অমোঘ সাজা
খবরটা এবারে আমার কাছে প্রত্যাশিত ছিল। কেষ্টপুরের কাছে জগৎপুর বলে একটা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সাজিদ জামাল বলে এক বছর পঞ্চাশের ব্যক্তিকে কেউ হত্যা করেছে। মাথার ওপর একটা প্রমাণ সাইজের পাথর ফেলে থেঁতলে দেওয়া হয়েছে। ফোন এসেছিল প্রদীপ্তর কাছ থেকেই, ঘটনাটা ঘটেছে সম্ভবত কাল রাতে। কিন্তু লোকটা একা থাকায় মৃতদেহ আবিষ্কার হয়েছে আজ সকালে।
আমি আর বিক্রম যখন গিয়ে পৌঁছলাম, এলাকায় তখন তিল ধারণের জায়গা নেই। রাস্তার কথা ছেড়েই দিলাম। ঘরের জানালায়, পাঁচিলের ওপর, বাড়ির ছাদে-এমনকী কয়েক জায়গায় গাছে উঠেও মানুষ নিজের কৌতূহল নিবারণ করছে। কথায় বার্তায় জানা গেল লোকটা প্রায় দশ বছর ধরে ইট, বালি সাপ্লাই করত, নিজেরই ব্যবসা।
কারও সঙ্গে শত্রুতা ছিল কি না-এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর পাওয়া গেল না।
লোকটাকে মারা হয়েছে বাড়ির পেছন দিকের উঠোনে। এদিকটায় বাথরুম আছে, বাড়ির থেকে আলাদা করা। ফরেন্সিক ডিপার্টমেন্ট জানাল, খুন করা হয়েছে রাত ন’টা থেকে সাড়ে ন’টার মধ্যে। এবং মৃতের পাশে তার ফোনের মধ্যে কষ্ট কাকে বলে, জানতে যদি চাও-বলে একটা গান চালানো ছিল।
আমি কোনোদিন এই গানটা শুনিনি।
বিক্রম বলল, এই গানটা এস.ডি. রুবেল বলে এক বাংলাদেশি গায়কের গাওয়া। কিছুক্ষণ পরে এক অফিসার একজন ক্রন্দনরত ব্যক্তিকে নিয়ে হাজির হল। লোকটার নাম রাজেশ মণ্ডল, সাজিদ জামালের সঙ্গে কাজ করত। বিক্রম লোকটাকে আপাদমস্তক জরিপ করে নিয়ে ইশারায় বসতে বলল। চারিদিকে পুলিশের খানাতল্লাশি চলছে, তার মধ্যেই আমরা তিনজন রাজেশ মণ্ডলকে ঘিরে বসলাম।
প্রদীপ্ত জিগ্যেস করল, ‘জল খাবেন?’ রাজেশ ঘাড় নেড়ে না বলল। ‘বেশ তাহলে যা যা জানেন, বলা শুরু করুন।’
রাজেশ মণ্ডল পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখ মুছে বলা শুরু করল, ‘স্যার, আমি সাজিদদার সঙ্গে আজ প্রায় দশ বছর ধরে কাজ করছি। সাজিদদার কেউ নেই। হেব্বি চাপা লোক। কাজে কম্মেও কারও সঙ্গে খুব একটা ঝামেলা হয়নি। খালি একবার বাগুইআটির প্রোমোটার সনৎদার সঙ্গে ক্যাচাল লেগেছিল। বালির কোয়ালিটি ঠিক হয়নি বলে অনেকদিন টাকা আটকে রেখেছিল। তারপর এম. এল. এ. সুজন সাহা এসে ব্যাপারটা সাল্টাল।’ রাজেশ দম নেওয়ার জন্য থামল, এই ফাঁকে বিক্রম জিগ্যেস করল, ‘কাল আপনি সারাদিন কোথায় ছিলেন?’
‘আমি তো স্যার সাইটে ছিলাম।’
‘সাইটে মানে কোথায়?’ প্রদীপ্ত জিগ্যেস করল।
‘নিউ টাউন অ্যাকশন এরিয়া টু। ওখানে একটা প্রোজেক্ট শুরু হয়েছে হরলালকা গ্রুপের। সুখ সায়র রেসিডেন্স বলে। ওখানেই ছিলাম স্যার। রাতে দু’ট্রাক মাল আসার কথা ছিল। কিন্তু দেরি হচ্ছিল দেখে দাদা বাড়ি চলে যায়, আর আমায় বলে থাকতে। আমি ওখানেই ছিলাম প্রায় রাত সাড়ে এগারোটা অবধি। মাল ঢোকার পর আমি দাদাকে ফোনও করি, কিন্তু তুলল না।’
বিক্রম খানিকক্ষণ একদৃষ্টে রাজেশের দিকে চেয়ে রইল। তারপর বলল, ‘আপনার সঙ্গে সাজিদের আলাপ কী করে হয়?’
রাজেশ তার বাঁ-গাল চুলকে নিয়ে বলল, ‘সে তো অনেক লম্বা ব্যাপার স্যার।’
‘আমাদের অনেক সময় আছে, বলে যান।’ প্রদীপ্ত বলল।
‘আচ্ছা স্যার বলছি, সাজিদদার সঙ্গে আমার পরিচয় আমার দাদা দীনেশের কাছ দিয়ে। আমার বাবা আর দাদা শুরুর দিকে ঠিকে মজুরের কাজ করত। একবার এক ঠিকাদার বাবা আর দাদাকে রানিগঞ্জে নিয়ে যায়, ওখানে কয়লা ভাঙার কাজ ছিল। সেখানেই সাজিদদার সঙ্গে দাদার দেখা হয়। সে অনেক বছর আগে একবার কয়লাখনিতে বন্যার জল ঢুকে লোক মরল। তখন আমার বাবাও মারা যায়। সাজিদ ভাই দাদাকে বলেছিল, দেশে ফিরে যেতে। কিন্তু ঘরে তখন অভাব, আমি ছোট, তাই দাদা ওখানেই থেকে যায়।
‘দাদা যখন বাড়ি আসত, তখন খুব সাজিদদার কথা বলত। হেব্বি চালু মাল ছিল স্যার! ওখানকার গুন্ডাদের সঙ্গেও সেটিং ছিল আবার পুলিশেরও নাকি খবরি ছিল। এদিক-ওদিক করে প্রচুর টাকা কামিয়েছিল। সেবার ওখানকার কয়লা মাফিয়াদের মধ্যে বিশাল ঠোকাঠুকি লেগেছিল। সে ঝামেলায় কী করে যেন আমার দাদা জড়িয়ে পড়ে, ওকেও কেউ গুলি করে মারে।
‘কে মেরেছিল জানি না স্যার। তবে তার কয়েক বছর পর যখন সাজিদদা কলকাতায় আসে, আমায় জড়িয়ে ধরে বলেছিল, “শোন রাজু, দিনু আর চাচাজি আমার পরিবার ছিল। যারা দিনুকে মেরেছে তাদের কাউকে আমি ছাড়িনি, গ্যাংয়ে গ্যাংয়ে লড়িয়ে দিয়েছি। শালারা প্রথমে
নিজেদেরকে মেরেছে, বাদবাকি পুলিশ। তবে তোর চিন্তা নেই আজ থেকে তুই আমার সঙ্গে কাজ করবি।”
‘সেই থেকে আমি সাজিদদার সঙ্গে কাজ শুরু করি। তবে একটা কথা স্যার, ও পাক্কা পাতাখোর ছিল। চরস, গাঁজা, টুলু, পাউডার, ট্যাবলেট-সব নিত। অনেকবার বারণ করেছি। কিন্তু শুনত না। নেশার জন্য যদি কারও সঙ্গে ঝামেলা করে থাকে স্যার, ওসব আমি বলতে পারব না।’
‘আর কিছু?’ বিক্রম জিগ্যেস করল।
মাথা নেড়ে না বলল রাজেশ।
প্রদীপ্ত রাজেশের ফোন নাম্বার আর ঠিকানা নিয়ে তাকে ছেড়ে দিল।
ওঠবার ঠিক আগে সে বলল, ‘আরেকটা কথা স্যার, বলা ঠিক কি না জানি না। সাজিদদার সঙ্গে পুলিশের কোনো এক বড়বাবুর খুব খাস সেটিং ছিল। কিন্তু কোনোদিন তার নাম বলেনি। খালি বলত, ওই নাম্বার ফোনে থাকে না মনে থাকে। নিজের ফোন থেকে নাকি ফোন করাও বারণ ছিল।’
‘তুমি তাকে দেখেছ?’ বিক্রম বিস্ফারিত চোখে জিগ্যেস করল। কিন্তু রাজেশ মণ্ডল দু’পাশে মাথা নেড়ে সেই আশার আলো নিভিয়ে দিল।
‘আর কিছু বলেছে ওনার সম্বন্ধে?’ বিক্রম যেন প্রাণপণে চেষ্টা করছে একটা পাওয়ার।
রাজেশ অনেকক্ষণ ধরে মাথা নেড়ে বলল, ‘একবার নেশার ঝোঁকে একটা কথা বলেছিল, এক পুলিশকে ঠুকতে আরেক পুলিশ ওকে সুপারি দিয়েছিল। নেশার ঝোঁকে আল-ফাল বকছিল, আমি বিশ্বাস করিনি।’
কথাটা শুনে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। নেশার ঘোরে বলা কথা কি সবসময় ভুল হয়? জানি না। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে এ খুনি কোনো সাধারণ লোক নয়। সে শেয়ালের মতো চালাক, বেজির মতো সতর্ক আর বাজপাখির মতো ক্ষিপ্র। তার ওপর এই প্লেস অফ অকারেন্সে এসে ওই পাথরটা দেখা ইস্তক আমার কেমন একটা ভয় ভয় করছে। কেন যেন মনে হচ্ছে, ওটা না দেখলেই ভালো হতো।
‘এই বোধি,’ বিক্রমের ডাকে হুঁশ ফিরল। ও জিগ্যেস করল, ‘কী রে, শরীর খারাপ লাগছে নাকি তোর?’
‘জল খাবে?’ এবারে প্রদীপ্ত জিগ্যেস করল। আমি তাড়াতাড়ি বললাম, ‘আরে না না, আমি… ঠিক আছি। আসলে অনেকগুলো খাতা দেখার আছে আর কোয়েশ্চেন পেপারও সেট করতে হবে। সেই চিন্তাতেই একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম।’
বিক্রম হালকা হেসে আমার পিঠ চাপড়ে দিল।
পরের কয়েকদিন কোনো কাজে ঠিক করে মন বসাতে পারলাম না। অনেকের পরীক্ষার খাতা দেখা বাকি আছে, কিছুই করা হচ্ছে না।
তৃতীয় দিন কোচিংয়ের সেন্টার হেড আমায় ডেকে পাঠালেন। আমি যেতেই বললেন যে আটজন বাবা-মা নাকি কমপ্লেইন করেছে-ক’দিন আগে নেওয়া পরীক্ষায় আমি অন্যায়ভাবে নাম্বার কেটেছি। আমার সামনে সেইসব খাতাগুলো রাখা হল। চেক করতেই বুঝলাম, ভুল আমারই।
সেন্টার হেড পরীক্ষিৎবাবু আমায় যথেষ্ট স্নেহ করেন। তার কারণ বাংলা সাবজেক্টটা নিয়ে দীর্ঘদিন যে সমস্যায় এই কোচিং সেন্টার ভুগছিল, শুধু তার সমাধানই নয়, বাংলার ছাত্র সংখ্যাও আমার কারণেই বেড়েছে।
তিনি আমায় বললেন, যদি সেরকম কোনো সমস্যা থাকে তাহলে যেন কয়েকদিন ছুটি নিই। আমি তাকে সর্বতোভাবে আশ্বস্ত করলাম যে, আমি সম্পূর্ণ সুস্থ, আমার কোনো ছুটির প্রয়োজন নেই এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না। উনি কতদূর আশ্বস্ত হলেন
জানি না, তবে আমায় আরেকটা সুযোগ দিলেন। কিন্তু এইভাবে আর কতদিন?
