একটি নদীর মৃত্যু
‘ধুত্তেরি।’ একটা বিরক্তিসূচক শব্দ করে টিভির রিমোটটা সোফার একদিকে ছুড়ে ফেলে দিল বিক্রম। ‘গত আধ ঘণ্টা ধরে একই কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলে যাচ্ছে, একই জিনিস দেখিয়ে যাচ্ছে। অসহ্য লাগে মাইরি! কেন? চারিদিকে কি আর কিছু হচ্ছে না?’
আমি হেসে বললাম, ‘এই সাত সকালে তুই ঠিক কোন ব্রেকিং নিউজের অপেক্ষা করছিস বল তো! আর নিউজ চ্যানেলগুলোকে কেই বা মাথার দিব্যি দিয়েছে যে, সবসময় তোর মনের মতো খবর দেখাবে?’
‘আরে ভাই, খবর যদি না থাকে অ্যাড দেখা, নয়তো খই ভাজ- তাই বলে একই জিনিস বারবার দেখানোর দরকারটা কী?’
‘আজকাল কে আর সঠিক কাজ করে বল!’
‘সেটাই আরও অসহ্য লাগে। কথায় বলে “ইন আ টাইম অফ ইউনিভার্সাল ডিসিট, টেলিং দ্য ট্রুথ ইজ আ রেভোলিউশনারি অ্যাক্ট”। কী বুঝলি?’
‘হুম, জর্জ অরওয়েল, ১৯৮৪।’
বিক্রম হাসি হাসি মুখে বলল, ‘বাহ্, তোর মনে আছে দেখছি!’
‘তা আছে বই কি! কিন্তু এসব কথা এখন ছাড় তো। তার চেয়ে একটু কফি বল, খাই।’
বিক্রম আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমারও অনেকক্ষণ ধরে মনটা কফি কফি করছে। দাঁড়া, নগেনদাকে বলছি। তোরটা দুধ দিয়ে তো?’
‘ইয়েস, উইথ দু’চামচ চিনি।’
‘ইসস, কফি খাওয়ার দরকারটা কী তোর! হরলিক্স খা।’ ব্যাজার মুখে বলল বিক্রম।
চিমটিটা বেশ জোরেই লাগায় ঠিক করলাম, জুতসই জবাব দিতে হবে। বললাম, ‘পুরোটাই স্বভাবের ব্যাপার বুঝলি তো। মিষ্টি মানুষরা মিষ্টি খায় আর তেতোরা তেতো।’
বিক্রম কিছু একটা বলতে গিয়েও হেসে ফেলল।
নগেনদাকে বলতেই কিছুক্ষণের মধ্যে দু’কাপ ধুমায়িত কফি এসে পড়ল। বিক্রম তাতে একটা চুমুক দিয়ে বলল, ‘এবার বলে ফেল, তোর কী হয়েছে? মন ভালো নেই কেন? গত আধ ঘণ্টা ধরে খবরের কাগজের খেলার পাতাটাই খোলা যখন, তার মানে একটাই। অস্ট্রেলিয়ার কাছে সেমি-ফাইনাল হারটা এখনও হজম করতে পারিসনি। তাই তো?’
অকাট্য যুক্তি। আমি দুঃখ করে বললাম, ‘কী করে হজম করি বল তো? মাত্র দু’সপ্তাহ হয়েছে। একে সেই ২০০৩-এর মতো বিশ্রী হার, তারপর এত লড়াই করেও শেষে ধোনির চোখে জল। মানা যায়?’
বিক্রম নিজের কফিতে আরেকটা চুমুক দিয়ে বলল, ‘বুঝেছি। নে কফিটা খা, দ্যাখ, একটু ভালো লাগবে।’
এই হাসি-ঠাট্টার মধ্যেও আমার মন খারাপটা বিক্রমের নজর এড়ায়নি। ওর চরিত্রের এই তীক্ষ্ণ দিকটা আমায় বরাবরই খুব অবাক করে। অনেকবার দেখেছি, কাউকে এক নজর দেখেই ও এমন অনেক কিছু বলে দেয়, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে একরকম অসম্ভব।
অবশ্য এইভাবে বললে পাঠক অথৈ জলে পড়বেন! তাই প্রথমে পরিচয় পর্বটা সেরে ফেলা যাক।
আমি বোধি, পুরো নাম বোধিসত্ত্ব ঘোষ, বয়স পঁয়ত্রিশ। আর এ হল আমার বন্ধু বিক্রম, ওরফে বিক্রমজিৎ চক্রবর্তী। আমরা দুজনেই সমবয়সি এবং বর্তমানে অবিবাহিত।
বিক্রম বিশেষ কোনো কাজকম্ম করে না। কাজকম্ম মানে-উপার্জন আর কী। অবশ্য তার প্রয়োজনও খুব একটা নেই। কারণ খুব সহজ- বিক্রমের বাবারা তিন ভাই; প্রকাশ চক্রবর্তী, বিকাশ চক্রবর্তী এবং আকাশ চক্রবর্তী। এঁদের মধ্যে বড় ভাই, বিক্রমের জ্যাঠামশাই প্রকাশ চক্রবর্তী সারাজীবন ধরে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা করেছেন। যার বেশিরভাগই সফল। বিক্রম একবার বলেছিল, উনি নাকি ব্যবসা সামলাতে গিয়ে আর বিয়েই করেননি। ওদের পরিবারে অর্থের প্রাচুর্য শুরু হয় ওঁর হাত ধরেই।
বিক্রমের বাবা বিকাশকাকু ছিলেন তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে মেধাবী। তিনি খড়গপুর আইআইটিতে কোয়ান্টাম ফিজিক্সের হেড অফ দ্য ডিপার্টমেন্ট ছিলেন। বিক্রমের মা রজনীকাকিমা ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতের অধ্যাপিকা।
আর বিক্রমের প্রিয় ছোটকা… এঁদের ছোট ভাই আকাশ চক্রবর্তী। উনি ছিলেন আইপিএস এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার অফ পুলিশ। উনিও অবিবাহিত ছিলেন।
যথারীতি এঁদের মৃত্যুর পর সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী হয় বিক্রম।
বিক্রমদের পরিবারে প্রায় প্রত্যেকেই অসুস্থতার কারণে বা বয়সজনিত কারণে মারা গেছেন। ব্যতিক্রম শুধু ওর ছোটকা। কর্মজীবনের শেষ দিকে উনি রানিগঞ্জে পোস্টেড ছিলেন। একটা বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে তাঁকে সেখানে পাঠানো হয়েছিল। ওখানকার কয়লা মাফিয়াদের ক্ষমতা দখলের যুদ্ধে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল-সেই কেসের সূত্রেই ওখানে গিয়েছিলেন ছোটকা।
ওনার পোস্টিংয়ের কয়েকদিন আগেই একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতাকে প্রকাশ্য দিবালোকে কে বা কারা গুলি করে হত্যা করেছিল। প্রাণের ভয়ে কেউ মুখ না খুললেও সকলেই জানত, এ হত্যার পেছনে কাদের হাত ছিল।
ছোটকা রানিগঞ্জে পা দিয়েই খুব দ্রুত গোটা ব্যাপারটা নিজের হাতের মুঠোয় করে নেন। তিনি কয়লা মাফিয়াদের পুরো নেটওয়ার্ক ভেঙে বেশিরভাগ দুষ্কৃতীদের জেলে পুরেছিলেন। কিন্তু কোনোভাবে এদের মধ্যে ধানবাদ পালিয়ে বেঁচে গিয়েছিল ভৈরব সিং ওরফে কালু। তক্কে তক্কে ছিল, এক দিন সুযোগও জুটে গেল। আগস্ট মাসের এক বৃষ্টিভেজা রাতে কালুর নির্দেশে প্রায় কুড়িজন বন্দুকধারী দুষ্কৃতীর দল ঘিরে ফেলল পুলিশের জিপটাকে। মিনিট পঁচিশ ধরে চলল অবিরাম গুলিবর্ষণ। শোনা যায়, আক্রমণ এমনই অতর্কিতে হয়েছিল যে, শত্রুদের কাছে ত্রাসসম ওই মানুষটি বন্দুক বের করার সুযোগটুকুও পাননি।
বিক্রম তখন ফাইনাল ইয়ার দিচ্ছিল। প্রিয় ছোটকার এই ভয়াবহ মৃত্যু, এই আচমকা চলে যাওয়া ও কোনোদিনই মেনে নিতে পারেনি। বিক্রম ঠিক করেছিল, ও ছোটকার মতো পুলিশে যোগ দেবে।
কিন্তু মানুষ ভাবে এক, আর হয় আরেক। চারবার ইউপিএসসি দিয়েও যখন কৃতকার্য হল না, তখন ওই একটু আগের করা স্বগতোক্তিটা করে নিজেকে অব্যাহতি দিয়েছিল। আমি আর বিক্রম দুজনেই শিয়ালদহের মিত্র ইনস্টিটিউশনে একসঙ্গে ক্লাস টুয়েলভ পর্যন্ত পড়েছি। তখন থেকেই আমাদের বন্ধুত্ব। স্কুল পাশ করে বিক্রম গেল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে, আর আমি গেলাম বাংলা অনার্সের দিকে। তারপর যা হয়, দীর্ঘদিনের বিচ্ছেদ।
অবশ্য সেই স্কুলের পরে আমাদের এই রি-ইউনিয়ন, আর তারপর রুমমেট হওয়াটা অপ্রত্যাশিতই ছিল।
বছর পাঁচেক আগের কথা, আমি তখন একটা ইন্টারভিউতে রিজেক্ট হয়ে ক্লান্ত পায়ে বাড়ি ফিরছি। হঠাৎ করে, কে যেন পিঠে বেশ জোরে একটা চাপড় মারল। আমি চমকে পিছন ফিরে তাকালাম। দেখি বিক্রম! মুখে সেই চেনা হাসি।
‘কী বোধিবাবু! ইন্টারভিউ ভালো হল না?’
আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। একে এতদিনের অসাক্ষাৎ, তার ওপর হঠাৎ এমন প্রশ্ন! বিক্রম আমার অবস্থা বুঝে হেসে বলল, ‘ওইভাবে বোকার মতো তাকাস না, অফিস এলাকায় দুপুরবেলা একা একা উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ানো, হাতে ট্রান্সপারেন্ট ফাইলের মধ্যে থাকা সিভি, আর চোখে হতাশার ছাপ একটা বাচ্চাও দেখলে বলে দেবে তোর কী হয়েছে।’
আমি অনেকদিন বাদে হাসলাম। সেই সন্ধ্যায় একটা কফি শপে দীর্ঘক্ষণ বসে দুই বন্ধু মিলে আড্ডা দিয়েছিলাম। পুরোনো দিনের গল্প, স্বপ্ন, হতাশা-সব মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। বিক্রমের মুখেই শুনলাম, একজন একজন করে ওর বাবা, মা আর ছোটকার চলে যাওয়ার কথা। ভাবতে অবাক লাগে, এত বছর পর যোগাযোগ হল… আর হয়েই শুধু বিয়োগের বিবরণ শুনলাম। এক সময় কফি খেতে খেতে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম, ‘চাকরির বাজার এত খারাপ, কিছুতেই কিছু ক্লিক করছে না জানিস! আর দিদির বাড়িতে থাকাটাও বেশ অস্বস্তিকর। সৌরভদা উঠতে বসতে খোঁটা দেয়।’
বিক্রম ভ্রু কুঁচকাল, ‘এই জরুরি কথাটা তুই আমায় এতক্ষণে বলছিস! যা, এক্ষুনি বাড়ি যা, সব লটবহর নিয়ে আমার বাড়িতে চলে আয়। ওখানেই থাকবি, নিশ্চিন্তে ইন্টারভিউর প্রিপারেশন নিবি, কেউ নাক গলাবে না।’
আমি হালকা হেসে বললাম, ‘ধুর পাগলা, কী যে বলিস না! এইরকম আবার হয় নাকি?’
‘কেন? তোর অসুবিধাটা কোথায়?’
‘আরে বাবা, তোর বাড়ির লোক…’ কথাটা বলতে গিয়েই হঠাৎ মনে পড়ে গেল, ওর বাড়িতে প্রশ্ন করার মতো কেউ নেই। শুধু ওর জ্যাঠার আমলের এক পুরাতন ভৃত্য নগেনদা ছাড়া। বুঝলাম যে বিক্রম আমায় ওর বাড়ি নিয়ে গিয়ে তবেই ছাড়বে। অগত্যা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম, তারপর মাথা নেড়ে বললাম, ‘বেশ ঠিক আছে।’
সেই থেকে আমার ঠিকানা ১২/১৪ বিবেকানন্দ রোড, বিক্রমের বাড়ি। আমি অবশ্য এখন আর আগের মতো কাঠবেকার নেই। চার বছর হল আমি ‘অল ওয়েল টিউটোরিয়াল’ বলে একটা কোচিং সেন্টারে বাংলা পড়াই। সপ্তাহে চার দিন। রোজগার বেশ ভালোই। মা’কে কিছু টাকা পাঠিয়ে আমার একার দিব্যি চলে যাচ্ছে।
এই ছিল পূর্বকথন। এবার বর্তমানে ফেরা যাক, মূল ঘটনার শুরু এখান থেকেই।
কফি কাপ হাতে টুকটাক আলোচনা চলাকালীন হঠাৎ বিক্রম টিভির দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে গেল। চিৎকার করে বলল, ‘বোধি, জোরে কর।’
আমি বোকার মতো মুখ করে বললাম, ‘কী জোরে করব?’
‘আরে টিভিটা। রিমোটটা কোথায় গেল রে বাবা।’
আমি প্রথমে টিভির দিকে তাকালাম। স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে ব্রেকিং নিউজ-প্রাক্তন সাংসদ ও সাহিত্যিক তোর্সা দেব রঞ্জনের নারকীয় হত্যা! নৃশংসতায় হতবাক পুলিশ।
আমি দ্রুত হাতে রিমোটটা নিয়ে টিভির ভলিউম বাড়িয়ে দিলাম। সংবাদ সঞ্চালিকার আওয়াজ সকালের নিস্তব্ধতাকে খান খান করে জানান দিল-কলকাতার অন্যতম জনপ্রিয় সাহিত্যিক ও প্রাক্তন সাংসদ তোর্সা দেব রঞ্জনকে তাঁর বাড়ির স্টাডিতে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশের তরফ থেকে এখনও পর্যন্ত কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়নি। ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়েছেন ডিসিডিডি লালবাজার শেখর সেন। আমরা সোজা চলে যাব আমাদের প্রতিনিধি গৌতম সরকারের কাছে, গৌতম, আমাদের কথা শুনতে পাচ্ছ?…
‘মিউট করে দে।’
আমি মাথা ঘুরিয়ে বিক্রমের দিকে তাকালাম। দেখলাম, ওর মুখটা বেশ গম্ভীর হয়ে গেছে। জিগ্যেস করলাম, ‘কী ব্যাপার রে, তুই কি চিনতিস ওনাকে?’ বিক্রম ধীরে ধীরে ওপর-নীচে মাথা নাড়ল, ‘ছোটকার সঙ্গে পরিচয় ছিল। একবার আমাদের বাড়িতেও এসেছিলেন। ছোটকাই ডেকে… এই জোরে কর, জোরে কর।’ বিক্রম আচমকা চেঁচিয়ে উঠল।
আমি আবার টিভি আনমিউট করলাম।
সঞ্চালিকার কথা ভেসে এল-এই মুহূর্তে আমরা সরাসরি চলে যাব সল্টলেকের বিডি ব্লকে নিহত সাহিত্যিক তোর্সা দেব রঞ্জনের বাড়ির সামনে, যেখানে পুলিশের তরফে সরকারি বিবৃতি দিতে চলেছেন ডেপুটি কমিশনার শেখর সেন। আমরা শুনে নেব ডিসিডিডির বক্তব্য…।
ক্যামেরা ঘুরে গেল পুলিশ অফিসারের দিকে। তিনি বললেন, ‘আমরা অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি, গত রাতে বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও প্রাক্তন সাংসদ শ্রীমতি তোর্সা দেব রঞ্জনকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ড কলকাতার সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ ঘটনা। হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে গভীর রাতে, আনুমানিক রাত ২:৩০ থেকে ৩:৩০-এর মধ্যে। ভিক্টিমকে তাঁর নিজের স্টাডি রুমে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে।
‘বডি ইতিমধ্যেই অটোপ্সির জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা এখন পোস্টমর্টেম রিপোর্ট হাতে পাওয়ার অপেক্ষা করছি। তবে প্রাথমিক তদন্তে যা পাওয়া গেছে, তা অত্যন্ত ভয়ংকর। ভিক্টিমের সমস্ত আঙুল কেটে আলাদা করা হয়েছে এবং সেই আঙুলগুলির দুটি চোখে, দুটি কানে, এবং বাকিগুলি মুখের ভিতরে গুঁজে দেওয়া হয়েছে। ঘটনাস্থলে কোনো রক্তের দাগ পাওয়া যায়নি, এটা প্রমাণ করে যে হত্যাকারী অত্যন্ত প্রফেশনাল এবং সিস্টেমেটিক ওয়েতে খুনটা করেছে।’
ডিসিডিডি শেখর সেন এবার কিছু ফাইল উলটে নিয়ে বললেন, ‘সঙ্গে একটা অদ্ভুত তথ্য উঠে এসেছে। মৃতদেহ উদ্ধারের সময়, নিহতের মোবাইল ফোনে আমায় ডুবাইলি রে, আমায় ভাসাইলি রে-গানটা চালিয়ে রাখা ছিল। এটা খুনির ইচ্ছাকৃতভাবে সেট করা, নাকি শুধুই বিভ্রান্ত করার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে, তা আমরা খতিয়ে দেখছি।’
একজন সাংবাদিক উঠে বললেন, ‘স্যার, এটা কি কোনো সিরিয়াল কিলিংয়ের অংশ বলে মনে হচ্ছে?’
অফিসার জানালেন, ‘এখনই আমরা এটাকে সিরিয়াল কিলিংয়ের তকমা দিতে পারি না। হত্যার ধরন এবং নিষ্ঠুরতা দেখে এটাকে নিছকই ব্যক্তিগত আক্রোশ বলে মনে হচ্ছে। তবে আমরা প্রতিটা দিকই খতিয়ে দেখছি।’
আরেকজন সাংবাদিক জিগ্যেস করলেন, ‘পরিবারের সদস্যদের কি জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে?’
ডিসিডিডি বললেন, ‘আমরা নিহতের স্বামী, মা ও ব্যক্তিগত সচিবের সঙ্গে কথা বলেছি। এছাড়াও তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধব, সহকর্মী এবং প্রকাশকদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’
একজন মহিলা সাংবাদিক জিগ্যেস করলেন, ‘স্যার, পুলিশ কী মনে করে? হত্যাকারী ভিক্টিমের পরিবারের কেউ?’
শেখর সেন সামান্য মাথা ঝুঁকিয়ে বললেন, ‘আমরা এই মুহূর্তে কোনো সম্ভাবনাকেই উড়িয়ে দিচ্ছি না। তদন্ত চলছে। আমরা আশা করছি খুব দ্রুত সত্যিটা আপনাদের সামনে আনতে পারব।’
হঠাৎ করে একজন সাংবাদিক উঠে একটা বেয়াড়া প্রশ্ন করে বসল, ‘আচ্ছা পুলিশ এখনও পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি কেন?’
উত্তরে ডিসিডিডি শেখর সেন বলে উঠলেন, ‘আপনি তাহলে বলে দিন কাকে কোন গ্রাউন্ডে গ্রেফতার করতে হবে, আমি এখনই অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট ইস্যু করছি। এই ধরনের শিশুসুলভ প্রশ্ন করে অযথা পুলিশের সময় নষ্ট করবেন না। মনে রাখতে হবে, দেয়ার আর সার্টেন প্রোটোকল্স অ্যান্ড প্রোসিডিওরস উই আর ফলোয়িং ইন আ স্ট্রিক্ট ম্যানার। তোর্সা দেব রঞ্জনের মৃত্যু কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। ওনার মৃত্যু, সাহিত্য এবং রাজনৈতিক জগতের এক অপূরণীয় ক্ষতি। সরকার এবং পুলিশ উভয়েই এই কঠিন সময়ে ওনার পরিবারের পাশে আছে এবং থাকবে।
‘সম্পূর্ণ ঘটনাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। আমাদের কাছে কড়া নির্দেশ আছে-এই কেস-সংক্রান্ত যে-কোনো বিভ্রান্তিকর, মনগড়া ও প্ররোচনামূলক তথ্য সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হবে। যদি কেউ বিতর্কিত কোনো কন্টেন্ট সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখতে পান, দয়া করে নিকটবর্তী থানায় যোগাযোগ করুন। আমরা অপরাধীকে শীঘ্রই আইনের সামনে এনে উপস্থিত করব এবং উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করব। দ্যাট উইল বি অল। থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ। নো ফারদার কোয়েশ্চেন প্লিজ।’
আমি টিভিটা বন্ধ করে দিলাম। বিক্রম অস্থিরভাবে সারা ঘরে পায়চারি করতে শুরু করল। তারপর হঠাৎ করে বলল, ‘বোধি, আমাদের একবার যাওয়া দরকার বুঝলি।’
আমি জিগ্যেস করলাম, ‘কোথায় যাবি?’
‘ক্রাইম স্পট। তার আগে একবার লালবাজার হয়ে যেতে হবে।’
‘এখনই? একটু ব্যাপারটা ঠান্ডা হওয়ার পর না হয়…’
‘বোধি, আমরা সান্ত্বনা জানাতে যাব না, ইনভেস্টিগেট করতে যাব। আমি এই তদন্তের অংশ হতে চাই।’
‘তার মানে?’ আমি অবাক হয়ে জানতে চাইলাম।
‘মানে আমি এই মামলার নিষ্পত্তি করতে চাই।’
‘এই, তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি রে? মানলাম উনি তোর পূর্বপরিচিত ছিলেন, কিন্তু তার মানে এই নয় যে, আমরা আচমকা এমন একটা হাই-প্রোফাইল মার্ডার কেসে জড়িয়ে পড়ব!’
‘বোধি একটা কথা বল, যবে থেকে আমায় চিনিস, তোর কী মনে হয়? আমার মধ্যে গোয়েন্দা হওয়ার ক্ষমতা আছে?’
আমি খানিক ভেবে বললাম, ‘তা আছে, তুই বুদ্ধিমান এবং তোর অবজার্ভেশন পাওয়ার যে মারাত্মক-তার প্রমাণ অনেকবারই পেয়েছি। কিন্তু তার সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে যে, তুই অনভিজ্ঞ। এরকম ধরনের হাই-প্রোফাইল কেসে পুলিশকে পর্যন্ত ভেবেচিন্তে স্টেপ নিতে হয়। সেখানে তোকে কেন এই কেসে ঢুকতে দেবে বল তো?’
‘আর যদি ঢুকতে পারি?’
আমি ভ্রু কুঁচকে বললাম, ‘সেটা কীভাবে?’
‘ডিসিডিডি শেখর সেন। অ্যাকাডেমিতে ছোটকার জুনিয়র ছিলেন, হি ইজ ইভেন ট্রেইনড আন্ডার ছোটকা। এখনও মাঝেমাঝে ফোন করে খবরাখবর নেন।’
‘বুঝলাম, কিন্তু বিক্রম তাও…’
‘আর কিন্তু নয়, চটপট রেডি হয়ে নে, আমরা লালবাজার যাব। আর বাকি কথা রাস্তায় বলব।’
এর পরে আর কিছু বলার থাকে না। অগত্যা দুরুদুরু বুকে একটা উবার বুক করে লালবাজারের উদ্দেশে রওনা দিলাম।
