হে অতীত কথা কও
হাতটাকে মুঠো করে মুখের সামনে ধরে জানালার দিকে তাকিয়ে বসে আছেন প্রণবেশ পাল। একসময় আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘শহর জুড়ে একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড চলছে। খুনিকে ধরা তো দূরস্থ, আপনারা একজন অসুস্থ বৃদ্ধকে বিরক্ত করে চলেছেন। আমি আগেও বলেছি, আবারও বলছি-এইসব ব্যাপারে আমি কিচ্ছু জানি না।’
বিক্রম চায়ের কাপ তুলে শেষ চা-টুকু গলাধঃকরণ করল, তারপর খুব শান্তস্বরে বলল, ‘একটা কথা বলুন তো স্যার, আগেরদিন যখন আপনার কাছে এসে ভদ্রভাবে সব জানতে চাইলাম, তখন আপনি আমাদের অর্ধেক সত্যি শোনালেন কেন? যে বয়সে মানুষ নিজের নাম মনে রাখতে পারে না, সে বয়সে এসেও কোন ‘৮৬ সালে কে পার্টি জয়েন করেছিল, কবে আপনি গ্রীষ্মকালীন অধিবেশনে অংশগ্রহণ করেছিলেন, এমনকী কত সালে কত ভোটে হেরেছিলেন-সব আপনার মনে আছে। অথচ তোর্সার সেই এনজিও কেন বন্ধ হয়ে গেল, সেটা আপনার মনে নেই? এবার একটু ঝেড়ে কাশুন তো, মশাই!’
প্রণবেশবাবু কষায়িত দৃষ্টিতে তাকালেন বিক্রমের দিকে, দাঁতে দাঁত চেপে মুখ বিকৃত করে বললেন, ‘ভালো করে শুনে রাখ, ফচকে ছোঁড়ার দল। তোরা আমায় ভয় দেখিয়ে কিচ্ছু করতে পারবি না। কিন্তু আমি চাইলে তোদের জেলের ভাত খাওয়াতে পারি। হ্যাঁ, এখনও পারি।’ তারপর প্রদীপ্তর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এই যে ইন্সপেক্টর, ব্যাপারটা কী? সাসপেন্ড হওয়ার জন্য এত উতলা হয়ে উঠেছ কেন? অ্যাঁ? বেরোও সবাই, এই মুহূর্তে আমার বাড়ি থেকে বেরোও।’
দেখলাম শেষ কথাগুলো বলতে গিয়ে প্রণবেশবাবু প্রায় কাঁপছেন, তার কপালের শিরা ফুলে উঠেছে। এবার বিক্রমের কঠিন স্বর বেরিয়ে এল, ‘আপনার ক্ষমতা থাকলে এই দণ্ডে আমায় গ্রেপ্তার করুন। আমিও দেখি আপনি এখনও পারেন কি না?’ প্রদীপ্ত, ইনি সোজা ভাষার লোক নন, সুতরাং ওভার টু ইউ।’
প্রদীপ্ত এতক্ষণ চুপ করে সব শুনছিল, বিক্রমের কথা শেষ হতেই সে প্রণবেশবাবুর দিকে এগিয়ে এসে বসল। ঘরের টেবিলে রাখা কিছু ওষুধের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, ‘এই ওষুধগুলো কার?’
প্রণবেশবাবু প্রদীপ্তর নির্দেশিত দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমার ওষুধ। কেন?’
‘সবক’টা?’
‘হ্যাঁ, কিছু ডায়াবেটিস আর বেশিরভাগ হার্ট আর প্রেসারের ওষুধ। কিন্তু কেন?’
‘কারণ, পরের প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি ঠিক করে না পাই, সব ওষুধ একসঙ্গে করে তোমার গাঁড়ে গুঁজে দেব বাঞ্চোৎ বুড়ো। তারপর দেখব, কোন ফুটো দিয়ে তোমার ক্ষমতা বেরোয়।’ এই আচমকা শব্দবাণের ঠেলায় প্রণবেশবাবু তো বটেই, আমিও হতবাক হয়ে গেলাম।
প্রণবেশবাবু নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, ‘অফিসার, আপনি কিন্তু আমার সঙ্গে এই ভাষায় কথা বলতে পারেন না। ভুলে যাবেন না, আমি একজন প্রাক্তন মন্ত্রী। আমার প্রাপ্য সম্মান আপনি…’
‘তোমার মন্ত্রিত্বের চোদ্দোবার… দম থাকলে আরও দু’বার। আর একটা ফালতু কথা বললে এখানেই শুরু হয়ে যাব।’
এই লাগামহীন প্রদীপ্তর সামনে প্রণবেশবাবু আর বাড়াবাড়ি করার সাহস পেলেন না। খানিক চুপসে গিয়ে বললেন, ‘ঠিক আছে বলছি,’ তারপর চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস নিয়ে বলতে শুরু করলেন, ‘তোর্সার এনজিওর নাম ছিল আশ্রয়। এই সংস্থার গোড়াপত্তন করেছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতির্ময় ভট্টাচার্য। পরে প্রবুদ্ধদা আর আমিও অফিসিয়ালি এর সঙ্গে যুক্ত হই। আমাদের এই এনজিওর সঙ্গে যুক্ত করে তোর্সা।
‘যদিও আশ্রয় যার মস্তিষ্কপ্রসূত, সে ছিল তোর্সার বেস্ট ফ্রেন্ড অনন্যা বলে একটা মেয়ে। ভীষণ মুখচোরা আর প্রচারবিমুখ ছিল। খুব একটা জনসমক্ষে আসত না।
‘তোর্সার মুখেই শুনেছিলাম, কোনো এক অ্যাংলো-খ্রিস্টানকে পালিয়ে বিয়ে করে নাকি পরিবারের বিরাগভাজন হয়েছিল। কিন্তু সমস্যা হয় যখন এক রাতে কেউ বা কারা এই মেয়েটাকে রেপ করে মাথায় পাথর দিয়ে মেরে খুন করে। সরকার পুলিশ দুজনেই চেষ্টা করেছিল, কিন্তু অনেক করেও খুনিকে ধরা যায়নি। তোর্সাও এই ঘটনাটা ভালোভাবে নেয়নি। ওকে অনেক কষ্টে বুঝিয়ে শান্ত করা হয়। মেয়েটার বর বহুদিন ধরে ধরনা দিয়েছিল যাদবপুর থানায় আর লালবাজারে।
‘বিশ্বাস করুন, আমরা সত্যিই অনেকদিন ধরে চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু কোনোদিন জানা যায়নি কে এই জঘন্য অপরাধ করেছিল। মেয়েটার এক দাদা ছিল যে পুলিশে চাকরি করত। সে-ও সে সময়ে বাইরে কোথাও পোস্টেড ছিল। বিশ্বাস করুন, এর বেশি আমি কিচ্ছু জানি না।’
আমি এতক্ষণ নিঃশব্দে প্রণবেশবাবুর কথা শুনছিলাম। ভদ্রলোকের কথা শেষ হতেই আমার দৃষ্টি ঘুরল বিক্রমের দিকে। দেখলাম, ওর চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে। মনে হল, দীর্ঘ প্রতীক্ষার ফল পেয়েছে। কয়েক সেকেন্ড আমরা সবাই চুপচাপ। বিক্রম প্রশ্ন করল, ‘এই ঘটনাটা এক্স্যাক্টলি কবেকার?’
প্রণবেশবাবু মাথাটা তুলে একটু ভেবে নিয়ে বললেন, ‘উমম… ‘৮৬-র গোড়ার দিকের ঘটনা।’
‘ওই সালেই তো তোর্সা পার্টি জয়েন করে?’ বিক্রম একটু ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল।
‘হ্যাঁ।’
‘ঘটনাটা কোথায় ঘটেছিল?’
‘যতদূর মনে পড়ে যাদবপুর এইটবি বাস স্ট্যান্ডের কাছে।’
বিক্রম ‘হুম্’ বলে আবার জিগ্যেস করল, ‘আর এই আশ্রয়ের অফিসের ঠিকানাটা…?’
‘সাউথ সিটি কলেজের পাশে একটা পাঁচতলা বিল্ডিং আছে, তার গ্রাউন্ড ফ্লোরে।’
‘ওনার হাজবেন্ডের নাম মনে আছে?’ প্রদীপ্ত জিগ্যেস করল।
‘হ্যাঁ। যিনি ক’দিন আগে খুন হলেন-উকিল নিকোলাস রজার্স।’
আমি একটা জোর ধাক্কা খেলাম। তাহলে নিকোলাস রজার্সের অনু হচ্ছে এই অনন্যা! আর তার পুলিশ দাদাটি কে?
প্রদীপ্ত আবার জিগ্যেস করল, ‘আর ওনার ভাইয়ের নাম?’
‘আমি জানি না। দেখুন, এটা হয়তো শুনতে অনেক বড় ঘটনা মনে হচ্ছে। কিন্তু সে সময় এটা নিয়ে এত বেশি হইচই হয়নি। র্যাদার আমরা হতে দিইনি। তাই আমার ওর দাদার সঙ্গেও সরাসরি যোগাযোগ হয়নি। তবে হ্যাঁ, হাজবেন্ড এবং দাদা দুজনকেই কম্পেনসেট করে দেওয়া হয়। দাদাকে প্রোমোশন আর হাজবেন্ডকে কিছু টাকা। প্রথমে রাজি না হলেও পরে মেনে নেয়।’
এ সময় হঠাৎ দরজায় কড়া পড়ল। দেখলাম, প্রণবেশবাবুর স্ত্রী এসেছেন। ঘরে ঢুকে আমাদের দিকে কড়া দৃষ্টিপাত করে বললেন, ‘দেখুন অনেক রাত হয়েছে। এতক্ষণ ধরে বসে কথা বলা ওনার জন্য ঠিক নয়। বয়স হয়েছে তো!’
বিক্রম অত্যন্ত মোলায়েম স্বরে বলল, ‘আপনি একদম সঠিক সময় এসেছেন। কথা শেষ, আমরা উঠতেই যাচ্ছিলাম।’
বাইরে এসেই বিক্রম বলল, ‘সবে মাত্র সাড়ে সাতটা বাজে। প্রদীপ্ত তোমার খুব তাড়া আছে?’
প্রদীপ্ত নিজের ঘড়ি দেখে বলল, ‘না, সেরকম কিছু নয়। কেন কোথায় যাবে?’
‘এই তেঘরিয়ার সামনে একটা সিসিডি আছে, ওখানে বসে একটু আলোচনা করা দরকার। একা ভাবতে গেলে আমার মাথা ফেটে যাবে।’
প্রদীপ্ত হালকা হেসে বলল, ‘বেশ তো চলো।’
