শেষ ইচ্ছে – প্রমিত গুপ্ত

শেষ ইচ্ছে

‘গঙ্গোত্রী’-র বিশাল বৈঠকখানায় সবাই বসে আছেন। ঠিক মাঝখানে অ্যাডভোকেট তন্ময় চ্যাটার্জি। তাঁর উলটো দিকে বসে আছেন শ্রীমতী যমুনা দেব, পাশে অজয় রঞ্জন। বাঁ-দিকে তোর্সার দুই সন্তান-সরযূ ও ঝিলাম। সরযূ পা দুলিয়ে চলেছে, আর ঝিলাম, তার ভাইয়ের গায়ে হেলান দিয়ে বসে আছে। তাদের দু’পাশে দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির তিন ভৃত্য-হরিদা, লক্ষ্মী আর বেলা। আর এক কোণে বসে আছেন কাবেরী বাসু।

আমি, বিক্রম আর প্রদীপ্ত দাঁড়িয়ে আছি ঘরের একপ্রান্তে, ঘড়িতে তখন ছ’টা। আমরা এখানে এসে পৌঁছেছি প্রায় আধ ঘণ্টা আগে।

তন্ময়বাবু একটু আগে গোটা উইলটা সকলের সামনে পড়ে শোনালেন। উইলে বিশেষ কিছু ছিল না। তোর্সার নিজের দুটো ফ্ল্যাট আছে, যার একটা তিনি তার ছেলেকে, অন্যটা মেয়েকে দিয়ে গেছেন। সঙ্গে ব্যাঙ্ক এবং অন্যান্য মিলিয়ে প্রায় পঞ্চান্ন লক্ষ টাকাও তার দুই সন্তানের মধ্যে সমান ভাগ করে দিয়ে গেছেন। শুধু একটাই শর্ত-এই সম্পত্তি পেতে হলে তার সন্তানদের মায়ের ইচ্ছে অনুযায়ী বিয়ে করতে হবে। নচেৎ সব সম্পত্তি কোনো এক চ্যারিটেবল সংস্থাকে দিয়ে দেওয়া হবে।

এমন সময়ে তন্ময়বাবু হঠাৎ বলে উঠলেন ‘এই উইল নিয়ে যদি কারও কোনো আপত্তি থাকে, তাহলে বলুন।’

‘আমার আপত্তি আছে।’ উপস্থিত সকলের দৃষ্টি ঘুরে গেল তোর্সার স্বামী অজয় রঞ্জনের দিকে, ‘আমি জানতে চাই হোয়াট ইস দ্য পয়েন্ট অফ দিস ইনসেন উইল? যেকোনো ভদ্র ও শিক্ষিত সমাজে একজন অ্যাডাল্ট নিজের ডিসিশন নিজেই নেয়। ইফ আয়াম নট রং, দেন দিস ইজ বেসিক রাইট। তাহলে তোর্সার ইচ্ছে অনুযায়ী আমাদের ছেলে-মেয়ে কেন বিয়ে করবে? আই উইল চ্যালেঞ্জ দিস উইল।’

তন্ময়বাবু তার চশমাটা খুলে খাপে রাখতে রাখতে বললেন, ‘মিস্টার রঞ্জন, আপনি চাইলে এই উইলটিকে চ্যালেঞ্জ করতেই পারেন। কিন্তু তার প্রয়োজন আছে কি? আপনি বোধহয় উইলের চার নম্বর ক্লসটি মন দিয়ে শোনেননি। এখানে উনি পরিষ্কার বলেছেন, যদি আইনি মতে ওনার দেওয়া শর্তের কোনো গ্রহণযোগ্যতা না থাকে, সেক্ষেত্রে ওনার সন্তানদের প্রতি ওনার ইচ্ছে শুধুই নৈতিক নির্দেশ হিসেবে বিবেচিত হবে। কিন্তু তাদের উত্তরাধিকার বাতিল হবে না।

‘আর তার থেকেও বড় কথা-কার সঙ্গে বিয়ে হবে, সেটা উনি অফিসিয়ালি ডিক্লেয়ার করেননি। সুতরাং শর্ত রক্ষার প্রশ্নই উঠছে না। আপনাদের সন্তানেরা আঠেরো বছর বয়স হলে নির্দ্বিধায় এই সম্পত্তি ক্লেম করতে পারে।’

মিস্টার রঞ্জন উত্তরে খানিকক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘আয়াম স্টিল ভেরি কনফিউজড। তোর্সা কি জানত যে তার এই ইচ্ছের আইনে কোনো একটা জায়গা নেই?’

‘প্রথমে জানতেন না,’ তন্ময়বাবু বললেন, ‘পরে উইলে নিজের শর্ত রাখার সময়ে গোটা ব্যাপারটা আমি নিজে ওনাকে বলি। উনি সব শুনে কয়েকদিন সময় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেন ৪র্থ ক্লসটি উইলে প্রবেশ করাবার।’

মিস্টার রঞ্জন সব শুনে একটা বাঁকা হাসি হেসে বললেন, ‘সব জেনেও এমন উইল? এ তোর্সার পক্ষেই সম্ভব। আ লুনেটিক বাটারফ্লাইস লাস্ট ফ্ল্যাপ।’

মিস্টার চ্যাটার্জি বেরিয়ে গেলেন। আমরাও ভাবছিলাম বেরোব, কিন্তু বিক্রম বলল, ও নাকি অজয়বাবুর সঙ্গে কথা বলবে। ব্যাপারটা ওনাকে জানাতে উনি আমাদের তিনজনকে দোতলায় নিজের স্টাডিতে আসতে বললেন। আমরা গিয়ে বসতেই উনি বেশ বিদ্রুপের স্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘তারপর ডিটেকটিভ, জানতে পারলেন তোর্সার খুনি কে?’

বিক্রম ঠান্ডা গলায় বলল, ‘সব বলব। তার আগে একবার কাবেরী ম্যাডামকে এখানে ডাকবেন? উনি থাকলে বেশ সুবিধা হয়।’

অজয় রঞ্জন মুখ গম্ভীর করে জিগ্যেস করলেন, ‘কেন? ওনাকে কীসের দরকার?’

‘সেটা উনি আসলেই বলব।’ বিক্রম একইরকম শান্তস্বরে জানাল।

অজয়বাবু একটা ফোন করতে ভদ্রমহিলা কিছুক্ষণের মধ্যেই ওপরে উঠে এলেন। বিক্রম শুরু করল, ‘মিস্টার রঞ্জন আর মিসেস বাসু আপনাদের সঙ্গে যখন প্রথমদিন কথা হয়, আপনারা দুজনেই কিন্তু অনেক ঘটনা আমাদের থেকে চেপে যান। যেটা আপনারা ঠিক করেননি।’

‘মানে, কী চেপে গেছি আমরা?’ অজয়বাবু জিগ্যেস করলেন।

‘২০১২ সালে বেশ কিছু বিদেশি পাবলিশার কপিরাইট স্ট্রাইক করায় আপনার স্ত্রীর প্রায় ষোলোটি বই বাজার থেকে তুলে নেওয়া হয়। এটা একটা অত্যন্ত জরুরি তথ্য, যা আপনারা দুজনেই পুলিশকে জানাননি।’

কথাটা শুনে অজয়বাবু আর কাবেরী দুজনেই একে ওপরের দিকে তাকাল। তারপর অজয়বাবু বললেন, ‘ব্যাপারটাকে চেপে রাখার একমাত্র কারণ ছিল আমাদের রেপুটেশন। আমায় প্রায় দেড় কোটি টাকা কম্পেন্সেট করতে হয়েছিল টু দোস গ্রিডি বাস্টার্ডস। এইজন্য সেদিন কিছু বলিনি।’ তারপর কাবেরীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘চাকরির কারণে উনিও বাধ্য হন, ওনার কোনো দোষ নেই।’

‘মিস্টার রঞ্জন, আপনার স্ত্রী বাংলায় বই লিখতেন। আর যে বইগুলো থেকে উনি লিখেছিলেন, সেগুলো অত্যন্ত দুষ্প্রাপ্য। কারণ ওর মধ্যে একটা বইও কোনোদিন ভারতে প্রকাশিত হয়নি। আর ভারত থেকে ওনার লেখা বই কোনোদিন তর্জমা করে বিদেশে পাঠানো হয়নি। তাহলে প্রশ্ন, বিদেশি প্রকাশকেরা এই ব্যাপারটা জানল কী করে? আপনি এই বিষয় আলোকপাত করতে পারেন?’

‘না, আপনারা জানেন কে এই কাজ করেছিল?’ অজয়বাবু অধীর হয়ে জিগ্যেস করলেন।

‘এই কাজের পেছনে তিনজনের হাত ছিল। তোর্সার ভাষা-শিক্ষক অমরেন্দ্রনাথ দত্ত, আপনার শ্যালিকা তিস্তা এবং আপনার স্ত্রীর সেক্রেটারি কাবেরী বাসু।’

‘হোয়াট? হাউ?’ অজয়বাবু প্রশ্নটা করতে গিয়ে নিজের চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন, তারপর একটা তীব্র রোষদৃষ্টি হানলেন কাবেরী বাসুর দিকে। কাবেরীকে দেখলাম থম মেরে বসে আছেন, শুধু ওনার দু’চোখ জলে ভরে উঠেছে। বিক্রম গোটা ঘটনাটা অজয়বাবুকে শোনাল। তারপর কাবেরীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘২০১০ সালে তোর্সার নামে ছেপে বেরোনো অকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত বই “ময়না মাঝি” আসলে আপনারই লেখা, তাই না?’ কাবেরী অবাক হয়ে বিক্রমের দিকে তাকাল, তারপর ধীরে ধীরে তিনবার ওপরে নীচে মাথা নাড়ল।

‘ভালো কথা কাবেরী ম্যাডাম, আপনি যত তাড়াতাড়ি পারেন, নিজের ডিভোর্সটা ফাইল করুন। পরে কিন্তু গন্ডগোল হয়ে যেতে পারে।’

‘মানে?’ কাবেরী অবাক হল।

‘গন্ধটা সেদিনকেও পেয়েছিলাম, আজকেও পাচ্ছি। আপনাদের দুজনের থেকেই। শ্যানেল নাম্বার ৫। অজয়বাবুর মতো সৌখিন মানুষ লেডিস পারফিউম মাখবেন না। আর আপনার ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্ট বলছে, আপনার পক্ষে শ্যানেল এফর্ট করা সম্ভব নয়।’ বিক্রম এবারে অজয়বাবুর দিকে ঘুরে গিয়ে জিগ্যেস করল, ‘তারপর মিস্টার রঞ্জন, এই নিষিদ্ধ প্রেমের বয়স কত? আর তোর্সাকে মারার আইডিয়াটা কার?’

অজয়বাবু বিক্রমের দিকে রক্তচক্ষু মেলে তাকালেন। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, ‘ইউ থিঙ্ক আই কিল তোর্সা? ইউ সোয়াইন। সত্যি জানতে চাস, তাহলে শোন আমি কাবেরীকে ভালোবাসি। তোর কী করার আছে করে নে, শালা দু’পয়সার টিকটিকি, অজয় রঞ্জনকে ফাঁসাবে? গেট দ্য ফাক আউট অফ হিয়ার।’

‘মিস্টার রঞ্জন, আমার এখনও অনেক কিছু জানার আছে। সেগুলো না জেনে আজ এখান থেকে বেরোব না।’ বিক্রম শান্ত কঠিন স্বরে বলল।

অজয়বাবু চিৎকার করে বললেন, ‘আমি কাউকে আর কিছু বলতে বাধ্য নই। এবার যা বলার নিজের উকিলের সামনে বলব।’

বিক্রম এবারে ব্রহ্মাস্ত্র ছাড়ল, ‘মিস্টার রঞ্জন, আপনি তো জানেন, যাকে আপনি ভালোবাসেন তিনি একজন বিবাহিত মহিলা! ওনার স্বামী যদি জানতে পেরে আপনার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়, আপনার মিনিমাম পাঁচ বছর হাজতবাস কেউ আটকাতে পারবে না। এছাড়া গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো আপনি আবার পুলিশের প্রধান সন্দেহভাজন। কথায় বলে, বাঘে ছুঁলে আঠেরো ঘা আর পুলিশে ছুঁলে না জানি কত? জেদাজেদি বন্ধ করে কো-অপারেট করুন। আখেরে আপনারই সুবিধা।’

উত্তরে অজয়বাবু বাঁ হাতে নিজের চশমাটা খুলে, ডান হাতে মাথার রগ ধরে খানিকক্ষণ বসে রইলেন। তারপর আস্তে আস্তে বললেন, ‘বলুন কী জানতে চান?’

‘আপনার স্ত্রী’কে কতদিন আগে আপনি প্রথমবার ডাঃ মিত্রের কাছে নিয়ে যান?’

‘তিন বছর আগে।’

‘আর ওনার বইগুলো মার্কেট থেকে উঠে যায় প্রায় ওই সময়ই, তাই তো?’

অজয়বাবু মাথা নাড়লেন।

‘তাহলে আমায় একটা জিনিস বলুন তো, আপনার স্ত্রীর এত ভয় কী নিয়ে বা কাকে নিয়ে ছিল?’ বিক্রম এবার অজয়বাবুর সামনের চেয়ারটায় গিয়ে বসল।

‘দেখুন, এই ব্যাপারটা আমায় ডাঃ মিত্র এবং ডাঃ ব্যানার্জি দুজনেই বলেছেন। কিন্তু তোর্সা আমার সঙ্গে এ বিষয়ে কোনোদিন কোনো কথা বলেনি। আর তাছাড়া সে সময় উই ওয়্যার নট ইন টকিং টার্মস।’

‘এক ছাদের তলায় এতগুলো বছর কাটানোর পরেও আপনি আপনার স্ত্রীর সম্বন্ধে বিশেষ কিছুই জানেন না। এটা কি বিশ্বাসযোগ্য?’ এতক্ষণে মুখ খুলল প্রদীপ্ত।

‘জানি বিশ্বাসযোগ্য নয়, তবে রাজনীতি ছাড়ার পর তোর্সা পুরোপুরি ঘরকুনো হয়ে যায়। তার আগে ছিল দাপট। সে সময় কী করেছে… কী কারণে তার এই ভয়-সেটা আমার পক্ষে জানা অসম্ভব। আপনারা বরং প্রণবেশ পালের সঙ্গে দেখা করুন।’

‘প্রণবেশ পাল মানে গণ অভ্যুত্থান পার্টির নেতা?’ প্রদীপ্ত জিগ্যেস করল।

‘কারেক্ট, তোর্সার শেষ ওয়েল উইশার। তবে এই মুহূর্তে কী করছেন? কোথায় আছেন? সেসব আমি জানি না। আমার সঙ্গে শেষবার কথা হয়েছিল, তাও প্রায় বছর দশ-বারো আগে। দ্যাট টু থ্রু তোর্সা।’

বিক্রম সব শুনে প্রদীপ্তর দিকে ঘুরে বলল, ‘আরেকবার প্লেস অফ অকারেন্সটা দেখব।’ আমরা সবাই তোর্সার স্টাডিতে এলাম। বিক্রম হঠাৎ এগিয়ে গিয়ে ঘরের জানালাগুলো খুলে দিল। তারপর মোবাইলের আলো জ্বেলে কিছু একটা দেখে, জানালাগুলো ফের বন্ধ করে দিল। আমি আর প্রদীপ্ত জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকালাম। বিক্রম আমাদের দিকে না তাকিয়ে অজয়বাবুর দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করল, ‘মিস্টার রঞ্জন, আপনিই তো আপনার স্ত্রীর মৃতদেহ প্রথম দেখেন! ভালোভাবে মনে করুন, সে সময় কি এই ঘরের জানালা বন্ধ ছিল?’

অজয়বাবু কিছুক্ষণ কী যেন ভাবলেন, তারপর বললেন, ‘আসলে ওই সময় আমি এমন শকে চলে গিয়েছিলাম। এই ব্যাপারটা ঠিক খেয়াল…’ ভদ্রলোক কথা শেষ না করেই চুপ করলেন। তারপর বিক্রমের দিকে চেয়ে বললেন, ‘মিস্টার চক্রবর্তী, একটা কথা হঠাৎ মনে পড়ল। ঘরে দাঁড়িয়ে সেদিন আমার খুব শীত করছিল, কারণ এসি ফুল ফ্লেজেডে চলছিল। তোর্সা খুব একটা এসিতে থাকতে পারত না। ও খুব শীতকাতুরে ছিল। সেই সঙ্গে ক্লস্ট্রোফোবিয়ার সমস্যা।’

বিক্রম কথাটা শুনে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে কী যেন ভাবল। তারপর বলল, ‘খুনি এই জানালা দিয়েই বাইরে থেকে ঘরে প্রবেশ করেছে। ফ্রেঞ্চ উইন্ডো হওয়ায় এ জানালায় কোনো গ্রিল ছিল না। তোর্সা ক্লস্ট্রোফোবিয়ার পেশেন্ট ছিলেন, তাই তিনি জানালা খুলেই রেখেছিলেন। খুনি সেটা জানত কি না বলা মুশকিল, তবে সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছে। আর এই জানালা দিয়ে ঢোকার জন্য বাইরের নুইয়ে পড়া কৃষ্ণচূড়া গাছটা তাকে সাহায্য করেছে। সুতরাং আততায়ীর অ্যাক্রোব্যাটিক স্কিল খুব হাই।’

কথাগুলো বলে ও আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘চলো বেরোই, এখানের কাজ আপাতত শেষ।’ 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *