আদেশের আদ্যাক্ষর
আজ মে মাসের সতেরো তারিখ, শনিবার। মাঝখানে কেটে গেছে প্রায় সাত বছর। দেশের শীর্ষ আদালত দ্য স্টেট ভার্সেস শেখর সেন মামলার রায় দিয়েছে। জাস্টিস অরুণাভ সেনগুপ্তর ডিভিশন বেঞ্চ নরঘাতক শেখর সেনকে ভারতীয় দণ্ডবিধির ধারা ৩০২-হত্যা, ধারা ১২০বি- অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, ধারা ২১৮-পুলিশ অফিসার হিসেবে মিথ্যা রিপোর্ট তৈরি করা ও তথ্য গোপন করা, ধারা ২০১-প্রমাণ লোপাট ও প্রকৃত অপরাধীকে আড়াল করা, ধারা ২১১-নিরপরাধ কাউকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ফাঁসানো, ধারা ১৯৩-আদালতে মিথ্যে বলা এবং অন্যকে প্ররোচিত করা এবং ধারা ১৩(১) (ডি) ও ধারা ১৩(২)-ঘুষ গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, বা নিজের পদ ব্যবহার করে অবৈধ কার্যকলাপ করা-এই সমস্ত দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেছেন। বিচারে তাকে আমৃত্যু কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে।
ভারতবর্ষের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অপরাধীর তকমা পেয়েছেন শেখর সেন। কেড়ে নেওয়া হয়েছে তার সমস্ত সম্মান, পদক ও পুরস্কার। সম্মান ফিরে পেয়েছেন অনিকেত চ্যাটার্জি। ন্যায়বিচার পেয়েছে নিগৃহীত হওয়া সেদিনের আট আর আজকের আটত্রিশ বছরের পিঙ্কি মণ্ডল এবং তার পরিবার। মিথ্যে সাক্ষ্য দেওয়ার দায়ে হারান মণ্ডল, ছোটন মাঝি এবং তৌফিক আহমেদের সাত বছরের কারাদণ্ডের সাজা হয়েছে। সাত বছরের এই আইনি লড়াই অবশেষে জয়ের মুখ দেখেছে। যেদিন এই ঘটনা প্রথমবার জনসমক্ষে আসে, তীব্র জনরোষে ফেটে পড়ে কলকাতাসহ সারা বাংলা এবং সারা দেশ। অনেকবার ডাকা সত্ত্বেও আমি আইনি জটিলতার কারণে কোনোদিন জনসমক্ষে আসতে পারিনি। প্রায় তিনটে রাজনৈতিক দলে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব এসেছে এবং প্রত্যেকবার তা ফিরিয়ে দিয়েছি। আজ অবশেষে এই দীর্ঘ লড়াইয়ের পর আমি গ্লানিমুক্ত।
আজ আমাদের স্কুল ছুটি। সন্ধেবেলা প্রদীপ্ত একটা দামি হুইস্কির বোতল নিয়ে হাজির হয়েছে। দু’চার পাত্র পেটে পড়তেই আমরা দুজনেই খুব ভাবুক হয়ে পড়লাম। এক সময় বিক্রমের সেই চিঠি যা এক কপি আমি জেরক্স করে রেখেছিলাম, সেটা খুলে বসলাম।
প্রদীপ্ত বলল, ‘আবার পড়ো, শুনব।’ আমি আবার পুরো চিঠিটা পড়লাম। এই প্রথমবার একটা জায়গায় এসে একটু খটকা লাগল। চিঠিতে বিক্রম দু’বার উল্লেখ করেছে যে, এই কাজ তাকেই করতে হতো। এটা নাকি নিয়তির আদেশ। নিয়তির আদেশ কেন? আর সব থেকে উল্লেখ্য শেষের কয়েকটা লাইন-
শেক্সপিয়ার বলেছেন নামে কী যায়ে আসে? আমি বলি নামেই সব যায় আসে বিশেষ করে আদ্যাক্ষরে। এই কাজ নিয়তি আমায় আদ্যাক্ষরে আদেশ দিয়েছে।
কীসের আদ্যাক্ষর? কার নামের কথা বলেছে? চিঠিটা বেশ কয়েকবার পড়েও কিছু উদ্ধার করা গেল না। মদের ঘোরে একসময় দুজনের জেদ চেপে গেল। কিন্তু এমন কাজ শুধু জেদে হয় না। মাথা ঠান্ডা করে ভাবতে হয়।
একসময় প্রদীপ্ত বলল, ‘ছাড়ো, ও আমরা উদ্ধার করতে পারব না।’
এই সময় আমার একটা অদ্ভুত কথা মনে হল। নাম মানে কি খুন হওয়া ছ’জন? তাদের নামের আদ্যাক্ষর? একটা খাতা পেন নিয়ে সবকটা নাম আর নামের আদ্যাক্ষর পর পর লিখলাম।
১) Torsha Deb Ranjan – T D R
২) Akash Mitra – A M
৩) Nicolas James Rogers – N J R
৪) Hashim Reraji – H T
৫) Sajid Jamal – S J
৬) Dilip Laha Mondal – D L M
সব মিলিয়ে এই T D R A M N J R H T S J D L M -এর থেকে আমি বা প্রদীপ্ত কেউই কিছু উদ্ধার করতে পারলাম না। এটা যদি কোনো সাইফার হয়ে থাকে, তাহলে ডিসাইফারের উপায় বিক্রম আমাদের দিয়ে যায়নি। আমি খাতাটা সবে বন্ধ করে আরেকবার গ্লাস হাতে নিয়েছি। হঠাৎ প্রদীপ্ত বলল, ‘সাহিত্যের লোক হয়ে হেঁয়ালির সমাধান করতে পারছ না?’
কথাটা নেহাত ইয়ের মতো হল। আমি একটু গম্ভীরভাবে বললাম, ‘হেঁয়ালি আর সাহিত্য এক নয়।’ কথাটা বলেই কী মনে হওয়ায় আবার খাতাটা খুললাম। এবারে সবকটা নাম বাংলায় লিখলাম। আর পাশে দিলাম তাদের বাংলা আদ্যাক্ষর।
১) তোর্সা দেব রঞ্জন – তো দে র
২) আকাশ মিত্র – আ মি
৩) নিকোলাস জেমস রজার্স – নি জে র
৪) হাশিম তেরাজি – হা তে
৫) সাজিদ জামাল – সা জা
৬) দিলীপ লাহা মণ্ডল – দি লা ম
একত্রে দাঁড়াল-তোদের আমি নিজের হাতে সাজা দিলাম। আমার হাত থেকে হুইস্কির গ্লাসটা নীচে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। মনে হল যেন উদাত্ত কণ্ঠে বাবার গীতাপাঠ শুনতে পাচ্ছি। বাবা বলছেন,
‘কালোহস্মি লোকক্ষয়কৃৎ প্রবৃদ্ধো
লোকান্ সমাহর্তুমিহ প্রবৃত্তঃ।
ঋতেহপি ত্বাং ন ভবিষ্যন্তি সর্বে
যেহবস্থিতাঃ প্রত্যনীকেষু যোধাঃ।।
তস্মাত্ত্বমুত্তিষ্ঠ যশো লভস্ব
জিত্বা শত্রুন ভুক্ষ্ণ রাজ্যং সমৃদ্ধম্।
মযৈবৈতে নিহতাঃ পূর্বমেব
নিমিত্তমাত্রং ভব সব্যসাচিন্।।’
অর্থাৎ আমি লোকক্ষয়কারী প্রবৃদ্ধ কাল এবং এই সমস্ত লোক সংহার করতে এক্ষণে প্রবৃত্ত হয়েছি। তোমরা (পাণ্ডবেরা) ছাড়া উভয়পক্ষীয় সমস্ত যোদ্ধারাই নিহত হবে। অতএব, তুমি যুদ্ধ করার জন্য উত্থিত হও, যশ লাভ করো এবং শত্রুদের পরাজিত করে সমৃদ্ধিশালী রাজ্য ভোগ করো। আমার দ্বারা এরা পূর্বেই নিহত হয়েছে। হে সব্যসাচী! তুমি নিমিত্ত মাত্র।
চিঠির শেষে আমায় মহাভারত পড়তে থাকার অনুরোধ এতদিনে স্পষ্ট হল। এখন আমার শোওয়ার ঘরে ওর একটা ছবি ঝোলানো আছে। এটা আমি ওর বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছি। আমি নতুন একটা গ্লাসে হুইস্কি ভরে সেই গ্লাস বিক্রমের ছবির দিকে তুলে বললাম, ‘বন্ধু, তুমি সেরা ছিলে, সেরা আছ, সেরাই থাকবে।
