সন্ধিক্ষণের প্রাক্কালে – প্রমিত গুপ্ত

সন্ধিক্ষণের প্রাক্কালে

সন্ধেবেলা ঘুম ভাঙতে বেশ দেরি হল। খানিকক্ষণ চোখ খুলে এপাশ-ওপাশ করে তারপর উঠে বাইরে এসে দেখি, বিক্রম সোফায় বসে আছে। আমায় দেখেই বলল, ‘কী রে, শরীর খারাপ নাকি তোর?’

‘দুপুরবেলা জ্বর এসেছিল। ওষুধ খেয়েছি। এখন একদম ফিট।’ আমি বললাম।

‘কফি খাবি এক কাপ?’ বিক্রম জিগ্যেস করল।

আমি বললাম, ‘তুই খেলে খেতে পারি।’

‘ভালো কথা, বাড়িতে কিছু অতিথি আসছে।’ বিক্রমের গলায় সঙ্কোচ প্রকাশ পেল।

আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম, ‘কে আসছে?’

‘ডিসিডিডি শেখর সেন।’ এই প্রথম আমার কোনো প্রতিক্রিয়া হল না। আমি সহজভাবে বললাম, ‘কী করতে?’

‘জানি না। আসলে জানতে পারব। তুই কি থাকবি?’ বিক্রম দ্বিধা নিয়ে প্রশ্ন করল।

আমি বললাম, ‘থাকব, তা তিনি আসছেন কখন?’

‘বলল, সাড়ে সাতটার মধ্যে আসবে। এখন সাতটা দশ।’

‘হাতে মিনিট কুড়ি সময় আছে। আমি একটু ফ্রেশ হয়ে নিই।’

বসার ঘরের ঘড়িতে কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে সাতটায় ডোরবেল বাজল। ঘরে ঢুকলেন শেখর সেন। সঙ্গে প্রদীপ্ত। প্রথমেই বসলেন না, এদিক-ওদিক ঘুরে দেখলেন। তারপর বললেন, ‘শেষবার যা দেখে গিয়েছিলাম,সে তুলনায় খুব একটা বদলায়নি। একইরকমই আছে।’

বিক্রম বেশ বিনয় করে দুজনকেই বসতে অনুরোধ করল। চা আর ফিশ-ফ্রাই সহযোগে একটু খোশ গল্পের পর কাজের কথা শুরু হল।

শেখর সেন চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে প্রশ্ন করল, ‘রনি, কেসের আপডেট কী? কিছু এগোল, নাকি এখনও সে তিমিরেই?’

বিক্রম একটু সময় নিয়ে তারপর বলল, ‘শেখরকাকু, আমি কিলারের একটা প্রোফাইল তৈরি করেছি। লোকটার বয়স চল্লিশের কোঠায়। জিমনাস্টিক এবং মার্শাল আর্টে রীতিমতো পারদর্শী। এবং সম্ভবত সে একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। এই কাজের প্ল্যানিং সে বহুদিন ধরে করছে। লোকটা রোগা, ছিপছিপে, পেটাই চেহারা সম্পন্ন। হাইট খুব বেশি হলে পাঁচ-নয় থেকে পাঁচ-দশ।’

‘ভেরি গুড রনি। খুব ভালো একটা প্রোফাইল তৈরি করেছিস। কিন্তু এই হিসেবে তো আমার তোকে সন্দেহ করা উচিত। যদিও তোর বয়স চল্লিশ হয়নি। কিন্তু হাইট আর চেহারা তো সবই মেলে। আপাতত তাপ্পি দেওয়ার জন্য তোকে অ্যারেস্ট করি, তারপর মিডিয়াতে বলা হবে-পুলিশ একজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করেছে। কি বলিস?’

এই কথার কোনো উত্তর হয় না। বিক্রম খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘শেখরকাকু, অল রোডস লিডস টু অ্যান ইন্সিডেন্ট, যেটা আজ থেকে প্রায় তিরিশ বছর আগে ঘটে। কোনো একজন মহিলা, নাম অনন্যা, তোর্সা দেব রঞ্জনের বেস্ট ফ্রেন্ড আর নিকোলাস রজার্সের স্ত্রী। ১৯৮৬ সালে এনাকে রেপ করে হত্যা করা হয়। এই জঘন্য কাজটা যে বা যারা করেছিল, তাদের কোনোদিন ধরা যায়নি। শোনা যায়, ওনার হাজবেন্ড মিস্টার রজার্স একসময় খুব নাকি চেষ্টা চালিয়ে ছিলেন, কিন্তু লাভ হয়নি।

‘মহিলার এক পুলিশ অফিসার দাদা ছিলেন। আমার মন বলছে, এনাকে খুঁজে পেলেই এই কেস সলভ হবে। বাট দ্যাট ম্যান ইজ ট্রেসলেস। আমি বাসন্তীদেবী কলেজে গিয়েছিলাম। রেকর্ড বলছে, ভদ্রমহিলার পুরো নাম অনন্যা ম্যারি রজার্স। ইনি বিয়ের পর ধর্ম পরিবর্তন করেন। ইন ফ্যাক্ট ওনার কলেজের সার্টিফিকেটেও বিয়ের পরের নাম লেখা।

‘তবে ওনার বাড়ির যে ঠিকানা আছে, সেখানে একটা বিশাল হাইরাইজ বিল্ডিং দাঁড়িয়ে আছে আজ প্রায় বিশ বছরের ওপর। বাবার নাম এ. কে. সেন। সেই হিসেবে ধরে নেওয়া যায়, ওনার আগের নাম অনন্যা সেন। তবে কলেজের রেকর্ডে এছাড়া আর কোনো আত্মীয়ের নাম উল্লেখ নেই। এখন প্রশ্ন, কে এই এ. কে. সেন? কী তাঁর পুরো নাম? কিছুই জানা যায়নি। এখন একটাই রাস্তা, যদি পুলিশের আর্কাইভে কিছু মেলে। প্রদীপ্ত, তুমি কী বলো?’

শেষ প্রশ্নটা বিক্রম প্রদীপ্তকে জিগ্যেস করল। সে খানিকক্ষণ মাথা নিচু করে থেকে বলল, ‘আমি লালবাজার থেকে যাদবপুর সব জায়গায় পুলিশের আর্কাইভ চেক করেছি। কিচ্ছু পাইনি। না অনলাইনে না অফলাইনে। কেউ খুব সতর্কভাবে সবকিছু মিটিয়ে দিয়েছে।’

বিক্রম সম্ভবত একটা লিড আশা করছিল, প্রদীপ্তর কথায় সে ধপ করে সোফার ওপর পিঠ ফেলে দিল। খানিকক্ষণ সকলেই চুপ। তারপর শেখর সেন মুখ খুললেন, ‘আমার মনে হয় তোমাদের একটু অন্যভাবে ভাবা উচিত।’

‘কীভাবে?’ বিক্রম প্রশ্ন করল।

প্রত্যেক ভিক্টিমের সামনে যে গান চলছিল, সে ব্যাপারে তোমরা কী মনে করো?’

‘গানগুলোর মধ্যে বিশেষ কোনো সামঞ্জস্য নেই। সেগুলো কিছুক্ষেত্রে খুনের পদ্ধতি আর বাকি শিকারের নামের সঙ্গে মিলিয়ে ব্যবহার হয়েছে। আমি সবকটা গানের ইতিহাস অবধি তলিয়ে দেখেছি, সিগনিফিক্যান্ট কিছু পাইনি।’ বিক্রম বলল।

‘তাহলে গান চালিয়ে রাখার অর্থ কী?’

এবার প্রদীপ্ত উত্তর দিল, ‘হয় বিভ্রান্ত করা, নয় খুনির গান খুব পছন্দ। অবশ্য সংবাদমাধ্যম এখন তাদের আদরের মিউজিক কিলারকে স্টোনম্যানের সঙ্গে জুড়তে চাইছে।’

উত্তরে শেখ সেন বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘রাবিশ, মিডিয়ার কোনো খেয়েদেয়ে কাজ নেই, তাই এই খুনের সঙ্গে স্টোনম্যানের তুলনা শুরু করেছে। এরপরে গলা টিপে মারা হলে বলবে বস্টন স্ট্র্যাংলার। এনিওয়ে, আমার সঙ্গে সত্যসিন্ধুস্যারের কথা হয়েছে আজ সকালে এবং উনি আমাদের সাত দিন টাইম দিয়েছেন। তার মধ্যে যদি আমরা ক্র্যাক করতে পারি ভালো। না হলে এই কেস সিবিআইকে সঁপে দেওয়া হবে।

‘অপজিশনের চাপ তো ছিলই, এখন কেন্দ্র থেকেও চাপ দেওয়া হচ্ছে। না চাইলেও আমাকে এই ব্যাপারে মত দিতে হয়েছে। স্টোনম্যানের মতো দু’একটা কেস ছাড়া কলকাতা পুলিশের রেপুটেশনে কখনও বিশেষ দাগ লাগেনি। অবশ্য সিবিআই ইনভলভ হলেও লালবাজার এই কেসের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। তবে সেখানে তোকে আমি আর রাখতে পারব না রনি। সুতরাং ইউ আর হেডিং ইনটু আ ওয়াটারশেড উইক, সো ইউ উইল হ্যাভ টু আউটডু ইয়োরসেলফ।’

‘কিন্তু স্যার এযাবৎ পাওয়া সমস্ত লিড ঠান্ডা হয়ে গেছে। এই অবস্থায় তো কারও কিছু করার নেই। আপনি প্লিজ একটু দেখুন…’

প্রদীপ্তর কথাগুলো প্রায় অসহায় আর্তের মতো শোনাল।

‘দেখার দিন শেষ প্রদীপ্ত। এই মুহূর্তে আমার আর কিছু করার নেই।’ কঠিন স্বরে বললেন শেখর সেন। তারপর নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এই যা, কাজের কথা বলতে গিয়ে সময়ের কথা প্রায় ভুলেই যাচ্ছিলাম। সাড়ে আটটা বাজে, উঠতে হবে।’

বিক্রম অনুরোধ করল, যাতে রাতের খাবার খেয়ে যান, কিন্তু উনি নাকচ করে দিলেন। প্রদীপ্ত বলল, সে-ও নাকি আর বসবে না। দুজনেউঠে দাঁড়াতেই বিক্রম হঠাৎ বলে উঠল, ‘শেখরকাকু, নিজের রেপুটেশন বাজি রেখে তুমি আমায় এই জটিল কেসে যোগ করেছ। আমি কথা দিলাম, আগামী চার দিনের মধ্যে এই মামলার সমাধান হবে। আর ভবিষ্যতে ক্রাইমের ইতিহাসে এই কেস স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।’

‘আর সেটা কী ভাবে?’ শেখর সেন জানতে চাইলেন।

‘সেটা আমার ওপরে ছেড়ে দাও, ইফ ইট ইজ আ ওয়াটারশেড উইক, আয়াম গোয়িং টু কার্ড ইটস কোর্স।’ বিক্রমের স্বরে একটা চাপা গর্জন শোনা গেল।

সকলে বেরিয়ে যাওয়ার পর বিক্রম অনেকক্ষণ ধরে গুম মেরে বসে রইল। রাতে খেতে বসে আমি একবার জিগ্যেস করলাম ‘এই যে বললি চারদিনের মধ্যে কেস সলভ করবি, কীভাবে করবি?’

‘জানি না।’

ছোট্ট উত্তর। আমিও আর ঘাঁটালাম না।

এত কিছুর মধ্যেও কেন জানি না, আমি ওর ঘরের সামনে পাওয়া ওই সার্জিকাল স আর ওই পাথরের কথা বলতে পারলাম না। আমার গাট ফিলিং বারবার জানান দিল, এটা আপাতত চেপে রাখাই ভালো।

আগামী দু’দিন বিক্রমের সঙ্গে কথা তো দূর, ঠিক করে দেখা পর্যন্ত হল না। অবশ্য গতকাল পড়িয়ে ফিরে দেখি, ও সোফায় হেলে বসে আছে।

আমি হেসে বললাম, ‘কী রে? কেসের খবর কী?’

আমার দিকে শাণিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বিক্রম বলল, ‘নিজের চরকায় তেল দে বোধি। এই কেস এবার শুধু আমি বুঝব। তোর আর প্রয়োজন নেই।’

ওর এই রূঢ়ভাবে বলা কথাগুলো শুনতে আমার মোটেই ভালো লাগেনি। আমি আর কথা বাড়াইনি।

আজ সোমবার, তার ওপর শিবরাত্রি। বিবেকানন্দ রোডের যে গলিতে আমাদের বাড়ি, সেখানে ঢোকার মুখে বটগাছতলায় একটা শিবমন্দির আছে। আমি পড়াতে যাওয়ার সময় প্রতিদিন এখানে মাথা ঠেকিয়ে যাই। লোকে বলে, ঠাকুর এখানে খুব জাগ্রত। সন্ধেবেলা যাওয়ার সময় দেখলাম মহিলা-পুরুষ মিলিয়ে বিরাট একটা লাইন। আমি অবশ্য জল ঢালব না, শুধু একটু মাথা ঠেকাব। কিন্তু উপায় নেই, ঠাকুরমশাই বললেন, ‘সবাই প্রথম প্রহরেই জল ঢালবে। একটু রাতে এসো, খালি পাবে।’

ফিরতি পথে দেখলাম ঠাকুরমশাইয়ের কথাই ঠিক, যে ভিড় দেখেছিলাম তার সিকিভাগও নেই এখন। মোড়ের মাথার ফুলের দোকান থেকে কিছু ফুল নিয়ে এসেছিলাম। সেসব ঠাকুরমশাইয়ের হাতে দিয়ে মাথা ঠেকাতে গিয়েই হঠাৎ একটা জিনিস নজরে পড়ল। গাছতলায় এই ছোট্ট মন্দিরের পাশ দিয়ে দশটা বড় পাথর সাজিয়ে রাখা থাকত। জায়গার অভাবে ওগুলোকে সরানোর কথা চলছিল। আজ এখানে সাতটা পাথর রয়েছে। এর আগে দুটো খোয়া গিয়েছিল। তার একটা চিনার পার্কে, অন্যটা কেষ্টপুরে পাওয়া গেছে। তৃতীয়টার সন্ধান এখনও জানি না।

আশেপাশে দেখলাম সবাই নিজের কাজে ব্যস্ত। ঠাকুরমশাইকে জিগ্যেস করতে উনি হেসে বললেন, ‘সে কী! তোমার বন্ধুই তো নিয়ে গেছে। গতকাল সন্ধ্যায় এসেছিল নিতে। আমি বললাম, কী রে কার মাথায় ভাঙবি? উত্তরে বলল, নিজের মাথায়। ভাবো একবার।’ বলে ঠাকুরমশাই খানিকক্ষণ হাসলেন।

আমি কোনোমতে বাড়ির দিকে রওনা হলাম। ঠিক ঢোকবার মুখে দেখলাম, বিক্রম বেরোচ্ছে। ক্ষণিকের দৃষ্টি-বিনিময় হলেও কেউ. কোনো কথা বললাম না। 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *