যবনিকার উত্থান-পতন
ঘরে এসে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলাম। নিজেকে ঘূর্ণিঝড়ে পথ হারানো নাবিকের মতো লাগছিল। শেষ পর্যন্ত বিক্রম! কিন্তু কেন? না না, কোথাও একটা বিরাট ভুল হচ্ছে আমার।
‘দাদাভাই…’ চমকে তাকিয়ে দেখলাম নগেনদা, ‘খেয়ে নেবে চলো, রাত হল তো।’
‘হ্যাঁ যাই,’
বলে কী মনে হওয়ায় জিগ্যেস করলাম, ‘নগেনদা,বিক্রম খাবে না?’
‘সে তো খেয়েদেয়ে বেরোল। বলল, কী কাজ আছে। আচ্ছা এত রাতে কী কাজ করে বলো দেখি? কীসের মধ্যে হঠাৎ জড়াল কে জানে। মাঝে মাঝে চিন্তা হয়।’
‘কখন ফিরবে কিছু বলেছে?’
‘না, বলল রাত হবে আমি যেন শুয়ে পড়ি। চাবি নিয়ে বেরিয়েছে। আমি একবার বললাম, এত রাতে কই চললে? বলল, তোমার জেনে লাভ নাই। আমি আর কী বলি? তা তোমাকে কিছু বলেনি?’
আমি মাথা নেড়ে না বললাম। খেতে বসে খেয়াল করলাম, এই প্রথমবার বিক্রমের ঘরে তালা মারা নেই। হয় ভুলে গেছে, নয়তো অতি আত্মবিশ্বাসের ফল। মনে হল, কিছু একটা করা দরকার-এটাই সুযোগ। আমি যত দ্রুত সম্ভব খেয়ে নিলাম, তারপর শুরু হল অপেক্ষা।
নগেনদা নিজে খেয়ে থালা-বাসন মেজে শুয়ে পড়ল।
আমার নজর ঘড়িতে, এই মুহূর্তে রাত দশটা চুয়ান্ন। যা করার খুব তাড়াতাড়ি করতে হবে। বিক্রমের ঘরে আসবাব বলতে ওর একটা পুরোনো কাঠের আলমারি, একটা টেবিল আর খাট। এছাড়া ঘরের সঙ্গে লাগোয়া একটা বারান্দা আছে, যেটা পরে ঢেকে দেওয়া হয়েছে।
ঘড়িতে এগারোটা সাত, বসবার ঘরের পাশের ঘর থেকে এখন নাক ডাকার আওয়াজ আসছে। অর্থাৎ নগেনদা ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি পা টিপে টিপে গিয়ে প্রথমে বাইরের দরজাটায় ছিটকিনি তুলে দিলাম।
যদি বিক্রম আচমকা এসে পড়ে, তাহলে অন্তত পালিয়ে নিজের ঘরে যাওয়ার জন্য একটু সময় পাওয়া যাবে। আমি বিক্রমের ঘরে ঢুকে দরজাটা ভেজিয়ে দিলাম। কিন্তু ঘরের আলো জ্বালালাম না, ফোনের আলো জ্বালালাম।
চারিদিকে আলো ঘোরাতে দুটো তাৎপর্যপূর্ণ জিনিস চোখে পড়ল। এক, ওর ল্যাপটপটা খোলা আর দুই, ওই লাগোয়া বারান্দা ঘরটাও খোলা, যেটা সচরাচর তালা লাগানো থাকে। ঠিক করলাম, প্রথমে ওখানেই দেখব। ভেতরে প্রবেশ করে ফোনের আলো ফেলতেই চমকে উঠলাম। দেওয়াল জুড়ে মাকড়সার জালের মতো অজস্র কাগজ আর ছবি সাঁটা। বেশ কিছু জায়গায় খবরের কাগজের কাটা অংশ, আর প্রচুর তারিখ। ছবিগুলোর বেশিরভাগই আমার চেনা। পাঁচজন ভিক্টিম ছাড়াও এখানে প্রদীপ্ত, শেখর সেন, কাবেরী বাসু, অজয় রঞ্জন-এমনকী প্রণবেশ পালের ছবিও রয়েছে।
আমি দ্রুত যে ক’টা পারলাম, ছবি তুললাম। তারপর নিঃশব্দে ওর ঘরে এলাম। প্রথমেই কাঠের আলমারিটা খুললাম। বেশ কিছু শার্ট আর কয়েকটা ব্লেজার ঝুলছে। তার ঠিক তলায় একটা ড্রয়ার। টানতেই খুলে এল। ভেতরে কয়েকদিন আগের দেখা সেই সার্জিকাল স, বেশ কয়েকটা সিরিঞ্জ, হরেকরকম স্ক্যালপেলে ভরা একটা বাক্স আর একটা পাতলা প্লাস্টিকের টিউব, যা রক্ত বের করতে কাজে লাগে। সঙ্গে বেশ কয়েকগাছি মোটা কালো দড়ি। সাধারণ নয়, এই ধরনের দড়ি শরীরচর্চায় ও ক্লাইম্বিংয়ের কাজে ব্যবহৃত হয়। কয়েকটা ছবি তুলে ড্রয়ারটা বন্ধ করে দিলাম।
আলমারি বন্ধ করতে গিয়ে একটা ফাইল চোখে পড়ল, তাড়াতাড়ি খুললাম। এখানে বিক্রমের স্কুল, কলেজের সার্টিফিকেট ছাড়াও আরও দুটো সার্টিফিকেট দেখলাম, একটা কুংফু অন্যটা একটা বিএমএস ক্র্যাশ কোর্সের। ও যে কুংফু জানে, সেটা আমি এই প্রথম জানলাম। ছবি তুলে আলমারি বন্ধ করে এবারে এলাম ওর ল্যাপটপের সামনে। স্ক্রিনটা তুলে একটা ক্লিক করতেই ল্যাপটপ খুলে গেল। একটু ধোঁকা লাগল।
বিক্রমের মতো সাবধানী মানুষ ল্যাপটপে পাসওয়ার্ড দেয়নি?
হঠাৎ মনে হল, বিক্রমের ঘরে অনুপ্রবেশ ইস্তক সবকিছু কি একটু বেশি সহজলভ্য হয়ে যায়নি? যেসব জায়গায় নির্বোধেও সাবধানতা অবলম্বন করবে, সেগুলো এমন অসাবধানতায় ফেলে রাখা? আমি কি পাতা ফাঁদে পা দিলাম নাকি? আতঙ্কে বুক কেঁপে উঠল। ঘরের, চারিদিকে একবার মোবাইলের আলো ঘোরালাম। না, কেউ নেই। ভালো করে কান পাতলাম, বাইরের ঘরে পাখা চলার শব্দ, নগেনদার নাসিকাগর্জন, দূরে কয়েকটা কুকুরের ডাক আর গাড়ির আওয়াজ ছাড়া কিচ্ছু কানে এল না।
তাছাড়া বাইরের দরজাটা বন্ধ, ভেতরে প্রবেশের আর কোনো পথ নেই। আমি ল্যাপটপে মনোনিবেশ করলাম। ডেস্কটপে বিশেষ কিছু নেই, খালি একটা অদ্ভুত আইকন-একটা ছোট্ট মাকড়সার গায়ে একটা প্রমাণ সাইজের বেড়ালের চোখ, নীচে লেখা-ঘোস্টআই। বেশ কিছুক্ষণ সার্চ করতে, ভাগ্য সহায় হল ‘ই’ ড্রাইভে গিয়ে। এখানে একটা ফোল্ডার আছে, নাম ‘মাই টার্গেট্স’। খুলতেই ভেতরে দেখলাম, আরও কিছু সাবফোল্ডার। সবকটা শিকারের নামে নামকরণ করা আছে, সঙ্গে একটা করে তারিখ। প্রতিটা ফোল্ডারে অজস্র ছবি বিভিন্ন জায়গায় তোলা।
সবমিলিয়ে ছ’খানা সাবফোল্ডার আছে।
সবকটা নাম আমার চেনা, শুধু একটা বাদে। নাম দিলীপ লাহা মণ্ডল। আর তারিখটা আজকের। পিঠ দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। সামনের প্লাগ পয়েন্টে বিক্রমের ফোনের চার্জার ঝুলছে। আমি সেটা থেকে চার্জিং কেবলটা খুলে বিক্রমের ল্যাপটপের সঙ্গে নিজের ফোন কানেক্ট করলাম। তারপর মাই টার্গেট্স ফোল্ডারটা কপি করে নিজের ফোনে নিলাম। ৭৫৮.৬ এমবি সাইজ। প্রায় দশ মিনিট সময় লাগল। আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকরতম দশ মিনিট।
কাজ হলে আমি জায়গার জিনিস জায়গায় রেখে, বাইরের দরজাটার ছিটকিনি খুলে নিজের ঘরে ফিরে এলাম। পাখা চালিয়ে খাটে বসতেই বুঝতে পারলাম, ঘামে সারা শরীর ভিজে উঠেছে। বাথরুমে গিয়ে জামা খুলে ঘাড়ে, কানে, মুখে জল দিলাম। কিন্তু স্বস্তি পেলাম না, বুঝলাম এই অবস্থায় ঘুমাতে পারব না। ঘড়িতে এখন বারোটা সাত।
আমার ওষুধের পাউচটা খুলে একটা ঘুমের ওষুধ খেয়ে শুয়ে পড়লাম।
ওষুধ খেয়ে শরীরটা হালকা লাগছিল। ঘুম ঘুম লাগতেই হঠাৎ মনে হল, খাটের ওপর কেউ বসে আছে। আমি ইচ্ছে হলেও যেন তাকাতে পারলাম না। শরীরটা নড়ে চড়ে উঠে আমার কাছে এল। এ সময় খেয়াল করলাম, জানালা থেকে একটা অদ্ভুত বেগুনি আলো প্রবেশ করে ঘরটাকে একটা মায়াবী আভায় ভরিয়ে রেখেছে। আমি মাথা ঘুরিয়ে তাকালাম। সেই আলোয় হালকা হলেও দেখতে পেলাম পাশে বসে থাকা ব্যক্তিকে।
কিন্তু এ কী করে সম্ভব! মুখটা আমার কাছে নেমে এল। ঠোঁটের দু’পাশে কাটা দাগ, আর চোখের জায়গায় দুটো গর্ত। চিনতে অসুবিধা হল না, ডাক্তার আকাশ মিত্র। আমার গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোল না। হঠাৎ একজন মহিলা বলে উঠল ‘ওকে ঠিক করে বোঝান, নয়তো চলবে কী করে? ধরুন, ভালো করে ধরুন… আপনার এখনও চোখ-মুখে ব্যথা আছে?’
দেখলাম, মহিলার আঙুলগুলো সব ওর চোখে-মুখে গোঁজা। কে যেন বলল, ‘এটাই তো শেষ কাজ। কাল থেকে ছুটি পড়ে যাচ্ছে। স্যার এসে সন্ধি-বিচ্ছেদ করাবে।’ নজরে পড়ল, আমার পায়ের কাছে আরও চারজন বসে আছে। কারও মুখ স্পষ্ট নয়, তার মধ্যে একজন একটা কালো রোব পড়ে আছে। হঠাৎ সেই রোব পড়া লোকটা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘অল রাইস, দ্য অনারেবেল জাজ হ্যাজ অ্যারাইভড’- এবার দরজা দিয়ে একটা ছায়া ঢুকল, তার হাতে ফুটবলের সাইজের একটা পাথর।
এই ছায়াটাকে আমি বিলক্ষণ চিনি, ছায়াটা ধীর পায়ে এগিয়ে এসে আমার বুকের ওপর উঠে বসল। আমার দম বন্ধ লাগতে শুরু করল। কিছুতেই আমি হাত-পা নাড়াতে পারছি না। চিৎকার করার চেষ্টা করতেই কেমন একটা অদ্ভুত গোঙানির আওয়াজ বেরোল গলা দিয়ে। বুকের ওপরে বসে বিক্রম দু’হাতে পাথর তুলে বলল, ‘কী, বোধিবৃক্ষ! মরবি! না মহাভারত পড়বি?’
আমি ভয়ে চোখ বন্ধ করলাম। কে যেন আমার কাঁধদুটো চেপে ধরে কানের কাছে বলল, ‘দাদাভাই, ও দাদাভাই!’ আমি প্রাণপণে নিজের চোখ খুললাম। সকাল হয়ে গেছে। প্রথমেই চোখে পড়ল বিক্রমের মুখ, ও আমার কাঁধদুটো ধরে আছে। একটা অমানুষিক ভয়ে আমি ‘আঁ আঁ আঁ…’ করে চেঁচিয়ে উঠলাম। বিক্রম হাত সরিয়ে নিল।
নগেনদা তাড়াতাড়ি এক গ্লাস জল এগিয়ে দিল আমার দিকে। আমি কাঁপতে কাঁপতে জলটা খেলাম। জল খেয়ে যেন জ্ঞান ফিরল।
‘তুই ঠিক আছিস?’ বিক্রম প্রশ্ন করল। আমি দু’বার ওপর-নীচে মাথা নাড়লাম।
‘তোমায় বোবায় পেয়েছিল দাদাভাই, খারাপ স্বপ্ন দেখেছিলে নাকি?’
আমি কোনো উত্তর দিলাম না।
বিক্রম খানিকক্ষণ চুপ করে বসে একসময় বলল, ‘তোর স্লিপ প্যারালিসিস হয়েছিল। ভাগ্য ভালো, ভয় মাত্রা ছাড়ায়নি। এনিওয়ে, হাত-মুখ ধুয়ে নে। ব্রেকফাস্ট করব।’ বিক্রম উঠে চলে গেল।
আমি খানিকক্ষণ চুপ করে বসে ঠিক করে ফেললাম, আমায় কী করতে হবে।
বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করলাম। কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা ধরে দাঁড়িয়ে আছি। একবার মনে হল, আমি কি বেইমানি করছি! পরমুহূর্তেই মনে হল, বিক্রম আমার বন্ধু ঠিকই, তবে তার সঙ্গে সে একজন অপরাধী। তাকে ক্ষমা করা যায় না। আমি যদি এখন চুপ করে থাকি, তাহলে সেই পাথরের নীচে আমার বিবেকও চাপা পড়ে যাবে। আমি ফোনটা খুললাম। আঙুল কাঁপলেও মন শক্ত। আমায় এই কাজটা করতেই হবে।
শেখর সেন ও প্রদীপ্ত-দুজনের উদ্দেশে মেসেজ লিখলাম-’আমার জীবন বিপন্ন,আমি খুব বিপদের মধ্যে আছি। আমি জেনে ফেলেছি খুনি কে…আমাদের বিক্রম। আমি যা বলছি, তার
সপক্ষে আমার কাছে প্রচুর প্রমাণ আছে। আমি কাল রাতে সবটা জেনেছি। কিন্তু খবর দেওয়ার মতো মানসিক অবস্থায় ছিলাম না। আপনারা দ্রুত এসে আমায় উদ্ধার করুন। আমি যেকোনো মুহূর্তে ধরা পড়তে পারি।’
সঙ্গে প্রমাণস্বরূপ কিছু ছবি পাঠালাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখলাম, দুজনের মেসেজেই ব্লু-টিক পড়ে গেছে। শুধু রিপ্লাই এল প্রদীপ্তর থেকে-’দশ মিনিটে আসছি।’
বাইরে বেরিয়ে দেখি, বিক্রম খাওয়ার টেবিলে বসে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আজকে লুচি আর কুমড়ো আলুর তরকারি হয়েছে। আমার ভীষণ প্রিয়। কিন্তু এই মুহূর্তে আমি খাওয়ার অবস্থায় নেই। মাত্র দুটো লুচি নিলাম।
খেতে খেতে একসময় বিক্রম বলল, ‘দ্যাখ, আমি গত দু’দিন তোর সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করেছি। আসলে আমার মাথা কাজ করছিল না। তুই প্লিজ কিছু মনে করিস না ভাই।’
আমি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালাম না। কয়েকবার মোবাইল দেখার ভান করে সময় দেখলাম।
‘কোথাও যাবি নাকি? বারবার টাইম দেখছিস?’
আমি চমকে বিক্রমের দিকে তাকালাম, কিন্তু উত্তর দেওয়ার আগেই দু’বার দরজায় বেল বেজে উঠল। নগেনদা দরজা খুলতেই একদল সশস্ত্র পুলিশ ঘরে প্রবেশ করল। আমি সঙ্গে সঙ্গে টেবিল ছেড়ে উঠে পুলিশের সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়লাম। এই দলে প্রদীপ্তর সঙ্গে শেখর সেনও এসেছেন।
বিক্রমকে দেখে মনে হল ভারি অবাক হয়েছে। সে বলল, ‘কী ব্যাপার, আপনারা সবাই এখন এখানে?’ তারপর শেখর সেনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী হল শেখরকাকু? কী হয়েছে?’ উত্তরে শেখর সেন প্রদীপ্তর দিকে চোখের ইশারা করলেন।
প্রদীপ্ত এগিয়ে এসে বলল, ‘বিক্রম, ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট।
তোমায় আমরা তোর্সা দেব রঞ্জন, ডাঃ আকাশ মিত্র, নিকোলাস রজার্স, হাশিম তেরাজি, সাজিদ জামাল এবং আজ সকালে দত্তাবাদ রোডে উদ্ধার হওয়া অটোচালক দিলীপ লাহা মণ্ডলের খুনের দায়ে গ্রেপ্তার করছি। আমাদের কাছে পোক্ত প্রমাণ আছে… এই সবকটা খুন তুমি করেছ।’
বিক্রম খাবার থালাটা সরিয়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর ভাবলেশহীন মুখে বলল, ‘সেদিন রাতে শেখরকাকুর বলা কথাগুলো তুমি দেখছি লিটেরালি নিয়ে নিয়েছ প্রদীপ্ত! ইয়ার্কি রেখে বোসো। ভালো কথা, আপনারা কেউ লুচি খাবেন?’
এবারে শেখর সেন মুখ খুললেন, ‘রনি, আমরা কেউ ইয়ার্কি মারছি না। চুপচাপ উঠে আয়। তুই ধরা পড়ে গেছিস। তোর বিরুদ্ধে সব প্রমাণ দিয়েছে তোর বন্ধু বোধিসত্ত্ব। সুতরাং…’
শেখর সেন কথা শেষ করার আগেই বিক্রম চেঁচিয়ে উঠল, ‘তার মানে? কী প্রমাণ? কীসের বালের প্রমাণ?’
এবার আমি মুখ খুললাম, ‘বিক্রম, শেষ তিনটে খুনে যে পাথরগুলো ব্যবহার হয়েছে, সেগুলো মোড়ের মাথার শিব মন্দিরের সামনে থাকত। আমি রোজ ওখানে যাই। আগেই দুটো পাথর মিসিং ছিল। আর কাল রাতে ঠাকুরমশাই নিজে আমায় বললেন যে, পরশু তুই গিয়ে একটা পাথর নিয়ে এসেছিস। ওনার সঙ্গে তো তোর কথাও হয়েছে। আর কাল রাতে তুই বেরিয়ে যাওয়ার পর আমি তোর ঘরে ঢুকি। আমি সব দেখেছি। তোর ল্যাপটপের মাই টার্গেটস ফোল্ডারটাও। আমিই পুলিশকে সব জানিয়েছি। এবার স্বীকার করে নে।’
শেখর সেন এগিয়ে এসে বললেন, ‘রনি, আমি তোকে এই কেসে আনার জন্য নিজের মান-মর্যাদা বাজি রেখেছিলাম। আর তুই এটা কী করলি?’
বিক্রম হিংস্রভাবে বলে উঠল, ‘চুপ করো, কতগুলো আইনের পুতুল, অকম্মার ঢেঁকি-তাদের আবার মান-মর্যাদা, ছ্যা…। যা করেছি বেশ করেছি, কতগুলো ক্ষতিকারক পোকা-মাকড় মেরেছি। অপরাধ করে বুকচিতিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল এতদিন, তখন কোথায় ছিল তোমাদের সো কল্ড মান-মর্যাদা? ভেড়ুয়ার দল।’ তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তাহলে, শেষে তুই! শালা ঘরের শত্রু বিভীষণ। রাস্তায় বসে তো খুঁটে খাচ্ছিলি, সেখান থেকে তোকে তুলে আনলাম। বিনে পয়সায় থাকলি খেলি, আর আজকে বেইমানি করলি? কিন্তু বিক্রমজিৎ চক্রবর্তী বেইমানদের ক্ষমা করে না। ছ’টা মেরেছি আরেকটা হলে পুরো সপ্তাহ শেষ হবে।’
কথাটা শেষ হতেই কোমরের পেছন থেকে একটা রিভলভার বের করে আমার দিকে তাক করল বিক্রম। এর জন্য আমরা কেউই প্রস্তুত ছিলাম না। প্রদীপ্ত আর শেখর সেন দুজনেই নিজের নিজের বন্দুক বের করে বিক্রমের দিকে তাক করলেন। প্রদীপ্ত বলে উঠল, ‘বিক্রম, বোকামি কোরো না, তোমার দিকে অনেকগুলো বন্দুক পয়েন্ট করা আছে।’
শেখর সেনও বলে উঠলেন, ‘রনি, আমার কথা শোন, বন্দুকটা ফেলে দে। তোর ছোটকার কথা ভাব। এরকম করিস না।’
কিন্তু কারও কোনো কথাই বোধ করি বিক্রমের কানে গেল না।
আমি নিচু হতে যাচ্ছিলাম, বিক্রম গর্জন করে উঠল, ‘অ্যাই শালা হারামি! বেইমানের বাচ্চা। নড়বি না। আজকেই তোর শেষ দিন।’
এরপরের কয়েকটা ঘটনা অত্যন্ত দ্রুত ঘটে গেল। একজন কনস্টেবল পাশ দিয়ে আসছিল বিক্রমকে ধরবে বলে। কিন্তু বিক্রম টের পেয়ে লাথি মেরে ডাইনিং টেবিলের একটা চেয়ার কনস্টেবলটার দিকে ফেলে দিল। আর পরক্ষণেই গুলি চালাল, আমি কাঁধে প্রচণ্ড যন্ত্রণা পেয়ে ছিটকে পড়ে গেলাম। পরমুহূর্তেই অনেকগুলো কান ফাটানো আওয়াজ আর এক চিলতে মরণ আর্তনাদ… তারপর সব অন্ধকার।
