মানসী-কথা – প্রমিত গুপ্ত

মানসী-কথা

ট্যাক্সি নিয়ে মানসী ব্যানার্জির চেম্বারে পৌঁছতে সময় লাগল পাক্কা বাইশ মিনিট। ওনার চেম্বার যোধপুর পার্কে একটা বিল্ডিংয়ের তিনতলায়। লিফটটা নিঃশব্দে উঠল। দরজা খুলতেই গায়ে এসির হাওয়া আর নাকে রুম ফ্রেশনারের গন্ধ এসে লাগল। দরজায় ধাতব নেমপ্লেট-ডাঃ মানসী ব্যানার্জি, ক্লিনিকাল থেরাপিস্ট। ভেতরে কাচের জানালা দিয়ে শহরের আলো ঢুকছে। এক দিকে বইয়ের তাক, সারি দিয়ে সাজানো। অন্য দিকে কাঠের ডেস্কে কয়েকটা ফাইল, একটা পেনস্ট্যান্ডে কিছু পেন, আর একটা ডেস্কটপ। দেওয়ালে অদ্ভুত দেখতে একটা মিনিমাল ঘড়ি।

ডাঃ ব্যানার্জি চেয়ারে বসে একটা খাতায় কিছু লিখছিলেন। পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়স, ববকাট চুলে হালকা পাক, চোখ শান্ত হলেও তীক্ষ্ণ। দরজার শব্দে উনি মাথা তুললেন। ‘আসুন।’ হাতের কলমটা রেখে বললেন, ‘আপনারা লালবাজার থেকে, তাই না? আকাশস্যার বলছিলেন। বসুন।’

আমরা চেয়ারে বসলাম। বিক্রম সামান্য ঝুঁকে বলল, ‘আমরা তোর্সা দেব রঞ্জনের ব্যাপারে জানতে এসেছি। আপনি কতদিন ওনার চিকিৎসা করেছেন?’

ডাঃ ব্যানার্জি বললেন, ‘প্রায় দু’মাস। আমি ওদের বাড়িতে আটবার গিয়েছি। অজয়বাবু আমাকে ডেকেছিলেন। মোট বারো থেকে ষোলোটা সেশনের কথা ছিল, কিন্তু আটবারের পর অজয়বাবু বললেন, আর দরকার নেই।’

বিক্রম জিগ্যেস করল, ‘কারণটা কী ছিল?’

ডাঃ ব্যানার্জি খাতাটা বন্ধ করে পাশে সরিয়ে রেখে বললেন, ‘গোড়া থেকেই বলি তাহলে। তোর্সা সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইত। ভাবত ও যা করে, সেটাই সেরা। লোকে শুনলে ভাববে খুব আত্মম্ভরী, কিন্তু আসলে এটা ছিল ওর অস্তিত্ব ধরে রাখার একটা মরিয়া চেষ্টা। যেন নিয়ন্ত্রণ হারালেই সবকিছু তছনছ হয়ে যাবে। নিজের পরিচয়, নিজের জায়গাটা ধরে রাখার জন্য ও সর্বক্ষণ লড়ে যেত। সাইকোলজির ভাষায় একে বলে অবসেসিভ কম্পালসিভ পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার বা ওসিপিডি। ভিতরে ভিতরে তোর্সা ভীষণ একা ছিল।’

বিক্রম বলল, ‘ডাঃ মিত্র খুব জোর দিয়ে একটা কথা বলেছেন। ওনার কোনো একটা ভয় ছিল-হয় কিছুকে নয় কাউকে। এ ব্যাপারে আপনার কী মত?’

ডাঃ ব্যানার্জি একটু ভেবে বললেন, ‘দেখুন ভয় তো ছিলই। তবে সেটা কোনো মানুষকে নয়। ছিল নিজের পতনের ভয়-এক দিন যদি সবাই বুঝে ফেলে যে ওর ভিতরে আসলে কিছু নেই, যদি এক দিন মুখোশ খুলে পড়ে যায়… তখন কী হবে। এটা একধরনের ইমপোস্টার অ্যাংজাইটি। বাইরের সাফল্যের চাপ ভিতরের শূন্যতাকে আরও প্রকট করে তোলে। তোর্সার সবকিছুর ভিতরে ছিল একটা বাঁচিয়ে রাখার তাগিদ। আর এই তাগিদটা আচমকা তৈরি হয়নি।’

বিক্রম একটু নড়েচড়ে বসল, ‘কী রকম?’

‘একটা বাচ্চাকে আপনি যদি ছোটবেলা থেকে বলেন, তুমি ঠিক নও, তোমার এটা খারাপ, ওটা জঘন্য, তোমার দ্বারা কিছু হবে না… তাহলে একসময় সে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। ওর বেড়ে ওঠার কাহিনিও সেরকমই। যতদূর শুনেছি, তোর্সার বাবা ওকে নিয়ে কোনোদিন খুব বেশি উৎসাহ দেখাননি। “পারলে নিজের দিদির মতো হ” -এই কথাটা তোর্সা দিনে অন্তত দশ-বারো বার শুনত।

‘একবার তোর্সা বলেছিল, ওর বাবা ওর দিকে তাকালেও যেন খুঁত খুঁজে পেতেন। বড় মেয়েই ছিল ওনার গর্ব, তোর্সা ছিল দায়। দিনের পর দিন একটা শিশুর সঙ্গে এটা চলতে থাকলে যে ধরনের সমস্যা দেখা দেয়, সেগুলো হল লো সেলফ-এস্টিম, ইন্সিকিউরিটি, ইমপোস্টার সিন্ড্রোম, হাইপার অ্যাংজাইটি, ডিপ্রেশন, আর সেই সঙ্গে মারাত্মক চাপা ক্ষোভ।

‘আসল ব্যাপারটা কী জানেন, প্রত্যেক মানুষ কিছু না কিছু বিশেষত্ব নিয়ে জন্মায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়। আর এ ক্ষেত্রে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে পরিবারের। সেই পরিবারকেই তোর্সা পাশে পায়নি।’

বিক্রম বলল, ‘তাহলে পরিবারকে পাশে না পাওয়াই সব সমস্যার মূল কারণ?’

‘অনেকটাই। তবে তোর্সা লড়াকু মনের মেয়ে ছিল। সাধারণত এই ধরনের খারাপ শৈশবের শিকার যারা হয়, তাদের যৌবন অনেক ক্ষেত্রে খুব সুখের হয় না। তবে পরের দিকে কোনো ঘটনা আবার ওর মধ্যে লুকিয়ে থাকা এই সমস্যাগুলোকে টেনে বাইরে এনেছিল। কোনো কারণে ভীষণ ভয় থেকে ওর মধ্যে বাইপোলার ডিসঅর্ডারের লক্ষণ দেখা দেয়, সেই সঙ্গে ডিপ্রেশন আর হাই মুড-সুইং। তার মধ্যে নারসিসিস্টিক ট্রেটস তো আগে থাকতেই ছিল। কথায় কথায় মেজাজ হারানো, কাউকে ভালো না লাগা, সকলের থেকে গুরুত্ব চাওয়া, আর না পেলেই রাগ।’

অনেকক্ষণ ধরে এসব শুনতে শুনতে এবার আমি একটা কথা জিগ্যেস না করে পারলাম না, ‘আচ্ছা, কোনো একজন মানুষের মনে এত ধরনের সমস্যা থাকা সম্ভব?’

ডাঃ ব্যানার্জি একটু হেসে চোখ থেকে চশমাটা খুলে সেটাকে মুছে নিয়ে আবার বলা শুরু করলেন,

‘মনে করুন আপনার ঠান্ডা লেগেছে, সেই জন্য জ্বর, সর্দি, কাশি, গা-ব্যথা এগুলো দেখা দিল। এই প্রত্যেকটা সমস্যা কিন্তু কারণের দিক থেকে মিউচুয়ালি এক্সক্লুসিভ। তোর্সার মনের ক্ষেত্রেও তাই। ইন ফ্যাক্ট আমি একবার ওর অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে ওর মায়ের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। ওনার থেকে একটা মারাত্মক ঘটনার কথা জানতেও পেরেছিলাম।

‘তোর্সার বয়স তখন ছয় আর ওর দিদির নয়। পুজোর সময় ওর বাবা ওর দিদির জন্য একটা গোলাপি রঙের ফ্রক আর ওর জন্য একটা হালকা হলুদ রঙের ফ্রক কিনে এনেছিল। পিঙ্ক কালার অনেক বাচ্চার মতো তোর্সারও খুব প্রিয় ছিল। ও জেদ ধরল-ওটাই ওর চাই। এই কারণে ওর বাবা ওকে প্রায় দু’ঘণ্টা বাথরুমে আটকে রেখেছিলেন। যখন দরজা খোলা হয়, মশার কামড়ে ওর সারা গা হাত পা দাগা দাগা হয়ে গিয়েছিল। রাতে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এসেছিল। ফলস্বরূপ দেখা দেয় ক্লস্ট্রোফোবিয়া। সেই থেকে শুরু।’

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ডাঃ ব্যানার্জি আবার বললেন, ‘আমি ওর মা’কে জিগ্যেস করেছিলাম, আপনি কখনও বাধা দেননি কেন? উনি বলেছিলেন, “বাধা দেওয়ার ক্ষমতা আমার ছিল না, ওর বাবা ভীষণ বদমেজাজি মানুষ ছিলেন।”

‘জানেন একবার আমি প্রসঙ্গ বদলাতে গিয়ে জানতে চেয়েছিলাম, ও পুরোনো কলকাতা নিয়ে কতটা ইন্টারেস্টেড? ওর লেখায় পুরোনো কলকাতার কথা খুব থাকে, সেই কারণেই জিগ্যেস করেছিলাম। আমার প্রশ্ন শুনে প্রায় দশ মিনিট হিস্টিরিয়া রোগীদের মতো হেসেছিল, তারপর বলেছিল, “আমি যা জানি, সেটাই আমায় শেষ করবে।” জিগ্যেস করেছিলাম, কী জানো? শুধু বলেছিল, “একটা পুরোনো পাপ।” তারপর চুপ। সেদিন বুঝেছিলাম, এ কোনো রোগীর মনের খেলা নয়-এটা একধরনের দীর্ঘস্থায়ী অপরাধবোধ। যেটা স্বীকারও করা যায় না, ভোলাও যায় না।’

বিক্রম জিগ্যেস করল, ‘পাপটা কী? সেটা আপনাকে বলেছিলেন?’

তিনি বললেন, ‘না। একবার বলেছিল, “জীবনে যা করেছি, তা ফিরিয়ে দেওয়ার উপায় নেই। তাই চুপ করে থাকাই শ্রেয়।” সে সময়ে ওর মুখ দেখে মনে হয়েছিল, যেন ও নিশ্চিত শাস্তির জন্য অপেক্ষা করে আছে।’

এতক্ষণ পর ডাঃ ব্যানার্জি থামলেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘ওর অবর্তমানে আমি যে ওর মায়ের সঙ্গে কথা বলেছি, সেটা ও কোনোভাবে জানতে পেরে যায়। তারপর থেকেই শুরু হয় ঝগড়া অশান্তি। ওর ধারণা হয়-আমি বুঝি ওকে অবিশ্বাস করি, তাই ওর মায়ের কাছ থেকে কনফার্ম করতে গেছি। এরপর আর মাত্র একবার ওর বাড়িতে যাই। সেদিন ও আর দেখা করেনি। শুধু অজয়বাবু ক্ষমা চেয়ে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে আর আসার দরকার নেই। দ্যাটস ইট।’ 

বিক্রম বলল, ‘শেষ প্রশ্ন, যা বললেন, এর বাইরে আর কোনো সিগনিফিক্যান্ট ঘটনা? যা আমাদের কাজে লাগতে পারে।’

‘তিস্তার খোঁজ পেয়েছেন?’ উনি বললেন, ‘আপনারা চাইলে আমি ওনার নাম্বারটা দিতে পারি।’

বিক্রম বলল, ‘রিয়েলি? দ্যাট উইল বি ইম্মেন্সলি হেল্পফুল। কিন্তু আপনি… আচ্ছা ওনার মা?’

ডাঃ ব্যানার্জি হেসে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন।

‘অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে।’ বিক্রম বলল, ‘আজ তাহলে উঠি।’

বাইরে আসতেই বিক্রম একটা অদ্ভুত কথা বলল, ‘কী সাংঘাতিক, দুটো নদীমাতৃক পরিবার। খুঁজে পেতে বিয়েও করেছে নিজেদের মধ্যেই। আর এখন কী নাচানো নাচাচ্ছে আমাদের।’

সেদিন একটু রাতের দিকে প্রদীপ্তর ফোন এল। অবশ্য ফোন যে আসবে, সেটা আগে থেকেই ঠিক ছিল।

বিক্রম ফোনটা স্পিকারে দিয়ে টেবিলের ওপর রাখল। ‘হ্যাঁ, প্রদীপ্ত বলো। কী খবর পেলে?’

প্রদীপ্তর গলা যেন একটু ক্লান্ত, বলল, ‘বিক্রম, আগে তোমারটা বরং শুনি।’

বিক্রম সোজা হয়ে বসল, কফির মাগটা টেবিলে রাখল। তারপর আজ সারাদিন মানসী ব্যানার্জির চেম্বারে যা যা কথা হয়েছে-সব বলে গেল। প্রদীপ্ত সবকিছু শুনে বলল, ‘আচ্ছা এই যে দুই ডাক্তার মিলে খালি একই কথা বলে চলেছেন-ভয় ভয় আর ভয়। কীসের ভয় সেটা কেউ বলতে পারছে না? এত বড় বড় ডাক্তার হয়ে তাহলে লাভ কী হল? আটচল্লিশ ঘণ্টা ওভার হতে চলল, এখনও আমরা একটাও অ্যারেস্ট করতে পারিনি। খবরের কাগজ আর চ্যানেলগুলো আমাদের ষষ্ঠীপুজো করবে এবার।’

বিক্রম এবার ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে সোফায় হেলান দিল, ‘প্রদীপ্ত এই চাপটা আমিও বুঝতে পারছি, কিন্তু উই আর ডিলিং উইথ টপ অফ দ্য ফুড চেন। অ্যারেস্টের চক্করে যদি কিছু এদিক-ওদিক হয়ে যায়, সেটা কিন্তু আরও সাংঘাতিক হবে। আচ্ছা, এবারে তোমায় র‍্যাদার তোমাদের দুজনকে কয়েকটা জরুরি কথা বলি।

‘ডাঃ আকাশ মিত্র, ওনার চেম্বারে গিয়ে কয়েকটা জিনিস ভারি অদ্ভুত লাগল। এক, কয়েকটা ওষুধ সঙ্গে তিনটে ছোট টেডি বিয়ার আর দেওয়ালে বাচ্চাদের ছবির দুটো ফ্রেম। এই ধরনের খেলনা বা ছবি পেডিয়াট্রিশিয়ান বা চাইল্ড সাইকোলজিস্টদের চেম্বারে ঢুকলে দেখতে পাওয়া যায়। উনি গত আট বছরে কোনো শিশুর চিকিৎসা করেননি আর এই চেম্বারটা ছ’বছর আগে তৈরি হয়েছিল। তাহলে এখানে এই ছবি রাখার অর্থ কী?’

বিক্রমের এই অদ্ভুত প্রশ্নের আমি কোনো অর্থ খুঁজে পেলাম না। বাধ্য হয়ে বললাম, ‘আচ্ছা কেউ যদি তার চেম্বারে ক’টা বাচ্চার ছবি আর টেডি বিয়ার রাখে, তাহলে অসুবিধা কোথায়? পুরুষ বলে তার টেডি বিয়ার ভালো লাগবে না-কোথায় লেখা আছে?’

‘বেশ তো রাখুক না,’ বিক্রম হালকা হেসে বলল, ‘একজন পুরুষের পুতুল ভালো লাগাটা মোটেই অন্যায় কিছু না। কিন্তু ওনার ডেস্কের ওপর তিনটে ওষুধের স্ট্র্যাপ আর দুটো ইঞ্জেকশনের অ্যাম্পুল ছিল। ওষুধ তিনটের নাম প্রোজ্যাক, জোলোফ্ট আর প্যাক্সিল-অ্যান্টি-ডিপ্রেস্যান্ট। আর ইঞ্জেকশন দুটো হল ডিপো-প্রোভেরা ও লুপ্রন-অ্যান্টি-অ্যান্ড্রোজেন। পাতি বাংলায় যদি বলি এই ওষুধ আর ইঞ্জেকশন এক্সেসিভ সেক্সুয়াল ডিজায়ার বা অদম্য যৌন ইচ্ছে সংবরণ বা দমন করতে সাহায্য করে। এছাড়াও আরেকটা ব্যাপার…

বিক্রম এবার ফোনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোমরা লক্ষ্য করেছ কিনা জানি না, ভদ্রলোক আমাদের সঙ্গে কথা বলাকালীন কম করে চারবার ওই ছোট্ট হালকা হলুদ রঙের টেডির গায়ে আঙুল দিয়ে সুড়সুড়ি দিচ্ছিলেন। সামথিং ইজ ফিশি।’

‘ফিজিশিয়ান হিল দাইসেলফ,’ প্রদীপ্তর গলায় বিস্ময়, ‘বিক্রম! কোনো কিছুই তোমার নজর এড়ায় না। তবে এক্ষেত্রে আমিও একটা কথা বলব, এমন কি হতে পারে না যে এটা কোনো ধরনের এমারজেন্সি ওষুধ? কারণ, একজন ডাক্তারের চেম্বারে ওষুধ থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। ওটা যে ওনারই ওষুধ… কী করে শিওর হচ্ছ?’ 

‘ওয়েল,’ বিক্রম বলল, ‘একজন ডাক্তারের চেম্বারে ওষুধ থাকাটা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু বাকি সব ওষুধ পেছনের একটা কাচের আলমারিতে রাখা, আর তার পাশেই একটা ছোট্ট ফ্রিজ। সম্ভবত ওতে ইঞ্জেকশন অ্যাম্পুল রাখা থাকে। তাহলে এই কয়েকটাই ওনার সামনে রাখা ছিল কেন? বিশেষ করে ইঞ্জেকশনের অ্যাম্পুল বাইরে রাখতে নেই, সে ডাক্তারের চেম্বার হোক বা ওষুধের দোকান।’

খানিকক্ষণ আমরা তিনজনেই চুপ করে রইলাম, বিক্রমের যুক্তিজাল ছেঁড়া গেল না। শেষে আমি বললাম, ‘সবই বুঝলাম, কিন্তু এর সঙ্গে কেসের কী সম্পর্ক?’

বিক্রম হাসল, ‘দিস আর ভ্যালুয়েবেল ইনফরমেশন। এই মুহূর্তে না হলেও ভবিষ্যতে কাজে লাগতে পারে। এনিওয়ে প্রদীপ্ত তুমি বলো, তুমি কী পেলে?’

প্রদীপ্ত বলল, ‘ওকে, তুমি যে আটটা পাবলিকেশন মার্ক করেছিলে, সবগুলোতেই গিয়েছি। তবে গ্রন্থকীট পাবলিকেশনের শিবনাথ ভট্টাচার্য এক ভদ্রলোকের রেফারেন্স দিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে দেখা করলাম। ভদ্রলোকের নাম প্রফেসর অমরেন্দ্রনাথ দত্ত, ভাষাবিদ। এককালে বহু বছর সরকারি দোভাষী হিসাবে চাকরি করেছেন। সব ছেড়ে এখন গোলপার্কে রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অফ কালচারে আছেন। বয়স প্রায় আশির কোঠায়, কিন্তু দেখে বোঝার উপায় নেই।

‘ইনি এককালে তোর্সার শিক্ষক ছিলেন। ১৯৯৮ সালে তোর্সা এখানে ভর্তি হন এবং অমরেন্দ্রবাবুর কাছেই ফ্রেঞ্চ, জার্মানি, আর স্প্যানিশ শেখেন। উনি দুঃখ করে বললেন, তোর্সা ওনার সেরা ছাত্রীদের মধ্যে একজন ছিলেন। কিন্তু ওর লেখা পড়ে বুঝেছেন, ওই ভাষাগুলো উনি শিখেছিলেন শুধু চুরি করার জন্য। ইউরোপে ঘুরে অখ্যাত সব বই কিনতেন, যেগুলো এদেশে বেরোয়নি। তারপর নাম বদলে বাংলায় ছাপাতেন। এত চালু মহিলা!

‘যাই হোক, তিন বছর আগে অমরবাবু সেইসব বিদেশি পাবলিশারদের সঙ্গে কথা বলে সত্যিটা ফাঁস করে দিয়েছিলেন। তারা এখানকার পাবলিশারদের কড়া ভাষায় আইনি ধমক দেয়। যার ফলে সমস্ত পাবলিশাররা ওনাকে এক কথায় বয়কট করে, এবং আইনি জটিলতা থেকে বাঁচতে ওনার প্রায় সব বই মার্কেট থেকে তুলে নেওয়া হয়। এই গোটা ঘটনাটা তোর্সা নিজের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পেশিশক্তি দিয়ে সংবাদ মাধ্যমের কাছ থেকে স্রেফ চেপে যান।’

‘আর ওনার হাজবেন্ড আর সেক্রেটারি আমাদের কাছ থেকে চেপে যান, তাই তো?’ বিক্রম বলল।

‘একদমই তাই।’

‘আচ্ছা প্রদীপ্ত, ক’টা বই থেকে এইভাবে গল্প ঝেড়ে লিখেছে?’ বিক্রম জিজ্ঞাসা করল।

প্রদীপ্ত বলল, ‘বললে বিশ্বাস করবে কি না জানি না। অমরেন্দ্রবাবুর কথা অনুযায়ী সংখ্যাটা ষোলো।’

‘ষোলোটা? বলো কী?’ আমি বলে ফেললাম।

প্রদীপ্ত হালকা হেসে বলল, ‘তবে আর বলছি কী? কথায় বলে পুকুর চুরি, আর এখানে তো প্রায় সমুদ্র চুরি হতে বসেছিল। অমরেন্দ্রবাবু বললেন, ওনার নাকি প্রতিভা ছিল, কিন্তু আত্মবিশ্বাসের অভাবও ছিল। আমার না বাপু বিশ্বাস হয় না। একে পাগলামির দোকান, তার ওপর সাত চোরের এক চোর। এই মহিলা খুন না হলে কে হবে? যাক গে, কটা বই ঝেড়েছে সে তো বললাম, কার কার লেখা, কোন কোন দেশের-সেইসব একটা লিস্ট করে এনেছি। নেক্সট দিন দেখা হলে তোমায় দিয়ে দেব।’

‘এ তো ইন্টারন্যাশনাল কেস হয়ে গেল।’ বিক্রম অবাক হয়ে বলল, ‘যাক প্রদীপ্ত, তোমার আজকে খুব ধকল গেছে মনে হচ্ছে। আর বিরক্ত করব না। কাল দেখা হবে। শুভরাত্রি।’

উত্তরে প্রদীপ্তও একটা ছোট গুড নাইট বলে ফোন রেখে দিল। আমার মনে তখন অজস্র প্রশ্ন বোয়াল মাছের মতো ঘাই মারছে। কিন্তু জিগ্যেস করার আগেই বিক্রম হাত তুলে বলল, ‘জানি, কিন্তু এখন নয়, কাল সকালে। কয়েকটা বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করতে হবে। তুই খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়। মনে হচ্ছে, আমায় আজ রাত জাগতে হবে।’ 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *