অবশেষে হল অবসান – প্রমিত গুপ্ত

অবশেষে হল অবসান

জ্ঞান ফিরে প্রথমেই একজন অচেনা মহিলাকে দেখলাম সাদা জামা পরে আছে। একটু সময় লাগল এটা বুঝতে যে, আমি এখন হাসপাতালে। আর ওই মহিলা একজন নার্স। কিছুক্ষণ পর ডাক্তার এলেন। বেডের পাশের মনিটর দেখলেন, তারপর আমায় জিগ্যেস করলেন, ‘কী মিস্টার ঘোষ? এখন কেমন লাগছে?’ উত্তরে আমি শুধু একপাশে নিজের মাথা হেলালাম।

‘ভেরি গুড, একটু তাকান দেখি।’ ডাক্তার নিজের বাঁ-হাতের তর্জনী তুলে ডান হাতে একটা পেন্সিল-টর্চ জ্বালিয়ে আমার চোখে ফেললেন। দু’চোখের মধ্যে একটু আলো ঘুরিয়ে নিয়ে বললেন, ‘সব ঠিক আছে। কোনো চিন্তা নেই। আপনার ফ্যামিলি বাইরে অপেক্ষা করছে। আপনি দেখা করবেন?’ আমি আবার মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম।

ডাক্তারবাবু বেরিয়ে গেলে আমি নার্সকে জিগ্যেস করলাম, ‘এখন ক’টা বাজে?’

‘প্রায় আঠারো ঘণ্টা পর আপনার জ্ঞান ফিরেছে।’ কথাটা শুনে আমার কী রকম অদ্ভুত ঠেকল। আঠারো ঘণ্টা মানে প্রায় এক দিন… নেহাত কম সময় নয়। কিছুক্ষণ পর মা, দিদি আর জামাইবাবু সৌরভদা ঘরে ঢুকল। মা-দিদির মুখে ভয়ের ছাপ, আর সৌরভদার হাতে একটা ফলের প্যাকেট। তারপরে মায়ের কান্না, দিদির উদ্বেগ আর সৌরভদার হালকা বকুনি খেলাম। কিন্তু অনেক জিজ্ঞাসার পরেও আমি কাঁধের চোট, বিক্রম বা এই ভীষণ মামলা নিয়ে একটা কথাও বললাম না। আরও কিছু কথাবার্তার পর মা আমায় খড়গপুর ফিরতে বলে চলে গেল।

কিছুক্ষণ পর আবার ডাক্তার এলেন, সঙ্গে সেই নার্স। নার্স সোজা এগিয়ে এসে বেডের তলার হাতল ঘোরাতেই আমি ধীরে ধীরে খাটসুদ্ধ উঠে বসলাম। তার পরেই শেখর সেন আর প্রদীপ্ত ঢুকলেন। শেখর সেনের মুখে ক্লান্তি, চোখে কঠিন দৃষ্টি। প্রদীপ্তর হাতে একটা পাতলা ফাইল। শেখর সেন চেয়ারে বসে বললেন, ‘বোধিসত্ত্ব, শরীর কেমন? ডাক্তার বলছেন, তুমি শিগগিরই ছাড়া পাবে। তোমার সঙ্গে কিছু জরুরি কথা আছে।’

আমি ধীরে ধীরে মাথা নাড়লাম, ‘আমি ঠিক আছি স্যার। বলুন কী কথা?’

প্রদীপ্ত ফাইলটা টেবিলে রেখে বলল, ‘বোধি, বিক্রম… আর নেই। ও তোমায় গুলি করার পর আমরা পালটা গুলি চালাই আর তাতেই…।’ আমার বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল। প্রদীপ্ত ফের বলল, ‘ওর শেষ ভিক্টিম, দিলীপ লাহা মণ্ডলকে তার বাড়িতে পাওয়া গেছে। লোকটার ফোনে “গুপি বাঘা ফিরে এলো” থেকে ওরে শয়তান গানটা বাজছিল।’

মাথাটা ঝিমঝিম করছে। আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম, ‘এতগুলো লোককে ও কেন মারল কিছু জানতে পারলে, প্রদীপ্ত?’

শেখর সেন উত্তর দিলেন, ‘কেন মারল, সেটা আমরাও এখনও বুঝিনি। আমার ধারণা, ওর মধ্যে একটা বিকৃত ন্যায়বোধ কাজ করছিল। দীর্ঘদিন কোনো মানুষ কাজকর্ম ছাড়া একা থাকলে তার মধ্যে অনেক ধরনের উন্মাদনা কাজ করে-যেমন, অবসেসিভ অ্যাটাচমেন্ট, ভিজিল্যান্টে সিন্ড্রোম বা নিহিলিজম। এক্ষেত্রে বিক্রম নির্দিষ্ট কিছু মানুষকে ঘৃণা ও সন্দেহ করে, নিজেকে মৃত কাকার জায়গায় কল্পনা করে, এবং জীবনের শেষ উদ্দেশ্য হিসেবে সিরিয়াল কিলিং প্ল্যান করে। আসলে মানুষের মন ব্যাপারটাই খুব বিচিত্র। তবে এসবই আমার অনুমান, সত্যিটা হয়তো চিরকাল অন্ধকারেই থেকে যাবে।’

প্রদীপ্ত বলল, ‘যেহেতু তুমি এই কেসের অংশ ছিলে তাই তোমায় বলছি, ওর ঘর আর ল্যাপটপে যা পেয়েছি, তাতে বোঝা যায়-বিক্রম অনেকদিন ধরে এই কাজের পরিকল্পনা করছিল। তবে ওর ফোনের কল রেকর্ডস চেক করে সেরকম কিছু পাওয়া যায়নি। একটা ল্যান্ডলাইন নাম্বার থেকে কয়েকবার কল এসেছিল। খোঁজ করে জেনেছি, ওটা দুর্গাপুরের একটা ফোন বুথের নাম্বার।

‘ফোনে আর ল্যাপটপে একটা সফটওয়্যার পাওয়া গেছে, নাম ঘোস্টআই। সাংঘাতিক পাওয়ারফুল। এই সফটওয়্যার তার আশেপাশের ২০০-২৫০ মিটারের মধ্যে থাকা একাধিক সিসিটিভি সিকিউরিটি সিস্টেম হ্যাক করতে পারে। এছাড়া আর কিছু পাইনি। এমনকী ব্রাউসিং হিস্ট্রি থেকেও না। তবে একটা ব্যাপার, বন্দুকটা কোত্থেকে পেল… জানি না। ইন ফ্যাক্ট ওর সিরিয়াল নাম্বার থেকেও কিছু পাওয়া যায়নি।

‘আর তার থেকেও বড় কথা, সকালবেলা ব্রেকফাস্ট খেতে বসে কে নিজের সঙ্গে বন্দুক রাখে? আর এতদিন ধরে এত খোঁজাখুঁজি করেও যার একটা ফিঙ্গার প্রিন্ট পাওয়া যায়নি, সে হঠাৎ সব প্রমাণ এমন আলগাভাবে রেখে গেল! ব্যাপারটা একটু বেশিই সহজ না?’

শেখর সেন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, বললেন, ‘আমি বলি কি বোধিসত্ত্ব, এবার তুমি নিজের কথা ভাবো। তুমি টেট ক্লিয়ার করেছ শুনলাম। আমি কথা বলে তোমার জন্য খড়গপুরে একটা স্কুল টিচারের চাকরির ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। এখান থেকে বেরিয়ে সোজা খড়গপুর চলে যাও। কলকাতায় আর না। এখানে তোমার জন্য শুধু বিপদ আর ব্যথা।’

আমি বললাম, ‘স্যার, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। কিন্তু আমায় একটু ভাবার সময় দিন।’ শেখর সেন উঠে দাঁড়ালেন, ‘ঠিক আছে, ভেবে কী ঠিক করলে জানিও। আমরা আজ আসি।’

ওনারা দরজার দিকে এগোলেন। আমি সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে শুয়ে রইলাম। বিক্রম কি সত্যিই পাগল? এই তদন্ত করতে গিয়ে আমরা যা যা জেনেছি-সব মিথ্যে? সব সাজানো? এত কিছু সাজানো সম্ভব? জানি না। আমি ওকে চিনতে এতটা ভুল করলাম! আর ভাবতে পারছি না, অনেক হয়েছে, সবাই ঠিকই বলছে। কলকাতায় আর কিছু রাখা নেই আমার জন্য, একরাশ বেদনাদায়ক স্মৃতি ছাড়া। আর তাছাড়া থাকবই বা কোথায়? ১২/১৪ বিবেকানন্দ রোড এখন একটা মৃত্যুমাখা হানাবাড়ি। অনেক ভেবে ঠিক করলাম, খড়গপুরেই ফিরে যাব।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *