বিকেলটা এখন বড় তাড়াতাড়ি ঘোলাটে হয়ে আসে। গঙ্গার ও-পাড়ের ইটভাটার রোগা রোগা চিমনিগুলো থেকে সরু সুতোর মতো ধোঁয়া উঠছে এখনও। জলে ভাঁটির টান। নদীটা মরে আসছে ক্রমশ। ছেঁড়া চটি, ঠাকুরের ভাঙা কাঠামো, চাপ চাপ কচুরিপানা, পেট-ফাটা মৃত কুকুর ধীরে ধীরে ভেসে যাচ্ছে দক্ষিণে। ওই দিকে সমুদ্র। দিয়েগোদের ছোটবেলায় নদীটা এমন ছিল না। ও প্রতি মহালয়ায় বাবার সঙ্গে এখানে আসত। বাবা আর বাবার বন্ধুরা স্নান করত আর ও অবাক হয়ে দেখত ভরা একটা নদী। দেখত বড় বড় জাহাজ যাচ্ছে, ভটভটি লাগানো নৌকোগুলো মানুষ নিয়ে এপার ওপার করছে। জাহাজের চিমনিতে লাগানো পতাকা দেখে ও মনে মনে ভাবত কোন দেশ থেকে আসছে জাহাজটা? কিন্তু সেই ছোটবেলার নদীটা কোথায় গেল কে জানে! এখন সামনের নদীটাকে দেখলে কষ্ট হয় দিয়েগোর। মরে যাচ্ছে, বড় দ্রুত মরে যাচ্ছে নদীটা। ঠিক যেন ওর মা।
গ্যাজনখানায় আজ দিয়েগোর সঙ্গে ডুডু আর জ্যাকসন আছে। কবীরটার যে কী হল? দিয়েগো মাঝে মাঝে ভাবে কবীর এভাবে ভুল বুঝল ওকে? অবশ্য কে না ভুল বুঝেছে? সব্বাই ভেবেছে ও বিশ্বাসঘাতক। ওকে নিয়ে ছোট্ট ছড়াও কেউ একটা ছড়িয়ে দিয়েছে সারা বাটানগরে। মাঝে মাঝেই শোনে ওকে দেখলে চেঁচিয়ে কিছু সিক্স-সেভেনের ছেলেরা বলছে, “ম্যাচ ছাড়লি কী নিয়ে? ক্রোনিয়ে, ক্রোনিয়ে।” দিয়েগো জানে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট ক্যাপ্টেন হ্যান্সি ক্রোনিয়ের কথা। ম্যাচ ফিক্সিং করেছিলেন তিনি। পৃথিবীর সমস্ত মানুষ স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু দিয়েগো তো অমন করেনি। তবে?
কে ছড়িয়েছে কথাটা দিয়েগো আকাশ পাতাল ভেবেও বের করতে পারেনি। কিন্তু যেই ছড়াক, সে খুব বুদ্ধি করে কথাটা ছড়িয়েছে। একেতেই বাড়িতে প্রচণ্ড টেনশন চলছে। তার ওপর এই ঝঞ্ঝাট, সামনে টেস্ট পরীক্ষা— দিয়েগোর পাগল পাগল অবস্থা। এখন প্র্যাকটিস বন্ধ। যদিও দিয়েগো প্র্যাকটিসে যাচ্ছে না। আসলে বলা যেতে পারে পুরুর ওপর অভিমান করেই যাচ্ছে না। সবাই না হয় ভুল বুঝল, কিন্তু পুরু নিজে তো হায়ার লেভেলে ফুটবল খেলেছে, ও কী করে অমনভাবে দিয়েগোকে সন্দেহ করছে? কোচ যদি তার প্লেয়ারকে বিশ্বাস না-করতে পারে তা হলে সে-টিমে প্লেয়ারের খেলে লাভ নেই।
“কী রে দিয়েগো, তখন থেকে কী অত ভাবছিস বল তো? কী হয়েছে তোর?” চিনেবাদামের খোসা ছাড়িয়ে মুখে ফেলে প্রশ্নটা করল ডুডু।
“কই কিছু না তো।” দিয়েগো অন্যমনস্ক ভাবে উত্তর দিল।
“কিছু নয় যখন, তখন অমন লাথ-খাওয়া প্রেমিকের মতো বসে আছিস কেন রে?” এবার জ্যাকসন রুক্ষভাবে জিজ্ঞেস করল। দিয়েগো উত্তর না-দিয়ে উঠে দাঁড়াল। ওরা যেখানে বসে আছে সেটা সবুজ পাড়। দিয়েগো হেঁটে সামনের দিকে এগিয়ে গেল। জ্যাকসন নাছোড়বান্দা হয়ে ওর সঙ্গে সঙ্গে উঠে গেল, বলল, “আজ তোকে বলতেই হবে কেন তুই সেই খেলার পর থেকে এমন করছিস। না হয় সেদিন বাজে খেলেছিস। লোকে যা খুশি বলুক, তুই অমন ম্যাদা মেরে গেছিস কেন? তুই এমন করছিস বলেই তো লোকে আরও বেশি তোর পেছনে লাগছে।”
দিয়েগো দাঁত চেপে বলল, “বেশি ফ্যাচফ্যাচ করিস না। যা বুঝিস না তা নিয়ে ভাটের জ্ঞান দিবি না।”
“শালা আমি বুঝি না তো কে বোঝে রে? ঠিক আছে, বোঝা আমায়। ফালতু মটকা গরম করে দিচ্ছিস তুই।” জ্যাকসন দুমদাম করে গিয়ে আবার বসে পড়ল। দিয়েগো একবার ঘড়িটা দেখল। পাঁচটাও বাজেনি তবু কেমন সন্ধে হয়ে আসছে। ভেবেছিল এখানে আসলে একটু ফ্রেশ লাগবে, কিন্তু এরা যা শুরু করেছে আর ভাল লাগছে না। এবার বাড়ি যেতে হবে।
ডুডু বাদামের ঠোঙাটা শেষ করে দূরে ছুড়ে ফেলে বলল, “এই দিয়েগো, তোর ‘সান সাইন’ মানে রাশি কী রে?”
“আবার রাশি, কাশী, গয়া বৃন্দাবন খুলে বসলি? মাইরি তুই এক পিস জিনিস বটে। ব্রিটিশ মিউজিয়ামে খবর দিলে ওরা এসে জামাই আদর করে নিয়ে যাবে। কথায় কথায় পঞ্জিকা, মাদুলি, তাবিজ, তাগা, পূর্ণিমা, অমাবস্যা সব চটকে চৌত্রিশ করে দেওয়া খালি।” জ্যাকসন খেঁকিয়ে উঠল।
“তুই কী বুঝিস রে? খালি ফটফট। আর তোকে কে জিজ্ঞেস করেছে?” ডুডুও যথাসম্ভব প্রতিবাদ করল।
“আমি বলছি, দেখি আমার সম্বন্ধে কিছু বলতে পারিস কিনা। আমার রাশি কর্কট।” জ্যাকসন না-দমে আবার বলল।
“ভাগ শালা। তোর মতো মর্কটের প্রেডিকশন করি না আমি।” ডুডু জ্যাকসনকে আর পাত্তা না-দিয়ে আবার দিয়েগোকে জিজ্ঞেস করল, “এই দিয়েগো বল না তোর রাশি কী?”
দিয়েগো অনিচ্ছার সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে জবাব দিল, “জেমেনি মানে মিথুন।”
জ্যাকসন কথাটা যেন লুফে নিল, বলল, “মিঠুন? ভাগ মিঠুন আবার রাশি হল কবে রে? ও তো চক্রবর্তী। ওই যে মিঠুন চক্রবর্তী। এখন সাউথের মোটা মোটা নায়িকাদের সঙ্গে সিনেমা করে। একসময় ডিস্কো ড্যান্সার করেছিল। গানটা মনে নেই? ‘আয়ামা ডিস্কো ড্যান্সার দাদুকে দিদিমা দেয় অ্যান্সার, ঢিচু, ঢিচু’। ওর যদি মিঠুন রাশি হয় আমার তবে অমিতাভ রাশি। ওঃ যা ঘ্যামা হবে না। বুড়ো বয়সে মাথায় রঙিন পরচুলা পরে কাজরা রে কাজরা রে বলে কী নাচ। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত সবাই ম্যালেরিয়া রুগির মতো কাঁপছে। মাইরি, বচ্চনের চামড়াফামড়া ঝুলে গেলেও এখনও বেশ টান্টু আছে।”
ডুডু আর পারল না, ছুটে গিয়ে ক্যাত করে একটা লাথি মারল জ্যাকসনকে, “তোর টান্টুগিরি বের করছি দাঁড়া। অমিতাভ বচ্চন সম্বন্ধে কিছু বললে কিন্তু এই গঙ্গার তীরে রক্তগঙ্গা বইবে বলে দিলাম।” দিয়েগো জানে অমিতাভ বচ্চন ডুডুর ফেভারিট অ্যাক্টর। কিন্তু জ্যাকসন দমবার পাত্র নয়। ও আবার বলল, “বলব না মানে? একশো বার বলব, হাজার বার বলব। চামড়া ঝুলে মশারি হওয়ার জোগাড় এখনও ইয়ং নায়িকাদের সঙ্গে সিনেমা করা! রানি মুখার্জিকে চুমু পর্যন্ত খেয়েছে, কী সাহস! একে টান্টু বলবি না তো কাকে বলবি? টান্টু, টান্টু, টান্টু, শালা তুইও টান্টু। জানি না ভেবেছিস? সেদিন তোকে আমি দেখিনি? ফরসামতো মেয়েটার সঙ্গে হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিলি?” দিয়েগো দেখল জোঁকের মুখে নুন পড়ল যেন। এই শেষ কথাটাতে চুপসে গিয়ে ডুডু চুপ করে গেল।
দিয়েগো বুঝল কোনও কেস আছে। কিন্তু এ ব্যাপারে ডুডুকে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই হঠাৎ সরসর করে দিয়েগোর পায়ের কাছ দিয়ে কিছু একটা চলে গেল। দিয়েগো চমকে উঠে স্থির হয়ে গেল। সাপ নয় তো? কিন্তু শীতকালে কি সাপ বেরোয়? দিয়েগো মুখ ঘুরিয়ে দেখল, না সাপ নয়, একটা কাঠবেড়ালি। মাটির রাস্তাটার উলটো দিকে যে হাড়িকাঠ তার পাশে গিয়ে ওটা বসেছে। আর হাড়িকাঠটাতে চোখ পড়তেই চমকে উঠল দিয়েগো। প্রায় সন্ধে হয়ে এসেছে। তার অল্প আলোয় মনে হচ্ছে হাড়িকাঠটার কালো কাঠের ওপর লাল ছোপ! রক্ত!
দিয়েগো পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল সেদিকটায়। দেখল, না রক্ত নয়, কেউ বোধহয় খয়েরি রঙের পানের পিক বা ওই জাতীয় কিছু ফেলেছে ওটার ওপর। দিয়েগো আজকাল সবজায়গায় রক্ত দেখছে যেন। এটা কি ফিয়ার সাইকোসিস? দিয়েগো কি ভিতু হয়ে যাচ্ছে? আসলে বাড়ির আবহাওয়াটাই কেমন যেন মৃত্যুর মতো হয়ে গেছে। ওর শ্যামলা, সুন্দর, ছোট্টখাট্টো মা দিনকে দিন কেমন আরও ছোট্ট হয়ে বিছানার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে যেন। সারা সংসার হাতের মুঠোয় থাকত মায়ের। বাবার চশমা খোঁজা থেকে দিয়েগোর পেনসিল কেটে দেওয়া, মা সব করত একা হাতে। দিয়েগো ভাবত ঠাকুর দশটা হাতে যা করতে পারে না মা দুটো হাতে তাই করে দেয়। সারাদিন চরকির মতো ঘুরত মা। দিয়েগোর মনে হত কে যেন মাকে দম দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে। আজ সেই মায়ের দম ফুরিয়ে এসেছে যেন। বিষণ্ণ একটা মানুষ শুয়ে শুয়ে অপেক্ষা করছে মৃত্যুর। ওই যে গঙ্গার ওই দিকে সূর্য ডুবে যাচ্ছে। ওই যে লাল রংটা জলে গুলে ক্রমশ গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়ে উঠছে, এই সমস্ত রং চেনে দিয়েগো। ওর মায়ের বিছানায় বালিশে মাঝে মাঝেই এই রংটা লেগে থাকে! সূর্য ডুবে যাচ্ছে, খুব দ্রুত সূর্য ডুবে যাচ্ছে। মায়ের জীবনেও বোধহয় গোধূলি নেমে এল।
কাউকে দিয়েগো এসব বলতে পারে না। জ্যাকসন, ডুডু বা অন্য কাউকে ও কক্ষনও বলে না ওর বাড়ির অবস্থা। ও জানে এসব কথা বললেই লোকে সহানুভূতি জানাবে, প্রচুর জ্ঞান দেবে। বাড়িতে অসুস্থ মানুষকে দেখতে গিয়ে তাকে আরও অসুস্থ করে তোলাই যেন মানুষের কাজ। দিয়েগো এসব চায় না। ও নিজে জানে ওর ইগো বেশি। কেউ ওকে করুণা করুক ও সেটা সহ্যই করতে পারে না। আর মা ওর সবচেয়ে বড় সেন্টিমেন্টের জায়গা। এটা নিয়ে ওকে কেউ কিছু বলুক সেটা ও চায় না।
মাসখানেক হল মায়ের অবস্থা এরকম। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ওরা দেখেছিল মায়ের কথা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেছে। শ্বাসকষ্ট হচ্ছে খুব। প্রায় কিছুই খেতে পারছে না। দিয়েগো আর ওর বাবা হতবাক হয়ে গেছিল। হঠাৎ এ কী হল? তারপর অনেক ডাক্তার বদ্যি করিয়েছে ওরা। দিনে দিনে মায়ের অবস্থা ক্রমশ খারাপ হয়েছে, লিকুইড ছাড়া অন্য সব কিছু খাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। কোনও ডাক্তার ধরতেই পারেনি কী হয়েছে। তারপর একদিন শুরু হল কাশি। তার সঙ্গে উঠে আসতে লাগল রক্ত। আবার ডাক্তার, আবার নার্সিংহোম, কিন্তু এবারও কেউ বুঝল না কী ব্যাপার। হাজারো টেস্ট করা হল। তাতে শুধু জানা গেল যে শ্বাসনালি আর খাদ্যনালি ফুলে প্রায় বন্ধ হয়ে আছে। কিন্তু কেন এমন হল কেউ ধরতে পারল না। চোখের সামনে মা ক্রমশ নির্জীব হয়ে পড়তে লাগল। অসহায়ের মতো দিয়েগো আর ওর বাবা দেখতে থাকল প্রায় দম ফুরিয়ে আসা একটা পুতুলকে।
দিয়েগো এসব বলবে কাকে? ফুটবল ছাড়া ওর জীবনের বাকি সবটাই তো ওর মা। মায়ের সঙ্গেই ওর সব ঝগড়া, সব বন্ধুত্ব। সব কথা দিয়েগো তো একমাত্র মাকেই বলত। এমনকী রুপাইয়ের কথাও একমাত্র মাকেই বলেছে দিয়েগো। মা কিন্তু একটুও রাগ করেনি। শুধু বলেছে কাউকে ভাল লাগলেই তো হল না, আগে জীবনে যোগ্য হতে হয়। দিয়েগো জানে যোগ্য ওকে হতেই হবে। ফুটবলের যোগ্য, ওর মায়ের যোগ্য আর রুপাইয়ের যোগ্য। আর মায়ের এই অবস্থা। দিয়েগোর আজকাল চারিদিক কেমন সব অন্ধকার লাগে। আর সবচেয়ে মারাত্মক খবরটা এসেছিল সেই ফুটবল ম্যাচটার দিন, দুপুরে। আর সেই খবরটার ঢেউয়ে তছনছ হয়ে গেছে দিয়েগোর জীবন।
ম্যাচের আগের দিনটা খুব যন্ত্রণায় কেটেছিল দিয়েগোর। খালি মনে হচ্ছিল রুদ্রর প্রস্তাবটা—‘ম্যাচ ছাড়, রুপাই তোর।’ নিজের কাছে এখন স্বীকার করতে লজ্জা নেই দিয়েগোর যে রুদ্রর প্রস্তাবটা ওর খারাপ লাগেনি। কারণ এই ম্যাচটায় হারলে সামনের ফিরতি ম্যাচটা তো আছেই। রুপাইয়ের জন্য একটা ম্যাচ ছাড়তেই পারে দিয়েগো। আর যেহেতু রবিন মেমোরিয়াল রুপাইয়েরও স্কুল, সেহেতু ওদের স্কুল জিতলে স্বাভাবিক ভাবে রুপাই খুশি হবেই। দিয়েগো মোটামুটি ঠিক করে ফেলেছিল ম্যাচটা ছেড়েই দেবে। ওর এই মন খারাপের জীবনে রুপাই-ই তো একমাত্র আনন্দ। তাই ভেবেছিল এই সুযোগটা ও ছাড়বে না। একবার, অন্তত একবার নিজের জন্য কিছু করবে ও।
শেষ রাতের দিকে ঘুম এসেছিল দিয়েগোর। কিন্তু কী এক অস্বস্তিতে বেশিক্ষণ ঘুমোতে পারেনি। ঘুম ভেঙে গিয়েছিল ওর। বিছানা থেকে উঠে জানলায় দাঁড়িয়ে ও দেখেছিল কার্তিক মাসের আবছা ঠান্ডা আর পাতলা কুয়াশার মধ্যে ওদের বাগানে গাছের সামনে দাঁড়িয়ে আছে মা। ওই প্রচণ্ড অসুস্থ শরীর নিয়েও বাগানে বেরিয়ে শিউলি ফুল জড়ো করছে। সেই শিফনের মতো কুয়াশা, কুসুম রঙের আলো আর এক গাছ শিউলির সামনে দাঁড়ানো মাকে দেখে হঠাৎ খুব মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল দিয়েগোর। মনে পড়ে গিয়েছিল যে, সেদিন ওর ঠাকুরদার মৃত্যুবার্ষিকী। দিয়েগোর মাকে নিজের মেয়ের চেয়েও বোধহয় বেশি ভালবাসতেন ওর ঠাকুরদা। মা এত কিছুর মধ্যেও দিনটা ভোলেনি। ঠাকুরদার ছবি সাজাবে বলে মা শিউলি জড়ো করতে উঠেছে।
দিয়েগোকে দেখে মা কষ্ট করে বলেছিল, “আজ ঠাকুরদার মৃত্যুদিন দয়া। মনে আছে তো? আজ ম্যাচটা কিন্তু ভালভাবে খেলিস।” দিয়েগোর সব কিছু গুলিয়ে গেল যেন। ঠাকুরদার কাছেই ফুটবলের শুরু দিয়েগোর। ঠাকুরদা বলতেন, “দয়া! মা, দেশ আর ফুটবল, এর সঙ্গে কোনওদিন বিশ্বাসঘাতকতা করবি না। ভাল প্লেয়ার সবাই হয় না কিন্তু ভাল স্পোর্টসম্যান কিন্তু হওয়া যায়।” মায়ের কথায় ছোটবেলা, প্রথম তিন নম্বর ফুটবল, প্রথম বুটের গন্ধ, প্রথম গোল করার আনন্দে সারারাত ঘুমোতে না-পারা— সব একসঙ্গে স্রোতের মতো ফিরে এল। রুপাই, রুদ্র, প্রেম সব কেমন কুঁকড়ে গেল যেন। সারারাত ধরে নিজেকে বোঝানো যুক্তিগুলো ক্রমশ ভেঙে গেল দিয়েগোর। নিজের প্রতি কেমন একটা ঘৃণা হতে শুরু করল। ইস কী করতে যাচ্ছিল ও? একটা মেয়ের জন্য ও বিশ্বাসঘাতকতা করতে যাচ্ছিল? না, সম্ভব নয়। দিয়েগো ঠিক করে নিয়েছিল ও নিজের খেলাই খেলবে। কিন্তু তবু সব গন্ডগোল হয়ে গিয়েছিল। এখন মনে হয় দিনটা ওর ছিল না, এক্কেবারে ছিল না।
ফুল তোলার পরেই মায়ের শরীর হঠাৎ খারাপ হয়ে পড়ল সেদিন। বাবা খুব বকাবকি করেছিল মাকে অমন অনিয়ম করার জন্য। কিন্তু ততক্ষণে মায়ের অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে পড়েছে। মুখ দিয়ে অনবরত রক্ত উঠতে শুরু করল। ওষুধ, ইঞ্জেকশন সব করেও কিছু হল না। ডাক্তারকাকা বললেন, “আমি খুব ভাল বুঝছি না। তোমরা যত তাড়াতাড়ি পারো বায়োপসি করার বন্দোবস্ত করো। ইট মে বি ক্যান্সার।”
ক্যান্সার? কথাটা শুনে দিয়েগোর মনে হয়েছিল ওর পৃথিবীটা কেউ যেন এক ধাক্কায় ভেঙে দিল। অনেক উঁচু নাগরদোলনার থেকে নীচে নামার সময় পেটের ভেতরটা যেমন খালি খালি লাগে, ঠিক তেমনই মনে হয়েছিল দিয়েগোর। ক্যান্সার মানে? মৃত্যু? মা মারা যাবে? মা আর থাকবে না? তা হলে দিয়েগোর কী হবে? মন খারাপ হলে কার কাছে গিয়ে বসবে? সকালে উঠে কার মুখ দেখবে প্রথমে?
মাকে তক্ষুনি বাটা হাসপাতালে ভরতি করা হয়েছিল। কারণ চব্বিশ ঘণ্টা অবজারভেশনে রাখা দরকার। দিয়েগো ঠিক করে নিয়েছিল সেদিনের ম্যাচটা আর খেলবে না। মায়ের এই অবস্থার মধ্যে ও কোনও কিছুতেই মনোযোগ দিতে পারবে না। কিন্তু মা শোনেনি। এত কিছুর মধ্যেও মা ভোলেনি ম্যাচের কথা। জোর করে দিয়েগোকে মাঠে পাঠিয়েছিল।
মায়ের কথা শুনে মাঠে অবধি চলে গিয়েছিল দিয়েগো, কিন্তু আর পারেনি। এ তো সিনেমা নয় যে এর মধ্যেও নায়ক দারুণ খেলে ম্যাচ জিতে যাবে। দিয়েগো স্যারকে গিয়ে বলেছিল ও ম্যাচটা খেলতে পারবে না। কিন্তু বরণ স্যার শোনেননি। জোর করে নামিয়ে দিয়েছিলেন মাঠে। দিয়েগো কিছুতেই স্যারকে বলতে পারেনি মায়ের কথা। কারণ এটা দিয়েগো পারে না। নিজের সমস্যা, কষ্ট ও কোনওদিন কাউকে বলতে পারে না। আর ও জানে এই ব্যাপারটা এমন যে লোকে জ্ঞান ছাড়া আর কিছু ওকে দেবে না।
খেলতে নেমে শুধু মায়ের কথাই মনে পড়ছিল দিয়েগোর। মা কি সত্যি মারা যাবে? মায়ের কি ভাল হওয়ার সম্ভাবনা নেই? এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে একের পর এক মিস পাস হতে লাগল। পায়ের থেকে বল বেরিয়ে যেতে লাগল, কাটাতে গিয়ে বিপক্ষের পায়ে জমা দিতে লাগল বলগুলো। সবাই গালাগালি দিতে শুরু করল। কেউ কেউ বাবা মায়ের নাম তুলেও গালাগাল করল। আর এইসব হট্টগোলের মধ্যে কীভাবে জানি গোলটা খেয়ে গেল ওরা। দিয়েগো সত্যি কবীরকে ইচ্ছে করে ধাক্কা মারেনি। কেন মারবে? কিন্তু ভগবান জানে কীসের থেকে কী হল। ভেসে-আসা বলটা লক্ষ করে লাফিয়েছিল দিয়েগো ক্লিয়ার করবে বলে। কিন্তু কোথা থেকে কবীর লাফিয়ে উঠল বলটা ফিস্ট করবে বলে। আর কেউই ওরা বলটা পেল না। নিজেদের মধ্যে ধাক্কা খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল। কেউ কোনও প্রশ্ন করল না। সবাই একচেটিয়া ভাবে দিয়েগোকে বিশ্বাসঘাতক বলে গালাগালি করতে লাগল। কবীর তো ওর গায়ে পর্যন্ত হাত তুলেছিল। রুদ্রও খেলার শেষে এসে ফিসফিসে গলায় থ্যাঙ্কস দিয়ে গেল ওকে। কেন থ্যাঙ্কস? দিয়েগো রুদ্রকে বলতে গিয়েছিল যে ও ইচ্ছে করে খারাপ খেলেনি। কিন্তু রুদ্র ওকে পাত্তাই দেয়নি। এইসবের মধ্যেও ওকে সেদিন বাড়িতে ফিরে হাসপাতালে যেতে হয়েছিল। এখন রাস্তার লোকেরা পর্যন্ত ওকে ম্যাচ নিয়ে উলটোপালটা প্রশ্ন করে। এ কলঙ্ক কোনও দিনও কি ওর যাবে?
এই প্রায়-সন্ধের গঙ্গার দিকে চুপ করে তাকিয়ে ছিল ও। দূরে একটা মোটরলঞ্চ আসছে। অন্ধকারে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না সেটা, কিন্তু লঞ্চের মধ্যের হলুদ আলোটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। লঞ্চের সঙ্গে সঙ্গে আলোটাও এগিয়ে আসছে ঘাটের দিকে। ওই সামান্য আলোটুকুও যদি নিজের জীবনে দেখতে পেত দিয়েগো!
“কী রে দিয়েগো, কী বিড়বিড় করছিস?” ডুডু এসে কাছে দাঁড়িয়েছে।
দিয়েগো মুখ না-ঘুরিয়ে জবাব দিল, “কিছু না এমনি।”
“শুনলাম কাকিমার শরীর খারাপ। কী হয়েছে রে?”
ডুডু জানল কী করে? দিয়েগো তো কাউকে বলেনি। ওর বাড়িতে ও বন্ধুদের যেতে বলে না। ডুডু বোধহয় বুঝতে পারল দিয়েগোর মনের ভাব। ও নিজেই বলল, “কাকুর সঙ্গে দেখা হল আজ। তখনই জানলাম। অবশ্য কাকু ডিটেলে কিছু বলেননি। ওঁর তাড়া ছিল। আচ্ছা ছেলে তো তুই। আমাদের কিছু বলিসনি। কী হয়েছে কী কাকিমার?”
দিয়েগো নিচু স্বরে বলল, “কী বলব বল? সবার জীবনেই নানা সমস্যা থাকে। অসুবিধে থাকে। সেটা বলে লাভ আছে? আর মায়ের শরীর খারাপ হয়েছে। ট্রিটমেন্ট চলছে। এর বেশি কিছু বলার নেই এ ব্যাপারে। যাক গে বাদ দে। চল বাড়ি যাই।”
দিয়েগো আর সময় নষ্ট করল না। সাইকেলটা নিয়ে বাঁধ থেকে নেমে এল। ডুডু আর জ্যাকসনও এল পেছন পেছন। শিবমন্দিরের সামনে থেকে সাইকেলে উঠে পড়ল ওরা। এতক্ষণ চুপ-করে-থাকা জ্যাকসন এবার মুখ খুলল, “আমায় একটু ইকোজিওর কয়েকটা চ্যাপ্টারের নোট দিবি ডুডু? কিচ্ছু বুঝতে পারছি না মাইরি।”
ডুডু বলল, “ঠিক আছে আমাদের বাড়িতে চল।”
“তোদের বাড়ি? মাথা খারাপ না কুমির তাড়া করেছে আমাকে? যা এক পিস ঠাকুরদা বানিয়েছিস না! ঝম্প পুরো।”
ডুডু ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “কেন? আমার ঠাকুরদা তোকে কী করেছে?”
“বল কী করতে বাকি রেখেছে? মাইরি, প্যান্টুলুন খুলে নেবার জোগাড় করে প্রতিবার। দেখা হলেই মান্ধাতার আমলের রেকর্ড বাজায়। ‘মনোময়, তুমি ব্রাহ্মণের ছেলে, গায়ত্রী মন্ত্র জানো? পইতে কই তোমার? আহ্নিক করো তো? আচমন মন্ত্র বলো দেখি।” তারপর আবার শুরু করে কোন গোত্র আমাদের, আমরা কোন শ্রেণির ব্রাহ্মণ, পইতের গ্রন্থি দিতে জানি কিনা। ওফ্! যাই বলিস ভারী বিটকেল বুড়ো। সেদিন জিজ্ঞেস করেছে আর্যভট্টের একটা বইয়ের নাম কী? ভাবলাম বলি ‘জিসম,’ তারপর ভাবলাম সেটা তো মহেশ ভট্টের প্রোডাকশনের। ডুডু, ইকোজিওর নোট দিবি না বললেই হয়। ওই ব্রাহ্মণ হিটলারের সামনে আমায় না-নিলেই হচ্ছে না?”
ডুডু প্রতিবাদ জানিয়ে কীসব বলতে শুরু করল। কিন্তু দিয়েগো আর শুনল না। ছ্যাবলামো আর ভাল লাগছে না। জ্যাকসনটা যেখানে থাকবে সেখানে ভুলভাল কথার ডিপো খুলে বসবে। কিন্তু দিয়েগো জানে একটু অদ্ভুত হলেও জ্যাকসন ছেলেটা ভাল। ওর মনে কোনও প্যাঁচ নেই। ওদের সাইকেল সাহেব কলোনির সামনে এসে পড়েছে। দিয়েগো ভাবল এবার জোরে সাইকেল চালিয়ে ও বেরিয়ে যাবে, আর দেরি করবে না। কিন্তু ঠিক সেই সময়ই একটা মেয়েলি গলার চিৎকারে আপনা আপনি তিনটে সাইকেল একসঙ্গে থেমে গেল। দিয়েগো দেখল একটা ফরসা বেশ সুন্দর দেখতে মেয়ে ডুডুর নাম ধরে ডাকছে। ওরা সাইকেল থামাতেই মেয়েটা এগিয়ে এল ওদের দিকে। বলল, “জানতাম তোকে এই রাস্তাতেই পাওয়া যাবে এরকম সময়ে। খুব দরকার আছে তোর সঙ্গে, একটু হেল্প করবি?”
ডুডু একটু অপ্রস্তুত আর নার্ভাস হয়ে বলল, “কী ব্যাপার বল তো পরী?”
“দেখ না সন্ধে হয়ে গেছে তো, আমি একা একা উষা গেটে যেতে ভরসা পাচ্ছি না। আমার সঙ্গে একটু যাবি?”
“এই সন্ধেবেলা উষা গেটে কী দরকার তোর?” ডুডু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
“এখানে না। চল, যেতে যেতে বলছি।” ডুডু একবার দিয়েগো আর একবার জ্যাকসনের দিকে করুণ চোখে তাকাল। তারপর যেন ইচ্ছে নেই এমন ভাবে বলল, “চল তা হলে।”
ওরা চলে যেতেই জ্যাকসন দিয়েগোকে বলল, “ওরেব্বাস। এই মেয়েটার হাত ধরেই তো সেদিন দাঁড়িয়ে ছিল ডুডু। শালা নামেও পরী, দেখতেও পরী, আর ফিগার দেখেছিস? মাইরি, আমাদের কপালে পরী তো দূরের কথা একটা ডাইনিও জোটে না রে। ডুডু মেয়েটাকে তুলে ফেলল?” জ্যাকসন ওর সরু গলায় কথাটা এমন তারস্বরে বলল যে একটু দূরে দাঁড়ানো ফুচকাওলার কাছে ফুচকা খেতে আসা দুটো মেয়ে ঘুরে তাকাল। দিয়েগো ধমক দিয়ে বলল, “কী সবসময় শালাটালা বলে কথা বলিস? চারপাশের লোকজন দেখে কথা বলবি তো।”
জ্যাকসন ফিক করে হেসে বলল, “সরি গুরু, ভুল হয়ে গেছে।”
দিয়েগো প্যাডেল করতে গিয়ে দেখল ফুচকাওলার সামনে দাঁড়ানো দুটো মেয়ের মধ্যে যাকে দেখতে ভীষণ সুন্দর, সে ফুচকার পাতাটা হঠাৎ মাটিতে ছুড়ে সাহেব কলোনির গেটের দিকে হাঁটতে শুরু করল। অন্য মেয়েটা থতমত খেয়ে জোরে ডাকল, “সায়েকা, এই সায়েকা, কী হল? ফুচকাটা খেয়ে যা! কী রে হঠাৎ কী হল তোর? তুই-ই বললি ফুচকা খাবি। এখন হঠাৎ কী হল? এই সায়েকা।”
দিয়েগো আর দাঁড়াল না। রাস্তার ঘটনা দেখলে ওর হবে না। ওর দেরি হয়ে যাচ্ছে।
ওর মায়ের বায়োপসির রিপোর্ট আসার কথা আজ সন্ধের সময়। মা এখন বাড়িতেই আছে। দিয়েগো ভাবল মায়ের কি সত্যি ক্যান্সার হয়েছে? দিয়েগো কিচ্ছু ভাবতে পারছে না। ও দ্রুত সাইকেল চালাতে লাগল। যদিও মায়ের কাছে মিনতিদি আছে। মানে মিনতিদি সবসময় মায়ের কাছেই থাকে, মাকে দেখাশুনো করার জন্যে। তবু আজ রিপোর্ট আসবে বলেই যেন ভেতরে একটা চাপ অনুভব করছে দিয়েগো। বাজারে কী দরকার আছে বলে মল্লিকবাজারের মোড় থেকে ডানদিকে চলে গেল জ্যাকসন। আর তার একটু পরে বটতলার কাছে এসে সাইকেলের স্পিড় কমিয়ে দিল দিয়েগো। বা বলা যায় কমাতে বাধ্য হল ও। কারণ ও দেখল সামনেই রুপাই আসছে।
ওকে দেখে রুপাইও দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর দিয়েগোকে অবাক করে ওর দিকে এগিয়ে এল। দিয়েগোর গলা শুকিয়ে কাঠ। হাঁটু দুটোও কাঁপছে। মেয়েটা ওর দিকে আসছে! রূপাই ওর সামনে এসে সামান্য হাসল, জিজ্ঞেস করল, “তুমি ক’দিন স্যারের কাছে পড়তে যাওনি কেন?”
কথাটা সত্যি। দিয়েগো স্যারের কাছে ক’দিন যায়নি। ও বলল, “না, মানে এমনি।”
“শরীর ঠিক আছে তো?”
“হ্যাঁ।” ছোট্ট করে উত্তর দিল দিয়েগো। আসলে ও অনেক বড় করে অনেক কিছু বলতে চাইছিল, কিন্তু সেই এক সমস্যা। কে যেন ষড়যন্ত্র করে ওর মুখে ব্লটিং পেপার ঢুকিয়ে দিয়েছে আবার। রুপাই আবার জিজ্ঞেস করল, “তোমায় খুব ডিস্টার্বড দেখাচ্ছে। আর ইউ শিয়োর এভরিথিং ইজ অলরাইট?”
“না, না, সব ঠিক আছে।” দিয়েগো কোনওমতে বলল।
রুপাই শ্রাগ করল। তারপর বলল, “ও কে। যদি ওই ক্লাসের নোটগুলো তোমার লাগে আমায় বোলো, আমি দেব।”
ধন্য হয়ে গেল যেন দিয়োগো। রুপাই নিজের হাতের লেখা নোটস দিয়েগোকে দেবে? মেয়েটা কী ভাল! মনে মনে রুপাইকে একটা লম্বা চুমু খেল দিয়েগো আর বাস্তবে বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ। আমার খুব উপকার হবে।”
রুপাই অসাধারণ হাসি দিল একটা। বলল, “বাই দেন। টেক কেয়ার।” রুপাইয়ের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে দিয়েগো ভাবল এবার থেকে সরকারের উচিত নিয়ম করে এই মেয়েটার হাসি বন্ধ করে দেওয়া। আর একবার হাসলেই দিয়েগো মারা পড়ত। কিন্তু আবার মনে পড়ে গেল যে মায়ের রিপোর্ট আসবে আজ। দিয়েগো ঘড়ি দেখল, হয়তো রিপোর্ট এসেও গেছে। ও আবার সাইকেল ছুটিয়ে দিল।
বাড়িটা আজ কেমন যেন অন্ধকার আর চুপচাপ লাগল দিয়েগোর। এমন তো থাকে না। সন্ধেবেলা ওদের বাড়ির সব ঘরের আলোই জ্বালানো থাকে। ব্যাপার কী? সাইকেলটা কোনওরকমে উঠোনে রেখে দ্রুত ঘরে ঢুকল ও। মা বিছানায় শুয়ে। বাবা বসে আছে পাশে। সামনের চেয়ারে ডাক্তারকাকু। আর ডাক্তারকাকুর হাতে ধরা একটা বড় সাদা কাগজ। দিয়েগো দেখেই বুঝল ওটা রিপোর্ট। কিন্তু কী লেখা আছে ওতে? মায়ের কি সত্যি গ্রাসনালির ক্যান্সার ধরা পড়েছে? দিয়েগো বাবার মুখের দিকে তাকাল। বাবার চোখ দুটো দেখে থমকে গেল ও। ঠিক সেই সময়ে ডাক্তারকাকু হাতের সাদা কাগজটা রেখে গম্ভীর গলায় বললেন, “শুনুন মিস্টার আংরে…” টেনশনে হৃৎপিণ্ডটা মনে হল মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসবে। দিয়েগো যেন আবার ছোট্ট হয়ে গেল, চোখ বন্ধ করে মনে মনে বলতে লাগল, “ঠাকুর, সব ঠিক করে দাও, প্লিজ মাকে বাঁচিয়ে দাও, প্লিজ… আর কোনওদিন কিচ্ছু চাইব না তোমার কাছে।”
