ন্যাড়া ক’বার বেলতলা যায়? একবার? উঁহুঁ, না। তার মাথায় যতক্ষণ না বেল পড়ে ততক্ষণ সে বেলতলায় যায়। কিন্তু ওর মাথায় তো দু’-দু’বার বেল পড়েছে তবু ওর বেলতলায় যেতে ইচ্ছা করে কেন? কথাটা ক’দিন ধরেই খুব ভাবাচ্ছে টাপুরকে। তা বলে টাপুর ন্যাড়া নয়। অবশ্য মাঝে মাঝে ও ভাবে ওকে যা দেখতে, ন্যাড়া হলেও বাজারের ডিমান্ড গ্রাফটা নীচের দিকে নামবে না। আর হলিউডের অনেক নায়িকাই তো ন্যাড়া হয়েছেন। সে ডেমি মুর থেকে শুরু করে নাটালিয়া পোর্টম্যান পর্যন্ত। তা বলে টাপুরের ন্যাড়া হওয়ার ইচ্ছে মোটেও নেই। ন্যাড়া আর বেলতলার কনসেপ্টটা সুকুমার রায় ব্যাপক নামিয়েছিলেন। ছোটবেলায় পড়ে টাপুর বুঝত না, কিন্তু এখন বোঝে। বিশেষ করে এই কবিতাটায় একটা লাইন আছে, “ঠোঙা ভরা বাদাম ভাজা/ খাচ্ছে কিন্তু গিলছে না।” এইটা একদম খুনখারাপি লাইন। কী করে অত দিন আগে একজন ঠিক টাপুরের মনের কথাটা লিখে দিলেন? এটা কি ম্যাজিক? আসলে এখন টাপুরের ঠিক এই ‘খাচ্ছি কিন্তু গিলছি না’-র দশা। কিচ্ছু ভাল লাগে না ওর। পড়ায় মন নেই, খেতে ইচ্ছা করে না, বন্ধুবান্ধবদের ভাল লাগে না, এমনকী সাজতে যে এত ভাল লাগত, সেটাও এখন বন্ধ। ওর বাবা রিসেন্টলি দু’সপ্তাহের জন্য বেলজিয়াম গিয়েছিল। সেখান থেকে ওকে ম্যাক্স ফ্যাক্টরের কমপ্লিট কসমেটিক কিট এনে দিয়েছে। কিন্তু টাপুর ওসব ছুঁয়েই দেখেনি। দূর, ওর আর ভাল লাগছে না। মা পর্যন্ত টাপুরকে দেখে অবাক। কিন্তু টাপুর পাত্তাই দেয়নি। ওর সারাদিন মাথায় শুধু একটা কথাই ঘোরে, ওর খালি মনে পড়ে যায় আবছা গলির মধ্যে পুরু ওর চিঠিটা ছিঁড়ে ফেলছে, এই দৃশ্য। একটা অদ্ভুত জ্বালা শুরু করে ওর হাতের আর পায়ের তলায়। মনে হয় কে যেন ক্রমাগত ওর বুকে সরু পিন দিয়ে খুঁচিয়ে চলেছে। কেন এমন হয়? মানুষ যেটা পায় না সেটার জন্যই কেন সবসময় মন খারাপ হয়? টাপুরের মনে পড়ে যায় টেবিল ল্যাম্পের আলোয় বসা শান্ত একটা মুখ। ওই মুখটা নিজের দু’হাতে ধরতে চায় টাপুর। নিজের দুই বুকের মধ্যে ওই মুখটার গরম নিশ্বাস পেতে চায় ও। শীতের ভোরবেলায় ঘুম ভেঙে টাপুর কোলবালিশটা টেনে নেয় শরীরের মধ্যে। ওর মনে হয় এটাই পুরু। ও ধীরে ধীরে কোলবালিশের সঙ্গে নিজের শরীর ঘষে। প্রাণপণে মনে করতে থাকে সেই শান্ত মুখটার কথা। ক্রমশ শরীরের শীত কেটে যায়। ভেতরে ভেতরে একটা তোলপাড় ঘটতে থাকে। ক্রমশ সিক্ত হয়ে ওঠে ও। এই কম্পন, এই সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠাটুকু টাপুর ভীষণভাবে নিজের করে রাখে। অনেকক্ষণ বালিশে মুখ চেপে শুয়ে থাকে ও। একসময় শরীরের শীত ফিরে আসে। জানলার ফাঁকফোকর দিয়ে দু’-চারটে রোদের টুকরো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে বিছানায়। টাপুর দেখে রোদ নয়, সেই চিঠির ছেঁড়া টুকরোগুলোই যেন।
আজ কিন্তু টাপুর তৈরি। আজ পুরুর সাধ্য নেই ওকে ফেরায়। একটা জেদ চেপে গেছে ওর। তার মধ্যে ডিমের কুসুমের মতো থইথই কুয়াশা মাখা জ্যোৎস্না আজ চারিদিকে। এই আলো, এই কুয়াশা… আজ পুরুকে বধ করবেই ও। টাপুরের উত্তেজনা হচ্ছে। ওর দামি ফ্লিসের জ্যাকেটের মধ্যেও সামান্য ঘামছে ও। ঘামের ফোঁটাগুলো চামড়ার ওপর দিয়ে গড়িয়ে নামছে। অল্প শিরশিরানি, অল্প কম্পন। ওর মনে হচ্ছে যেন পুরুর আঙুলগুলোই ওকে হালকা করে ছুঁয়ে যাচ্ছে।
আজ টুপুরের পড়া নেই তবু বেরোতে হয়েছে। শিমুল কী বিশেষ এক কারণে ওকে ডেকে পাঠিয়েছে। সকালেই শিমুল ফোন করেছিল। কী সব নাকি দরকার আছে ওর সঙ্গে। শিমুল নাকি খুব কষ্টে আছে। কয়েক সপ্তাহ আগে একটা ঘটনা ঘটেছে, সেটা নাকি এখন মহীরুহের আকার নিয়েছে। সেটা নিয়ে টাপুরের সঙ্গে কথা আছে শিমুলের।
টাপুর জানে শিমুলটা একটু পাগলি আছে। তা ছাড়া মুখচোরা, ইন্ট্রোভার্ট টাইপ। কখনও নিজের কথা অন্যকে বলে না। আর সেইজন্যই একটু আশ্চর্য হচ্ছে টাপুর। কী এমন ঘটনা ঘটল যে শিমুল ওর সঙ্গে পরামর্শ করতে চায়।
সন্ধের এই সময়টা এইখানে, মানে এই আশিসদার টাইপ স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে বিরক্ত লাগে টাপুরের। রাজ্যের লোক রাস্তা দিয়ে যাবার সময় এমন করে তাকায় যে গা-ঘিনঘিন করে। এইসব লোকজনের মুখচোখ দেখে টাপুর ভাবে যে ভারতে জনবিস্ফোরণ আশ্চর্য কিছু নয়।
যাক, ওই তো শিমুল আসছে। দূর থেকে শিমুলকে দেখতে পেল টাপুর। চোখে চশমা। চুলটা কোনওমতে বাঁধা। গায়ে একটা পঞ্চো। শিমুলের ড্রেস সেন্সটা আর ঠিক হল না। উনিশশো কুড়ি সালের মতো পঞ্চো গায়ে বেরিয়েছে। ভুলভাল পোশাক দেখলে গা পিত্তি জ্বলে যায় টাপুরের।
শিমুল ওর কাছে এসে দাঁড়াল। ওকে দেরি করার জন্য আর বিটকেল পোশাকের জন্য ঝাড় দিতে গিয়েও দিতে পারল না টাপুর। শিমুলের কী হয়েছে? চশমার ভেতর দিয়েই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে চোখদুটো লাল আর ফোলা ফোলা। খুব কেঁদেছে মেয়েটা। টাপুর আস্তে করে শিমুলের হাত ধরল, “কী হয়েছে, শিমুল?”
সামান্য কথাতেই আবার চোখের লকগেট খুলে গেল। শিমুলের দু’গাল এখন বন্যা কবলিত এলাকা। শিমুল টাপুরকে জড়িয়ে ধরে হুহু করে কাঁদতে লাগল। মহা মুশকিল। ভর সন্ধেবেলা রাস্তার মধ্যে কেউ এভাবে কাঁদে? আবার বিনা পয়সার সিনেমা দেখার জন্য দর্শক জমে যাবে। টাপুর জোর করে শিমুলকে ছাড়াল, বলল, “রাস্তায় সিন ক্রিয়েট করিস না, চল ওই দোকানটায় বসি।”
সামনেই নামকরা একটা স্ন্যাক্সের দোকান হয়েছে। ওখানে বসে খাওয়াও যায় যেমন, তেমন ‘টেকহোম’-ও আছে। ওই দোকানেই ঢুকল ওরা। দোকানে ভিড় নেই তেমন। কোনার দিকে একটা ছেলেমেয়ে বসে প্রেম করছে আর কফি খাচ্ছে। ওদের থেকে কিছুটা দূরত্ব রেখে টাপুর আর শিমুল বসল। যা শীত পড়েছে কফি খাওয়া যেতেই পারে। টাপুর দুটো কফি আর চাইনিজ শিঙাড়া অর্ডার করল। এই শিঙাড়াটা অদ্ভুত। ভেতরের পুরটা নুডুলস্ দিয়ে করা।
এবার ও শিমুলের দিকে মনোযোগ দিল। মেয়েটা কেমন যেন নেতিয়ে রয়েছে। টাপুর জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে এবার গুছিয়ে বল তো।” শিমুল এতক্ষণ মাথা নিচু করে বসে ছিল, এবার টাপুরের কথায় মুখ তুলল। এ কী! টাপুর দেখল শিমুলের দু’চোখে আবার জল টলটল করছে। টাপুর চোয়াল শক্ত করল, তারপর বলল, “আশ্চর্য মেয়ে তো তুই। আবার কাঁদছিস? কী হয়েছে বলবি তো?”
“আমন।” ফোঁপাতে ফোঁপাতে কোনওমতে বলল শিমুল।
“আমন মানে? আমন ধান?” যেন কিছু বুঝতে পারেনি এমনভাবে বলল টাপুর।
ভীষণ আহত হয়েছে এমন মুখ করে টাপুরের দিকে তাকাল শিমুল। যেন বলতে চাইল “এ তু ব্রুত?”
টাপুর বলল, “আচ্ছা, আচ্ছা, কী হয়েছে বল?”
“আমন আমাকে চিট করেছে।”
“মানে? চিট করেছে মানে?”
“মানে ও আমার দিদিকে পছন্দ করে। আমি ওর লেখা দেখেছি। রঙ্গনাদিকে নিয়ে সেখানে ভীষণ অসভ্য অসভ্য কথা লিখেছে।”
“অসভ্য কথা?”
অবাক হয়ে প্রশ্ন করল টাপুর। তারপর জিজ্ঞেস করল, “কী ধরনের অসভ্য কথা রে?”
শিমুল চোখের জল মুছে বলল, “সে অনেক আছে। দিদির শরীরের পুরো ডেসক্রিপশন আছে। ব্রোঞ্জের মতো বুক, পাহাড়ি ঢালের মতো পেট। গিটারের মতো কোমর। ওঃ আমি আর বলতে পারছি না। আমন এমনটা করবে ভাবতেই পারিনি। ওকে আমি এত ভালবাসি আর ও আমার দিদির পেছনে ঘুরছে। তুই বল টাপুর, ছেলেরা সত্যিই খারাপ হয়।”
টাপুর গম্ভীর হয়ে বলল, “তুই কী বলছিস তুই জানিস? আমন তোকে চিট করেছে? কী করে? তুই কি কখনও তোর ফিলিংস ওকে জানিয়েছিস?”
“না। আমি মেয়ে না? আমি কেন বলব? ও আমায় প্রোপোজ করবে।” শিমুল ঠোঁট ফুলিয়ে বলল।
টাপুর হাসল, “বাঃ কী গুণের কথা! গাধা, তোর ফিলিংস তো আমন জানেই না। ও বুঝবে কী করে যে তুই ওকে ভালবাসিস?”
“কেন ও বোঝে না? ওর ঘর গুছিয়ে দিই, বাড়িতে কোনও ভাল কিছু রান্না হলে ওর জন্য নিয়ে আসি। আমার পকেটমানি বাঁচিয়ে ওকে পেন কিনে দিই, ও তাও বোঝে না? এসব কি আমি রাস্তার ছেলেদের জন্য করি?”
“সে তুই জানিস রাস্তার ছেলেদের জন্য করিস কিনা? আর কোথায় বলা আছে যে মেয়েরা প্রোপোজ করতে পারবে না? যদি আমনকে তোর ভাল লাগে তা হলে সেটা গিয়ে ডাইরেক্ট বল না ওকে। এখানে কেঁদে কেটে ন্যাকামো করছিস কেন?”
ধ্যাতানি খেয়ে শিমুল থমকে গেল। বলল, “কীভাবে বলব?”
“কেন, মুখ নেই তোর? মুখ দিয়ে বলবি।”
“না না, সে তো ঠিক। কিন্তু কীভাবে বলব? আর তুই বল, আমার দিদিকে যার পছন্দ তার আমায় ভাল লাগবে কেন? আমি কি অত সুন্দরী না সেক্সি?”
“এই তো আবার ফালতু কথা বলছিস। শোন, তুই ততটাই সুন্দরী যতটা তুই নিজেকে ভাবিস আর ঠিক ততটাই সেক্সি যতটা তুই নিজেকে হতে অ্যালাউ করবি। শিমুল গ্রো আপ। স্টপ ব্রুডিং। জানিস জীবনে সবচেয়ে লো পয়েন্ট কখন আসে? যখন মানুষ নিজেকে ‘পিটি’ করে। ডোন্ট ফিল সরি ফর ইয়োরসেলফ। তোর যা ভাল লাগে সেটা তোকেই ছিনিয়ে নিতে হবে। শিমুল, তুই খুব ভাল। শুধু তুই নিজেকে ঠিকমতো প্রেজেন্ট কর, দেখবি আমনের তোকে ভাল লাগবেই। জাস্ট ছোট ছোট জিনিসের অ্যাডভান্টেজ নিতে হয় জীবনে। আর সোজা আঙুলে ঘি না-উঠলে আঙুলটা সামান্য বাঁকাতে হয়। বুঝলি?”
“কীভাবে হবে এসব? তুই বল একবার।”
“ডোন্ট বি অ্যান অ্যাশ শিমুল। সেটা তোকেই চক আউট করতে হবে। শুধু, বি কনফিডেন্ট।” কথা থামিয়ে টাপুর ভাবল, ওঃ অনেকখানি লেকচার দিয়ে ফেলেছে। আসলে ওর ভেতরে যে এত কথা জমে ছিল ও নিজেই জানত না। আজ কীসের থেকে কী যে হল। শিমুলকে অনেক কিছু বলে ফেলল। ও যে আজ ভেতরে ভেতরে উত্তেজিত হয়ে আছে এটা কি তারই বহিঃপ্রকাশ?
কিন্তু আর বসে থাকলে চলবে না। ওর একটা কাজ আছে। একবার ঘড়ি দেখল টাপুর। প্রায় আটটা বাজে। আর মিনিট দশেকের মধ্যে ওকে এক জায়গায় পৌঁছোতে হবে। ও উঠে পড়ল। হ্যান্ডব্যাগ থেকে বিলের টাকা টেবিলে রেখে শিমুলকে বলল, “আজ একটু কাজ আছে, আমি আসি। আর যা বললাম মনে রাখবি। এখন থেকে নো কান্নাকাটি। চোখের জল সস্তা, না?” শিমুল একটু হাসল। যাক মেঘ সামান্য হলেও কেটেছে।
ওরা একসঙ্গে দোকান থেকে বেরোল। সামনের রাস্তায় একটা ফাঁকা রিকশা দেখে দাঁড় করাল টাপুর। তারপর শিমুলকে বলল, “আজ আসি। কাল স্কুলে দেখা হবে কেমন? চিয়ার্স।” শিমুল অল্প হেসে নিজের বাড়ির দিকে চলে গেল। টাপুর আর সময় নষ্ট না-করে উঠে বসল রিকশায়। এবার ওর গন্তব্য ডাক্তার ভটচাযের গলি। ও জানে ওখানেই একজন ছাত্র পড়াতে যায় পুরু, সেই পড়ানোর সময় শেষ হয়ে এল প্রায়। কী করে জানল? সেটা ‘টাপুরস ওয়ে’। কুশের থেকে দু’দিন আগে কথাটা বের করেছে টাপুর। অবশ্য শুধু এটুকুই নয়, আরও অনেক কথাই বের করেছে।
সেদিনের কথা মনে পড়ায় হেসে ফেলল টাপুর। হয়েছিল কী, বাটার নিজস্ব জুতোর দোকান ‘বাটা বাজার’ থেকে এক জোড়া জুতো কিনে রিকশা করে ফিরছিল ও। শীতের সন্ধে, টমাস বাটা অ্যাভিনিউয়ের মার্কারি ভেপার ল্যাম্পগুলো জ্বলছিল। উত্তরে, গঙ্গার দিক থেকে ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছিল একটা। বাটা কোম্পানির মেন গেট পেরিয়ে রিকশাটা যখন বাটা স্টেডিয়ামের সামনে তখনই হঠাৎ কুশকে দেখতে পেয়েছিল টাপুর। সামনের একটা দোকান থেকে কিছু কিনছে। পাশে রাখা ওর মোটরবাইক। ওকে দেখেই চিড়িক করে মাথায় একটা আইডিয়া এসেছিল টাপুরের। পেয়েছে, ও পুরুর সম্বন্ধে জানার জন্য সোর্স পেয়েছে। টাপুর রিকশাটা থামাতে বলেছিল সঙ্গে সঙ্গে।
কেন জানে না, কিন্তু টাপুরের ভেতরে সেদিন পুরুকে দেখার পর কেমন একটা তোলপাড় চলছে। তাই কি বলে ‘ওল্ড ফ্লেমস ডাই হার্ড।’ যেন তেন প্রকারে ওর পুরুকে চাই। কিন্তু পুরুও অনড়। ও কিছুতেই সেই চিঠির অপমান ভুলতে পারে না। আর একটা চিঠি ক’দিন আগে ও দিয়েছিল পুরুকে। পুরু সেটা না-পড়েই ছিঁড়ে ওকে ফেরত দিয়েছিল। টাপুরের প্রচণ্ড খারাপ লেগেছিল বলাটা আন্ডার স্টেটমেন্ট হবে।
কুশকে দেখেই তাই মাথায় আইডিয়াটা এসেছিল। একটা হলিউডের সিনেমায় টাপুর দেখেছিল কোনও কিছুকে জিততে হলে তার ইনস অ্যান্ড আউট সম্বন্ধে জানতে হয়। কারণ তা হলেই একমাত্র জয় সম্ভব। এই ইনফরমেশনটাই হল ভাইটাল। এখানে ছোট থেকে ছোট খবরও অনেক বড় কিছু জানাতে পারে। পুরুর সম্বন্ধে টাপুর প্রায় কিছুই জানে না। ব্যাপারটা অদ্ভুত হলেও সত্যি। তাই পুরুর সম্বন্ধে জানতে হবে।
কুশ ভূত দেখলেও বোধহয় এর চেয়ে কম চমকাত। এমনিতেই শেষ সাক্ষাৎটা ভালই মনে ছিল কুশের। তার ওপর সন্ধেবেলা, স্টেডিয়ামের সামনে হঠাৎ করে চোখের সামনে টাপুর। ভিন গ্রহের প্রাণী এলে বোধহয় এত ভ্যাবাচ্যাকা না-খেয়ে কুশ দু’গেম ক্যারাম খেলে নিত।
কোনও ভণিতা না করে টাপুর কুশকে বলল, “তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে। তোমার সময় হবে?”
ভ্যাবাচ্যাকা ভাব তখনও পুরোটা কাটেনি কুশের, ও বলল, “আমি আজ কিছু করিনি। প্লিজ আমায় ছেড়ে দাও।” টাপুর হাসল, “ভয় পাচ্ছ কেন? তোমার থেকে আমার কিছু কথা জানার আছে। সেইজন্যই বলছি, তোমার সময় হবে?” এতক্ষণে ভরসা পেল কুশ, বলল, ‘অফ কোর্স। আয়াম অল ইয়োরস।” অন্য সময় হলে এর একটা মোক্ষম জবাব দিত টাপুর। কিন্তু না, এখন ওর কুশকে দরকার। ফলে টাপুর ওর সবচেয়ে ভাল হাসিটা বের করে আনল আর দেখল এতক্ষণ ভয়ে অর্ধমৃত কুশ এবার ভাললাগার চোটে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে।
“আচ্ছা, পুরু সম্বন্ধে তুমি যা জানো বলো।” টাপুর কথাটা বলেই ভাবল স্কুলের ইতিহাসের কোয়েশ্চন পেপারের মতো হয়ে গেল ব্যাপারটা। কিন্তু কুশের সেদিকে খেয়াল নেই। ও তখন টাপুরের সামনে ওর জ্ঞান ভাণ্ডার উজাড় করতে ব্যস্ত। এক-এক করে টাপুর জেনে গেল পুরুর আর্থিক অবস্থার কথা, ফ্যামিলির কথা, ওর ফুটবলার না-হতে পারার কথা। এমনকী পুরু ক’টা টিউশন করে সেটাও সবিস্তারে টাপুরকে জানিয়ে দিল কুশ। তারপর নিজের পজিশন হাইলাইট করতে ও টাপুরকে বলল, “আসল কথাটাই তো তোমায় বলা হয়নি। ও যে নঙ্গী হাইস্কুলে টেম্পোরারি গেমস টিচার হয়েছে সেটা তো আমিই করিয়ে দিয়েছি আমার জেঠুকে বলে। আসলে বুঝলে তো আমার মন মার্জারিনের মতো কোলেস্টরল ফ্রি আর নরম। কারও দুঃখই আমি দেখতে পারি না। আরও একটা খবর দিই তোমায়। পুরুর সম্বন্ধেই খবর, তবে পুরু এখনও জানে না।”
“মানে?” এবার টাপুরকে অবাক হওয়ার পালা।
কুশ একটা সিগারেট ধরাল এবার, তারপর ধোঁয়ার গোল্লা ছাড়ল কয়েকটা। শীতের কুয়াশার মধ্যে নীল ধোঁয়ার গোল্লাগুলো বড় হতে হতে ছড়িয়ে গেল চারিদিকে। এই রাস্তাটায় গাড়িই চলে মূলত। পায়ে হাঁটা মানুষেরা কমই যায় এখান দিয়ে। টাপুরের আর কুশের সঙ্গে কথা বলতে ভাল লাগছে না। কিন্তু কী করবে? ওর পুরুর সম্বন্ধে তথ্য দরকার। কুশ আবার শুরু করল, “আসলে পরের নঙ্গী হাই আর রবিন মেমোরিয়ালের ফুটবল ম্যাচটা পুরুর পরীক্ষা। নঙ্গী যদি জেতে তবে পুরুর চাকরিটা পাকা হবে। জেঠুই বলল আমায়। অবশ্য পুরুকে বলতে বারণ করেছে ব্যাপারটা। ঠিক সময়েই ওকে জানানো হবে।” কথাটা শেষ করে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে গোপন খবর ফাঁস করে দিয়েছে এমন মুখ করে হাসল কুশ। “পাঁঠা,” মনে মনে ভাবল টাপুর। তারপর ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ টাইপের হাসি ছুড়ে বলল, “আচ্ছা, ওকে বুধবার সন্ধেবেলা কোথায় পাওয়া যায়?”
কুশ খানিক চিন্তা করে বলল, “বুধবার করে ওর পড়ানো থাকে। আটটা-সওয়া আটটা নাগাদ ভট্টাচার্যের গলিতে ওকে পাওয়া যাবে, সে সময় ও পড়িয়ে ফেরে।” তারপরই কী মনে হওয়াতে কুশ জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, এত সব তুমি জিজ্ঞেস করছ কেন বলো তো?” টাপুর এর উত্তরে আলতো করে ঠোঁট মোচড়াল, তারপর কুশের হাতটা হালকা করে ছুঁয়ে বলল, “এমনি।” কুশের মুখ দেখে বুঝল বিদ্যুৎটা ঠিকঠাক পৌঁছে দিতে পেরেছে ও। কুশ আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি সেদিন। ওই হাতের ছোঁয়াটুকুই ওকে চুপ করিয়ে দিয়েছিল। টাপুর শুধু মনে মনে বলেছিল “বুধবার।”
আজ সেই বুধবার। এখন সময় সাতটা আটান্ন। ভট্টাচার্যের গলির সামনে রিকশাটা ছেড়ে দিল টাপুর। তারপর গিয়ে দাঁড়াল একটু অন্ধকার একটা কোনায়। এই গলিটা সব সময়ই বেশ নির্জন। টাপুর যেখানে দাঁড়িয়ে আছে তার পাশেই নতুন বাড়ি তৈরি হচ্ছে একটা। ইট সিমেন্টের হালকা গন্ধ পাচ্ছে টাপুর। বাড়িটা শেষ হতে আরও বেশ কিছু দিন লাগবে। বুড়ো রাক্ষসের মুখের মতো ফাঁকা দরজা জানলা দেখে কেমন গা ছমছম করল টাপুরের। সত্যি বলতে কী ওর একটু ভূতের ভয় আছে। এই গলির ভেতরে একদম অন্য মাথায় একটা স্ট্রিট বালব্ জ্বলছে। তার দরিদ্র আলোয় গলিটা একদম গোয়েন্দা গল্পের থেকে তুলে আনা মনে হচ্ছে। টাপুর ঘড়ি দেখল। আটটা পাঁচ। পুরু কই? তবে কি আজকে পড়াতে আসেনি? সামান্য অধৈর্য হয়ে পড়ল টাপুর। তবে কি ওর সমস্ত আয়োজন মাঠে মারা যাবে? পুরু কি আসবে না? আরেকবার ঘড়ি দেখল টাপুর। আর তারপর মুখ তুলতেই দেখল গলির অন্য প্রান্ত থেকে একজন সাইকেলে আসছে। মানুষটার সাইকেলে বসার ভঙ্গিটা দেখেই শরীরে কাঁটা দিল টাপুরের। এ-ভঙ্গিটা ওর চেনা। সেই ক্লাস নাইনে ওর ঘরের জানলা দিয়ে এই মানুষটাকে দেখত টাপুর। আজ এই দু’বছর বাদেও বুকের মধ্যে নাগরদোলার ঘুর্ণনটা একই রকম লাগল টাপুরের। ও মনে মনে বলল, “পুরু, আজ আর প্লিজ আগের মতো কোরো না।” সাইকেলটা ক্রমশ কাছে এগিয়ে আসতে লাগল ওর।
