কমল স্যার আজ একদম সজুত হয়ে গেছেন। আর কোনওদিন অসভ্যতা করবেন না। বেশ ক’দিন ধরে তক্কে তক্কে ছিল ও। আজ অ্যায়সা দিয়েছে না, বাপের নাম ভুলিয়ে ছেড়েছে। ব্যাটার পট্যাটো হাইল ডিফেক্টিভ ছিল, যাকে বলে পি এইচ ডি। আজ সব শেষ করেছে। এক ধাক্কায়। যদি লজ্জা থাকে তবে আর কোনওদিন এসব করবেন না।
টাপুর কাঠি দিয়ে আলুকাবলির আলু তুলল একটা। ওঃ দারুণ বানায় নেপালদা। আ জেনুইন ওয়ার্ক অব আর্ট। হাতটা সোনা দিয়ে মুড়িয়ে দিতে হয়। তিন টাকা, চার টাকা, যে যেমন বলবে ঝটাঝট নামিয়ে দেবে টক-ঝাল আলুকাবলি। মাঝে মাঝে পাতাটাও খেয়ে নিতে ইচ্ছে করে টাপুরের। তা বলে ও গোগ্রাসে খায় না। খায় একটা একটা করে, আস্তে আস্তে, তারিয়ে তারিয়ে। শিমুলটা এসব কিছু খায় না। ওই দেখ না, কেমন মুখ করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। এক্ষুনি বলবে, “আলুকাবলির টক জলটা ড্রেনের থেকে নেওয়া।” টাপুর হাসল, “কী রে! খাবি নাকি শিমুল?”
“ইস, দেখলেই মনে হয় অম্বল হয়ে যাবে। খাস কী করে তুই?” শিমুল মুখ ব্যাঁকাল।
“আবার পৃথিবীতে জন্মাতে হবে তোকে, বুঝলি? যমরাজ যদি শোনে তুই পৃথিবীতে ফুচকা, আলুকাবলি, পাঁপড়ি চাট খাসনি, তা হলে তোকে আবার ফেরত পাঠাবে।” টাপুর নেপালদাকে টাকা দিতে দিতে বলল।
এবছরই মাধ্যমিক পাশ করে ইলেভেনে উঠেছে ওরা। এখন পড়াশুনোর তেমন চাপ নেই। তবে ডিসেম্বরের শেষে ফার্স্ট টার্ম আছে। শিমুলটা অবশ্য এখন থেকেই তেড়ে পড়াশুনো শুরু করেছে। পুয়োর গার্ল। টাপুর নিজের মনেই হাসল। “বেশি হাসিস না আজ। স্যারের সঙ্গে যা করলি, সেটা ঠিক হল?” শিমুল টেনস্ড গলায় প্রশ্ন করল।
“একশোবার ঠিক হয়েছে। উনি যা করতেন সেটা কি ঠিক ছিল? বুড়োটাকে ডোজ না দিলে চলছিল না।”
ঘটনাটা সত্যিই কেলেঙ্কারির। কমল স্যারের বয়স প্রায় পঞ্চান্ন-ছাপ্পান্ন বছর। উনি কলকাতার নামী একটা স্কুলে পড়ান। আর প্রাইভেটে, বাটানগরের ‘স্টাডি এড’ কোচিং সেন্টারে ইলেভেন টুয়েলভের স্টুডেন্টদের ফিজিক্স পড়ান। উনি টিচার হিসেবে দারুণ। স্যারের কাছে পড়ার জন্য তাই ভীষণ ভিড় হয়। কিন্তু এসবের মধ্যে একটা সমস্যা আছে— স্যার মেয়েদের একটু বেশি করে পড়ান বা পড়েন। মানে গায়ে পড়েন। সামান্য ছুতোনাতায় তাদের গায়ে হাত দেন। স্যারের হাত মাঝে মাঝে বিপদ সীমাও ছুঁয়ে ফেলে। এতে সব মেয়েরাই অস্বস্তিতে পড়ে কিন্তু স্যারের এত নাম-ডাক, এত খ্যাতি যে কেউ এ ব্যাপারটা নিয়ে মুখ খোলে না।
টাপুর সবসময়ই একটু খোলামেলা জামাকাপড় পরে। মা রাগারাগি করলেও ও পাত্তা দেয় না। ছেলেরা লোভীর চোখে তাকাবে? তাকাক না, টাপুরের বয়ে গেছে। কমল স্যারের কাছে পড়তে আসার আগে টাপুর স্যারের এই ব্যাপারটা সম্বন্ধে শুনেছিল, কিন্তু ভেবেছিল বোগাস। বাবার চেয়ে বয়সে বড় একটা লোক এরকম হতে পারে? তাই আমল দেয়নি। কিন্তু ক্লাসে জয়েন করার চারদিনের মাথায় কথাটা যে সত্যি সেটা বুঝল। সেদিন টাপুর একটা অনেকখানি পিঠ কাটা চুড়িদার পরে এসেছিল। স্যার পড়াতে পড়াতে টাপুরের পাশে এসে দাঁড়ালেন। টাপুর এমনিতেই খুন-খারাপি দেখতে, তার উপর অমন ড্রেস। ব্যস! স্যার পিঠে হাত দিলেন। বলতে লাগলেন, “কী রে যা বললাম বুঝেছিস?” বলতে বলতে পিঠে হাত বোলাতে লাগলেন। স্যারের আঙুলের মাথা থেকে যে লোভ ঝরে পড়ছে সেটা ভালভাবে বুঝলেও টাপুর কিছু বলতে পারছিল না, আবার সহ্যও করতে পারছিল না। জানোয়ার একটা, মনে মনে ভেবেছিল টাপুর। সেদিন থেকেই ব্যাটাকে ঝাড় দেবার তালে ছিল। আর সেটাই সম্পূর্ণ করেছে গত দু’দিনে। একদম স্ট্রাটেজিকালি।
গত দিন টাপুর টিউশনে এসেছিল শাড়ি পরে। আর পরেছিল ফুলহাতা ব্লাউজ। ক্লাসে বসেও ছিল শাড়ির আঁচল দিয়ে পিঠটিঠ ঢেকে। শুধু মুখটুকু দেখা যাচ্ছিল ওর। ঠিক মনে হচ্ছিল কাপড়ের পুঁটলি। সবাই জিজ্ঞেসও করেছিল ব্যাপার কী? ও কোনও উত্তর দেয়নি। সেদিন স্যার টাপুরের ধারে কাছেও মাড়াননি। আজ আজকেই ছিল কাহানি মে ট্যুইস্ট। টাপুর পরে এসেছিল স্লিভলেস ডিপকাট টপ আর টাইট জিনস্। “আগুন, আগুন” বলে রাস্তায় কিছু ছেলে আসার পথে আওয়াজ দিচ্ছিল। একজন চিৎকার করে উঠেছিল “দমকল কো বোলাও”। যথারীতি স্যারও সব স্টুডেন্টকে ছেড়ে আজ টাপুরকেই বেশি বোঝাচ্ছিলেন। বোঝাতে বোঝাতে স্যার যখন প্রায় ওর পিঠে হাত দিয়ে ফেলেছেন, ঠিক তখনই নিরীহ মুখে টাপুর বলল, “স্যার, একটা কথা জিজ্ঞেস করব? গত দিন তো আপনি আমার কাছে এসে এত বোঝাননি। আজ আমায় এত বোঝাচ্ছেন কেন? আজ আমায় দারুণ লাগছে, তাই না?” স্যারের চোয়াল বোয়াল মাছের মতো খুলে গেল। সারা ক্লাস চুপ। শুধু টাপুর হাসছে। দিয়েছে বুড়োর নুড়ো জ্বেলে। টাপুর এরকমই। ওর যা ইচ্ছে হয় ও করে। ওর সঙ্গে চালাকি নয়। স্যার আর না পড়িয়ে বেরিয়ে গেছেন ক্লাস থেকে।
শিমুল আবার বলল, “একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছিস আজকে।”
টাপুর কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “কিচ্ছু বাড়াবাড়ি হয়নি। চরিত্রের স্কু ঢিলে হয়ে গিয়েছিল, একটু টাইট দিয়ে দিয়েছি, ব্যস। আর ছাড় তো, তুই এত টেনস্ড হচ্ছিস কেন? সবটাতে ভয় পেলে চলে?” শিমুলটা এরকমই। সবসময় ‘কী হয়, কী হয়’ ভাব। একবার ক্লাস নাইনে পড়ার সময় ওর পিছনে একটা লোফার টাইপের ছেলে লেগেছিল। মানে রাস্তায় দেখলেই শিমুলকে উত্ত্যক্ত করত। পিছনে পিছনে সাইকেল নিয়ে যেত। এমনকী ওদের পাড়ার মোড়েও দাঁড়িয়ে থাকত। শিমুল তো ভয়ে আধমরা। একটা সময় এল যখন প্রায় দু’সপ্তাহ স্কুলই গেল না ও। ওর বাবা-মা কত বোঝাল। ওর দিদি রঙ্গনা, কত সাহস দিল। কিন্তু কে শোনে কার কথা? শিমুল রাস্তায় বেরোলই না। তখন খুব সাহায্য করেছিল রুদ্র। টাপুর রুদ্রকে বলেছিল ব্যাপারটা। কারণ রুদ্রকে বলা যায়। ছোট থেকে রুদ্র টাপুরের দাদার মতো। টাপুর রুদ্রর স্কুলেই পড়ে এক ক্লাস নীচে। অবশ্য রুদ্র কমার্স আর টাপুর সায়েন্স।
রুদ্রই বাঁচিয়েছিল সেবার। ছেলেটাকে ডেকে নিয়ে গিয়ে কী করেছিল কে জানে। ছেলেটা আর শিমুলমুখো হয়নি। রুদ্রকে জিজ্ঞেস করাতে বলেছিল, “জানবি সব জিনিসের ওষুধ আছে। আমার বয়স হয়তো কম, কিন্তু আমি ওষুধগুলো জানি। আর ঠিকঠাক অ্যাপ্লাই করি।” রুদ্র এমনই, ভীষণই আপরাইট। কীভাবে কাজ হাসিল করতে হয় জানে। এইজন্যই তো টাপুর এত পছন্দ করে রুদ্রকে। ও মাঝে মাঝে ভাবে রুদ্র যদি ওর নিজের দাদা হত! ও রুদ্রর জন্য সব করতে পারে।
ওদের পাড়ার গলিতে শিমুল ঢুকে গেল। ওর নাকি পড়াশুনো করতে হবে। পারেও বাবা মেয়েটা। কিন্তু টাপুর এখনই বাড়িতে যাবে না। ওর মােবাইলের কার্ড ফুরিয়ে গেছে, রিচার্জ করাতে হবে। পকেটমানি হিসেবে ওর বরাদ্দ মাসে হাজার দেড়েক টাকা আর সাড়ে চারশো টাকার মোবাইলের কার্ড। টাপুর জানে ইচ্ছে করলেই ওর বাবা ওকে পাঁচ হাজার টাকা হাতখরচও দিতে পারে। ওর বাবার লেদার এক্সপোর্টের বিজনেস, এ ছাড়া পেট্রল পাম্পও আছে একটা। বাটানগরের লোকে বলে যে ওর বাবা টাকার কুমির। বাটানগরে ওদের বাড়িটাই চারতলা। বাড়ির মধ্যে কিচেন গার্ডেন থেকে শুরু করে সুইমিং পুল সব আছে। ওরা ইচ্ছে করলেই কলকাতায় গিয়ে থাকতে পারে। কিন্তু বাবার সব ব্যাবসাই এই অঞ্চলে। তা ছাড়া টাপুরের মা কলকাতায় থাকতেই পারবে না। এত জায়গা, বাড়ির সামনে বাগান, কলকাতায় পাবে কোথায়?
মোবাইলটা রিচার্জ করিয়ে দোকান থেকে বেরােতেই ছেলেটাকে দেখল টাপুর। আজও মোটরবাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রায়ই দাঁড়িয়ে থাকে। টাপুর জানে অনেক ছেলেই ওকে দেখে কিন্তু এরকম রুটিন মেনে কেউ ওকে ফলো করে না। ডিসগাস্টিং! হঠাৎ রোখ চেপে গেলে টাপুরের। আজ একটা বুড়ো রোমিওকে টাইট দিয়েছে, এবার ছোঁড়া রোমিওর পালা। টাপুর সোজা এগিয়ে গেল মোটরবাইকের দিকে।
ছেলেটা বেশ লম্বা, মুখে একটা ওভার কনফিডেন্ট ভাব। টাপুর জানে এদের কীভাবে শায়েস্তা করতে হয়। ছেলেটার সামনে গিয়ে টাপুর গম্ভীরভাবে প্রশ্ন করল, “কী ব্যাপার বলো তো? তুমি সবসময় আমায় ফলো করো কেন?” কোনও আপনি টাপনি নয়, সোজা তুমি দিয়ে শুরু করল, যাকে বলে একেবারে অ্যাটাকিং মোড। টাপুর দেখল ছেলেটার চোখে মুখে একটা ভ্যাবাচ্যাকা ভাব। টাপুর বুঝল ছেলেটা এই আকস্মিক আক্রমণে ঘাবড়ে গেছে। ও আরও চেঁচিয়ে প্রশ্ন করল, “কী হল, বলছ না কেন? সবসময় বাইক নিয়ে আমায় ফলো করো কেন? কী মতলব তোমার? জবাব দাও।”
“না মানে… আমি মানে… তোমার পিঠটা ইয়ে…” ছেলেটা ঠোঁট চাটছে।
“পিঠ? আমার পিঠটা কী? ইতর, অসভ্য জানোয়ার ছেলে।” টাপুর তারস্বরে চেঁচাতে শুরু করল।
“না, মানে… পিঠটা… মন্দিরা বেদীর… মানে আমার পিসিমার কথা মনে পড়ছে…”
“আমার পিঠ দেখে পিসিমার কথা মনে পড়ছে? পারভার্ট।” ছেলেটা ভুলভাল বকছে দেখে টাপুর ওর গলার ভলিউম আরও দু’ঘর বাড়িয়ে দিল। প্রায় সন্ধে সাতটা বাজে। এই অঞ্চলটা লোকজনে ভরতি হয়ে আছে। চিৎকার চেঁচামেচি শুনে অনেকেই বিনা পয়সায় সার্কাস দেখতে ভিড় জমিয়ে ফেলেছে। একজন জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে। এই ছোকরা কি তোমায় বিরক্ত করছে?” টাপুর জানে সুন্দরী মেয়েদের সাহায্য করার লোকের অভাব পৃথিবীতে নেই। লোকটার দেখাদেখি আরেকজন এগিয়ে গিয়ে ছেলেটার কলার ধরল। “কী রে শুয়োরের বাচ্চা! মেয়েদের দেখলেই খচড়ামো করতে ইচ্ছে হয়? ইভটিজিং? আঁ?”
ছেলেটা এবার বলল, “আমি তো কিছু বলিনি। এখানে বসে ছিলাম। ওই তো এসে ধমক ধামক দিতে শুরু করল।”
“শুরু করল? অ্যাঁ, এমনি শুরু করল? মামদোবাজি?” লোকটা মারার জন্য হাত তুলল। টাপুর দেখল কেলেঙ্কারি, এমনটা হোক ও চায়নি। ছেলেটাকে একটু কড়কে দিলেই হত। এ তো রীতিমতো ঝামেলা শুরু হয়ে গেল। এর মধ্যে পরিচিত কেউ দেখে বাবাকে লাগিয়ে দিলেই সমস্যা হবে। বাবা ভালর ভাল, কিন্তু টাপুর সম্বন্ধে কোনও খারাপ রিপোর্ট এলে দারুণ রেগে যায়। টাপুর পৃথিবীতে এই একটা লোককেই ভয় পায়। টাপুর এবার সেই ভয়টাই পেল। কিন্তু ওর আর কিচ্ছু করার নেই, পুরো ঘটনাটাই ওর হাতের থেকে বেরিয়ে গেছে। সামান্য একটা ছেলেকে শিক্ষা দিতে গিয়ে পুরো কেসটাই জন্ডিসে কনভার্ট করেছে। এখন কী করে এটা সামলাবে টাপুর ভেবে পেল না।
ঠিক তখনই ভিড় ঠেলে এগিয়ে এল একজন। একহারা চেহারা, গম্ভীর মুখ। এতদিন পরেও ওকে দেখেই টাপুরের পেটের মধ্যে প্রজাপতি ওড়াউড়ি করতে শুরু করে দিল, মনে হল কেউ যেন ওকে বড় ইলেকট্রিকের নাগরদোলায় চড়িয়ে দিয়েছে। বুকের মধ্যে হৃৎপিণ্ডটাও গতি বাড়িয়ে দিল হঠাৎ। টাপুর ওকে চেনে, খুব ভাল করে চেনে। ও পুরু।
বাটানগরের সাধারণ লোকেরা অনেকেই পুরুকে চেনে। ভাল ফুটবলার হওয়ার সুফল এখনও পায় পুরু। টাপুর অবাক হয়ে দেখল মারমুখী ভিড়টা পুরুর সামনে কেমন নেতিয়ে পড়ল। ছেলেটা যে পুরুর বন্ধু বুঝল টাপুর। অনায়াসেই বন্ধুকে বের করে নিয়ে গেল পুরু। ছেলেটার নাম শুনল কুশ। ছাড়া পেয়ে ফুল স্পিডে বাইক চালিয়ে কুশ বেরিয়ে গেল। আর থাকে? ভিড়টাও আর নেই। বিশেষ কিছু হল না দেখে পাবলিক একটু হতাশ হয়েছে, বুঝল টাপুর। দেখল ঝামেলা মিটিয়ে পুরুও চলে যাচ্ছে। এ সুযোগ ছাড়া যায় না। ও দৌড়ে গেল।
“আপনাকে যে কী বলে ধন্যবাদ দেব?” টাপুর পুরুর পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলল।
“কিচ্ছু বলে নয়। তুমি বাড়ি যাও।”
“কেন, আমার সঙ্গে হাঁটতে আপনার খারাপ লাগছে?”
“হ্যাঁ। তুমি বাড়ি যাও।”
“আপনি এমন করে বলছেন কেন?”
“তুমি আমার সামনে থেকে যাও টাপুর।” পুরু এবার রূঢ় গলায় বলল।
“কিন্তু কেন? কবে কী হয়েছে সেটা এখনও মনে রেখে দিয়েছেন?” টাপুরের গলাটা ওর নিজের কাছেই অদ্ভুত শোনাল। পুরু আর কোনও কথা না-বলে পাশের রবীন্দ্র সুইমিং ক্লাবের অন্ধকার গলিতে ঢুকে গেল। টাপুর বুঝল বৃথা চেষ্টা। মনটা খারাপ হয়ে গেল। নাঃ এবার বাড়ি যাবে। কিচ্ছু ভাল লাগছে না। কেন যে সেদিন টাপুর অমন করেছিল! মাথায় যে কী ভূত চেপেছিল তখন! এখনও সেদিনের কথা মনে পড়লে লজ্জা পায় টাপুর।
বেশি নয়, বছর দুয়েক আগের কথা। সদ্য ফুটবল ছেড়ে পুরু তখন টিউশন শুরু করেছে। সে সময় পুরু এসেছিল টাপুরকে পড়াতে। ইতিহাস আর বাংলা। টাপুর তখন ক্লাস নাইনে পড়ে। পড়াতে এসে পুরু খুব কম কথা বলত। যেটুকু পড়াতে গেলে দরকার তার বাইরে বিশেষ কথা বলত না। এককাপ চা-ও খেত না ওদের বাড়িতে। টাপুর দেখত একদম চুপচাপ মানুষ একটা। খুব অবাক লাগত ওর। টেবিল ল্যাম্পের আলোয় বসে থাকা অল্পবয়সি কিন্তু গম্ভীর মানুষটার দিকে একটা কারণহীন টান অনুভব করত টাপুর। কোনও দিনও নিজের বয়সি ছেলেদের ভাল লাগত না টাপুরের। ভাবত ওর পছন্দের মানুষটা হবে গম্ভীর, ম্যাচিওর্ড। দুটো কথাতেই সে দু’হাজার মানে বুঝিয়ে দিতে পারবে।
টাপুরের মনে হয়েছিল পুরু সেরকমই। তখন সবসময় পুরুর কথা মনে পড়ত ওর। পুরু একদিন কামাই করলে পুরো পৃথিবীটাকেই তছনছ করে দিতে ইচ্ছে করত ওর। মাস পাঁচেকের মাথায় খুব সাহস কবে একটা প্রেমপত্র লিখেছিল ও। তারপর ইতিহাস বইয়ের ভাঁজে রেখেছিল সেটা। বইটা সেদিন পুরুর নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। সে টাপুরের একটা টেস্ট নেবে, তার প্রশ্ন বানাবে সেখান থেকে।
সপ্তাহে দু’দিন টাপুরকে পড়াত পুরু। চিঠিটা দেবার পরের দিনে পড়ার দিকে তাকিয়ে বসে ছিল টাপুর। একই সঙ্গে ভাললাগা আর ভয় কাজ করছিল। খেতে বসে খিদে নেই, রাত্রে ঘুম আসতে চাইত না কিছুতেই। কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করত না। সারাদিন মনখারাপ হয়ে থাকত ওর। সবার সঙ্গে অকারণে ঝগড়া হত। সাইকেলের শব্দ পেলেই ভাবত পুরু এসেছে।
তারপর সত্যিই পুরু এল। সন্ধের দিকে সাইকেলের মৃদু ঘণ্টা শুনেই বুঝল টাপুর। পড়ার ঘরে যেতে পা যেন সরছিল না ওর। কিন্তু ঘরে গিয়ে দেখল সেই গম্ভীর চুপচাপ একটা মানুষ। সেদিন কী যে পরীক্ষা দিল টাপুর, ভগবান জানে! অশোক হয়ে গেল সমুদ্রগুপ্তের ছেলে। রানা প্রতাপকে নিয়ে গেল ঔরঙ্গজেবের সময়ে। হর্ষবর্ধন হয়ে গেল বাংলার প্রথম সুলতান। কিন্তু টাপুর দেখল পুরু চুপচাপ, যেন কিছুই হয়নি। একসময় পরীক্ষা শেষ হল। পুরু উঠে দাঁড়াল। চলে যাওয়ার ঠিক আগে পুরু নরম কিন্তু গম্ভীর গলায় বলল, “টাপুর, এই চিঠিটা ফিরিয়ে নাও। আর এরকম কোরো না কখনও। তোমার সামনে বছর মাধ্যমিক। পড়ায় মন দাও।” ব্যস আর কিছু নয়। চিঠিটা ভাঁজ করে টেবিলে রেখে দিয়ে চলে গিয়েছিল ও। চোখ ফেটে জল এসে গিয়েছিল টাপুরের। এত অপমান! নিজেকে কী ভাবে ও? সাধুপুরুষ? টাপুরের ভালবাসার কোনও দাম নেই? দাঁড়াও দেখাচ্ছি মজা।
দু’দিন পরে টাপুরের বাড়ির কাজের লোক ডেকে নিয়ে গেল পুরুকে। টাপুরের মা আগুনের মতো মুখ করে বসে ছিল। বাবা সেসময় বাইরে গিয়েছিল কাজে। টাপুর মাকে বলেছিল পুরু ওকে নোংরা চিঠি লিখেছে। অনেক কু ইঙ্গিত-ভরা এক চিঠি। পুরুর হতভম্ব মুখ দেখে খুব আনন্দ হয়েছিল টাপুরের, ভেবেছিল বেশ হয়েছে। টাপুরের মা “ছোটলোক, ইতর, জানোয়ার” যা খুশি বলে অপমান করেছিল পুরুকে। পালটা একটা কথারও জবাব দেয়নি পুরু। মুখ নিচু করে উঠে গিয়েছিল শুধু। সেদিন সারারাত ঘুম আসেনি টাপুরের। বারবার মনে পড়ছিল শান্ত আর গম্ভীর একটা মুখ। জানলা দিয়ে ঠিকরে আসা জ্যোৎস্না ছড়ানো বিছানায় শুয়ে কখনও আনন্দে কখনও দুঃখে খুব কেঁদেছিল ও। এ কি জয় না পরাজয় বুঝতে পারছিল না ও। কারণ টাপুর জানত পুরু আর কোনওদিন ওদের বাড়িতে আসবে না।
বাবা ফিরে আসার পর মা সব বলেছিল বাবাকে। বাবা এসে টাপুরের কাছে চিঠিটা দেখতে চাইল। হাতের লেখাটা মিলিয়ে দেখল টাপুরের হাতের লেখার সঙ্গে। টাপুর হাতের লেখা পালটে চিঠিটা লিখেছিল। কিন্তু চিঠিটা যে নকল সেটা বাবার ধরতে সময় লাগল না। টাপুরকে দু’-চারটে প্রশ্ন করে বুঝেও নিল ব্যাপারটা। বরাবরের মতো টাপুর বাবার সামনে মিথ্যে বলতে পারল না। বাবার চোখ দুটোর দিকে তাকালে কেমন অবশ হয়ে যায় টাপুর।
সব শুনে বাবা ভীষণ রেগে গিয়েছিল। জীবনে প্রথমবার টাপুর চড় খেয়েছিল সেদিন। বাবা বহুদিন কথাও বলেনি টাপুরের সঙ্গে। পরে বাবা নিজে পুরুর কাছে গিয়ে টাপুরের হয়ে ক্ষমা চেয়ে এসেছিল। টাপুরও পুরুর সঙ্গে কথা বলতে চেষ্টা করেছিল। পুরু কথাই বলেনি। টাপুর নিজের সব দোষ স্বীকার করেছিল। তবু পুরু একটুও নরম হয়নি। পাথরের মতো মুখ করে ফিরিয়ে দিয়েছিল টাপুরকে।
আজকেও ঠিক তাই হল। পুরু কি কোনও দিনও ভুলতে পারবে না ব্যাপারটা? টাপুর ওদের পাড়ায় ঢুকল। দেখল লোডশেডিং। বাটানগরে এই এক ঝামেলা। তবে ওর চিন্তা নেই। ওদের জেনসেট আছে। অন্ধকারের মধ্যে ওদের বাড়িটিকে আলো ঝলমলে জাহাজের মতো লাগল টাপুরের। বাড়ির দিকে দু’পা এগোতেই পেছন থেকে একটা গলা পেল টাপুর, “এই যে রেন ড্রপ! তোমার গানের খাতাটা ফেলে এসেছিলে, নিয়ে এসেছি।” ওফ আবার! পেছনে না-ঘুরেই টাপুর বুঝল গলাটা কার। কবীর আজও এসেছে!
