পাতাঝরার মরশুমে – ১৮

“বল তো কোন জিনিস লাল আর ট্রিং ট্রিং ট্রিং শব্দ করে?”

“লাল? ট্রিং ট্রিং ট্রিং করে? কে জানে।”

“পারলি না তো? টমেটো।” জ্যাকসন চিকলেট মুখে পুরে বলল।

“টমেটো? ভাগ, টমেটো ট্রিং ট্রিং ট্রিং করে কোথায়?” কবীর খিঁচিয়ে বলল।

“আরে ট্রিং ট্রিং ট্রিং ব্যাপারটা তো তোকে মিসগাইড করার জন্য বলা।”

কবীর থতমত খেয়ে গেল। দিয়েগোর হাসি পেল খুব।

জ্যাকসনটা পারে বটে। ও শুনল জ্যাকসন আবার প্রশ্ন করছে, “বল তো কোন জিনিস লাল আর ট্রিং ট্রিং শব্দ করে?”

“আবার? পারব না।” কবীর এবার হাত তুলে দিল।

জ্যাকসন কায়দার হাসি দিয়ে বল, “কলিংবেল।”

“মানে? ইয়ারকি? কলিংবেল লাল?” এবার ডুডু চোখ পাকিয়ে প্রশ্ন করল।

“আরে লাল ব্যাপারটা তো তোদের মিসগাইড করার জন্য বলা।”

ডুডু চোখ ছানাবড়া করে তাকিয়ে থাকল। জ্যাকসন আবার প্রশ্ন করল, “আচ্ছা বল তো কোন জিনিস লাল আর ট্রিং ট্রিং ট্রিং শব্দ করে?”

এবার আমন বলল “কী বলছ না তুমি!”

“কেন বল।” জ্যাকসন আবার বলল।

“পারব না।”

জ্যাকসন ঠোঁট চেপে হাসি আটকে বলল, “কেক।”

“কেক? কেক লাল আর ট্রিং ট্রিং ট্রিং করে? মারব শালা।”

কবীর আবার খিঁচিয়ে উঠল।

“আরে লাল আর ট্রিং ট্রিং ট্রিং দুটোই তো তোদের মিসগাইড করার জন্য বলা।” জ্যাকসন শান্তভাবে বলল। সত্যি এই না হলে জ্যাকসন। জ্যাকসন আবার বলল, “এবার লাস্ট কোয়েশ্চন। বল তো কোন জিনিস লাল আর ট্রিং ট্রিং ট্রিং শব্দ করে?”

দিয়েগো এবার নিজে বলল, “তোর মাথা।”

“না, দমকলের গাড়ি। পারলি না তো। লাল আর ট্রিং ট্রিং শব্দটা তোদের ক্লু দেবার জন্যই তো বলা।” জ্যাকসন খ্যাক খ্যাক করে হাসতে লাগল।

দিয়েগো মাথা তুলে দেখল লাল চিল ঘুড়িটা আজও উড়ছে। রাধাকাকু আর বোঁ ঘুড়িটা ওড়ায় না। এখন বাটানগরের মাথায় লাল ঘুড়িটা ওড়ে। দিয়েগোর মনে হয় যেন আকাশ থেকে আগুন রঙের এক পাখি বাটানগরকে লক্ষ রাখছে।

প্র্যাকটিস শেষ হয়েছে কিছুক্ষণ হল। আর দিন আটেক বাকি আছে ম্যাচের। পুরু জোর কদমে প্র্যাকটিস করাচ্ছে এখন। আজও প্র্যাকটিস হয়েছে ভাল। তারপর নিজেদের মধ্যে টিম করে খেলাও হয়েছে। দিয়েগো এবার পুরুর কথা শুনে প্র্যাকটিস করছে। আসলে পুরু যা করেছে ওর জন্য! কিন্তু গত কয়েক দিন হল দিয়েগো লক্ষ করেছে পুরু যেন কেমন আনমনা। সব কিছুই করছে কিন্তু কোথায় যেন ফাঁক। আগে পুরু প্র্যাকটিসের পর একটু বসে কথাটথা বলত, কিন্তু এখন প্র্যাকটিস শেষ হলেই পুরু চলে যায়। কী ব্যাপার দিয়েগো বুঝতে পারে না।

ডুডু হয়তো দিয়েগোর মনের কথাটাই ধরতে পারল। বলল, “আজকাল একটা ব্যাপার লক্ষ করেছিস? পুরু স্যার কেমন জানি হয়ে গেছেন, না? একটু গম্ভীর, একটু অন্যমনস্ক, ঠিক না?”

কবীর বলল, “যা বলেছিস। কী কেস বল তো?”

জ্যাকসন তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলল, “আমি জানি কী কেস।”

“তুমি তো মাল সব জানো শালা সবজান্তা গামছাওলা।”

কবীর জ্যাকসনকে হ্যাটা করে বলল।

জ্যাকসনও পালটা বলল, “আমি তো আর তোর মতো ক্যালানে নই যে কিছু জানব না। আমার কাছে খবর আছে।” দিয়েগো দেখল কবীর আর জ্যাকসনের আবার গন্ডগোল লাগছে। কিন্তু ও কিছু বলল না। কবীর এখনও ওর সঙ্গে ভালভাবে কথা বলে না। দিয়েগোর খারাপ লাগে। ছোটবেলার বন্ধু সবাই এরা। আর এরাই ওকে বিশ্বাস করে না। তবে আগে যেমন কবীর দিয়েগোর সামনেই থাকত না, সেটা এখন হয় না। ওরা এক আড্ডায় বসে কিন্তু কেউ কারও সঙ্গে কথা বলে না।

কবীর জানতে চাইল, “কী খবর আছে তোর কাছে?”

“তোকে বলব কেন? খুব চুলকানি, না? স্যারের খবর শুনতে খুব ভাল লাগে?” জ্যাকসন কবীরকে ভেঙিয়ে বলল।

ডুডু ব্যাপারটা সামাল দিতে বলল, “স্যারের কোনও কেসফেস নাকি?”

“কেস বলে কেস? একদম সুটকেস। সেই যে রে মনে নেই, সেই তিমিরের ব্যাপারটা। সেই যে ছিনতাই হল। স্যার অরণ্যদেবের রোল প্লে করলেন।” জ্যাকসন ঝুকে বসে গোপন তথ্য ফাঁস করার মতো করে বলল।

“তো?” ডুডু ব্যাপারটা বুঝতে না-পেরে জিজ্ঞেস করল।

দিয়েগো ব্যাপারটা শুনেছিল, তবে জ্যাকসন কী বলতে চাইছে সেটা বুঝতে পারল না।

“ডুডু, তুই সত্যিই দুদুভাত। পুরু স্যার ফেঁসে গেছেন। সেই যে সেই রোহিণী। যার ব্যাগ স্যার উদ্ধার করলেন।” জ্যাকসন হেসে বলল।

“তুমি কী করে জানলে?” আমন এবার জিজ্ঞেস করল।

“আরে আমি নিজে দেখেছি। স্যার, ওই রোহিণীর পেছনে ঘুরছেন।”

“মানে এখনও কেসটা পাকেনি?” কবীর জানতে চাইল।

জ্যাকসন বলল, “না। ওয়ান সাইডেড অ্যাফেয়ার। স্যার দেখেই সন্তুষ্ট। আরে সেইজন্যই তো স্যার এমন টাল খেয়ে গেছেন।”

দিয়েগোর আর ভাল লাগছিল না। পুরু ব্যক্তিগত জীবনে কী করছে। সেটা তো অন্য কারও দেখার কথা নয়। ও জ্যাকসনকে বলল, “থাম তো। ফালতু কথা যত সব। সামনে খেলা আর পরীক্ষা। সেটায় কনসেন্ট্রেট কর।”

কবীর চাপা গলায় বলল, “হুঁ, কে বলছে দেখ।” দিয়েগো পাত্তা দিল না। ও ঠিক করে নিয়েছে যে এ ব্যাপারে আর কোনও রিঅ্যাক্ট করবে না। সেকেন্ড ফেব্রুয়ারির ম্যাচটায় সমস্ত উত্তর দিয়ে দেবে ও। এবার লোক দেখবে কেন ওকে দিয়েগো বলা হয়।

মাঠ থেকে উঠে পড়ল দিয়েগো। ওর একটা কাজ আছে। দু’দিন হল মা বাড়িতে এসেছে। সব শেষে ডাক্তাররা ধরতে পেরেছিলেন যে ইন্টারন্যাল আল্যার্জি হয়েছিল মায়ের। আর তার ফলে গলার ভেতরে ঘা হয়েছিল। অ্যালার্জিটা হয়েছিল দুধ থেকে। মা তো লিকুইড খেত শুধু। আর তার মধ্যে দুধটাই প্রধান। কেউ বুঝতেই পারেনি, যে-খাদ্যটা প্রধানত মা খাচ্ছে, সেটার থেকেই শরীরটা খারাপ হচ্ছে। ভাগ্যিস শেষ মুহুর্তে ব্যাপারটা ধরা পড়েছিল, তাই তো মা সুস্থ হওয়ার পথে। অবশ্য এর মধ্যে পুরুর অবদানও অনেকখানি। দিয়েগো ভাবল সেদিন যদি পুরুর সঙ্গে ধাক্কা না-লাগত তা হলে অত রাতে কোথায় পেত এবি নেগেটিভ রক্ত।

কোনওদিন দিয়েগো ভুলতে পারবে না সেই সন্ধেটার কথা। মাকে দেখে ডাক্তার বলেছিলেন ব্লাড লাগবে। এবি নেগেটিভ। সেটার স্টক বাটা হাসপাতালে নেই। সাধারণত কোনও জটিল কেস এলে বাটা হাসপাতাল রোগীকে কলকাতার এস এস কে এম হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু মায়ের শারীরিক অবস্থা এমনই ছিল যে বাটা থেকে এস এস কে এম-এ যাওয়ার ধকল মা নিতে পারত না। ফলে বাটা হাসপাতালের ডাক্তারই নামকরা সিনিয়ার ডাক্তারদের, সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁদের আনিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বয়স্ক আর গম্ভীর ডাক্তারবাবুই কিছু নতুন টেস্ট করে উদ্ধার করেছিলেন মূল রোগ। আর দিয়োগোদের বলেছিলেন রক্ত দিতে হবে মাকে। মায়ের ব্লাড গ্রুপ অনুযায়ী এবি নেগেটিভ রক্ত লাগবে।

সন্ধে প্রায় আটটার কাছাকাছি ওই রেয়ার গ্রুপ কোথায় পাবে? দিয়েগোর ওরকম অসহায় বোধহয় কোনওদিন লাগেনি। ও আর বাবা মিলে যত চেনাশোনা মানুষ আছে সবার বাড়ি গিয়েছিল কিন্তু কারওই ব্লাড গ্রুপ এবি নেগেটিভ নয়। ততক্ষণে টেনশনে বাবার মুখ চোখ লাল। হয়ে উঠেছে। নিমেষে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বাবা। এক বন্ধুকে নিয়ে রওনা দিয়েছিল কলকাতায়। নিশ্চয়ই ওখানকার ব্লাড ব্যাঙ্কে এই রক্ত পাওয়া যাবে। কিন্তু ততক্ষণে যদি দেরি হয়ে যায়? দিয়েগো চিন্তা করে নিয়েছিল। জ্যাকসন। ওর প্রচুর চেনাজানা। এবার ওর সাহায্য নিতেই হবে। ওকে নিয়ে বেরিয়ে দেখবে। নিশ্চয়ই ওর চেনাশোনা কারও-না-কারও এবি নেগেটিভ রক্ত হবেই। তাই তো পাগলের মতো জোরে সাইকেল চালাচ্ছিল দিয়েগো। যে-করেই হোক জ্যাকসনকে ধরতেই হবে। একটু অন্যমনস্ক আর প্রচুর টেনশনে ছিল ও। আর তাই কি অ্যাক্সিডেন্টটা হয়েছিল?

বটতলাটা এমনিতেই অন্ধকার। সেদিন যেন আরও অন্ধকার লাগছিল। বটগাছটাও বিশাল বড়। তার নীচের গোল ছায়াটা দিনের বেলাতেও কেমন অন্ধকার অন্ধকার থাকে। আর রাতে তো কথাই নেই। সেদিন সেই অন্ধকার থেকেই হঠাৎ রাস্তায় উঠে এসেছিল পুরু। দিয়েগো শেষ মুহূর্তে দেখেছিল পুরুকে। ব্রেকও চাপার চেষ্টা করেছিল সাইকেলের, কিন্তু দেরি হয়ে গিয়েছিল ততক্ষণে। পুরু দিয়েগো আর সাইকেল একসঙ্গে পড়ে গিয়েছিল রাস্তার পাশে ঘেঁসের ওপর। বেশ রাগ হয়েছিল দিয়েগোর। এই লোকটা সবসময় মাঝখানে চলে আসে। এমনিতেই রক্তের জন্য পাগল পাগল অবস্থা। কিন্তু ও চমকে গিয়েছিল যখন ওর কথা শুনে পুরু বলেছিল, “দেন দ্য অ্যাক্সিডেন্ট প্রুভস টু বি আ গুড ওয়ান।”

পুরুর রক্তের গ্রুপ এবি নেগেটিভ! দিয়েগো আনন্দে, কৃতজ্ঞতায় কথা বলতে পারেনি। দিয়েগোকে অবশ্য কিছু বলতেও হয়নি। পুরু নিজেই এগিয়ে এসেছিল। পাঁচ মিনিটের মধ্যে ওর বন্ধু কুশের মোটরবাইকে করে পৌঁছে গিয়েছিল হাসপাতালে। ওদের পেছনে পেছনেই পৌঁছে ছিল দিয়েগো। ব্লাড ম্যাচ করিয়ে রক্ত দিতে আরও খানিকটা সময় গিয়েছিল। হাসপাতালের করিডোরে চুপ করে বসে ছিল দিয়েগো। ম্রিয়মাণ বেগুনি আলো, পালিশ ওঠা বেঞ্চ। সাদা পোশাকের নার্সদের সামান্য শব্দের সঙ্গে চলা ফেরা। হালকা ডেটল, ওষুধ আর রক্তের গন্ধও কি? প্রতিটা মুহূর্ত কে যেন টেনে লম্বা করে দিয়েছিল। মাঝে একবার হাসপাতালের পি সি ও থেকে বাবার মোবাইলে ফোন করেছিল দিয়েগো। বলেছিল যে রক্তের বন্দোবস্ত হয়ে গেছে। তবু বাবা দু’পাউচ রক্ত নিয়ে আসছে, খবর পেয়েছিল ও। দিয়েগো আবার ফিরে এসে বসেছিল করিডোরে। তখন রাত নেমে আসছে বাটানগরে।

অনেকক্ষণ পরে করিডোরের একদম অন্য মাথায় দিয়েগো দেখেছিল পুরু আসছে। ধীরে, মাথা নিচু, সামান্য দুর্বলও। ওকে দেখে বুকটা ধক করে উঠেছিল দিয়েগোর। মা ঠিক আছে তো? কাছে এসে পুরু বসেছিল ওর পাশে। ভয়ে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারেনি দিয়েগো। পাছে অন্য কোনও খারাপ খবর পুরু ওকে বলে। কিন্তু পুরুই প্রথম কথা বলল, “দিয়েগো, চিন্তা কোরো না, সব ঠিক হয়ে যাবে। ডাক্তার বললেন ঘণ্টা তিনেক অপেক্ষা করতে। লেট আস ওয়েট।”

পুরু অপেক্ষা করবে? দিয়েগো ভাবতেই পারেনি। দিয়েগো বলল, “স্যার, আপনি চলে যেতে পারেন।”

“না। আমি একটু থাকি। কুশকে বলে দিয়েছি আমার বাড়িতে যাতে খবর দিয়ে দেয়।”

“ঠিক আছে স্যার।” দিয়েগোর গলায় নার্ভাসনেস।

“আচ্ছা দিয়েগো, তুমি ঘাবড়াচ্ছ কেন? সব ঠিক হয়ে যাবে দেখো।”

“আসলে স্যার আমার কোনও কিছুই ঠিক হয় না। সব কিছু গন্ডগোল হয়ে যায় সবসময়। সব কিছুর রেজাল্টই শূন্য হয়।”

পুরু সামান্য থামল। হাসলও একটু, বলল, “আসলে জীবনকে দেখার ওপরই সব নির্ভর করে। তুমি বলছ শূন্য মানে ‘0’! জানো তো ‘0’ যদি ZERO-র শেষ অক্ষর হয়, তবে ‘OPPORTUNITY’-র প্রথম অক্ষরও। তোমাদের জীবন এখন সবে শুরু হচ্ছে। খারাপ কথা চিন্তা কোরো না।”

ব্যস এটুকুই। আর কিছু বলেনি পুরু। দিয়েগোর পাশে চুপ করে বসে ছিল। খানিক পরে বাবাও চলে এসেছিল। তবু পুরু যায়নি। মাঝরাতে নার্স এসে বলেছিল মা আউট অব ডেঞ্জার। তারপর পুরু উঠেছিল। দিয়েগো পুরুকে হাসপাতালের দরজা অবধি এগিয়ে দিয়েছিল। যাওয়ার আগে পুরু কিচ্ছু বলেনি। শুধু হেসেছিল সামান্য। দিয়েগো বুঝেছিল যে মাঝে মাঝে কথা না-বলাটাই অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রাতের অন্ধকার, হাসপাতালের সোডিয়াম ভেপারের আলো আর কুয়াশার মধ্যে একসময় মিশে গিয়েছিল পুরু। নির্জন রাতের মাঝে হাসপাতালের সেই বারান্দায় একা দাঁড়িয়ে ছিল দিয়েগো। কাছের স্ক্রুপাইন গাছের থেকে টুপ টুপ করে ঝরে পড়ছিল শিশির। আর অদ্ভুত ভাল লাগছিল দিয়েগোর। তবে কি ভাললাগাগুলো ধীরে ধীরে ফিরে আসবে?

ফিরে আসছে। সত্যিই ভাললাগাগুলো ধীরে ধীরে ফিরে আসছে। মাঠের বাইরে এসে সাইকেলে উঠল দিয়েগো। ওকে একবার ওষুধের দোকানে যেতে হবে। মায়ের একটা ওষুধের দরকার। দোকানের মালিক বুড়োদা বলেছিল কলকাতা থেকে এনে দেবে। চারটে ক্যাপসুল তিনশো নব্বই টাকা দাম। ওষুধটা কোথাও পাওয়া যাচ্ছিল না। দিয়েগো বুড়োদার দোকান থেকে ওষুধটা নিল। বুড়োদা বলল, “আর দরকার হলে একটু তাড়াতাড়ি বোলো। ওষুধটা পেতে জান বেরিয়ে গেছে। আসলে খুব দামি তো। সব স্টকিস্টের কাছে পাওয়া যায় না।” দিয়েগো মাথা নেড়ে দোকান থেকে বেরিয়ে এল। আর দেরি করবে না, আজ তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে যাবে।

নঙ্গী স্কুলের সামনের গলিটা দিয়ে শর্টকাট নিল দিয়েগো। তারপর কালিকা মিস্টান্ন ভাণ্ডারের সামনে দিয়ে বটতলা হয়ে বাড়ি চলে যাবে। পাড়ার ভেতরের এই রাস্তাটা কংক্রিট করা। তারই পাশে দু’-চারটে কচুরিপানা ভরতি পুকুর। দুটো এমন পুকুর নির্বিঘ্নে পেরোলেও তৃতীয় পুকুরটার সামনে এসে দিয়েগোর সাইকেলটা থমকে গেল। কারণ উলটো দিক থেকে রুদ্র আসছে আর ওর পাশে রুপাই। দিয়েগোর বুকটা ধক করে উঠল। প্রায় বছর দুয়েক হয়ে গেল, তবু আজও রুপাইকে দেখলেই প্রথমে বুকের মধ্যে একটা ধাক্কা লাগে দিয়েগোর। কিন্তু দু’জনে এখন কোত্থেকে আসছে? আজ তো তাপস স্যারের পড়া নেই। অবশ্য ইংরিজিও ওরা এক স্যারের কাছেই পড়ে।

রুদ্রই প্রথম কথা বলল, “এই যে মারাদোনা? কেমন প্র্যাকটিস চলছে?”

দিয়েগো সাইকেল থেকে নেমে বলল, “ভালই।”

“ব্যস, শুধু ভাল? সামনেই ম্যাচ মনে আছে তো? অবশ্য প্র্যাকটিস ভাল হলেও তোরা হারবি।”

“না, এবার হারব না।” নিশ্চিত গলায় বলল দিয়েগো।

“আচ্ছা?” রুদ্রর গলায় ব্যঙ্গ, “দেখি এবার জিতিস কী করে। মনে নেই গতবার কীভাবে জিতলাম।”

দিয়েগো শক্ত গলায় বলল, “তুই যা ভাবছিস তা নয়।”

“তাই নাকি? তবে এবার তোর হেল্‌প লাগবে না, এমনিই জিতব।” রুদ্র বাঁকা হেসে বলল।

“হেল্‌প মানে?” এতক্ষণে রুপাই প্রথম কথা বলল।

দিয়েগো দেখল বিপদ। ও রুদ্রকে বলল, “কী আজেবাজে কথা। বলছিস রুদ্র?”

“আজেবাজে কথা? জানিস রুপাই, এই দিয়েগোটা হাড় শয়তান। গতবারের ম্যাচের আগে আমায় বলে কী রুপাইয়ের সঙ্গে আমায় ফিট করিয়ে দে আমি তোদের ম্যাচ ছেড়ে দেব। আর ম্যাচে কেমন খেলেছে সেটা তো সারা বাটানগর দেখেছে।”

“রুদ্র, বাজে বকবি না, মেরে ছাল তুলে দেব।” দিয়েগো আর সহ্য করতে পারল না, আবার বলল, “জানোয়ার মিথ্যে কথা বলছিস কেন?”

“মিথ্যে কথা! রুপাই তুই বিশ্বাস কর। ও আমায় বলেছে তোকে পেতে ও যা খুশি তাই করতে পারে। তোর কোমরের খাঁজ দেখে নাকি ওর ইয়ে হয়ে যায়।” একটা অন্ধ, বোবা রাগ দিয়েগোকে গ্রাস করে নিল। ও সাইকেলটা ফেলে দিয়ে দৌড়ে এসে ঘাপ করে ঘুষি মারল রুদ্রর পেটে। এটা আশা করেনি রুদ্র। ‘মা গো’ বলে পেট চেপে বসে পড়ল রুদ্র। “শুয়োরের বাচ্চা, মাগিবাজ।” বলে চেঁচাতে লাগল। দিয়েগো এবার এগিয়ে গিয়ে বাঁ পায়ে সপাটে লাথি মারল ওর পেটে। বাঁধানো রাস্তার থেকে কচুরপানা-ভরতি পুকুরে পড়ে গেল রুদ্র।

দিয়েগো ফুঁসতে লাগল দাঁড়িয়ে। রুদ্রটা এতটা শয়তান জানত না। কিন্তু রুপাই, ও কই? হুঁশ হতে পেছনে ফিরে দেখল দিয়েগো। রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে রুপাই কাঁপছে। চোখের সামনে কোনওদিন মারামারি দেখেনি তো। দিয়েগো গিয়ে ওর সামনে দাঁড়াল, বলল, “তুমি যদি রুদ্রর কথা বিশ্বাস করো সেটা তোমার ব্যাপার। কিন্তু আমি এমন করিনি। রুদ্রই আমায় প্রস্তাব দিয়েছিল। আর সেদিন ম্যাচটা আমি ছাড়িনি। খারাপ খেলেছিলাম তাই হেরেছি। তবে একটা কথা উঠলই যখন তখন বলি, হ্যাঁ। ম্যাচটা ছাড়তে চেয়েছিলাম আমি। কারণ তোমাকে আমার খুব ভাল লাগে। কিন্তু তবু ম্যাচটা ছাড়িনি আমি। কেন ছাড়িনি কোনওদিন যদি শুনতে চাও বলব। এটুকুই সত্যি। তুমি বিশ্বাস করবে কি করবে না সেটা তোমার ব্যাপার।” রুপাই মুখ তুলে তাকাল ওর দিকে। এখন আর ভয়ে কাঁপছে না। দিয়েগোর দিকে পূর্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “আমায় ভালবাসো তুমি? আগে বলোনি কেন? শোনো, রুদ্র কী সেটা আমাকে বোঝাতে এসো না। তবে একটা কথা, তোমার সব কথা শুনব আমি। যেমন ভাবে চাও তেমন ভাবেই শুনব যদি সামনের ম্যাচটা জিততে পারো তুমি। না হলে বুঝব রুদ্র সত্যি কথাই বলেছে।” আর কোনও কথা না-বলে রুপাই পুকুরের ধারে গিয়ে হাত ধরে তুলল রুদ্রকে। রুদ্র এখন আর কথা বলছে না। বরং শীতে হি হি করছে। মাথায় একটু কচুরিপানাও লেগে আছে। রুদ্র আর রুপাই হাঁটতে হাঁটতে দিয়েগোর পাশ দিয়ে চলে গেল। যাওয়ার সময় রুদ্র শুধু চাপা গলায় বলল, “শালা দেখব সামনের ম্যাচে তুই খেলিস কী করে।”

ওরা চলে যেতে রাস্তাটা খুব শূন্য আর অর্থহীন মনে হল দিয়োগোর। মনে হল অনন্তকাল ধরে এখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে ও। যেন কোনও জায়গা থেকে ও আসেনি, কোথাও যাওয়ার নেই। এই শূন্যতার মধ্যে ওর কানে শুধু বাজতে লাগল রুপাইয়ের কথা। সামনের ম্যাচটা দিয়েগোর জীবনে অনেক কিছু বদলে দিতে পারে। দিয়েগো মাটিতে পড়ে থাকা, মাডগার্ড তুবড়ে যাওয়া সাইকেলটা সোজা করে হাঁটতে লাগল। সন্ধের অন্ধকার গাঢ় হচ্ছে মফস্‌সলে। দিয়েগোকেও যেন চারিদিক দিয়ে অন্ধকার চেপে ধরেছে আবার। ভাল লাগা আর ভাল সময়গুলোর আসার এখনও দেরি। দিয়েগো মনে মনে বলল, জীবনে অন্তত একটা খেলায় সবাই হারে। কিন্তু জীবনে তারপরও আরও খেলা আসে। মানুষ ঘুরে দাঁড়ায়। দেখা যাক দিয়েগো পারে কিনা। সাপের মতো আঁকাবাঁকা গলি দিয়ে তাোবড়ানো সাইকেল নিয়ে অন্ধকারে মিশে গেল দয়ারাম আংরে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *