“ব্যানার্জি, দেবপ্রস্থ ব্যানার্জি।” ধুত আজকেও হল না। আসলে কোনও দিনই হয় না। তবু ডুডু চেষ্টা করে মাঝেমধ্যে। একা ঘরে, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ধৈর্য ধরে বলে, “ব্যানার্জি, দেবপ্রস্থ ব্যানার্জি।” সেই কবে থেকে চেষ্টা করে যাচ্ছে নিজের নামটা এভাবে বলার। মানে সিনেমায় যেভাবে শুন কোনারি থেকে পিয়ার্স ব্রসনন বলেন, “বন্ড, জেমস বন্ড।” কিন্তু ভুডুর ভাল নামটাই এমন যে এভাবে বলতে গেলে পুরো ব্যাপারটাই মশাকে বারমুডা পরাবার মতো হয়ে যায়। ওর ঠাকুরদার রাখা নাম এই ‘দেবপ্রস্থ’। আর যাতে সেটা দেবু না হয়ে যায় সেটার জন্যই ডুডু ডাকনামটা ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়েছে। ঠাকুরদার মোটেই ইচ্ছে নয় দেবপ্রস্থ নামটার অপভ্রংশ হোক। অপভ্রংশ তো না হয় আটকানো গেল কিন্তু এই দেবপ্রস্থ নামটা নিয়েও রিসেন্টলি কম কথা শুনতে হয় না ওকে। কথা শোনা মানে অবশ্য এক জনেরই। সায়েকার।
মাস কয়েক আগে মেঘাদিদের বাড়িতে ডুডুর প্রথম আলাপ হয়েছিল সায়েকার সঙ্গে। আলাপের দিনই সায়েকা ডুডুর ভাল নাম শুনে বলেছিল, “দেবপ্রস্থ? দেবদৈর্ঘ্য নয় তো? অবশ্য দৈর্ঘ্যপ্রস্থ হলেও খারাপ হত না!” প্রথম দিনের আলাপেই ডুডু বুঝেছিল খুব বিচ্ছু মেয়ে। তাই নিজের ডাকনামটা আর বলেনি বা বলা ভাল, বলার রিস্ক নেয়নি। কিন্তু তাতে অবশ্য ডাকনামটা বেশিদিন চাপা থাকেনি। ওই মেঘাদির কীর্তি।
মেঘাদি ডুডুদের পাশের বাড়িতে থাকে। মেঘাদি খুব ভাল নাচে। খুব ভাল মানে এমন ভাল যে ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে। এখন মেঘাদি বছরে দু’বার বিদেশে যায় প্রোগ্রাম করতে। সঙ্গে যায় মেঘাদির নাচের স্কুলের বাছাই করা ছাত্রীরা। ফলে মেঘাদির নাচের স্কুলে ভরতি হওয়ার জন্য খুব রাশ হয়। মাস কয়েক হল সায়েকা এসেছে মেঘাদির কাছে নাচ শিখতে। সায়েকা ক্লাস টেনে পড়ে কলকাতার নামকরা এক স্কুলে। ডুডু প্রায় রোজই মেঘাদির বাড়িতে যায়। মেঘাদির মা ডুডুকে ছোটবেলা থেকে নিজের হাতে মানুষ করেছে, আর ভালও বাসে নিজের ছেলের মতো। সেখানেই সায়েকার সঙ্গে ডুডুর আলাপ হয়েছে।
মেঘাদিকে ডুডু, পাখি পড়ানোর মতো করে বুঝিয়েছিল মেঘাদি যেন সায়েকার সামনে ওকে ডুডু বলে না ডাকে। কিন্তু মেঘাদির কি অত মনে থাকে? দু’-তিন দিন সামলে সুমলে থাকার পরে একদিন ভুল করে মেঘাদি বলে ফেলল, “এই ডুডু, আমায় বিক্রম ঘোষের ‘রিদমস্কেপ’-টা দিয়ে যাবি তো।” আর যায় কোথায়? লোপ্পা বল পেলে কেউ ছাড়ে? তাও আবার সে যদি সায়েকা হয়?
নাচ শেষ করে সায়েকা তখন ঘরের আরেক কোনায় দাঁড়িয়ে কীসব বই নাড়াচাড়া করছিল। ‘ডুডু’ নামটা শুনেই এদিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল, “কী নামে ডাকলে মেঘাদি? ভুতু? এ বাবা সে তো জন্তু জানোয়ারদের নাম।” এ কী বিষাক্ত মেয়ে রে বাবা! মুখে কোনও রাখঢাক নেই? ডুডু যথেষ্ট গম্ভীরভাবে বলল, “তুমি কানে কম শোনো নাকি? নামটা হল ডুডু।” সায়েকা হাসল। ওফ্ মেয়েটা কেন যে হাসে! দাঁতগুলো যেন চন্দ্রানী পার্লস থেকে অর্ডার দিয়ে বানানো। তার ওপর থুতনিতে আলতো একটা ডিপ্রেশন। এরকম থুতনির মেয়ে দেখলে ডুডু নিজেই একটু ডিপ্রেসড হয়ে পড়ে। এ মেয়ে পুরো ‘ফুল অর কাঁটে, হৃদয় ফাটে’ টাইপ। তো সেরকম ডিপ্রেশন ছড়ানো হাসি ছড়িয়ে সায়েকা বলল, “না কানে ঠিকই শুনি। আসলে জন্তুদের নাম শুনে অভ্যাস নেই তো। যাক তাও ভাল যে নামটা প্রেজেন্ট টেন্স। ডিড ডিড হলেই পাস্ট টেন্স হয়ে যেত।” ডুডু দাঁত কিড়মিড় করে রাগটা হজম করে নিয়েছিল। তারপর থেকে দেখা হলেই সায়েকা ওকে হ্যাটা করে। ওর যে কী পার্সোনাল এজেন্ডা আছে ডুডুর বিরুদ্ধে কে জানে?
ডুডুকে আজকেও ডেকে পাঠিয়েছে মেঘাদি। কিন্তু যাবে কিনা ভাবছে ও। কারণ আজকে সকাল থেকেই আবার সেই গন্ধটা পাচ্ছে ভুডু। বিরিয়ানির খুব কাছাকাছি একটা গন্ধ, কিন্তু ঠিক বিরিয়ানি নয়। কোত্থেকে যে গন্ধটা ও পায় ভগবান জানে। কিন্তু যেদিনই পায় সেদিনই একটা না-একটা ঝামেলা হয়। আজও পাচ্ছে। ডুডু একটু দমে গেল। জেমস বন্ড হওয়ার ইচ্ছেটাও আর নেই। ডিসেম্বরে টেস্ট পরীক্ষা তবু এখনও ক্লাস হচ্ছে। আজ রবিবার বলে স্কুল ছুটি। ডুডু জানে মেঘাদি কেন ডেকে পাঠিয়েছে। আজ ছাত্রীদের নিয়ে নিজেদের বাড়ির ছাদে পিকনিক করছে মেঘাদি। বাইরের লোক হিসেবে ডুডুই একমাত্র নিমন্ত্রিত। ডুডু জানে সায়েকা আসবে। আর ও যায়? কিন্তু এখন দেখছে মেঘাদি ছাড়বে না। বেলা প্রায় এগারোটা বাজে, তবু ডুডু এখনও যায়নি দেখেই ওকে ডেকে পাঠিয়েছে।
কিন্তু মনটা খচখচ করছে। গন্ধটা আজ আবার কী ঝামেলা পাকাবে কে জানে। ডুডু এসবে খুব বিশ্বাস করে। ডুডু নিজে জানে যে এসব সংস্কার। তবে কু না সু সেটা জানে না। ছোটবেলা থেকেই ডুডু নিজের ঠাকুরদার ন্যাওটা। ওর ঠাকুরদা পুরনো দিনের মানুষ। পুজো না-করে জল গ্রহণ করেন না। ডুডুও ওঁর সঙ্গে থেকে থেকে এসবে ভীষণ বিশ্বাসী। ঠাকুর দেবতা তো আছেই, এ ছাড়া পূর্ণিমা, অমাবস্যা, চন্দ্রগ্রহণ, সূর্যগ্রহণ এসবও খুব মানে ও। বাড়ি থেকে বেরোবার সময় ভরা কলসি দেখা ভাল, ডান পা আগে ফেলে রাস্তায় বেরােতে হয়, খাটের সোজাসুজি আয়না রাখতে নেই, এক শালিখ খারাপ, দু’শালিখ ভাল, এসবও ডুডু মনে প্রাণে বিশ্বাস করে। সবাই ওকে খেপায়, বলে বাস্তু বিশারদ, বলে প্রাইভেট চ্যানেলে কমণ্ডলু নিয়ে বসে পড়তে। কিন্তু ডুডু ওসব পাত্তা দেয় না, কারণ ও জানে এসব অক্ষরে অক্ষরে ফলে যায়।
তবে সবচেয়ে অদ্ভুত এই “ঠিক বিরিয়ানি নয়’ গন্ধটা। এই গন্ধটা ও যতবার পেয়েছে ততবারই কোনও না কোনও ঝামেলা হয়েছে। প্রথমবার যেদিন পেয়েছিল, ডুডুর পোষা কাকাতুয়াটা মারা যায়। দ্বিতীয় বারে ওর সাইকেলটা চুরি হয়ে গিয়েছিল। আর শেষবার গন্ধটা পেয়েছিল রবিন মেমোরিয়ালের সঙ্গে ম্যাচের দিন সকালে। ও তখনই ভেবেছিল কোনও ঝামেলা হবে। কিন্তু ম্যাচটা যে হেরে যাবে সেটা ভাবতে পারেনি। দিয়েগোটা সেদিন এমন ঝোলাল যে হেরেই গেল। অবশ্য হারতই হয়তো, শনিবারের বারবেলায় খেলাটা পড়েছিল যে। আর তার ওপর ছিল অমাবস্যা। কেউ বিশ্বাস করে না বটে কিন্তু হল তো?
মেঘাদিদের বাড়ির ছাদটা খুব সুন্দর। চওড়া পাঁচিল দেওয়া শ্বেতপাথর বসানো। তারই এক কোনায় আজ রান্নার আয়োজন করা হয়েছে। ডুডু ঢুকেই রান্নার গন্ধ পেল, চাটনি হচ্ছে। যাক সেই বিটকেল গন্ধটা আর নেই। মেঘাদি ডুডুকে দেখেই দৌড়ে এল, “কী রে সকাল থেকে কোথায় ছিলি? এদিকে তোকে খুঁজছি। একটা জরুরি কাজ আছে, করে দিতে হবে, পারবি?”
“কাজ করে দিতে হবে? ও কাজ করিয়ে নিয়ে তবেই খেতে দেবে?” ডুডু মুখে একটা দুঃখ দুঃখ ভাব এনে বলল।
“মারব এক থাপ্পড়, বাঁদর কোথাকার। যা বলছি শোন, সায়েকা আসেনি। তুই গিয়ে ওকে একটু নিয়ে আয়।”
“আমি? সায়েকাকে? খেপেছ? আর রাজ্যে লোক নেই? আর ও কী এমন ভি আই পি যে নিজে আসতে পারবে না?”
“আরে বলিস না! ওর বাবা সকালে কোন এক আত্মীয়ের বাড়ি গেছে। আর ওর মা একটা জিনিস। মেয়েকে কিছুতেই একা ছাড়বে না। ভাবতে পারিস ক্লাস টেনের মেয়ে, থাকে পনেরো মিনিট দূরে, তাকে ছাড়বে না! সায়েকা তো ফোনে প্রায় কেঁদেই ফেলেছে। আমি ওর মাকে ফোনে বলে কয়ে রাজি করিয়েছি। বলেছি যে আমার এক ভাইকে পাঠাচ্ছি, ও সায়েকাকে নিয়ে আসবে, আবার পৌঁছেও দেবে। যা লক্ষ্মীটি, একবার সায়েকাকে নিয়ে আয়।”
ডুডু বুঝল ‘ঠিক বিরিয়ানি নয়’ গন্ধটার তাৎপর্য। মেঘাদিকে না করতে পারবে না ও। নাও এবার নিজের বাঁশ জঙ্গল থেকে নিজে কেটে আনো। সারাদিন ধরে হ্যাটা হও। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ডুডু জিজ্ঞেস করল, “ওর বাড়িটা কোথায়?”
“সাহেব কলোনিতে। এফ ফোর বাংলো। ওর বাবার নাম অলিপকুমার জানা। গেটে গিয়ে জিজ্ঞেস করবি, দেখিয়ে দেবে।”
ও বাবা! সাহেব কলোনিতে থাকে নাকি? সে তো ঘ্যামা জায়গা। বাটা কোম্পানির টপ বসেরা ওখানে থাকে। পাঁচিল দিয়ে ঘিরে গোটা কতক বাংলো একেবারে আলাদা করা সেখানে। ওই কম্পাউন্ডের ভেতরে বাটার অফিসার্স ক্লাব, টেনিস কোর্ট, বাস্কেট বল কোর্ট। সবাইকে ওই কম্পাউন্ডে ঢুকতে দেয় না। “মেঘাদি, আমায় কি ওখানে ঢুকতে দেবে?” ডুডু ওর সংশয় জানাল।
“দূর বোকা! সায়েকার মা তো গেটে বলে রাখবে। তুই ফালতু চিন্তা করছিস। নে চট করে গিয়ে ওকে নিয়ে আয়।”
ডুডু বুঝল না করে কোনও লাভ নেই আর। ও বেরিয়ে পড়ল। আকাশটা যেন নীল টাইলস্ বসানো এক সুইমিং পুল। যেন এখুনি একফোঁটা জল গায়ে এসে পড়বে। এর মধ্যে ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে বেশ। শীত প্রায় চলে এল। এ সময় বাটানগর ভীষণ সুন্দর হয়ে ওঠে। চারিদিকে গাছপালার রং বদলাতে শুরু করে। সবুজ থেকে ধীরে ধীরে পাতারা লাল-হলুদ হয়ে ওঠে। আর সারাদিন অল্প অল্প করে পাতারা ঝরে পড়ে নীচে। রাস্তার দু’পাশে ধীরে ধীরে জমে ওঠে ঝরা পাতার স্তূপ। বিদেশ হলে একে বলা হত ‘ফল’। কিন্তু এখানে বলা হয় হেমন্ত। সেই নামটাও দারুণ। এসবের মাঝে সকালে সাইকেল চালিয়ে টমাস বাটা অ্যাভিনিউ দিয়ে যেতে ভালই লাগছিল ডুডুর। সাহেবদের তৈরি করা টাউনশিপ তো, সবকিছু এত মাপমতো আর সুন্দর যে ভাবা যায় না। বড় বড় সবুজ মাঠের মধ্যে লাল সাদা কোয়ার্টার, রাস্তার দু’পাশে গাছ, কালো মাখনের মতো রাস্তা। নিখুঁত। সাহেব কলোনি সেই গঙ্গার ধারে। ওর কম্পাউন্ডের ভেতরে অনেক আগে একবার ঢুকেছিল ডুডু। তারপর বহুদিন যায়নি।
সবই ঠিক আছে শুধু মনের মধ্যে খচখচ করছে সায়েকার কথা। দেখা হলেই তো আবার যা তা বলতে শুরু করবে। এত সুন্দর একটা সকালে ওসব বাঁকা বাঁকা কথা শুনতে ভাল লাগবে না। এসব ভাবতে ভাবতে একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল ডুডু, হঠাৎ কেউ ওর নাম ধরে ডাকাতে থতমত খেয়ে ও সাইকেল থামাল। আবার কে ডাকছে? সাইকেল থেকে নেমে ঘুরে দাঁড়াল ও। দেখল একটা লেডিজ সাইকেল নিয়ে রাস্তার অন্যদিকে দাঁড়িয়ে আছে পরী। রূপকথার নয়, মল্লিক বাজারের। মল্লিক বাজার বাটানগরের সবচেয়ে বড় বাজার। তার কাছেই তেরো হাত কালীর মন্দির। তার পাশের বাড়িটাই সুরজিৎদাদের। সুরজিৎদার বোনই হল পরী। পরী ডুডুর একদম ছেলেবেলার বন্ধু। একসঙ্গে বাটানগর নার্সারি স্কুলে ওরা পড়ত। নঙ্গী স্কুলে ডুডু ভরতি হয়েছে ক্লাস ফাইভে। কিন্তু পরী তো এখানে এখন থাকে না! ও তো দাদু দিদিমার সঙ্গে দুর্গাপুরে থাকে। সেখানে থেকেই হায়ার সেকেন্ডারি দেবে। ও হঠাৎ এখানে?
“কী রে পরী? তুই কবে এলি?”
পরী ওর সামনে এসে বলল, “গতকাল। সামনে ডিসেম্বরে টেস্ট তো, তাই এখন স্টাডি লিভ চলছে। তা তোদের ছুটি হয়নি এখনও?” ছুটি? মনে মনে ভাবল ডুডু, সেসব কী জিনিস? স্যারেরা পারলে টেস্টের আগের দিন পর্যন্ত ক্লাস নেন। ওরা ছুটির কথা বললেই বলেন এখন যা পড়ানো হচ্ছে সেগুলোই নাকি আসল। ডুডু ভাবে তা হলে সারাবছর কি নকল পড়াশুনো করল নাকি? জ্যাকসন তো সেদিন বাংলার স্যার সুনির্মলবাবুকে জিজ্ঞেস করল, “স্যার, সবার ছুটি হয়ে গেছে, আমাদের হবে না?”
স্যার হেসে বললেন, “তুমি ছুটি নিয়ে কী করবে? পড়াশুনো তো কিছুই করো না।”
জ্যাকসন তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলল, “না স্যার, আমি প্রচণ্ড পড়াশুনো করছি।”
স্যার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বললেন, “তুমি পড়াশুনো করছ? আই সুগার ইউ বোন টু বোন। তুমি পড়াশুনো করার ছেলে?” কথাটা মনে পড়াতে নিজের মনেই হেসে ফেলল ডুডু।
“কী রে পাগল নাকি? একা একা হাসছিস কেন? স্কুল ছুটি হয়নি এখনও?”
ডুডু অপ্রস্তুত মুখে বলল, “হয়ে যাবে, যে-কোনও দিন হয়ে যাবে। তা বল তোর কী খবর? এদিকে কোথায় যাচ্ছিস?”
“আরে তোর বাড়িতেই যাচ্ছিলাম। ভাগ্যিস তোর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।”
ডুডু অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, “কেন?”
পরী বলল, “বলছি। আগে বল তুই কোথায় যাচ্ছিস?” ডুডু সংক্ষেপে বলল পুরোটা।
“তবে তো তোর দেরি হয়ে যাচ্ছে। চল তোর সঙ্গে যাই। যেতে যেতে তোকে বলছি।”
বাটা কোম্পানির গেট থেকে সাহেব কলোনি একটুখানি পথ। পরী কিছু বলার আগেই ওরা পৌঁছে গেল। ডুডু ভাবল পরীর আবার কী দরকার? বন্ধু মহলে একটা কথা সবাই জানে যে বেগার কাজের জন্য পৃথিবী বিখ্যাত হল ডুডু। কারও হয়ে কোনও কাজ করে দিতে হবে? চলে যাও ডুডুর কাছে। ডুডু কী করবে? ওর সমস্যা হল ও কাউকে ‘না’ বলতে পারে না। নিজের হাজার অসুবিধা হলেও ডুডু কাজটা করে দেয়। এখানেও সেই ঠাকুরদার প্রভাব। ঠাকুরদা বলেন, “সাধ্যমতো মানুষের সেবা করতে হয়, তা হলে ঈশ্বর আশীর্বাদ করেন।” ভগবান হল ঠাকুরদার নুন। সব কথাতেই এক চিমটে-দু’চিমটে মিশিয়ে দেন।
সত্যি, সায়েকার মা সাহেব কলােনির গেটে বলে রেখেছিল। ডুডুদের কলোনির ভেতরে ঢুকতে তাই অসুবিধা হল না। সায়েকা সাইকেল নিয়ে রেডি হয়েই ছিল। প্রথমে ও ঝোপঝাড়ের আড়ালে পরীকে দেখতে পায়নি। সামনে ডুডুকে দেখেই বলল, “তুমি এতটা ইরেস্পন্সিবল জানতাম না তো! আমি কখন থেকে ওয়েট করছি। আমি তো ভাবলাম দেবপ্রস্থ ইন্দ্রপ্রস্থের পথে রওনা দিয়েছে।” এই রে আবার শুরু হয়ে গেছে, প্রথম বলেই গুগলি। ডুডু বোকা হাসি দিয়ে বলটা কোনওমতে ব্লক করার চেষ্টা করল। ওই হাসি দেখে আরও কিছু বলার জন্য মুখ খুলেছিল সায়েকা কিন্তু ডুডুর পেছনে পরীকে দেখে চুপ করে গেল ও। সায়েকার মা বলল, “শোনো ডুডু, ডুডুই নাম তো তোমার? তুমি কিন্তু সায়েকাকে সাড়ে পাঁচটার মধ্যে দিয়ে যাবে। দেরি না হয় যেন। আর সায়েকা, মেঘার ওখানে পৌঁছে আমায় একটা ফোন করে দেবে, কেমন!”
ডুডু ভাবল এত সতর্কতা কেন রে বাবা? মেয়ে প্রিয়াঙ্কা গাঁধী নাকি? আর সায়েকা যা এক পিস যন্তর, কেউ নেবে না। কারণ যে নেবে তারও তো নিজের প্রাণের ভয় আছে। নিজের হাড়ে স্বরচিত দুব্বো কে গজাতে চায়?
পথে সায়েকা একটা কথাও বলল না আজ। সেই সুযোগে ডুডু পরীর দরকারটা শুনল। ডুডুকে সন্ধেবেলা পরীর সঙ্গে যেতে হবে বাটানগর থেকে একটু দূরে সারেঙ্গাবাদ বলে একটা জায়গায়। সেখানে পরীদের কোন এক আত্মীয়ের বাড়ি। তাদের ওখানে পরীর কীসব দরকার আছে। দরকারটা কী ডুডু আর জিজ্ঞেস করল না, কারণ তা হলেই পরী হ্যাজাতে থাকবে। সারেঙ্গাবাদটা পরী একদম চেনে না। তাই আজ সন্ধেবেলা ডুডু গাইড ওর ভরসা।
মেঘাদিদের বাড়িতে পৌঁছে সায়েকা দ্রুত ওপরে উঠে গেল। পরী বলল যে ও সওয়া পাঁচটা নাগাদ মেঘাদিদের বাড়িতে চলে আসবে। দু’জনে সায়েকাকে ওর বাড়ি পৌঁছে দিয়ে সারেঙ্গাবাদ যাবে। ডুডু দেখল প্ল্যানটা ভালই। কারণ ফেরার পথে পরী সঙ্গে থাকলে সায়েকা ওকে কাবু করতে পারবে না। ডুডু রাজি হয়ে গেল।
মেঘাদিদের বাড়ির তিনতলায় ছাদ। ডুডু ছাদে উঠে দেখল রান্না প্লাস আড্ডা বেশ জমে উঠেছে। ডুডুর খুব আউট অব প্লেস মনে হল নিজেকে। এতগুলো মেয়ের মধ্যে ও একা বসে কী করবে? কিন্তু চলে যেতেও পারবে না। তা হলেই মেঘাদি ক্যাঁক করে ধরবে। তবে কি ঢপ মেরে একটু ঘুরে আসার চেষ্টা করবে? এই ভাবতে ভাবতেই মেঘাদি ডুডুকে ডাকল, “অ্যাই ডুডু, এই গরমমশলাগুলাে হামানদিস্তায় গুঁড়ো করে দে তো।” ডুডু ভাবল যাক কিছু একটা কাজ পাওয়া গেল। ডুডু ভারী হামানদিস্তা নিয়ে খুটুং খুটুং শুরু করল। যদিও কাজটা খুব প্লেজেন্ট নয় তবু হালকা মশলার গন্ধে বেশ ভালই লাগছিল ডুডুর। ও একমনে লবঙ্গ, বড় এলাচ, দারুচিনি গুঁড়ো করছিল হঠাৎ দেখল টাপুর ওর পাশে এসে বসল। টাপুর নাচ শেখে মেঘাদির কাছে। ও পাশে বসতেই ডুডু কাঁটা হয়ে রইল। ওরে বাবা এ মেয়ে যে ট্রান্সফরমার! এই মেয়ে গোটা বাটানগরে নানান কারণে বিখ্যাত। ডুডু বেশ কয়েকটা কারণ নিজেই জানে। ওর আবার কী দরকার? মশলার গন্ধের সঙ্গে টাপুরের শরীর থেকে ভেসে আসা পারফিউমের গন্ধ পাচ্ছিল ডুডু। সুরেলা গলায় টাপুর জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা ডুডুদা, গত ম্যাচটা যে তোমরা হারলে সেটায় কি সাবোটাজ ছিল?”
“মানে?” কথাটা ঠিক বুঝতে পারল না ডুডু।
“মানে, শুনেছি তোমাদের দিয়েগো নাকি ইচ্ছে করে তোমাদের হারিয়ে দিয়েছে?”
“না না। তা হয় নাকি? দিয়েগো সেদিন ভাল খেলতে পারেনি এটা ঠিক। তার মানে এই নয় যে ইচ্ছে করে হারিয়ে দিয়েছে। কে রটাচ্ছে রে এসব?”
“রটাচ্ছে না, কথাটা আমাদের স্কুলেই শুনলাম।”
“বোগাস, একদম ফালতু কথা।” টাপুর ডুডুর উত্তরে চুপ করে রইল।
একটু পরেই আবার জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা কবীর কেমন ছেলে বলো তো?”
“কবীর? কেন বল তো?” ডুডু কেসটা জানে। ও সাবধান হয়ে গেল।
“বলো না কেমন ছেলে?”
“ভালই তো। পড়াশুনোতেও ভাল, খেলাধুলোতেও ভাল। আমাদের স্কুল টিমের গোলকিপার তো ও-ই।”
“সে আমি জানি। আচ্ছা ও কি মুসলিম?”
“হ্যাঁ। আচ্ছা হঠাৎ এত প্রশ্ন করছিস কেন রে?” ডুডু ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল। বলা যায় না, মেয়ে তো সুবিধের নয়।
“না এমনি। নাও তুমি মশলা গুঁড়ো করো। আমি যাই।” পাশের ঠোঙার থেকে দুটো এলাচ আর লবঙ্গ তুলে মুখে পুরে টাপুর আবার মেয়েদের আড্ডায় ফিরে গেল।
খাওয়াদাওয়া শেষ হতে বেলা চারটে বেজে গেল। ডুডু বেশি খেতে পারে না, তবু সাধ্যমতো খেল। রান্নাটা ভালই হয়েছিল, তবে বাঁশকাঠি চালের ভাত তো, বেশ গলে গিয়েছিল। মেঘাদি রান্না কেমন হয়েছে জিজ্ঞেস করাতে ডুডু বলেছে, “মেঘাদি, এটা ভণ্ড টাইপ হয়েছে। মানে ভাতের মণ্ড আর কী।” তবে একটা ব্যাপারে ডুডু আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছে, আজ সায়েকা একবারও ওকে হ্যাটা করেনি। ঠিকমতো কথাই বলেনি বলা যায়। এমনকী চোখে চোখ পড়লে চোখ সরিয়ে নিয়েছে। যাক গে, বাঁচা গেছে, কথা বলা মানেই তো মুরগি করার চেষ্টা। এতগুলো মেয়ের সামনে সেটা খুব ভাল হত না।
এখন দিন বেশ ছোট হয়ে গেছে, তাই খাওয়ার পরেই সবাই তিনতলার ছাদ থেকে নীচে নেমে এল। ডুডু মেঘাদিদের কাজের লোকটার সঙ্গে বাসনপত্র নীচে নামাল ধরাধরি করে। ঠিক সওয়া পাঁচটায় মেঘাদিদের কাজের মেয়েটা এসে বলল পরী বলে একজন ডুডুকে খুঁজছে। মেঘাদি ঘড়ি দেখে সায়েকাকে বলল, “এই, এবার যা, ডুডু তোকে পৌঁছে দেবে।” সায়েকা গম্ভীরভাবে বলল, “দরকার নেই, আমি একাই যেতে পারব।”
“চুপ কর। কাকিমাকে আমি কী উত্তর দেব? যা, পাকামো করিস না। ডুডু তোকে পৌঁছে দেবে। এরপর কিন্তু দেরি হয়ে যাবে।” সায়েকা আর কোনও কথা না-বলে নীচে নামতে লাগল।
পরী সাইকেল নিয়ে নীচেই দাঁড়িয়ে ছিল। ডুডুরা নামতেই ওরা একসঙ্গে রওনা দিল। এখন প্রায় সন্ধে হয়ে গেছে। চারিদিক ইলেকট্রিক আলোয় ঝলমল করছে। ডুডুর ছোটবেলাতেও কিন্তু এরকম এত দোকানপাট ছিল না। তখনও বাটানগর ছিল এক টিমটিমে মফস্সল। আর এখন প্রায় কলকাতার মতোই লাগে। আর পিন কোডও তো কলকাতার। বৃহত্তর কলকাতার।
পরী এবার আর সাহেব কলোনির ভিতরে ঢুকল না। বলল, “যা তুই ওকে ছেড়ে আয়, আমি ওয়েট করছি। একটু তাড়াতাড়ি আসিস কিন্তু।” ডুডু মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে সায়েকার সঙ্গে কলোনির কম্পাউন্ডে ঢুকে গেল।
ডানদিকে দুটো টেনিস কোর্ট আর বাঁয়ে কাঠের রেলিং দেওয়া সার সার সাদা বাংলো। সায়েকাদের বাংলোটা একটু ভিতরের দিকে। রঙ্গন গাছের ঝোপ পেরিয়ে সায়েকা ওদের বাড়ির সামনে সাইকেল থেকে নামল। ডুডু দেখল সায়েকার মুখটা এখনও গম্ভীর। ডুডু বলল, “ঠিক আছে তা হলে, আমি আসি?”
সায়েকা বাড়ির ভেতরে যেতে গিয়েও থমকে দাঁড়াল, অন্যদিকে তাকিয়ে উত্তর দিল, “হ্যাঁ যাও, তাড়াতাড়ি যাও, একজন অপেক্ষা করছে।” ওর গলার স্বরে এমন কিছু ছিল যে ডুডু চলে না-গিয়ে অবাক হয়ে ওর দিকে তাকাল, বলল, “মানে?”
সারাদিন পর এবার ঝড়টা এল। সায়েকা চট করে মুখ ফেরাল। ওদের বারান্দার আলোয় ডুডু দেখল সায়েকার নাকের মাথা লাল হয়ে উঠেছে আর চোখের কোণ চিকচিক করছে। সায়েকা রাগ আর কান্না মেশানো গলায় বলল, “সবসময় শুধু মানে আর মানে। ঘটে কি একটুও বুদ্ধি নেই? আর আমি এতই খারাপ যে আমার সঙ্গে আসতে হলে বডিগার্ড লাগে। অন্য মেয়েদের সঙ্গে সারাক্ষণ পুটুর পুটুর। আর আমি? আমার কোনও দাম নেই, না? যাও, এখানে ভূতের মতো দাঁড়িয়ে আছ কেন? পরী হুরিরা তো সব অপেক্ষা করছে। যাও।”
চোখের চিকচিকে জিনিসটা এবার গড়িয়ে নেমে এল গালে। সায়েকা সাইকেলটা বারান্দায় রেখে ঘরের মধ্যে ঢুকে দড়াম করে বন্ধ করে দিল দরজা।
“আমার কোনও দাম নেই?” মানে? এর মানে কোন ডিকশনারিতে আছে? মাথা নিচু করে ফিরে যেতে লাগল ডুডু। ভাবল, চোখের চিকচিকে জিনিসটা কি ডি বিয়ারস-এর, না আসমির? কার হিরে? এই হিরে মুক্তোর মেয়েটার কোনও দাম নেই? কার কাছে নেই? ডুডুর কাছে?
