‘My love has made me selfish. I cannot exist without you-I am forgetful of every thing but seeing you again-my life seems to stop there—I see no further.’
শিমুল কখনও কখনও এই লেখাটা খুলে পড়ে। বছর খানেক আগে বেশ কিছু পুরনো কাগজপত্তরের মধ্যে থেকে আধছেঁড়া ডাইরি, আর জীর্ণ একটা বই পেয়েছিল শিমুল। ডাইরির হাতের লেখাটা দেখেই বুঝেছিল এটা ওর বাবার। প্রথমে ভেবেছিল বাবার ব্যক্তিগত ডাইরি, পড়া উচিত হবে না। কিন্তু দু’-তিন দিন পর আর কৌতূহল চেপে রাখতে পারেনি শিমুল। ভেবেছিল বহুদিন আগের ডাইরি, বাবা এটার কথা নিশ্চয়ই ভুলেও গেছে এতদিনে। একটু পড়লে ক্ষতি কী? তাই খুব সাবধানে, এক রাত্রে ডাইরিটা খুলেছিল শিমুল। প্রথম পৃষ্ঠাতেই একটা কোটেশন—‘For god’s sake hold your tongue and let me love.’ ও দেখল হলদে হয়ে গেছে পৃষ্ঠাগুলো। ফাউন্টেন পেনের কালির রংও ফ্যাকাশে। তারপর পোকারা এদিক ওদিক ছোট্ট ছোট্ট ট্রেঞ্চ কেটে রেখেছে পৃষ্ঠা জুড়ে। ফলে কিছু শব্দ বোঝা যাচ্ছে না। তবু সময় নিয়ে ধীরে ধীরে পড়েছিল শিমূল। আর যত পড়ছিল, তত অবাক হচ্ছিল ও। ভাবছিল এটা কি সত্যিই ওর বাবার লেখা?
প্রায় শেষরাতে গিয়ে যখন ডাইরিটা পড়া শেষ করেছিল শিমুল, ওর সব কিছুই অদ্ভুত লাগছিল তখন। ভাবছিল বাবার জীবন কি সত্যিই এমন ছিল? বাবার কলেজ জীবনে কি সত্যিই কোনও প্রেম ছিল? এই শান্ত বাবা একসময় একটা মেয়ের জন্য মারামারি করেছে? ‘মুমু’ বলে কোনও মেয়ের জন্য কি সত্যিই বাবার মনের মধ্যে সারাজীবন কষ্ট থেকে যাবে? শিমুলের কেমন যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না। ওর শান্ত, নিরর্ঞ্ঝাটে বাবা মারামারি করতে পারে। এমন অদ্ভুত সুন্দর বাংলা লিখতে পারে। শিমুল নিজে বাবাকে সবসময় শুধু ইংরেজি নিয়েই দেখেছে। শিমুল অবাক হয়ে বসে ছিল সারারাত। শিমুল জানে ওর মা খুব অ্যাগ্রেসিভ, বাবার সঙ্গে সবসময় খিটির খিটির করে। কিন্তু বাবা কখনও পালটা কিছু বলে না। মাঝে মাঝে মা এমন সব কথা বলে যা শুনলে শিমুলের মনে হয় এমন মায়ের থাকার দরকার নেই। কিন্তু বাবা তবু চুপচাপ থাকে। সেই বাবা ‘মুমু’ বলে কোনও মেয়ের জন্য মারামারি করেছিল! মুমুর বাবা মুমুকে শিমুলের বাবার সঙ্গে মিশতে দেয়নি। পাড়ায় ছেলেদেরও বলে দিয়েছিল যাতে বাবা দেখা করতে গেলে বাবাকে মারে। বাবা একা মারামারি করেছিল ছ’টা ছেলের সঙ্গে। হাসপাতালে ভরতি ছিল দু’সপ্তাহ। পরে মুমুও আর বাবার সঙ্গে দেখা করতে পারেনি। তখন তো অত টেলিফোন ছিল না। মাঘ মাসে বিয়ে হয়ে যায় মুমুর। বাবা ডাইরিতে লিখে রেখেছে বিশে মাঘ। আর লিখে রেখেছে ‘my life seems to stop there-I see no further.’ সত্যিই কি বাবার জীবন থেমে আছে সেখানে? এই এত বছর পরও কি বাবা সেইরকম আছে? তাই কি মায়ের কথার কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না বাবার? শিমুল বুঝেছিল এই কোটেশনটা ওই জীর্ণ বইটার থেকে নেওয়া। শিমুল বইটা খুলেছিল তখন। ভেতরের পাতায় সাদা কালোয় আঁকা একটা ছবি। এক তরুণ গালে হাত দিয়ে বসে আছে। সামান্য মেয়েলি চেহারা, ফ্যাকাশে মুখ, কিন্তু অসম্ভব উজ্জ্বল দুটো চোখ। বইটার তলায় লেখা ‘Letters of John Keats’।
শিমুল পরে বইটা পড়ে দেখেছে। অন্যান্য অনেক চিঠির সঙ্গে ফ্যানি ব্রওনকে লেখা অদ্ভুত সুন্দর প্রেমের সব চিঠি আছে বইটায়। শিমুলকে এত ভাল চিঠি কেউ লিখলে শিমুল তো তার প্রেমে পড়ে যেতই। কিন্তু শিমুলকে কেউ চিঠি লেখে না। শিমুল যার কাছ থেকে চিঠি পেতে চায় সে তো দিদির বুক পেট কোমর নিয়ে লেখার থেকেই ফুরসত পায় না।
আর যাতে ফুরসত পায়, যাতে ঘি ওঠে, তাই আজ সামান্য আঙুল বাঁকাবে শিমুল। টাপুরের সঙ্গে সেই সন্ধেয় দেখা হবার পর থেকে অনেক চিন্তা করেছে শিমুল। ঠিকই বলেছে টাপুর, শিমুলকে ওর পছন্দের জিনিস ছিনিয়ে নিতে হবে। না হলে কেউ ওকে কিচ্ছু হাতে তুলে দেবে না। আর তাই একটা প্ল্যান করেছে ও। দেখা যাক আজ সন্ধের এই প্ল্যান কাজ করে কিনা।
ক্রিসমাস হয়ে গেছে সাত দিন হল। দিন একটু একটু করে বড় হচ্ছে এখন। সঙ্গে ঠান্ডাও পড়েছে খুব। বাটানগরের দক্ষিণ দিকে একটা ছোট্ট ক্রিশ্চান পাড়া আছে। সেখানে দারুণভাবে ক্রিসমাস পালন করা হয়। টাপুর ওখানে বড়দিনে যায়। উলটোনো চেরি ড্রাম, সাদা কাঠের ফেনসিং, নানা রঙের রিবন আর ছোট্ট ছোট্ট ঘণ্টা দিয়ে সারা পাড়াটা সাজানো হয়। বুড়ো ম্যাথিউ দাদু কী দারুণ গিটার বাজায়। আর সবাই দুলে দুলে গায়—
‘Oh, the weather outside is frightful,
But the fire is so delightful,
And since we’ve no place to go,
Let it show, let it snow, let it snow.
It doesn’t show signs of stopping,
And I brought some corn for popping.
The lights are turned way down low,
Let it snow, let it snow, let it snow.
When we finally say good night,
How I’ll hate going out in the storm;
But if you really hold me tight,
All the way home I’ll be warm.
The fire is slowly dying,
And, my dear, we’re still good-bye-ing,
But as long as you love me so.
Let it snow, let it snow, let it snow.’
শিমুলও ওদের সঙ্গে গলা মেলায়। আর গানের শেষে সবাই যখন একসঙ্গে গায়— “Let it snow, let it snow, let it snow.”
তখন সত্যিই আশেপাশের বাড়ির ছাদ থেকে ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চারা কুচি কুচি থার্মোকল ছড়িয়ে দেয় নীচে গোল করে বসা মানুষগুলোর মাথায়। আর বাটানগরে, মিথ্যে মিথ্যে হলেও, বছরে একবার তুষারপাত হয়।
তারপর সবাই মিলে যায় কাছের কাঠের চার্চে। এটা ক্যাথলিক চার্চ। বিরাট বড় কাঠের ক্রশে যিশুর মূর্তি। মাথায় লেখা আছে আই. এন. আর. আই। একবার ম্যাথিউ দাদু শিমুলকে বলেছিল এর মানে ইয়েশুস নাজারেনাস রেক্স ইউডিওরাম—নাজারাথের যিশু ইহুদিদের রাজা। সবাই মিলে বাইবেল পড়ে সেখানে। শিমুল চুপ করে শোনে। অদ্ভুত সুন্দর লাগে ওর। তারপর ফাদার সবাইকে একটা করে ‘ওয়েফার’ দেন ওয়াইনে ডুবিয়ে।
চার্চের ‘মাস’ শেষ হলে শুরু হয় নাচ গান। তারই মধ্যে রেড ওয়াইনে ডুবিয়ে সবাই একটু করে রুটি খায়। এটাকে বলা হয় ব্লাড অ্যান্ড ফ্লেশ অব জেসাস। শিমুলের সবটাই ভাল লাগে খুব। বাটানগরে যেমন ফাটাফাটি দুর্গাপুজো হয়, তেমনি ক্রিসমাসও দারুণ। বছরে এই দুটো সময় খুব সুন্দর।
এবারও শিমুল যিশুর কাছে, আমন যাতে ওকে পছন্দ করে, সেটাই চেয়েছে। চার্চের বাইরে বেরোতেই ম্যাথিউ দাদু বলেছিল, “কী সোনা, কী চাইলে তুমি?”
“কিছু না।” কেন জানে না লজ্জায় লাল হয়ে উত্তর দিয়েছিল শিমুল।
ম্যাথিউ দাদু বলেছিল, “হোয়েন আ গার্ল ব্লাশ, শি মাস্ট হ্যাভ আ ক্রাশ। হু ইজ হি?” শিমুল কোনও উত্তর দেয়নি। শুধু হেসেছিল। একটা জিনিস ক্রমশ শিমুল বঝছে যে ওর যাকে পছন্দ তাকে পেতে গেলে ওকেই উদ্যোগ নিতে হবে। তাই এই ক’দিনে একটা ছোট্ট প্ল্যান তৈরি করেছে ও। এটা ও কাউকেই বলেনি। এমনকী টাপুরকেও না। কারণ প্ল্যান বললেও আসলে তাতে আদৌ কোনও কাজ হবে কিনা কে বলতে পারে? এখন, শিমুল শুধু অপেক্ষা করছে সেই সময়ের যখন আমন আসবে ওদের বাড়িতে। তবে বেশি দেরি করলে সব ভেস্তে যাবে। কারণ বাবা মা, দাদু, ঠাকুমা সবাই বাড়িতে ফিরে আসবে।
গত পরশু আমনকে ওদের বাড়িতে গিয়ে ধরেছিল শিমুল। আমন তখন কম্পিউটারে ‘ফিফা ২০০৪’ খেলছিল। শিমুলকে দেখেই জিজ্ঞেস করল “কী রে? ঠাকুরমার সঙ্গে গল্প শেষ হল?” ওর উত্তরের পরোয়া না করেই আবার জিজ্ঞেস করল, “আমার বায়োলজি প্র্যাকটিকালের খাতাটা কোথায় রেখেছিস রে খুঁজে পাচ্ছি না। তোর গোছানোর ঠেলায় নিজেকেই খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে একদিন। তুই পুরো ‘গিভ আপ’ একটা।” “গিভ আপ’ কথাটা আমন খুব ব্যবহার করে। শিমুল কিছু না-বলে খাতাটা বের করে দিয়েছিল। আমন আবার ডুবে গিয়েছিল ওর ফুটবলে। শিমুল পায়ে পায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল ওর চেয়ারের পেছনে। তারপর ধীরে ধীরে বলেছিল, “দিদি তোকে একবার দেখা করতে বলেছে।” দিদি মানে রঙ্গনা। যেন শক খেল এমনভাবে ঘুরে বসেছিল আমন, তারপর শিমুলের হাত ধরে বলেছিল, “সত্যিই? কবে? এক্ষুনি?” ভাল আর খারাপ একসঙ্গে লাগলে কেমন লাগে প্রথম বুঝেছিল শিমুল। ওর হাত ধরে বসে থাকা আমন, আর দিদির কথায় উত্তেজিত আমন। শিমুল তবু যথাসম্ভব শান্ত মাথায় বলেছিল, “না আজ নয়, পরশু। দিদি বলেছে সন্ধে ছ’টা নাগাদ তোকে যেতে। আগে নয় কিন্তু। তখন বাড়িতে কেউ থাকবে। তোকে দিদির কীসব কথা বলার আছে প্রাইভেটলি।”
“কী কথা?” আমনের মুখ চোখ লাল হয়ে উঠেছিল। শিমুল বলেছিল, “আমি জানি না। পরশুদিন আসবি কেমন? তার আগে নয়। দিদি কিন্তু স্ট্রিক্টলি বলে দিয়েছে।”
শিমুল একবার উঠে জানলার কাছে গেল। আমন এখনও আসছে না তো? কী ব্যাপার? শিমুল ঘড়ির দিকে তাকাল, প্রায় ছ’টা বাজে। জলজ দিদির কাছে এসেছে এখন। সাতটা নাগাদ ও চলে যাবে কারণ সাড়ে সাতটায় বাড়ির সবাই নেমন্তন্ন থেকে ফিরে আসবে। শিমুল চায় জলজ থাকতে থাকতে আমন আসুক। কারণ, তা হলেই ওর প্ল্যানটা খাটবে।
শিমুল জানলার পরদা সরিয়ে নীচে দেখল। ঘুটঘুটে অন্ধকার রাস্তা। ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে উঠেছে শিমুল, আমন কোথায়? ও জানে অমূল্য সময় চলে যাচ্ছে। ওর সমস্ত আয়োজন মাঠে মারা যাচ্ছে। বাড়ির বড়রা যখন নেমন্তন্নে যাচ্ছিল সবাই শিমুলকে যেতে বলেছিল, শিমুল জেদ করে যায়নি। কারণ ও জানে রঙ্গনা যেহেতু যাচ্ছে না সেহেতু জলজ নিশ্চয়ই আসবে। আর সেটাকেই এক্সপ্লয়েট করবে ও।
জলজ দিদির বন্ধু না বয়ফ্রেন্ড সেটা প্রথমে বুঝত না শিমুল। কখনও ভাবত বয়ফ্রেন্ড আবার কখনও ভাবত বন্ধু। কিন্তু একবার জলজ আর রঙ্গনাকে একসঙ্গে জানলার খড়খডির ফাঁক দিয়ে দেখে সব ধারণা কেমন তালগোল পাকিয়ে গিয়েছিল শিমুলের। এখনও সেই দৃশ্যের কথা চিন্তা করলে গায়ে কাঁটা দেয় শিমুলের। আর কেন কে জানে তার সঙ্গে সঙ্গেই ওর মনে পড়ে যায় বছর দেড়েক আগের এক দুপুর। শিমুলের সবসময়ই দুটো আলাদা আলাদা ঘটনা একসঙ্গে মনে পড়ে যায়।
বছর দেড়েক আগের সেই দুপুরে শিমুল ছিল টাপুরের বাড়ি। ভগবান জানে কোথেকে লুকিয়ে একটা সিডি নিয়ে এসেছিল টাপুর। সেটা চালাতেই দম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল শিমুলের। অতগুলো শরীর কী করছে। একসঙ্গে? ঘটনাটা বুঝতেই কিছুটা সময় লেগেছিল ওর। কিন্তু বুঝতে পেরেই ওয়াক উঠে এসেছিল শিমুলের। কিন্তু টাপুরও ছাড়বে না, দেখতেই হবে। খানিকটা ধস্তাধস্তি হয়েছিল ওদের। তারপর টাপুর সোফার সঙ্গে ওকে চেপে ধরে বলেছিল, “ন্যাকামো হচ্ছে? তুই সাধু, না? ঘেন্না লাগছে? হিপোক্রেসির জায়গা পাস না? তুই অ্যারওসড্ হচ্ছিস না? জানিস না কীভাবে তুই পৃথিবীতে এসেছিস? তোর ইচ্ছে করে না এসব করতে? তুই নিজেকে স্টিমুলেট করিস না?” কোনও উত্তর না দিতে পেরে কেঁদে ফেলেছিল শিমুল। অবাক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরটাও শিরশির করছিল শিমুলের। রুদ্রর ভেজা ঠোঁট, টাপুরের বাড়ির সেই ছবি, সব একসঙ্গে মিলেমিশে গিয়েছিল।
সাইকেলের আলোটা অন্ধকার গলিটাকে আধাআধি করে দিল যেন। শিমুল চমকে উঠল—আমন। খুব দ্রুত, বলতে গেলে প্রায় উড়েই নীচে নেমে গেল শিমুল। আমন কলিং বেল বাজাবার আগেই দরজা খুলে দিল শিমুল। ও চায় না রঙ্গনা কলিং বেলের আওয়াজ শুনুক।
দরজা খুলতেই আমন বোকার মতো মুখ করে হাসল, বলল, “আসলে ফুল কিনতে একটু দেরি হয়ে গেল। রঙ্গনাদি কই? ওপরে?”
আমনের হাতে একগুচ্ছ হলুদ ফুল। শিমুল দম নিল একটু, এবার ওর খেলা শুরু হবে। তবে খেলাটা রিস্কি, সাবধানে খেলতে হবে। শিমুল বলল, “দেরি করে ফেলেছিস রে, দিদির সঙ্গে একজন আছে। দিদি এখন অন্য কারও সঙ্গে দেখা করবে না।”
“মানে? অন্য কারও সঙ্গে আছে? দেখা করবে না? তা হলে আমাকে ডেকে পাঠাল কেন? ইয়ারকি? সর, আমি গিয়ে দেখছি।” আমন প্রায় শিমুলকে ঠেলে সরিয়ে ওপরে উঠতে লাগল। শিমুল পেছনে “শোন শোন” বলে যেতে লাগল। কিন্তু আমনকে আটকাল না। শিমুল জানে ঠিক কখন আমনকে আটকাতে হবে।
শিমুল যা ভেবেছিল ঠিক তাই, রঙ্গনার ঘরের দরজা বন্ধ। আমন হাত তুলল দরজায় ধাক্কা দেবে বলে আর ঠিক সেই মুহূর্তে শিমুল ওর হাতটা চেপে ধরল। বলল, “দাঁড়া, ধাক্কা দিস না। একটা জিনিস দেখি।” আমন অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। শিমুল পা টিপে টিপে গিয়ে জানলার খড়খড়ি তুলে রঙ্গনার ঘরের ভিতরে উঁকি দিল। দেখাদেখি আমনও এগিয়ে এল। কিন্তু শিমুল দ্রুত, শব্দ না-করে খড়খড়ি নামিয়ে আমনকে বলল, “তুই ভেতরে দেখিস না, তোর ভাল লাগবে না।”
“কেন?” আমন শিমুলকে ঠেলে এগিয়ে গেল জানলার দিকে। শিমুল আর আমনকে বাধা দিল না। ও ঠিক এটাই চাইছিল। মানুষের এটাই প্রবৃত্তি, যেটা তাকে দেখতে বারণ করা হয় সে সেটাই দেখবে। আমন গিয়ে জানলার খড়খড়িটা ফাঁক করল। ভাগ্যও এমন যে ভেতরের পরদাটাও আজ সরানো আছে। শিমুলও আমনের পাশ দিয়ে উঁকি দিল।
ঘরের ভেতরে নরম আলো জ্বলছে একটা। জানলার দিকে পিঠ করে বসে আছে রঙ্গনা। গায়ে একটা সুতোও নেই। মাটির মূর্তির মতো লাগছে ঠিক। আর রঙ্গনার বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে পাগলের মতো ছটফট করছে জলজ। ওর হাতদুটো রঙ্গনার কোমর খামচে ধরে আছে। জলজ কিছু একটা বলছেও কিন্তু স্পষ্ট শুনতে পাওয়া যাচ্ছে না। ধীরে ধীরে জলজ রঙ্গনাকে বিছানায় শুইয়ে দিল। বুক থেকে চুমু খেতে খেতে নীচে নামতে লাগল জলজ। রঙ্গনা ছটফট করছে। হাত দিয়ে খামচে ধরছে বিছানার চাদর। জলজ গিয়ে থামল রঙ্গনার তলপেটে আর তারপরই মুখ ঘষতে শুরু করল। রঙ্গনার অস্ফুট শব্দ এবার চিৎকারে পরিণত হল। শিমুল স্পষ্ট শুনল রঙ্গনা বলছে, “জোরে আরও জোরে জলজ। আর পারছি না, মা গো। আর না, এবার করো, এবার করো প্লিজ, ওঃ!” শিমুল দেখল মুখ তুলে নিয়ে জলজ হাঁটু গেড়ে বসল রঙ্গনার দু’পায়ের মধ্যে, তারপর রঙ্গনার কোমর দু’হাতে চেপে ধরে নিজেকে প্রবেশ করাল রঙ্গনার মধ্যে। আবছা আলোয় দুটো শরীর দুলতে লাগল অদ্ভুত ছন্দে।
পাশে ধপ করে শব্দ হওয়াতে শিমুল ঘরের থেকে চোখ ফিরিয়ে তাকাল। আমন থেবড়ে বসে পড়েছে মাটিতে। হাতের হলুদ ফুলগুলো পাশে পড়ে আছে ছড়িয়ে। আমনের ফরসা মুখ লাল, চোখ দিয়ে দরদর করে জল পড়ছে, কিছু বলতে চেষ্টা করছে আমন, কিন্তু কিছুতেই যেন পারছে না। শিমুল কোনওমতে দাঁড় করাল আমনকে। তারপর কষ্ট করে একরকম টানতে টানতেই ওকে নিয়ে গেল নিজের ঘরে, শিমুলের ঘরটা রঙ্গনার ঘরের উলটোদিকে বারান্দার আরেক মাথায়।
শিমুলের খাটে ধপ করে বসে পড়ল আমন। শিমুল দেখল রীতিমতো কাঁপছে ও। মুখ এখনও লাল, চোখ দিয়ে এখনও জল পড়ছে। আমন যে ভীষণ শকড্, বুঝতে অসুবিধা হল না শিমুলের। শিমুল ধীরে ধীরে বসল আমনের পাশে। ওর হাতটা নিজের হাতে নিয়ে শিমুল বলল, “তখনই বলেছিলাম দেখিস না, ভাল লাগবে না।”
আমন হেঁচকি তুলে বলল, ‘এসব কী করছে? ছেলেটা কে? ওরা সেক্স করছে কেন? আমায় এও দেখতে হল? আমি…” শিমুল বুঝল আমন কথার খেই হারিয়ে ফেলেছে। ও বলল, “কান ডাউন আমন। ছেলেটা দিদির বয়ফ্রেন্ড। বাড়ি ফাঁকা থাকলেই দে হ্যাভ সেক্স। তুই দুঃখ পাস না।”
“দুঃখ পাব না? আমার যে কোথায় কষ্ট হচ্ছে… শিমুল আমি… আমি কী করব? রঙ্গনাদি এমন করল কেন?” আমনের কথা ক্রমশ প্রলাপের আকার নিচ্ছে।
শিমুলের এবার কষ্ট হল। এমনটা ও হয়তো না করলেই পারত। এভাবে আমনকে ডেকে এনে শক দেওয়াটা বোধহয় ঠিক হয়নি ওর। শিমুল তো জানত রঙ্গনা ফাঁকা বাড়ির অ্যাডভান্টেজ নেবেই। আর এও জানত আমন এসব দেখলে কষ্ট পাবেই। তবু কোথাও যেন সূক্ষ্মভাবে একটা আনন্দও হচ্ছে ওর, আমন ওকে জিজ্ঞেস করছে, “আমি কী করব?” তবে কি আর অদৃশ্য নয় শিমুল?
শিমুল চোখ মুছিয়ে দিল আমনের। ওর কাঁধে হাত রেখে বলল, “সব ঠিক হয়ে যাবে দেখিস। আর দিদির কথা চিন্তা করিস না। খারাপ কথা ভাবলে নিজেরই মন খারাপ হয়।” আমন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল ওর দিকে। শিমুল নিজের কথায় নিজেই অবাক হচ্ছে। এসব কথা বলতে পারছে কী করে ও? এসব কে বলাচ্ছে ওকে দিয়ে? শিমুল আবার বলল, “আর কাঁদিস না। তোকে কাঁদতে দেখলে আমার কষ্ট হয়।” কথাটা সত্যি, কারণ শিমুলের চোখের কোণেও জল চিকচিক করছে। আমন শিমুলের হাতটা ধরে ওর দিকে তাকাল। তারপর ধীরে ধীরে ওর কাঁধে মাথা রাখল। আমনের নিশ্বাস লাগছে শিমুলের গলায়, মাথার চুল থেকে হালকা শ্যাম্পুর গন্ধ পাচ্ছে ও। ভাল লাগায় শিমুলের শরীর অবশ হয়ে আসছে। আমন আস্তে আস্তে বলল, “শিমুল, তুই সবসময় আমায় এভাবে সামলাবি তো?”
শিমুলের হঠাৎ মনে পড়ে গেল হলদে হয়ে আসা কিছু পৃষ্ঠা, ফ্যাকাশে নীল কালি, মারামারি করে ছেড়া শার্ট আর ঠোঁটের কোনায় রক্ত নিয়ে ফেরা এক যুবক। যুবকটাকে কেউ কোনওদিন এভাবে সামলায়নি। শিমুলের গলার কাছে হঠাৎ ব্যথা করে উঠল, মনে হল কী যেন আটকে আছে। ওর বলতে ইচ্ছে হল, “সামলাব, তোকে আমিই সামলাব।” কিন্তু পারল না, শুধু নাক থেকে পিছলে নেমে আসা চশমাটা ঠিক করতে করতে বলল, “সবসময় কথা বলতে নেই, একটু চুপ কর।”
