পাতাঝরার মরশুমে – ৮

আজ প্র্যাকটিসের চতুর্থ দিন। এখন দিন যেহেতু অনেক ছোট হয়ে গেছে তাই এই বেলা সাড়ে তিনটের মধ্যেই সূর্য অনেক ঠান্ডা হয়ে আসে। ওদের প্র্যাকটিস ঘণ্টা দেড়েকের হয়, স্টুডেন্টরা একে একে আসছে। সবে। পুরুও খানিকক্ষণ হল মাঠে এসেছে। পুরু মাঝে মাঝে ভাবে যে এখন তো ওর ফুটবলার থাকার সময়, আর এখনই ওকে গেমস টিচার হিসেবে একটা স্কুলে ট্রেনিং করাতে হচ্ছে। আচ্ছা ওকে কি কোচ বলা যায়, মানে যে-অর্থে কোচ বলা হয়? প্রশ্নটা মনে আসাতে নিজেই হেসে ফেলল পুরু। কিন্তু পুরু জানে এই হাসিটুকু টিকিয়ে রাখা মুশকিল। কারণ প্রাণবল্লভ মিত্রের হাতেই পুরুর চাকরির প্রাণ।

প্রথম দেখা হওয়ার সময় প্রাণবল্লভ মিত্র বলেছিলেন সাত দিনের মধ্যে উনি পুরুকে খবর পাঠাবেন চাকরির ব্যাপারে। কিন্তু পুরুকে অপেক্ষা করতে হয়েছে দু’সপ্তাহ। তারপর একদিন এসেছে। ইন্টারভিউয়ের ডাক।

ইন্টারভিউতে নঙ্গী হাই-এর হেডস্যার ছাড়াও আরও কয়েক জনের সঙ্গে প্রাণবল্লভ মিত্র নিজেও ছিলেন। পুরুকে অবশ্য বিশেষ কিছুই জিজ্ঞেস করা হয়নি। স্পষ্ট বলে দেওয়া হয়েছে জানুয়ারির শেষ অবধি ওকে গেমস টিচার করা হচ্ছে। তারপর ওর কাজ দেখে ওকে পারমানেন্ট করা হবে কিনা বলা হবে। এর জন্য টাকাপয়সাও যা দেওয়া হচ্ছে সেটাও বলার মতো নয়। তবু নেই মামার চেয়ে কানা মামা তো ভাল।

গত তিন দিন কিছুই বিশেষ প্র্যাকটিস হয়নি। সবার সঙ্গে পরিচয় হতে হতেই সময় চলে গেছে। পুরু লক্ষ করেছে, এই তিন দিন সবাই এসেছে শুধু একজন আসেনি। দয়ারাম আংরে। দিয়েগোর নাম যে দয়ারাম আংরে এটা জানতই না পুরু, এখানে এসে জেনেছে। কিন্তু কেন আসছে না সে? জ্যাকসন বলে একটা ছেলেকে জিজ্ঞেস করেছিল ও। জ্যাকসন নামটাও পুরুকে অবাক করেছিল। এদের কি কারও স্বাভাবিক নাম নেই? যাই হোক, ওর প্রশ্নের উত্তরে জ্যাকসন বলেছিল, “দিয়েগোর তো হেপাটাইটিস কেস স্যার।”

“মানে? শরীর খারাপ নাকি?”

“না স্যার, মন। গত ম্যাচটা হারার জন্য সবাই ওকে অ্যাকিউজ করছে তো। তার ওপর বোধহয় বাড়িতেও খুব টেনশন চলছে।”

“বোধহয় কেন? তুমি ওর বন্ধু, তুমি জানো না?”

“স্যার, যে দিয়োগোর যতই বন্ধু হোক ওর সমস্যার কথা ও কাউকে বলে না। এমনকী কেউ ওর বাড়িতে যায়, সেটাও ও পছন্দ করে না।”

পুরু ভাবল, এ তো মহা সমস্যা। পুরু একটা ব্যাপার জানে, মানে ওকে কেউ স্পষ্ট না করে বললেও ও জানে, স্কুল কেন ওকে জানুয়ারির শেষ অবধি সময় দিয়েছে। কারণ সেকেন্ড ফেব্রুয়ারি নঙ্গী হাই-এর সঙ্গে রবিন মেমোরিয়ালের ফিরতি এবং ডিসাইডিং ম্যাচ। ওই ম্যাচটায় জেতা হারা অনেক কিছু পার্থক্য করে দেবে। বাটানগরে সব স্কুল টিমের যে-ক’টা খেলা পুরু দেখেছে তাতে ও জানে এই অঞ্চলের সব স্কুলের প্লেয়ারদের মধ্যে এই দিয়েগো ছেলেটা স্পেশাল। ও একাই যে-কোনও ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। পুরুর মনে হয়েছে কৃশানু দের পরে কলকাতা মাঠ আর কোনও বল প্লেয়ার পায়নি। পুরু দিয়েগোর মধ্যে সেই সম্ভাবনা দেখেছে। ও শুধু গোল করে না, গোল করায়ও। গত ম্যাচটায় ও যাই করে থাকুক না কেন এই দিয়েগোকে পুরুর চাই। ও সেদিন জ্যাকসনকে বলেছিল, “যে-করেই হোক পরের দিন দিয়েগোকে মাঠে নিয়ে আসবে।”

কিন্তু পরের দিন মানে গত প্র্যাকটিস সেশনেও দিয়েগোকে নিয়ে আসতে পারেনি জ্যাকসন। দেখা যাক আজ পারে কিনা। পুরু দেখল প্রায় সব স্টুডেন্টই চলে এসেছে। এবার প্র্যাকটিস শুরু করতে হবে। হঠাৎ পেছন থেকে “স্যার” বলে কে যেন ডাকল ওকে। পুরু পেছন ঘুরে দেখল জ্যাকসন। ও কাছে এসে বলল, “স্যার, দিয়েগোকে নিয়ে এসেছি। কিন্তু গুরুর মুড একদম পাংচার হয়ে আছে, খেলতেই চাইছে না। দেখুন না, জার্সি বুট কিছুই নিয়ে আসেনি। ও বলছে। আপনি কোচিং করালে ও খেলবে না।”

“কেন?” পুরু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।

“জানি না স্যার আপনার সঙ্গে ওর কী দুষমনি! ও বারবার বলছে ও খেলবে না। স্যার, আপনি প্লিজ ওকে রাজি করান। ও না-খেললে ফিরতি ম্যাচে ল্যাজে গোবরে হয়ে যাব।”

“ল্যাজে গোবরে হবে কেন? ওকে ছাড়া তোমরা জিততে পারবে না? ফুটবল টিম গেম। অ্যান্ড নো ওয়ান ইজ বিগার দ্যান দ্য গেম।” পুরু চোয়াল শক্ত করল। ও জানে প্রথম থেকেই ওকে শক্ত হতে হবে, রাশ আলগা দিলেই মুশকিল। জ্যাকসন হাউমাউ করে উত্তর দিল, “ওসব বইয়ের কথা স্যার আমি মানি না। মারাদোনা না-থাকলে ছিয়াশিতে আর্জেন্টিনা জিতত? মারাদোনা ফুটবলের চেয়েও বড়।” পুরু কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু জ্যাকসন ওকে বলার সুযোগ না-দিয়ে নিজেই আবার বলল, “প্লিজ স্যার, আমাদের ইজ্জত কা সওয়াল। পুরো বাঁশ হয়ে যাবে স্যার।”

“চুপ করো, কী আজেবাজে বকছ?” পুরু ধমক দিল, “তুমি প্র্যাকটিসে নামো। ও বসে থাকুক, পরে দেখা যাবে।”

পুরু জোর করে জ্যাকসনকে প্র্যাকটিসে নামিয়ে দিল। ওয়ার্ম আপ করিয়ে নিয়ে কিছুটা ফিজিকাল ট্রেনিং করাল। দেখল ছেলেগুলো ফিজিকালি খুব একটা ফিট নয়। আধ ঘণ্টাখানেক পরে পাঁচ মিনিটের ব্রেকে আমন বলে একটা ছেলে এসে বলল, “স্যার, গত তিন দিনে একবারও বল পেলাম না। আমরা বল নিয়ে ট্রেনিং করব না?”

পুরু বলল, “নিশ্চয়ই করবে। আগে একটু ফিজিকাল ফিটনেসটা বাড়ুক। ফার্স্ট উইক অব ডিসেম্বর বল নামাব।”

“সে কী স্যার! তখন তো প্রাকটিস বন্ধ থাকবে। আমাদের ফার্স্ট টার্ম পরীক্ষা শুরু হয়ে যাবে, তা ছাড়া টেন-টুয়েলভের টেস্ট শুরু হবে। ডিসেম্বরের শেষে আবার প্র্যাকটিস শুরু হবে। পুরো গিভ আপ কেস হয়ে যাবে স্যার।”

সর্বনাশ! এটা তো জানত না পুরু। ও নিজের মতো একটা ট্রেনিং শিডিউল বানিয়ে রেখেছিল। এখন তো পুরোটা বদলাতে হবে। পুরু চিন্তা করল খানিকক্ষণ। বুঝল যে, সময় যখন কম ওকে খানিকটা ইমপ্রোভাইজ করতেই হবে। আর একটা কথাও সত্যি। শুধু ফিজিকাল ফিটনেস বাড়াতে গেলে ছেলেরাও বোর হয়ে যাবে। ওরা তো আর বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছে না। পুরু মনে মনে ঠিক করে নিল। আমনকে বলল, “আজই বল পাবে তোমরা। শোনো, এবার থেকে প্রথমে ড্রিল করে নেবে, তারপর বল নিয়ে ম্যাচ সিচুয়েশন তৈরি করে খেলা হবে। নাও এবার নেমে পড়ো।”

এরপর বল নিয়ে খানিকটা সময় নানা ড্রিল করানোর পর বেশ কিছুটা শুটিং প্র্যাকটিস করাল পুরু। দেখল সবাই মোটামুটি মারতে পারলেও জ্যাকসন ছেলেটা বল ডানদিকে শট মারলে তা বাঁ দিকে যাচ্ছে। একে দেখলে পুরুদের কোচ অলোকদা বলতেন ‘তাল কানা।’ কিন্তু জ্যাকসনের যেটা গুণ সেটা হল স্পিড। বেশ জোরে দৌড়োয় ছেলেটা। পুরুর মনে পড়ল এরকমই জোরে দৌড়োত ও নিজে। অলোকদা বলতেন ‘জেসি ওয়েন্স’।

এরপর ওদের একটা ছোট ম্যাচও খেলাল পুরু। দুটো টিম ভাগ করে পনেরো পনেরো তিরিশ মিনিটের ম্যাচ। পুরু দেখল ছেলেগুলো মোটামুটি খেলছে। কিন্তু সবারই নিজের কেরামতি দেখাবার একটা ঝোঁক। এদের বোঝাতে হবে যে ফুটবল টিম গেম, এটা টেনিস নয়। তবু এসব কিছুর মাঝেও পুরু দেখছিল দিয়েগোকে। মাঠের এক পাশে চুপ করে বসে আছে ও। দেখে মনে হচ্ছে এই মাঠ, এই স্কুল কোনও কিছুর সঙ্গেই ওর আর যোগাযোগ নেই কোনও। পুরু দেখল মাঠের দিকেও তাকাচ্ছে না দিয়েগো। দূরে দুটো শালিখ পাখির দিকে তাকিয়ে বসে আছে ও। এ-ছেলেকে মাঠে ফেরাতে যথেষ্ট বেগ যে ওকে পেতে হবে সেটা বিলক্ষণ বুঝল পুরু।

নির্দিষ্ট সময়ে প্র্যাকটিস শেষ করে দিল পুরু। আজ আর নয়। সবাইকে কিট গোছাতে বলে নিজের ব্যাগ থেকে জলের বোতল বের করে জল খেল খানিকটা। জামার হাতায় মুখ মুছে এবার দিয়েগোর দিকে এগিয়ে গেল ও। দিয়েগো ডুডু আর জ্যাকসনের সঙ্গে গল্প করছিল। পুরুকে আসতে দেখেই চুপ করে গেল।

পুরুই প্রথম কথা শুরু করল। বলল, “দিয়েগো, তুমি প্র্যাকটিসে আসছ না কেন?” দিয়েগো কোনও উত্তর না-দিয়ে চুপ করে রইল। পুরু দেখল এ তো মহা ঝামেলা। ও আবার একই প্রশ্ন করল। দিয়েগো এখনও চুপ। পুরু বুঝল এভাবে হবে না। দেখা যাক অন্যভাবে চেষ্টা করে। পুরু এবার বলল, “শোনো দিয়েগো, চুপ করে থেকে কোনও কিছুর সমাধান হয় না। অন্তত এইটুকু বলো তোমার প্রবলেমটা কী? এমনও তো হতে পারে যে কোথাও কোনও ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে।”

দিয়েগো সরু চোখে পুরুর দিকে তাকাল একবার, তারপর শান্তভাবে বলল, “দেখুন, আমি এমন কারও কাছে ট্রেনিং করতে চাই না যিনি আমায় বিশ্বাস করেন না। ম্যাচের দিন সন্ধেবেলায় বটতলায় আপনিই তো ছিলেন, তাই না? আপনিই তো আমায় জিজ্ঞেস করেছিলেন আমি ইচ্ছে করে কবীরকে ধাক্কা মেরেছিলাম কিনা? ঠিক কিনা?”

পুরু চুপ করে রইল। কথাটা সত্যি। পুরু ভেবেছিল যাদের গেমস টিচার হওয়ার কথা হচ্ছে, তাদের খেলা একবার দেখে নেবে। আসলে এর আগেও ওদের অনেক খেলা দেখেছে পুরু, কিন্তু এবার ভেবেছিল অনেক খুঁটিয়ে দেখবে, শুধু দর্শকের চোখে নয়, পরীক্ষকের চোখেও। তাই সেদিন খেলা দেখতে গিয়েছিল ও। আর খেলা দেখে ওর মনে হয়েছিল দিয়েগো ঠিক গা লাগাচ্ছে না। তাই সন্ধেবেলা বটতলার কাছে ওদের আড্ডায় বসে হঠাৎ রাস্তা দিয়ে দিয়েগোকে যেতে দেখে দিয়েগোকে খেলা সম্বন্ধে ওই কথাটা না জিজ্ঞেস করে পারেনি।

“আপনি বললেন না কিন্তু আমি ঠিক বলেছি কিনা।” দিয়েগোর গলায় সামান্য অধৈর্য। এবার চোয়াল শক্ত হল পুরুর। ও জানত এই স্কুলে এসে ওকে ঝামেলার সামনে পড়তে হবেই। কারণ ওর বয়সটা তো ঠিক স্যার হওয়ার নয়। কিন্তু পুরু জানে এমন সময় কী করতে হয়। ও বলল, “দিয়েগো, আমি নিজে সুপার ডিভিশনে ফুটবল খেলেছি। আমি কিন্তু বুঝি কে কী ভাবে খেলছে। সেদিন তুমি যে ঠিক খেলোনি সেটা তুমি নিজেও জানো। শোনো, তুমি ভাল প্লেয়ার তাই তোমাকে এতগুলো কথা বলছি।”

“আপনি সুপার ডিভিশনে কী খেলেছেন আমি জানি না, কিন্তু এখানে যে প্র্যাকটিস করাচ্ছেন!” দিয়েগোর অবজ্ঞাটা স্পষ্ট বুঝতে পারল পুরু।

“আচ্ছা? তুমি ফুটবলের সব জানো দেখছি! তুমি আমায় কাটিয়ে বেরোতে পারবে দিয়েগো? যদিও আমি ডিফেন্সে খেলতাম না, তবু, পারবে?” পুরু কঠিন গলায় বলল।

“একশোর মধ্যে একশোবার।” কনফিডেন্টলি বলল দিয়েগো।

“ও. কে, কাম অন দেন।” বল হাতে মাঠের দিকে এগিয়ে গেল পুরু। দিয়েগো বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে হেসে চোখ টিপল একবার, তারপর মাঠের দিকে এগোল।

জ্যাকসন ডুডুকে চাপা গলায় বলল, “দেখলি, স্যার কেমন কায়দা করে দিয়েগোকে মাঠে নিয়ে গেলেন! একদম কাকা টাইপের স্যার।”

“একশোবার নয়, তিনবার, জাস্ট তিনবার তুমি আমায় কাটিয়ে বেরোও।” বলল পুরু।

“ঠিক আছে। নাও মে উই স্টার্ট?” দিয়েগো প্যান্ট গুটিয়ে পা দিয়ে বলটাকে আলতো জাগ্‌ল্ করে বলল।

“কাম অন।” পুরু ঝুঁকে দাঁড়াল একটু। পুরু জানে এটা ওর করা উচিত নয়। কারণ এটা ওর হাঁটুর পক্ষে খুব খারাপ। তবু রিস্ক নিতেই হবে।

বল পায়ে দ্রুত এগিয়ে এল দিয়েগো। বাঁ পায়ের সামনে বলটা লাট্টুর মতো ঘুরছে। পুরু একবার সামনে এগোল একটু। দিয়েগো চট করে বলটা একবার সামনে টেনে নিয়ে আবার পুরুর দু’পায়ের মধ্যে দিয়ে গলিয়ে ওকে সহজেই কাটিয়ে বেরিয়ে গেল। পুরু ঘুরে দেখল দিয়েগো হাসছে। পুরু মনে মনে বলল, ভাল, খুব ভাল। এরকম স্কিল সত্যি সহজে দেখা যায় না। পুরু বলল, “গুড। ওয়ান্স মোর।” কিন্তু দ্বিতীয়বারও এক অবস্থা। পুরু ট্যাকেল করার আগেই দিয়েগো ওকে কাটিয়ে বেরিয়ে গেল। আর এবার হাঁটুতে একটু লাগল পুরুর। বড্ড ঝুঁকি নিয়ে ফেলছে ও। পুরু নিজেকেই মনে মনে বলল। তবু টিকে থাকতে হবে। লড়াইটা ছাড়লে হবে না। ও দেখল দিয়েগো হাসছে, বলছে, “দেখলেন তো প্র্যাকটিসে আসি না কেন? আপনার কাছে কিছু শেখার নেই আমার।”

“তাই?” পুরু হাসল, বলল, “বাট আই স্টিল হ্যাভ মাই লাস্ট চান্স। কাম অন দিয়েগো, কাম অন।”

দিয়েগো একবার কাঁধ ঝাঁকাল। তারপর আবার বল নিয়ে এগিয়ে আসতে লাগল। এবার পুরু বেশি এগোল না আর। চট করে একবার দেখে নিল দিয়েগোর চোখ। পুরু জানে দিয়েগো বাঁ পায়ের প্লেয়ার। ওর মাথার মধ্যে অলোকদাই যেন ওকে বললেন, “বাঁ দিকে চুক্কি দে।” তাই হঠাৎ ওর সামনে গিয়ে বাঁ দিকে ঝুঁকল পুরু। রিফ্লেক্সে দিয়েগো বলটা চট করে ডান পায়ে নিয়ে নিল আর সঙ্গে সঙ্গেই পুরু কড়া ট্যাক্‌ল্ করল দিয়েগোর ডান পায়ে। হতভম্ব দিয়েগো দেখল বলটা ওর পায়ে নেই আর। পুরু বলটা পায়ে নিয়ে এবার গোড়ালি দিয়ে জাগ্‌ল্ করছে। পুরু হাসল, বলল, “শেষ হওয়ার আগে কোনও কিছুই শেষ হয় না দিয়েগো। তুমি খুব ভাল খেলো, কিন্তু জেনো বেস্ট ক্যান বি বেটার। এবার তুমি ঠিক করো কাল থেকে প্র্যাকটিসে আসবে কিনা।”

মাঠ ছাড়ার আগে জ্যাকসন এগিয়ে এল পুরুর কাছে। বলল, “স্যার, আপনি ব্যাপক লোক। আপনি এমন কিছু করুন যাতে আমরা রবিন মেমোরিয়ালকে পিষে দিতে পারি। খুব বজ্জাত স্কুল ওটা।”

“স্কুল কখনও খারাপ হয় না মনোময়। রবিন মেমোরিয়াল ভাল স্কুল, তোমরা ওদের হারাতে চাইলে তোমাদের ওদের চেয়ে ভাল হতে হবে। আর একটা কথা তোমাদের জেনে রাখা ভাল আমি কিন্তু রবিন মেমোরিয়ালে পড়াশুনো করেছি। ওটা আমার স্কুল।” জ্যাকসনের অবাক-হওয়া মুখের দিকে না-তাকিয়ে পুরু হাঁটতে শুরু করল।

এন এস এ মাঠ থেকে বেরিয়ে চ্যাটার্জি পাড়ার রাস্তা ধরে হাঁটছিল পুরু। সন্ধে হয়ে এসেছে প্রায়। এখানে পাড়ার ভেতরের রাস্তায় আলো নেই। পিচও ভাঙাচোরা। এত কম লোক যায় এখান দিয়ে তবু রাস্তার এই হাল কীভাবে হল বোঝা মুশকিল। পুরু বুঝতে পারছিল নঙ্গী স্কুলের এই চাকরিটা খুব কিছু সহজ হবে না। দিয়েগো ওদের সবচেয়ে ভাল প্লেয়ার, কিন্তু ও-ই সবচেয়ে বেশি গন্ডগোল করছে। এমন চললে পুরুকে কোনও স্টেপ নিতেই হবে। টিমে ডিসিপ্লিন না-আনলে কিচ্ছু হবে না। এখনও স্কুল কর্তৃপক্ষ ওকে নিয়মিত স্কুলে যেতে বলেননি। পুরুকে শুধু সপ্তাহে দু’দিন স্কুলে গিয়ে ওর প্র্যাকটিসের প্রগ্রেস রিপোর্ট লিখে দিয়ে আসতে হয়। ছোট ক্লাসগুলোর গেমস্ ক্লাস নিতে হয় না ওকে। পুরু জানে এটাই ওর শেষ সুযোগ। সামনের সরস্বতী পুজোর সময়ের ম্যাচটাই আসল।

পুরু হাতঘড়িটা দেখল একবার। এখনও একটু সময় হাতে আছে। ওর পড়ানো সন্ধে সাড়ে সাতটায়। খিদেও পেয়ে গেছে। একটু বাড়ি যাবে কি? কিন্তু কিছু ঠিক করার সময় পেল না পুরু। একটা মোটরবাইক এসে থামল ওর পাশে। “এই পুরু।” পুরু বিলক্ষণ চেনে গলাটা। ও বলল, “কী রে কুশ, তুই? এত দিন কোথায় ছিলি? কোনও খবর নেই। সেদিন ঝামেলার পর এই তোকে প্রথম দেখলাম। জানিস নিশ্চয়ই আমি নঙ্গী স্কুলকে প্র্যাকটিস করাতে শুরু করেছি।” কুশ মোটরবাইক থেকে নামল। রাস্তার পাশে বাইকটা রেখে একটা কালভার্টে বসল। এই জায়গাটায় সামান্য আলো আছে। কারণ সামনে একটা বিশাল বড় জলের ট্যাঙ্ক আর পাম্প হাউস। তার আলোর ছিটেফোঁটায় অন্ধকার এখানে পাতলা। কুশ চুপচাপ বসে রইল কিছুক্ষণ, তারপর বলল, “হ্যাঁ রে, পুরো ডাউন হয়ে ছিলাম এই ক’টা দিন। সেদিন তুই না-বাঁচালে পিটিয়ে তক্তাপোশ বানিয়ে ছেড়ে দিত পাবলিক।”

“তুই মেয়েটাকে কী বলেছিলি বল তো?” পুরু ওর পাশে বসে জিজ্ঞেস করল।

“মা কালীর দিব্যি বলছি কিচ্ছু বলিনি। এমনিই মেয়েটার সঙ্গে একটু ঝাড়ি করার চেষ্টা করি। সেদিনও করছিলাম। এমনকী চোখফোকও মারিনি। কিন্তু কেন যে মেয়েটা এসে ধুয়ে ইস্ত্রি করে দিল বুঝলাম না।”

“তুই কিচ্ছু বলিসনি?” পুরু অবিশ্বাস ভরা চোখে কুশের দিকে তাকাল।

“মাইরি, শুধু যখন ও ঝাড়ছিল আমি চাপে পড়ে বলে ফেলেছিলাম যে ওর পিঠটা মন্দিরা বেদীর মতো।”

“মন্দিরা বেদীর মতো পিঠ না বিষান সিং বেদীর মতো পিঠ, তোকে কে বলতে বলেছে? সত্যি এমন ঝামেলা পাকাস না! আর তুই জানিস না যে মেয়েটা সাংঘাতিক? যাক গে, আর ওর পেছনে ঘুরিস না। সবসময় কিন্তু আমি বাঁচাতে যাব না। মাথায় রাখিস।” পুরু বিরক্তির সঙ্গে উঠে দাঁড়াল।

কুশও আর বসল না। উঠে বাইকে স্টার্ট দিল। পুরু জিজ্ঞেস করল, “এখন কোথায় যাচ্ছিস?”

কুশ বাইকের আওয়াজের ওপরে গলা তুলে বলল, “যাই, রাধাকাকুর মেয়েকে সময় দেওয়া আছে।”

পুরু অবাক হয়ে বলল, “এত কিছুর পরেও তোর স্বভাব গেল না?”

কুশ মুচকি হাসল, “জলে থাকলেও মাছের কি গায়ের গন্ধ যায়? ও কে, বাই? কুশের বাইকের টেল লাইটটা দ্রুত রাস্তার বাঁকে মিলিয়ে গেল।

আজ সঙ্গে সাইকেল নেই পুরুর। ও মেন রোড না-ধরে পাড়ার ভেতর দিয়ে বাড়ি ফিরতে লাগল। এই রাস্তাটা কংক্রিটে বাঁধানো। কিন্তু এখানেও বিশেষ আলো নেই। এর-ওর বাড়ির আলোয় রাস্তাটা আবছা দেখা যায়। পুরু এই আলো আঁধারির মধ্যে কাকে যেন ওর বাড়ির রাস্তার বাঁকের মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। মুখটা স্পষ্ট বুঝতে না পারলেও দাঁড়ানোর ভঙ্গিটা দেখে পুরুর পিঠ দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল একটা। ও আবার কেন?

পুরুকে দেখে ছায়া থেকে বেরিয়ে এল টাপুর। পুরু দেখল আজ একদম সাজেনি মেয়েটা। আজ শুধু একটা জিনস্ আর জ্যাকেট পরে আছে। তাতেও অসাধারণ লাগছে টাপুরকে। টাপুরের গুণেই বোধহয় ওদের গরিব গলিটা পার্ক স্ট্রিটের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। এত সুন্দর একটা মেয়ের মনটা এমন কেন? যাক গে। পুরু নিজেকে সতর্ক করে নিল। টাপুর খুব নিচু স্বরে বলল, “আপনাকে একটা জিনিস দেব বলে দাঁড়িয়ে আছি।”

“আমায়?” পুরু আশ্চর্য হল।

“হ্যাঁ, এটা। আগে আপনি এর কোনও উত্তর দেননি। এবার কিন্তু প্লিজ দেবেন।” টাপুর একটা খাম এগিয়ে দিল পুরুর দিকে।

পুরু হতভম্ব হয়ে যন্ত্রের মতো হাত বাড়িয়ে খামটা নিল, “কী এটা?”

“পড়ে দেখবেন। আমি আমার মোবাইল নম্বর ওতে দিয়ে দিয়েছি। একটা ফোন করলে ভাল লাগবে।” টাপুর চলে যাবে বলে পেছন ফিরল। পুরুর হঠাৎ রাগ চড়ে গেল মাথায়, পেয়েছে কী মেয়েটা? ও কড়া গলায় বলল, “টাপুর, দাঁড়াও। আবার এসব শুরু করেছ? আবার চিঠি দিয়েছ? কী চাও তুমি? না, কোনও কথা বলবে না। উত্তর চাই তোমার, না? এই নাও উত্তর।” পুরু খামটা চার টুকরো করে ছিঁড়ে টাপুরের হাতে দিয়ে হাঁটতে শুরু করল।

মেয়েটা নিশ্চয়ই আবার কোনও গন্ডগোল পাকানোর তালে আছে। একবার শিক্ষা হয়েছে পুরুর। আর নয়। পুরু ফিরেও দেখল না পেছনে। টাপুর থাকুক বা যাক ওর কী? ও কেয়ার করে না। এমনিতেই ওর জীবনে হাজারটা ঝামেলা। তার মধ্যে আর নতুন ঝামেলা ভাল লাগে না। এসব চিন্তা করতে করতে পুরু প্রায় ওর বাড়ির সামনে এসে পড়েছে হঠাৎ একটা সাইকেল পেছন থেকে এসে গা ঘেঁষে দাঁড়াল। পুরু চমকে উঠে সরে দাঁড়াল। “স্যার!” কবীরের গলা। পুরুর সঙ্গে আলাপ হয়েছে ওর মাঠে। পুরু জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার? তুমি? কিছু বলবে?”

কবীর যেন দম নিল একটু, তারপর ফিসফিসে গলায় বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ স্যার, থ্যাঙ্ক ইউ ভেরি মাচ।”

“থ্যাঙ্ক ইউ? কেন? কী ব্যাপারে?” পুরু অবাক হয়ে গেল।

কবীর হাসল, “স্যার, ইউ হ্যাভ মেড মাই ডে। থ্যাঙ্ক ইউ।”

আর দাঁড়াল না কবীর! সাঁ করে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে গেল। পুরু অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কী হচ্ছে সব? কিচ্ছু বুঝতে পারছে না ও। কবীর হঠাৎ ওকে থ্যাঙ্কস জানাল কেন?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *