কুশকে দোকানের সামনে মোটরবাইক স্ট্যান্ড করতে দেখল পুরু। ওর সাতটায় আসার কথা, এখন সওয়া আটটা বাজে। পুরু ভেবেছিল সাড়ে সাতটার মধ্যে কথা সেরে ছাত্রের বাড়ি যাবে পড়াতে। কোথায় কী! কুশটা যা তা। আজ পড়ানোটাই মাটি হল। ছাত্রের মা ভাল হলেও ছাত্রের বাবাটা এক পিস জিনিস। একদিন না-গেলেই খ্যাঁচ খ্যাঁচ করে। হাজার কারণ জানতে চায়। এ-মাসের মাইনেটাও দিতে ঠিক ঝোলাবে।
এসব ভাবতে ভাবতেই কুশ দোকানে ঢুকল। দোকানটা হল ‘চক্রবর্তী টি স্টল’। বাটানগরের কফি হাউস। সন্ধে হতে-না-হতেই রাজত্বের লোক এসে হাজির হয় এখানে। কেউ সচিন তেন্ডুলকরকে ব্যাট করতে শেখায়, কেউ সানিয়া মির্জার স্কার্টের ঝুল আর একটু কমিয়ে দিতে চায়, কেউ আবার বিশ্ব রাজনীতিতে নেতারা কোথায় কোন ভুল করছে তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। এখানের সবাই সব বোঝে।
কোণের দিকে একটা বেঞ্চে বসে ছিল পুরু। ওর সামনে এসে ধপ করে বসল কুশ। পুরু বেজার মুখে বলল, “এই তোর সাতটা? ফালতু টিউশনটা মিস করলাম। জানিস তো ছাত্রের বাবাটা কেমন বিষাক্ত টাইপের।”
কুশ পাত্তাই দিল না, “ছাড় তো। কিচ্ছু হবে না। টিউশন করে কেউ বড়লোক হয় না। তা ছাড়া ছাত্রের মা তো তোর ফেভারে। ওই কাল গিয়ে একটু চুমু খেয়ে নিবি সব সাইজ হয়ে যাবে। আরে আমার লেট হয়ে গেল একটু মাপামাপি করতে গিয়ে।”
“মাপামাপি? মানে?” পুরু অবাক।
“ওই ‘স্টাডি এড’ কোচিং সেন্টারে একটা ব্যাচ শেষ হল তাই মেয়েগুলোকে দেখব বলে অপেক্ষা করছিলাম। ওফ্, যা সব মেয়ে আছে না, ডাক ছেড়ে কঁদতে ইচ্ছে করে। এত ভাল ভাল পিস কাদের বাড়িতে যাবে রে? কোন রেশনের চাল খায় এরা? এর মধ্যে বিশেষ করে একটা মেয়ে আছে, মাইরি ওর জন্য যুদ্ধ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু মেয়েটা কিছুতেই আমায় পাত্তা দেয় না, কেন বল তো?”
পুরু হাসল। একবার মণি বলে একটা মেয়েকে পছন্দ হয়েছিল কুশের। মেয়েটা ওকে একদম পাত্তা দিত না। কুশ একদিন সোজা মণির বাড়িতে গিয়ে হাজির হল। মণির মা দরজা খুলেছিল। কুশ পকেট থেকে একজোড়া সোনার চুড়ি বের করে বলেছিল, “মাসিমা, এই চুড়িদুটো আমার মা আপনার মেয়ের জন্য পাঠিয়েছে। আপনার মেয়ে খালি হাতে রাস্তায় বেরোয়। আমার একদম ভাল লাগে না। আরে আমারও তো একটা প্রেস্টিজ আছে নাকি।” মণির মা এত আশ্চর্য হয়েছিল যে কুশকে থাপ্পড় না মেরে উলটে জিজ্ঞেস করল, “তোমার প্রেস্টিজ মানে?”
“বা রে, আফটার অল আমার বউ হবে তো।” নির্ভয়ে জবাব দিয়েছিল কুশ। সেদিন খুব জোর ধােলাই খেত ও। স্রেফ মোটরবাইকটা ছিল বলে বেঁচে গিয়েছিল।
আরেকবারও অন্য একটা মেয়েকে সরাসরি প্রপোজ করতে গিয়ে কুশ বলেছিল, “তোমার মতো এত সুন্দর বুক আমি আর কারও দেখিনি।” সেবার অবশ্য থাপ্পড়টা মিস হয়নি। পরে জিজ্ঞেস করাতে কুশ বলেছিল, “না রে বুকটা বলতে চাইনি। বলতে চেয়েছিলাম ওর সুন্দর মুখটা দেখলে আমার বুকটা কেমন করে। কিন্তু টেনশনে সব মিলেমিশে কেমন গুবলেট হয়ে গেল।”
সেই কুশ এখন বসে আছে পুরুর সামনে। লেট করে এসেছে বলে তো কোনও অনুশোচনাই নেই বরং দাঁত দেখাচ্ছে। পুরু বলল, “বাদ দে ওসব। কাকু কিছু করতে পারলেন?”
কুশের হাসিখুশি মুখটা হঠাৎ দপ্ করে নিভে গেল। পুরু বুঝল ব্যাপারটা। কুশ বলল, “না রে হয়নি। বাবা বলল ওরা অন্য আরেকজনকে নিয়ে নিয়েছে। বাবার বসের এক ক্যান্ডিডেট। জানিসই তো সব জায়গায় চূড়ান্ত দলবাজি!”
দোকানের ভিতরটা হঠাৎ খুব গুমোট লাগতে শুরু করল পুরুর। সারা পৃথিবীটা আলেকজেন্ডারে ভরে গেছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, ও একাই পুরু। সবসময় হারে। কুশের বাবা একটা বড় সফটওয়্যার কোম্পানির অ্যাডিশনাল জেনারেল ম্যানেজার। ওঁদের ওখানে একজন ডেটা এন্ট্রির লোক দরকার ছিল। পুরুর কম্পিউটারে ডিপ্লোমা আছে। ও বলেছিল কুশের বাবাকে। কিন্তু হল না। এই চব্বিশ বছর বয়সে এসে পুরু বোঝে যে একটা গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি আর একটা কম্পিউটার ডিপ্লোমা দিয়ে কোনও যুদ্ধই জয় হবে না। কিন্তু হত না কি? ওর যা অস্ত্র ছিল তাতে হয়তো হত। যদি না সেই দুর্ঘটনাটা ঘটত।
তখন সদ্য কলেজ পাশ করেছে পুরু। কলকাতায় একটা ‘এ’ ডিভিশন ক্লাবের হয়ে ফুটবল খেলে। আর বেশ ভাল খেলে। ময়দানের বড় ক্লাবগুলোও তখন নজর রাখছে ওর ওপর। সবাই বলছে ফুটবলার হিসেবে ওর ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। বাড়িতে অভাব চিরকাল ছিল। বাবা বাটা কোম্পানির ওয়ার্কার। দুই দিদি। মা হাঁপানির রুগি। মানে একদম বাংলা সিনেমার গল্পের মতো জীবন। বাড়িতে নিত্য অশান্তি বাঁধা। পুরু বুঝত একটা চাকরি ওকে পেতেই হবে। আর এইসবের মধ্যে ওর আনন্দ, ওর জীবন বলতে ছিল সবুজ মাঠ আর একটা ফুটবল। খেলতে খেলতে প্রায় সবকিছু ভুলে যেত ও।
সেরকমই একসময় রেলওয়েজের একটা ট্রায়াল ম্যাচ ছিল। পাশ মানেই রেলের চাকরি। পুরুদের কোচ অলোকদা বলেছিলেন, “তুই একরকম সিলেক্ট হয়েই আছিস। ম্যাচটায় শুধু তোর স্বাভাবিক খেলা খেল। ব্যস, সেটাই এনাফ।” দারুণ আনন্দ হয়েছিল পুরুর। ভেবেছিল বাবার খোঁটা আর দিনরাত বাড়ির অশান্তি থেকে রেহাই পাবে এবার। তাই কি সেদিন একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল? স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে সাইকেল করে বাড়ি ফিরছিল পুরু। তখন বেশ রাত। রাস্তা ফাঁকা। ঝড়ের বেগে সাইকেল চালাচ্ছিল ও। মাথার ভিতর শুধু ম্যাচের চিন্তা। তাই কি হর্নটা শুনতে পায়নি? যখন বুঝেছিল যে গাড়িটা একদম পেছনে চলে এসেছে, তখন আর কোনও উপায় ছিল না। গাড়িটা সাইকেলের পিছনে মেরেছিল। অনেকটা দূরে ছিটকে পড়েছিল পুরু। জ্ঞান হারাবার ঠিক আগের মুহূর্তে পুরুর মনে পড়েছিল যে কালকের ম্যাচটা আর খেলা হবে না ওর। আসলে আর কোনও দিনই ফুটবল খেলা হয়নি পুরুর। শরীর থেকে প্রচুর রক্ত বেরিয়ে গিয়েছিল। পুরুর রক্তের গ্রুপটাও একটু রেয়ার। এবি নেগেটিভ। খবর পেয়ে অলোকদা এসেছিলেন। অলোকদার রক্তের গ্রুপও এবি নেগেটিভ। অলোকদার রক্ত পেয়েছিল বলেই বোধহয় প্রাণে বেঁচে গিয়েছিল পুরু। ভাঙা হাঁটু সারতে অনেক সময় লেগেছিল। কিছুটা দৌড়োলে এখনও হাঁটুতে ব্যথা হয়। মনে হয় মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে যাবে। তাই সবসময় ‘নি ক্যাপ’ পরে থাকতে হয় ওকে। তার ফলে সাইকেলটা অন্তত চালাতে পারে।
“কী হল রে অত ডাউন হয়ে গেলি কেন?” কুশ খোঁচাল। সংবিৎ ফিরল পুরুর, “না কিছু না, এমনি।”
“শোন, মনখারাপ করিস না। তোর জন্য অন্য একটা খবর আছে। দেখ সেটায় যদি কোনও কাজ দেয়।” কথাটা বলে কুশ এবার একটু হাসল যেন।
পুরু তেমন উৎসাহ পাচ্ছিল না। তবু জিজ্ঞেস করল, “কী খবর?”
“বলব, আগে দুটো চা বলি।” কুশ চেঁচিয়ে দুটো লেবু চা দিতে বলল। তারপর পুরুর দিকে ফিরে শুরু করল, “তুই জানিস তো যে আমার জেঠু নঙ্গী স্কুলের সেক্রেটারি। বাবা তোর কথা জেঠুকে বলেছে। মানে, তুই যে ভাল প্লেয়ার ছিলি সেটাই আর কী। নঙ্গী স্কুলে গেমস টিচারের পোস্টটা খালি আছে। জেঠু আজ একবার তোকে নিয়ে যেতে বলেছে। চল আমার সঙ্গে। দেরি করা ঠিক হবে না।”
পুরু একটা আশার আলাে দেখল যেন। তারপর ভাবল ওর যা কপাল! ও জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু ওদের এস এস সি পরীক্ষা নেই?”
“ধুর, প্রাইভেট স্কুল তো। ওরা ডাইরেক্ট অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেয়।” কুশ আশ্বস্ত করল।
“কিন্তু হবে কি?” পুরু মাথা নিচু করে বসে রইল।
“ডোন্ট বি সো পেসিমিস্টিক। চা-টা শেষ করে তাড়াতাড়ি চল।” কুশ এবার একটু ধমক দিল।
ওরা দোকান থেকে বেরিয়ে পড়ল। কুশের মোটরবাইকেই যাবে। পুরু দোকানের পাশে ওর সাইকেলটা রেখে গেল। দোকানের আশুদা ঠিক দেখবে। ওরা বাইকে উঠতে যাবে, ঠিক তখনই এক বিপত্তি। পেছন থেকে একটা গলা এল, “এই যে কেষ্ট ঠাকুর একটু দাঁড়াও।” ওরা মুখ ফিরিয়ে দেখল রাধাকাকু।
মুখটা গম্ভীর হয়ে আছে রাধাকাকুর। কী ব্যাপার কে জানে। ছোটবেলা থেকেই রাধাকাকুকে চেনে পুরু— অবশ্য রাধাকাকুকে কে না চেনে? ছেলে থেকে বুড়ো সবার কাছে রাধাকাকু পরিচিত মুখ। কিন্তু আজ মুখটা গোমড়া কেন? পুরু জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে রাধাকাক?” রাধাকাকু পুরুকে পাত্তাই দিল না। গম্ভীরভাবে কুশকে প্রশ্ন করল, “তুই খুব লায়েক হয়েছিস, না? আমার মেয়ের পেছনে খুব ঘুরছিস? আমাদের বাড়ির ঝি-টা বলছিল ও তোদের একসঙ্গে নিউল্যান্ড মাঠে দেখেছে। অন্ধকারে তোরা বসে কী করছিলি?”
কুশ এমন মুখ করল যেন আকাশ থেকে পড়ছে, “কী বললে? কে বলেছে? তোমাদের ঝি? ছি ছি রাধাকাকু তুমি ঝিয়ের কথায় নাচো? আর তোমার মেয়েকে কি তুমি অন্ধকারে বসে থাকার শিক্ষা দিয়েছ?”
রাধাকাকু থতমত খেল, “তার মানে তই বলতে চাস ঝি-টা ভুল দেখেছে?”
“দুশো পারসেন্ট। আরে আমার আলোতে বসারই সময় নেই তো অন্ধকারে বসব! সত্যি, তোমরা যে কী না! তবে ভালই হল তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে।”
“কেন?” রাধাকাকুর এখনও সংশয় কাটেনি।
“কারণ ঘুড়ি।”
“ঘুড়ি!” রাধাকাকুর মুখে পৌনে এক হাসি।
“বাবা এবার তাইওয়ান যাচ্ছে, ভাবছিলাম তোমার জন্য ফোল্ডিং ঘুড়ি আনতে বলব কিনা? বেশ বড়, পাখির মতো দেখতে। প্যারাসুট কাপড়ের ঘুড়ি।”
রাধাকাকু আর পারল না। সব ভুলে, গলে জল হয়ে টোপটা গিলল, “বা বা, বেশ বেশ, তাই বলিস। আমিও তোদের কাকিমাকে বলছিলাম যে ঝি-টা ভুল দেখেছে। তা বাবা কবে যাচ্ছেন?”
কুশ বলল, “সামনের মাসে।”
“সামনের মাসে?” দেরি আছে বুঝে রাধাকাকু আবার সলিড ফর্মে ফিরে এল।
“তো? ডিসেম্বরেই আসবে ঘুড়ি।” যেন দু’বছরের বাচ্চাকে স্তোক দিচ্ছে এমনভাবে বলল কুশ। তারপর আর সময় নষ্ট করল না। বলল, “আজ আসি কেমন? পরে কথা হবে।”
রাধাকাকু একা রাস্তায় দাঁড়িয়ে নিজের মনে হাসতে লাগল। পুরু বুঝল এই সন্ধেবেলা রাধাকাকু মনে মনে ঘুড়ি ওড়াতে শুরু করেছে। লাল টকটকে পাখির মতো একটা ঘুড়ি।
মোটরবাইকে যেতে যেতে পুরু জিজ্ঞেস করল, “হ্যাঁরে কুশ, রাধাকাকুর মেয়ের সঙ্গে তুই সত্যি নিউল্যান্ডের অন্ধকারে বসেছিলি?”
“হ্যাঁ। ওরকম মেয়ের সঙ্গে কক্ষনও আলোয় বসতে নেই। রাধাকাকুর মতো আতার তো সমাজে ওই একটাই কন্ট্রিবিউশন, ঝংকার টাইপের একটা মেয়ে। ভাল করে লক্ষ করে দেখবি ড্রিউ ব্যারিমোর, প্রীতি জিনটা আর ডেমি মুরের ককটেল একটা। যে খাবে নেশা হয়ে যাবে। আর যা চুমু খায় না, মনে হয় ঠোঁটদুটো ছিঁড়ে বাড়িতে নিয়ে আসি।”
“যাক তবে তুইও প্রেমে পড়লি!”
“তুইও আরেক পিস আতা। প্রেমে পড়তে যাব কেন? তবে গায়ে পড়েছি বলতে পারিস।” কুশ হ্যা হ্যা করে হাসছে। পুরু আর বেশি ঘাঁটাল না। নন-ভেজ গন্ধটা ভালই পাচ্ছে।
পুরু কি এরকম পারত? প্রচণ্ড বৃষ্টির দিনে একবার একজন ওকে বলেছিল চুমু খেতে। পুরু তখন কলেজে পড়ে। মেয়েটার নাম ছিল তমালী। ভারী চটপটে মেয়ে। হইহই করে গান গায়, খলখল করে কথা বলে। কে জানে কেন, প্রথম থেকেই ও পুরুকে পছন্দ করত। অত লাউড মেয়ে পুরুর ভাল লাগত না। কিন্তু স্বভাব মুখচোরা বলে কিছু বলতেও পারত না। আসলে ওর ভাল লাগত সুনেত্রাকে। ফরসা ছিপছিপে ভারী মিষ্টি মুখের মেয়ে ছিল সুনেত্রা। পুরু কোনওদিন তেমন বলিয়ে কইয়ে নয়। ফলে সুনেত্রাকে কিছু বলতে পারেনি। পরু শুধ তাকিয়ে থাকত। সুনেত্রা মাঝে মাঝে তাকাত, হাসত। ব্যস ওটুকুই। এদিকে তমালী পুরুকে নিজের সম্পত্তি মনে করত। পুরুর চুলটা হয়তো কপালে এসে পড়েছে অমলি তমালী বড় বড় চোখ করে বলত, “কপাল থেকে চুলটা সরা।” কখনও আবার বলত, “কী সব জামা পরে আসিস? একদম জংলির মতো লাগে।” আবার নিজের টিফিন থেকে জোর করে খাওয়াতও ওকে। এরকমই চলত। পুরু একদম কাঁটা হয়ে থাকত সবসময়।
তারপর একদিন ঘটনাটা ঘটল। প্রচণ্ড বৃষ্টিতে সেদিন কলকাতা প্রায় অচল। পুরুরা কয়েকজন আটকে পড়েছে কলেজে। বাকিরা কমনরুমে থাকলেও তমালী পুরুকে জোর করে নিয়ে গিয়েছিল একটা ফাঁকা ক্লাসরুমে। কী ব্যাপার? পুরু আশ্চর্য হয়েছিল। তমালী বলেছিল, “দেখ তো আমার কাঁধটাতে কী কামড়েছে?” বলেই বড় গলার গেঞ্জিটা একটানে কাঁধ থেকে নামিয়ে দিয়েছিল ও। ফরসা কাঁধের ওপর কালো স্ট্র্যাপ। পুরুর দম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, বলেছিল, “কই কিছু না তো।” “ভাল করে দেখ।” তমালী পুরুর মাথাটা টেনে নিয়েছিল কাঁধের ওপর। ওর নাকের সামনে দারুণ ফরসা একটা কাঁধ, তার ওপরে কেটে বসা একটা কালো স্ট্র্যাপ। কী সুন্দর গন্ধ আসছে! হঠাৎ শরীর ঘুরিয়ে পুরুর মুখটাকে বুকে চেপে ধরেছিল তমালী। ফিসফিস করে বলেছিল, “কিস মি, পুরু, কিস মি হার্ড।” থতমত খেয়ে গিয়েছিল পুরু। দমবন্ধ হয়ে আসছিল ওর। ততক্ষণে পুরুর মুখটা দু’হাতে তুলে ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিয়েছে তমালী। ভেজা, মিন্টের গন্ধ, অল্প কামড়, সব গণ্ডগোল হয়ে যাচ্ছিল পুরুর। কিছু পরে ঠোঁট তুলে নিয়েছিল তমালী, বলেছিল, “যা আজ থেকে তুই আর আমার নোস। তোকে দেখলাম। বড্ড বোকা বোকা রকম ভাল তুই। ভাল আর ইনএফিশিয়েন্ট। চুমুটাও খেতে পারিস না।” গটগট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল তমালী। আর তখনই দূরের জানলায় চোখ পড়তে কেঁপে উঠেছিল পুরু। বারান্দায় দাঁড়িয়ে সুনেত্রা একদৃষ্টে ওর দিকেই তাকিয়ে। পুরুর ঠোঁটের চিনচিনে ব্যথাটা নেমে এসেছিল বুকে। কিন্তু সর্বনাশ যা হবার হয়ে গিয়েছিল। সুনেত্রা আর কোনওদিন ওর দিকে তাকিয়ে হাসেনি। সেটুকু আজও মনের মধ্যে খচখচ করে পুরুর। সুনেত্রার সঙ্গে তো ওর কোনও সম্পর্ক ছিল না, তবু কেন যে খারাপ লাগাটা আজও মনে লেগে আছে পুরু বুঝতে পারে না। অবশ্য কতটুকুই বা ও বুঝতে পারে?
আজ মোটরবাইকের পেছনে বসে সেইসব কথাই মনে পড়ে গেল। পুরুর। কুশের মতো কেন যে হতে পারল না ও!
কুশদের জ্যাঠার বাড়িটা বিশাল বড়। বাড়ির ভেতরে একটা ছোটখাটো মাঠ আছে, এমনকী শান-বাঁধানো পুকুরও আছে একটা। তা ছাড়া বাগানটাও খুব সুন্দর। পুরু বহুবার এই বাড়ির সামনে দিয়ে গেছে। কিন্তু বড় লোহার গেট পেরিয়ে এই প্রথম বাড়ির মধ্যে ঢুকল। কুশ বলল, “জেঠু একটু মুডি মানুষ, ভুলভাল কথা বললে কিছু মনে করিস না। যতটা পারবি উত্তর দিবি। ঘাবড়াবি না। জানবি মানুষ হিসেবে কিন্তু খুব ভাল।”
“সে কী রে! ইন্টারভিউ নাকি?” রকমসকম দেখে পুরুর জিভ শুকিয়ে গেছে।
“ঘাবড়াচ্ছিস কেন? যা প্রশ্ন করবে জাস্ট উত্তর দিবি।” কুশ পুরুকে আশ্বস্ত করল।
বাড়ির ভিতরটা আরও সুন্দর। দাবার ছকের মতো মেঝে, রোজ উডের গ্র্যান্ড পিয়ানো, কালো কাঠের ঠাকুরদাদা ঘড়ি। পুরুর হাঁটু কাপতে লাগল। ভাবল এ কোথায় এসে পড়ল রে বাবা। বাটানগরে এরকম বাড়ি থাকতে পারে? কুশের জ্যাঠা ড্রইং রুমেই ছিলেন। পুরু বুঝল, ওদেরই অপেক্ষা করছিলেন।
“এই তোর ক্যান্ডিডেট?” কুশের জ্যাঠা প্রাণবল্লভ মিত্রর গলায় যেন গোটা সুন্দরবনটাই ডেকে উঠল। গলার আওয়াজের সঙ্গে মানানসই চেহারা। যেমন লম্বা তেমন চওড়া। অর্থাৎ, শুধু গলার স্বরটাই বাঘের মতো নয়, চেহারাটাও সমস্ত বাঘের সাত দিনের খাবার। এরকম বাঘ ভল্লুক টাইপের লোকের সামনে পুরু দেখল কুশও নার্ভাস হয়ে পড়েছে। পুরু বুঝল জ্যাঠা মানুষটা কড়া ধাতের। “কী নাম তোমার?” এবার বাঘ ডাকল পুরুর উদ্দেশে। পুরু নাম বলল। “কী নাম বললে, পুরু? তা, তুমি আমার থেকে কেমন ব্যবহার আশা করো পুরু?” প্রশ্নটা করেই হা হা করে হেসে উঠলেন তিনি। খুব মজা পেয়েছেন। পুরু আরেকটু হলেই নার্ভাস হয়ে হিস্ট্রির উত্তরমতো বলতে যাচ্ছিল ‘রাজার প্রতি রাজার মতো’, কিন্তু তা না-বলে আমতা আমতা করে চুপ করে গেল। জ্যাঠা আবার চিৎকার দিলেন, “শুনেছি ভাল ফুটবল খেলতে। চোট পেয়ে আর খেলতে পারোনি? ছাত্রদের সঙ্গে দৌড়াদৌড়ি করতে পারবে তো?”
“হ্যাঁ পারব।” সংক্ষেপে জবাব দিল পুরু।
“জানো তো আমাদের স্কুলে গেমস বলতে ফুটবলটাই হয়। তোমার সেটাই দেখতে হবে, কেমন?”
পুরু মাথা নাড়ল।
“ঠিক আছে। সামনে আমাদের একটা ম্যাচ আছে রবিন মেমোরিয়ালের সঙ্গে, সেটা হয়ে যাক! দেখি কী করতে পারি। তবে একটা কথা, যদি কাজটা পাও তবে মন দিয়ে কাজ করবে। বেগড়বাই দেখলেই কিন্তু ঘাড় ধরে বের করে দেব। নাও, তোমরা কিছু খেয়ে নাও এবার।”
ওরে বাবা এ জ্যাঠামশাই না ঠ্যাটামশাই? এই হেমন্তকালেও কুলকুল করে ঘামছে পুরু। এ যে বৃদ্ধ আলেকজেন্ডার!
ঘাড় ধরার কথাটা ঠিক হজম হচ্ছিল না পুরুর। তাই ঠিকমতো খেতে পারল না। ফেরার পথে পুরুকে চুপচাপ দেখে কুশ বলল, “ফিকর নট। ঘাড় ধরার কথায় ভয় পাস না। ওটা গুড সাইন।” সাইন, না ঝাড় খাওয়ার আগের সাইনবোর্ড, বুঝল না পুরু।
রাত্রে ছাদে একা দাঁড়িয়েছিল ও। মাথার ওপর কার্তিক মাসের আকাশ। কোটি কোটি তারার মধ্যে নির্জন কালপুরুষ। এ-সময়টা হিম পড়ে। পুরু ভাবছিল বাবা আজকেও খেতে বসে খোঁটা দিয়েছে। পুরু নাকি অন্ন ধ্বংস করছে। স্কুলের চাকরিটা সত্যি খুব দরকার ওর। কিন্তু হবে কি? শেষ মুহূর্তে আবার সব গন্ডগোল হয়ে যাবে না তো? হঠাৎ ও দেখল একটা বড় উল্কা খসে পড়ল আকাশের এক মাথা থেকে আরেক মাথায়। ঠিক যেন কর্নার ফ্ল্যাগের কাছ থেকে কেউ সেন্টার করল গোল মুখে। উল্কা দেখে কেউ যদি কিছু চায় সেটা নাকি সফল হয়— পুরু শুনেছে। দেখবে নাকি চেয়ে? ভগবান টগবান বিশেষ বিশ্বাস করে না পুরু। তবু আজ খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে ওর। পুরু চোখ বন্ধ করল। দেখা যাক কর্নার ফ্ল্যাগের থেকে ভেসে আসা সেন্টারটায় গোল হয় কিনা!
