এবার বাসন্তী শাড়িই পরবে টাপুর। গত কয়েকবারে সরস্বতী পুজোয় ও নিজের ইচ্ছেতেই শাড়ি পরেনি। বাবা মা প্রতিবারই শাড়ি পরতে বলে কিন্তু ও পাত্তা দেয় না। ধুত, কে পরে শাড়ি? এবারও তেমনই ভেবেছিল। কিন্তু আজ নিউল্যান্ড স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁঠালচাঁপা আর বকুল ফুলের গাছের ফাঁক দিয়ে একফালি নখের মতো চাঁদ আর তার বাসন্তী আভা দেখে কেন কে জানে হঠাৎ শাড়ির কথাটাই মনে পড়ল টাপুরের। আর দু’দিন পরে সরস্বতী পুজো। হয়তো সেইজন্যই।
“শাড়ি পরলে তোমাকে নদীর মতো দেখায়। মনে হয় বহুদিন পর হাজার হাজার মাইল মরুভূমি পেরিয়ে নদীর জলে পা ডুবিয়ে বসলাম। সেদিন তুমি পেয়ারাগাছের গোড়ায় ঠেস দিয়ে বসে কাঁদছিলে আর আমি দেখছিলাম ঘাসের ওপর একটা একটা করে মুক্তো ঝরে পড়েছে। আমরা যারা দারিদ্র্য সীমার নীচে বেঁচে থাকি তাদের কাছে ওই এক একটা মুক্তোর কত দাম তুমি জানো?” ক্লাস এইটে পড়ার সময় সোমাদির গানের ক্লাস থেকে গঙ্গার ধারে একবার পিকনিকে গিয়েছিল টাপুর, সব মেয়েরাই সেদিন শাড়ি পরেছিল। অন্য একটা মেয়ের সঙ্গে অন্ত্যাক্ষরী খেলা নিয়ে ঝগড়া হয়েছিল ওর। মেয়েটা ওকে বলেছিল, “বড়লোকের বখাটে মেয়ে।” খুব দুঃখ লেগেছিল টাপুরের। গঙ্গার ধারে বাঁধের দিক থেকে হাওয়া দিচ্ছিল একটা। সেটা ছিল বসন্তকাল। নানা ফুলের গন্ধও ভেসে আসছিল দিগ্বিদিক থেকে। আর এর মধ্যে একটা পেয়ারা গাছের গোড়ায় বসে কাঁদছিল টাপুর।
সোমাদির গানের ক্লাসের ছেলেরাও ছিল সেই পিকনিকে। তাদের মধ্যেই কেউ একজন টাপুরকে একটা চিঠি লিখেছিল। গোটা চিঠির মধ্যের এই কথাগুলো আজও মনে আছে ওর। ছেলেটা কে ছিল আজ পর্যন্ত জানতে পারেনি ও। কিন্তু কখনও কখনও ওর এই কথাগুলো মনে পড়ে যায়।
টাপুর নিজের মনেই হেসে ফেলল। সত্যি কত দিন আগের কথা মনে হয় এসব। এবার একবার ঘড়ি দেখল টাপুর। সাড়ে ছ’টা। একজনের আসার সময় হয়ে গেল। আর মিনিট পাঁচ-দশেক বড়জোর। এখন জানুয়ারির শেষ। ঠান্ডার ধার কমে এসেছে অনেকটা। এবার ঠান্ডাটা যেমন হঠাৎ করে পড়ল, তেমনই হঠাৎ করে চলেও গেল। সব ব্যাপারেই এবার যে কী হচ্ছে! কালীপুজোর পর থেকেই সব কেমন গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আর যাতে গোলমাল না হয়, যাতে সব ঠিকঠাক চলে সেইজন্যই তো আজ এই নিউল্যান্ড স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ও। অবশ্য এর মাস্টার মাইন্ড রুদ্র। সব প্ল্যান ওর করে দেওয়া। টাপুর রুদ্রর গোটা প্ল্যানটা মনে মনে ভাবল। সত্যিই পুরোটা ফুল প্রুফ। রুদ্র সত্যিই জিনিয়াস। রুদ্রর সম্বন্ধে অনেক খারাপ কথা শোনে টাপুর। সেগুলোর কিছু হয়তো সত্যিও। কিন্তু তাতে কিছু এসে যায় না টাপুরের। রুদ্র সত্যিই ওর দাদার মতো। যখন যা দরকার পড়ে, যখন কিছু পরামর্শের দরকার হয় তখন টাপুরের প্রথমে রুদ্রর কথাই মনে পড়ে। পুরুর সঙ্গে শেষ সাক্ষাতের পরও যেমন ওর মনে পড়েছিল। কিন্তু মন এত খারাপ ছিল যে কারও সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছেই হয়নি।
পুরুর সঙ্গে সেই সন্ধের ঘনিষ্ঠতার ওম এখনও টের পায় টাপুর। খুব কষ্ট হয় ওর। এখনও লেপের ওমের মধ্যে শুয়ে পুরুর নিশ্বাস যেন ওর বুকের মধ্যে টের পায় টাপুর। শরীরে কাঁটা দিয়ে ওঠে। ও বোঝে শরীরের ভেতরে যেমন আনন্দ লুকোনো থাকে তেমন কষ্টও লুকোনো থাকে। টাপুর ভেবেছিল শিমুলকে বলবে এসব কথা। কিন্তু শিমুলটা যেন কেমন হয়ে গেছে। সেই একাচোরা, জিরো কনফিডেন্স মেয়েটা যেন আর নেই। এখন মাঝে মাঝে শিমুলকে আমনের সঙ্গে দেখা যায় বাটা ব্রিজের ঢালে বসে গল্প করতে। টাপুর জানে শিমুলের আর ওর কথা শোনার তেমন সময় নেই। এখন থাকার মধ্যে আছে কেবল রুদ্র।
ওর কথায় এই রুদ্রই একবার কবীরকে পিটিয়েছিল। কিন্তু ছেলেটা এত কানকাটা যে আবার এক সন্ধেয় গুচ্ছের গিফট্ নিয়ে এসেছিল। তবে সেদিন মজা হয়েছিল খুব। কবীরের বাবা একদম মোক্ষম সময় এসে পড়েছিল। আর ওর সামনেই কবীরের কান ধরে থাপ্পড় মেরেছিল। থাপ্পড়ের ভেলোসিটিতে কবীর উলটে পড়েছিল টাপুরের পায়ে। হাতের গিফট্গুলো ছড়িয়ে পড়েছিল সারা রাস্তায়। কবীরের বাবাকে বাটানগরে সবাই চেনে। টাপুরও চিনত। কবীর আরও মার খেত সেদিন কিন্তু টাপুরই বাধা দিয়েছিল। তবে বাড়িতে গিয়ে কবীরের কী হয়েছিল সেটা টাপুর জানে না। আর জানতে ওর বয়ে গেছে।
দীর্ঘদিন মনমরা থাকার পর গত দু’দিন আগে টাপুর দেখা করেছিল রুদ্রর সঙ্গে। এক নম্বর গেটের ঠেকে গিয়েছিল টাপুর। আর সেখানে গিয়ে যথেষ্ট অবাক হয়েছিল ও। তিমির নামে সেই ফালতু ছেলেটার সঙ্গে চাপা গলায় কীসব কথা বলছে রুদ্র। টাপুর সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই রুদ্র বলল, “তা হলে তিমির মনে থাকে যেন, দু’তারিখ। কেমন?” তিমির হেসে চলে গেল। রুদ্র এবার টাপুরের দিকে তাকিয়ে বলল, “কী রে এত দিন কোথায় ছিলিস? যাক ভালই হয়েছে তুই এসেছিস। আমার তোর সঙ্গে দরকার ছিলই।” টাপুর অবাক হল। রুদ্র এগিয়ে এসে টাপুরের কাঁধে হাত রাখল, বলল, “টাপুর, আমার একটা ছোট্ট প্ল্যান আছে। হয়তো একটু উইকেড, কিন্তু আমাদের স্কুলের ইন্টারেস্টে প্ল্যানটা এক্সিকিউট করা প্রয়োজন। তোর হেল্প আমার দরকার।”
“মানে? উইকেড মানে? ইজ ইট সামথিং বিগ?” টাপুর অবাক হয়ে প্রশ্ন করল।
রুদ্র মুচকি হেসে বলল, “নাথিং কুড বি বিগার।”
টাপুর দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে তাকিয়ে রইল রুদ্রর দিকে। কী বলছে রুদ্র? কীসের প্ল্যান? প্ল্যানটা উইকেড বলছে কেন? মানে কতটা উইকেড? কারও কি ক্ষতি হতে পারে? সাংঘাতিক কিছু নয় তো? টাপুর নিজে যথেষ্ট স্মার্ট আর ডেসপারেট। কিন্তু রুদ্রর মুখভঙ্গি আর গলার স্বর শুনে ও একটু চিন্তায় পড়ে গেল। রুদ্র হাসল, “পাগলি, ভয় পেয়ে গেলি? তেমন চিন্তার কিছু নেই। নঙ্গী হাইকে এবার একটু টাইট দেব। সেজন্যই তোর হেল্প দরকার আমার।” নঙ্গী হাইকে টাইট? টাপুর অবাক হল। আজ তিরিশে জানুয়ারি আর দু’দিন পর টমাস চ্যালেঞ্জ কাপের ফিরতি ম্যাচ। টাপুর বুঝল রুদ্র নিশ্চয়ই সেই ব্যাপারেই কিছু বলছে। কিন্তু টাপুর কী হেল্প করতে পারে? টাপুরের মাথায় কিছু ঢুকল না। ও প্রশ্ন করল, “কী ব্যাপারে হেল্প দরকার রুদ্রদা? আমি কী করতে পারি?”
রুদ্র হাসল, বলল, “শোন তা হলে— জানিসই তো দু’তারিখ আমাদের ফিরতি ম্যাচ। ওই ম্যাচটা ড্র করতে পারলেই এবারের ‘টমাস চ্যালেঞ্জ কাপ’ আমাদের স্কুলে আসবে। কিন্তু একটা কথা জানিস টাপুর, যে ড্র করতে চায়, আসলে সে হারতেই চায়। মানে, তার জেতার যে যোগ্যতা নেই সেটাই বোঝা যায়। শোন, আমি কিন্তু ড্র করতে চাই না। ম্যাচটা জিততে চাই। আর সেখানেই তোর হেল্প দরকার।” কী বলছে রুদ্র? কীভাবে হেল্প করবে টাপুর? ও তো আর মাঠে নেমে খেলতে পারবে না। রুদ্র সামান্য হেসে আবার বলল, “খুব অবাক হচ্ছিস, না? দাঁড়া সব বলছি। কফি খাবি?” টাপুর মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল।
রুদ্র রাস্তা পেরিয়ে গেল উলটো দিকের দোকানটায়। ‘জর্জিয়া’-র একটা কফি কাউন্টার আছে ওখানে। টাপুর বিশেষ চা কফি খায় না, তবু রুদ্রকে না করতে পারল না। দু’কাপ কফি দু’হাতে ধরে ধীরে ধীরে আবার টাপুরের সামনে এসে দাঁড়াল রুদ্র। কাপটা টাপুরের হাতে দিয়ে বলল, “ধর। সাবধানে, গরম আছে কিন্তু,” টাপুর কাপটা হাতে নিয়ে চুমুক দিল একটা। সত্যিই খুব গরম।
রুদ্র ওর কফিতে ছোট্ট একটা চুমুক দিয়ে উঠে বসল নিচু দেওয়ালের ওপর। ওদের ঠেকটাই হল এই ইংরিজি এল অক্ষরের মতো নিচু দেওয়ালটা ঘিরে। টাপুরও গিয়ে বসল রুদ্রর পাশে। একটু থেমে রুদ্র শুরু করল, “দেখ টাপুর, আমার এ-বছর স্কুলজীবন শেষ হচ্ছে। রবিন মেমোরিয়াল স্কুল আমার জীবনের একটা অংশ। স্কুল আমায় অনেক কিছু দিয়েছে, কিন্তু আমি কিছু স্কুলকে ফিরিয়ে দিতে পারিনি। ‘টমাস চ্যালেঞ্জ কাপ’ আমার শেষ সুযোগ। এ-বছর নঙ্গী হাই যদি জিতে যায় পরপর তিনবার জিতে কাপটা ওরা চিরকালের জন্য নিয়ে নেবে। এটা আমি হতে দিতে পারি না। প্রথম ম্যাচটা আমরা জিতেছি। বলতে পারিস আমি ট্ৰিক খাটিয়েছিলাম একটা, তার ফলেই ম্যাচটা আমরা জিতেছি। কিন্তু সামনের ম্যাচটাই আসল। দ্যাখ আমাদের স্কুলের টিম ততটা ভাল নয়। ছেলেগুলো মন দিয়ে প্র্যাকটিস করে না। তোদের পেছনে হিড়িক দিতে ব্যস্ত। আমি অনেক চেষ্টা করেও ওদের পালটাতে পারিনি। অর্থাৎ উপায় একটাই। নঙ্গী হাই-এর টিমটাকে এলোমেলো করে দেওয়া।”
টাপুর এতক্ষণে কথা বলল, “ কিন্তু আমি কী করব রুদ্রদা? আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।”
রুদ্র কফির কাপটা দলা পাকিয়ে ছুড়ে ফেলে দিল। তারপর বলল, “আগে কথাটা শেষ করি, ঠিক বুঝবি। আমি হিসাব করে দেখেছি নঙ্গী হাই-এর ফুটবল টিমটা তিনটে ছেলের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এক দিয়েগো, দুই ডুডু আর তিন কবীর। শোন, ডুডুর ব্যবস্থা আমি করে নিয়েছি। যাতে ও ম্যাচের দিন মাঠেই পৌঁছোতে না-পারে তার বন্দোবস্ত আমি করেছি। এখন তোকে বাকি দু’জনকে সামলাতে হবে।”
“বাকি দু’জন? আমি সামলাব? কীভাবে?” টাপুর নিজেই নিজের গলায় টেনশন টের পেল।
“ভয় পাচ্ছিস কেন? আগে আমার কথা শোন, তারপর তুই নিজেই বুঝতে পারবি যে কাজটা তত কঠিন নয়।” রুদ্রর গলায় আশ্বাস।
টাপুর চুপ করে থাকল খানিকক্ষণ, তারপর বলল, “ঠিক আছে, বলো।”
রুদ্র হাসল আবার। হাসলে কি সুন্দর লাগে রুদ্রকে। টাপুর মুগ্ধ হয়ে যায়। রুদ্র বলল, “দিয়েগো আর কবীরকে তুই সামলাবি। প্রথমে দিয়েগো। তোকে এমন কাউকে জোগাড় করতে হবে যে ম্যাচের ঠিক আগে পুরু, মানে ওদের কোচকে গিয়ে বলবে যে দিয়েগো এ-ম্যাচটা রবিন মেমোরিয়ালকে ছেড়ে দেবে। কেমন?” পুরু, নামটা শুনতেই শরীরটা কেঁপে উঠল টাপুরের। আসলে ও নামটা শোনার জন্য তৈরি ছিল না। একটু ধাতস্থ হয়ে ও আবার জিজ্ঞেস করল, “ওদের কোচ কথাটা বিশ্বাস করবে কেন?”
রুদ্র কাঁধ ঝাঁকাল, “করবে, বিশ্বাস করবে। গত ম্যাচের পর গোটা বাটানগরে এমন একটা প্রোপাগান্ডা করা হয়েছে যে পুরু বিশ্বাস করবেই। তবে হ্যাঁ, কীভাবে কাজটা করবি সেটা তোকে ঠিক করতে হবে। কিন্তু মনে রাখবি টাইমিংটা ইমপর্ট্যান্ট। খেলার ঠিক আগে কথাটা গিয়ে বলতে হবে। এতে দুটো কাজ হবে। প্রথমটা হল টিমটার একটা মরাল সেট ব্যাক হবে আর দ্বিতীয়টা হল, আমি ডেফিনিট পুরু ওকে বসিয়ে দেবে।”
“কিন্তু যদি না বসায়?” টাপুর জিজ্ঞেস করল। রুদ্রর চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। ও বলল, “তা হলে বুঝব পুরু ফালতু লোক। ফুটবল ভালবাসে না। আর টাপুর, সেটুকু রিস্ক আমাকে নিতেই হবে। ডুডুকে যেভাবে আটকাব সেভাবে দিয়েগোকে আটকানো যাবে না। কারণ ওরা অনেকে মিলে একসঙ্গে মাঠে আসে আর ডুডু আসে একলা। তাই দিয়েগোকে মাঠ থেকে এভাবেই সরাতে হবে।”
চুপ করে বসে রইল টাপুর। কাকে পাঠাবে ম্যাচের ঠিক আগে পুরুর কাছে? মরে গেলেও ও নিজে যাবে না। কিন্তু এমন একজনকে পাঠাতে হবে যার অ্যাপিয়ারেন্সটাই হবে খুব অনেস্ট। কাকে, পাঠাবে কাকে? হঠাৎ বিদ্যুচ্চমকের মতো নামটা মাথায় এল টাপুরের—শিমুল। ওই পারে এই কাজটা করতে। শুধু ওকে মোটিভেট করতে হবে। মিথ্যে করে বলতে হবে যে দিয়েগো ম্যাচ ছেড়ে দিতে চায়। আমন আর ওর স্কুল হারবে শুনলে, টাপুর নিশ্চিত, শিমুল, ওরা যা চায় সেটা করবেই। কিন্তু পটিয়ে পাটিয়ে শিমুলকে রাজি করাতে হবে। তাই রুদ্রকে এখন কিছু বলবে না কাকে দিয়ে কাজটা করাবে ও।
রুদ্র জ্যাকেটের চেনটা একবার নামিয়ে আরেক বার ওপরে ওঠাল। ভুরুদুটো কুঁচকে আছে একেবারে। টাপুর বুঝল রুদ্র এবার আরেকজনের কথা বলবে ওকে। আরেকজন মানে কবীর। টাপুর বুঝল রুদ্রর সমস্যাটা। ওর কথাতেই কবীরকে পিটিয়েছিল রুদ্র আর এখন ওর কাছে নিশ্চয়ই টাপুরকে যেতে বলতে ওর খারাপ লাগছে। টাপুর আস্তে করে রুদ্রর হাত ধরল। বলল, “রুদ্রদা, আরেকজন?”
রুদ্র ঠোঁট চাটল একবার। গলাটা খাঁকরে বলল, “না, মানে ভাবছিলাম যে কবীরের কাছে তোকে পাঠানো ঠিক হবে কিনা। আসলে আগে যা সব ঘটে গেছে তারপর… কিন্তু যাওয়াটাও জরুরি। টাপুর তুই কি যেতে পারবি?”
টাপুর ছোট্ট করে হাসল, “তুমি বলো না একবার। ডোন্ট হেসিটেট।” স্ট্রিট বালবের হলুদ আলো আর কুয়াশা মিশে ইম্প্রেশনিস্ট ছবির মতো দৃশ্য তৈরি হয়েছে একটা। টাপুরের মামা চিত্রশিল্পী। ওর দৌলতেই ছবি সম্বন্ধে টাপুর কিছু জানে। রুদ্র সেই স্থিরচিত্রটাকে ভেঙে বলল, “শোন টাপুর। যা বলছি মন দিয়ে শোন। কবীরের সঙ্গে তোকে দেখা করতে হবে। অ্যারেঞ্জমেন্টটা আমিই করিয়ে দেব। এখন কবীরকে কী বলবি মন দিয়ে শোন।” রুদ্র পরপর বলে যাচ্ছিল টাপুরকে— ওকে কী কী বলতে হবে কবীরকে, আর দরকার পড়লে কী করতে হবে।
আজ রুদ্রর সেই কথাগুলোই পরপর বলতে হবে টাপুরকে। কিন্তু কী হল। কবীর আসছে না কেন এখনও। তবে কি কোনও গন্ডগোল হল? বেশ অন্ধকার হয়ে গেছে এখন। চাঁদটাও আরও একটু ঘুরে চলে গেছে পাতার গভীরে। টাপুরের অস্বস্তি হতে লাগল, কবীর যদি না-আসে?
“যো হ্যায় আলবেলা মদ নয়নও ওয়ালা…’ পলিফনিক রিংটোনের শব্দে চিন্তাটা ছিঁড়ে গেল টাপুরের। মোবাইলের স্ক্রিনে দেখল ‘রুদ্রদা’ শব্দটা। তাড়াতাড়ি জবাব দিল টাপুর, “হ্যালো রুদ্রদা, কী ব্যাপার বলো তো?”
“শোন, কবীরকে একজনের মাধ্যমে খবর পাঠিয়েছি যে তুই ওর সঙ্গে দেখা করবি ‘নিউল্যান্ড ক্যাফে’-তে। সাড়ে ছ’টা নাগাদ।”
“কিন্তু তুমি তো নিউল্যান্ড স্কুলে বলেছিলে।”
“আরে যেই ছেলেটাকে কবীরকে খবর দিতে বলেছিলাম, মালটা এমন ছাগল, যে কবীরকে ভুল করে নিউল্যান্ড ক্যাফেতে অপেক্ষা করতে বলেছে। আর আমায় আগেও বলেনি। একটু আগে বলেছে। দেখেছিস তো কীসব জিনিসপত্র নিয়ে আমায় চলতে হয়।
“সে তো হল। আমি এখন কী করব?” টাপুর জিজ্ঞেস করল।
“শোন, এখন সাড়ে ছ’টাই বাজে। তোর স্কুলের সামনে থেকে মেন রোডে গিয়ে অটো ধরে দোকানে পৌঁছোতে আট-দশ মিনিট লাগবে। তুই আর দেরি করিস না। কবীর নিশ্চয়ই এটুকু সময় এক্সট্রা ওয়েট করবে। টাপুর, প্লিজ দেখিস কাজটা যেন হয়।”
নিউল্যান্ডে ক্যাফের কাচের সুইংডোর ঠেলে যখন টাপুর ঢুকল তখন প্রায় ছ’টা চল্লিশ বাজে। ক্যাফের ভিতরে হালকা মিউজিক বাজছে। দু’-চারজন বসেও আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। আর ক্যাফের এক কোনায় গোল কাচের টেবিল থুতনিতে হাত রেখে বসে আছে কবীর।
দূর থেকে কবীরের মুখ দেখে টাপুর বুঝল কবীর ওকে ঢুকতে দেখেছে। কারণ কবীর সিট ছেড়ে দাঁড়িয়ে উঠেছে। টাপুর চট করে একবার দেওয়ালের আয়নায় নিজেকে দেখে নিল। সাদা জিনস্, লাল ফুল সোয়েটার। নিজেকে দেখে আশ্বস্ত হল টাপুর। এরকম মেয়ে কোনও ছেলেকে দিয়ে যা খুশি তাই করিয়ে নিতে পারে।
বুক ভরে শ্বাস নিল টাপুর। এই ছোট্ট অঞ্চলটার মধ্যে খেলা শুরু হবার আগেই আরেক খেল শুরু হয়ে গেছে। আর এই খেলাটাই টাপুরকে ঠিকভাবে খেলতে হবে আজ।
টাপুর যখন কবীরের সামনে বসল, কবীর তখনও দাঁড়িয়ে। টাপুর সামান্য হাসল, বলল, “বসো, দাঁড়িয়ে রইলে কেন?”
কবীর কোনও উত্তর না দিয়ে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রইল টাপুরের দিকে। টাপুর আবার বলল, “বসো।”
এবার বসল কবীর। তীক্ষ্ণ চোখে টাপুরের দিকে তাকিয়ে বলল, “কী ব্যাপার? আমায় ডেকে এনেছ কেন তুমি? কী দরকার?”
টাপুর এবারও হাসল। চট করে উত্তর না দিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল, “কিছু খেলে হয় না? ওয়েটার।” টাপুরের ডাকে একজন ওয়েটার এগিয়ে এল। দুটো চিকেন পিৎজার অর্ডার দিল টাপুর। তারপর আর দেরি না-করে সরাসরি কবীরের দিকে তাকাল, বলল, “কবীর, তুমি বলেছিলে আমার জন্য সব কিছু করতে পারো তুমি। কথাটা কি সত্যিই?” টাপুর দেখল কবীরের মুখের রাগের ভাবটা ভাঙতে ভাঙতে বিস্ময় থেকে আশায় এসে থামল। মনে মনে হাসল টাপুর। ওষুধ ধরেছে।
কবীর ঢোক গিলল কয়েকবার তারপর বলল, “টাপুর, তোমার জন্য আমায় অনেক কষ্ট, মার, অপমান সহ্য করতে হয়েছে। তবু তোমায় আমি ভালবাসি। হ্যাঁ, তোমার জন্য সব কিছু করতে পারি আমি।
“চিন্তা করে দেখো, সব কিছু?”
কবীর চোয়াল শক্ত করল, বলল, “হ্যাঁ সব কিছু।”
টাপুর ভাবল ছেলেটা নিজেই ফাঁদে ঢুকে পড়েছে। ও টেবিলে রাখা পেপার টাওয়েল নিয়ে সেটাকে ভাঁজ করতে করতে বলল, “তা হলে দু’তারিখের ম্যাচটা আমাদের ছেড়ে দাও তুমি। যদি আমরা জিতি আমি তোমার।”
“কী?” কবীরের মুখে হতভম্ব ভাব। যেন কথাটার মানেটাই ধরতে পারেনি।
টাপুর বলল, “ম্যাচটা ছেড়ে দিলে আমি বুঝব যে তুমিই সত্যিই আমায় ভালবাসো। নাথিং ইজ ইজি কবীর। তুমি জানো যে বাটানগর ছোট্ট জায়গা। কনসারভেশন এখানে বেশি। একটা হিন্দু মেয়ে যখন মুসলিম ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে, ব্যাপারটা খুব সখের হবে না। আমি কোনওরকম স্টেপ নেবার আগে দেখতে চাই যে তুমি সত্যিই আমায় ভালবাসো কি না। কারণ যার তার জন্য তো সব ছাড়া যায় না। এটাকে তুমি পরীক্ষা ভাবলে পরীক্ষা। কিন্তু তুমি যদি ম্যাচ ছাড়ো জেনো আমি তোমার হব।”
কবীর কোনও কথা না-বলে মাথা নিচু করে রইল খানিকক্ষণ। তারপর বলল, “আমায় তুমি ইচ্ছে করে গোল খেতে বলছ? আমায় ইন্টিগ্রিটি ভাঙতে বলছ?”
টাপুর এবার গম্ভীর হয়ে গেল, বলল, “শোনো কবীর, আমি এখানে নেগোসিয়েশন করতে আসিনি। মাই অফার ইজ সিম্পল। টেক ইট অর লিভ ইট।” কথাটা বলে হাত দিয়ে কবীরের হাতে একটু চাপ দিল টাপুর। এসব ভাইটল ছোঁয়াগুলো খুব দরকারি। কবীরের মুখ দেখে ও বুঝল কবীর দ্বিধায় পড়েছে। টাপুর আরেকটু চাপ বাড়াল, বলল, “কবীর, এটুকু, আমি জানি, তুমি আমার জন্য করবে।” কবীর শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল টাপুরের দিকে। ওর শরীর ধ্বংসস্তূপের মতো পড়ে রয়েছে চেয়ারে। টাপুর জানে কবীর এই লোভ সামলাতে পারবে না। ম্যাচ ছাড়বেই। যাক রুদ্রর কথা রাখতে পেরেছে ও। টাপুর টেবিলে দিয়ে যাওয়া পিৎজায় এক কামড়ও না-দিয়ে বিলের টাকাটা রেখে বেরিয়ে এল। এখানে থাকার আর মানে হয় না।
ফেরার সময় টমাস বাটা অ্যাভিনিউ দিয়ে হেঁটেই ফিরছিল টাপুর। মাঘ মাস। ঝকঝক করছে আকাশ। অনেক উঁচু দিয়ে দ্রুত স্যাটেলাইট চলে গেল একটা। ঠিক যেন উল্কা। যে-চিন্তাটা ও মনে আনতে চাইছিল না এতদিন, এবার সেটাই এই নির্জন রাস্তায় হুড়মুড় করে এসে পড়ল। পুরু। নঙ্গী হাই-এর হারা মানে পুরুর চাকরি শেষ। পুরুর যা আর্থিক অবস্থা এটা ওর কফিনে শেষ পেরেকের মতো হবে। আর টাপুরের হাত দিয়েই কিনা সেটা হল। টাপুরের চোখের সামনে ভেসে উঠল বহুদিন আগের এক দৃশ্য। টেবিল ল্যাম্পের আলোয় মাথা ঝুঁকিয়ে বসে থাকা গম্ভীর এক যুবক। টাপুরের গলার কাছটা ব্যথা করছে। লোককে শায়েস্তা করে সবসময় আনন্দ পায় টাপুর। কিন্তু এবার একদম ভাল লাগছে না। এত কষ্ট হচ্ছে বুকে। ভীষণ অস্থির লাগছে। ও না-চাইলেও চোখের কোণগুলো ভিজে উঠছে ওর। ওঃ পুরু, তুমি কেন আমায় ফিরিয়ে দিলে? কেন একটু ভালবাসলে না আমায়? এই শাস্তি তো তোমার প্রাপ্যই ছিল। আমায় ভাল না-বাসার শাস্তি, আমায় ফিরিয়ে দেবার শাস্তি। টাপুর আবছা কুয়াশার জাল কেটে হাঁটতে লাগল। আর দু’-চারটে মুক্তো গড়িয়ে পড়তে লাগল পথে। টাপুর চোখ মুছল না। যাক, ওর কষ্টগুলো, ওর কবীরকে বিপথে টানার পাপগুলো, জল হয়ে বেরিয়ে যাক।
