পাতাঝরার মরশুমে – ১৭

‘মোর দিবস রজনী
হায় গো সজনী
জাগিয়া জাগিয়া যেত
তবু স্বপ্ন যে মনে হত
সেই মগন স্বপন সহসা কখনো ভাঙিয়া ভাঙিয়া গেল
সেই পথ দিয়ে বধূবেশে সেজে যেদিন গেল সে হারিয়ে
সেদিন আমার সজল হৃদয় দু’পায়ে গিয়েছে মাড়িয়ে
যাক যা গেছে তা যাক, যাক যা গেছে তা যাক’

দূরের কোয়ার্টারগুলোর থেকে ভেসে আসছে গান। বটতলার কাছটা আজ ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে আছে। দূরে কোয়ার্টারগুলোর আবছা আলো এই অন্ধকারটাকে যেন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বটতলাতেই তপনের পানের দোকান। যেটার আলোয় বটতলা কিছুটা উজ্জ্বল থাকে। কিন্তু তপন এমন, যে রোজ দোকানটা খোলেই না। আজ সেরকমই একটা দিন। অন্ধকারে, মাফলারে কান মাথা ঢেকে বসে থাকতে নিজেকে ভূতের মতো লাগছিল পুরুর। তার ওপর এই গান। কী সহজেই সলিল চৌধুরী বলছেন ‘যা গেছে তা যাক’। কিন্তু অত সহজে কি যেতে দেওয়া যায়? অন্তত পুরু তো অত সহজে কিছু ছেড়ে দিতে পারে না। কুশ এতক্ষণ পাশেই ছিল, কিন্তু ওর সিগারেট ফুরিয়ে যাওয়ায় মল্লিকবাজারের মোড়ে গেছে কিনতে। যাওয়ার আগে গালাগালি করছিল তপনের দোকানটা বন্ধ থাকায়।

এবার শীতটা জব্বর পড়েছে। নিশ্বাস ফেললেই নাক দিয়ে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। পুরু একটু কুঁকড়ে বসল। হাতদুটো গরম করার জন্য উইন্ড চিটারের পকেটে ঢুকিয়ে দিল। এই ঠান্ডা আর সহ্য হচ্ছে না পুরুর। এমনিতেই শীতকালটা ওর ভাল লাগে না, তার ওপর এবারের শীতটা তো অসহ্য। একটা মেয়ে, মাত্র একটা সরল চোখের মেয়ে গোটা শীতকালটা বিষাক্ত করে দিয়েছে। ওঃ রোহিণী, তুমি কেন এমন করলে?

এমনিতেই সারা পৃথিবী যেন পুরুর বিরুদ্ধে। সে বাড়িতে বাবাই হোক আর স্কুলের লোকজনই হোক। বাবা তো উঠতে বসতে গালাগালি দেয়। দিনকে দিন যেন সেটা আরও বাড়ছে। পুরু কী করবে? চাকরি কি বাগানে ফলে যে গিয়ে টুক করে পেড়ে আনবে? বাবাকে কে বোঝাবে সেটা? বাবা ভেবেছিল নিজে ভি আর এস নিয়ে পুরুকে চাকরিতে ঢুকিয়ে দেবে। কিন্তু কোম্পানিতে আর নতুন লোক নেওয়া হচ্ছে না। সেই ঘটনাই বোধহয় বাবাকে আরও খিটখিটে করে তুলেছে। মাঝে মাঝে খুব কষ্ট হয় পুরুর। বাবা তো এরকম ছিল না। তবে কি ওর নিজের অপদার্থতাটাই বাবাকে এমন করে দিল?

ওদিকে প্রাণবল্লভ মিত্রও শত্রুর মতো আচরণ করে রেখেছেন। পুরুকে একদিন ডেকে পাঠিয়েছিলেন উনি। কোনও ভণিতা না করে সোজা বলেছিলেন, “কে জি বি-র সঙ্গে ম্যাচটা হারলে তবে? এই জন্যই কি তোমায় রেখেছি আমরা? শুনেছি টিমের ভেতর খুব গন্ডগোল চলছে? দিয়েগো নাকি তোমায় মানছে না? শোনো, তোমার আর্থিক অবস্থা ভাল নয়, তুমি ফুটবলার ছিলে, তাই তোমায় এই সুযোগটা আমি দিয়েছি। না হলে হাড় হাভাতেদের প্রতি আমার কোনও সিমপ্যাথি নেই। সামনের সেকেন্ড ফেব্রুয়ারির ম্যাচটা যদি টিম জিততে না-পারে তবে তোমায় আর আমাদের স্কুলমুখো হতে হবে না। ইজ দ্যাট ক্লিয়ার?” একটা বিখ্যাত সিনেমার অনুকরণে পুরুর বলতে ইচ্ছা করেছিল, “ক্রিস্টাল।” কিন্তু পারেনি। এরকম অর্ধেক বাঘ, অর্ধেক মানুষের সামনে কথা বলা খুব শক্ত।

সেদিন থেকে পুরু একটু তেবেড়ে আছে। কী যে হবে কে জানে? এই বটতলাটাই যেন ওর জীবনের পোয়েটিক ইন্টারপ্রিটেশন। ঘুটঘুটে অন্ধকার আর জব্বর ঠান্ডায় জমে থাকা এক সময়খণ্ড। আর এই পরিস্থিতির মধ্যে রোহিণী! মেয়েটা পুরুকে পুরো শেষ করে দিয়েছে। এই ঠান্ডাতেও রোহিণীর কথা মনে পড়ায় কান গরম হয়ে উঠল পুরুর। সেই সন্ধ্যায় ছিনতাইয়ের ঘটনার পর থেকে পুরু কিছুতেই মন থেকে মুছে ফেলতে পারেনি রোহিণীকে। কোনও মেয়ে কোনওদিন পুরুকে এরকম নাড়া দেয়নি। তারপর থেকে পুরু বিভিন্ন রাস্তায় ঘোরাঘুরি করে রোহিণীর যাতায়াতের পথটা মোটামুটি জেনে নিয়েছে। বিকেলের একটা নির্দিষ্ট সময়ে সিনেমা হলের সামনে দিয়ে হেঁটে যায় রোহিণী। তারপর থেকেই পুরু সেই সিনেমা হলের সামনে একটা চায়ের দোকানে বসে থেকেছে। শুধু বসেই থাকেনি, অকথ্য বাজে চা-ও খেয়েছে কয়েক ভাঁড়। রোহিণী কি ওকে দেখেনি? দেখেছে। না হলে কেনই বা রোহিণী রাস্তার ঠিক ওই জায়গাতে এসেই ধীরে ধীরে হাঁটবে? অনর্থক চুল ঠিক করবে? কেনই বা সম্পূর্ণ অকারণে বাঁ হাতের ঘড়িটা দেখে একবার আলতো করে তাকাবে চায়ের দোকানটার দিকে? পুরু জানে রোহিণী ওকে দেখে। তবে সেটা কি পছন্দ করে বলে দেখে? ব্যাপারটা বিশ্বাস করতে খুব ইচ্ছা করলেও পুরু বিশ্বাস করে না। ওর জীবনে সুন্দর ঘটনাগুলো খুব কম ঘটেছে কিনা।

ওই রোজ রোজ বসে থাকা আর একটু দেখা দিয়ে আর কাঁহাতক পারা যায়? পুরুও পারছিল না। এর উপায় একটাই। রোহিণীকে সরাসরি বলা। কিন্তু তার জন্য ব্যাকগ্রাউন্ডটা জানা দরকার। দুম করে তো কাউকে প্রপোজ করে দেওয়া যায় না। আর, এর জন্য শ্রেষ্ঠ লোক হল কুশ। সব মেয়ের নাড়িনক্ষত্র যার জানা। কোনও উপায় না-দেখে একদিন কুশকে ধরল পুরু। বলল, “কুশ, একটা মুশকিলে পড়েছি। তোর হেল্‌প দরকার।”

“এনি টাইম। বল কী দরকার।”

“একটা মেয়ে। মানে… মেয়েটাকে আমার ভাল লাগে…”

“তাই? দারুণ খবর। কে? মেয়েটা কে?” কুশ উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করল।

“রোহিণী। গঙ্গার ধারে ম্যানশনটায় নতুন এসেছে।”

“রোহিণী? গঙ্গার ধারে? আশ্চর্য আমি দেখিনি তো!” কুশের মুখে অবিশ্বাস আর যন্ত্রণা। একটা মেয়ে বাটানগরে নতুন এসেছে আর ও জানে না? হতে পারে? পুরু মুখ চুন করে বিস্তারিত ভাবে কুশকে বলল সেই ছিনতাইয়ের ঘটনা। রোহিণীর কথা, ওর বোনের কথা। এও বলল যে ওরা ওকে নেমন্তন্ন করে রেখেছে ওদের বাড়ি যেতে। সব শুনেটুনে কুশ বলল, “তবে তো হয়েই আছে। একদিন ওদের বাড়ি চলে যা। ভালই হবে।”

“চলে যা মানে? মামার বাড়ি নাকি যে দুর্গাপুজোয় ঘুরতে যাব?” পুরু তেতো মুখে বলল।

“কেন নেমন্তন্ন তো করেই রেখেছে। একবার গিয়ে পড়তে পারলেই তো হয়।” কুশ নির্বিকারভাবে জবাব দিল। পুরু চটে গিয়ে বলল “ফালতু বকিস না। সে তো ভদ্রতা করে যেতে বলেছে। ওতে কারও বাড়ি যাওয়া যায় নাকি?”

“যায় না? তবে কি শালা তোমাকে নেমন্তন্নের কার্ড ছাপিয়ে নেমন্তন্ন করবে? শোন, পেটে খিদে মুখে লাজ নিয়ে প্রেম করতে নেমেছিস? পেছনে দম নেই দমকল সাজতে গেছে।” কুশও গরম হয়ে জবাব দিল। পুরু দেখল ব্যাপারটা হাতের বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে। ও কুশকে খোশামোদ করার গলায় বলল, “আহা খচে যাচ্ছিস কেন? প্লিজ একটু খবর নে না মেয়েটা সম্বন্ধে। তোকে তো ওর হোয়্যারঅ্যাবাউটস সবই বললাম।” পুরুর গলায় এমন কিছু ছিল যে কুশ আর ফেলতে পারল না ওর অনুরোধ। শুধু মুচকি হেসে বলল, “শালা পথে এসো। মেয়ের নামে নাল পড়ছে। ঠিক আছে যা, খবর দিয়ে দেব।”

কুশ খবর দিতে পারেনি। কয়েক দিন আগে এরকমই এক সন্ধ্যায় এসেছিল কুশ। মুখের ভাবটা একটু নিরাশাজনক। ও এসেই বলল, “শালা কোন বাড়ির মেয়ে পছন্দ করেছিস তুই? ওঃ বাড়ি না স্তালিনের আয়রন ওয়াল? গঙ্গার কাছে যে ব্যাপক ম্যানশনটা না? ওরকম খণ্ডহর টাইপের আর্ট ফিল্ম মার্কা বাড়িকে পুরো পেন্ট হাউজ বানিয়ে ছেড়েছে। অবশ্য ভেতরে ঢুকতে পারিনি, বাইরে থেকে উঁকিঝুঁকি মেরেই বুঝেছি দারুণ বাড়ি। আর তোর রোহিণী, গুরু, দারুণ জিনিস। ওরকম ফিগার, অমন স্কিনটোন, শালা শোকেসই এত, গোডাউনে না জানি কত দারুণ জিনিস আছে। দারুণ বাড়িতে ছিপ ফেলেছিস। তবে এটুকুই। এর বেশি কিছু খবর পাইনি। একেতেই ওরা নতুন এসেছে তার ওপর প্রচুর বড়লোক। ঠাকুর চাকরে বাড়ি ভরতি। আর সে-মালগুলো হেভি ঢ্যাঁটা। কিছুতেই কোনও কথা বলে না। বাইরের কোনও লোকও যায় না ওদের বাড়িতে। জানি না গুরু এ-মেয়েকে তুই কীভাবে তুলবি। আর সত্যি বলতে কী মেয়েটার মধ্যে এমন একটা পারসোনালিটি আছে না যে ওকে ডেকে যে কথা বলব তাতে ব্রহ্মতালু অবধি শুকিয়ে যায়। মাইরি, ওদের ফ্যামিলির কী এত গোপন কেস আছে জানি না, তবে যাই হোক যা করার তোকেই করতে হবে। আমি এর মধ্যে নেই।”

একটাও কথা না বলে চুপ করে পুরোটা শুনেছিল পুরু। অবশ্য কী-ই বা বলবে। অত বড়লোকের একজন মেয়ে আর ও নিজে চালচুলোহীন। একদম বাংলা মেলোড্রামাটিক সিনেমার প্লট। তবে কি সত্যি আর্ট ইমিটেট লাইফ? কিন্তু একটা ব্যাপার ঠিক, যা করতে হবে ওকেই করতে হবে। কেউ হেল্‌প করবে না। আর যা করতে হবে তাড়াতাড়ি করতে হবে। পুরু কোনওদিন ভাবেনি একটা মেয়ের জন্য এমন মন খারাপ হতে পারে ওর। গত ক’দিন ধরে যেন কিছুই করতে পারছে না। ও ভেবেছিল । কুশ কোনও খবর আনবে। কিন্তু না, সে-গুড়েও বালি।

এর দু’দিন পর ছিল সেই দিন যার কষ্টটা ওকে এখনও ভোগাচ্ছে বা হয়তো সারাজীবন ভোগাবে। একটা অত সুন্দর চোখের মেয়ে অমন নিষ্ঠুর হতে পারে? কী চেয়েছিল পুরু? সামান্য একটু কথা বলতে? সামান্য একটু নিজের কথাটা জানাতে?

সেদিনও বিকেলে পুরু চায়ের দোকানে বসে ছিল। সেই একঘেয়ে শীত, অকথ্য চা আর রুক্ষ একটা সূর্যাস্ত। রোহিণীর আসতে একটু দেহি হয়েছিল সেদিন। পুরু সেদিন আর শুধু দেখেই চলে যায়নি। ও পিছু নিয়েছিল মেয়েটার। বাটা সিনেমার পর সামান্য এগোলে মল্লিক বাজারের মোড়। তার ডানদিকের রাস্তা দিয়ে সোজা যেতে হয় গঙ্গার পাড়ে। রোহিণীর যাওয়ার পথও সেটা। এই পথের দু’পাশে সবুজ মাঠ। তাতে নানারকম বড় বড় গাছ। সন্ধে হলেই এই গাছগুলোর আশেপাশে কুঞ্জবন গড়ে ওঠে। এখন থেকেই সেখানে জোড়া ছেলেমেয়েদের ভিড় বাড়তে লেগেছে। কিন্তু পুরুর সেদিকে কোনও খেয়ালই হয়নি। ও শুধু মেয়েটাকে নিজের মনের কথা বলতে চেয়েছিল। আর তাই বহুব্রীহি ক্লাবের কাছে রাস্তা একটু ফাঁকা পেতেই রোহিণীর একদম সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল পুরু।

চমকে গেলেও কি মেয়েদের সুন্দর লাগে? সব মেয়েদের কথা বলতে পারবে না পুরু, কিন্তু এ-মেয়ের ব্যাপারটা সেরকমই। পুরু লক্ষ করেছিল রোহিণীর মধ্যে একটা অপ্রস্তুত ভাব, খানিক বিরক্তিও কি? কে জানে। পুরু থরথর করে কাঁপছিল। ওর মনে হচ্ছিল পায়ে বুঝি একদম জোর নেই। কুশের কথামতো সত্যিই ব্রহ্মতালু শুকিয়ে গিয়েছিল ওর। তবু জীবনের সমস্ত সাহস আর ভালবাসা এক জায়গায় এনে বলেই ফেলেছিল পুরু। পাতা খসে পড়ার মতো শান্ত কিন্তু নরম শব্দের মতো শুরু করেছিল পুরু, “রোহিণী তুমি কি আমায় চিনতে পেরেছ? আমি পুরু। অনেক দিনের সাহস জমিয়ে নিয়ে আমি তোমার কাছে এসেছি। তুমি জানো যে তোমায় একদিন না-দেখলে আমার মন খারাপ হয়। সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথমে তোমার মুখটাই মনে পড়ে। আমি জানি না এর কোনও অর্থ হয় কিনা। জানি না তোমার কাছে এর কোনও গুরুত্বও আছে কিনা। কিন্তু এই কথাগুলো তোমায় না-বলে আমি থাকতে পারছিলাম না। তুমি কি একটু ভাববে ব্যাপারটা নিয়ে? দেখো, আমি খুব সাধারণ বাড়ির ছেলে। চাকরিবাকরিও তেমন কিছু করি না। জানি আমার মতো ছেলেদের প্রেমটেমের কোনও অধিকারই নেই। তবু তুমি কি একটু ভেবে দেখবে? আমি তোমাকে খুব ভালবাসব রোহিণী। তুমি কি আমায় তোমাকে ভালবাসতে দেবে?”

পুরুর ভেতরে যে এতটা আবেগ ছিল ও নিজেও কল্পনা করতে পারেনি। কিন্তু পুরু যতক্ষণ কথা বলছিল রোহিণী একবারও ওর দিকে তাকায়নি। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। এমনকী একটা কথাও বলেনি। পুরুর কথা শেষ হওয়ার পর বড় বড় চোখ তুলে ওর দিকে তাকিয়েছিল একবার, তারপর পাশ কাটিয়ে চলে গিয়েছিল ওর বাড়ির পথে।

ওই বড় বড় চোখ, ওই শান্তভাবে হেঁটে চলে যাওয়া, একটা কথাও না-বলা, এসবের কী মানে করবে পুরু? কিন্তু এর যা-ই মানে হোক, প্রচণ্ড খারাপ লেগেছিল পুরুর। ভেবেছিল একটা কথাও বলল না? এত অহংকার। এই অপমান কি প্রাপ্য ছিল পুরুর? সেদিনের পর থেকে প্রচণ্ড খারাপ লাগছে পুরুর। নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছে। ভাবছে, কথাগুলো ওভাবে না-বললেই পারত ও। কী দরকার ছিল গাল বাড়িয়ে থাপ্পড় খাওয়ার?

বটতলার এই ঘুটঘুটে অন্ধকারে বসে এইসব কথাই এখন মনে পড়ছে পুরুর। আর যত ভাবছে ততই মন মেজাজ তেতো হয়ে যাচ্ছে। হয়তো কাউকে বলতে পারলে ভাল হত। কিন্তু বলবেই বা কাকে? বলার মধ্যে এক কুশ। কিন্তু সে ব্যাটাও অপদার্থ। জিনিসের গুরুত্ব না-বুঝেই হাবিজাবি বকতে শুরু করবে।

মাফলারটা ভাল করে জড়িয়ে নিয়ে বসল পুরু। ওঃ শীতকাল কী অসহ্য। আর কুশটাই বা কোথায় গেল? সিগারেট কিনতে তো এত সময় লাগে না। তবে কি বাড়ি চলে যাবে পুরু? কিন্তু তাও ইচ্ছে করছে না। চুপ করে বসে থাকল পুরু। নাহ্, কুশ আসুক। যেমনই হোক কুশ ওর বন্ধু তো।

দূর থেকে চাপা একটা মোটরবাইকের আওয়াজ পেল পুরু। চিনতে পারল। এ হল কুশের মোটরবাইক। যাক ছেলেটা আসছে তা হলে শেষ পর্যন্ত।

বাইকটা গাছের সামনে দাঁড় করিয়ে কুশ চিৎকারের ভঙ্গিতে বলে উঠল, “পুরু কি এম এল এ, কি এম এল এ। প্রায় ফরটি ফাইভ হল তবু শালা ডাঁসা পেয়ারা যেন। মাইরি ওই জন্যই দেরি হয়ে গেল। ডোন্ট মাইন্ড।”

এম এল এ? ডাঁসা পেয়ারা? ফরটি ফাইভ? কী বলছে কুশ? এর মানে কী? কুশ কিন্তু পুরুর পাশে বসল না। সামনেই হাত পা ছুড়ে কীসব বলার চেষ্টা করতে লাগল, পুরু এক লাইনও বুঝল না কী বলছে কুশ কিন্তু এটুকু বুঝল যে কোনও কারণে কুশ খুব একসাইটেড। ও ধীর ভাবে বলল, “কাম ডাউন কুশ। কী হয়েছে? এত উত্তেজিত কেন? আর এম এল এ মানে?”

কুশ লম্বা শ্বাস নিল একটা, বোধহয় নিজেকে শান্ত করার জন্যই। তারপর বলল, “তুই ক্যালানেই রয়ে গেলি রে পুরু। এম এল এ মানে হল ‘মারনে লায়েক আন্টি’।” বলে ইঙ্গিতপূর্ণ ভাবে হাতের ইশারা করল কুশ। ব্যাপারটার মধ্যে যে অশ্লীল ইঙ্গিত লুকিয়ে আছে তা বুঝতে একটু সময় লাগল পুরুর। তারপর ও বলল, “আবার অসভ্যতা শুরু করেছিস?”

“অসভ্যতা? মানে?” কুশ অবাক হয়ে গেল, “নো অসভ্যতা। আরে সিগারেট কিনে ফিরছি হঠাৎ মালা আন্টির সঙ্গে দেখা। মানে আন্টি বলছি বিপাকে পড়ে। কারণ মালার সঙ্গে দি বলতে খারাপ লাগে। যাক গে। বহু দিন পর ওকে দেখলাম, বুঝলি? ওঃ, আমায় চিনতে পেরে গাল টিপে হাত ধরে কত আদর করলেন। শালা কী বলব আমার মায়ের বান্ধবী, আন্টি বলে ডাকতে হয়, কিন্তু অমন কোমর পাছা, বুক, শালা আমার যা অবস্থা হচ্ছিল না। পুরু, মনে হচ্ছিল ওর সঙ্গে ওর বাড়িতেই চলে যাই। কী বলব তোকে, পৃথিবীতে যে চন্দ্র সূর্য এখনও ওঠে এইসব মহিলারাই তার প্রমাণ।”

বিরক্তি কী বিরক্তি! কুশ মহিলা ছাড়া আর কিছু বোঝে না। নিজের মায়ের বান্ধবী, তারও শরীর দেখে বেড়াচ্ছে। ও কি সেক্স স্টার্ভড না যৌন ম্যানিয়াক? ধ্যাত্তেরি, আর বসে থাকবে না পুরু। বাড়িতেই ফিরবে। কুশের সঙ্গে থাকলে মেজাজ আরও খারাপ হয়ে যাবে। আর দেরি না করে উঠে পড়ল পুরু। কুশ জিজ্ঞেস করল, “আরে চললি কোথায়? এত ইন্টারেস্টিং গল্প বলছিলাম।”

পুরু বলল, “না রে বাড়ি যাই। খুব দরকারি একটা কাজ মনে পড়ল। ভুলেই গেছিলাম।” কুশকে আর কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বটতলার অন্ধকার থেকে সামনের রাস্তায় উঠল পুরু আর তখনই ঘটল বিপত্তিটা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক ধাক্কায় মাটিতে ছিটকে পড়ল পুরু। কিছুক্ষণের জন্য সব কিছু কালো হয়ে গেল চারদিক। তারপর ধীরে ধীরে দৃষ্টি ফিরে এল যখন, দেখল কুশ ওর ওপর ঝুঁকে আছে। তার পাশে আরেকটা মুখ। পুরুর মুখটা চিনতে সামান্য সময় লাগল। কিন্তু চিনতে পেরেই বলল, “দিয়েগো না?”

“স্যার, আপনার লাগেনি তো? আসলে সাইকেলটা নিয়ে তাড়াতাড়ি যাচ্ছিলাম তো, আর আপনি হঠাৎ বটতলার অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আমার সামনে এসে পড়ায় আমি সাইকেলটা ব্রেক মারতে পারিনি। খুব লেগেছে স্যার?” পুরু ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। ডান হাতের কনুইটার কাছটা টনটন করছে। সঙ্গে জ্বলছেও খুব। কেটে গেছে নিশ্চয়ই। পুরু বলল, “না না আমি ঠিক আছি। তুমি এত হুড়োহুড়ি করে কোথায় যাচ্ছ?” দিয়েগো খানিক চুপ করে থাকল, তারপর আস্তে আস্তে বলল, “স্যার, খুব বিপদে পড়েছি। কী করব বুঝতে পারছি না।”

“কেন?” পুরু জিজ্ঞেস করল।

কথা বলতে গিয়ে দিয়েগোর গলাটা সামান্য কেঁপে গেল, “স্যার, মা মায়ের দুই বোতল রক্ত লাগবে। বাটা হসপিটাল দিতে পারছে না। ব্লাড গ্রুপটাও রেয়ার। কী করব ঠিক বুঝতে পারছি না।”

“কোন গ্রুপ তোমার মায়ের?”

“এ বি নেগেটিভ।”

পুরু থমকে গেল মুহূর্তের জন্য, তারপর শান্ত গলায় বলল, “দেন দ্য অ্যাক্সিডেন্ট প্রুভস টু বি আ গুড ওয়ান।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *