এদিকটায় সার সার পাম গাছ। পেছনে লাল সাদা হস্টেল। তার বড় বড় কাচের জানলা, সবুজ রঙের বিশাল দরজা, ইংরাজি ‘ডি’ অক্ষরের মতো চাতাল। এই চাতালেই এখন বসে আছে ওরা। দূরে প্যান্ডেলের মাইক বাজছে। ‘রং দে বসন্তী’ ছবির গান হচ্ছে। এর আগের গানটায় এই চাতালে জ্যাকসন আর ডুডু নাচছিল। জ্যাকসন তো নাচতে নাচতে পুরুকেও হাত ধরে টানছিল নাচবার জন্য। পুরু নাচেনি। হেসে হাত ছাড়িয়ে নিয়েছিল। জ্যাকসনটা খুব মজার ছেলে।
ওরা যেখানে বসে আছে তার কিছু দূরে বাটার রাস্তা। দুরত্ব এমন যে এখানে বসলে রাস্তার সব কিছু দেখা গেলেও রাস্তার গোলমালটা পোহাতে হয় না। আজ রাস্তায় অনেক লোকজন কারণ আজ সরস্বতী পুজো। বাটানগরে প্রচুর সরস্বতী পুজো হয়। দু’পা দূরে দূরেই এক একটা ক্লাব। আর তাদের ছোট্ট ছোট্ট পুজো। আর এই পুজোগুলোর বৈশিষ্ট্য হল এর ঠাকুরের মূর্তি। দেশলাই কাঠি, আলপিন, বিস্কুট, মিষ্টি থেকে শুরু করে রাংতা, ভাঙা কাচ সব কিছুর মূর্তি তৈরি হয়। একবার তো একটা ক্লাব দুটো মেয়েকে নিয়ে এসেছিল। দু’ঘণ্টা দু’ঘন্টা করে ওরা ঠাকুরের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়েছিল। সেই দেখতে কী ভিড় কী ভিড়। পুরুর মনে আছে কুশ তো একটা মেয়েকে চোখও মেরেছিল। সেই নিয়ে ক্লাবের ছেলেদের সঙ্গে অশান্তি হয়েছিল খুব।
কথাটা মনে পড়াতে নিজের মনেই হাসল পুরু। আজ কুশটা থাকলে ভাল হত। অবশ্য বলেছে আসবে। এখন সন্ধে সাতটা। বলেছে সাতটাতে আসবে। কিন্তু কুশের সাতটা তো!
পুরুর সঙ্গে আজ ডুডু জ্যাকসন ছাড়াও কবীর, দিয়েগো, আমন, রুপাই, শিমুল আর সায়েকা আছে। এই শেষের তিনজন আজ দুপুরের সংযোজন।
গতকাল প্রাণবল্লভ মিত্র খেলার শেষে পুরুকে যে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন আজ স্কুলে সেটাই মৌখিকভাবে বলে দিয়েছেন উনি। আজ শুক্রবার, সোমবার স্কুল খুললেই নঙ্গী হাই স্কুলের গেমস টিচারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার পেয়ে যাবে পুরু। সেই কথা শোনার পর জ্যাকসন ধরেছিল, “স্যার, খাওয়াতে হবে, খাওয়াতে হবে” বলে। পুরু “ঠিক আছে” বলার সঙ্গে সঙ্গে জ্যাকসন অন্যদের জুটিয়ে ঠিক করে ফেলেছিল যে আজ সন্ধেতেই হবে ব্যাপারটা। পুরুর খুব ভাল লেগেছিল। কোনওদিন কেউ এভাবে কিছু চায়নি ওর কাছে। আর ছেলেগুলোকে এই ক’মাসে খুব ভালবেসে ফেলেছে পুরু। নিজের ছোট ভাইয়ের মতোই দেখে ওদের। কিছুক্ষণ পরে আবার জ্যাকসন ফিরে এসেছিল। পুরু তখন পরিবেশন করছে।
স্কুলে সরস্বতী পুজোয় খিচুড়ি, বাঁধাকপির তরকারি, বেগুনভাজা, চাটনি, পাঁপড় আর পায়েস হয়। ক্লাসঘরের সামনের লম্বা বারান্দায় ছাত্ররা খেতে বসে। পুরু সবে পায়েসের বালতিটা নিয়েছে এমন সময় জ্যাকসন এসে হাজির। বলল, “স্যার, আমরা তো আসবই, আরও কয়েকজনকে নিয়ে আসব?”
“পুরু অবাক, আরও কয়েকজন? মানে?”
“মানে, স্যার কয়েকজন মেয়েকে। ওরা আমাদের বন্ধু স্যার। অন্য কিছু ভাববেন না কিন্তু! নতুন বন্ধু বলতে পারেন। আনব স্যার? মানে, ওরা আসলে ভাল হবে।”
পুরু হেসে বলেছিল, “ঠিক আছে, অত ব্যাখ্যা দেবার কিছু নেই। নিয়ে এসো।”
সেই ওরা এসেছে। শিমুল অবশ্য একটু কিন্তু কিন্তু করছিল। গতকাল মাঠে যে ও ভুল তথ্য দিয়েছিল সেটা ততক্ষণে জেনে গেছে ও। কিন্তু এখানে সবাই মিলে যখন বলেছিল ওতে ওর কোনও ভুল নেই তখন খানিকটা স্বাভাবিক হল। এতক্ষণে অবশ্য পুরু বুঝে গেছে, এই ‘বন্ধু’ মেয়েগুলো আসলে কারা। পুরুর বেশ মজাই লাগছে। এই অল্পবয়সি ছেলেমেয়েগুলোর ভাবভালবাসা খুব অদ্ভুত হয়। আর কোনও বয়সেই বোধহয় মানুষ এরকম সর্বস্ব পণ করে প্রেমে পড়তে পারে না। বেশ লাগছে ওদের।
আর এই ভাললাগাটুকুর মধ্যে থেকে হঠাৎ টাপুরের কথা মনে পড়ে গেল পুরুর। টাপুরও কি সর্বস্ব দিয়ে ভালবাসেনি পুরুকে? এই সমাজে দাঁড়িয়ে টাপুর তো অনেকখানি মাত্রা ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিল পুরুর জন্য। পুরুর মনে পড়ে গেল আজ দুপুরের কথা।
স্কুলের পুজো, পরিবেশন শেষ করে বাড়ি ফিরছিল পুরু। ওর সঙ্গে ছিল ওদেরই স্কুলের বায়োলজির টিচার মৃণালদা আর তাঁর বন্ধু অর্ণবদা। অর্ণবদাকে পুরু ছোটবেলা থেকে চিনত। মৃণালদা আর অর্ণবদা মৃণালদার বাড়িতে একসঙ্গে ঢুকে যাওয়ার পর পাড়ার ভেতরের রাস্তা দিয়ে একাই ফিরছিল পুরু। এই রাস্তাটা সরু, ছায়ায় ঢাকা। মাঝে মাঝে দু’-একটা বাঁকে ছোট ছোট ছেলেরা তিন-চার ফুটের প্যান্ডেল বানিয়ে সরস্বতী পুজো করছে। কিন্তু দুপুর বলেই কেমন ঝিম-ধরা একটা ভাব সব দিকে। এর মধ্যে দিয়ে হেঁটে হেঁটে ফিরছিল পুরু। সাইকেল আনেনি সঙ্গে।
হাঁটতে হাঁটতে ও চলে এসেছিল শানিবুড়োর বাগানের সামনে। বাটানগরে এই বাগান খুব বিখ্যাত। বসন্তের আভাস পেয়ে বাগান আবার রং ধরছে এখন। আর এই বাগানের সবুজ-হলুদ পাতার মধ্যে থেকে হঠাৎ ওর সামনে বেরিয়ে এসেছিল টাপুর। চোখ ধাঁধিয়ে গিয়েছিল পুরুর। সবুজ পাড়ের বাসন্তী শাড়ি পরেছে টাপুর। মাথায় আলগা একটা খোঁপা। দুই ভুরুর মাঝে সবুজ টিপ। এরকম টাপুরকে কোনওদিন দেখেনি পুরু। অবাক হয়ে টাপুরের দিকে তাকিয়েছিল ও। কোনও কথা বলতে পারছিল না। টাপুরই প্রথম কথা বলেছিল। হাতের প্যাকেট থেকে দুটো বড় তালশাঁসের সন্দেশ পুরুর হাতে দিয়ে বলেছিল, “আমাদের বাড়িতে পুজো হয়েছে, তার প্রসাদ, খেয়ে নাও। আমি অনেকক্ষণ থেকে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি পুরু। এত দেরি করলে কেন?” পুরু হতভম্ব হয়ে তাকিয়েছিল টাপুরের দিকে। আসলে এত সুন্দর লাগছিল টাপুরকে যে দম বন্ধ হয়ে আসছিল পুরুর। টাপুর আবার বলল, “পুরু, আর বছরখানেক, তারপর আমি বিদেশে চলে যাব। আমার জেঠু থাকে কানাডায়। আমি চলে যাব জেঠুর কাছে। জানো, বাবা মা আমাকে পাঠাতে চায় না, কিন্তু আমিই জেদ ধরেছি। আমি যাবই। আর থাকব না এখানে। তুমি ভাবছ এসব তোমায় বলছি কেন। কিন্তু পুরু, আমি তো তোমার জন্যই চলে যাচ্ছি। আমি সহ্য করতে পারব না যে তুমি এই শহরে থাকবে কিন্তু আমার হবে না।” টাপুর ঠোঁট কামড়ে মাটির দিকে তাকিয়েছিল। পুরু সন্দেশ হাতে দাঁড়িয়ে ছিল বোকার মতো। একটা কথাও মুখ দিয়ে বেরোচ্ছিল না ওর। টাপুর আবার বলল, “তুমি আমায় এত কষ্ট দিলে কেন পুরু? আমি জানি, আমি খুব লাউড। তা বলে আমায় ভালবাসতে পারলে না তুমি? তাই তো রাগ হয়েছিল আমার। তোমায় জব্দ করতে চেয়েছিলাম আমি। বোকা শিমুলটাকে দিয়ে মিথ্যে খবর পাঠিয়েছিলাম তোমার দল ভাঙতে। আমি চাইছিলাম তোমায় হারাতে। কিন্তু তুমি জেতায় আনন্দ হচ্ছে কেন আমার? পুরু, তুমি এর উত্তর জানো? জানো এখনও আমি পড়ার টেবিলে বসলে দেখতে পাই গম্ভীর মুখের একটা ছেলেকে। যে সাইকেল স্ট্যান্ড করে উঠে আসছে আমার পড়ার ঘরে। আমি স্পষ্ট দেখি টেবিল ল্যাম্পের আলোয় তুমি মুখ নিচু করে বই দেখছ আর টেবিলের ওই পারে বসে আছে ক্লাস নাইনের এক মেয়ে। তার গলা শুকিয়ে কাঠ, হাতের তালুতে ঘাম। তুমি চলে যাওয়ার পর তোমার চেয়ার ধরে দাঁড়িয়ে থাকতাম আমি। টেবিলে তোমার হাত রাখার জায়গায় আমার হাত রাখতাম। বালিকা থেকে নারী হয়ে ওঠার সবটুকুতে তুমিই আমার সঙ্গে ছিলে পুরু। আমার সঙ্গে থাকবেও। আর কোনওদিন আমাকে তুমি দেখবে না। দেখা হলেও আমিই চিনব না তোমায়। কিন্তু মনে রেখে দেব। তুমি মনে রাখবে কি রাখবে না সেটা প্রশ্ন নয়, আমি তোমায় সারাজীবন মনে রেখে দেব পুরু। শুধু এটুকু জেনো একটা পাগলি তোমায় প্রচণ্ড ভালবেসেছিল। আর আজ এই দুপুরে সেই পাগলিটার মৃত্যু হল। এই মুহূর্তটুকু, তোমার এই বয়সটুকু, চিরদিনের মতো আমার হয়ে গেল। এই দুপুর এই রোদ কোনওদিন পৃথিবীতে ফিরে আসবে না আর। আমাদের বিচ্ছেদের সঙ্গে এরও মৃত্যু হল আজ।”
আর একটা কথাও না-বলে পুরুকে একা রেখে চলে গিয়েছিল টাপুর। খাঁ খাঁ দুপুরে নিঝুম রাস্তায় একা দাঁড়িয়ে ছিল পুরু। হাতের সন্দেশটুকু না-থাকলে ও হয়তো বিশ্বাসই করত না টাপুর এসেছিল। যে-মেয়েটাকে ও মনে মনে ঘৃণা করত, তার সামনে নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছিল পুরুর।
এসব মনে পড়াতে এত জনের মধ্যে বসেও নিজেকে কেমন নিঃসঙ্গ লাগল পুরুর। ওর চিন্তাটা ভাঙল কবীরের কথায়, “স্যার, এখনও দিয়েগোরা আসছে না কেন বলুন তো?”
পুরু বলল, “আসবে, ধৈর্য ধরো।” কবীর আবার আড্ডায় মশগুল হল। কথা আছে এখানে বসেই ‘নিউল্যান্ড ক্যাফে’ থেকে কিনে এনে স্ন্যাকস খেয়ে নেবে ওরা। সেইমতো দিয়েগো আর আমন গেছে খাবার আনতে। ওদের ফিরে আসার সময়ও হয়ে এল প্রায়।
পুরু মুখ ঘুরিয়ে দেখল ওরা নিজেদের মধ্যে কীসব গল্প করছে। স্বাভাবিক। এই বয়সটায় প্রচুর কথা জমে থাকে। পুরু যদিও ওদের চেয়ে ছ’-সাত বছরের বড়। তবু কেন কে জানে ওর নিজেকে মধ্য বয়স্ক মনে হয়। আসলে জীবনে যে যত বিপদে পড়ে তার মনের বয়স তত বেড়ে যায়। পুরু একবার চারিদিক তাকাল। এই ছবির মতো সুন্দর বাটানগর, এই সরস্বতী পুজোর সন্ধে, চাকরির একটা হিল্লে হয়ে যাওয়া, এই অনুজপ্রতিমদের মধ্যে বসে থাকা, সব কিছুই তো আনন্দের। কিন্তু ওর আনন্দ হচ্ছে না কেন? কেন মনে হচ্ছে ওর, যে গলায় কাটা ফুটে আছে? সবসময় অস্বস্তি! সবসময় কী নেই, কী নেই ভাব! তার কারণ কি রোহিণী?
গতকাল খেলার পর মাঠ থেকে ফিরছিল পুরু। তখন হন্তদন্ত হয়ে এসেছিল কুশ। কুশ এম বি এ পড়বে বলে ‘ক্যাট’-এর জি ডি পি আই-এর ট্রেনিং নিচ্ছে। তার ক্লাস ছিল বলে কুশ ম্যাচে আসতে পারেনি। কিন্তু ট্রেন থেকে স্টেশনে নেমেই সোজা চলে এসেছিল মাঠে। আর আসতে আসতে খবর পেয়ে গিয়েছিল যে ম্যাচটা নঙ্গী হাই জিতে গেছে। কুশ বলেছিল, “বিশ্বাসঘাতক! রবিন মেমোরিয়ালের স্টুডেন্ট হয়ে নঙ্গী হাইকে খেলায় জিততে সাহায্য করলি?” পুরু হেসেছিল। কিছু বলেনি। ও কীভাবে বোঝাবে কুশকে যে এই ম্যাচটার ওপর পুরুর জীবন নির্ভর করছিল।
ওরা যখন ফিরছিল ঠিক সেই সময়েই দৃশ্যটা দেখেছিল পুরু। সিনেমা হলের সামনের রাস্তা দিয়ে হাতে একটা ফুলের তোড়া আর কাঁধে খুব সুন্দর একটা পাটের তৈরি ব্যাগ নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে রোহিণী। ফুলের তোড়া দেখে ভুরু কুঁচকে গিয়েছিল পুরুর। ফুল কে দিল ওকে? কুশ ধরেছিল ব্যাপারটা, ও বলল, “কী রে, ফুলের তোড়া দেখে চুপসে গেলি মনে হচ্ছে? শালা ওকে যা দেখতে, কেউ যদি গোটা বাগানটা উপড়ে দিয়ে দেয়, তাতেও কিছু বলার নেই। যতই খেলায় জিতিস আর যা-ই করিস, তুই কিন্তু চিরকালীন আতা ক্যালানে। ও একটা মেয়ে ছাড়া তো কিছু নয়। একবার প্রোপোজ করেছিলিস, রিপ্লাই দেয়নি, তার মানে কি সারাজীবন বসে সেই নিয়ে গ্রাম্বল করবি? শালা, একটা ফুলের তোড়া দেখেই তোর মুখের যা জিয়োগ্রাফি তাতে সামনের বার মাধ্যমিকের সিলেবাস বদলাতে হবে মনে হচ্ছে। যা না, কথা বল না আবার। পৃথিবীর নাইন্টি পারসেন্ট মেয়েকে মাল্টিপল প্রপোজাল দিতে হয়। যা।”
পুরু কুশের কথায় ভরসা পেয়ে রাস্তা পেরিয়ে গিয়েছিল রোহিনীর দিকে। রোহিণী পুরুকে সামনে দেখে যেন ভূত দেখছে এমনভাবে চমকে উঠেছিল। তারপর দ্রুত পুরুকে কোনও কিছু বলার সুযোগ না-দিয়েই চলে গিয়েছিল পাশ কাটিয়ে। বোকার মতো দাঁড়িয়ে ছিল পুরু। রাস্তায় তখন মাঠ থেকে খেলা দেখে ফেরা লোকের ঢল। তাই অত লোকের মাঝে কিছু করতেও পারেনি পুরু। শুধু বোকার মতো দেখছিল বড় একটা মাঠ, নানা ধরনের গাছ, আর তার মধ্যে দিয়ে যাওয়া উঁচু নিচু রাস্তার ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে রোহিণী।
তখন থেকে মনটা খচখচ করছে ওর। সব কিছু করেও যেন কিছু করতে ইচ্ছে করছে না। “স্যার, কী চিন্তা করছেন?” জ্যাকসন পুরুর পাশে বসে জিজ্ঞেস করল, পুরু দেখল অন্যান্যরাও এসে ওকে ঘিরে বসে পড়েছে। মাঘ মাস চললেও শীত হঠাৎ কমে এসেছে এখন। তাই কারও গায়েই খুব কিছু শীতের পোশাক নেই। সবার মুখ চোখ দেখে ভারী আনন্দ হল পুরুর। ইস ও যদি এই বয়সটা ফিরে পেত আবার! “কী স্যার, কী চিন্তা করছেন এত?” আবার প্রশ্ন করল জ্যাকসন। পুরু সামান্য হেসে বলল, “কই কিছু না তো।”
“তা হলে এবার চিন্তা করুন।” বলে জ্যাকসন বলল, “আচ্ছা স্যার, বলুন তো ‘একটি অবিবাহিতা মেয়ে নীচে দাঁড়িয়ে আছে’ এর ইংলিশ ট্রান্সলেশন এক কথায় কী হবে? মানে একটাই ইংলিশ শব্দ বলতে হবে যার মানে দাঁড়ায় এটা।”
পুরু হাসল, এ আবার কীরকম প্রশ্ন। খানিকক্ষণ চিন্তা করে বলল, “ধুস, পারব না। তুমি বলো।”
জ্যাকসন তৃপ্তির হাসি দিল, “এনিওয়ান? তোরা কেউ পারবি?” সবাই চুপ। পুরু বুঝল কেউ পারবে না। জ্যাকসন মিটিমিটি হাসছে। সায়েকা বলল, “কেন সাসপেন্স ক্রিয়েট করছ? বলেই দাও না?”
জ্যাকসন বলল, “তা হলে সবাই ফেল তো?”
“না ফেল নয়। উত্তরটা হবে Missunderstanding।” পুরু অবাক হয়ে দেখল ওদের জটলার থেকে একটু দূরে মোটরবাইক স্ট্যান্ড করতে করতে জবাবটা দিল কুশ। জ্যাকসন থতমত খেয়ে গেল। এটা ও আশা করেনি। কুশ এবার কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, “তোমার উত্তর তো দিলাম। এবার বলো তো মায়ের বোন মাসি হলে বাবার বোন পিসি কীভাবে প্রমাণ করবে?”
জ্যাকসন বলল, “এ আবার কী? ধুর, এ আবার প্রমাণ করাই যায় না।”
কুশ হাসল, “পারলে না তো? খুব সোজা। আচ্ছা শোনো:
মাতার বোন মাসি
১-এর বোন মাসি
মাতা
পিতার বোন পি (তা) × (মা) সি।
(মাতা) = পিসি।”
“গুরু, গুরু” বলে জ্যাকসন কুশের হাত ধরল। পুরু ভাবল একেবারে সেয়ানে সেয়ানে হয়েছে। ও কথা ঘোরাবার জন্য বলল, “কী রে দেরি হল? যাক গে! পরিচয় করিয়ে দিই। এ হল কুশ, আমার বন্ধু। আর এরা হল…”
কুশ পুরুকে কথা শেষ করতে না দিয়ে নিজেই এগিয়ে গিয়ে সবার সঙ্গে পরিচয় করে নিল। ঠিক সেই সময় দুটো সাইকেল বেল বাজিয়ে হাজির হল সেখানে। পুরু দেখল দুটো ঢাউস সাদা পলিপ্যাকে খাবারদাবার নিয়ে এসেছে দিয়েগো আর আমন।
ওরা খাবারের প্যাকেটগুলো বের করার উদ্যোগে নিতে যাবে এমন সময় কুশ ফিসফিস করে পুরুর কানে বলল, “রোহিণীকে দেখলাম রাকার সঙ্গে বেরিয়েছে। সিনেমা হলের সামনে ফুচকা খাচ্ছে। এখন গেলে ধরতে পারবি।”
পুরু রোহিণীর নাম শুনে চিড়িং করে শক খেল যেন। ওঃ আবার সেই মেয়েটার কথা কেন? ও অভিমানভরে বলল, “না আমি যাব না।”
কুশ চাপা গলায় বলল, “ছাগলামো করিস না। যা। প্রুভ ইয়োর টেনাসিটি, গার্লস লাইক দ্যাট।” এই সামান্য কথাতেই পুরু দ্বিধায় পড়ে গেল। কুশ এবার আলতো ধাক্কা দিয়ে বলল, “যা না শালা।” পুরু এবার সত্যি উঠল। এখান থেকে সিনেমা হল খুব কাছে। তিন-চার মিনিটের হাঁটা পথ। পুরু সবাইকে “একটু আসছি” বলে জোরে পা চালাল সিনেমা হলের দিকে। ভাবল এর মধ্যে যদি ফুচকা খাওয়া হয়ে গিয়েও থাকে, তা হলেও ওরা বেশি দূর যেতে পারেনি। ওই চত্বরেই হবে। শুধু একটু খুঁজে নিতে হবে, এই যা।
সিনেমা হলের চত্বরটা বেশ ঝলমল করছে আজ। আর হবেই তো! সরস্বতী পুজো বলে কথা। পুরুকে বেশিক্ষণ খুঁজতে হল না। দেখল, বড় রাস্তা দিয়ে একটু দূরে হেঁটে যাচ্ছে দুই বোন। সামান্য ভিড় থাকলেও দু’জনকে চিনতে অসুবিধা হল না পুরুর। ও রোহিণীদের পিছু নিল। আজ একটা হেস্তনেস্ত করবে ও। রোহিণী বহুত ঝুলিয়েছে ওকে। এত দিনে একটা কথাও বলেনি। অহংকার, না? আজ ওর সমস্ত অহংকার ভাঙবে পুরু।
দুটো পুজো প্যান্ডেলের মাঝখানের অপেক্ষাকৃত ফাঁকা জায়গায় পুরু গিয়ে দাঁড়াল ওদের সামনে। পুরু লক্ষ করল ওকে দেখেই রোহিণীর মুখটা যেন হঠাৎ সাদা হয়ে গেল ঠিক গতকালের মতো। পুরু ভাবল ও কি দৈত্য না দানব? ওকে এত ভয় পাওয়ার কী আছে? পুরু কঠিন গলায় বলল, “আমাকে চিনতে পারছ রোহিণী? মানে, আমাকে চিনতে পারো তুমি? আমি কী অন্যায় করেছি বলতে পারো? আর কত দিন তোমার কাছে আসব আমি? আমাকে পছন্দ হয় না সেটা সরাসরি বলে দিলেই তো পারো, এভাবে অবজ্ঞা করার, কথা না-বলে চলে যাওয়ার কী মানে হয়? তুমি সুন্দরী বলে তোমার খুব অহংকার, না? তুমি জানো ভালবাসলে কেমন লাগে? কতটা কষ্ট হয়? আমায় এভাবে কষ্ট দিয়ে কী লাভ তোমার? বলো, কথা বলছ না কেন? কেন কথা বলছ না?”
পুরু শেষ কথাগুলো বলার সময় একটু চিৎকার করে ফেলল। ও দেখল রোহিণী কঁপছে। ওর অতর্কিত আক্রমণে রাকাও হতবাক। পুরু আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু রোহিণী আর দাঁড়াল না। পিছন ফিরে দ্রুত হাঁটতে লাগল ওদের বাড়ির দিকে।
পুরুও ওর পিছু নিত কিন্তু রাকা এবার হাত ধরে ফেলল পুরুর। ও তাকিয়ে দেখল রাকার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। চোখ দুটোও যেন জ্বলছে। পুরু এবার নিজে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। রাকা কঠিন গলায় বলল, “আপনি দিদির সম্বন্ধে কতটুকু জানেন যে ওকে অহংকারী বললেন? দিদি ভাল, প্রতিবাদ করতে পারে না, তাই আপনি যা ইচ্ছে তাই বলে যাবেন? খুব তো ভালবাসেন বলছেন। যাকে ভালবাসেন তাকে এতগুলো কথা শোনাতে খারাপ লাগল না?”
পুরুর তেজ কমে গেছে এতক্ষণে। আসলে খুব বেশিক্ষণ তেজ করে থাকতে পারে না পুরু। ও হতাশ গলায় বলল, “আমি কী করব? তোমার দিদি আমায় মানুষ বলে গণ্য করে না। তুমি বুঝবে না এর যন্ত্রণা। জানো আমার কথার উত্তর পর্যন্ত দেয় না।”
রাকা থমকাল, তারপর বলল, “সত্যি কথাটা শুনবেন? মনের জোর আছে? শোনার পর দিদিকে ভালবাসবেন আর?”
পুরু ঘাবড়ে গেল, জিজ্ঞেস করল, “মানে? কী বলছ তুমি?”
রাকা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল পুরুর দিকে। তারপর বলল, “শুনুন তবে, আমার দিদি কথা বলতে পারে না। জন্ম থেকেই স্বরযন্ত্রের একটা ডিফেক্ট আছে ওর। ও সব শুনতে পায় কিন্তু কিছু বলতে পারে না। সেইজন্য সবসময় সংকুচিত হয়ে থাকে ও। বুঝলেন তো কেন ও কিছু বলে না আপনাকে? তারাতলার কাছে একটা ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জড বাচ্চাদের স্কুলে পড়ায় ও। সেটুকু নিয়েই থাকে। আপনি ওকে পছন্দ করেন শোনার পর থেকে ওর জীবনটা একটু অন্যরকম হয়েছে। কিন্তু আর কি আপনি ওকে পছন্দ করবেন? ভালবাসবেন? একটা বোবা মেয়েকে ভালবাসবেন আপনি?”
পুরু নিষ্পলক তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ, তারপর জিজ্ঞেস করল, “ও কি আমায় পছন্দ করে রাকা?”
রাকা বলল, “আমি জানি না, নিজেই জিজ্ঞেস করুন গিয়ে।”
পুরুর মাথা ঘুরছে যেন। ওর হাত পা কাঁপছে। এখন রোহিণী কোথায়? পুরু প্রায় দৌড়োতে লাগল রোহিণী যে-পথে হেঁটে গেছে সেই পথে। রোহিণী কি বাড়ি চলে গেল? প্রায় মল্লিকবাজারের মোড় এসে গেছে। ডানদিক দিয়েই রোহিণীদের বাড়ি যাওয়ার রাস্তা। পুরু দ্রুত বাঁক নিল সেই দিকে আর তখনই চিৎকার শুনল একটা, “স্যার ওই দিকে না। সোজা গেছে সোজা, বাটা ফ্যাক্টরির দিকে।” পুরু ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল রাস্তার অন্য দিক থেকে জ্যাকসন চেঁচাচ্ছে। ওর পাশে দিয়েগো, আমন, কবীর, সায়েকা, শিমুল, রুপাই আর কুশ। সবাই একসঙ্গে ওকে বাটা ফ্যাক্টরির রাস্তাটা দেখাচ্ছে।
পুরু থতমত খেয়ে গেল। ওরা জানল কী করে? যাক গে। পুরু এবার বাটা ফ্যাক্টরির রাস্তার দিকে যেতে লাগল। ও জানে এই পথ দিয়েও রোহিণীদের বাড়ি যাওয়া যায়। কিন্তু এখানেই বা রোহিণী কোথায়? এদিকটা বেশ ফাঁকা। এখানে পুজোটুজো হয় না। সন্ধের পর থেকেই ঝিম মেরে থাকে অঞ্চলটা। পুরু এদিক ওদিক দেখতে লাগল। এবার ভয় করতে লাগল ওর। যখন রোহিণীকে ওসব কথা বলেছে তখন ওর মাথার ঠিক ছিল না। কী বলতে কী বলেছে! মেয়েটা যদি কিছু করে বসে? পুরু পাগলের মতো এদিক ওদিক তাকাতে লাগল। চারিদিকের গাছপালার মধ্যে ঠাহর করা মুশকিল। তবে কি ফিরে গিয়ে অন্য জায়গায় দেখবে? পুরু যখন কী করবে বুঝতে পারছে না ঠিক তখনই চোখে পড়ল ওর। দূরের দুটো বকুল গাছ, আর তার মাঝে দাঁড়িয়ে রয়েছে রোহিণী।
পুরু একটু হেঁটে একটু ছুটে ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। রোহিণী মাটির দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পুরু সামনে যাওয়াতেও মুখ তুলে তাকাল না। পুরু নরম করে ডাকল, “রোহিণী। আমার দিকে তাকাবে না রোহিণী? আমার এই তুচ্ছ, সামান্য জীবনটাকে বড় করে তুলবে না তুমি? আমার জীবনের সমস্ত ভাঙচুরগুলো তুমি ঠিক করে দেবে না নিজের হাতে? রোহিণী, আমাকে তোমার কাছে একটু রাখবে তুমি? আমাকে সারিয়ে তুলবে একটু?” রোহিণী ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকাল পুরুর দিকে। পুরু অবাক হয়ে দেখল সেই চোখ। এত সহজ, কিন্তু এত রহস্যময় আর কিছু কোনওদিন দেখেনি পুরু। পুরু ভাবল যার চোখ এত কথা বলে সে না হয় কথা বললই না। কী এসে গেল তাতে? পুরু আলতো করে হাত ধরল রোহিণীর। হঠাৎ বড় রাস্তার ওখান থেকে হল্লা উঠল একটা। পুরু দেখল কুশ আর বাকিরা দাঁড়িয়ে আছে দূরে, আর ওদের দিকে হাত নাড়ছে।
পুরু হাসল। দেখল রোহিণী শক্ত করে ওর হাতটা ধরে রয়েছে। হঠাৎ মৃদুমন্দ হাওয়া বইতে লাগল। সরস্বতী পুজোর সন্ধে গাঢ় হয়ে রাতের দিকে চলতে লাগল। ওরা দু’জনে দু’জনকে ধরে দাঁড়িয়ে রইল ওই বকুল গাছের তলায়। আকাশে ভেসে থাকল শুক্লা পঞ্চমীর চাঁদ। দু’-চারটে রাতের পাখি হাওয়া কেটে চলে গেল কোথাও। তখন দূরে, ছায়ার মতো মানুষেরা সুখ দুঃখ পেরিয়ে হেঁটে চলেছে। গাছেদের নতুন হয়ে ওঠার সময় হয়ে এল। পাতা ঝরার মরশুম শেষ হয়ে এল প্রায়। বসন্ত আসছে। এই লেবু রঙের চাঁদ, এই সারি সারি ঘুমন্ত গুলমোহর, এই দু’-এক ঝাপটা ফুলের গন্ধ, এই কণ্ঠহারের মতো মার্কারি ভেপার, এই ঝুলনের মতো সাজানো শহরতলি, এইসব বন্ধুত্ব, এইসব ভালবাসা— সমস্তকে সাক্ষী করে, হাজার হাজার মানুষকে বাঁচিয়ে তুলতে, বসন্ত ফিরে আসছে আবার। বসন্ত ফিরে আসে বারবার।
***
