কেউ কি পায়েস বসিয়েছে? কাছে কিংবা দূরে? নতুন গুড় দিয়ে তৈরি পায়েস? সকালে ঘুম থেকে উঠেই গন্ধটা পেয়েছিল ডুডু। প্রথমে ভেবেছিল শীতকাল, মা হয়তো পায়েস করছে। কাল সরস্বতী পুজো, বাড়িতে অনেক লোকজন এসেছে, তাই হয়তো মা পুলিপিঠে আর চালের পায়েস বসিয়েছে। কিন্তু দেখল, তা নয়। আশেপাশে যারা থাকে তাদের বাড়িতেও বোধহয় নয়, কারণ সেসব বাড়ির সঙ্গে ডুডুদের সম্পর্ক ভাল। ভাল কিছু রান্না হলেই দেওয়া নেওয়া হয়। তবে? এরকম পায়েস পায়েস গন্ধ পাচ্ছে কেন ডুডু? তবে কি এটাও সেই ‘ঠিক বিরিয়ানি নয়’ টাইপের গন্ধ? মানে আবার কি কোনও গন্ডগোল হবে?
সকালের সময় প্রথম গন্ধটা পেয়েছিল ডুডু, তারপর আবার পেল একটু আগে। কিটব্যাগে জার্সি, বুট, শিনগার্ড ঢোকাচ্ছিল ও। আজ সেই মরণ বাঁচন ম্যাচ। খেলা শুরু হবে সাড়ে তিনটের সময়। এখন দুপুর পৌনে দুটো। ডুডু সবসময় সব জায়গায় আগে আগে পৌঁছে যায়। না হলে কেমন যেন টেনশন হয় ওর। ওর ইচ্ছে আছে সওয়া দুটোর মধ্যে মাঠে চলে যাবে। এমনিতেই আজকের ম্যাচটা ঘিরে একটা চাপা টেনশন তৈরি হয়েছে। সেইজন্য চাইছিল একটু আগে মাঠে গিয়ে মাঠের সঙ্গে অ্যাকাস্টমড হতে। সেইমতো দুপুরে হালকা খাওয়াদাওয়া করে কিট গোছাচ্ছিল ডুডু কিন্তু ঝামেলা বাধাল গন্ধটা। নতুন গুড় দিয়ে তৈরি পায়েসের গন্ধ আসছে কোত্থেকে? এ কি বিপদের গন্ধ না অন্য কিছুর?
মাঝে মাঝে ডুডু ভাবে সত্যিই গত জন্মে কুকুরটুকুর ছিল না তো ও? মাইরি, উৎকট গন্ধগুলো আর ঢোকার জায়গা পায় না? ওর নাকেই এসে ঢুকতে হবে? এমনিতেই আজ বৃহস্পতিবার। বিকেলবেলায় অর্থাৎ বারবেলার পর খেলা, তার ওপর এই গন্ধ, কী অঘটন ঘটবে কে জানে। গলা শুকিয়ে গেল ডুডুর। টেবিল থেকে জলের বোতলটা তুলল ও।
ঠিক দুটোয় সাইকেল নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল ডুডু। বেরোবার আগে ঠাকুরদাকে প্রণাম করে নিয়েছে। ঠাকুরদা মাথায় হাত রেখে কীসব মন্ত্রটন্ত্র পড়ে দিয়েছেন। সেটুকুই যা আজ ভরসা। রাস্তার মোড়ে ডুডু দেখল মেঘাদি আসছে। আজ মেঘাদির স্কুল ছুটি, ডুডু জানে। কিন্তু এই দুপুরে কোত্থেকে আসছে মেঘাদি? ডুডু সাইকেল থেকে নেমে পড়ল। মেঘাদি ডুডুর কাছে এসে দাঁড়াল। “কী রে ভরদুপুরে কোথায় চললি? তোর ম্যাচ সাড়ে তিনটের সময় না?”
ডুডু বোকার মতো হাসল, বলল, “না মানে ওই আর কী। তুমি এখন কোত্থেকে আসছ?”
“মনে নেই কাল আমার স্কুলে সরস্বতী পুজো। তার আয়োজনেই বেরিয়েছিলাম। অবশ্য মনে থাকবেই বা কেমন করে? আজকাল তো আর না-ডেকে পাঠালে আসিস না। আর সত্যিই তো আসবিই বা কেন। সে তো দিল্লি গেছে, এখন কদিন ক্লাসে আসছে না।” ঠেশ দিয়ে বলল মেঘাদি। ডুডু চুপ করে গেল। ও জানে সায়েকা দিল্লি গেছে। ওকে জ্যাকসন বলেছে। ও জ্যাকসনকে জিজ্ঞেস করেছিল কীভাবে খবর পেয়েছে ও, কিন্তু জ্যাকসন সেটা আর বলেনি। মেঘাদির কথার খোঁচায় অস্বস্তি হল ডুডুর। ভাবল সায়েকার কথাটা না-বললেই কি চলছিল না মেঘাদির? সত্যিই সায়েকার জন্য খুব মনখারাপ হয় ডুডুর। এই যে ও এখানে নেই এতে যেন ম্লান হয়ে গেছে বাটানগর। কেমন যেন রং-চটা বাড়িঘর, ময়লা আকাশ, কঙ্কালের মতো গাছ, পুরনো হলুদ শাড়ির মতো রোদ, সবই কেমন যেন ফ্যাকাশে। ডুডু দীর্ঘশ্বাস ফেলল একটা। আর কথা না-বাড়িয়ে বলল, “আমি এলাম মেঘাদি।”
মেঘাদি হাসল, হাত দিয়ে ওর চুলটা ঘেঁটে দিয়ে বলল, “পাগল ছেলে, বেস্ট অব্ লাক। আজ জিততে হবে কিন্তু।” ডুডু স্লানভাবে হাসল একটু, তারপর সাইকেলে উঠল।
রেললাইনের পাশ দিয়ে গিয়ে বাটা ব্রিজকে ডানদিকে রেখে বাটা অ্যাভিনিউতে উঠবে ও। রেললাইনের পাশের রাস্তাটা বাটানগরের অন্যান্য রাস্তার মতোই নির্জন। তার ওপর এখন দুপুরবেলা। রাস্তাঘাট আরও ফাঁকা। অবশ্য রাস্তা ফাঁকা হওয়ার অন্য আরেকটা কারণও আছে। আর সেটা হল আজকের ম্যাচ। কমসে কম হাজার দশেক লোক হবে আজ। বাটানগর ছাড়াও বজবজ, আক্রা, সন্তোষপুর অঞ্চল থেকেও প্রচুর লোক আসে এই খেলাটা দেখতে। ডুডু সাইকেল চালাতে লাগল।
গতকাল থেকে শীতটা বেশ কমে গেছে হঠাৎ। আজ আবার মিষ্টি হাওয়া দিচ্ছে একটা। কে জানে কেন রোদটাকে আর অতটা ফালতু মনে হচ্ছে না এখন। আকাশটাও মনে হচ্ছে নতুন রং করানো। কেসটা কী? একটু আগেও যা মনে হচ্ছিল তা তো আর মনে হচ্ছে না। এত দ্রুত কারও মন পালটায় নাকি? তবে কি গন্ধটা কোনও ভাল কিছুর ইঙ্গিত? কী ভাল হতে পারে? ম্যাচ জিতবে? সায়েকা ওর সঙ্গে কথা বলবে আবার? কী ভাল অপেক্ষা করে আছে ওর জন্য? ডুডু অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল। সামনে, কিছুটা দূরে, রাস্তাটা বাঁদিকে বাঁক নিয়েছে। ওই জায়গাটার দু’দিকে কিছুটা বুনো ঝোপঝাড় আছে। ডুডু যদি অন্যমনস্ক না হত, যদি একটু সাবধান হত, তবে ও দেখতে পেত ওই ঝোপের পাশে তিনটে রুক্ষ চেহারার ছেলে দাঁড়িয়ে আছে।
সায়েকা কি সত্যি ওর সঙ্গে আগের মতো কথা বলবে আবার? আবার কি শুধু ওর সঙ্গে সময় কাটাতে চাইবে? এইসব ভাবতে ভাবতে বাঁকের কাছে চলে এল ডুডু। আর হঠাৎ কী যেন হল। চোখের সামনে পৃথিবীটা দুলে উঠল ওর। সাইকেল থেকে ও ছিটকে পড়ল রাস্তার পাশে ঘাসে। থতমত খেয়ে গেল ডুডু। কী হল? পড়ে গেল কী করে? তবে ভাগ্য ভাল ঘাসে পড়েছে বলে বিশেষ লাগেনি ডুডুর। একটু ধাতস্থ হওয়ার আগেই ও দেখল তিনটে মুখ ঝুঁকে আছে ওর ওপর। মুখগুলো দেখলেই বোঝা যায় সেগুলো মোটেই বন্ধুত্বপূর্ণ নয়। বরং কিছুটা হিংস্রই। এর মধ্যে দু’জনকে চিনতে পারল না ডুডু। কিন্তু মাঝের ছেলেটাকে দেখে শিরদাঁড়া দিয়ে হিম স্রোত বয়ে গেল ওর। রোগা ফ্যাকাশে ছেলেটাকে খুব ভাল করে চেনে ও। ছেলেটা তিমির।
“হ্যালো ডুডু মাস্টার, ফুটবল খেলতে যাচ্ছ?” তিমির ব্যঙ্গ করে বলল। ডুডু কোনও জবাব না-দিয়ে চুপ করে তাকিয়ে রইল ওর দিকে। তিমির হাসল। তারপর বাবু হয়ে বসে পড়ল ডুডুর পাশে। শান্ত গলায় বলল, “আজ তোকে খেলাধুলো করতে হবে না, বুঝলি। আমার সঙ্গে বসে থাক।”
ডুডু এবার বলল, “কী যা-তা বলছিস? ছাড় আমায়। মাঠে যেতে হবে।”
তিমির এবার গলাটা শক্ত করল, “সোজা বাংলা বুঝিস না? আজ তোর খেলা বন্ধ। তোকে আমার সঙ্গে সন্ধে ছ’টা অবধি থাকতে হবে। এখন চুপ করে বস।”
“মানে? মগের মুল্লুক নাকি?” ডুডু তেড়েমেরে দাঁড়াবার চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না। অন্য দুটো ছেলে ধাক্কা মেরে মাটিতে বসিয়ে দিল ওকে। ডুডুর সব কিছু গুলিয়ে যাচ্ছে। কী হচ্ছে কী?
ও বলল, “তিমির, ইয়ারকি ভাল লাগছে না কিন্তু। ছাড় আমায়।”
তিমির শক্ত করে ডুডুর থুতনি ধরল, “হারামি, ইয়ারকি মারছি? তুই কে রে? যদি এখান থেকে এক পা-ও নড়িস, তোর গোড়ালির রগ দুটো কেটে দেব, বুঝেছিস?” ডুডু দেখল তিমিরের হাতে-ধরা ক্ষুরটা রোদে ঝিকোচ্ছে।
“এমন কেন করছিস তিমির? জানিস না খেলাটা কত ইমপর্ট্যান্ট। আমায় ছেড়ে দে।” ডুডু কাতর গলায় বলল। তিমির আবার হাসল, “তোর খেলায় পেচ্ছাপ করি রে শুয়োরের বাচ্চা। তোকে ম্যাচে খেলতে দেব না। বুঝলি? এখন চুপ কর।” একটা ছেলে পকেট থেকে একটা সিগারেট দিল তিমিরকে। সিগারেটের সামনেটা লজেন্সের র্যাপারের মতো মোড়ানো। ডুডু বুঝল ওটাতে গাঁজা আছে। ও আবার বলল, “তিমির, আমায় ছাড়। নয়তো ভাল হবে না বলছি।”
ঠাস করে চড় পড়ল ডুডুর গালে। তিমির চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “ভাল হবে না মানে? আমায় থ্রেট করছিস তুই? শোন, আজ ম্যাচটা তোকে খেলতে দেব না। আর একটা কথা বললে কিন্তু হাঁ মুখ চিরে কুমিরের মতো করে দেব।” তিমিরের মুখ দেখে ডুডু বুঝল তিমির অমন করতেও পারে। তিমির আবার বলল, “শালা, সেদিন তোদের মার আমি ভুলিনি। আজ দেখ তোদের খেলার তেইশটা কীভাবে মারি।”
একটু দুরে সাইকেলটা কাত হয়ে পড়ে আছে। এমন কপাল, রাস্তা দিয়ে একজনও যাচ্ছে না। সময়ের সঙ্গে সূর্য ধীরে ধীরে পশ্চিমে সরতে শুরু করেছে। এখানটায় বসে বাটা কোয়ার্টারের সামনে মাঠগুলোয় কালকের পুজোর ছোট ছোট প্যান্ডেল দেখা যাচ্ছে। ডুডু আড়চোখে তিমিরের হাতঘড়িটা দেখল। তিনটে বাজে। আর মাত্র আধঘণ্টা বাকি আছে খেলা শুরুর। মাঠে সবাই নিশ্চয়ই ওর কথা ভাবছে। ওরা কি কেউ খুঁজতে আসবে না ওকে? ডুডু মাথা নিচু করে বসে রইল। এমনিতেই ও শান্ত। ওর পক্ষে তিনজনের সঙ্গে মারামারি করা সম্ভব নয়। এখন ও বুঝল কেন ওর নামটা ‘বন্ড, জেমস বন্ড’-এর মতো করে বলা যায় না। ও সামান্য এক মফস্সলের ছেলে। ভিতু, ঈশ্বরবিশ্বাসী, কারও খারাপ চায় না। তবে ওর এরকম হল কেন? এটাই স্কুলের হয়ে ওর শেষ খেলা। সেটা কি ও স্মরণীয় করে রাখতে পারবে না। এভাবে একটা নোংরা ছেলে ওকে আটকে দেবে? ডুডুর চোখ ফেটে জল আসছে। ভগবান।
কে জানে ভগবান আছেন কিনা। কে জানে মানুষের বিপদে কেউ তাকে আড়াল থেকে রক্ষা করেন কিনা। কিন্তু তবু মানুষকে তাঁকে ডাকতে হয়। তাঁর ওপর ভরসা করতে হয়। ঠাকুরদা বলেন মানুষের এই বিশ্বাস আর ভরসার মিলিত রূপ হল ভগবান। ডুডু চুপ করে বসে রইল। ওর বিশ্বাস আর ভরসাকে মেলাতে চাইল প্রাণপণে। তিমিররা নিজেদের মধ্যে কীসব কথাবার্তা বলছে। ডুডু সেদিকে মন দিল না। তিনটে পাঁচ। ওর ঘাম হতে শুরু করল এবার। কেউ কি সত্যিই আসবে না?
ঠিক সেই মুহূর্তে রাস্তার দূরের বাঁকে চারটে সাইকেল ধুলো উড়িয়ে বাঁক নিল একসঙ্গে। কিছু শুকনো পাতা উড়ে এল চাকায় চাকায়। একঝাঁক চড়াই উড়ে পালাল। আশেপাশের ঝোপ থেকে চমকে উঠল দুটো ছাগলছানা। চারটে সাইকেল দ্রুত এগোতে লাগল কমলালেবু রঙের রোদ চিরে। আবছা শব্দ পেয়ে ডুডু বাঁদিকে তাকাল। তিমিররা নিজেদের কথাবার্তা আর সামান্য নেশা হয়েছে বলেই বোধহয় বুঝতে পারেনি! ডুডু ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে দেখল অনেকটা দূরে চারটে সাইকেল ভাঙা পিচের রাস্তার ধুলো উড়িয়ে আসছে। তার মধ্যে একটা সাইকেল লাল, গিয়ার চেঞ্জিং। বাটানগরে একমাত্র একজনেরই এই সাইকেল আছে। আর সেই সাইকেলের পাশের সাইকেল থেকে গোলাপি ওড়না উড়ছে একটা। এই ওড়নাটা কার চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারে ডুডু। ওর সারাগায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল, তবে কি বিশ্বাস আর ভরসা মিলল শেষ পর্যন্ত? ও দেখল কয়েকজনের সঙ্গে ঝড়ের বেগে এগিয়ে আসছে জ্যাকসন আর হিরে মুক্তোর সেই মেয়েটা। সায়েকা।
সাইকেলগুলো যখন প্রায় কাছে চলে এসেছে হঠাৎ ঝোপের মধ্যে থেকে দাঁড়িয়ে উঠল ডুডু। তিমিররাও এতক্ষণে বুঝতে পেরেছে যে কিছু একটা হচ্ছে। তিমির হাতের ক্ষুরটা তুলে লাফিয়ে উঠল, “অ্যাই শুয়োরের বাচ্চা…” কিন্তু আর কিছু বলার সুযোগ পেল না, জ্যাকসন সাইকেল নিয়ে সোজা গিয়ে ধাক্কা মারল ওর তলপেটে। “মা গো” বলে পেট চেপে বসে পড়ল তিমির। বাকি দুটো ছেলে বেগতিক দেখে ততক্ষণে দৌড় মেরেছে। ওদের পেছনে কেউ দৌড়োল না। মাটিতে পড়ে থাকা তিমিরকে কলার ধরে তুলল জ্যাকসন, মিহি গলায় বলল, “কী চাঁদ! ডুডুকে নিয়ে কী করছিলি?” ডুডু যথাসম্ভব সংক্ষেপে পুরো ব্যাপারটা বলল। জ্যাকসন হাসল, “তিমির, রুদ্র তোকে এটা করতে বলেছে, না?” তিমির আমতা আমতা করছে দেখে এবার এগিয়ে এল একজন লম্বা ভীষণ সুপুরুষ ছেলে। সে রোগা তিমিরকে ঘাড় ধরে মাটি থেকে অনায়াসে ছ’ইঞ্চি তুলে ফেলল, তারপর বলল, “লিভ হিম টু মি৷ হি উইল টক।”
এতক্ষণে কথা বলল সায়েকা, “দাদা, ওকে ছাড়, মাঠে যাবি চল। দেরি হয়ে যাবে।” দাদা? সায়েকার? ডুডু সায়েকাকে জিজ্ঞেস করল, “তোমার দাদা? মানে?”
“আবার মানে? আমি কি ডিকশনারি? দাদা, মানে জ্যাঠতুতো দাদা। এন ডি এ তে আছে। আমরা দিদুকে নিয়ে এসেছি দিল্লি থেকে। ছুটি বলে আমাদের সঙ্গে দাদাও এসেছে।” দাদা এবার তিমিরকে দু’বার ঝাঁকিয়ে ছুড়ে ফেলল দূরে। ডুডুর মনে হল তিমির যেন শোলার তৈরি। এই তিনজন ছাড়া স্কুলেরই আরেকজন স্টুডেন্ট ছিল। ও এবার তিমিরকে তাড়া করল। তিমির মাটি থেকে উঠে চোখের নিমেষে রেললাইন টপকে পালিয়ে গেল। “এই ক’টা বাজে? চল তাড়াতাড়ি।” ডুডু আর পাত্তা না-দিয়ে সাইকেলটা মাটি থেকে তুলে বলল।
“ডোন্ট হেস্ট। খেলা শুরু হবে চারটেতে। এম এল এ সাহেব চারটেয় আসবেন। ফলে চল্লিশ মিনিট সময় আছে এখনও।” জ্যাকসন নিশ্চিন্ত গলায় বলল। ওরা এবার সাইকেলে উঠে পড়ল সবাই। এখান থেকে বাটা স্টেডিয়াম আট মিনিট লাগবে বড়জোর। ডুডু জিজ্ঞেস করল, “আমি এখানে আছি জানলি কী করে?”
“তুই সায়েকাকে জিজ্ঞেস কর। আমি দাদার সঙ্গে কথা বলি।” বলে জ্যাকসন চোখ টিপল ডুডুকে। ডুডু শুনল এবার দাদার দিকে মুখ ঘুরিয়ে জ্যাকসন জিজ্ঞেস করছে, “আচ্ছা ডি এন এ তো শুনেছি। এন ডি এ কী? জিন গবেষণার কোনও নতুন জায়গা?” সায়েকা আর ডুডুর সাইকেল সামনে এগিয়ে গেল।
ধীরে সাইকেল চালাচ্ছিল ওরা। বিকেলের রোদ এত সুন্দর কোনওদিন খেয়াল করেনি ডুডু। বড় রাস্তার দু’পাশের লাল সাদা কোয়ার্টারগুলোয় রং করা হয়েছে। মাঠের আগাছাও সব পরিষ্কার করা হয়েছে। শীত শেষের বার্তা নিয়ে একটু একটু করে সবুজ পাতা আসছে রাস্তার দু’পাশের গুলমোহর গাছে। সায়েকা পাশ ঘেঁষে সাইকেল চালাচ্ছে। ডুডু মিষ্টি গন্ধ পাচ্ছে ওর গায়ের। নরম হাওয়ায় চুলগুলো বারবার এসে পড়ছে কপালে। রোদ লেগেই বোধহয় ফরসা গাল দুটো হালকা গোলাপি রং ধরেছে। ডুডু ভাবল এ-মেয়ে কোথা থেকে এল? একে না-পেলে বাঁচবে কী করে ডুডু? বুকের মধ্যে কষ্ট হতে লাগল ওর। আধঘণ্টা আগেও জানত না সায়েকা ওর এত কাছাকাছি আসবে। মাঠের মধ্যে বসে তিমির আর ওর সাঙ্গোপাঙ্গদের মধ্যে থেকে শুধু ভগবানকে ডাকছিল ডুডু। তবে কি সত্যিই ভগবান আছেন? তিনি কি সত্যিই শেষ মুহূর্তে হাত ধরেন ডুবন্ত মানুষের? ডুডুর গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। কেউ কি সত্যিই অলক্ষ্যে থেকে লক্ষ করছেন ডুডুকে।
“গালটা লাল কেন, ওরা মেরেছিল বুঝি?” সায়েকা জিজ্ঞেস করল।
ডুডু সামান্য লজ্জিত হয়ে বলল, “ওই একটু, তেমন লাগেনি।”
“হুঁ বাহাদুর কত! একটুও লাগেনি! না-লাগলে অমন পাঁচ আঙুলের দাগ বসে যায় গালে?”
ডুডু হাসল, “তোমরা আমার খবর পেলে কী করে?”
“সে এক ইতিহাস। আমার দাদাকে তোমার কথা বলেছিলাম।”
“আমার কথা? কেন?” ডুডু অবাক হয়ে প্রশ্ন করল।
“আঃ শুধু প্রশ্ন আর প্রশ্ন। ন্যাকা না? জানো না কেন? এখন চুপ করো। তো, দাদা আবার ফুটবল-পাগল। বলল তোমায় আর ম্যাচ একসঙ্গে দেখবে। মাঠে গিয়ে দেখলাম সবাই এসেছে শুধু তুমি নেই। প্রথমে খুব রাগ হল আমার। তারপর জিজ্ঞেস করাতে জ্যাকসন বলল, তুমি সবার আগে মাঠে আসো। আজ যখন আসোনি নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে। পুরু স্যারও অধৈর্য হয়ে উঠেছিলেন। আমরা দাদার মোবাইল থেকে প্রথমে তোমার বাড়িতে, পরে মেঘাদির বাড়িতে ফোন করি। শুনলাম তুমি অনেক আগে বেরিয়ে গেছ। তখন জ্যাকসনই বলল যে খুঁজতে যাবে। তুমি যে-পথে মাঠে আসো সেটা ওর চেনা। আমি, দাদা, জ্যাকসন আর তোমাদের স্কুলের অন্য একজন ছেলেও এল আমাদের সঙ্গে। আর এদিকে তো তোমাকে ঝোপে বসিয়ে রেখেছে। যদি না তোমার সাইকেলটা রাস্তার উপর পড়ে থাকত, আমরা বুঝতেই পারতাম না তুমি কোথায়। অবশ্য তুমিও ঠিক সময়ে উঠে দাঁড়িয়েছিলে ঝোপের মধ্যে থেকে। ওঃ যা একটা অ্যাডভেঞ্চার গেল না! আর তোমারও বলিহারি। অত ফাঁকা রাস্তা দিয়ে চলাফেরার মানে কী?”
ডুডু বলল, “শর্টকাট তো, তাই।”
“শর্টকাট? সত্যিই, এসব করতে গিয়েই তো বিপদ ডেকে আনে। আমার চিন্তা হয় না বুঝি?”
স্টেডিয়াম এসে গেছে। ডুডু ভাবল স্টেডিয়ামটা আর দুশো মাইল দূরে হলে কী ভালই না হত! ও দেখল চারিদিকে রঙিন ফ্ল্যাগ উড়ছে, খাবারদাবার নিয়ে লোকেরা বসে পড়েছে। দর্শকও ঢুকছে পিলপিল করে। চারিদিকে হইহট্টগোল, কেমন একটা মেলা মেলা পরিবেশ। তবু, এসবের মাঝেও নিজেকে খুব হালকা আর নির্জন মনে হল ডুডুর। ওর জন্য চিন্তা হয় সায়েকার? ডুডুর মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল ওর কপিরাইটেড প্রশ্ন, “মানে?” গেটের মাঝে দাঁড়িয়ে পড়ল সায়েকা। এবার আর বিরক্তি নেই, শুধু ঠোঁট টিপে মৃদু হাসল। কিছু বলতও হয়তো কিন্তু পারল না। পেছন থেকে জ্যাকসন আর সামনে থেকে পুরু স্যার সমেত অন্য ছেলেরা এগিয়ে এল হন্তদন্ত হয়ে। ডুডুকে হাত ধরে টানতে টানতে ওরা নঙ্গী হাই-এর টেন্টের দিকে নিয়ে গেল। শেষ মুহূর্তে একবার পেছনে ফিরল ডুডু। নরম হাওয়ায় গোলাপি ওড়নাটা এখনও উড়ছে আর তার অধিশ্বরী, এত মানুষের ভিড়েও, স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। সেই থুতনিতে ঘূর্ণি, হাসিতে মুক্তোর বিজ্ঞাপন। ডুডু অলক্ষ্যের মানুষটাকে ধন্যবাদ দিল আর বুঝল ঠিক এই মুহূর্ত থেকে ওদের ছোট্ট জনপদে শুরু হল বসন্ত।
ডুডু টেন্টে গিয়ে কিট ব্যাগটা নামাল। ওঃ যা গেল আজকে! দিয়েগো জুতোর ফিতে বাঁধছিল। ডুডুকে দেখে এগিয়ে এল, “কী রে কোথায় ছিলি? জানিস না টিম নামবে? ভাগ্যিস এম এল এ লেট করলেন। না হলে কী হত বল তো?”
জ্যাকসন পাশ থেকে টিপ্পনী কাটল, “কী হত আবার? হাতে হ্যারিকেন পেছনে ইংরিজি বাজনা। শালা, ডুডু কিডন্যাপ হয়ে গিয়েছিল। ভাগ্যিস নায়িকা উদ্ধার করল। ওঃ তারপর কী সিন! চুমু, জড়াজড়ি, কাকা।”
“মারব শালা লাথি। ওসব কোথায় হল রে?” ডুডু খেঁকিয়ে উঠল।
জ্যাকসন বলল, “ও হয়নি বলেই রেগে যাচ্ছিস?” ডুডু আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তক্ষুনি ঢুকল পুরু, “কাম অন, হারি আপ। আর মিনিট পনেরো বাকি আছে মোটে। ও! আর একটা অ্যানাউন্সমেন্ট আছে। আজ এই ম্যাচে ক্যাপটেন হল দেবপ্রস্থ।”
“অ্যাঁ? ক্যাপ্টেন? এ যে মাসির গোঁফ গজিয়ে মেসো হয়ে ওঠা। স্যার, আমি, আমি ক্যাপ্টেন হব।” ফস করে বলে উঠল জ্যাকসন। পুরু কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু এবার বাধা দিলেন হেডস্যার। বললেন, “মনোময়, তুই ক্যাপ্টেন হবি? তুই তো টিমেই নেই। ঠিক আছে, আগে কো-অর্ডিনেট জিওমেট্রির ইলিপ্স্-এর প্রতিটা ফর্মুলা বল তো?
জ্যাকসন ঢোঁক গিলল, “স্যার ঠিক আছে, আমি ভাইস ক্যাপ্টেন হব তা হলে।”
দিয়েগো এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরল ডুডুকে। বলল, “চল আজ জিতে আসি।” ডুডু এমনিতেই বিহ্বল হয়ে গিয়েছিল, এবার আনন্দে চোখে জল চলে এল প্রায়। এরা কি ওকে না-কঁদিয়ে ছাড়বে না? ডুডু ড্রেস করতে শুরু করল।
“স্যার, একটা মেয়ে আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাইছে।” একটা ক্লাস এইটের ছেলে এসে পুরুকে বলল। মেয়ে? পুরুর সঙ্গে? সবাই তাকাল একসঙ্গে। পুরু ডুডুকে ডেকে নিয়ে টেন্টের বাইরে এল। ওদের সঙ্গে হেডস্যারও বেরিয়ে এসেছেন। ডুডু দেখল স্কুলের সেক্রেটারি প্রাণবল্লভ মিত্রও দাঁড়িয়ে আছেন ওখানে, এদিকে মাঠও ভরতি। বাঁশের ব্যারিকেডের মধ্যে থেকে পুলিশ ভিড় সামলাচ্ছে। এরই মধ্যে, লাল লং স্কার্ট আর পোলো নেক গেঞ্জি পরে যে মেয়েটা দাঁড়িয়ে ছিল, তাকে দেখে চোখ কপালে উঠে গেল ডুডুর। এ যে শিমুল! কী ব্যাপার? ডুডু জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার রে শিমুল?”
পুরু অবাক হয়ে ডুডুকে দেখল একবার, তারপর শিমুলকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি আমার সঙ্গে দেখা করতে চাও? কেন?”
শিমুলকে কেমন যেন বিভ্রান্ত দেখাচ্ছিল। চুলগুলো এলোমেলো, ঠোঁটে খড়ি উঠছে, ও দাঁড়িয়ে ঠোঁট চাটছিল আর বারবার নাক থেকে পিছলে পড়া চশমাটা ঠিক করছিল। ডুডু বুঝল শিমুল কোনও একটা ব্যাপারে খুব টেনশনে আছে। পুরুর প্রশ্নে শিমুলের চোখমুখ আরও শক্ত হয়ে উঠল। কোনওক্রমে ও বলল, “স্যার, একটা খবর দেবার ছিল। আমি রবিন মেমোরিয়ালে পড়ি। আমি খবর পেয়েছি দিয়েগো নামের ছেলেটা ইচ্ছে করে ম্যাচ ছেড়ে দেবে আজ। স্যার, আমি ফুটবল বুঝি না, কিন্তু মনে হল এটা আপনাকে জানানো দরকার।” পুরুর চোয়াল ঝুলে গেল। চোখ দুটো ঘোলাটে হয়ে উঠল নিমেষে। ও বলল, “আমি বিশ্বাস করি না। দিয়েগো মোটেই ওরকম করবে না।”
শিমুল এবার কাছে এগিয়ে গেল পুরুর। ডুডু দেখল কেমন একটা ডেসপারেট ভাব ওর। ও বলল, “স্যার, বিশ্বাস করুন। দিয়েগোর ইনটেনশন খুব খারাপ। আমি এমন জায়গা থেকে খবরটা পেয়েছি যে, তাতে ভুল নেই।”
“কে খবর দিয়েছে তোমাকে?” পুরুর গলায় রাগ।
শিমুল আবার বলল, “স্যার, বিলিভ মি। আয়াম সিরিয়াস, দিয়েগো ইজ বাগড্।”
পুরু কঠিন গলায় বলল, “না, দিয়েগো খেলবে। তোমার যা বলার তুমি বলেছ, নাউ লিভ।”
“না ও যাবে না।” বাঘের মতো গলা শুনে চমকে তাকাল ডুডু। এতক্ষণে মুখ খুলেছেন প্রাণবল্লভ মিত্র। উনি আবার বললেন, “দিয়েগো খেলবে না।”
পুরু এবার ওঁর দিকে মুখ ফেরাল, “মানে? একটা কোথাকার কে মেয়ে তার কথায় দিয়েগো খেলবে না?”
“না খেলবে না। ওর জায়গায় অন্য কেউ খেলবে।”
“কিন্তু আমার টিম হয়ে গেছে। ডুডু আর দিয়েগো ছাড়া স্ট্রাইকার বলতে মনোময় আছে আমার হাতে। দিয়েগো টিমে খেলবেই।” পুরু শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল।
“মানে? আমার কথার অবাধ্য হচ্ছ? এই চাকরি করছ কার দয়ায় তুমি? পুরু, মনোময়কে ড্রেস করাও। অ্যান্ড দ্যাট ইজ ফাইনাল।” প্রাণবল্লভ মিত্র আর কথা না-বলে টেন্টের মধ্যে চলে গেলেন।
ডুডু দেখল পুরুর মুখ লাল হয়ে আছে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। এ আবার কী অশান্তি শুরু হল? কার মুখ দেখে ঘুম থেকে উঠেছিল ডুডু? পুরু হেডস্যারের দিকে তাকাল একবার। হেডস্যার এগিয়ে এসে পুরুর পিঠে হাত রাখলেন, বললেন, “মন খারাপ কোরো না। ফার্স্ট হাফটায় দিয়েগোকে নামিয়ো না। সেকেন্ড হাফটায় দেখা যাবে।” পুরু মাথা নিচু করে টেন্টে চলে গেল। ডুডু ভেবে পাচ্ছিল না, ও কী করবে? শিমুল তখনও দাঁড়িয়ে রয়েছে। ডুডু ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াল, “শিমুল, এসবের মানে কী? তুই খেলা শুরুর মুহূর্তে কী শুরু করলি বল তো? আগে এসে বলতে পারিসনি?”
শিমুল বলল, “আমাকেই টাপুর ব্যাপারটা বলল মিনিট দশেক আগে। ডুডুদা, আমি আর থাকতে পারিনি। আমন যেখানে খেলছে… সেখানে… ও হারলে…” শিমুল আর বলতে পারল না। ডুডু অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল ওর দিকে। আমনকে পছন্দ করে শিমুল? আমন যাতে না হেরে যায় তাই শিমুল এসেছে? আর দিয়েগো সত্যি এমন করেছে? এও সম্ভব?
ডুডু দেখল শিমুল ধীরে ধীরে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল। ও কী করবে বুঝতে পারল না। এমন দিনেই ও ক্যাপ্টেন? ডুডু দু’হাত দিয়ে মাথার চুল মুঠো করে দাঁড়িয়ে রইল। ও দেখল ওদের টিম বেরিয়ে আসছে টেন্ট থেকে। সাদা কালো জার্সি পরা দশজন খেলোয়াড়। সবার সামনে কবীর। আজ কবীরটা কেমন যেন চুপচাপ, হয়তো কনসেন্ট্রেট করছে। এগারো নম্বর হিসাবে দলে যোগ দিল ডুডু। মাঠে নামার আগে সাইড লাইনের মাটি ছুঁয়ে ডুডু একবার প্রণাম করল। তারপর পেছনে ফিরে তাকাল। দেখল রিজার্ভের জায়গায় বুট খুলে বসে আছে। দিয়েগো। মাথা নিচু। ডুডুর চোখে চোখ পড়াতে দিয়েগোর পাশ থেকে পুরু উঠে এল ওর কাছে। কাঁধে হাত রেখে বলল, “ডুডু, প্লে ইয়োর ন্যাচারাল গেম। টেনশন নিয়ো না।” তারপর সেন্টার সার্কেলের কাছে। দাঁড়ানো জ্যাকসনের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল, “শট মারার সময় কী করতে হবে মনে আছে তো?” জ্যাকসন দূর থেকে বুড়ো আঙুল তুলল। পুরু রিজার্ভ বেঞ্চে ফিরে যাওয়ার আগে বলল, “ডুডু, ওয়ান টাচে খেলবে। সময় নেবে। ওদের বল ধরতে দেবে না বেশি। কেমন? বেস্ট অব লাক।”
ডুডু সেন্টার সার্কেলের কাছে এসে দাঁড়াল। কবীর গোলে দাঁড়িয়ে, আমন হাফে। আর মাঝ মাঠে দাঁড়িয়ে জ্যাকসন হাসছে। ৪-৪-২ পদ্ধতিতে খেলছে নঙ্গী হাই আর রবীন মেমোরিয়াল ৪-৩-৩ পদ্ধতিতে। ডুডু দেখল কথা নেই বার্তা নেই জ্যাকসন হঠাৎ ভুলভাল প্লেয়ার সাজাতে শুরু করেছে। কাউকে বলছে “পয়েন্টে দাঁড়া,” “তুই এক্সট্রা কভারটা গার্ড কর,” “আমন মিড উইকেটে যা।” ডুডুর মাথা গরম হয়ে গেল। “কী করছিস তুই?” চিৎকার করল ও। জ্যাকসন কান অবধি হেসে বলল, “একটু ফিল্ডিং সাজিয়ে নিচ্ছিলাম। আমি ভাইস ক্যাপ্টেন না।”
ডুডু আর পারল না, আবার চিৎকার করে বলল, “এবার কানের গোড়ায় দেব। সবসময় ইয়ারকি, না?”
রেফারি টস করতে ডাকল ওদের। নিকেলের মুদ্রা টং করে উঠে গেল হাওয়ায়। টসে রুদ্র জিতে সাইড নিল। ডুডুর সঙ্গে বাধ্যতামূলকভাবে হাত মিলিয়ে চাপা গলায় বলল, “তিমিরের হাতে খুব জোর, কী বল। চড়টা আলপনার মতো ফুটে আছে তোর মুখে।” ও, তা হলে এই জানোয়ারটাই! দাঁত চেপে ডুডু হাত ছাড়িয়ে নিল। রুদ্র হাসল, বলল, “ও ক্যাপ্টেন, মাই ক্যাপ্টেন, কাম অন।”
ঠিক চারটের সময় রেফারির বাঁশির সঙ্গে শুরু হয়ে গেল খেলা। টমাস চ্যালেঞ্জ কাপের আক্ষরিক অর্থে ফাইনাল। মাঠের পূর্ব প্রান্তে রবিন মেমোরিয়াল আর পশ্চিম প্রান্ত আগলাচ্ছে নঙ্গী হাই। ডুডু স্ট্রাইকার হলেও খেলা শুরুর প্রথম খানিকক্ষণ বল ধরে নীচে নেমে নিজেদের অর্ধে খেলতে লাগল। দেখল রবিন মেমোরিয়ালও বিশেষ এগোচ্ছে না। অবশ্য সেটাই স্বাভাবিক। ওরা আজ ড্র করলেই কাপটা জিতে যাবে।
মিনিট দশেক ঢিমে তালে খেলা চলল। আর বারো মিনিটের মাথায় ঘটল ঘটনা। মাঝ মাঠ থেকে আমন চিপ করে বলটা রাখল ডান দিকে। ডুডু ওদের রাইট উইঙ্গারের সঙ্গে ওয়ান-টু খেলে বলটা নিয়ে পৌঁছে গেল বক্সের মাথায়। রবিন মেমোরিয়ালের ডিফেন্ডার ওকে ট্যাকেল করার আগেই আলতো করে বলটা ভাসিয়ে দিল দুটো ডিফেন্ডারের মাথার ওপর দিয়ে জ্যাকসনের দিকে। বলটা রিসিভ করে পুশ করলে চারটে গোলকিপারও গোল বাঁচাতে পারবে না। কিন্তু বুকে রিসিভ করার বদলে জ্যাকসন হঠাৎ শরীরটাকে ছুড়ে মাটির সঙ্গে সমান্তরাল করে দিয়ে চাইনিজ ভলি মারতে গেল। বলটা উড়ে এসে লাগল ওর হাঁটুতে, তারপর গড়াতে গড়াতে চলে গেল কর্নার ফ্ল্যাগের কাছে গোল লাইন অতিক্রম করে। গোল কিক।
“কী করছিস তুই?” ডুডু চিৎকার করে উঠল। জ্যাকসন মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, “ভাবলাম জিকোর মতো মারব। গতকালই ই এস পি এন-এ পুরনো খেলা দেখছিলাম একটা। জিকো এভাবে গোল দিয়েছিল।” রুদ্র পাশ দিয়ে যেতে যেতে বলল, “শালা, তোদের সার্কাসের জোকার এবার খেল দেখাচ্ছে।”
এরপর রবিন মেমোরিয়াল চেপে ধরল কিছুটা। ডুডুদের দম বেরিয়ে যাচ্ছিল। তবে রবিন মেমোরিয়ালের স্ট্রাইকারদের অপদার্থতায় ওদের কোনও শটই গোলে থাকল না। এরই মধ্যে আঠাশ মিনিটে আমন একজনকে কাটিয়ে বল বাড়াল বাঁ প্রান্তে। ডুডুদের লেফট ব্যাক ওভার ল্যাপে গিয়ে বলটা ধরে সেন্টার রাখল বক্সের মাথায়। ডুডু বুক দিয়ে বলটা নামিয়ে মারতে যাবে হঠাৎ কোত্থেকে জ্যাকসন উদয় হল, “লিভ ইট” বলে দুম করে শট মেরে দিল বলটায়। বলটা বেলুনের মতো উড়ে গেল বারের ওপর দিয়ে। জ্যাকসন এবার নিজেই বলল, “বলটা ভীষণ খারাপ বুঝলি, আমি যে ড্রপ শট মারলাম, বলটা বুঝতেই পারল না!”
আবার চেপে ধরল রবিন মেমোরিয়াল। দু’বার প্রায় গোলও হয়ে যাচ্ছিল। প্রথমবার বলটা সোজাই ছিল, কিন্তু কবীরই বুকে লাগিয়ে প্রায় গোল খেয়ে যাচ্ছিল। ভাগ্যিস আমন গোললাইন সেভ করল। দ্বিতীয়টাও সেরকমই। সহজ একটা বল গ্রিপ করতে গিয়ে কবীর ফসকাল। বলটা চলে গেল ফাঁকায় দাঁড়ানো রুদ্রর কাছে। কিন্তু এবার তড়িঘড়ি করতে গিয়ে রুদ্র মিস করল। নঙ্গী হাই-এর সমর্থকদের হাঁফ ছাড়ার শব্দে ডুডুর মনে হল কোথাও স্টিম ইঞ্জিন ছাড়ল বোধহয়। বিপদ, ডুডু বুঝল ঘোর বিপদ। ওরা আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে খেলা থেকে। কিছুতেই ম্যাচটা ধরতে পারছে না। ইস্ দিয়েগোটা যদি থাকত!
আর ঠিক বিয়াল্লিশ মিনিটের মাথায় ঘটল অঘটনটা। মাঝ মাঠে রুদ্র ফাউল করল আমনকে। ফ্রি কিক থেকে ডুডুর মিস পাসে আবার বলটা ধরল রুদ্রই। বল পেয়েই দৌড়োতে শুরু করল ও। সামনে অনেকটা ফাঁকা জায়গা। রুদ্র একজনকে কাটিয়ে ঢুকে গেল নঙ্গী হাই-এর পেনাল্টি বক্সে, পেছন পেছন তাড়া করছিল আমন। আর উপায় না দেখে আমন শুয়ে রুদ্রর গোড়ালিতে টোকা মারল। মুখ থুবড়ে পড়ে গেল রুদ্র। পিঁ করে বাঁশি বাজাল রেফারি। পেনাল্টি। সঙ্গে বোনাস হিসাবে হলুদ কার্ড দেখল আমন। ডুডু কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। ব্যস, এবার গোলটা খাবে। আর আশা নেই। ও দেখল সাইড লাইনের ধারে একটা জলের বোতল রাগ করে ছুড়ে ফেলে দিল পুরু, আর দিয়েগো শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে।
পেনাল্টি স্পটে বল বসিয়ে রুদ্র হঠাৎ এগিয়ে গেল কবীরের দিকে। কিছু একটা বললও। ডুডু শুনতে পেল না ঠিক। কিন্তু লক্ষ করল কবীর মাথা নিচু করে ফিরে গেল গোলের কাছে। রুদ্র পিছিয়ে এসে আমনের সামনে দাঁড়াল এবার, মৃদু হেসে বলল, “শিমুলকেও কি তুই এভাবেই পেছন থেকে… অবশ্য আমিও ওকে খেয়ে দেখেছি। সামনে থেকেও দারুণ।” ডুডু কথাগুলো শুনেও কিছু বোঝার আগেই দেখল আমন ঝাঁপিয়ে পড়েছে রুদ্রর ওপর। এলোপাথাড়ি হাত-পা চালিয়ে চিৎকার করে যাচ্ছে, “শুয়োরের বাচ্চা মেরে ফেলব তোকে, শালা, হারামি।” সবাই মিলে কোনওক্রমে ছাড়িয়ে দিল দু’জনকে। রুদ্রর গাল ছড়ে গেছে, থুতনি নীল হয়ে গেছে কিছুটা। আমনকে ধরে রাখা যাচ্ছে না। ও তখনও চিৎকার করে যাচ্ছে। ডুডু বুঝল যা সর্বনাশ হওয়ার হয়ে গেছে। রেফারি উইদাউট বল ফাউল করার জন্য আমনকে রেড কার্ড দেখিয়ে দিল। আমন যখন মাঠ থেকে বেরোচ্ছে রবিন মেমোরিয়ালের সমর্থকদের চিৎকার বোধহয় কলকাতা থেকেও স্পষ্ট শোনা গেল। স্বাভাবিক, ম্যাচ তো রবিন মেমোরিয়ালের পকেটে।
ডুডু চোখ বন্ধ করল একবার। রিজার্ভ বেঞ্চের দিকে তাকাবার সাহস আর নেই ওর। ডুডু ভাবল অলক্ষ্য থেকে সত্যিই কি কেউ লক্ষ করছেন ওকে? দেখতে পাচ্ছেন ওর যন্ত্রণা? আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকাল একবার। লাল, আগুন রঙের একটা বিশাল পাখি অনেক উপরে ভেসে আছে।
পেনাল্টি স্পটে বলটা বসিয়ে ডুডুর দিকে তাকিয়ে হাসল রুদ্র। তারপর অপেক্ষা করতে লাগল রেফারির বাঁশির। সারা মাঠ নিস্তব্ধ। অনেক দূরের পাখির কিচির মিচির পর্যন্ত স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। নিজের নিশ্বাসটাও শুনতে পেল ডুডু। আর তারপরেই শুনল স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল ভেদ করা বাঁশির আওয়াজ। রুদ্র কোনা করে দৌড়ে গেল বলটার দিকে, তারপর বাঁ পায়ের শটে সেকেন্ড পোস্টের কোনায় বলটা রাখল। নিশ্চিত গোল। রবিন মেমোরিয়ালের সমর্থকরা আনন্দে চিৎকার করে উঠল। কিন্তু চিৎকারটা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই কী জানি একটা ঘটল। ডুডু দেখল একটা সরলরেখার মতো কবীর ছিটকে গেল বলটার দিকে। ওর বাড়ানো হাতে লেগে বলটা দিক পরিবর্তন করে পোস্টে লাগল, তারপর গড়িয়ে গড়িয়ে পার হয়ে গেল গোললাইন। সারা মাঠ হঠাৎ চুপ। ডুডুর মনে হল ওর হৃৎপিণ্ডটা বুঝি মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসবে। রেফারি পিঁ করে বাঁশি বাজিয়ে দিল। কর্নার। কবীর ছিটকে বেরোল গোল থেকে। হতভম্ব রুদ্রর দিকে তাকিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “শুয়োরের বাচ্চা, ভেবেছিস আমি বুঝব না টাপুর কেন এসেছিল? মেয়েদের দিয়ে নোংরামো শুরু করেছিস? দালাল শালা, দম থাকলে একটা গোল দিয়ে দেখা।” রুদ্র মাথা নিচু করে কর্নার ফ্ল্যাগের দিকে এগিয়ে গেল। বল স্পটে বসিয়ে কর্নার নিতে নিতে রেফারির বাঁশি জানিয়ে দিল—হাফ টাইম।
ওরা মাঠ থেকে বেরোতেই পুরু এগিয়ে এল ওদের দিকে। ডুডু দেখল কবীর তখনও রাগে ফুঁসছে। পুরু চিন্তিত মুখে এসে ডুডুকে বলল, “এবার কী বিপদ হল বুঝলে? আমরা দশজনে নেমে এলাম। ওরা ওয়ান ম্যান অ্যাডভান্টেজ পেয়ে গেল। যাক তোমরা টেন্টের ভেতরে এসো। ইস, দিয়েগোটাকে যদি খেলাতে পারতাম!” পুরু শেষ কথাগুলো বলার পর ঠোঁট কামড়ে ধরল নিজের।
কিন্তু টেন্টে না-ঢুকে পাশ থেকে কবীর জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা স্যার, দিয়েগোকে নামাচ্ছেন না কেন? ফার্স্ট হাফে নামাননি, ভাবলাম স্ট্র্যাটেজি, কিন্তু এবার নামাচ্ছেন না কেন?”
পুরু চট করে একবার ডুডুকে দেখে নিল। তারপর খুব সংক্ষেপে গোটা ঘটনাটা বলল কবীরকে।
“মানে দিয়েগো চিট করবে টিমকে? স্যার, ওরা, মানে রবিন মেমোরিয়ালের ছেলেরা, যে ছেলেটাকে ম্যাচ ছাড়ার প্রস্তাব দিয়েছিল সে দিয়েগো নয়, সে আমি। আমায় ম্যাচ ছাড়তে বলেছিল ওরা। দিয়েগোর নাম এর মধ্যে টেনে আনা হয়েছে চক্রান্ত করে। স্যার আপনি ব্যাপারটা বুঝুন। এটা ওদের প্ল্যান।” ডুডু উত্তেজিত হয়ে বলল, “স্যার, আমাকেও তো ম্যাচে আসতে আটকেছিল ওরা। প্রথমে আমি, তারপর কবীর আর সব শেষে দিয়েগো, ওর প্ল্যানটা এবার স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। রুদ্র আমাদের নোংরাভাবে আটকাতে চাইছে। ও প্রচণ্ড ধড়িবাজ ছেলে। জেতার জন্য ও যা খুশি তাই করতে পারে। স্যার, আপনি দিয়েগোকে নামানোর বন্দোবস্ত করুন, আমরা আছি আপনার সঙ্গে।”
পুরু মাথা নিচু করে ভাবল কয়েক মুহূর্ত। তারপর বলল, “চলো তো।” ডুডু, কবীর আর পুরু একসঙ্গে ঢুকল টেন্টের মধ্যে। এই জায়গায় স্কুলের স্যাররা আর প্লেয়াররা ছাড়া অন্যদের ঢোকা বারণ। ডুডু দেখল টেন্টে সব প্লেয়াররা মাথা নিচু করে বসে আছে আর প্রাণবল্লভ মিত্র একা চেঁচিয়ে যাচ্ছেন গাঁক গাঁক করে। ওদের দেখে জ্যাকসন উঠে এল ওদের পাশে। চাপা গলায় বলল, “মাইরি, এই মালটাকে কে সেক্রেটারি করেছে বল তো? যা চেঁচাচ্ছে না, মনে হচ্ছে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লেগে গেছে।” ডুডু শুনল প্রাণবল্লভ মিত্র তখন আমনকে ঝাড়ছেন রেড কার্ড দেখার জন্য। ডুডু দেখল দেরি হয়ে যাচ্ছে। ও পুরুকে খোঁচাল, “স্যার, প্লিজ একটু দেখুন। আর বিশেষ সময় নেই।”
দিয়েগো এসবের মধ্যে এক কোনায় চুপ করে বসে ছিল। পুরু চিৎকার করতে থাকা প্রাণবল্লভ মিত্রের ওপর গলা তুলে বলল, “দিয়েগো, গেট রেডি, নামতে হবে তোমায়। বুট পরো, বুট পরো।” থতমত খেয়ে মাঝপথে চিৎকার থামিয়ে দিলেন প্রাণবল্লভ মিত্র মহাশয়। ডুডু দেখল ওঁর চোখদুটো গোল হয়ে উঠেছে। ধাতস্থ হয়ে উনি এবার পুরুকে বললেন, “মানে? কী বলছ তুমি? না, দিয়েগো খেলবে না। জানো না তুমি কেন? ও খেললে আমরা জিতব না।”
পুরু গম্ভীর কিন্তু শান্ত গলায় বলল, “স্যার, ও না-খেললেও কি আমাদের সুযোগ আছে? দেখুন, আমি আমার প্লেয়ারদের জানি, আমি ফুটবলটাও জানি। প্লিজ আমায় আমার কাজ করতে দিন। সমস্ত টিম চাইছে দিয়েগো নামুক। আর দিয়েগোকে সত্যিই প্রয়োজন।”
ডুডু বলল, “হ্যাঁ স্যার। দিয়েগোকে চাই।”
প্রাণবল্লভ মিত্রের মুখ লাল হয়ে উঠেছে। উনি ভাবতেই পারছেন না যে কেউ ওঁর বিরুদ্ধে কথা বলতে পারে। উনি আবার চিৎকার করলেন, “কী বললে? আমার মুখের ওপর কথা? আমি…”
“প্রাণবল্লভবাবু,” এতক্ষণ চুপ করে থাকা হেডস্যার এবার কথা বললেন, “আপনি প্লিজ ওদের নিজেদের মতো খেলতে দিন। আমার ছেলেরা ঠিক জিতবে।”
প্রাণবল্লভ অনেক কষ্টে রাগটা গিললেন। পুরুর দিকে ভস্ম করে দেবার মতো দৃষ্টি দিয়ে বললেন, “ঠিক আছে। কিন্তু মনে রেখো যদি হেরে যাও…”
পুরু কথাটা শেষ করে দিল নিজেই, “ঘাড় ধরে বের করে দেবেন।” ডুডু দেখল প্রাণবল্লভ মিত্র গটগট করে টেন্ট ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।
পুরু আর সময় নষ্ট করল না। জোরে বলে উঠল, “সবাই একসঙ্গে বসো। আর একটু সময় বাকি আছে মাত্র। শোনো ডুডু, আমি ডিফেন্স থেকে একজনকে তুলে নিচ্ছি। তুমি রাইট হাফে নেমে এসে আমনের জায়গাটা নাও আর মনোময় সরে আসবে তোমার জায়গায় মানে রাইট স্ট্রাইকারে। আর দিয়েগো তুমি নামবে লেফট স্ট্রাইকারে। মনোময় শোনো, শট মারার সময় আমার কথা মনে রাখছ না কেন? তোমরা জেনো, ওরা কিন্তু দিয়েগোকে টার্গেট করবে। ফাঁকায় জায়গা নিয়ে তোমাকে এর সুযোগ নিতে হবে মনোময়। শোনো, সমস্ত প্র্যাকটিস, সমস্ত কষ্ট, যারা তোমরা এতদিন করেছ, আজ শেষ পঁয়তাল্লিশ মিনিট তার পরীক্ষা। কবীর, আমি জানি তুমি কোনও গোল খাবে না আজকে। স্পার্টাকাসকে মনে রেখো তোমরা। তিনশো সৈন্য নিয়ে হাজার হাজার শত্রু সৈন্যকে আটকে দিয়েছিলেন ওঁরা। আর তোমরা দশ জন নিয়ে এগারো জনকে হারাতে পারবে না? পারবে। লেটস ডু ইট টুগেদার। কাম অন।”
সারামাঠ দেখল নঙ্গী হাই-এর দল যখন মাঠে নামছে তাদের সবার শেষ প্লেয়ারটাকে। বেঁটে, ঝাঁকড়া চুল, মাটির দিকে চোখ। চাপা গুঞ্জন উঠল ভিড়ের মধ্যে “দিয়েগো, দিয়েগো।”
সেন্টারে বল বসিয়ে নিজের জায়গায় ফিরে গেল দিয়েগো। কিক অফ করার জন্য রুদ্র এগিয়ে এল। দিয়েগোর দিকে তাকিয়ে জোরে বলল, “কী রে এবারও গতবারের মতো করবি নাকি?” ডুডু দেখল দিয়েগো পাত্তাই দিল না ওকে। রেফারি বাঁশি বাজিয়ে বুঝিয়ে দিল খেলা শুরু।
রবিন মেমোরিয়াল প্রথম মিনিট আটেক বল নিজেদের মধ্যে দেওয়া-নেওয়া করে কাটাল। ডুডুরা অনেকবার বল তাড়া করল কিন্তু রবিন মেমোরিয়াল পুরো ডিফেন্সে ঢুকে গেছে। ম্যাচ ড্র করাই যেন ওদের লক্ষ্য। কিন্তু দশ মিনিটের মাথায় হঠাৎ আক্রমণে উঠল রবিন মেমোরিয়াল। তিন-চারটে লম্বা পাস খেলে ওরা পৌঁছে গেল নঙ্গী হাই-এর বক্সে। গোল হয় হয় অবস্থা কিন্তু নঙ্গীর লেফট ব্যাক সুমন বলটা কোনওমতে ক্লিয়ার করে দিল। মাঝ-মাঠে দাঁড়ানো দিয়েগোর কাছে বলটা উঁচু হয়ে এল। দিয়েগোর পেছনে রবিনের দুটো প্লেয়ার। দিয়েগো বলটা রিসিভ না-করে, চকিতে শরীর ঘুরিয়ে শূন্যে লাফিয়ে উঠে বলটা পাস বাড়াল ফাঁকায় দাঁড়ানো জ্যাকসনকে। ডুডু অবাক হয়ে দেখল বলটা নিয়ে জ্যাকসন কিছুটা এগিয়ে পেনাল্টি বক্সের বাইরে থেকেই দুম করে শট মেরে দিল। বলটা গোলের প্রচুর বাইরে দিয়ে গিয়ে লাগল দর্শকদের মধ্যে দাঁড়ানো রবিন মেমোরিয়ালের একটা মেয়ের গায়ে। জ্যাকসন আনন্দে চিৎকার করে উঠল, “হোয়াট আ শট। পুরো বুলস আই।” রুদ্র পেছন থেকে বলল, “জোকার, শালা। হ্যাংলার বাচ্চা।”
খেলা চলতে লাগল। পনেরো মিনিট, কুড়ি মিনিট। কিছুই হচ্ছে না। দিয়েগোকে বলই ধরতে দিচ্ছে না ওরা। যত বার ও বল ধরছে কেউ-না-কেউ এসে মারছে ওকে। এরই মধ্যে রবিনের দুটো প্লেয়ার হলুদ কার্ডও দেখেছে। একটা থ্রো ইনের সময় দিয়েগো ডুডুর কাছে এল। বলল, “এভাবে হবে না, বলটা একটু হোল্ড করার সময় দে আমায়। জাস্ট আমায় কভার কর।”
পঁচিশ মিনিটের মাথায় রবিন মেমোরিয়ালের ভুল পাস থেকে একটা বল পেল দিয়েগো। ডুডু দেখল রবিনের দুটো প্লেয়ার ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য ছুটে আসছে। ডুডু দিয়েগোকে কভার করার জন্য হঠাৎ সামনে চলে এল ওদের। দিয়েগো এই সুযোগটা নিয়ে পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল। ডুডু ওদের ধাক্কায় মাটিতে পড়ে গেল কিন্তু ওর বিশেষ লাগেনি। মাটি থেকে উঠে ও দেখল গোলের দিকে এগিয়ে চলেছে। দিয়েগো বলটা লাট্টুর মতো বাঁ পায়ে ঘুরছে। ঝাঁকড়া চুলগুলো নড়ছে মাথায়। চার, পাঁচ, ছয়। একের পর এক কাটিয়ে চলেছে ও। সারামাঠ আবার পুরনো দিনের মতো চিৎকার করছে, “দিয়েগো, দিয়েগো।” সাদা-কালো জার্সি পরা বেঁটে ছেলেটার সেদিকে খেয়াল নেই, ও দৌড়ে চলেছে। ততক্ষণে রবিন মেমোরিয়ালের গোলকিপার গোলের মুখ ছোট করার জন্য এগিয়ে এসেছে। সেটা দেখে ছুটন্ত বলের তলায় আলতো করে বাঁ পায়ে মারল দিয়েগো। মেরে আর সেদিকে তাকাল না। কিন্তু ডুডু দেখল, সারামাঠ দেখল, সাদা-কালো বলটা গোলকিপারের নাগাল এড়িয়ে উঁচু হয়ে রামধনুর মতো বেঁকে দ্বিতীয় পোস্টের কোণ দিয়ে গোলে ঢুকে গেল। ১-০, নঙ্গী হাই স্কুল।
সবাই পাগলের মতো দৌড়ে গেল দিয়েগোর দিকে। ডুডু দেখল কবীর হাতদুটো বুকের কাছে নিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে আছে গোল লাইনে। পুরু আনন্দে, উত্তেজনায় পায়চারি করছে রিজার্ভ বেঞ্চের সামনে। ডুডুর চোখে চোখ পড়তে হাত দিয়ে ডাকল ওকে। ও দৌড়ে গেল পুরুর কাছে, পুরু বলল, “সাবধান, এবার সাবধান। ওরা মরণ কামড় দেবে। একটা গোল করতে হবে আর। মিনিট কুড়ি সময় আছে।”
আবার শুরু হল খেলা। এবার সত্যিই রবিন মেমোরিয়াল মরণ কামড় দিতে শুরু করল। ওদের সব প্লেয়ার প্রায় উঠে এসেছে। দুটো খেলার এগ্রিগেটে ফলাফল এখন ১-১। এবার যে গোল দেবে সেই জিতবে। রবিন মেমোরিয়ালের আক্রমণ একের পর এক আছড়ে পড়তে শুরু করেছে নঙ্গী হাই-এর ডিফেন্সে। শুধু দিয়েগো ওপরে দাঁড়িয়ে। জ্যাকসনও নীচে নেমে ডিফেন্স করছে। ডুডুদের নাকের জলে চোখের জলে অবস্থা। ডুডু বুঝল দশজন মিলে এগারো জনের সঙ্গে পাল্লা টানতে গিয়ে দম ফুরিয়ে এসেছে ওদের।
পঁয়ত্রিশ মিনিট, আটত্রিশ মিনিট। এবার সর্বশক্তি দিয়ে ঝাপিয়ে পড়েছে রবিন মেমোরিয়াল। কবীর একা লড়ে যাচ্ছে। নিজের চেয়ে অনেকটা বড় হয়ে উঠেছে যেন। দিয়েগো মাঝ-মাঠে দাঁড়িয়ে সমানে চেঁচাচ্ছে “বল দে, বল দে” বলে। ডুডু দেখল পুরু সাইড লাইন থেকে দেখাচ্ছে যে আর পাঁচ মিনিট মাত্র বাকি। মোটে পাঁচ মিনিট? তবে কি একস্ট্রা টাইম খেলতে হবে? ডুডু জানে একস্ট্রা টাইম খেলতে হলে সব শেষ, কারণ কেউ দম পাবে না। এই সাতপাঁচ চিন্তার মধ্যেই একটা কর্নার পেল রবিন মেমোরিয়াল। সবাই এসে জড়ো হল নঙ্গী হাই-এর পেনাল্টি বক্সে, শুধু দিয়েগো সেন্টার সার্কেলের মাথায় দাঁড়িয়ে আর দিয়েগোর পাশে রবিন মেমোরিয়ালের একটা ডিফেন্ডার। আর রবিনের গোলকিপারও গোল ছেড়ে এগিয়ে এসেছে প্রায় ওদেরই কাছে।
নিজেদের পেনাল্টি বক্সে দাঁড়িয়ে ডুডু কবীরকে বলল, “পারলে বলটা ফিস্ট করে দিয়েগোকে দেওয়ার চেষ্টা করিস তো।” রবিনের রাইট আউট কর্নার কিক নিতে গেল। রেফারি কিক নেবার বাঁশি বাজাল। কিক নেওয়া হবে, ঠিক সেই সময় আবার গন্ধটা পেল ডুডু। কে যেন পায়েস বসিয়েছে কোথাও। নতুন গুড়ের পায়েস। এ কীসের গন্ধ? চিন্তা করতে করতে বলটা উড়ে এল। জ্যাকসনের মাথা ছাড়িয়ে ডুডুর মাথা টপকে বলটা নেমে এল পেনাল্টি বক্সের মধ্যে। প্রায় সবাই একসঙ্গে লাফাল হেড করতে। আর সেই জটলার মাথায় চড়ে বলটা প্রাণপণে ফিস্ট করে দিল কবীর। বলটা গিয়ে পড়ল সুমনের পায়ে। ও বলটা মাঝ-মাঠের দিকে জোরে ক্লিয়ার করে দিল। আর বিদ্যুৎ বেগে বলটা গিয়ে পড়ল সেন্টার সার্কেলের মাথায় দাঁড়ানো দিয়েগোর পায়ে।
বলটা গোড়ালি দিয়ে ডিফেন্ডারের মাথার ওপর দিয়ে তুলে প্রায় মাঝ-মাঠে দাঁড়ানো গোলকিপারকেও কাটিয়ে নিল দিয়েগো। গোলকিপার শেষ মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, কিন্তু ওই পেছন থেকে তাড়া করে আসা ডিফেন্ডারের ধাক্কায় দু’জনেই পড়ে গেল। বল পায়ে দিয়েগো একা। বেশ খানিকটা দূরে গোলপোস্ট দেখা যাচ্ছে। দিয়েগো বিদ্যুৎ বেগে দৌড়োল গোলের দিকে। পড়ে থাকা গোলকিপার আর ডিফেন্ডারটাও উঠে দাঁড়িয়েছে ততক্ষণে। অন্যান্য প্লেয়ারদের সঙ্গে ডুডু আর জ্যাকসনও দৌড় দিয়েছে। ডুডু আড় চোখে দেখল পুরুও সাইডলাইন ধরে দৌড়োচ্ছে। কিন্তু দিয়েগো শট মারছে না কেন। একদম ফাঁকা গোল পেয়েও মারছে না কেন শট ও? ডুডু অবাক হয়ে দেখল পেনাল্টি বক্সে ঢুকে বলটা পায়ের তলায় রেখে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল দিয়েগো। ফাঁকা গোল পেয়েও গোলে বল মারছে না। হ্যাঁচোর প্যাঁচোর করে দৌড়োচ্ছে রবিন মেমোরিয়ালের গোলকিপার। সমস্ত রবিন মেমোরিয়ালের টিম নেমে যাচ্ছে দিয়েগোর দিকে। ডুডু আর জ্যাকসনও জীবনের শ্রেষ্ঠ দৌড়টা শুরু করেছে। সারামাঠ টিৎকার করছে, “মার দিয়েগো, মার।” পুরু চিৎকার করছে, “বলটা গোলে দাও।” প্রাণবল্লভ মিত্র চিৎকার করছেন, “গোল দাও গোল দাও।” দিয়েগো দাঁড়িয়ে আছে। চোয়াল শক্ত। পায়ের তলায় বল। ডুডু পেনাল্টি বক্সের প্রায় মাথায় পৌঁছে গেছে আর জ্যাকসন ভুল করে চলে গেছে ডানদিকে। গোলকিপার আর ডিফেন্ডারটা গোল বাঁচাতে শেষ মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়ল দিয়েগোর পায়ে। দিয়েগো বল নিয়ে ছোট্ট নাচের ভঙ্গিতে কাটিয়ে নিল দু’জনকে, তারপর সারা মাঠকে বিস্মিত করে কোনায় পৌঁছে যাওয়া জ্যাকসনকে পাস বাড়িয়ে দিল। জ্যাকসনের সামনে দু’জন রবিন মেমোরিয়ালের প্লেয়ার। ডুডু দেখল বলটা নিয়ে তাদের কাটাবার কোনও চেষ্টাই করল না জ্যাকসন। দূরুহ অ্যাঙ্গেল থেকে সোজা বাঁ পায়ে শট মেরে দিল। বলটা অদ্ভুতভাবে হাওয়ায় ভাসল তারপর বাঁক খেল। সামনে দাঁড়ানো দুটো প্লেয়ারের ফাঁক দিয়ে বেঁকে, গোলকিপারের নাগাল এড়িয়ে বলটা ঝরা পাতার মতো গোল লাইন পেরিয়ে জড়িয়ে গেল জালে। ডুডু অবাক হয়ে লক্ষ করল বলটা ঠিক মারার মুহুর্তে ডান চোখটা বন্ধ করে নিয়েছিল জ্যাকসন।
রেফারির খেলা শেষের বাঁশিটা চাপা পড়ে গেল নঙ্গী হাই-এর সমর্থকদের চিৎকারে। ডুডু বসে পড়ল মাঝ-মাঠে। জিতেছে, শেষ পর্যন্ত জিতেছে ওরা। এত সংকট, মনোমালিন্য, অনিশ্চয়তা কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত ‘টমাস চ্যালেঞ্জ কাপ’ পেয়েছে ওরা। ডুডুর খুব হালকা লাগছে এখন। চারিদিকে হইহট্টগোল থেকে মনে মনে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে অনেক ওপরে ভেসে থাকা লাল একটা পাখির দিকে তাকিয়ে রইল ও। মনে মনে ধন্যবাদ দিল ও পাখিটারও আরও অনেক অনেক ওপরের, অলক্ষ্যের একজনকে। তিনি লক্ষ করেন, সত্যিই তিনি লক্ষ করেন। এরই মধ্যে জ্যাকসন দৌড়ে এল ওর কাছে, বলল, “বলটা এবার কথা শুনল দেখলি ডুডু। কারণ জানিস? এত দিন মরিয়েন্তেস, রোনালডিনহোরা শট মারছিল আর আজ মারল মনোময় মুখোপাধ্যায়। আমি জোকার, না? দেখ শালা, একেই বলে জোকার ট্রাম্প।”
মাঠের হইহট্টগোলের মধ্যে ডুডুর হাতে এম এল এ সাহেব তুলে দিলেন ‘টমাস চ্যালেঞ্জ কাপ’। পরপর তিনবার। চিরদিনের মতো। পুরুকে নিয়ে ওরা লোফালুফি করল খানিকক্ষণ। এরই মধ্যে সবার সামনে প্রাণবল্লভ মিত্র এসে জড়িয়ে ধরলেন পুরুকে। বললেন সামনের বারও যেন জেতে নঙ্গী হাই। হইচইয়ের মাঝে এবার ডুডুর কাছে এল রুদ্র। সেই তেজ আর নেই যেন। ও বলল, “সরি ফর এভরিথিং। আমি অনেকভাবে তোদের আটকাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পারলাম না। ইটস নাথিং পারসোনাল। তবে যদি আরেকবার সুযোগ পেতাম, আবার তোদের হারাবার চেষ্টা করতাম। এনিওয়ে কনগ্র্যাটস।” পাশের থেকে জ্যাকসন কিছু বলতে যাচ্ছিল। ডুডু বাধা দিল। ও নিজে বলল, “তোর হয়তো পারসোনাল ছিল না, বাট ইট ওয়াজ পারসোনাল টু আস। আমাদের সবার মুখ থুবড়ে পড়া জীবনটাকে দাঁড় করাবার জন্য জেতার দরকার ছিল এই ম্যাচটা। আর আবার খেলা হলেও তোরা পারতিস না। রুদ্র, সামথিঙস আর অনলি পসিব্ল্ ইন ড্রিমস। এটাও তাই।” রুদ্র হাসল। এ অবজ্ঞার হাসি নয়। তারপর ডুডুর কাঁধে চাপড় মেরে চলে গেল। রুদ্র চলে যেতেই জ্যাকসন বলল, “ওই দ্যাখ।” ডুডু দেখল ভারী মিষ্টি দেখতে একটা মেয়ে, ওদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। মেয়েটা ডুডুদের পাশে দাঁড়ানো দিয়েগোকে বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ। আমার কথা রেখেছ তুমি। এবার বলো কী বলতে চাও আমায়।” পেছন থেকে জ্যাকসন টিপ্পনি কাটল। “দিয়েগো আর কী বলবে? সেই বর্গির আমল থেকে তো শুধু শুনেই গেল।”
দিয়েগো হাসল। এই হাসি, এই চোখ ডুডু এখন চেনে। ও শুনল মেয়েটাকে দিয়েগো বলল, “বলব রুপাই বলব, ইন গুড টাইম। যখন সময় হবে, তখন তোমাকেই সব বলব।”
রুপাই বলল, “আমি অপেক্ষা করব দিয়েগো। তোমাদের সেলিব্রেশন হয়ে যাক। আমি তোমার জন্য মাঠের গেটে অপেক্ষা করব। আজ তোমার সঙ্গে ফিরব আমি।” এই বলে মেয়েটা হাজার ওয়াটের হাসি দিয়ে চলে গেল ভিড়ে। কিন্তু কবীর, কবীর কই? একটু দূরে শিমুলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আমনকে জিজ্ঞেসা করল ওরা। আমন বলল, “কবীরদা এমন ‘গিভ আপ’ না! এর মধ্যে টেন্টে একা বসে আছে।” এরা তাড়াতাড়ি টেন্টে ঢুকে গেল। ডুডু দেখল একা মাটিতে বসে আছে কবীর। মাথা নিচু, চোখের কোণ দিয়ে জল পড়ছে ওর। এ-জলের মানে এখন বুঝতে পারল ডুডু। টাপুর। ভেঙে-যাওয়া প্রেম সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয় মানুষকে। কিন্তু কী করবে বুঝতে পারল না ডুডু। ও দেখল দিয়েগো এগিয়ে গিয়ে বসল কবীরের সামনে। শান্ত গলায় বলল, “কবীর, চল বাইরে চল। এই মুহূর্ত সারাজীবনে একবারই আসে। আর কাঁদবি না। কত কিছু ছেড়ে যেতে হয় জীবনে। সেজন্য তো মন খারাপ হবেই, তা বলে সেটা বয়ে বেড়াস না। আজ তুই যা খেললি আমার সারা জীবন মনে থাকবে। আর কাঁদিস না। জানিস না বয়েজ ডোন্ট ক্রাই।” কবীর জামার হাতায় চোখ মুছে দিয়েগোর হাত ধরল। তারপর একসঙ্গে উঠে দাঁড়াল ওরা।
টেন্টের বাইরে সায়েকা অপেক্ষা করছিল ওর দাদার সঙ্গে। ওকে দেখে ডুডুর মনটা আরও ভাল হয়ে গেল। এবার দাদার সঙ্গে ফরমালি পরিচয় হল ওর। দু’-একটা টুকটাক কথার মধ্যে জ্যাকসন হঠাৎ দাদার হাত ধরে বলল, “আচ্ছা তুমি তো এন ডি এ-তে আছ? সেটা কি ওই পলিটিক্সের এন ডি এ? এত ইয়ং এজে হঠাৎ পলিটিক্সে জয়েন করলে?” দাদা থতমত খেয়ে গেল। নার্ভাস হয়ে বলল, “আ-আমি আসি আজ। তোমাদের সঙ্গে আবার দেখা হবে। সায়েকা, তুই বাড়ি চলে আসিস ঠিক সময়ে, কেমন?”
সায়েকা বলল, “দাদা, মাকে বলিস না কিন্তু, ম্যানেজ করে নিস প্লিজ।”
দাদা চলে যেতেই জ্যাকসন বলল, “আমিও যাই, পরী ওয়েট করছে। তোরা একা একা কথা বল।”
“পরী? মানে?” ডুডু অবাক হয়ে প্রশ্ন করল।
সায়েকা বলল, “হ্যাঁ, এতে আশ্চর্য হওয়ার কী আছে? পরী তো ওর প্রেমিকা।”
“কী?” ডুডু গোল গোল চোখে তাকিয়ে থাকল জ্যাকসনের দিকে। জ্যাকসন বোকা আর চালাকের রেজালটেন্টে হাসি দিল একটা। তারপর চলে গেল। সায়েকা বলল, “সত্যিই আমি ভেবেছিলাম তোমার সঙ্গে পরীর অ্যাফেয়ার আছে। এত রাগ হয়েছিল না। ভাগ্যিস জ্যাকসন এসে আমায় বলল যে পরী ওর গার্লফ্রেন্ড। আর তুমি ভদু একটা। কথাটা বলতে পারোনি আমায়? যাক, আজ জিতেছ, আজ আর বকব না। আজ খুব আনন্দ হচ্ছে আমার। আয়াম সো গ্ল্যাড। আই ফিল লাইক কিসিং।” ডুডু চমকে গেল, কিস? ঠাকুরদার মুখটা মনে পড়ে যাচ্ছিল প্রায়, কিন্তু আজ ও সেই মুখটার ওপর চাদর চাপা দিয়ে দিল একটা। মনে মনে বলল, ‘প্লিজ ঠাকুরদা, আজ একটু অন্য দিকে তাকিয়ে থাকো। আর জ্যাকসন? ডুডু মনে মনে বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ মনোময়।”
আরও বেশ কিছু পরে। টমাস বাটা অ্যাভিনিউ দিয়ে ফিরছিল ডুডুরা। সুন্দর হাওয়া দিচ্ছে একটা। রাস্তার মার্কারি ভেপার ল্যাম্প কণ্ঠহারের মতো জ্বলে আছে পরপর। কোনও কথা বলছিল না ওরা, শুধু আলতো করে হাত ধরে আছে একে অপরের। ডুডু এখন যেন বুঝতে পারল পায়েসের গন্ধের মানে কী!
ওদের সামনেই চারজন প্রৌঢ় মানুষ হাঁটছিলেন। তাদের পাশ দিয়ে যেতে যেতে ডুডু শুনল একজন জিজ্ঞেস করছেন, “আচ্ছা নঙ্গীর টিমটা এত ভাল খেলল কী করে বলো তো? গত ম্যাচেও তো জঘন্য খেলেছিল! এ যে মিরাকল্।”
খয়েরি চাদর গায়ে আরেকজন শান্ত গলায় উত্তর দিলেন, “এতে মিরাকলের কিছু নেই। ওদের নতুন গেমস টিচারের জন্যই তো এটা সম্ভব হল। দেখছিলে না, ম্যাচের মাঝে মাঝে কীরকম নির্দেশ দিচ্ছিল। সব ছেলেরা কেমন কথা শুনছিল ওর! জানো ও কে? ও আমার ছেলে পুরু।”
ডাক পয়েন্টের কাছে এসে হঠাৎ সায়েকা ডুডুর হাত জড়িয়ে ধরল। মাথাটা আলতো করে একবার ওর কাঁধে রেখে সরিয়ে নিল। আস্তে আস্তে সাহেব কলোনির রাস্তায় হাঁটতে লাগল ওরা। এই প্রায়-সন্ধের অল্প আলোয় ডুডু দেখল হিরে মুক্তোর মেয়েটা চোখে পৃথিবীর সমস্ত ভালবাসা জড়ো করে ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। ডুডু আর একটু কাছে টেনে নিল ওকে। শীত শেষের ওম নিয়ে সায়েকা মৃদু আদুরে গলায় বলল, “ডুডু, ডুডু নামটা প্রথম থেকেই এত ভাল লেগেছে না আমার!”
