ফেশিয়াল করাটা খুব ঝঞ্ঝাটের ব্যাপার। মুখের ওপর চটচটে কীসব প্যাকট্যাক লাগিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকা। প্রথমে কেমন ভেজা ভেজা, তারপর কেমন শুকনো শুকনো লাগে। তারওপর শীতকাল, ঠান্ডাও লাগে। আর ওইসব মেখে আয়নায় নিজেকে দেখলে প্লুটোর বাসিন্দা মনে হয় ওর। তা ছাড়া বসে থাকতে থাকতে কোমর লক হয়ে যাওয়ার জোগাড়। এরপর আছে ভুরু প্লাক। সে আরও ভয়ংকর। সরু সুতো দিয়ে অদ্ভুত কায়দায় ভুরুর লোম তুলে ভুরুকে ধনুক বানানো। কী ব্যথা লাগে রে বাবা! শিমুল তাই ভুরু প্লাক করার ঝামেলায় যায় না। ফ্যাশন মাথায় থাক। ওর ভয় লাগে খুব। অবশ্য শুধু এটাতেই নয়, শিমুলের আরও অনেক কিছুতেই ভয় লাগে। ওদের বাড়ির কাছেই গঙ্গা, কিন্তু শিমুল কোনওদিন নৌকায় চড়েনি। ওর জলে ভীষণ ভয় লাগে। এই কিছুদিন আগে কালীপুজো হয়ে গেল, কিন্তু শিমুল বাজি পোড়ায়নি। যদি হাত পুড়ে যায়। আগুনেও শিমুলের খুব ভয়। বেশি তেল ঝালের খাবার, রাস্তার খাবার কিচ্ছু খায় না শিমুল। ওর ভয় হয় যদি জন্ডিস হয়! মা মাঝে মাঝে রাগ করে খুব, বলে, “এত ভয় কেন তোর? সব কিছুতেই ভয়, আশ্চর্য! পৃথিবীতে বাঁচবি কীভাবে? পুরো বাপের ধাঁচে গেছিস।” হ্যাঁ, সবাই তাই বলে। শিমুল নাকি একদম ওর বাবার মতো— মুখচোরা, শান্ত, নিরীহ। আচ্ছা এই যে শান্ত চুপচাপ বলেই কি কারও কাছে ওর গুরুত্ব নেই?
ওর মা, ঠাকুরদা, ঠাকুমা সবাই সবসময় ওর দিদিকে, মানে রঙ্গনাকে নিয়ে ব্যস্ত। রঙ্গনাকে দেখতে ভাল, রঙ্গনা ভাল গান গায়, রঙ্গনা প্রেসিডেন্সিতে পড়ে, রঙ্গনা ভাল রান্না করে। শুধু রঙ্গনা আর রঙ্গনা, রঙ্গনার সব ভাল। ছোটবেলায় রঙ্গনা যখন স্কুল স্পোর্টসে প্রচুর প্রাইজ আনত আর বাড়ির প্রায় সবাই যখন ওকে নিয়েই আনন্দ করত, তখন সামান্য একটা সান্ত্বনা পুরস্কার হিসেবে পেনসিল বক্স নিয়ে ঘরের এক কোনায় দাঁড়িয়ে থাকত শিমুল আর বারবার নাক থেকে পিছলে-পড়া চশমাটা ঠিক করত হাত দিয়ে। একমাত্র বাবা-ই তখন আসত ওর কাছে। আর ও, পৃথিবীর সমস্ত উপেক্ষা আর ভয়ের থেকে লুকোবার জন্য বাবার বুকে মুখ লুকোত। আড়চোখে দেখত সমস্ত আলো নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে রঙ্গনা।
সেই ছোটবেলা থেকে আজ পর্যন্ত সব আলোই সবসময় রঙ্গনার ওপর গিয়ে পড়ে। অবশ্য শুধু যে বাড়িতেই ব্যাপারটা এরকম সেটা নয়। রাস্তাতেও এক ঘটনা। রঙ্গনা যখন ট্রেন ধরার জন্য বেরোয় তখন স্টেশন রোড একদম জমে যায়, যাকে বলে ‘ফ্রিজ শট’। নিজের চোখে একবার ব্যাপারটা দেখেছে শিমুল। সাইকেল করে যারা যায় তারা পেছন ঘুরে রঙ্গনাকে দেখতে গিয়ে সাইকেল সমেত ড্রেনের মধ্যে নেমে যায়। চায়ের দোকানের লোকেরা চায়ের খুরি হাতে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে পড়ে। রঙ্গনার হাঁটার দিকে তাকিয়ে মুদিওলা সুজির বদলে ময়দা প্যাক করতে থাকে। হোমিওপ্যাথি ডাক্তারবাবু রোগীর নাড়ি দেখতে গিয়ে কনুই ধরে বসে থাকে। আর সবাই হাঁ করে দেখে রঙ্গনা হাঁটছে। শাড়ির ভাঁজ সরে গিয়ে কোমরের মহার্ঘ খাঁজ বেরিয়ে পড়েছে, বালি ঘড়ির মতো তার ঢাল। সময় যেন পিছলে পড়ছে ব্রোঞ্জের মতো শরীর থেকে।
সেদিন রঙ্গনার পাশে হাঁটতে হাঁটতে কেমন যেন মাটির তলায় সেঁদিয়ে যেতে ইচ্ছে করছিল শিমুলের। মাঝে মাঝে ও ভাবে ওকে কেন রঙ্গনার মতো দেখতে হল না! আসলে শিমুলের কি কোনও পজেটিভ দিকই নেই? জোরে হাওয়া দিলেই স্কুলের বন্ধুরা ওকে বলে, “ওরে, শিমুল তুলোকে বেঁধে রাখ নইলে উড়ে যাবে।” উড়ে যেতেই তো ইচ্ছে করে ওর। যেখানে কেউ ওকে দেখতে পাবে না কখনও, কেউ ওকে সবসময় মনে করাবে না যে ও হেরো, যেখানে ভয় পৌঁছোতে পারবে না ওর কাছে। কিন্তু পারে না, কিছুটা ভয়ে আর কিছুটা বাবার কথা চিন্তা করে।
কুট করে পায়ে একটা পিঁপড়ে কামড়াল। উফ। বর্তমানে ফিরে এল শিমুল। আয়নার সামনে ফেশিয়াল প্যাকটা পড়ে আছে। মরে গেলেও ও ওটা লাগাবে না। মা আর দিদি খুব বকবে, বকুক, ওদেরই গলা ব্যথা হবে। ওরা কেন যে ওকে সুন্দর বানাতে চেষ্টা করে। কী হবে সুন্দর হয়ে? দিদি অবশ্য মাঝে মাঝে ওকে বলে, “শিমু, তোকে এত মিষ্টি দেখতে, একটু সাজলে তো পারিস।” মিষ্টি দেখতে না হাতি। ও খুব জানে এ-সব ওকে স্তোক দেওয়া। সত্যি যদি শিমুলকে মিষ্টি দেখতে হত তা হলে কি ‘ও’ নজর করত না শিমুলকে? তা হলে না হয় একটু সাজবার মোটিভেশন পেত ও। ওই জঘন্য প্যাকটা মুখে লাগিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকত, খুব ব্যথা লাগলেও ভুরুটা প্লাক করে ফেলত। কিন্তু ‘ও’ তো আর ওর দিকে নজর দেয় না। ভুল করেও না। ওর সামনে গেলে শিমুলের নিজেকে অদৃশ্য মনে হয়।
ধুর, কোনওমতে চুলটা আঁচড়ে বেরিয়ে গেল শিমুল। মা বলছিল স্যান্ডউইচ খেতে। ইয়াক, স্যান্ডউইচ শুনলেই ওর বমি পায়। তার চেয়ে ও এখন যে বাড়িতে যাবে সেখানেই কিছু খেয়ে নেবে। আচ্ছা ‘ও’ কি এখন বাড়িতে থাকবে?
শিমুলদের বাড়ির পাশেই একটা পুকুর আর তার পাশেই ওদের বাড়ি। ‘ও’ মানে আমন। শিমুলের জ্ঞান হওয়ার থেকেই ও দেখে আসছে আমনদের বাড়ির সঙ্গে ওদের বাড়ির সম্পর্ক খুব ভাল। দু’বাড়ির মধ্যে খুব যাতায়াত। আমন আর শিমুল একবয়সি আর পড়েও এক ক্লাসে। ইলেভেনে। স্ট্রিমও এক, সায়েন্স। শিমুল ভাবে কত মিল তবু আমন কেন যে ওকে দেখতে পায় না! কিন্তু তবু ও রোজ আমনদের বাড়িতে যায়। যদি কোনওদিন আমন ওর গুরুত্ব বোঝে। এটুকু বাদ দিলে পৃথিবীতে এই একটা জায়গাই আছে যেখানে গেলে শিমুলের নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। শিমুল ও-বাড়িতে গেলেই আমনের মা ওর ওপর হামলে পড়ে। বলে, “কী রোগা রে তুই। নে খা। সব খেয়ে নিবি, যদি কিছু ফেলে উঠিস তো দেখবি মজা।” বলেই কোনওদিন ঘিয়ে ভাজা লুচি, কোনওদিন চিড়ের পোলাও, মিষ্টি ঠেসে ধরে সামনে। ওর ওজনের চেয়ে বেশি ওজনের খাবার খেতে পারে নাকি শিমুল? তবু সাধ্যমতো খায়। কিন্তু তাতে আমনের মায়ের মন ভরে না। সারাক্ষণ খুঁতখুঁত করতে থাকে। কিন্তু তবু ভাল লাগে শিমুলের। এই ছদ্ম শাসনের ভেতরে যে আদর আছে সেটা ওর ভাল লাগে।
এই মফস্সলে শীত একটু তাড়াতাড়ি পড়ে। উত্তরে গঙ্গার থেকে বিকেল হলেই একটা শিরশিরে ঠান্ডা হাওয়া দেয়। শিমুলের মনে হয় যেন কাছেই কেউ ফ্রিজ খুলে রেখেছে। ওর নাকের মাথা ঠান্ডা হয়ে ওঠে। হাতের আর পায়ের তলায় বিন্দু বিন্দু ঘাম জমা হয়। শিমুলের ভয় লাগে আবার সর্দি হয়ে যাবে না তো? এটা মনে পড়াতে শিমুল একটা মাফলার নিয়ে নিল। তারপর দুদ্দাড় করে নেমে এল রাস্তায়। আর রাস্তায় বেরিয়েই আচমকা একজনকে দেখে একদম কাঠ হয়ে গেল ও। ওর সামনেই রুদ্র। আবহাওয়ার তাপমাত্রা হঠাৎই যেন চার ডিগ্রি নেমে গেল। কে যেন বরফের গুলি গড়িয়ে দিল শিমুলের শিরদাঁড়ায়। রুদ্রকে শিমুল যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলে। ও যে কতটা খারাপ ছেলে সেটা শিমুলের চেয়ে বেশি কেউ জানে না।
তখন ক্লাস নাইনে পড়ে শিমুল। একটা লোফার টাইপের ছেলে ওর পেছনে খুব লেগেছিল। রাস্তায় বেরোলেই প্রচণ্ড উত্ত্যক্ত করত ওকে। স্কুলে যাওয়ার সময় সারাটা পথ ওর পেছন পেছন যেত। গুলমোহর ফুল থেকে শুরু করে গোলাপ, ছোট ছোট কাগজের টুকরো ওকে ছুড়ে ছুড়ে মারত। এমনকী ছোট ছোট রঙিন যৌন মিলনের ছবির বই থেকে অসভ্য ছবি ছিঁড়ে ওর দিকে ছুড়ে দিত। এ ছাড়া খারাপ কথা তো আছেই। শিমুল ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকত। পরের দিন স্কুল আছে চিন্তা করে রাতে ঘুম আসত না। একটা আতঙ্ক হয়ে গেছিল ওর। ছেলেটার কথা মাকে বলেছিল ও। কিন্তু সবটা বলতে পারেনি। খারাপ ছবি আর অশ্লীল কথাগুলো ও মাকে বলতে পারেনি। মা জানে মেয়ে ভিতু তাই ওর কথায় অতটা গুরুত্বও দেয়নি।
এর পর একদিন ঘটল বিপত্তি। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে ছেলেটা আবার ওর পিছু নিল। তখনও শীতকাল ছিল। স্কুল ফাংশনের নাচের রিহার্সালের জন্য শিমুলের স্কুল থেকে বেরোতে দেরি হয়ে গিয়েছিল। আর ভাগ্যটাও এমন সেদিন টাপুরও সঙ্গে ছিল না। স্কুল থেকে বাড়ির পথ অনেকটা। অল্প আলোকিত রাস্তা দিয়ে একা ফিরছিল ও। হঠাৎই পেছনে শুনল ক্রিং ক্রিং— সাইকেলের বেল। শিমুলের শরীর যেন অবশ হয়ে গেল। রাস্তার দু’দিকে বড় মাঠ, তাতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গুলমোহর আর পাম গাছের সারি। জায়গাটা খুব সুন্দর হলেও বেশ নির্জন, তার ওপর আলোও কম। ছেলেটা ওর সাইকেল নিয়ে শিমুলের সামনে এসে দাঁড়াল, বলল, “কী ডার্লিং, আজ একা! চলো, যা শীত পড়েছে, একটু মস্তি করা যাক। এমন সুযোগ আর পাওয়া যাবে না।” বলে হাত দিয়ে একটা প্রচণ্ড খারাপ ইঙ্গিত দেখাল। শিমুল ভয়ে নীল হয়ে গেল। ডিসেম্বরের ঠান্ডাতেও দরদর করে ঘামতে লাগল। আর তার সঙ্গে ওর কান্নাও পেল খুব। ছেলেটা এবার সাইকেল থেকে নেমে এসে দাঁড়াল ওর সামনে। ফিসফিস করে বলল, “চলো না, আজ একটু তোমায় খাব। এই যে তোমার সালমা হায়েকের মতো পেট সেটা একটু চেটে দেখব।” বলে এবার ছেলেটা শিমুলের বুক আর পেটের মাঝখানটা ধরতে গেল। শিমুল আর পারল না। এক ধাক্কায় ছেলেটাকে মাটিতে ফেলে দৌড় লাগাল। ছেলেটা মাটিতে পড়ে গিয়েও সামলে নিল মুহূর্তের মধ্যে। তারপর তাড়া করে শিমুল বেশি দূর যাওয়ার আগেই গিয়ে ধরে ফেলল ওকে। শিমুলের হাতটা মুচড়ে ধরে হিম গলায় বলল, “অ্যাসিড বাল্ব জানো? নাইট্রিক অ্যাসিড? ওর এক ফোঁটা যদি কারও চামড়ায় পড়ে তা হলে সেটা চামড়া হাড় সব জ্বালিয়ে দেয়। ভাবো যদি বাল্ব ভরতি সেটা তোমার মুখে পড়ে? এই প্রীতি জিনটার মতো ঠোঁট তো কুষ্ঠ রোগীর মতো হয়ে যাবে। না? যদি নিজেকে বাঁচাতে চাও তো কাল অবশ্যই গঙ্গার জেটির ধারে আসবে। এই সাড়ে চারটে নাগাদ। আমি তোমাকে খাব। আর যদি তুমি রাজি থাকো তবে ফিতে কাটার জন্যে ক্যাপ নিয়ে আসব।” ছেলেটা খ্যাক খ্যাক করে হাসতে লাগল। জোর করে শিমুলকে নিজের দিকে টেনে আনল। আরও কিছু করতও বোধহয়, কিন্তু পারল না জ্যাকসন আর দিয়েগোর জন্যে। আমনদের বাড়িতে যায় বলে ওরা শিমুলকে ভালই চেনে। ওরা কাছ দিয়েই যাচ্ছিল। ঘটনা দেখে হা হা করে এসে পড়ায় ছেলেটা রণে ভঙ্গ দিল।
ছেলেটা ওর হাত ছেড়ে দিতেই কাপড়ের স্তূপের মতো মাটিতে পড়ে গিয়েছিল শিমুল। সেদিন জ্যাকসন আর দিয়েগো না-থাকলে কী হত কে বলতে পারে। ওরাই শিমুলকে বাড়িতে দিয়ে গিয়েছিল। সে-রাতে তুমুল জ্বর এসেছিল শিমুলের। জ্বরের ঘোরে “অ্যাসিড মারবে” কথাটা নাকি অনেকবার বলেছিল ও। ডাক্তার বলেছিল মেন্টাল শক।
ঠিক হতে সাত দিনেরও বেশি সময় লেগেছিল শিমুলের। মা আর দিদি ওকে অনেক সাহস দিয়েছিল। কিন্তু তবু কিচ্ছু হয়নি। ঘরের এক কোনায় গুটিশুটি মেরে বসে থাকত শিমুল। তারপর একদিন টাপুর এল। প্রথমে টাপুরকেও কোনও কথা বলতে চায়নি শিমুল, কিন্তু টাপুর অন্য ধাতুতে গড়া। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব জেনে নিল, তারপর বলল, “ভাবিস না, একটা উপায় করছি। ছেলেটাকে শুধু চিনিয়ে দিতে পারবি তো একবার? তা হলেই হবে। রুদ্রদাকে বলছি। সব ব্যবস্থা করবে।”
সেই রুদ্রর সঙ্গে প্রথম কথা হয়েছিল শিমুলের। আগে শিমুল রুদ্রকে চিনত, কিন্তু কোনওদিন কথা বলেনি। এবার হল টাপুরের জন্য। টাপুর রুদ্রকে নিজের দাদার মতো মানে। প্রায় সব কথাই শেয়ার করে ওর সঙ্গে। শিমুলের সমস্যার কথা শুনেই তাই হয়তো টাপুরের রুদ্রর কথা মনে এসেছিল। “কিন্তু রুদ্রদা কি ওই ছেলেটাকে শায়েস্তা করতে পারবে? ও তো মাত্র ক্লাস টেন-এ পড়ে।” শিমুল না-জিজ্ঞেস করে পারেনি। টাপুর হেসে বলেছিল, “পারে কি পারে না সময় হলেই দেখবি।”
দু’সপ্তাহ পরে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল শিমুল। বুক কঁপছিল ভীষণ। খালি মনে হচ্ছিল এই বুঝি কেউ অ্যাসিড মারবে। যথারীতি বাটা ব্রিজের কাছে এসে ও সেই পরিচিত ক্রিং শব্দটা শুনল। আশ্চর্য! ছেলেটা কি ওর বাড়ির বাইরে আসার অপেক্ষাই করছিল? ছেলেটা সাইকেল নিয়ে একটা বড় চক্কর দিয়ে এসে ওর সামনে দাঁড়াল, “কী গো তুমি যে অশোক বনে সীতা হয়ে বসে রইলে এতদিন। এদিকে আমার কত কষ্ট হল বলো তো। আচ্ছা তোমারও যদি এমন কষ্ট হয়? মানে হতেও তো পারে, অ্যাসিড মুখে পড়লে সবারই তো হয়। তাই না?”
শিমুলের হাত পা আবার জমে গেল। টাপুরের কথা শুনে বাইরে বেরিয়ে তবে কি ভুল করল ও? রুদ্র কোথায়? আর ঠিক তখনই আচমকাই, যেন মাটি খুঁড়ে রুদ্র এসে হাজির হল। শিমুলের পেছনে রুদ্রকে দেখে ছেলেটা থতমত খেয়ে গেল। রুদ্র সাইকেল থেকে নেমে বলল, “শিমুল, তুমি যাও।” তারপর ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বলল, “কী রে তিমির, তুই আবার ঝামেলা শুরু করেছিস? চল তো একটু ওদিকে। তোর সঙ্গে আমার কথা আছে।” শিমুল অবাক হয়ে দেখেছিল বদ ছেলেটা সুড়সুড় করে রুদ্রর সঙ্গে চলে গেল।
শিমুল আর জানে না কী হয়েছিল কিন্তু তিমির নামে ছেলেটা আর কোনও গন্ডগোল পাকায়নি। আর কোনওদিন শিমুলের সামনেও আসেনি। খুব ভাল লেগেছিল শিমুলের। রুদ্র কি ম্যাজিশিয়ান? কী ভাবে এটা সম্ভব হল? তারপর থেকে রুদ্র মাঝে মাঝে আসত শিমুলদের বাড়ি। রুদ্র দারুণ ভাল গান গাইতে পারে, কথাও বলে খুব সুন্দর। রুদ্র এলে খুব ভাল সময় কাটত শিমুলের। ওরও নিজের দাদার মতো মনে হত রুদ্রকে। কিন্তু অত সুখ কি সহ্য হয় শিমুলের কপালে? সেই বিশ্রী ঘটনাটা ঘটল এক বর্ষার বিকেলে।
সেদিন বাড়িতে শিমুল আর ওর ঠাকুরদা ঠাকুমাই ছিল শুধু। দিদি, বাবা আর মা কোথাও গিয়েছিল। সেদিন শেষ বিকেলে রুদ্র এল। হাতে একটা চকোলেট। ছাদের চিলেকোঠার ঘরটা হল শিমুলের স্টাডি রুম। বরাবরের মতো সেখানেই বসল ওরা। গল্পও হল অনেকক্ষণ। আর বিপত্তিটা ঘটল তার পরেই। রুদ্র চলে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াল একসময়। শিমুলও দাঁড়াল। আর হঠাৎই পেছন ঘুরে রুদ্র ঝাঁপিয়ে পড়ল শিমুলের ওপর। রুদ্র এমনিতেই লম্বা চওড়া। আর শিমুল, তুলোর মতো। আচমকা ধাক্কায় বেসামাল হয়ে ও পড়ে গেল গেল পাশের ছোট্ট ডিভানের ওপর। ও প্রথমে বুঝতেই পারেনি কী হল। একেবারেই প্রস্তুত ছিল না এই ঘটনার জন্য। ওকে বিছানায় চেপে ধরে রুদ্র বলল, “একটা চুমু খাব, প্লিজ একটা চুমু খাব তোমায়।” শিমুল আপ্রাণ চেষ্টা করল হাত ছাড়াতে, পারল না। এদিকে রুদ্র পাগলের মতো চুমু খেতে লাগল শিমুলকে। ঠোঁটে গালে গলায় মুখ ঘষতে লাগল রুদ্র। শিমুলের গা গুলিয়ে উঠল রুদ্রর মুখের লালায়। হাতে ব্যথাও লাগল খুব। রুদ্রর তখন কোনও হুঁশ নেই। ও প্রলাপের মতো বলছিল, “জানো, কেন সেদিন তোমায় বাঁচিয়েছি? তোমার এই ঠোঁট দুটোর জন্য। তিমিরকে বলেছিলাম আমার মালের পেছনে লাগলে ওকে শেষ করে দেব। শিমুল, এত সুন্দর ঠোঁট তুমি কেমন করে বানালে? আমি এটা আজ কামড়ে ছিঁড়ে নেব। এটা আমার, এক্কেবারে আমার।”
রুদ্র চলে যাওয়ার পর বিধ্বস্ত শিমুল একা বসে ছিল। ঠোঁট দুটো জ্বলছিল খুব। গলায় দু’-চারটে আঁচড়ের দাগ। শিমুলের কান্নার শক্তিও ছিল না। কাউকে ও সেই কথা বলতে পারেনি। এক লজ্জায় আর দুই কেউ ওকে বিশ্বাস করবে না। শুধু অনেক ভরসায় ও আমনকে বলেছিল ঘটনাটা। সব শুনে আমন উত্তর দিয়েছিল, “আমায় এসব বলে কী লাভ বল? আমি কী করব?” শিমুল অবাক হয়ে তাকিয়েছিল আমনের দিকে। ছেলেগুলো সবাই কি এরকম নিষ্ঠুর হয়? নিষ্ঠুর আর স্বার্থপর? কিন্তু তবু আমনের ওপর রাগ করতে পারেনি শিমুল। আজও সুযোগ পেলেই আমনের সামনে যেতে ওর ভাল লাগে। আমন কখনও কথা বলে, কখনও বলে না। আমনও কি দেখতে পায় না ওকে? ও কি অদৃশ্য? এর পরও রুদ্র কয়েকবার অসভ্যতা করতে গেছে। ঠিক কায়দা করতে পারেনি। তবে হিন্ট দিয়ে গেছে ক্রমাগত। শিমুল এখন পারতপক্ষে রুদ্রর সঙ্গে একা থাকে না।
অবশ্য আমন আসে ওদের বাড়িতে। কিন্তু সে তো ওর জন্য নয়। দিদির জন্য। ওর সঙ্গে ক্ষমাঘেন্নার মতো একটু কথা বলে আমন সোজা ঢুকে যায় দিদির ঘরে। সেখানে কত হা হা হি হি করে। সবাই কেন যে দিদিকে এত পাত্তা দেয়! ওদের হাসি পাশের ঘরে বসে শোনে শিমুল। ভীষণ রাগ হয়। নাক থেকে চশমাটা পিছলে পড়ে যায়। শিমুল চশমাটা জায়গায় বসাতে গিয়ে দেখে সেটা আবার পিছলে নেমে আসছে নীচে।
আজ রুদ্রকে দেখে থমকে গেল শিমুল। রুদ্র হাসল। শিমুল দেখল শয়তানটার হাসিটা খুব সুন্দর। সেইজন্যে কি বলে— ইভল্ লুকস বেটার! রুদ্র এগিয়ে এল, বলল, “কী সুইটি পাই? আমার কাছে আসছিলে?” শিমুল কোনও কথা না-বলে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। “আরে কথা বলছ না কেন? আমি কি এখন তোমায় খেয়ে নেব নাকি? এখন খাব না, ঠিক সময়ে খাব। বহুদিন খাইনি তো! ভুলে গেছি টেস্ট কেমন। কাল একবার গঙ্গার ধারে এসো তো।” শিমুলের চোখ দিয়ে জল বেরোবার উপক্রম হল। কিন্তু ঠিক সেই সময়ে একজনের সাইকেল এসে দাঁড়াল ওদের পাশে। জ্যাকসন।
“কী বে রুদ্র, আমাদের এলাকায় এসে লক্কাগিরি হচ্ছে?” জ্যাকসন রুদ্রকে দেখেই দাঁত কিড়মিড় করে বলল।
রুদ্র জ্যাকসনের দিকে ঘুরল, “বাঁদরের বাচ্চা! ভাগ এখান থেকে। তোর এলাকা মানে? তোর বাপ তোকে লিখে দিয়েছে?”
“বাপ তুলবি না রুদ্র। কেলিয়ে তক্তা বানিয়ে দেব শালা।”
রুদ্র হো হো করে হেসে উঠল, “যা যা হেরো পার্টি, হেরে গিয়ে মাথার ঠিক নেই। জোকার শালা।” তারপর আর সময় নষ্ট না-করে বলল, “তা হলে আমি আসি শিমুল। কেমন?” কী ভদ্র, কী ভদ্র! জানোয়ার। ঠিক সময়ে এসে পড়ার জন্য শিমুল মনে মনে জ্যাকসনকে ধন্যবাদ দিল।
রুদ্র চলে গেল। জ্যাকসনও আর দাঁড়াল না। শিমুল প্রায় দৌড়ে গিয়ে ঢুকে পড়ল আমনদের বাড়িতে। আজ আমনদের সারাবাড়ি চুপচাপ। শিমুল বুঝল আমনের মা আজ বাড়িতে নেই। কোথাও গেছে বোধহয়। অবশ্য তাতে শিমুলের হাঁপ ছাড়ল, কেউ ওকে খাওয়া নিয়ে এখন অতিষ্ঠ করবে না। দোতলায় আমনের ঠাম্মার ঘর। শিমুলের খুব ভাল লাগে ওঁকে। শিমুল দোতলায় উঠে সোজা ঠাম্মার ঘরে গিয়ে ঢুকল। ঠাম্মা একটা মোটা বই পড়ছিলেন। ঠাম্মাকে যত দেখে তত অবাক হয় শিমুল। একটা মানুষ এই বয়সেও এত সুন্দর থাকে কেমন করে! শিমুল ঠাম্মার গা ঘেঁষে বসল। দু’হাতে ঠাম্মাকে জড়িয়ে ধরে পিঠে মাথা রাখল। কী দারুণ ওডিকোলনের গন্ধ। ঠাম্মা বললেন, “কী রে পাগলি, দু’দিন আসিসনি কেন? তোর জন্য মিটসেফে নারকেলের তক্তি রেখেছি। নিয়ে খা। আর আমায় ছাড়, রামায়ণের এই অধ্যায়টা শেষ করি, তারপর গল্প করছি তোর সঙ্গে।”
অগত্যা উঠল শিমুল। নারকেলের তক্তি ওর প্রিয়। মিটসেফ থেকে দুটো তক্তি বের করে নিল ও। ঠাম্মা পড়া শেষ করুক, ততক্ষণে আমনের ঘরে গিয়ে দেখা যাক ও আছে কিনা।
আমনের ঘরটা খুব সুন্দরভাবে সাজানো। কিন্তু আমনটা এমন অগোছালো যে কিছুই ঠিকভাবে রাখে না। ঘরের চারিদিকে জামাকাপড়, বই, খাতা সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা। শিমুল ঘরের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল। যা ভেবেছিল ঠিক তাই, আমন ঘরে নেই। অন্য দিন ও যা করে আজও তাই শুরু করল শিমুল। আমনের ঘরটা গোছাতে শুরু করল। জামাকাপড়গুলো ভাঁজ করে তুলে রাখল আলমারিতে। বইখাতাগুলো জড়ো করে রাখল র্যাকে। শিমুলের মনে হয় এই কাজগুলো করা ওর পক্ষে স্বাভাবিক। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘরটা আবার আগের মতো সুন্দর হয়ে গেল। চারিদিকে চোখ বুলিয়ে শেষবারের মতো দেখে নিল শিমুল। সব ঠিক আছে তো? দেখল কম্পিউটার টেবিলের নীচে দু’-চারটে লুজ পৃষ্ঠা উঁকি দিচ্ছে। এই আমনের দোষ। সবসময় লুজ পৃষ্ঠায় লিখবে আর ঘরময় ছড়িয়ে রাখবে। পরে নিজেই আর কিছু খুঁজে পাবে না। শিমুল টেবিলের তলা থেকে কাগজগুলো বের করল। বাংলায় কীসব লেখা। শিমুল ড্রয়ারে কাগজগুলো রাখতে গিয়েও পারল না। লেখার প্রথম লাইনটায় চোখ আটকে গেল ওর। কী লিখেছে এসব আমন? এর মানে কী? শিমুল ধপ করে বসে পড়ল খাটে। লেখাগুলো পড়তে লাগল— ‘রঙ্গনাদি, তোমার মুখটাই বারবার সামনে চলে আসে আমার। তোমার ব্রোঞ্জরঙা শরীর, তোমার গিটারের মতো খাঁজওলা কোমর। সেদিন তুমি যখন সামনে ঝুঁকে মাটি থেকে স্কেল তুলছিলে আমি স্পষ্ট দেখলাম তোমার পোড়ামাটির বুক। আমার সব ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল। আমি এখন রাত্রে ঘুমোতে পারি না। তুমি যখন মুখ টিপে হাসো, আমার দিকে তাকাও, আমি মরে যাই একদম, আবার বেঁচেও উঠি। তুমি বোঝে না রঙ্গনাদি? তোমাকে যতবার দেখি কে জানি আমার শরীরে গরম লোহা ঢেলে দেয়, আমার পুরু…”
আর পড়তে পারল না শিমুল। এসব কী লিখেছে আমন? কেন লিখেছে এসব? এর মানে কী। শিমুলের হাত পা অবশ হয়ে গেল। মাথাটাও ঘুরছে। ঠাম্মার তৈরি নারকেলের তক্তি আঠার মতো জড়িয়ে আসছে জিভে। নারকেলের তক্তি এত তেতো হয় আগে জানত না।
