পাতাঝরার মরশুমে – ১০

স্কুলের শেষ পরীক্ষা হয়ে গেল। আজ টুয়েলভের টেস্টের শেষ পরীক্ষা ছিল। এখন ডিসেম্বরের মাঝামাঝি। বেশ ঠান্ডা পড়েছে এবার। স্কুল গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে কবীর দেখল স্টুডেন্টরা স্কুল থেকে একে একে বেরিয়ে আসছে। ওই তো দিয়েগো, ওই যে ডুডু আর সবার পেছনে জ্যাকসন। ওঃ, প্রতিটা পরীক্ষায় গন্ডগোল করেছে ব্যাটা, হয় স্যারদের সঙ্গে, নয় পাশের স্টুডেন্টের সঙ্গে, কোনও না-কোনও ঝামেলা করেছেই ও। জ্যাকসনের এইসব ননসেন্স কাজকর্মের জন্য কবীরের বিরক্তও লাগে, আবার হাসিও পায়। সত্যি ভীষণ উদ্ভট এই ছেলেটা। কখন কী করে ঠিক নেই। হঠাৎ ওর মনে পড়ে গেল ক্লাস সেভেনের একটা ঘটনা।

জিওগ্রাফি পরীক্ষার খাতা বেরোনোর দিন ছিল সেটা। ফাইনাল পরীক্ষা নয়, এমনি টার্মিনাল পরীক্ষা।

জিওগ্রাফিতে জ্যাকসন বরাবর কাঁচা। অবশ্য তখন জ্যাকসন নয়, সবাই মনোময় বলেই ডাকত ওকে। তো, স্যার খাতা নিয়ে ক্লাসে এসে বসে প্রথমেই ডাকলেন জ্যাকসনকে, বললেন, “মনোময়, এদিকে আয়।” সবাই তো অবাক। তবে কি ও-ই হায়েস্ট নম্বর পেল? জ্যাকসন কাছে। যাওয়াতে স্যার খাতার বান্ডিল থেকে ওর খাতাটা বের করে বললেন, “তুই জিওগ্রাফির যে উত্তর লিখেছিস এগুলো কোন বইতে আছে?”

জ্যাকসন স্মার্টলি বলল, “কেন স্যার, আমাদের জিওগ্রাফি বইতে।”

“আমাদের জিওগ্রাফি বইতে? ইয়ারকি হচ্ছে?” স্যার সামান্য উত্তেজিত হয়ে উঠলেন, তারপর ক্লাসের উদ্দেশে বললেন, “তোরা শুনবি ও কী উত্তর লিখেছে? শোন তবে। শর্ট নোট লিখতে দেওয়া ছিল ‘জলবিদ্যুৎ’-এর ওপর। আমাদের মনোময় কী লিখেছে শোন।” স্যার জ্যাকসনের খাতা থেকে পড়তে শুরু করলেন, “জল থেকে যে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় তাকে জলবিদ্যুৎ বলে। লোকেরা এই বিদ্যুৎ জলে নেমে তুলতে গেলে শক খেয়ে পটাপট মরে যায় তাই প্রচুর বিদ্যুৎ জল থেকে উৎপন্ন হলেও মানুষ তা ব্যবহার করতে পারে না। অর্থাৎ জলবিদ্যুৎ ব্যবহার করতে হলে বিদ্যুৎকে জল থেকে তোলার জন্য উন্নত পরিবহণ ব্যবস্থার দরকার।” স্যার যখন থামলেন, জ্যাকসন ছাড়া আর সবাই হাসতে শুরু করেছে।

আজ স্কুলের শেষ পরীক্ষা ছিল বলেই কি সেইসব পুরনো দিনের কথা বেশি মনে পড়ছে? “কী রে কবীর! একা একা দাঁত কেলাচ্ছিস কেন?” জ্যাকসন কাছে এসে প্রশ্ন করল।

“লাথি খাবি শালা।” কবীর খিঁচিয়ে বলল।

ডুডু বলল, “আবার শুরু করলি? লক্কাবাজি না করলেই তোর হয় না, না রে জ্যাকসন?”

“ও তুমি শালা মাগিবাজি করে বেড়াবে আর আমি লক্কাবাজি করছি, না?” জ্যাকসন চোখ টিপে বলল।

“কী বললি তুই?” ডুডু এবার সত্যিই খেপে গেছে। কবীর দু’জনের মাঝে এসে দাঁড়াল, বলল, “আবার শুরু করলি তোরা? আজ পরীক্ষা শেষ হল, আজও ঝগড়া করছিস?”

“তুই জানিস না কবীর, কিছুদিন আগেই পরী বলে একটা মেয়ের সঙ্গে ডুডু ব্যাপক সিন দিয়েছে। দু’জনকেই মাঝে মাঝে এদিক ওদিক যেতে দেখা গেছে। অবশ্য এখন ক’দিন দেখা যাচ্ছে না। আর শালা কী মেয়ে মাইরি। ফ্লুরোসেন্ট কালারের একদম। আর তেমন ফিগার। একেবারে পৃথিবী টাইপ। সারা শরীরে পাহাড় মালভূমি ভরতি। কী মাল তুলেছিস ডুডু।” জ্যাকসন খিকখিক করে হাসতে লাগল। ডুডু প্রচণ্ড রেগে গেছে, বুঝল কবীর। কিন্তু ছেলেটা ভদ্র, বিশেষ কিছু বলতে পার না। কবীর ওর হয়ে এক লাথি মারল জ্যাকসনকে, “চুপ শালা, বেশি বললে বিচুটি দিয়ে ক্যালাব কিন্তু।” জ্যাকসন এবার রণে ভঙ্গ দিল।

কবীর দেখল দিয়েগো এইসবের বাইরে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে দূরে। এবার জ্যাকসন ওর কাছে যাওয়াতে দু’জন ফিরে যেতে লাগল বাড়ির দিকে। ডুডু চিৎকার করে বলল, “দিয়েগো, পরশু থেকে প্রাকটিস, আসবি কিন্তু।” দিয়েগো সাইকেল করে যেতে যেতে পিছনে ফিরে তাকাল একবার, তারপর বুড়ো আঙুলটা তুলল শুধু। ওরা দু’জন গলির মধ্যে মিলিয়ে গেল।

কবীর আশ্চর্য হল, ডুডুকে জিজ্ঞেস করল, “দিয়েগোটা প্র্যাকটিসে জয়েন করবে?”

“হ্যাঁ করবে। ও নিজেই বলল।”

“হঠাৎ মত পরিবর্তন?”

“কে জানে কেন? আসলে ওর খুব টেনশন যাচ্ছে বুঝলি তো। বাড়িতে মা অসুস্থ আরও কীসব প্রবলেম আছে। যাক যখন নিজেই বলেছে যে প্র্যাকটিস করবে, করুক।”

“তা করুক, কিন্তু দেখ কতটা সিরিয়াসলি করে। যা চারদিকে শুনছি গত ম্যাচটা নাকি ইচ্ছে করে ছেড়ে দিয়েছিল ও।”

ডুডু বাধা দিল এবার। বলল, “ফালতু কথা। দিয়েগো অমন ছেলেই নয়।”

“ডুডু, তুই যাই বলিস রবিন মেমোরিয়ালের ছেলেরা কিন্তু তেমনই বলেছে।” কবীর গম্ভীর হয়ে বলল।

“ওরা এমনি বলে আমাদের টিম ভাঙতে চাইছে। ডোন্ট গো বাই দেম কবীর। যাক গে আমি এবার কাটি। আজ পরীক্ষা শেষ বলে মেঘাদিদের বাড়িতে নেমন্তন্ন করেছে। জেঠিমা, মানে মেঘাদির মা যা রান্না করে না! কথা হবে না বাঙালি।” বলে ডুডু সাইকেলটা নিয়ে এগিয়ে গিয়েও কিছু মনে পড়াতে থেমে গেল হঠাৎ, তারপর কবীরের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল, “হ্যাঁরে, টাপুর তোর কথা জিজ্ঞেস করছিল। কোনও কেস করিসনি তো? মেয়েটা কিন্তু সুবিধের নয়, আবার বলছি।”

“না না, তুই চিন্তা করিস না।” কবীর স্বাভাবিকভাবে উত্তর দিল।

ডুডু আর ঘাঁটাল না। বলল, ঠিক আছে যা পারিস কর। আমি এলাম।” ডুডু চলে গেল।

‘টাপুর’ নামটাই কেমন করে দেয় কবীরকে। কবীর কেন এত ভালবাসে টাপুরকে? কত ঝঞ্জাটেই না পড়ে এইজন্য। তবু টাপুরের প্রতি আকর্ষণ বাড়তে থাকে ওর। এইরকম আগুনের মতো একটা মেয়ে, ওকে কবীরের চাই-ই চাই। সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথম যার মুখটা ওর মনে পড়ে সেটা টাপুরের আর রাত্রে ঘুমোতে যাওয়ার আগের মুহূর্তে যার মুখটা মনে পড়ে সেটাও টাপুরেরই। মনে মনে খুব ভাল হয়ে উঠতে ইচ্ছে করে কবীরের। মহান হয়ে উঠতে ইচ্ছে করে। যেদিন টাপুর ওর সঙ্গে কথা বলে সেদিন ও সবাইকে মনে মনে ক্ষমা করে দেয়। রাস্তায় বসা ভিখিরিকে নিজের জামাটাই খুলে দিয়ে দিতে ইচ্ছে করে ওর। কোথায় যেন ও পড়েছিল, “লাভ ব্রিংস দ্য বেস্ট আউট অব ম্যান।” প্রেমে পড়লে সব ছেলেরাই কি মহান হয়ে পড়ে? অবশ্য কবীরকে অপদস্থও কম হতে হয় না টাপুরের জন্য। এই গত দু’দিন আগেও তো বাবার কাছে ব্যাপক ঝাড় খেয়েছে কবীর। টাপুর ওর কষ্টটা বোঝে না কেন কে জানে? ও তো পুরু স্যারের পেছনে পড়েছে। তবে স্যারটা ভাল। টাপুরকে পাত্তা দেন না।

তবে টাপুরের পেছনে যে কবীর পড়েছে সেটা ক্রমশ ছড়িয়ে যাচ্ছে বাটানগরে। এই দু’দিন আগে সেটা নিয়েই তো বাবার কাছে ভীষণ ঝাড় খেয়েছে কবীর।

খবরটা বাবার কানে তুলেছে নারুকাকা। ও লোকটা সর্ব ঘটে কাঁটালি কলা। কোত্থেকে খবর জোগাড় করেছে কে জানে? তবে এটা বলতে হবে যে নারুকাকার পরোপকারী নীতির জন্য ওর নেটওয়ার্ক বিশাল। আর টাপুর যেমন মেয়ে, ওর পেছনে ঘুরলে জানাজানি হয়ে যাওয়ার চান্স আছেই।

দু’দিন আগে ছিল অ্যাকাউন্টেসি পরীক্ষা। পরীক্ষা ভালই হয়েছিল কবীরের। দারুণ মেজাজ নিয়ে বাড়ি ফিরেছিল ও। বাড়িতে ঢোকার মুখে দেখেছিল নারুকাকা বেরোচ্ছে। ওকে দেখে নারুকাকা বলল, “যাও, ভেতরে যাও, আজ খবর আছে তোমার।” সর্বনাশ! কী হল আবার? ভয় পেয়ে গিয়েছিল কবীর। দোতলায় নিজের ঘরে গিয়ে ব্যাগ রেখে, জামাকাপড় পালটে চুপ করে বসেছিল কবীর। কিছুক্ষণ পরেই মা এসে বলেছিল যে বাবা ওকে ডাকছে। বাবা? এই সময় বাড়িতে? মা বলেছিল যে শরীরটা ভাল নেই বলেই বাবা তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এসেছে। বাবা নিজের থেকে সহজে ডেকে পাঠায় না কবীরকে। ভয়ে ভয়ে কবীর গিয়েছিল বাবার কাছে।

একটা রকিং চেয়ারে বাবা বসে ছিল। হাতে মোটা একটা ইংরাজি বই। কবীর চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। বাবা কোনও কথা না-বলে বই পড়ে যাচ্ছে। কবীর জানে এ ঝড়ের ইঙ্গিত। বাবা এরকমই করে। সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে দাঁড় করিয়ে রাখে। বাড়িতে সবাই বাবাকে ভয় পায়। এমনকী বাবার কাকারা, মানে কবীরের দাদু যাঁরা, তারাও কবীরের বাবার সামনে সবসময় একটা হেঁ হেঁ হেঁ হেঁ ভাব নিয়ে আসে। কবীরের বাবা উকিল মানুষ। সারাদিন বিভিন্ন মক্কেলের সঙ্গে আর কোর্টে প্রচুর কথা বলতে হয়। তাই বোধহয় বাবার কথা ফুরিয়ে যায় আর বাড়িতে চুপ করে থাকে। দশটা কথা বললে একটা কথার উত্তর দেয়। মাঝে মাঝে বাবাকে ‘ওরে বাব্বা’ মনে হয় কবীরের।

মিনিট দশেক পরে বাবা বই থেকে মুখ না-সরিয়েই বলল, “পরীক্ষা কেমন হচ্ছে?”

কবীর আমতা আমতা করে বলল, “ভালই তো।”

“এর পর তো হায়ার সেকেন্ডারি, তারপর কী করবে ভাবছ?” বাবা বইয়ের আড়াল থেকে প্রশ্ন করল।

“ভাবছি ফাউন্ডেশন দিয়ে সি এ পড়ব।”

“সি এ পড়বে? আমার ইচ্ছে তুমি ল পড়ো।”

“ল?” কবীর থতমত খেয়ে গেল।

“হ্যাঁ, ল। আমাদের ফ্যামিলি ট্রাডিশনটা তুমি ছাড়া আর কে বজায় রাখবে?”

কবীর ঈষৎ প্রতিবাদ করে বলল, “কিন্তু সি এ তে প্রসপেক্ট ভাল। মানে…”

“কোনও মানে নয়। এখন থেকে সমস্ত ডিসিশন কি তুমিই নেবে তা হলে? দিনকে দিন বাঁদর হয়ে উঠছ।” বাবা এবার বইটা রেখে হুংকার দিল।

“আমি বলছিলাম…” কবীর কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু বাবার দিকে তাকিয়ে থেমে গেল। গুলির মতো চোখের দৃষ্টি গায়ে এসে বিঁধছে ওর। বাবা এবার কেটে কেটে জিজ্ঞেস করল, “তুমি খুব লায়েক হয়েছ না? নিজের ভালমন্দ সব বোঝো তুমি? পাখনা গজিয়েছে? টাপুর কে?” শেষ প্রশ্নটায় প্রায় প্যান্ট খুলে যাওয়ার মতো অবস্থা হল কবীরের। ওর মনে হল ওর পেটের মধ্যে একটা জলহস্তী ঢুকে খুব দাপাদাপি শুরু করেছে। বাবার সঙ্গে বসে টিভি পর্যন্ত দেখে না কবীর পাছে কোনও বিজ্ঞাপনে ছেলেমেয়েরা জড়াজড়ি করছে দেখায়। পাছে কোনও সিনেমায় চুমুটুমু দেখিয়ে ফেলে। সেই বাবা ওকে টাপুর সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করছে! কবীর কী বলবে ভেবে না-পেয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। বাবা এবার চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল, “ডোন্ট বি আ মিউট পাপ্পি। আনসার মি, হু ইজ টাপুর?”

“টা… টা… টা…” কথা আটকে গেছে কবীরের।

“শোনো, নারু এসেছিল। বেশ ক’দিন ও তোমায় দেখেছে যে তুমি ওই মেয়েটার পেছনে ঘুরঘুর করছ। এসবের মানে কী? একটা ভদ্র বাড়ির মেয়ের পেছনে তুমি অসভ্যের মতো ঘরছ কেন?” বাবা ভীষণ রেগে গেছে। কবীর কোনও কথা না-বলে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। তবে রাগও হতে লাগল ভীষণ, ব্যাটা ‘গুড় চা’, দাঁড়াও মজা দেখাচ্ছি। চুকলি কাটা হয়েছে? চুকলিখোর।

বাবা এবার সম্পূর্ণ নতুন দিক থেকে আক্রমণ করল, বলল, “তুমি জানো না যে টাপুর হিন্দু। সবাই যদি জানে যে তুমি ওর পেছনে ঘুরছ তবে ফলটা অন্য রকম হবে। তুমি চাও যে তোমার বাবার মাথা লজ্জায় হেঁট হয়? চাও তুমি?” প্রশ্নটা যে উত্তর আশা করছে না কবীর সেটা ভালই জানে। বাবা এবার কঠিন কিন্তু শান্ত গলায় বলল, “আর যেন না-শুনি যে তুমি ওর পেছনে ঘুরঘুর করছ। বুঝেছ? এবার এসো।” বাবা আবার বই তুলে নিল।

সেদিন বাবার ঘর থেকে নিজের ঘরটার দূরত্বটা বিশাল মনে হয়েছিল কবীরের। কিন্তু টাপুরকে ও ভালবাসবে না। হয় নাকি? আর হিন্দু মুসলিম? ধুর ওসব কবীর মানেই না। দু’হাজার পাঁচ সালেও যদি এসব মানতে হয় তা হলে তো হয়েছে। তবে কবীর সেদিন থেকে আরও সতর্ক হয়েছে। আজ তাই ডুডু ওকে টাপুর সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করাতেও কিছু বলেনি। ও কাউকে কিছু বলবে না, যা করার নিজেই করবে।

কিন্তু প্রথমে গুড় চায়ের জন্য বাঁশের ব্যবস্থা করতে হবে। আর এর জন্য শ্রেষ্ঠ বাঁশঝাড়টা হল জ্যাকসন। কবীর ইচ্ছে করেই স্কুলে কিছু বলেনি। আজ পরীক্ষা শেষ হল। বেশ ফ্রি লাগছে কবীরের। আজ সন্ধেবেলা কবীর জ্যাকসনের বাড়ি যাবে। ‘গুড় চা’কে টিট করতে জ্যাকসনকে ওর দরকার। ওর বিটকেল মাথা থেকে নিশ্চয়ই কোনও আইডিয়া বেরোবে। কিন্তু টাপুরের কেসটা বলা যাবে না। অন্য কোনও বাহানা করতে হবে।

কবীরের সাইকেলটা বটতলায় এসে থামল। সামনেই জ্যাকসনদের বাড়ি যাওয়ার রাস্তা। কিন্তু কবীর সাইকেলটা ইচ্ছে করে থামায়নি। বটতলায় বটগাছটার নীচে একটা আড্ডা বসে, সেখান থেকে ওর নাম ধরে কেউ ডেকেছে। জায়গাটা এমন অন্ধকার যে কবীর ঠিক দেখতে পেল না কে ওকে ডাকছে। কিন্তু যে ডেকেছে সে এবার অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এল সামনে। পুরু স্যার! ও, স্যার এখানে আড্ডা মারেন। কবীর একটু সংকুচিত হয়ে গেল মনে মনে। সেদিন জোশের মাথায় স্যারকে থ্যাঙ্কস ট্যাঙ্কস বলে দিয়েছিল। সেদিনের পরে দু’দিন মাত্র প্র্যাকটিস হয়ে পরীক্ষার জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কবীর দু’দিনই ডুব দিয়েছে। পুরু স্যার সেদিনের পর কবীরকে আর সামনে পাননি। আজ নিশ্চয়ই সেই প্রশ্নটাই তুলবেন।

“কবীর, পরীক্ষা কেমন হল?” পুরু সামান্য হেসে জিজ্ঞেস করল।

“ভাল, স্যার।”

“তুমি পরশু থেকে প্র্যাকটিসে আসছ তো। শেষ দু’দিন কিন্তু আসোনি।”

“হ্যাঁ স্যার, আসব।” কবীর নিচু স্বরে বলল। পুরু নিষ্পলক তাকিয়ে থাকল ওর দিকে, খুব অস্বস্তি হচ্ছে কবীরের। পুরু স্যার কী বলবেন বলে ফেললেই তো পারেন। পুরু এবার সত্যিই বলল, “কবীর, আমি তোমার চেয়ে ছ’-সাত বছরের বড় হব। তোমার দাদার মতোই ধরতে পারো আমায়। তুমি আমায় বলবে কোথায় তোমার সমস্যা হচ্ছে?”

কবীর বুঝতে না-পারার ভান করে বলল, “মানে?”

পুরু মুচকি হাসল, বলল, “তুমি এত বোকা নও কবীর। শোনো, যা করবে ভেবেচিন্তে করবে। এমন কিছু করবে না যাতে তোমার নিজের জীবনে সমস্যা হয়। সামনে এইচ এস। পড়াশুনোটা খুব ভাল করে করা দরকার। আর হ্যাঁ সঙ্গে ফুটবলটাও আছে। দ্যাখো, আমি খুব সাধারণ মানুষ, আমার একার কিছু করার ক্ষমতা নেই। তোমরা যদি সাহায্য না-করো পরের ম্যাচটা আমরা জিতব কী করে? দিয়েগো প্র্যাকটিসে গন্ডগোল করছে, তুমি শেষের দু’দিন এলে না। কেউ তো মুখ দেখে তোমাদের জেতাবে না।”

“স্যার, আসলে সব কিছু এত টাফ হয়ে যাচ্ছে যে সামলাতে পারছি না।”

“কেন সামলাতে পারছ না? কী কাজ করতে হয় তোমায়? পড়াশুনো আর খেলা। এতেই সামলাতে পারছ না? নাকি এখানেও কোন থার্ড ডাইমেনশন আছে?”

কবীর থমকাল একটু, স্যার কি সেই সন্ধের কথা বলছেন? পুরু আবার বলল, “শোনো কবীর, জানো তো সমস্যা ভাবলেই সমস্যা। তোমরা ইয়ং, প্রমিসিং, জাস্ট মুভ অন ইন লাইফ। কোনও কিছু করে সেটা নিয়ে রিপেন্ট করে সময় নষ্ট করে লাভ নেই। তার চেয়ে ভুলে যাও। মুভ অন।” কথাটা শেষ করে অর্থপূর্ণ ভাবে হাসল পুরু, “ঠিক আছে তবে, পরশু প্র্যাকটিসে দেখা হচ্ছে কেমন?”

পুরু চলে যাওয়াতে কবীরের ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল যেন। পুরু স্যারকে যত দেখছে তত অবাক হচ্ছে কবীর। স্যার আগে ফুটবলার ছিলেন। মানে স্পোর্টসম্যান। নাহ এই মানুষটার কথা শোনা যায়। এর জন্য অনেক কিছুই করা যায়। আর টাপুরের ব্যাপারে স্যার যা করলেন সেটা তো ফেনোমেনন। স্যারের নম্বর অনেক বেড়ে গেছে কবীরের কাছে।

এখন গিয়ে জ্যাকসনের সঙ্গে দেখা করাটা বাকি। কবীর আবার মুগ্ধতার জামা ছেড়ে বাঁশ দেবার কেটারিংয়ের জামা গায়ে চড়াল। এই বটতলার মোড় থেকে জ্যাকসনদের বাড়ি সাইকেলে তিন-চার মিনিটের পথ। সামনেই নেতাজি সঙঘ ক্লাব, তারপরে একটা মাঠ, সেই মাঠ পার হলেই জ্যাকসনদের বাড়ি।

কিন্তু মাঠটা পার করতে পারল না কবীর। তার আগেই একটা বড় ছাতিম গাছের নীচে চার-পাঁচটা ছেলে আচমকাই ওর সাইকেল দাঁড় করিয়ে দিল। কবীর প্রথমে চমকে গেলেও মুহূর্তে সামলে নিল। রুদ্র অ্যান্ড কোং। “কী মজনু কুমার কী খবর?” রুদ্রর গলায় ব্যঙ্গ আর বিষ লক্ষ করল কবীর। “কী মুখে কথা সরছে না? সাইকেল থেকে নাম, নাম শুয়োরের বাচ্চা।” রুদ্র খশখশে গলায় বলল।

“কী বললি? কী বললি তুই?” কবীর চিৎকার করে লাফ দিয়ে নামল সাইকেল থেকে। সাইকেলটা কাত হয়ে মাটিতে পড়ে গেল।

রুদ্র কবীরের কলার ধরে দাঁত চেপে বলল, “বললাম শুয়োরের বাচ্চা মাগিবাজ। টাপুরের পেছনে লেগেছিস? একদম ভেঙে দেব শালা।” কবীর কলার ছাড়াবার জন্য ধস্তাধস্তি করতে লাগল। পারল না। অন্য ছেলেগুলো ওকে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে গিয়ে ছাতিম গাছের সঙ্গে চেপে ধরল। রুদ্র কবীরের গালে ঠাস করে এক থাপ্পড় মেরে বলল, “সাবধান করে দিলাম, টাপুরের পেছনে ঘুরবি না। না হলে এই বয়েসে ফলসটিথ পরে ঘুরতে হবে।”

কবীর তেজের সঙ্গে বলল, “কেন রে! টাপুর তোর বাপের সম্পত্তি?”

“শুয়োরের বাচ্চা তোমার পুরকি বেড়েছে, না? যা বলছি শোন। লাস্ট ওয়ার্নিং দিলাম তোকে।” এবার তলপেটে একটা মোক্ষম ঘুষি মারল রুদ্র, কবীরের চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে গেল যেন। হাঁটু দুটো হঠাৎ দুর্বল লাগল খুব। ও মাটিতে বসে পড়ল। রুদ্র এবার একটা লাথি মারল কোমরে। কবীর মুখ থুবড়ে পড়ল মাটিতে। অন্য ছেলেগুলো অকথ্য খিস্তির সঙ্গে লাথি মারতে শুরু করেছে ওকে। কবীর উঠতে পারছে না। ওর শরীরটার ওপর দিয়ে যেন হাতি হেঁটে চলে গেছে। ছাতিম গাছ, সামনের মাঠ, তার অন্য দিকের বাড়িগুলো ক্রমশ আবছা হয়ে আসছে চোখের সামনে। হঠাৎ গরম জলের মতো কী যেন ওর গায়ে পড়তে লাগল। ফুলে যাওয়া চোখটা কষ্ট করে খুলে দেখল রুদ্র ওর ওপর দাঁড়িয়ে ওর গায়ে পেচ্ছাপ করছে আর সমানে খিস্তি করে যাচ্ছে। শরীর গুলিয়ে উঠল কবীরের। পেটের মধ্যের সব কিছু ওপর দিকে উঠে আসতে লাগল। ভাবল কেউ কি নেই ওকে বাঁচাবে? পাড়াটা এমনিতেই নির্জন, তা বলে এতটা! প্যান্টের জিপার আটকে রুদ্র ওর জুতোটা কবীরের মুখে রাখল, বলল, “এর পরের বার পেচ্ছাপটা খাওয়াব।”

ছাতিম গাছের নীচে একা পড়ে রইল কবীর। গাছের ডালপালার ফাঁক দিয়ে অর্ধেক চাঁদ দেখা যাচ্ছে। দু’-চারটে তারাও। কবীর ভাবল এত কিছু ও টাপুরের জন্য সহ্য করছে সেটা কি টাপুর কোনও দিনও বুঝবে না? মেয়েরা কি কোনওদিন ছেলেদের বোঝে না? কিন্তু মাথাটা কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে। কিছু চিন্তা করতে পারছে না স্পষ্ট করে। কবীর উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করল। কিন্তু পায়ে জোর পাচ্ছে না একদম। সারা শরীরে ব্যথা। মাথাটা টলে গেল ওর। পড়েই যাচ্ছিল, কিন্তু একটা হাত শক্ত করে ধরল ওকে। ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছে না কবীর। চোখ ফুলে গেছে, চোখ দিয়ে জলও বেরোচ্ছে। সেই জলের আবছা পরদা ভেদ করে এই আধো অন্ধকারে সেই হাতের মালিকের মুখটা দেখল ও। এই সময়ে এখানে ও কী করছে? এই ঘোলাটে মাথাতেও কবীর টান মেরে হাতটা ছাড়িয়ে নিল। কিন্তু ভারসাম্য রাখতে না-পেরে আবার পড়ে গেল মাটিতে। হাতটা এবার শক্ত করে কবীরকে ধরে টেনে তুলল মাটি থেকে। হাতের মালিক বলল, “কী ছেলেমানুষি করছিস কবীর? কী হয়েছে তোর? কে মেরেছে? আমায় বল।” কবীর আবার হাত ছাড়াবার চেষ্টা করল, অস্ফুটে বলল, “বলব না, তোকে বলব না, বিশ্বাসঘাতক।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *