পাতাঝরার মরশুমে – ৬

আজ স্কুল জীবন শেষ হয়ে গেল কবীরদের। মাত্র চার পিরিয়ড ক্লাস হয়েছে। কবীরের মনটা বেশ খারাপ হয়ে আছে। এই হলুদ স্কুল বিল্ডিং, এই পাঁচিল ঘেরা বিশাল কমপাউন্ড, এইসব স্যারেরা, আর কোনওদিন পড়া হবে না এখানে। আর কোনওদিন শুনতে পাবে না সকাল এগারোটায় স্কুলবাড়ির থেকে জেগে ওঠা জাতীয় সংগীত। দেখতে পারবে না পাশের পুকুরের ওপর ঝুঁকে-পড়া খেজুর গাছের ওপর বসে থাকা মাছরাঙা। আসলে সব কিছুরই শেষ আছে জীবনে। শুধু স্মৃতির কোনও শেষ নেই। কবীর স্কুল কম্পাউন্ডের বাইরে এসে একবার ফিরে তাকাল। এই স্কুলে আর পড়তে আসবে না ভাবতে খারাপ লাগছে। কিন্তু কী করা যাবে?

“কী বস স্কুলটা দেখছিস কেন? ছেড়ে চলে যেতে মায়া হচ্ছে? তা হলে টেস্টে গাড্ডু মার। আর এক বছর এই দৃশ্য দেখতে পাবি।” জ্যাকসন হ্যা হ্যা করে হাসতে হাসতে বলল। কবীর মনে মনে ভাবল এটা জন্ম উল্লুক। ও শুধু বলল, “তোকে কদ্দিন বলব যে ‘বস’ বলে ডাকবি না কাউকে। এটা খারাপ কথা।”

“খারাপ কথা? ভাগ! ঢপ মারলেই হল, না? কী খারাপ কথা এটা?” জ্যাকসন তেরিয়া হয়ে বলল।

“বি ও এস এস-এর পুরো কথাটা হল ব্রাদার অব সেক্সি সিস্টার। বুঝলি ছাগল?”

“ওমা তাই নাকি? ও তোর বোন নেই বলে বলতে বারণ করছিস?”

কবীর আর উত্তর দিল না। কারণ ও শুরু করলেই জ্যাকসন হেজিয়ে লাট করে দেবে। তবে একটা ভাল ব্যাপার যে স্কুল শেষ হলেও প্র্যাকটিস পুরো দমে চালু থাকবে। কারণ সামনে সরস্বতী পুজোর আগের দিন রবিন মেমোরিয়ালের সঙ্গে ওদের ফিরতি ফুটবল ম্যাচ। এবার কবীররা এক গোলে হেরেছে। সামনের বার অন্তত দু’গোলের মার্জিন রেখে ওদের জিততে হবে। কারণ হোম অ্যাওয়ে পদ্ধতিতে ম্যাচ তো, দুটো ম্যাচের স্কোরের যোগফলের ভিত্তিতেই জয় পরাজয় ঠিক হবে। দু’গোলের ব্যবধানে জেতা অত সহজ নয়। সহজ হত যদি দিয়েগোটা ঠিকঠাক খেলত। কিন্তু গত ম্যাচে যা নমুনা দেখাল, তাতে একটুও ভরসা পাচ্ছে না কবীর। ও নিজে গোলকিপার। আর যাই হোক সামনের ম্যাচে ওর অন্তত গােল খাওয়া চলবে না। আর তার জন্য চাই জান কবুল প্র্যাকটিস। কবীর একটা ব্যাপার বোঝে যে বরণ সিনহা স্যার খুব চেষ্টা করছেন, কিন্তু ফুটবলটা ওঁর লাইন নয়। উনি পারছেন না। একজন ভাল গেমস স্যার যদি থাকত দারুণ হত।

“আই কবীর, কোথায় যাবি এখন? আজ তো তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে গেল, চল না একবার গ্যাজনখানায় যাই সবাই মিলে।” ডুডু স্কুল গেট থেকে বেরিয়ে এসে বলল। কবীর দেখল ওর পেছনে দিয়েগো দাঁড়িয়ে। দিয়েগোকে দেখিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “দেখ ডুডু, ও থাকলে আমি নেই। ওই নোংরা ছেলেটা যেখানে থাকবে সেখানে তোরা যা, আমি যাব না।”

দিয়েগো এবার মুখ খুলল, “ফালতু কথা বলবি না কবীর। অনেকদিন থেকে এই কথাটা বলছিস। খারাপ দিন কার না আসে? আর ভুলে গেলি আগের ম্যাচগুলো? নমকহারাম।”

“কে নমকহারাম? কবীর আহমেদ না দয়ারাম আংরে? বেশি কথা বলিস না। সেদিন মাঠে কী হয়েছিল সারা বাটানগরের লোক দেখেছে। কাউকে কাটাতে পারছিলি না, না কাটাচ্ছিলি না? আমাকে ধাক্কা মারিসনি?” কবীর প্রায় তেড়ে গেল দিয়েগোর দিকে।

এবার জ্যাকসন ফোড়ন কাটল, “তোর মতো তালকানা গোলকিপার থাকলে দিয়েগো কী করবে?”

“তুই চুপ কর।” কবীর খিঁচিয়ে উঠল।

“মামার বাড়ি না? উনি চিল্লিয়ে পাড়া বেপাড়ার কাক জড়ো করে ফেলবেন আর আমি কথা বলব না? আমার গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ? কী করবি আমি কথা বললে? জানিস আমার পিসেমশাই দারোগা?”

“তোর পিসেমশাই দারোগা আর তোর মাথাটা দা মোটা। বারবার ক্যানালের মতো পিসেমশাই দারোগা বলিস কেন? আর ফুটবলটা কেমন খেলিস আমি দেখিনি? শট মারতে গিয়ে বল না-মেরে মাটি উপড়ে তুলিস। চাষা না ফুটবলার বোঝা মুশকিল।”

“কী বললি! আমি চাষা? আমি চাষা হলে তুই চাষের বলদ।” জ্যাকসন দাঁত মুখ খিঁচিয়ে বলে উঠল।

“চুপ কর তোরা। অনেক হয়েছে। রাস্তায় এভাবে সিন ক্রিয়েট করিস না।” ডুডু চিৎকার করে থামিয়ে দিল ওদের।

কিন্তু কবীর তাও বলল, “দেখ দিয়েগো, একটা কথা কিন্তু আমার কানে এসেছে যে তই নাকি সেদিন ইচ্ছে করে ম্যাচ ছেড়েছিলি। যদি এটা সত্যি হয়, তবে তোর কপালে দুঃখ আছে।” কবীর আর দাঁড়াল না, হনহন করে হাঁটা দিল।

কবীর সব কিছু সহ্য করতে পারে কিন্তু হিউমিলিয়েশন সহ্য করতে পারে না। রাস্তাঘাটে যেখানেই যায় সেখানেই সবাই বলে যে ওরা হেরো। আজ দিয়েগোর সঙ্গে একটা হেস্তনেস্ত করত, কিন্তু জ্যাকসন ব্যাটা এসে সব গুলিয়ে দিল। সত্যি, জ্যাকসন কোন ধাতু দিয়ে গড়া খোদায় জানে। আজ স্কুলের শেষ দিন ছিল, আর গামবাটটা আজও ক্লাসে একটা গন্ডগোল পাকিয়েছে।

ক্লাসটা ছিল হেডস্যারের। স্যার ওদের কমার্সের যে অঙ্ক পেপারটা আছে সেটা নেন। কিন্তু আজ আর পড়াশুনো নয়, স্যার এমনিই গল্প করছিলেন। নিজের জীবনের গল্প, স্কুল জীবনের গল্প, এই স্কুলের গল্প এইসব। বলতে বলতে সবাইকে ভাল করে পড়াশুনো করার কথাও বললেন। বললেন এইচ এস খুব ইমপর্টান্ট পরীক্ষা। সারাজীবনের পড়াশুনো নির্ভর এই রেজাল্টের ওপর। এই কথা বলে গিয়ে দাঁড়ালেন দিয়েগোর সামনে, বললেন, “তুমি ভাল খেলোয়াড়, কিন্তু পরীক্ষায় ভাল লিখে তোমায় লেখোয়ার হয়ে উঠতে হবে।” দিয়েগোর পাশেই বসে ছিল জ্যাকসন। ব্যস যায় কোথায়? ফস করে বলে বসল, “আর স্যার, যারা খুব জানে, সব জানে, প্রচণ্ড জানে তারা কী হবে, জানোয়ার?” স্যার থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন।

ঘটনাটা মজার হলেও কেন জানে না মজা লাগল না ওর। সব কিছুই কেমন পানসে লাগছে আজ। তাই এদিক ওদিক না-গিয়ে বাড়িতে ফিরে বিকেল অবধি চুপচাপ শুয়ে রইল কবীর। ও ঝগড়া করতে চায় না, কিন্তু কী করে জানি হয়ে যায়। বিশেষ করে আজকাল দিয়েগোকে দেখলেই কেমন মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে।

বিছানায় শুয়ে দুপুরটা বড় নিঝুম মনে হল কবীরের। ওদের বাড়ির দোতলায় ওর ঘর। জানলার ধারে ওর খাট। ও শুয়ে শুয়ে দেখছিল লম্বা লম্বা সুপুরি গাছ, দু’-চারটে তালগাছের মাথা আর তার মধ্যে দিয়ে উঁকি মারা পুরনো মন্দিরের চুড়ো। কাঁচা হলুদ রঙের রোদ ছড়িয়ে ছিটিয়ে লেগে আছে এই সব কিছুর গায়ে। বহু দূরে আকাশে কয়েকটা চিল চক্কর মারছে গোল করে। জানলার পাশের বেলগাছের ডাল থেকে একটা কাঠবেড়ালি ওর দিকেই তাকিয়ে আছে যেন। আচ্ছা, আজ এই যে কবীরের মন খারাপ, কাঠবেড়ালিটা কি বুঝতে পারছে? ওর এই প্রায়-আঠারো বছরের দুপুরটা তো কোনওদিন ফিরে আসবে না আর! একসময় তো ও বুড়ো হয়ে যাবে, তখন কি ওর মনে পড়বে এইসব দিনের কথা? এই স্কুল, এই বন্ধুরা আর টাপুরের কথা? তখন কি এসবের আর কোনও গুরুত্ব থাকবে ওর কাছে? একবার ক্লাস নাইনে পড়ার সময় সন্দীপ স্যার বলেছিলেন সমস্ত ঘটনার ছবিই নাকি আলোর মধ্যে থেকে যায়। মানে, যদি ধরে নেওয়া যায় যে অ্যানড্রোমিডা নক্ষত্র থেকে পৃথিবীকে এখন দেখা যাবে, তা হলে নাকি এই ২০০৫ সাল নয়, দেখা যাবে আকবর বাদশার শাসন চলছে। কিন্তু এ-সবই হাইপোথিসিস। সত্যি যদি এমন কিছু দেখার কোনও যন্ত্র থাকত! তা হলে কি কবীর আলোয় জমে থাকা এই সময়টাকে দেখত না আবার? ও কি দেখত না ওর স্কুলকে? ওর বাটানগরকে? ওর বন্ধুদের? ওর কি মন খারাপ হত না টাপুরের ছবি দেখে?

ধড়মড় করে খাটে উঠে বসল কবীর। কীসব আবোল তাবোল চিন্তা করতে করতে ঘুম এসে গিয়েছিল। এর নাম কি ‘ডুডু সিনড্রোম’? একবার ঘড়ি দেখল ও। প্রায় চারটে বাজে। আর ঝিমোলে হবে না। ও উঠে পড়ল। স্কুল থেকে এসে মন খারাপ থাকায় কিছু না-খেয়ে শুয়ে পড়েছিল। এখন পেটবাবাজি জানান দিচ্ছে। মাকে খাবার দিতে বলবে।

বারান্দায় বসে মায়ের দেওয়া নারকোল কোরা আর চিনি দিয়ে মুড়ি খেল কবীর। দারুণ লাগে। এবার গানের ক্লাসে যেতে হবে ওকে। গানের ক্লাস মানে রবীন্দ্রসংগীত শেখার ক্লাস। কবীরের মোটেই গানে তেমন ইন্টারেস্ট নেই। এ হচ্ছে গুঁতো, প্রেমের গুঁতো। যখন গানের ক্লাসে সোমাদি ঠিকমতো সম লাগাতে বলে কবীরের বিষম খাওয়ার জোগাড় হয়। যখন ‘এসেছিলে তবু আসো নাই’ গানটার অন্তরা ধরতে বলেন, ভয়ে ঘামতে ঘামতে কবীরের ইচ্ছে হয় পাশে বসে থাকা অন্তরা বোসকে চেপে ধরে। কবীর মাঝে মাঝে ভাবে, “ও টাপুর! আমায় দিয়ে আর কী কী করাবে? রবি ঠাকুর থাকলে আমার গান শুনে গান লেখাই ছেড়ে দিতেন।” একবার সোমাদি বলেছিল, “কবীর, তুই রবীন্দ্রনাথের গানগুলো ওঁর মতো করে না-গেয়ে আপাচে ইন্ডিয়ানের মতো করে গাইছিস কেন?” কবীর বলতে যাচ্ছিল অন্তত আপাচে ইন্ডিয়ানের মতো তো হচ্ছে। কিন্তু টাপুর ওর দিকে তাকিয়ে আছে দেখে ও আর কিছু বলতে পারেনি। কিন্তু তবু এরকম হেনস্থা মাঝে মধ্যেই হয় কবীরের। আর এই সমস্ত অপমান, মন খারাপ কবীর মনে মনে টাপুরকে উৎসর্গ করে। বলে, “তোমার জন্যই আমি এত কষ্ট সহ্য করি। একমাত্র তোমার কাছাকাছি থাকব বলেই আমি রোজ এখানে অপমানিত হতে আসি।”

টাপুর কবীরের কাছে যে কী সেটা ও ঠিক কাউকে বোঝাতে পারে। আসলে বোঝাবে কী করে, সব কি বোঝানো যায়? প্রথম সমুদ্র দেখলে কেমন লাগে বোঝানো যায়? না বহুদিন প্রচণ্ড গরমের পর শহর আবছা করে যখন বৃষ্টি আসে তখন কেমন লাগে তা বোঝানো যায়! এই না-বোঝানোর ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল সেই সময় যখন কবীর প্রথম টাপুরকে দেখেছিল বাটা রিক্রিয়েশন ক্লাবের একটা ফাংশনে। কবীর সেই অনুষ্ঠানটা দেখতে গিয়েছিল। সেখানে একটা নাচ নেচেছিল টাপুর। “পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে” গানের সঙ্গে ছিল নাচটা। সেই নাচ দেখে কবীরেরই পাগল হওয়ার জোগাড়। সেই যে কবীরের সব গণ্ডগোল হয়ে গেল আর তা ঠিক হয়নি।

সেই নাচের পর খোঁজ শুরু করেছিল কবীর। টাপুর কোথাকার মেয়ে, কোথায় থাকে, কোন স্কুলে পড়ে, সব কিছু জানতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল কবীর। এরকম একটা মেয়ে বাটানগরে থাকে অথচ ওর চোখে পডেনি, কীভাবে সেটা সম্ভব তাই ভাবত কবীর। অবশ্য পড়ার কথাও নয়। কবীরের সারাটা জীবনই ছিল পড়াশুনো আর ফুটবল। ওর বন্ধুরা ওকে ‘ইনঅ্যানিমেট’ বলে খেপাত। কিন্তু সেই নাচ ঘুরিয়ে দিল কবীরের মাথা। জীবনও।

কিছুদিনের ফেলুদাগিরির পর ও জানতে পারল যে টাপুর ভীষণ বড়লোকের মেয়ে। রবিন মেমোরিয়ালে পড়ে, ক্লাস ইলেভেনে। এ ছাড়া ও নাচ শেখে মেঘাদির কাছে আর গান শেখে সোমাদির কাছে। নাচের খবরটার সোর্স হচ্ছে ডুডু। একমাত্র ডুডুকেই ও বলেছিল টাপুরের ব্যাপারে। ডুডু তো শুনেই বলে দিয়েছিল, “তুই এ কী করছিস কবীর? এ পুরো বিষ জিনিস। তুই এমন লাথি খাবি না যে সারাজীবন আর খিদে পাবে না। বাটানগরে আর মেয়ে ছিল না?” কিন্তু যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। কবীর মাছের চোখ ছাড়া আর কিছু দেখছে না। যে-করেই হোক ওকে টাপুরের কাছাকাছি যেতে হবে। উপায়? হয় নাচ নয় গান। নাচ শেখার রিস্কটা আর কবীর নেয়নি। ওটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। তার চেয়ে গান ভাল।

সোমাদি তো প্রথমে নেবেই না, বলল, “তুই যে-ব্যাচে ভরতি হতে চাইছিস সেখানে সবাই বেশ ভাল গায় আর তুই সবে শুরু করবি। এ হয়?” হয় মানে? হয়ে আছে। কবীর অনেক বুঝিয়ে না-পেরে স্ট্রেট সোমাদির পায়ে পড়ে গিয়েছিল। এক সপ্তাহ ধরে রোজ সোমাদির কাছে যেত ও। শেষ অবধি ফল মিলল। সোমাদি কবীরকে নিল ওই ব্যাচেই। শর্ত হল সবার ফাঁকে ফাঁকে সোমাদি কবীরকে একটু একটু শেখাবে। কবীর প্রায় বলেই ফেলেছিল যে না-শেখালেও চলবে, কারণ গান শিখতে কে চায়?

কিন্তু এত সাধনার ফল কী হল? না, লবডঙ্কা। ও কত চেষ্টা করে টাপুরের সঙ্গে কথা বলার, কিন্তু টাপুর পাত্তাই দেয় না। প্রথম দিন কথা বলতে গেলে টাপুর কবীরকে জিজ্ঞেস করেছিল, “তুমি কবীর? তা তুমি কবীরের দোঁহা জানো?” দোঁহা শুনে হাঁ করে তাকিয়েছিল কবীর। টাপুর মুচকি হেসে চলে গিয়েছিল। অনেক খুঁজে পেতে সন্ত কবীরের দোঁহার বই জোগাড় করেছিল কবীর। মুখস্থও করেছিল বেশ কিছু। কিন্তু তারপর একদিন দোঁহা শোনাতে গেলে টাপুর জিজ্ঞেস করেছিল, “কবীর সুমনের গান জানো তুমি? ওই যে ‘সারারাত জ্বলেছে নিবিড়’ গানটা?” জ্বালালে দেখছি। কে সারারাত জ্বলেছে তাতে ওর কী? ও যে জ্বলছে সেটার খবর কেউ রাখে। কিন্তু কী করবে, টাপুর বলেছে, খুব খুঁজে ক্যাসেটটা জোগাড় করল। গানটাও মোটামটি তোলার চেষ্টা করল। একদিন শোনাতে যাবে দেখল টাপুর তো শুনছেই না, উলটে প্রশ্ন করল, “বলো তো কবীর বেদী জেমস বন্ডের কোন সিনেমায় অ্যাকটিং করেছে?”

ডুডু সত্যি কথাই বলেছে, এ সাংঘাতিক জিনিস। কবীর বুঝল একে ইমপ্রেস করা অসম্ভব। পৃথিবীর যাবতীয় কবীরের ঠিকুজি নিয়ে এ-মেয়ে বসে আছে। তাই আর ভ্যানতারা করে সময় নষ্ট না করে সোজাসুজি টাপুরকে প্রোপোজই করে ফেলল একদিন। সেদিন সোজাসুজি টাপুরকে কবীর বলেছিল যে ওর টাপুরকে খুব ভাল লাগে। ওকে ছাড়া কবীর আর কিছু চিন্তা করতে পারে না। কবীরের রাত্রের ঘুমটুম সব নষ্ট হচ্ছে এইজন্য। এখন কবীর চায় যে টাপুরও ওকে পছন্দ করুক। কথাটা শুনে টাপুর অদ্ভুতভাবে হেসেছিল যার একটাই মানে হয়— কুঁজোর চিত হয়ে শোয়ার ইচ্ছে হয়েছে, আর একটা মানে হয় যে ও ভেবে দেখতেই পারে। কিন্তু এর কোনটা ঠিক? টাপুরকে সেটা জিজ্ঞেস করার আগেই টাপুর প্রশ্ন করেছিল, “তুমি হঠাৎ আমায় প্রোপোজ করলে কেন? যাক গে, ওসব হয়েই থাকে, বাদ দাও। আচ্ছা বলো তো সঞ্জীবকুমারের কোন সিনেমায় নাম হয়েছিল কবীর?”

কবীর হাল ছাড়েনি। এই তো সেদিনও টাপুরের বাড়ির কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল ও। সোমাদির কাছে গানের খাতা ফেলে এসেছিল টাপুর। কবীর ওটা নিয়ে এসেছিল। পরদিন খাতাটাই ফেরত দিতে গিয়েছিল। খুব গোপনে টাপুরের যে আদরের নামটা ও দিয়েছে, সেই ‘রেন ড্রপ’ নামে ডেকেওছিল টাপুরকে। টাপুর যেন শুনতেই পায়নি এমন ভান করেছিল। খুব অবহেলায় মরা নেংটি ইঁদুর ধরার মতো দু’আঙুলে বইটা ধরে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল। কেন জানি না ভীষণ অন্যমনস্ক দেখাচ্ছিল টাপুরকে। কবীরকে ধন্যবাদ তো দূরে থাক, এমনি কোনও কথাও বলেনি। গোটা ব্যাপারটাই কেমন উচ্ছে সেদ্ধর মতো হয়ে গিয়েছিল কবীরের কাছে।

কবীর আবার বর্তমানে ফিরে এল। সোমাদির ক্লাসের সময় হয়ে এল প্রায়। ও তাড়াতাড়ি সাইকেল বের করল। টাপুরের সামনে সোমাদি ওকে লেট নিয়ে কিছু বলুক ও চায় না।

সোমাদির গানের ক্লাস চ্যাটার্জি পাড়ায়। ওদের বাড়ি থেকে যেতে একটু সময় লাগে। সাইকেল নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে এল কবীর। কিন্তু সাইকেলে উঠেও যেতে পারল না। ওর কাবাবে মূর্তিমান হাড্ডির মতো হাজির হল নারুকাকা। নারুকাকা হল কবীরদের বাড়ির কন্সট্যান্ট ফ্যাক্টর। নারুকাকা কোনও চাকরিবাকরি করে না। ওর বাবা একটা হাওয়াই চটির ফিতে তৈরির ফ্যাক্টরি করে দিয়েছিলেন, নারুকাকা এখন সেটাই দেখাশুনো করে। দেখে অবশ্য নামেই। কারণ নারুকাকার কাজই হল সবার সব ব্যাপারে নিজের ছোট্ট বড়ির মতো নাকটা গলিয়ে দেওয়া। সারাদিন ঘুরে ঘুরে কোথায় ঝামেলা হচ্ছে, কোন বুড়োবুড়িকে তাদের ছেলেমেয়েরা বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে, কোন মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না, নারুকাকা এসব খুঁজে বেড়ায়। আর কবীরের বাবা যেহেতু উকিল, নারুকাকা ওর কাছে হয় কি নয় ছুটে আসে লিগাল অ্যাডভাইস নিতে। এখনও নিশ্চয়ই সেরকম কোনও কেস।

নারুকাকার ‘কয়লার সঙ্গে কেস চলছে’ টাইপের কালো মুখটা দেখে কবীরের মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। কবীরকে দেখেই নারুকাকা বলল, “এই যে সন্ত কবীর! কী খবর?” এই সন্ত কবীর নামে কেউ ওকে ডাকলেই কবীরের মাথা গরম হয়ে যায়। এখনও গরম মাথাটা আরও তেতে গেল ওর। কিন্তু অতি কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে ও বলল, “কী ব্যাপার নারুকাকা?”

“আর বলিস না, এক ঝামেলায় পড়েছি। আমাদের পাশের বাড়ির ছেলেটা একটা কাণ্ড করেছে। একটা বাচ্চামতো মেয়েকে বিয়ে করে নিয়ে এসেছে। গতকাল রাতের ঘটনা এটা। মেয়ের বাপ তো খুঁজে পেতে আজ দুপুরে এসে হাজির। সঙ্গে একগাদা পুলিশ আর লোকজন। ছেলেটাকে ধরে নিয়ে যাবে। কী? না, মেয়ের নাকি আঠারো বছর হয়নি এখনও। এদিকে মেয়েটা বেঁকে বসেছে, বলছে ওর আঠারো হয়ে গেছে। আরে গন্ডগোলটা করেছে কোথায় জানিস? মেয়েটা মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ডটা বাড়িতে ফেলে এসেছে। ওটাই তো এজ প্রুফ।”

কবীর ভাবল ওকে এসব বলছে কেন? ওদিকে সোমাদির গানের ক্লাস শুরু হয়ে গেছে বোধহয়। নারুকাকা আবার জিজ্ঞেস করল, “হ্যারে কালামদা আছেন?” কালামদা মানে কবীরের বাবা। খুব নামকরা উকিল। কিন্তু বাবা তো বিকেলে বাড়িতে থাকে না। সেটা তো নারুকাকার জানাও উচিত। কবীর সেটাই বলল। সব শুনে নারুকাকা বলল, “ও, তাই তো, ভুলেই গেছি। ঠিক আছে বউদির সঙ্গেই দেখা করে যাই।” কবীর ভাবল মা আবার কবে থেকে উকিল হল? আসলে বিকেলের চা-কেস আছে। যাক গে, কবীর আবার সাইকেলে উঠেছে আর নারুকাকাও বাড়ির ভেতরে ঢুকবে, এমন সময় ঘটনাটা ঘটল।

রাস্তা দিয়ে একদল ইয়াং ছেলে যাচ্ছিল, ওরা নারুকাকাকে দেখে হঠাৎ চিৎকার করে উঠল, “গুড় চা, অ্যাই গুড় চা।” ব্যস কুরুক্ষেত্র! নারুকাকা নিমেষের মধ্যে ঘুরে দাঁড়াল আর তারপরই অকথ্য গালাগাল শুরু করল। পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীর বাচ্চাদের সঙ্গে পটাপট ছেলেগুলোকে মিলিয়ে দিতে শুরু করল। নিমেষে মজা দেখার ভিড় জমে গেল চারপাশে।

নারুকাকার এই এক সমস্যা। কেউ ওকে ‘গুড় চা’ বলে ডাকলেই ও খেপে যায়। কেন যায় সেটা কেউ জানে না। কিন্তু ‘গুড় চা’ শুনলেই নারুকাকা সম্পূর্ণ উন্মাদ হয়ে ওঠে। অবশ্য কবীররাও ওকে কম খেপায়নি এ নিয়ে।

নারুকাকা মান্না দে-র গানের অন্ধ ভক্ত। মান্না দে-র গান শোনাব বলে নারুকাকাকে দিয়ে অনেক কাজ করিয়ে নেওয়া যায়। একবার কবীর, ডুডু, জ্যাকসন আর দিয়েগো একটা মান্না দে-র গানের ক্যাসেট নিয়ে গিয়েছিল নারুকাকার বাড়িতে। ক্যাসেটটা অরিজিনাল নয়, অন্য ক্যাসেট থেকে রেকর্ড করা। কিন্তু তাতে একটু কারসাজি করেছিল কবীররা। আর কারসাজিটা করেছিল শেষ গানে। গানটা সেই বিখ্যাত ‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা’। মান্না দে-র গানের ক্যাসেট দেখে তো নারুকাকা আহ্লাদে আঠাশ টুকরো। সবাই টেপ রেকর্ডার ঘিরে বসার পর তো গান শুরু হল। এক-একটা গান হচ্ছে আর নারুকাকাও ডিসকাউন্ট রেটে আহা উহু করে যাচ্ছে। একসময় শুরু হল শেষ গানটা। “এটা আমার প্রিয় গান” বলে নড়েচড়ে বসল নারুকাকা। গানটা বাজতে লাগল—“কফি হাউসের সেই ‘গুড় চা’… কোথায় হারাল সেই ‘গুড় চা…” নিখিলেশ প্যারিসে, মইদুল ‘গুড় চা’… সুজাতাই আজ শুধু ‘গুড় চা’… এভাবে গানটা বেজে চলল। কবীররাই জায়গামতো কথাটা ঢুকিয়েছে। কবীর আড়চোখে দেখল নারুকাকার মুখ লাল, চোয়াল শক্ত, মাথার চুলগুলো প্রায় খাড়া হয়ে গেছে। কিন্তু কিছু করতেও পারছে না। টেপ রেকর্ডারটা যে ভেঙে ফেলবে, সেটাও সম্ভব নয় কারণ সেটা নিজের। শেষে আর থাকতে না-পেরে বলেই ফেলল, “শেষ পর্যন্ত মান্না দে-ও বলছেন? তা হলে আর কী করা যাবে?”

এখন এই বিকেলে নারুকাকাকে থামাতে যথেষ্ট বেগ পেতে হল কবীরকে। চিৎকার চেঁচামেচিতে কবীরের মা-ও নেমে এসেছে নীচে। দু’জনে মিলে ওরা কোনওমতে থামাল নারুকাকাকে। কিন্তু নারুকাকা আর বাড়ির ভেতরে গেল না। রইল পড়ে বিয়ের ঝামেলা। নারুকাকা হনহন করে স্টেশনের দিকে হাঁটা দিল। কবীর ঘড়ি দেখল। ওফ প্রচুর লেট হয়ে গেছে। সোমাদির ক্লাস প্রায় হাফ হয়ে গেছে। কবীর আর কোনও দিকে না-তাকিয়ে পড়ি কি মরি করে সাইকেল ছোটাল।

সোমাদির বাড়িটা আজ বড় চুপচাপ লাগল কবীরের। কী ব্যাপার? দরজার কাছে খুলে রাখা কোনও জুতো তো নেই। ক্লাস শেষ হয়ে গেল নাকি? কবীর কলিং বেল টিপল। সোমাদি নিজেই বেরিয়ে এল, বলল, “ও কবীর তুই? আজ বেশিক্ষণ ক্লাস নিতে পারিনি রে। মায়ের শরীরটা খারাপ হয়েছে হঠাৎ, একবার ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব, তাই তাড়াতাড়ি ছুটি দিয়ে দিয়েছি। পরের দিনও ক্লাস নিতে পারব না বুঝলি? ও ভাল কথা! এই গানের খাতাটা টাপুরকে দিয়ে দিস তো। আজও খাতাটা ফেলে গেছে। কী যে হয়েছে মেয়েটার! গানেও মন নেই একদম।” সোমাদি গানের খাতাটা কবীরের হাতে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।

কবীরের মনে হল ফার্স্ট প্রাইজ পেয়েছে ও। আজও টাপুরের খাতা? আচ্ছা, টাপুর ইচ্ছে করে খাতাটা ফেলে যাচ্ছে না তো যাতে কবীর ওকে বারবার খাতাটা ফেরত দিতে পারে? মনের মধ্যে পপকর্ন ফুটতে লাগল কবীরের। ও দ্রুত প্যাডেলে চাপ দিল। টাপুরের বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াবে আজও। আজ নিশ্চয়ই টাপুর ওকে অবজ্ঞা করবে না। হঠাৎ কী মনে হওয়াতে রাস্তার পাশে সাইকেলটা থামাল কবীর। গতদিন খাতাটা খুলে দেখেনি ও। আজ খুব ইচ্ছে করছে। দেখবে একবার? একবার দেখলে কী হয়েছে? কেউ তো আর জানতে পারছে না। খাতাটা খুব যত্ন করে খুলল কবীর। ওর ‘রেন ড্রপ’-এর খাতা। নাকের কাছে নিয়ে একবার গন্ধ শুঁকল। অদ্ভুত সুন্দর একটা গন্ধ পেল ও। পাতায় পাতায় নানান গান লেখা। কী সুন্দর টাপুরের হাতের লেখা! দেখি তো শেষ পাতাটা। কারণ খাতার শেষ পাতাতে হিজিবিজি লেখার মধ্যে অনেক গোপন কিছু লিখে রাখে মানুষ। শেষ পাতাটা খুলল কবীর। রাস্তার আলোয় কবীর দেখল শেষ পাতার লেখাটা। সাদা পৃষ্ঠার ওপর লাল কালি দিয়ে আঁকা একটা পানপাতা আর তার মধ্যে মোটা করে লাল কালি দিয়ে লেখা ‘পুরু!’ হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেল ওর। পুরু? এর মানে কী? পুরুর সঙ্গে টাপুরের যোগ কোথায়? মাথাটা ঘুরতে লাগল কবীরের। ওর চোখের সামনে বাটানগর ঢেউ-লাগা নৌকার মতো অল্প অল্প দুলতে লাগল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *