পাতাঝরার মরশুমে – ৩

মাঝে মাঝে জ্যাকসনের খুব মনখারাপ হয়। ওর কপালটাই জঞ্জালের গোডাউন। কেউ ওকে সিরিয়াসলি নেয়ই না। আসলে সবাই ওর কথার ভুল মানে ধরে। কিন্তু জ্যাকসন নিজে জানে যে কথাগুলো ও সাদা মনেই বলে। কিন্তু কী যে হয়, কথার মানেগুলো সব ইন সুইং, আউট সুইং হয়ে যায়। ও বলে এক, লোকে বোঝে আরেক। আর সত্যি বলতে কী মাঝে মাঝে একটু উলটোপালটা বলেও যে ফেলে না তা নয়। কী করে জানি মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায় সব। ভাবে জলের জন্য তো ফিল্টার পাওয়া যায়, মুখের কথার জন্য পাওয়া যায় না।

ক্লাস টেনেই তো একবার ঝামেলা হয়েছিল। হেডস্যার ক্লাস নিতে এসেছেন। ফিজিকাল সায়েন্স ক্লাস। স্যার মুখে বলতে বলতে বোর্ডে লিখলেন— বস্তু দুই প্রকার। এক পদার্থ, দুই… কীভাবে জানি জ্যাকসনের মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, “অপদার্থ।” বলেই বুঝল সর্বনাশ করেছে। হেডস্যার পিছন ফিরেছিলেন, তিনি বুঝতেনই না কে কথাটা বলেছে। কিন্তু ওই— কপাল খারাপ। জ্যাকসনের গলার স্বর অবিকল সচিন তেন্ডুলকরের মতো সরু। স্কুলের সবাই সেটা জানে। হেডস্যার গটগট করে গিয়ে থামলেন ওর সামনে। কান ধরে বললেন, “কে অপদার্থ? দাঁড়া তোর হচ্ছে।” বলে চড়ও তুললেন। কিন্তু আবার বিপত্তি। জ্যাকসনের আবার মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল, “স্যার আমার পিসেমশাই কিন্তু দারোগা।”

“মানে?” হেডস্যারের চড় মাঝ পথে আটকে গেল, “দারোগা, তো আমায় বলছিস কেন?”

জ্যাকসন ম্যানেজ করার চেষ্টা করল, “জাস্ট এমনি স্যার, এমনি, ফর ইয়োর ইনফরমেশন। দরকার হলে বলবেন, দু’নম্বরি কেসে ফেঁসে গেলে ম্যানেজ করে দেব।”

স্যার কান ছেড়ে দিলেন। বলে কী ছেলেটা? দু’ নম্বরি কেস? ম্যানেজ? ব্যস গার্ডিয়ান কল। জ্যাকসন নিজেও জানে না কেন এমন কথা ও বলেছিল। ওর ভেতরে কি অন্য কেউ ঢুকে বসে আছে?

তবে এসব মাঝে মাঝেই জ্যাকসনের সঙ্গে হয়। এই তো গত জানুয়ারিতেই নন্দনকুসুম স্যারের সঙ্গেই একটা ঝামেলা হয়ে গেল।

ওদের ইকো-জিও নেন নন্দনকুসুম রায়। খুব ভাল টিচার, শুধু একটাই গন্ডগোল, সুযোগ পেলেই উনি লন্ডনের গল্প করতে শুরু করেন। ওঁর দাদা লন্ডনে থাকেন। আর ওঁর বউদি ব্রিটিশ মহিলা। নন্দনকুসুম স্যার একবার লন্ডনে গিয়েছিলেন। আর সেটাতেই বিপত্তি। সেই যাওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে উনি এখন ছাত্রদের কানের পোকা বের করে দেন এই বলে যে— টেমস কত বড় নদী, লন্ডন ব্রিজ কেমন, শেক্সপিয়ারের বাড়িতে উঠোন আছে কিনা, বেকার স্ট্রিটে শার্লক হোমস বাড়ি বলে কিছু নাকি নেই। আরও সব সাতসতেরো, হাবিজাবি। স্কুলে তাই ওঁর নামই হয়ে গেছে লন্ডনকুসুম।

এরকমই একদিন স্যার লন্ডনের গল্প শুরু করেছেন। সেই এক ভ্যানতারা। অনেকক্ষণ বকেটকে শেষে জিজ্ঞেস করলেন, “লন্ডন সম্বন্ধে আর কিছু জানার আছে তোমাদের?” ব্যস, জ্যাকসন হাত তুলল বা বলা যায় রিফ্লেকস অ্যাকশনে হাতটা উঠে গেল ওর। তারপর মুখ কাঁচুমাচু করে জিজ্ঞেস করল, “স্যার, ওখানে শুনেছি বিকিনি খুব সস্তা, সত্যি?”

“কী কিনি?” স্যার প্রথমে বুঝতেই পারেননি। স্বাভাবিক। ওঁর মাথাতেই আসেনি কেউ এরকম প্রশ্ন করতে পারে।

জ্যাকসন এবার বিস্তারিত করল, “ওই যে স্যর বিকিনি। ছোট ছোট। স্যান্ডো গেঞ্জিকে কেটে ফেললে যেমন হয় সেরকম জামা, তিনকোনা ছোট প্যান্টের মতো লেংটি। ওই যেগুলো পরে ‘এফ’ টিভিতে রোগা মেয়েরা ল্যাগব্যাগ করে হাঁটে। সেগুলো কি খুব সস্তা?” লন্ডনকুসুমের মুখ নিমেষে ডিমের কুসুমের মতো হয়ে গেল। পরিণতি গার্ডিয়ান কল।

কবীর মাঝে মাঝে ওকে জিজ্ঞেস করে, “হ্যাঁরে জ্যাকসন তোর মুখে কী আছে বল তো? সবসময় এরকম আরবিট প্রশ্ন করিস?” জ্যাকসন কী বলবে ও নিজেই কি জানে নাকি?

জ্যাকসন একটু মনমরা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। এন এস মাঠ এখনও দর্শকে ভরেনি। আজ শনিবার। বাটা কোম্পানির ছুটি। খেলা শুরু হবে বিকেল তিনটের সময়ে। তার মিনিট দশেক আগেই মাঠ দর্শকে ভরে যাবে। প্রতিবারই তাই হয়। এটা নঙ্গী হাই স্কুলের নিজের মাঠ। খেলাটা হয় হোম-অ্যাওয়ে পদ্ধতিতে। মাঠের ধারে একটু দূরত্ব রেখে চারিদিকে বাঁশের ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছে। এই ম্যাচটায় এত ভিড় হয় আর এত টেনশন থাকে যে এসব ব্যবস্থা নিতেই হয়। আসলে এই ম্যাচটা একটা প্রেস্টিজ ম্যাচ। মোটামুটিভাবে পশ্চিম বাটানগর রবিন মেমোরিয়ালের সাপোর্টার আর পূর্ব বাটানগর নঙ্গী হাই-য়ের। এ-ম্যাচটা হল বাটানগরের মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গল ম্যাচ।

জ্যাকসন ওদের স্কুলের শামিয়ানার নীচে গিয়ে বসল। টিম এখন ড্রেস করছে। জ্যাকসনের ড্রেস করা হয়ে গেছে। তবে ও জানে ওকে স্যার ফার্স্ট ইলেভেনে নামাবেন না। ওর চিরজীবন এক্সট্রার কপাল। এমনিতেই এখন গেমস টিচার নেই। বরণ সিনহা স্যার ওদের ইংরাজি পড়ান। উনি আপাতত খেলাটা দেখছেন। আর উনি জ্যাকসনকে প্লেয়ার হিসেবেই ধরেনই না। বলেন “ওটা তো জোকার।” খুব রাগ হয় জ্যাকসনের। মনে মনে ভাবে এই জোকারই একদিন ওভার ট্রাম্প করবে।

মাঠে আস্তে আস্তে লোক বাড়ছে এবার। স্কুলের ছেলেরা তো আছেই। রবিন মেমোরিয়াল কো-এড স্কুল, ওদের মেয়েরাও খেলা দেখতে আসে। নঙ্গী হাই বয়েজ স্কুল। এখানকার ছেলেরা মেয়েদের কাছাকাছি বিশেষ আসতে পারে না। তাই সেদিক থেকেও ম্যাচটা গুরুত্বপূর্ণ। নঙ্গী হাই-এর ছেলেদের খরার জীবনে রবিন মেমোরিয়ালের মেয়েরা একটু মনসুন আর কী। আর হবে নাই বা কেন! রবিন মেমোরিয়ালের মেয়েরা দুর্লভ জিনিস। ওদের জামাকাপড় দেখলেই মাথা ঘুরে যাওয়ার জোগাড় হয়। কেউ জিনস্ পরে, কেউ বা আবার শর্ট স্কার্ট, আবার কারও গায়ে বিপজ্জনক গেঞ্জি। কারও বুকের কাছে লেখা— ‘বুকার প্রাইজ’! কারও পিঠে লেখা— ‘হিল অন দ্য আদার সাইড’। এসবের কী অর্থ কে জানে! কত রকমের পোশাক, কত রকমের কায়দা। কাঙাল যেভাবে শাকের খেতের দিকে তাকিয়ে থাকে, সেভাবেই নঙ্গী হাই-এর ছেলেরা হাঁ করে ওদের দেখে। জ্যাকসনও তাই করে। কী করবে? ওকে তো আর খেলায় নামাবে না। অবশ্য খেলা দেখেই বা কী হবে? দিয়োগের সঙ্গে তো কথা হয়েই গেছে।

জ্যাকসনের চিন্তায় বাধা পড়ল। কে যেন পিঠে হাত রাখল। জ্যাকসন বলল, “কে বে?” ঘুরেই দেখে বরণ স্যার। ‘বে’ শব্দটা স্যারের মোটেই পছন্দ হয়নি। উনি দাঁত কিড়মিড় করে প্রশ্ন করলেন, “বে মানে? বে মানে কী?” উফ এই জিভটাই যত নষ্টের গোড়া। আবার কেলো করে ফেলেছে! ও সামলাতে গিয়ে বলল, “স্যার ওটায় প্রিন্টিং মিসটেক আছে।”

“প্রিন্টিং মিসটেক?” স্যার থতমত খেয়ে রাগটা বজায় রাখবেন কিনা বুঝতে পারলেন না।

“মানে স্যার-ব-য়ের তলায় ফুটকিটা পড়েনি। ওটা ‘বে’ না ‘রে’ হবে।”

স্যার অনেক কষ্টে রাগটা গিললেন, “ছাগল। কবীরের গ্লাভস্‌টা কোথায় রেখেছিস?” কবীর নঙ্গী হাই-এর গোলকিপার। জ্যাকসন দূরে রাখা একটা লাল ব্যাগ দেখিয়ে বলল, “ওর মধ্যে আছে স্যার।” স্যার ওর আগাপাস্তলা মেপে গজগজ করতে করতে চলে গেলেন।

স্যার লাল ব্যাগের কাছে গিয়ে ব্যাগ থেকে গ্লাভস্‌টা বের করছেন হঠাৎ জ্যাকসন দেখল যে দিয়েগো স্যারের কাছে গিয়ে কিছু বলছে। মাঠের চিৎকারে দিয়েগো কী বলছে সেটা জ্যাকসন বুঝতে পারল না। কিন্তু জ্যাকসন বুঝল যে দিয়েগো এমন কিছু বলেছে যাতে স্যার উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। হট্টগোল ছাপিয়ে জ্যাকসন শুনল স্যার বলছেন, “কোনও কথা শুনব না। নামো এক্ষুনি।” ও দেখল দিয়েগো মাথা গোঁজ করে চলে গেল ওদের টেন্টে।

মাঠ এখন কানায় কানায় ভরতি। প্লেয়ারেরা নামছে। জ্যাকসন মাঠের ধারে অন্য স্যার আর প্লেয়ারদের সঙ্গে গিয়ে বসল। রবিন মেমোরিয়ালের মেয়েদের জন্য জ্যাকসনের দুঃখ হতে লাগল— কাঁদবি, আজ খুব কাঁদবি তোরা।

ঠিক সময়ে খেলা শুরু হয়ে গেল। সাদা কালো জার্সি পরে নঙ্গী স্কুল পূর্ব প্রান্তে আর নীল জার্সি পরে রবিন মেমোরিয়াল পশ্চিম প্রান্তে প্লেয়ার সাজিয়েছে। প্রথম দশ-পনেরো মিনিট ঢিমেতালে খেলা চলল। দুটো দলই নিজেদের মধ্যে বল দেওয়া নেওয়া করে খেলছে! কেউই বিশেষ রিস্ক নিচ্ছে না। দু’পক্ষই একটু বুঝে, বিপক্ষকে একটু মেপে নিতে চাইছে। জ্যাকসন জানে মিনিট কুড়ির পর থেকে দিয়েগো খেলাটা ধরে। ও মনে মনে হিসেব করল আর পাঁচ মিনিট তারপরই রবিন মেমোরিয়ালের প্যাথোজ শুরু হবে।

ঠিক বাইশ মিনিটের মাথায় সেন্টার সার্কেলের কাছে বলটা ধরল আমন। একজনকে কাটিয়ে ও বলটা পাস দিল ডান দিক দিয়ে ওভারল্যাপে যাওয়া ওদের স্কুলের সুমনকে। সুমন ওয়ান টাচে বলটা ফরোয়ার্ড পাস করল ডুডুকে। ডুডু ছোট্ট করে কাটিয়ে নিল আরও একজনকে তারপর বলটা লব করে দিল দিয়েগোর পায়ে। ওর সামনে একজন ডিফেন্ডার আর তারপরেই গোলকিপার। জ্যাকসন সাইডলাইন থেকে উঠে দাঁড়াল। গোল নিশ্চিত। দিয়েগোর কাছে এসব দুধভাত। কিন্তু দিয়েগো বলটা ধরে ডিফেন্ডারটাকে কাটাবার কোনও চেষ্টা না-করে আচমকা গোলে শট নিল। গোওও বলে প্রায় চিৎকার করে উঠেছিল জ্যাকসন। কিন্তু অবাক হয়ে দেখল বলটা বারের দশ হাত উপর দিয়ে বেরিয়ে গেল। এ কী করল দিয়েগো? এ যে দু’বছরের ছেলেও গোল দেবে। মনখারাপ হয়ে গেল জ্যাকসনের। তারপর ভাবল হয়তো ভুল হয়ে গেছে দিয়েগোর। আর নিশ্চয়ই হবে না। স্যারকে বলল, “দেখলেন স্যার, দিয়েগোটা এমন গোল মিস করল যেটা আমি চোখ বন্ধ করে দেব।”

এমনিতেই গোল মিস তার ওপর জ্যাকসনের কথা শুনে খেপে গেলেন স্যার, বললেন, “চুপ কর ছাগল। চোখ বন্ধ করে গোল দেবে? চোখ খুলেই কিছু করতে পারে না! দিয়েগোই গোল দেবে, ভাল করে খেলা দেখ।” কিন্তু কোথায় কী? তিরিশ মিনিট কেটে গেল, চল্লিশ মিনিট কেটে গেল। গোল কই? বারবার একইরকম ভুল করছে দিয়েগো। আজ কী হয়েছে ওর? একবারও একজনকে কাটাতে পারছে না! ভুল পাস দিচ্ছে অনবরত। এমনভাবে বল রিসিভ করছে যে অপনেন্ট বল নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। দিয়েগোর সেই বিখ্যাত দৌড়টাই বা কই? কী হল আজ ছেলেটার? ফুটবলের বেসিকটাই ভুলে গেল নাকি? দেখতে দেখতে রেফারি বাঁশি বাজিয়ে দিল হাফ টাইমের।

দিয়েগো মাঠ থেকে বেরোতেই জ্যাকসন গিয়ে ওকে ধরল, “কী করছিসটা কী? ফুটবলটা ভুলে গেলি নাকি?” দিয়েগো চুপ করে রইল। মাঠে বসে পড়ে গ্লাসে করে একটু একটু জল খেতে লাগল। জ্যাকসন আবার খোঁচাল, “কী কাকা, ডুবিয়ে দিচ্ছ? দেখ তো ওদের মেয়েগুলো কেমন হ্যা হ্যা করছে। রবিন মেমোরিয়ালের ছেলেরা মেয়েদের পাশে বসে পড়াশুনো করবে, আবার ফুটবলেও জিতে যাবে, তা হয়? তুই বল, ভগবান বলে কিছু নেই? অ্যাই দিয়েগো।”

দিয়েগো মাথা নিচু করে বলল, “চেষ্টা তো করছি। কিন্তু আজ কেমন সব গন্ডগোল হচ্ছে।” দিয়েগোর মুখটা দেখে জ্যাকসন বুঝল হাওয়া খারাপ। ও গিয়ে ধরল বরণ স্যারকে, “স্যার, একটু দিয়েগোর কাছে এসে ওকে একটু টনিক দিয়ে দিন তো।”

“টনিক?” স্যার অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন।

“ওই যে স্যার পি কে দেন না কী সব লোকাল না ইন্টারন্যাশনাল টনিক, একটু দিয়ে দিন না।”

“ছাগল, ওটা ভোকাল টনিক!” স্যার খিঁচিয়ে উঠলেন। এমনিতেই টিম খারাপ খেলছে তার ওপর জ্যাকসন! কিন্তু জ্যাকসনও নাছোড়বান্দা, “যাই হোক স্যার, ওই টনিকটাই দিয়ে দিন না দিয়েগোকে। ও কেমন নেতিয়ে পড়েছে।”

স্যার আরও রেগে গেলেন, “দাঁড়া তোকে টনিক দেবার সময় হয়েছে।”

আসলে দিয়েগোকে যে কিছু বলার নেই সেটা জ্যাকসন জানে। তবু শেষ চেষ্টা করল, “গুরু একটু দেখো, উতরে দাও।” জ্যাকসন দেখল মাঠে নামার আগে আবার স্যারকে কিছু বলল দিয়েগো কিন্তু স্যার আবার মাথা নেড়ে চলে গেলেন। একটু যেন বেদম হয়েই মাঠে নামল দিয়েগো। জ্যাকসন ভাবল, আচ্ছা দিয়েগোর কি আজ খেলার ইচ্ছে নেই?

সেকেন্ড হাফের শুরুটা একটু অন্যরকমভাবে হল। ডুডুর একটা শট বারে লাগল, আমন একটা মিস করল। বারো মিনিটের মাথায় আবার ডানদিক থেকে একটা আক্রমণ শুরু হল। আমন বল ধরে দু’জনকে কাটিয়ে ডিফেন্স চেরা পাস বাড়াল দিয়েগোকে। এবার সুযোগ আরও সহজ। বলটা লাফাতে লাফাতে দিয়েগোর দিকে গেল। কিন্তু দিয়েগো শট মারার আগেই বলটা ওর শিন বোনে লেগে বেরিয়ে গেল মাঠের বাইরে। জ্যাকসন উত্তেজনায় মাঠের থেকে একমুঠো ঘাস ছিঁড়ে ফেলল। এ কী রে ভাই? দিয়েগো হাডুডুর মতো করে ফুটবল খেলছে কেন? এত সুযোগ নষ্ট করার জন্যই বোধহয় একটু মনমরা হয়ে গেল নঙ্গী স্কুলের প্লেয়াররা। বরং পঁচিশ মিনিটের পর থেকে রবিন মেমোরিয়াল বেশ চেপে ধরল নঙ্গী হাইকে। এদিকে দিয়েগো বলই ধরতে পারছে না। কবীর গোল থেকে এবার দিয়েগোকে গালাগালি করতে লাগল। কবীর এমনিতেই শর্ট টেমপার্ড, তার ওপর দিয়েগোর নমুনা দেখে ও খেপে আগুন হয়ে গেছে। এমনকী হাফ লাইন থেকে আমন আর রাইট স্ট্রাইকার পজিশন থেকে ডুডুও চিৎকার শুরু করেছে। দর্শকরাও অধৈর্য হয়ে উঠল। কে যেন “অ্যাই শুয়োরের বাচ্চা” বলে চিৎকার দিল। এই দিয়েগোই যে আগের ম্যাচগুলোয় নঙ্গী হাইকে জিতিয়েছে সবাই ভুলে গেছে। অবশ্য ক্রাউডের চরিত্রই তাই। গত ম্যাচের পারফরমেন্স কেউ মনে রাখে না। জ্যাকসন বুঝল আর উপায় নেই, ম্যাচটা ড্র-ই হয়ে যাবে। আর ঠিক তখনই ঘটল ঘটনাটা।

ডান দিক থেকে একটা বল ধরে রবিন মেমোরিয়ালের মলয় অনেকটা ওভারল্যাপ করে কর্নার ফ্ল্যাগের কাছ থেকে বলটা সেন্টার করল। পেনাল্টি বক্সের মাথায় বলটা উঁচু হয়ে এল। রবিন মেমোরিয়ালের চাপে নঙ্গী হাই তখন সবাই মিলে ডিফেন্স করছে। দিয়েগোও নীচে নেমে এসেছে। বলটা হেড করার জন্য সবাই একসঙ্গে লাফাল। কবীর গোল ছেড়ে বেরিয়ে এল বলটা ধরবে বলে। ও সহজেই বলটা হাতে পেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কীসের থেকে কী হল, লাফিয়ে ওঠা দিয়েগোর সঙ্গে ধাক্কা লাগল কবীরের। দু’জনেই মাটিতে পড়ে গেল। জ্যাকসন দুঃস্বপ্ন দেখার মতো মুখ করে দেখল বলটা ড্রপ খেতে খেতে চলে গেল গোলের সামনে ফাঁকায় দাঁড়ানো রুদ্রর পায়ে।

মাঠের ওই ধার থেকে যখন চিৎকারটা উঠল জ্যাকসন ততক্ষণে চোখ বন্ধ করে মাটিতে বসে পড়েছে। সব শেষ। চিৎকারটা বহুক্ষণ ধরে চলল। রেফারি খেলা শেষের বাঁশি বাজাবার পর সেটা আরও বাড়ল। বহুদিন পর নঙ্গী হাইস্কুল ‘টমাস চ্যালেঞ্জ কাপ’-এর ম্যাচ হেরে গেল ০-১ গোলে।

চারিদিক থেকে গালাগালি ভেসে আসতে লাগল। প্লেয়াররা মাঠের ধারে প্রায় সবাই মাথা নিচু করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে পড়েছে। কবীর হাতের গ্লাভস্‌টা ছুড়ে ফেলল এক কোনায়। ওর চোখে জল। স্যারেরা কী সান্ত্বনা দেবেন বুঝতে পারছেন না। হঠাৎ কবীর লাফিয়ে উঠল, “এই জানোয়ারের বাচ্চা দিয়েগো, তোর জন্য, শুধু তোর জন্যই আজ হারলাম। শুয়োর, আমায় ধাক্কা দিলি কেন? গোলটা তোর জন্যই খেতে হল আমাদের।” বলতে বলতেই কবীর তেড়ে গিয়ে কলার ধরে ফেলেছে দিয়েগোর। এবার ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে দিয়েগোকে মাটিতে শুইয়ে ফেলল ও। চড়, ঘুষি, লাথি যা খুশি তাই চালাতে লাগল দিয়েগোর শরীর লক্ষ্য করে। বরণ স্যার, হেডস্যার সবাই এগিয়ে এলেন। এদিকে দিয়েগো মার ঠেকাবার কোনও চেষ্টাই করছে না, চুপচাপ মার খেয়ে যাচ্ছে। কবীর তখনও বলে যাচ্ছে, “জানোয়ার, তোর জন্য হারলাম, তুই হারিয়ে দিলি।” স্যারদের সঙ্গে এবার জ্যাকসন, ডুডু আর অন্যরাও হাত লাগাল। কোনওমতে কবীরকে ছাড়িয়ে আনল সবাই। কবীর ভীষণ চিৎকার করছে, সঙ্গে কঁদছেও খুব। দিয়েগো কোনওমতে উঠে বসল। জ্যাকসন দেখল দিয়েগোর চোখের নীচে কালসিটে। নাক দিয়ে সামান্য রক্ত বেরোচ্ছে। ঠোঁটটাও বেশ কেটে গেছে। কিন্তু তবু দিয়েগো কাঁদছিল না। কথা বলছিল না কোনও। জ্যাকসন ফার্স্ট এড বক্স থেকে একটু আয়োডিন তুলোয় করে নিয়ে দিয়েগোকে দিল। বলল, “এটা লাগা।” দিয়েগো তুলোটা নিল না। চুপ করে বসে রইল।

এখন মাঠ অনেক ফঁকা হয়ে এসেছে। সন্ধেও হয়ে এল প্রায়। জ্যাকসন মাথা তুলে দেখল বোঁ ঘুড়িটা এখনও উড়ছে। রাধাকাকু কি খবর পেয়েছে যে ওরা ম্যাচটা হেরে গেছে? স্যারেরা ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিতে বললেন। জ্যাকসন দেখল রবিন মেমোরিয়াল টিম নিয়ে মাঠ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে, প্রচণ্ড হল্লা করছে ওরা। স্বাভাবিক, নঙ্গী হাইকে তাদের নিজের মাঠে হারিয়ে দেবে, ওরা আশাই করেনি। কিন্তু বাস্তবে তাই হল। হঠাৎ জ্যাকসন দেখল প্লেয়ারদের ভিড় থেকে বেরিয়ে ওদের দিকে আসছে রুদ্র। জ্যাকসন অবাক হল বেশ। রুদ্র এদিকে আসছে কেন?

“কী রে নিজেদের মধ্যে মারামারি করছিস কেন? খেলায় হারজিত আছেই। ব্যাপারটা স্পোর্টিংলি নিতে শেখ। সব বার তোরা জিতবি নাকি? মামার বাড়ির আবদার? মন দিয়ে প্র্যাকটিসটা কর, দেখ ফিরতি ম্যাচে জিততে পারিস কিনা। সরস্বতী পুজো অবধি তো সময় আছে।” রুদ্র মুচকি হেসে বলল। কাটা ঘায়ে যেন নুনের ছিটে। যদিও কথাটা সত্যি। ‘টমাস চ্যালেঞ্জ কাপ’ খেলাটা হয় এই দুটো স্কুলের মধ্যেই। বছরে দুটো ম্যাচ, একটা নভেম্বরে আর একটা সরস্বতী পুজোর আগের দিন। টেস্টের পর জ্যাকসনদের স্কুল শেষ হলেও ওই ম্যাচটা ওরা খেলবে। প্রতিবারের টুয়েলভরা ওটা খেলে। এটাই নিয়ম। সেই হিসেব করলে আর মাস তিনেক সময় আছে।

রুদ্রর কথায় কবীর ছিটকে উঠেছিল কিছু বলার জন্য, কিন্তু বরণ স্যার বারণ করলেন। রুদ্র হাসল, তারপর দিয়েগোর দিকে তাকিয়ে বলল, “কী গো, আজ ফিউজ কেন? যাক, তোকে থ্যাঙ্কস, গোলটা তোর জন্যই দিতে পারলাম। অবশ্য তা না হলেও আজ আমরাই জিততাম।” জ্যাকসন আর পারল না। ভুলে গেল স্যাররা সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। ও চিৎকার করে বলল, “এই যে দামড়া ছাগল, এবার এখান থেকে না-গেলে পিছনে তিনটে লাথ মারব। এখানে এসে পিনিক দেওয়া হচ্ছে? মনে নেই গতবারগুলোয় কেমন দিয়েছিলাম? এবার ফ্লুকে জিতে খুব পোংটামো হচ্ছে, না?”

রুদ্র সামান্য হাসল, “জোকার, সত্যি তুই জোকার। হেরেছিস তবু লজ্জা নেই! আর তুই কথা বলছিস কী? খেলতে পারিস? দশটা শট মারলে তো কুড়িটা মিস করিস। টিমের লেবুজল বয়ে বেড়াস।” জ্যাকসন আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু স্যারেরা বলতে দিলেন না। সবাইকে “চল, চল” করে মাঠ থেকে বের করে নিলেন। রুদ্রও গা-জ্বালানো হাসি হেসে চলে গেল। দিয়েগো শুধু চুপ করে বসে রইল। ডুডু যেতে যেতে বলল, “আজ শনিবার না! বারবেলা। তাই তো হারলাম।” জ্যাকসন ওর দিকে কটমট করে তাকাতেই ডুডু রণে ভঙ্গ দিল।

ডুডুটা এরকমই। ভীষণ কুসংস্কারাচ্ছন্ন। এর মুখ দেখা খারাপ, এই জামাটা পয়া। এক শালিখ মানে ব্যাড লাক, দু’শালিখ মানে গুড লাক, এরকম হাজারটা প্রেজুডিস ওর। খেলার মাঠেও ওকে সাত নম্বর জার্সিটা দিতে হবে। ওটা নাকি ওর গুড লাক চার্ম। কিন্তু আজ আবহাওয়া দেখে বেশি হ্যাজাল না।

একরকম জোর করেই জ্যাকসন দিয়েগোকে মাঠ থেকে তুলে মাঠের বাইরে বেরিয়ে এল। এখন বেশ অন্ধকার হয়ে এসেছে। নভেম্বর মাস, তাই দিন অনেক ছোট হয়ে এসেছে। দিয়েগো কোনও কথা বলছিল না। এমনিতেই এদিকটা খুব নির্জন। খেলা দেখার ভিড় চলে গেছে। রাস্তার পাশের গাছগুলো থেকে পাতা খসার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে এখন। আর পাওয়া যাচ্ছে আধ ভাঙা পিচের ওপর ওদের জুতোর শব্দ। ওরা হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা চলে এল। জ্যাকসন দেখল এখনও কথা বলছে না দিয়েগো। ও আস্তে জিজ্ঞেস করল, “কী হল গুরু? এত ঠান্ডা মেরে গেলে কেন? এই দিয়েগো কিছু বল। একটা ম্যাচ হেরেছি তো কী হয়েছে? পরেরটা জিতব।”

এবার শব্দ করে নিশ্বাস ছাড়ল দিয়েগো, বলল, “না আমার ব্যাপারটা তোরা বুঝবি না। এটা সামান্য হারা জেতার জন্য নয়। অন্য ব্যাপার। কত করে স্যারকে বললাম যে ম্যাচটা খেলব না, খেলতে পারব না। কে কার কথা শোনে? এখন তাড়াতাড়ি চল। বাড়িতে কেউ নেই। এ ছাড়া আমাকে এক জায়গায় যেতেও হবে।”

“মানে? কী ব্যাপার? খেলতে পারবি না মানে?” জ্যাকসন কৌতূহলী হয়ে উঠল। কিন্তু দিয়েগো আবার চুপ করে গেছে। মহা মুশকিল। জ্যাকসনেরও ভাল লাগছিল না, কাঁহাতক আর প্রশ্ন করা যায়?

হাঁটতে হাঁটতে ওরা এসে থামল এক মোড়ে। সামনেই বিরাট এক বটগাছ। সবাই এই জায়গাটাকে বটতলা বলে। এই বটতলার নীচের ছায়াচ্ছন্ন জায়গাটা এই সন্ধের সময় আরও অন্ধকার আর ভুতুড়ে দেখাচ্ছে। বটগাছটার নীচেটা বাঁধানো। সেখানে কারা যেন বসে আড্ডা মারছে। তাদের মুখ দেখতে পেল না জ্যাকসন। ওর আর দিয়েগোর বাড়ি যাওয়ার রাস্তাটা এখান থেকে দু’ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। ডানদিকে যাবে দিয়েগো আর বাঁদিকে জ্যাকসন। অন্ধকারে দিয়েগোর মুখটাও ঠিক দেখা যাচ্ছে না, ফলে জ্যাকসন বুঝতে পারল না ওর মনের ভাব কী। তবে আর দেরি করল না জ্যাকসন। চলে যাবে বলে ও সবে “আসছি” বলতে যাবে, এমন সময় বটতলার ওই আড্ডা থেকে একটা ছায়ামূর্তি বেরিয়ে এল ওদের সামনে। কে লোকটা? মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। ছায়ামূর্তিটা নিচু কিন্তু শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল, “দিয়েগো, তুমি কি কবীরকে ইচ্ছে করে ধাক্কা দিয়েছিলে?”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *