পাতাঝরার মরশুমে – ১৩

এন এস এ মাঠে দাঁড়ালে কিছু লম্বা লম্বা তালগাছ দেখা যায়। পুরু জানে তালগাছগুলো যেদিকে সেখানে একটা বড় ভাঙা বাড়ি আছে। অনেক পুরনো সেই বাড়ি। লোকে বলে সারেঙ বাড়ি। বলা হয় অনেক অনেক আগে, যখন গঙ্গার নাব্যতা খুব ভাল ছিল, তখন প্রচুর জাহাজ যেত এই নদী দিয়ে। ঠিক এই গঙ্গার ধারেই নোঙর করত সেসব জাহাজ। সারেঙ বা নাবিক বদল হত এখানে। সেই নোঙর থেকেই নাকি নঙ্গী নামটা এসেছে। আর সেইসব পর্তুগিজ, ফরাসি আর মুসলমান নাবিকদের বাসস্থান থেকে নাম হয়েছে এই সারেঙ বাড়ি। এর কতটুকু ইতিহাস আর কতটুকু লোকের মনগড়া গল্প তা বলা মুশকিল। আসলে সব মানুষই নিজের ইতিহাস নিয়ে একটু-আধটু বেশি বলে থাকে। ইতিহাসহীন হিসাবে মানুষ নিজেকে ভাবতেই পারে না। এই নঙ্গী অঞ্চলের নাম এখন আর তেমন প্রচলিত নয়, সবাই বাটানগর হিসাবেই এই অঞ্চলকে চেনে।

স্কুলে পড়ার সময় মাঝে মাঝে কুশ আর পুরু ওই ভাঙা বাড়িতে যেত। ভাঙা ফোয়ারা, কালো হয়ে যাওয়া পাথরের ভাঙা মূর্তি, ইট বের করা দেওয়াল দেখে গা ছমছম করত পুরুর। মাঝে মাঝে ওখানে তক্ষকের ডাক শুনত ওরা। গিরগিটি হেঁটে যেত ইটের আলগা দেওয়ালের ওপর দিয়ে। একবার, পুরু খুব সাহস করে বাড়িটার দোতলায় উঠেছিল। কুশ বারবার না করছিল উঠতে। কিন্তু সেদিন পুরুকে নিশিতে পেয়েছিল যেন। অর্ধেক ভেঙে যাওয়া সিঁড়ি দিয়ে খুব হালকা পায়ে ওপরে উঠেছিল পুরু। নড়বড়ে রেলিং, কাঠের প্রায় নেই এমন ঝরোকা আর সিংহের মুখওলা নল। অবাক হয়ে গিয়েছিল পুরু, অর্ধেক ঘরের মেঝেই ভাঙা, নেই। তবু তার মাঝে দূরের একটা দেওয়ালে খোদাই করা একটা লেখা দেখেছিল পুরু। দেখেছিল লেখা আছে—“তোমারে কি আর কোনও কালেই দেখিতে পাইব না? তুমি কি আমারে ক্রমশ ভুলিয়া যাইবে?”

আজ এত দিন পরেও পুরুর মাঝে মাঝে মনে পড়ে সেই কথা। আর সেই কথাগুলো মনে পড়লেই কেন জানে না মনখারাপ হয়ে যায়। ওর কোনও প্রেমিকা নেই তবু এই কথাটা মনে পড়লেই ওর মনে হয় কেউ একজন থাকলে মন্দ হত না।

প্রেমিকা? পুরুর। ‘কুঁজোরও শখ হয় চিত হয়ে শোয়? একেতেই বাড়িতে ঝামেলা, তার ওপর প্রেম? এই তো আজও বাবা প্রচণ্ড কথা শুনিয়েছে। সকালে দিদি রুটি তরকারি করে দিয়েছিল। রুটিগুলো বেশ পুড়িয়ে ফেলেছিল দিদি। খেতে পারছিল না পুরু। শুধু বলেছিল যে রুটিগুলো পুড়ে গেছে। বাবা সদ্য বাজার করে ফিরেছিল। পুরুর কথা শুনেই চিৎকার করে উঠেছিল। বলেছিল, “বাপের পয়সায় খাস, তবু লজ্জা করে না? রুটি পোড়া, না? অর্ধেক পোড়া রুটি জোগাড় করার মুরোদ আছে তোর? নির্লজ্জ, ক’টা পয়সা সংসারে দিস?”

সামান্য প্রতিবাদ করেছিল পুরু, বলেছিল, “কেন আমি টাকা দিই না? টিউশনি করে সাতশো টাকা আর স্কুলের থেকে হাজার টাকা পাব। বাড়িতে তো হাজার টাকা দেব।”

“দেব। ফিউচার টেন্স। হাজার টাকায় কী হবে? চায়ের জল গরম হয় ওই টাকায়? ভিক্ষে করে মানুষ ওর থেকে বেশি রোজগার করে। রুটি পোড়া, না? উঠে যা আপদ, খেতে হবে না তোকে।”

বাবা সব সময়ই এরকম বলে। অন্য দিন কিছু মনে করে না পুরু। কিন্তু আজ আর পারল না। এমনিতেই গত বুধবার থেকে মাথাটাথা সব গোলমাল হয়ে আছে, তার ওপর বাবার এই খিটির খিটির। কোনওদিন যা করেনি আজ সকালে সেটাই করেছিল পুরু। খাবারের থালাটাকে ঠেলে উঠে গিয়েছিল ও। ঠেলার চোটে তরকারির কিছুটা ছিটকে থালা থেকে মাটিতে পড়ে গিয়েছিল। সেই দেখে বাবা আরও জোরে চেঁচাতে শুরু করেছিল। খুব খারাপ কথাও বলতে শুরু করেছিল। জামাটা গায়ে দিয়ে বাড়ি থেকে বেরোতে বেরোতে পুরু শুনেছিল যে মা বাবাকে এসব বলতে বারণ করাতে বাবা মাকেও যা তা বলছে। জীবনে প্রথমবার পুরুর মনে হয়েছিল লোকটাকে ধরে মারে। মাঝে মাঝে খবর কাগজে পড়ে পুরু যে ‘ছেলের হাতে বাবা খুন’। এখন পুরু বোঝে জীবন কোন অবস্থায় গেলে মানুষ অমন কাজ করতে পারে।

সেই যে সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে পুরু, আর ঢোকেনি। এখন ও দাঁড়িয়ে আছে মাঠে। আজ ছেলেদের প্র্যাকটিস ডে। ঘণ্টাখানেক প্র্যাকটিস করিয়ে মিনিট পনেরোর ব্রেক দিয়েছে ও। দূরে ওরা বসে আছে। ঠাট্টা ইয়ারকিও করছে। অবশ্য সবাই নয়। জ্যাকসন আর দিয়েগো নিজেদের মতো চুপ করে বসে আছে।

দিয়েগোটা প্র্যাকটিস করছে কিন্তু নিজের খুশিমতো। দৌড়োতে বললে স্ট্রেচিং করছে। লাফাতে বললে দৌড়োচ্ছে। যা খুশি করছে। পুরু বলাতে বলেছে, “স্যার, আপনি ওদের প্র্যাকটিস করান না। আমায় আমার মতো থাকতে দিন।” পুরুকে এখনও যেন সহ্য করতে পারছে না দিয়েগো। স্কুলে ওর খারাপ ব্যবহার নিয়ে বলেওছে পুরু। বলেছে যে দিয়েগো থাকলে টিম স্পিরিট নষ্ট হচ্ছে। কিন্তু হেডস্যার সটান বলে দিয়েছেন যে ভারতের ক্রিকেট টিম যেমন সচিন তেন্ডুলকর ছাড়া হয় না, তেমনি নঙ্গী হাই-এর ফুটবল টিমও দিয়েগো ছাড়া হবে না। পুরু বুঝতে পারছে না ও কী করবে। যখন ও টিম করে খেলায়, অর্ধেক দিন দিয়েগো খেলে না। কোনও বোঝাপড়াই তৈরি হচ্ছে না টিমের। সবদিক থেকেই পুরুর জীবন বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। তাই কি সহজেই মাথা গরম করে ফেলছে পুরু? এই তো প্রথম সেশনের প্র্যাকটিসে ভীষণ বকেছে জ্যাকসনকে। ছেলেটা অদ্ভুত। সবসময় ইয়ারকি। আজেবাজে কথার ডিপো। এদিকে ফুটবল খেলতে নামলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে একসা করবে। একটা শট গোলে থাকে না ওর। প্রথমে রানিং বলে শট মারতে বলে দেখেছে। তারপর পেনাল্টি মারতে বলে দেখেছে। শেষে সেন্টার লাইন থেকে ফাঁকা গোলে বল মারতে বলেছে। জ্যাকসন একবারও গোলে বল রাখতে পারেনি। তার ওপর প্রতিটা শট মারার আগে বলছিল, ‘এইটা জিদানের শট’, ‘এইটা মরিয়ন্তেস মারছে’, ‘এবার মারছে রোনালডিনহো।’ খুব রাগ হয়ে গিয়েছিল পুরুর। সমস্ত ছেলের সামনে প্রচণ্ড বকেছে জ্যাকসনকে। এমনকী কান ধরে সারামাঠ দৌড়ও করিয়েছে। তাই ছেলেটা এই ব্রেকে ওরকম মনমরা হয়ে বসে আছে। এখন একটু খারাপ লাগছে পুরুর। আসলে ও কাউকে কঠিন কথা বলতে পারে না। বা বলে ফেললেও পরে ওর ভীষণ খারাপ লাগে। এই এখন যেমন লাগছে। পুরু ভাবল অতটা হার্শলি না-বললেও হত। আসলে সত্যি করে ভেবে দেখলে বাবার বকুনিতে নয়, পুরু মেন্টালি আপসেট হয়ে আছে গত বুধবারের ঘটনাটায়। টাপুর অত্যন্ত বাড়াবাড়ি করেছিল সেদিন।

ভট্টাচার্যের গলি দিয়ে রোজকার মতো সেদিনও সাইকেল চালিয়ে ফিরছিল পুরু। গোটা গলিটাতে একটাই মাত্র স্ট্রিট বালব্। তার সামান্য আলোয় গলির অন্ধকারটাই যেন আরও প্রকট হয়ে ওঠে। একেতেই পৌষ মাস। ভীষণ ঠান্ডা। একটু ধীরে সাইকেল চালাচ্ছিল পুরু যাতে ঠান্ডা হাওয়াটা বেশি না-লাগে। আর তাই হয়তো আচমকা সামনে এসে যাওয়া টাপুরকে দেখে ঠিক সময়ে ব্রেক চেপে দাঁড়িয়ে পড়তে পেরেছিল পুরু। অন্ধকারের মধ্যে থেকে হঠাৎ ওর সাইকেলের সামনে কেন এল টাপুর? কী চায় ও? মনে হয়েছিল পুরুর। কিন্তু ওকে কিছু বলতে হয়নি। কারণ টাপুরই প্রথম বলল, “পুরু, তোমার সঙ্গে ভীষণ দরকার আছে আমার।” পুরু? তুমি? কী বলছে টাপুর? স্যার না, আপনি না, একদম নাম ধরে, তুমি করে ডাকছে! পুরুর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ওকে বলল, “সাবধান।” পুরু সাইকেল থেকে নামল, তারপর ঠান্ডা গলায় বলল, “এই সময় তুমি এখানে কেন? আর অন্ধকারেই দাঁড়িয়ে আছ কেন?”

টাপুর সামান্য কাঁপা গলায় বলল, “তোমার জন্য পুরু। এসো এখানে, তোমার সঙ্গে অনেক জরুরি কথা আছে আমার।” বলেই টাপুর টানতে টানতে ওকে ঢুকিয়ে নিয়ে গেল পাশের অর্ধেক তৈরি একটা বাড়ির মধ্যে। ব্যাপারটা এতটাই আকস্মিক হল যে পুরু কিছু বলতে পারল না। শুধু ওই বাড়িটার মধ্যে ঢুকতে ঢুকতে শুনল শব্দ করে ওর সাইকেলটা মাটিতে পড়ে গেল।

বাড়িটার ভেতরে কাঠের পাটাতন, বালি আর কিছু ছেঁড়া বস্তা রাখা। এই জায়গাটা বেশ অন্ধকার। চোখ সয়ে যাওয়াতে তাও টাপুরের মুখটা দেখতে পাচ্ছিল পুরু। টাপুরকে এরকম চঞ্চল কোনও দিনও দেখেনি পুরু। বাড়িটার ভেতরে ঢুকেই টাপুর দু’হাত দিয়ে পুরুর হাতদুটো চেপে ধরল, বলল, “তোমায় ছাড়া আমি একদম ভাল নেই পুরু। আমার একদম ভাল লাগে না কিছু। দু’বছর ধরে আমি শুধু তোমাকেই চেয়েছি। তুমি আজ আমায় ফিরিয়ে দিয়ো না।”

পুরু যতটা সম্ভব গম্ভীরভাবে বলল, “টাপুর, বিহেভ ইয়োর সেলফ্। কী হচ্ছে কী? এমন করছ কেন?” কিন্তু টাপুর কোনও কথাই শুনছে না। ও পাগলের মতো বলে যেতে লাগল, “না পুরু, প্লিজ তুমি এমন কোরো না। আজ আমায় ফিরিয়ে দিয়ো না। দেখো, আমার দিকে দেখো তুমি। আমি সুন্দরী না? আমার পিছনে অনেক ছেলে ঘোরে। আমি কাউকে পাত্তা দিই না। আমি কারও দিকে তাকাই না। আমি তোমার জন্য নিজেকে সামলে রেখেছি। আমি এখনও ভার্জিন। তুমি আমায় ভার্জিনিটি থেকে মুক্ত করবে, পুরু, প্লিজ টেক মি।” প্রলাপের মতো বলতে বলতে টাপুর ঝাঁপিয়ে পড়ল পুরুর ওপর। পুরু কিছু বুঝে ওঠার আগেই টাপুর ওকে এলোপাথাড়ি চুমু খেতে শুরু করেছে। পুরুর হাতদুটো নিজের বুকের মধ্যে চেপে ধরে বলছে, “আমায় তুমি ধরো।” পুরুও মুহূর্তের জন্য কেমন হয়ে গিয়েছিল। টাপুরের নরম শরীর, ভরাট বুক, ওর নিশ্বাস, হালকা শ্যাম্পুর গন্ধ। পুরু কেমন শিথিল হয়ে যাচ্ছিল, আবার দৃঢ়ও হচ্ছিল ক্রমশ। আর ঠিক তখনই টাপুর দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরল পুরুর ঠোঁট। ভেজা, মিন্টের গন্ধ, কামড়—শীতের সন্ধে হঠাৎ বদলে গিয়ে প্রচণ্ড বর্ষার বিকেল হয়ে গেল যেন। বহু বছর আগের এক বিকেলের কথা হুহু করে মনে পড়ে গেল পুরুর। অবিকল সেই গন্ধ, সেই ভেজা ঠোঁট। পুরুর হুঁশ ফিরল। দু’হাতে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিল টাপুরকে। তারপর আর কথা না-বলে দৌড়ে বেরিয়ে এল বাড়িটার মধ্যে থেকে। সাইকেলে উঠে চলে যাওয়ার সময় ও আবছাভাবে শুনেছিল অন্ধকার বাড়িটার ভেতর থেকে একটা চাপা কান্নার শব্দ আসছে। বাড়ি ফেরার পথে পুরু ঠিক করেছিল আর কোনওদিন টাপুরের সঙ্গে কোনও কথা বলবে না ও।

“স্যার ব্রেক শেষ। আমরা রেডি।” ডুডুর কথায় সংবিৎ ফিরল পুরুর। এই ছেলেটাকে বেশ ভাল লাগে ওর। দোষের মধ্যে একটু সুপারস্টিশস। পুরু নিজে প্লেয়ার ছিল। ও জানে কলকাতা মাঠে অনেক বড় বড় প্লেয়ারের কত সুপারস্টিশন আছে। এমনকী বিশ্ববিখ্যাত প্লেয়ারদেরও অনেক সংস্কার থাকে। স্টিভ ওয়র লাল রুমাল, সচিনের হেলমেট না-খোলা, রোনালডিনহোর গোলের পর দুটো আঙুল দেখানো, এরকম উদাহরণ অজস্র আছে। পুরু সামান্য হাসল, তারপর ডুডুকে বলল, “ঠিক আছে, চলো।”

এরপর খানিকক্ষণ বল নিয়ে প্র্যাকটিস চলল, রিসিভিং, ট্র্যাপিং, শুটিং করাল পুরু। আর সর্বক্ষণই লক্ষ করে গেল জ্যাকসনকে। কেমন মনমরা নিস্পৃহ ভাব। না, ওকে ওভাবে বকাটা ঠিক হয়নি পুরুর। প্র্যাকটিসের মাঝে আমনকে ডেকে প্র্যাকটিস কনডাক্ট করতে বলল পুরু। তারপর জ্যাকসনকে ডেকে নিয়ে গেল মাঠের আরেক প্রান্তে।

জ্যাকসন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে পুরুর সামনে। পুরু আলতো স্বরে বলল, “মনোময়, প্র্যাকটিসে মন না-দিলে আমি আরও বকব। জানো তো বেশি এদিক ওদিক কথা বললে খেলার থেকে ফোকাসটা সরে যায়। শোনো, যে-কোনও কিছুই প্র্যাকটিস নির্ভর। তুমি তো স্ট্রাইকারে খেলতে চাও। কিন্তু জেনো এর জন্য পরিশ্রম করতে হবে। আমাদের আসল ম্যাচের আর মাসখানেকের একটু বেশি আছে। তোমাকে আমি কথা দিচ্ছি তুমি যদি নিজেকে এর মধ্যে ইমপ্রুভ করো তোমায় ওই ম্যাচটায় খেলাব। আচ্ছা একটা কথা বলো তো, গোলে শট নেবার সময় তুমি কী দেখো?”

জ্যাকসন মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, “কেন, সব দেখি। মাঠ, গোলকিপার, আশেপাশের প্লেয়ার, দর্শক। মানে সব কিছুই।” পুরু বুঝল গন্ডগোলটা কোথায়। বলল, “শোনো, একটা কাজ করবে। যখন গোলে শট নেবে, তখন ঠিক শট নেবার মুহূর্তে একটা চোখ বন্ধ করে নেবে। মানে ডান পায়ে শট নিলে বাঁ চোখ বন্ধ করবে, বাঁ পায়ে শট নিলে ডান চোখ বন্ধ করবে। কেমন?”

“কেন স্যার?”

“কারণ যাতে তোমার ভিশনটা ফোকাসড থাকে তাই একটু অপটিকাল সেন্সর করার কথা বলছি। তোমাকে যা বললাম জাস্ট ডু ইট।” বলেই পুরু মাঠের মাঝখানে দাঁড়ানো কবীরকে হাত তুলে ডাকল। কবীর দৌড়ে এল কাছে।

পুরু বলল, “কবীর, গোলে দাঁড়াও তো। মনোময় পাঁচটা শট মারবে।”

“আবার স্যার? তখন তো মারল। একটা গোলের মধ্যে ছিল না।” কবীর অবাক হয়ে বলল।

“যা, বেশি ভ্যাজর ভ্যাজর করিস না।” জ্যাকসন খেঁকিয়ে উঠল। কবীর চোয়াল চেপে গোলের দিকে যেতে যেতে বলল, “নে মার দেখি।”

পুরু মন দিয়ে পাঁচটা শট নেওয়া দেখল জ্যাকসনের। প্রথম চারটে বাইরে গেল। কিন্তু শেষটা আশ্চর্যভাবে পোস্টে লাগল। পুরু নিজের মনেই হাসল। ও দেখেছে, একমাত্র শেষ শটটা নেওয়ার সময়ই ঠিক মুহূর্তে চোখটা বন্ধ করেছিল জ্যাকসন। পুরু জ্যাকসনের দিকে এগিয়ে গেল। বলল, “এইভাবেই শট মারার প্র্যাকটিস করবে, কেমন?”

আর খানিকক্ষণ প্র্যাকটিসের পর পুরু শেষ করে দিল সেদিনের মতো। বেশ খিদে পেয়েছে ওর। সারাদিন কিছু খাওয়া হয়নি। মাঠ থেকে বেরোবার সময় পুরু দেখল ডুডু আর জ্যাকসন এগিয়ে আসছে ওর দিকে। জ্যাকসন বলল, “স্যার, চলুন একসঙ্গে যাওয়া যাক। আপনি তো সারদা পল্লিতে থাকেন, না? আমরাও ওই দিকেই যাব।”

পুরু বলল, “কিন্তু আমি যে একটু খাব মনোময়। খিদে পেয়েছে।”

জ্যাকসন উৎসাহিত হয়ে বলল, “হ্যা স্যার, চলুন তবে। আমাদেরও খিদে পেয়েছে। সামনেই জীবনদার পেটাই পরোটা পাওয়া যায়। একশো গ্রাম ছ’টাকা। দারুণ করে।”

পুরু এক মুহূর্ত চিন্তা করল। তিন ছয়ে আঠারো টাকা। একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু স্টুডেন্টরা খাবে। ওর পকেটে চল্লিশ টাকা মতো আছে। ঠিক আছে। পুরু বলল, “চলো তবে।” পুরু দেখল অন্যদিন ওরা সাইকেল আনে, আজ আনেনি। পুরু তো আনেইনি। সকালে সেই রাগ করে বেরিয়ে আসার সময় সাইকেলের কথা মাথাতেই ছিল না।

পেটাই পরোটা সত্যিই দারুণ করে জীবনদা। খিদেও জব্বর পেয়েছিল পুরুর। খাওয়াদাওয়া শেষ করে ওরা দোকানের বাইরে এসে দাঁড়াল। আর তখনই ঝপ করে লোডশেডিং হয়ে গেল। ঘুটঘুটে অন্ধকার নেমে এল চারিদিকে। চোখে ধাঁধা লেগে গেল পুরুর। এরই মধ্যে ডুডু হঠাৎ বলল, “জ্যাকসন, আমি ভাল বুঝছি না। সেই গন্ধটা আবার পাচ্ছি। একটা ঝামেলা হবে।”

পুরু অবাক হল, বলে কী ছেলেটা? ঝামেলার গন্ধ হয় নাকি? ডুডু, জ্যাকসন, দিয়েগো, কবীর সবক’টা ছেলেকেই একটু অদ্ভুত লাগে পুরুর। মাঝে মাঝে এদের কীর্তিকলাপে হাসিও পায় ওর। তারপরেই পুরুর মনে পড়ে নিজের এই বয়সটার কথা। আসলে এই টিন এজটাই অদ্ভুত। বিশেষ করে ছেলেদের ক্ষেত্রে সব সময়ে একটা “To be or not to be”-এর মধ্যে থাকা। সব থাকলেও কী নেই কী নেই মনে হয়। মেয়েদের মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্লভ বস্তু। মনে হয় ‘কেউ পাত্তা দিচ্ছে না আমাকে’। এ বড় যন্ত্রণার সময়, আবার বড় আনন্দের সময়ও।

আশেপাশের দোকানগুলোয় কেরোসিনের বাতি আর এমার্জেন্সি লাইট জ্বলে উঠেছে এতক্ষণে। আবছা আলোয় ভরে উঠেছে চারদিক। এই আলোয় ডুডু আর জ্যাকসনকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ওরা আবার হাঁটতে শুরু করল। পুরু ভাবল ওদের একটা খবর জানিয়ে দেবে। আসলে কালকের প্র্যাকটিসে বলতই। তবু আজই ওদের বলে দেবে। পুরু বলল, “তোমাদের ছোট্ট একটা খবর দিই। আজ তো বাইশে ডিসেম্বর, আঠাশ তারিখ আমি একটা ম্যাচের আয়োজন করেছি। স্টেশনের কাছে একটা ভাল ক্লাব আছে। ওদের কেউ কেউ কলকাতার ক্লাবে খেলে। ওরা ভাল টিম। তোমরা চেনো ওই ‘কে জি বি’।”

“কে জি বি? মানে রাশিয়ান গুপ্তচর সংস্থা?” ডুডু ঘাবড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল।

জ্যাকসন ভেংচে বলল, “কে জি বি? তোর মাথা। রাশিয়া ভেঙে যাওয়ার পর কে জি বি আর নেই। মাইরি, তোর জন্য কে জি বি খেলতে আসবে? এই কে জি বি হল স্টেশনের কাছে একটা ক্লাব, পুরো নাম ‘কাঠ গোলা বয়েজ’।”

ডুডু বলল, “না, মানে স্লিপ অব টাঙ হয়ে গেছে। আসলে গন্ধটা…”

“বাদ দে তো, গত জন্মে ডগ স্কোয়াডে ছিলি নাকি?” এবার খেঁকিয়ে উঠল জ্যাকসন, পুরু দেখল ব্যাপারটা অন্যদিকে মোড় নিচ্ছে। ও বলল, “শোনো শোনো, ম্যাচটা ভাল করে খেলতে হবে কিন্তু। সেদিন দেখা যাবে তোমরা কতটা ইমপ্রুভ করেছ।”

হাঁটতে হাঁটতে ওরা বাটা সিনেমার পেছনের দিকে চলে এসেছে। এখন সিনেমার ইভনিং শো চলছে। ফলে রাস্তায় লোকজন প্রায় নেই। বললেই চলে। ডুডু আর জ্যাকসন এখন পিছনে কীসব কথাবার্তা বলছে। পুরু ভাবল ও এখন কোথায় যাবে। বাড়িতে ফেরার ইচ্ছে এখন নেই। তবে কি বটতলার আড্ডায় গিয়ে একটু বসবে? ও পেছনে ঘুরল ডুডুদের চলে যেতে বলবে বলে আর ঠিক সেই সময়ই একটা চিৎকার শুনল ও। “চোর, চোর।” পুরু ফিরে তাকাল। একটা রোগা পাতলা ছেলে সাঁ করে ওদের পাশ দিয়ে গঙ্গার দিকের রাস্তায় ছুটে চলে গেল। ওর পেছনে দুটো-চারটে বয়স্ক লোকও ছুটছে। পুরু জানে গঙ্গার দিকে কিছু অ্যান্টিসোশালের ঠেক হয়েছে। সন্ধে হলে সেখানে নেশা-ভাং শুরু করে ওরা। আর সুযোগ পেলেই ইটখোলার জন্য আসা কয়লার নৌকো লুঠ করে। এরাই মাঝে মাঝে সন্ধেবেলা নির্জন রাস্তায় টুকটাক ছিনতাই করে।

ছিনতাইবাজ ছেলেটাকে তাড়া করা লোকগুলোকে দেখে পুরু বুঝল ওরা ধরতে পারবে না ছেলেটাকে। মুহূর্তের মধ্যে পুরু কর্তব্য স্থির করে নিল। পায়ের চপ্পলটা খুলে রেখে জোরে স্প্রিন্ট টানল। ইস, আজ যদি সাইকেলটা থাকত! কিন্তু সেসব চিন্তার সময় নেই। পুরু তাড়া করল ছেলেটাকে। সামনে প্রায় একশো মিটার দূরে ছেলেটা। পুরু চোয়াল শক্ত করল। নিমেষে ভুলে গেল ওর হাঁটুতে চোট, জোরে দৌড়োনো বারণ। ও দৌড়োতে লাগল। ঘটনার আকস্মিকতা কাটিয়ে ডুডু আর জ্যাকসনও ওর পিছনে ছুট লাগাল। কিন্তু পুরু ওদের অনেক আগে দৌড়োচ্ছে। ওর সেই বিখ্যাত দৌড়। খেলার মাঠেও আগে, বল ধরে হঠাৎ হঠাৎ দৌড় দিত পুরু। ওদের কোচ অলোকদা বলতেন চোরা গতি। মজিদ বাসকরের পর এরকম চোরা গতি নাকি অলোকদা কলকাতা মাঠে আর কারও দেখেননি। পুরু জানে রাস্তাটা আরও কিছুটা সোজা তারপরই বেশ আঁকাবাঁকা। সেখানে ছেলেটা ঢুকে পড়লে রিএনফোর্সমেন্ট পেয়ে যেতে পারে। পুরু স্পিড বাড়াল। দূরত্ব কমতে লাগল দ্রুত। রোগা ছেলেটাও বেশ বেদম হয়ে পড়েছে। ওর পেছনের তাড়া করা ভিড়টাকে অনেকটা পেছনে ফেলে এসেছে পুরু। কিন্তু এবার হাঁটুটা মট করে উঠল। আবার সেই ব্যথা! যন্ত্রণায় পুরুর মুখ বেঁকে গেল, কিন্তু গতি কমাল না ও। ছেলেটা এখন পাঁচ গজের মধ্যে চলে এসেছে। পুরু এবার ওকে ধরে ফেলবে। বেগতিক দেখে ছেলেটা ঘুরে দাঁড়াল। পুরু লক্ষ করল ছেলেটার বাঁ হাতে একটা লেডিস পার্স আর ডান হাতে একটা লম্বামতো জিনিস। এই অল্প আলোতেও জিনিসটার ঝিলিক দেখে চিনতে ভুল করল না পুরু। ওটা একটা ক্ষুর। ছেলেটা কাঁপা গলায় বলল, “আয় শুয়োরের বাচ্চা, নীচ থেকে ওপর খুলে দেব।” ছেলেটা এবার হাতের ক্ষুরটা নাচাচ্ছে। পুরু মনে মনে চিন্তা করে নিল। আড় চোখে দেখে নিল বেশ কিছুটা পেছনে ডুডু আর জ্যাকসন ক্ষুর দেখে দাঁড়িয়ে পড়েছে। ছেলেটা এখনও সমানে গালাগালি দিয়ে যাচ্ছে। নিমেষে মাটিতে বসে পাশে পড়ে থাকা একটা আধলা ইট তুলে ছেলেটার হাঁটু লক্ষ্য করে ছুড়ে দিল পুরু। ছেলেটা এটা আশা করেনি। খটাং করে পায়ের হাড়ে গিয়ে লাগল ইটটা। “বাবা গো” বলে ব্যাগ আর ক্ষুরটা ফেলে বসে পড়ল ছেলেটা। পুরু দেখল ওর পেছনে থেকে বোঁ করে ডুডু আর জ্যাকসন গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল ছেলেটার ওপর। পুরু কাছে গিয়ে ক্ষুরটা আর ব্যাগটা তুলে নিল।

ডুডু আর জ্যাকসন এর মধ্যে ছেলেটাকে মারতে শুরু করেছে। পুরু বারণ করল। ছেলেটা এমনিতেই হাঁপাচ্ছে। আর মারলে অজ্ঞান হয়ে যাবে। দু’-চার মিনিটের মধ্যেই একটা ছোটখাটো দল এসে পড়ল ওখানে। মাতব্বর গোছের কিছু লোক, আনাড়ি চ্যাংড়া দু’-চারটে ছেলে আর দুটো মেয়ে। দেখলেই বোঝা যায় বেশ ভাল ঘরের মেয়ে ওরা। ওদের মধ্যে থেকে একজন এগিয়ে এসে পুরুকে বলল, “আপনাকে কী বলে যে ধন্যবাদ দেব? আমার দিদির পার্সটা ছেলেটা ছিনতাই করেছিল। সো কাইন্ড অব ইউ।” পুরুর হাঁটু দুটো ভীষণ ব্যথা করছে। এখন, তবু তার মধ্যেও সামান্য হাসার চেষ্টা করল ও।

ভিড়টা ততক্ষণে ঘিরে ধরেছে ছেলেটাকে। কয়েকটা টর্চের আলো গিয়ে পড়েছে ছেলেটার মুখে। রোগা, ফ্যাকাশে একটা ছেলে। চোখের তলায় কালি, নাক আর ঠোঁট দিয়ে রক্ত গড়াচ্ছে। হঠাৎ জ্যাকসন ছেলেটাকে বলে উঠল, “এই তুই তিমির না? ও! তুই এখন চুরি ছিনতাই শুরু করেছিস?”

ডুডু বলল, “তাই তো, জানোয়ার।” আবার ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিল ডুডু।

তিমির খসখসে গলায় বলল, “শুয়োরের বাচ্চা, তোদের দেখে নেব।” এবার মাতব্বরেরা তাদের চড় থাপ্পড় শুরু করল।

পুরুর আর ভাল লাগছে না। ওর গোটা দিনটাই বরবাদ হয়ে গেছে। ও মেয়েটাকে বলল, “আপনারা চলে যান, আর দাঁড়াবেন না।”

মেয়েটা হাসল, বলল, “হ্যাঁ এবার যাব। বাট থ্যাঙ্কস এগেন। একদিন আমাদের বাড়িতে আসুন না। কাছেই, গঙ্গার ধারে নতুন ম্যানশনটা আমাদের। মাসখানেকও হয়নি এখানে এসেছি। কী দিদি! ওঁর আমাদের বাড়িতে আসা উচিত না? বাই দ্য ওয়ে আমি রাকা আর এই আমার দিদি রোহিণী।” এবার অন্যজনকে লক্ষ করল পুরু। আর সঙ্গে সঙ্গে চার সেকেন্ড হৃৎপিণ্ডটা বন্ধ হয়ে গেল ওর। এই প্রায়-অন্ধকার গলিটা হঠাৎ আলোয় ভরে উঠল যেন, পাশের চোরটাকেও মনে হল দেবশিশু। এ-মেয়ে কোত্থেকে এল? এমন চোখ, এমন ঠোঁট, এ কে? এমন সুন্দরের সামনে দম বন্ধ হয়ে গেল পুরুর। কিন্তু রোহিণী চুপ, মাথা নিচু। রাকা সামান্য হেসে বলল, “আসি তা হলে? ওহো, আপনার নামটাই তো জানা হল না।” পুরু নাম বলল। রাকা হাত নেড়ে বলল, “একদিন আসবেন কিন্তু আমাদের বাড়িতে, কেমন? আসি।”

ফেরার পথে খালি পায়ের তলায় এবার রাস্তার কাঁকরগুলো ফুটছিল পুরুর! চটিটা খুঁজে পেলে হয়! হঠাৎ জ্যাকসন বলল, “যাই বলুন স্যার, মেয়েটা দেখতে ভাল হলেও ভারী অভদ্র। এত ঘটনার পরও কেমন চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। কোনও কথাই বলল না। একটা থ্যাঙ্কস তো দেবে। ফালতু।”

পুরু খোঁড়াচ্ছে এবার। রাস্তাটাও মনে হচ্ছে কেউ যেন টেনে লম্বা করে দিয়েছে। তবু কোথাও যেন আবছাভাবে ভালও লাগছিল পুরুর। ওর জীবনে তো হিরোইক কিছু করাই হয় না। আজ সামান্য হলেও কিছু তো করেছে। হঠাই, হয়তো অকারণেই, ওর বহু বছর আগে দেখা পুরনো এক বাড়ির দেওয়ালে খোদাই করা লেখার কথা মনে পড়ে গেল। তারা-ভরা ডিসেম্বরের আকাশের তলায় সামান্য খোঁড়াতে খোঁড়াতে বছর চব্বিশের একটা ছেলে অস্ফুটে বলে উঠল, “তোমারে কি আর কোনও কালেই দেখিতে পাইব না? তুমি কি আমারে ক্রমশ ভুলিয়া যাইবে?”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *