কাঠ গোলা বয়েজ। এখন পরের ম্যাচটুকু নিয়েই শুধু চিন্তা করছে কবীর। পুরু এদের সঙ্গে যে এতদিন খাটাখাটনি করল তার ফলাফলের কিছুটা এই ম্যাচ থেকে পাওয়া যাবে। দেখা যাক কাঠ গোলা বয়েজকে ওরা সামলাতে পারে কিনা। টিমটার সবার বয়সই চব্বিশ-পঁচিশ বছর, অর্থাৎ ওদের চেয়ে অনেকটাই বড়। পুরু চায় ওদের এমন প্রতিপক্ষের মুখোমুখি ফেলতে যাতে কম্পিটিশনটা টের পায় ওরা। পুরুর এই প্রস্তাবে প্রথমে কিছু ছেলে আপত্তি করেছিল। তখন পুরু বলেছিল—“হোয়েন দ্য গোয়িং গেটস্ টাফ, দ্য টাফ গেটস্ গোয়িং। দেখব হাউ টাফ ইউ পিপল্ আর।”
টাফ। ওকে হতেই হবে টাফ। কবীর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চোয়াল চিপল। সেদিন সন্ধের মারের দাগগুলো শরীর থেকে চলে গেলেও ওর মন থেকে যায়নি। প্রতিটা কথা ওর মনে কাঁটার মতো গেঁথে আছে। ওকে ‘শুয়োরের বাচ্চা’ বলেছিল রুদ্র, ওকে ‘লাস্ট ওয়ার্নিং’ দিয়েছিল। ওর গায়ে পেচ্ছাপ করেছিল রুদ্র। প্রতিটি অংশের হিসেব বুঝে নেবে কবীর। আর টাপুর? টাপুর কবীরেরই হবে। যার ক্ষমতা থাকে আটকাক। টেস্টের রেজাল্ট বেরিয়ে গেছে। ওরা সবাই ভালভাবে পাশ করেছে। ফলে পড়াশুনোর টেনশনটা এখন একটু কম। বাবাও রেজাল্ট দেখে খানিকটা শান্ত। কবীর চুলটা আঁচড়ে নিল দ্রুত। এমনিতেই প্র্যাকটিস থেকে ফিরতে দেরি হয়ে গেছে আজ। ওদিকে বেশি দেরি হলে নাচের স্কুলের পরে টাপুরকে মিস করবে ও। টাপুরকে মিস করতে চায় না আজ। ও আজ আরেকবার টাপুরের কাছে ট্রাই নিয়ে দেখবে। গানের স্কুলে তো আর দেখা হবার চান্স নেই।
মাঝে মাঝে ভাবলে ভীষণ খারাপ লাগে কবীরের। সোমাদির গানের ক্লাসে টাপুরের একদম কাছে আসার সুযোগ হত কবীরের। সেটা আর সম্ভব নয়। আর তার জন্য কিছুটা দায়ী ও নিজে। রুদ্রের কাছে বেদম মার খেয়ে প্রায় অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল কবীর। দিয়েগো বাড়ি পৌঁছে দিয়ে যায় ওকে। প্রায় তিন-চারদিন জ্বরে বেহুঁশ ছিল কবীর। তার মধ্যে প্রলাপ বকেছিল। বারবার ‘টাপুর’, ‘গানের গ্লাস’ ‘রুদ্র’, ‘সোমাদি’র কথা বলেছে ও। বাড়ির লোকেরা সবটা বুঝতে না পারলেও টাপুর আর গানের ক্লাসটা সহজেই ইকুয়েট করে ফেলেছিল। বাবা তো আগেই ওয়ার্নিং দিয়ে দিয়েছিল টাপুরের বিষয়ে। ফলে একটু সুস্থ হতেই বাবা প্রথমে জিজ্ঞেস করেছিল, “তোকে কে মেরেছে বল।” কবীর কিছুতেই বলেনি। যত বারই জিজ্ঞেস করা হয়েছে প্রশ্নটা, কবীর চুপ করে থেকেছে। শেষে বলেছে, “অন্ধকার ছিল, তার ওপর সব বেপাড়ার ছেলেরা, ঠিক দেখতে পাইনি।” বাবা কি অত বোকা? এরপরই সেই প্রশ্নে না-গিয়ে বাবা আচমকা বলেছিল, “খুব তো রবীন্দ্রনাথের গান শিখিস। ‘দীপ নিভে গেছে মম’ গানটা শোনা দেখি।” এই খেয়েছে এই গানটা কবে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন? আর কেনই বা লিখলেন। কবীর আমতা আমতা করছে দেখে বাবা বলেছিল, “তোমার আর গান শিখে কাজ নেই। খেলছ, পড়ছ, এনাফ। গান একদম বন্ধ।” কবীর তীব্র প্রতিবাদ করতে চেয়েছিল কিন্তু বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে তীব্র প্রতিবাদের বদলে তীব্র ঢোক গিলেছিল ও। মনে মনে ভেবেছিল টাপুর এভাবে ফসকে গেল? এবার তো অন্য কোনও ছেলে ওকে নিয়ে নাকের ডগা দিয়ে ড্যাং ড্যাং করে চলে যাবে, এ সহ্য করা যায়?
তাই বেশ ক’দিন ধরে অনেক সাহস জুটিয়ে আজকের দিনটাকে ঠিক করেছে কবীর। আজ হয় এসপার ওয় ওসপার। আর নাচের ক্লাসের আশেপাশে বখাটের মতো ঘুরঘুর করতে হবে না। কবীর যাবে ডুডুর কাছে, যেন ডুডুর সঙ্গেই দেখা করতে এসেছে।
কবীর হলুদ পুলওভার আর নীল জিনস্ পরেছে একটা। এতে ওকে বেশ স্মার্ট দেখায়, মা বলে। চুলটাকেও সামনের দিকে জেল দিয়ে স্পাইক করে নিয়েছে। আজ ওকে দারুণ দেখতে লাগতেই হবে। কোনও গ্যাপ রাখবে না আজ। এরই মাঝে কলকাতায় গিয়ে আর্চিস থেকে একটা মিউজিকাল কার্ড কিনে নিয়ে এসেছে কবীর, সঙ্গে রিবন-বাঁধা বিদেশি টফির বাক্স। ইন্টারনেট ঘেঁটে রাজ্যের ‘কবীর’ নামের লোকেদের তথ্য জোগাড় করেছে। আজ আর টাপুর ওকে কাবু করতে পারবে না। আর একবার নিজেকে আয়নায় দেখে নিল কবীর। সানগ্লাসটা পরলে আরও ভাল লাগত, পরবে? একবার ভাবল। তারপরেই ভাবল বিকেল প্রায় শেষের দিকে, সানগ্লাস পরলে যা প্যাঁক খাবে, আজ রাত্রে আর খেতে হবে না তা হলে। ইস যদি একটা মুনগ্লাস থাকত ওর!
কবীর আর একটুও দেরি না-করে গিফট্গুলো নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। তাড়াতাড়ি ডুডুর ওখানে পৌঁছোতে হবে। হিসেবমতো আর বেশি দেরি নেই নাচের ক্লাস শেষ হতে। আজ আর সাইকেল নিল না কবীর। পাড়ার ভেতর দিয়ে শর্টকাট মেরে দেবে।
কবীর রাস্তায় বেরিয়ে দেখল একটা দুটো করে আশেপাশের দোকানের আলো জ্বলতে শুরু করেছে। বেশ ঠান্ডা পড়েছে এবার। গত কয়েকবার এত ঠান্ডা পড়েনি। কবীরের শীত খুব ভাল লাগে। তবে আজ যেন একটু বেশিই ঠান্ডা লাগছে ওর। ও হাঁটতে লাগল। চারপাশের হইচই, দোকানের আলো, গাড়ির আওয়াজ, কিচ্ছু পৌঁছোচ্ছে না ওর কানে। নিজেকে খুব মহান মনে হচ্ছে আজ ওর। কেমন একটা চোরা কনফিডেন্স টের পাচ্ছে ও। পেতেই হবে। ওকে টাফ হতে হবে যে। টাপুরকে নিয়ে আসতে চলেছে ওর জীবনে। এর জন্য ওকে যোগ্য হয়ে উঠতে হবেই। কবীর শর্টকাটের জন্য পাশের গলিটাতে ঢুকে গেল।
“কী রে, জীতেন্দ্রর ট্যাঁরা ব্যাঁকা জেরক্স, হনহনিয়ে কোথায় যাচ্ছিস?” গলাটা শুনে কবীর দাঁড়িয়ে পড়ল। সেরেছে। এই জোকারটা এখানেও? জ্যাকসন এগিয়ে এল, “ওঃ নিজেকে একেবারে রঙের দোকানের শেড কার্ড বানিয়ে ফেলেছিস। হলুদ পুলওভার, নীল প্যান্ট, লাল জুতো। কী রে ফাঁসাতে যাচ্ছিস, না ফাঁসতে?”
“ভাগ শালা। ডুডুর কাছে যাচ্ছি।” কবীর জবাব দিল।
“ডুডুর কাছে? এত সাজুগুজু, হাতে মনে হচ্ছে গিফট্ও আছে, এইসব নিয়ে ডুডুর কাছে? কী রে ডুডুর সঙ্গে প্রেম করছিস নাকি? এত উন্নতি তোর কবে হল?” হ্যা হ্যা করে হাসতে লাগল জ্যাকসন।
“এবার তোকে ক্যালাবই। খালি আনসান কথা, না?” কবীরের মাথা গরম হয়ে গেল।
“আমায় ক্যালাবি? দম আছে? সেদিন তো অমন ক্যালানি খেলি আমাদের বাড়ির সামনে, তখন মনে ছিল না এইসব ডায়লগ?” জ্যাকসন পালটা জবাব দিল।
সেই মারটার কথা ওঠাতে কবীর চুপ করে গেল। জ্যাকসনও বোধহয় বুঝল একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে। ও বলল, “তোকে তো সেদিন রুদ্ররা মেরেছে, না? দাঁড়া শুয়োরের বাচ্চাগুলোকে পাই। এমন প্যাঁদাব না হাসপাতালের বেডের প্রেমে পড়ে যাবে।”
কবীর বলল, “ছাড় ওসব, আমি যাই।”
জ্যাকসন উৎসাহিত হয়ে উঠল। বলল, “হ্যাঁ হ্যাঁ চল, চল। ডুডুদের ওখানের নাচের স্কুলটায় শালা যা সব পিস আসে না। এই শীতের মধ্যে শরীরটা বেশ গরম হবে।” এই রে! জ্যাকসন গেলেই যে কেলো। কী বলতে কী বলবে, খেলা শুরুর আগেই লাল কার্ড হয়ে যাবে। ও বলল, “জ্যাকসন, তুই গিয়ে কী করবি? তার চেয়ে বাড়িতে গিয়ে পড়াশুনো কর। ইকো জিয়োতে যা উইক তুই।”
জ্যাকসন বলল, “মানে? আমি উইক তো তোর কী? আর ডুডুর কাছে তুই যেতে পারিস আমি যেতে পারি না? আমি যাবই যাব।”
“শোন না, ফালতু এই শীতের মধ্যে যাবি কেন বল? তার চেয়ে অন্য কোথাও যা।”
“মানে? কেসটা কী বল তো! তুই আমাকে প্রস্ফুটিত হতে বলছিস কেন রে? হুম, নন ভেজ গন্ধ পাচ্ছি। তুই কি ওখানে কারও পেছনে লাইন মারতে যাচ্ছিস?”
“লাইন? ভাগ। তোর ভালই জন্যই বলছি।”
“আমার ভাল? শালা মাজাকি? আমি যাবই ডুডুর বাড়ি। চল।” ধ্যাত্তেরি, ছেলেটা কিছুতেই শুনবে না। কবীর মুহূর্তে স্থির করে নিল ব্যাপারটা। ভাবল আর দেরি করা ঠিক হবে না। এবার যেতেই হবে। জ্যাকসন এখন চলুক, ওখানে গিয়ে না হয় কোনওক্রমে কাটিয়ে দেব ওকে। কবীর ভালমানুষের মতো মুখ করে বলল, “চল তা হলে। তোর মরজি”। জ্যাকসনের সাইকেলের সামনের রডে বসে পড়ল কবীর। সাইকেল চলতে শুরু করল।
নাচের স্কুলের সামনে পৌঁছে কবীর দেখল বেশ কিছু মেয়ে জটলা করছে। মানে আগের ব্যাচ, অর্থাৎ টাপুরদের ব্যাচটা শেষ হয়নি এখনও। বাঁচা গেল। কবীর ভাবল তবে কি ডুডুদের বাড়িতে গিয়ে একটু বসবে? মানে ওর এখানে আসাটা জাস্টিফাই করতে হবে তো। কিন্তু তার আগেই ওর হাতে খোঁচা দিল জ্যাকসন, “কবীর, ওই দ্যাখ মালটা ওই গাছটার পাশে একটা মেয়ের সঙ্গে গুজগুজ করছে। শালা ডুডুটা পুরো ঝাড় কেস। আজকাল খালি মেয়েদের সঙ্গে গল্প করে।” কবীর অবাক হয়ে দেখল মেয়েদের জটলার থেকে একটু দূরে ডুডু একটা মেয়ের সঙ্গে হাত নেড়ে উত্তেজিতভাবে কথা বলছে। কী কেস কে জানে? কবীর জ্যাকসনের সঙ্গে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল ওদের দিকে। “আই বাপ, এ যে সেই মেয়েটা।” জ্যাকসন বলে উঠল।
“সেই মেয়েটা মানে? কোন মেয়েটা?”
“আরে কিছুদিন আগেও ওর সঙ্গে কথা বলছিল ডুডু। তবে মেয়েটা বলেছিল ওর লাভার আছে।”
“লাভার থাকতেই পারে, হয়তো ডুডুর সঙ্গে এমনি কথা বলছে।” কবির বলল।
“কী জানি। তবে যাই বলিস মেয়েটাকে দেখতে সলিড। থুতনির টোলটা দেখেছিস?”
কবীর আর কথা না-বাড়িয়ে এগিয়ে গেল ডুডুর দিকে। কাছে গিয়ে দেখল সুন্দরমতো মেয়েটার চোখটা কেমন ছলছল করছে। ওদের দেখেই মেয়েটা চট করে চোখের কোণে রুমাল চেপে ধরে মেয়েদের জটলার দিকে চলে গেল। কবীর বুঝল সেন্টুতে আবহাওয়া পাথরের মতো ভারী। ও ডুডুর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দেখল ডুডুর ভুরুটায় সমস্ত পৃথিবীর যন্ত্রণা এসে জড়ো হয়ে, সেটা কোলপসিবল গেটের মতো কুঁচকে আছে।
“কী রে ডুডু, মুখে সুনামিকম্পের পরের অবস্থা কেন তোর? মেয়েটা হেভি চেটেছে তোকে, না?” জ্যাকসন বলল।
ডুডু দাঁত চেপে বলল, “শালা তোর জন্য, তোর জন্য আজ এই কেস। সবসময় তোকে বকবক করতে হবে, না?”
“যা কলা, আমি কী করলাম? একটা মেয়ে তোকে বাঁশ দিয়েছে আর তার কন্টিনিউয়েশনটা আমায় ফরোয়ার্ড করবি নাকি?”
“তোমায় মেরে শালা ফাটিয়ে দেব জানোয়ার। সব জায়গায় নাক গলিয়ে দেবে।”
এবার কবীর আর থাকতে না-পেরে জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপারটা কী? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না?”
ডুডু বলল, “এই শালা জ্যাকসনের বাচ্চা এমন উলটোপালটা বলেছে যে সায়েকা পুরো ফোরফরটি হয়ে আছে। আমার সঙ্গে কথা বলতেই রাজি নয়।”
“তো? কথা না-বললে বলবে না। তুই হেদিয়ে মরছিস কেন?” কবীর জিজ্ঞেস করল।
“মানে?” উত্তেজিত হয়ে ডুডু বলল, “আমার রাগ হবে না? কথা না-বললে, আমার ইয়ে…”
“কী রে? এখন তোতলাচ্ছিস কেন? শালা একবেলা পরী আরেকবেলা সায়েকা, আমি বুঝব কী করে?” জ্যাকসন ঝাঁঝিয়ে বলল।
কবীর আবার বলল, “আয়াম স্টিল নট গেটিং ইট। কেসটা কী?”
ডুডু গাছের পাশের নিচু পাঁচিলটার ওপর বসে পড়ল। মুখের ভাব ওয়াটারলুর পরের নেপোলিয়নের মতো। কবীর ভাবল ওরা তো কবীরের বুকের ভেতরটা দেখতে পাচ্ছে না। মনে হচ্ছে কলকাতার রেসকোর্সের পুরোটা ওর ভেতরে ঢুকে পড়েছে আর সেখানে সমস্ত লেন দিয়ে হাজারে হাজারে ঘোড়া ছুটে চলেছে। কবীর ঘড়ি দেখল, এতক্ষণে তো নাচের ক্লাস শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। আজ কি একস্ট্রা ক্লাস হচ্ছে? কবীরের আর দেরি ভাল লাগছে না। ও ধপ করে বসে পড়ল ডুডুর পাশে। ভাবল একটু জল পেলে ভাল হত। জিভ শুকিয়ে কাঠ। ডুডু ধীর স্বরে বলল, “সায়েকা আজ বলেছে আমার সঙ্গে আর কোনও দিনও কথা বলবে না। আগে একদিন জ্যাকসন বলেছিল যে পরীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক আছে, তারপর থেকে ও আর আমার সঙ্গে কথা বলছিল না। আজ সেটা জিজ্ঞেস করতে গেছি, আর আমায় বলেছে যে, আমার এই পোড়া মুখ যেন ওকে না-দেখাই। শালা জ্যাকসন, আমি তোর বন্ধু আর আমাকেই বাঁশ দিলি? সেদিন বিকেলে সায়েকার সামনে ওই কথা না-বললেই চলছিল না?”
“আচ্ছা সায়েকাকে যে তোর ভাল লাগে তুই ওকে বলেছিস?” জ্যাকসন জিজ্ঞেস করল।
ডুডু বলল, “না চান্স পাইনি। আর সব ওরকম বলতেও হয় না। কিছু জিনিস আছে যেগুলো বেস্ট সেড বাই সাইলেন্স। কিন্তু সেই সাইলেন্সটুকুই আর নেই। তবু অনেক চিন্তা করে মন ঠিক করেছিলাম। জানিসই তো আমাদের বাড়ি কেমন অর্থোডক্স। জ্যাকসন মাইরি যা করলি না!”
“ও-ও! যত দোষ নন্দ ঘোষ, না? তোমার ম্যাও তুমি সামলাতে পারবে না আমায় দোষ দেবে? আর ওরা ‘জানা’ তোরা ‘ব্যানার্জি। তোদের বাড়ি অর্থোডক্স, তোর ঠাকুরদা গঙ্গাজল দিয়ে ধুয়ে মাংস খায়, একটা মেয়েকে ভাল লাগার পর এত হিসেব করিস কেন? আমি সায়েকা হলে তোকে এমনিই লাথ মারতাম।” জ্যাকসন খ্যাঁক খ্যাঁক করে বলল।
কবীর ঝুম হয়ে বসে রইল। সব কথাই ওর কানে যাচ্ছে কিন্তু কোনও কিছুই যেন মাথায় ঢুকছে না। আসলে টাপুরের ব্যাপারটা যতক্ষণ না কোনও ফয়সলা হচ্ছে কবীরের কিছুই ঠিক হবে না। ওর কি আর এখন ডুডুর ঝামেলা শোনার সময় আছে? এদিকে নাচের ক্লাসটাও শেষ হচ্ছে না। ওর মনে হচ্ছে বোমা মেরে পুরো স্কুলটাই উড়িয়ে দেয়। “টাপুর, আর কত সময় নেবে তুমি?”
কবীর শুনল জ্যাকসন ডুডুকে জিজ্ঞেস করছে, “সায়েকা মেয়েটা কোথায় থাকে রে?”
“কেন? তোর কী দরকার? এবার কুরিয়র সার্ভিস করে ওদের বাড়িতে বাঁশ পৌছে দিবি নাকি?” ডুডু রেগে গিয়ে বলল।
এবার জ্যাকসন সামান্য হাসল, “আহা, রাগছিস কেন? জাস্ট আউট অব কিউরিওসিটি জিজ্ঞেস করছি।”
প্রচণ্ড অনিচ্ছার সঙ্গে ডুডু বলল, “সাহেব কলোনিতে থাকে সায়েকা।”
“বাংলো নম্বরটা কত?” জ্যাকসন আবার জিজ্ঞেস করল।
“অত জানি না, ভাগ। এবার শোয়ার ঘর ক’টা, বাথরুম ক’টা, কমোড না বাংলা সিস্টেম সব জিজ্ঞেস করবি।” ডুডু খিঁচিয়ে উঠল।
জ্যাকসন কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু বাধা পড়ায় পারল না। আজকেও রাধাকাকু হন্তদন্ত হয়ে এসেছে! বলল, “অ্যাই বাঁদর, তুই এখানে দাঁড়িয়ে কী করছিস? ওদিকে তোর মা হন্যে হয়ে তোকে খুঁজছে। ঠাকুরের জন্য মিষ্টি কিনতে বেরিয়ে তো আর টিকির দেখা নেই তোর। ভাবলাম মিষ্টি বানাতে বসে গেলি নাকি? একটা কাজ যদি তোকে দিয়ে হয়। গোরু খোঁজা খুঁজে তবে তোকে এখানে পেলাম। যা করিস না তুই! চল বাড়ি চল।”
ডুডু বলল, “ঠিকই তো! গোরুকে গোরুর মতোই খুঁজতে হবে। ভাগ তো ভাগ তুই। অপয়া।”
জ্যাকসন একটু রেগে গিয়ে বলল, “আবার পয়া অপয়া শুরু করেছিস। তোর ব্রেনের ম্যালফাংশনটা এবার কাটাবার বন্দোবস্ত কর। নিজে ভুলভাল করবে আর দোষ দেবে অন্যদের। আর পারিসও তুই লেবু তেতো করতে। কোথায় ভাবলাম এখানে এসে মজা হবে, না তুই ঝামেলা শুরু করলি। ধুর।”
কবীর দেখল রাধাকাকু কিছু না বুঝে এর ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছে। তারপর রাধাকাকু বলল, “কী রে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করছিস কেন? একসঙ্গে পড়িস, একসঙ্গে খেলিস, এরকম করলে তো টিম স্পিরিটে প্রভাব পড়বে। তোদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ চেঞ্জ হয়ে যাবে। তোদের টিমের থিঙ্ক ট্যাঙ্কের ব্যাপারে কিছু করা উচিত। নঙ্গী হাই যদি হেরে যায় তবে তো রাস্তায় মুখ দেখাতে পারব না আমরা। এবার জিততেই হবে তোদের। তোদের টিম ম্যানেজমেন্টের এক্ষুনি এ ব্যাপারে স্টেপ নেওয়া উচিত। নিজেদের মধ্যে এত খেয়োখেয়ি থাকলে চলে?”
কবীরের এবার অসহ্য লাগছে সব কিছু। একেতেই নাচের টিউশন শেষ হচ্ছে না, তার ওপর ডুডু-জ্যাকসনের ঝামেলা আর সব শেষে রাধাকাকু। আজকাল একটা প্রবণতা খুব দেখা দিয়েছে। ভ্যানওলা থেকে টপ একজিকিউটিভ সবাই এইসব ‘বডি ল্যাঙ্গুয়েজ’, ‘টিম স্পিরিট’, ‘থিঙ্ক ট্যাঙ্ক’, ‘কথাগুলো সবসময় বলে। যেন তাতে সবটাই খুব গ্র্যাভিটি পায়। এসব ক্রিকেটের ফল। আর সবচেয়ে হাইট হল রাধাকাকুর শেষ কথাটা, ‘টিম ম্যানেজমেন্ট’। যেন ন্যাংটো খোকার গলায় টাই। একটা মফস্সলের স্কুল, তার একটা সামান্য ফুটবল টিম আর তার আবার টিম ম্যানেজমেন্ট! কবীর ভাবল এ আর নেওয়া যাচ্ছে না। এবার একটা কিছু বলতেই হয়। পাঁচিলের থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “কী রে জ্যাকসন, বাড়িতে কাকিমা ডাকছে, যা। রাধাকাকু এত কষ্ট করে তোকে খুঁজে বের করল আর তুই এখানে হ্যাজাচ্ছিস?”
রাধাকাকু বলল, “হ্যাঁ হ্যাঁ চল চল। আর দেরি করা ঠিক নয়। তবে আমার কথাগুলো কিন্তু মাথায় রাখিস।” কবীর হ্যাঁ হ্যাঁ করে জ্যাকসনকে সামান্য ঠেলল যাওয়ার জন্য কারণ ও দেখতে পেয়েছে নাচের স্কুল থেকে একটা দুটো করে মেয়ে বেরোচ্ছে। টাপুরও যে-কোনও সময় বেরিয়ে আসবে। ও চায় না জ্যাকসন আর থাকুক! ডুডুকে যে কী বিপদে ফেলেছে ও। কিন্তু জ্যাকসন সত্যিই আর দাঁড়াল না। রাধাকাকু আর ও চলে গেল। ডুডুও বসল না আর। একদঙ্গল মেয়ের সঙ্গে সায়েকা নাচের স্কুলে ঢুকে গেল দেখেই বোধহয়। কবীরের ভারী ভাল লাগল। সব ঠিকঠাক চলছে আজ। ঠিক সময়মতো সবাই ওকে সুযোগ করে দিচ্ছে। আজ টাপুর রাজি না হয়ে পারবে না। তা ছাড়া, কবীরের মনে হল, ওর রাজি হয়ে যাওয়াও উচিত। এতদিন টাপুরের পেছনে খাটছে ও। পরিশ্রমের তো একটা দাম আছে নাকি? হাতে গিফট্ আর রংচঙে জামাকাপড় পরে সামান্য দুর্বল হাঁটু নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল কবীর। মাথার ওপর পৌষের আকাশ, অদৃশ্য হিম পড়ছে। জীবনের সমস্ত ভালবাসা জড়ো হয়ে আছে কবীরের চোখে। আর সেই চোখ গেট দিয়ে বেরিয়ে আসা একটা একটা করে মেয়ের মধ্যে খুঁজছে টাপুরকে। অবশেষে চোখ খুঁজে পেল। হঠাৎ কামিনী ফুলের গন্ধ কোত্থেকে এসে যেন ঝাপটা মারল মুখে, আর সমস্ত দৃশ্যই তুচ্ছ, ঝাপসা হয়ে গেল ক্রমশ। কবীর দেখল ছোট একটা ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে আসছে টাপুর।
কবীর তক্ষুনি ওর সামনে গেল না। ও দেখল টাপুর দুটো-চারটে মেয়ের সঙ্গে সামান্য একটু কথা বলল। তারপর একবার হাতঘড়িটা দেখল। কবীর ঠিক এইখানে টাপুরের সঙ্গে কথা বলতে চায় না। ও চায়, টাপুর যখন এখান থেকে বেরিয়ে পাড়ার ভেতরে অপেক্ষাকৃত ফাঁকা রাস্তায় যাবে, সেখানে ওকে ধরতে।
টাপুর আর দাঁড়াল না। পাড়ার ভেতর দিয়ে হাঁটতে লাগল। কবীর জানে ওই রাস্তাটা টাপুরের বাড়িতে যাওয়ার জন্য শর্টকাট। কবীর তবু যেন নড়তে পারছে না। কে যেন ওর পা-টা মাটির সঙ্গে গেঁথে দিয়েছে। তবু টাপুরের পেছনে তো ওকে যেতে হবেই। কবীর ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল।
পাড়ার ভেতরের রাস্তাটা এই শীতেও কেমন স্যাঁতস্যাঁতে। রাস্তাটা মিউনিসিপ্যালিটি কংক্রিটের করে দিয়েছে। তবু কোথাও কোথাও ভাঙাচোরা। এর ওর বাড়ির আলো এসে পড়েছে পথে। একটু কুয়াশাও আছে। বাটানগরের এই দিকটায় এখনও খানিকটা বাঁশঝাড়, কলাবন, কচুপাতার জঙ্গল ঘেরা পুকুর আছে। এই জায়গাটা পেরোলেই একটা পাম্প হাউস, তার আলোয় আশেপাশের অন্ধকার কিছুটা কেটেছে। ঠিক তার সামনেই টাপুরকে ধরল কবীর। কার্ড, ফুল আর থরথরে বুক নিয়ে টাপুরের চোখে চোখ রাখল ও। এ-মুহূর্তগুলোর জন্যই বোধহয় বেঁচে থাকে মানুষ। টাপুর অদ্ভুতভাবে তাকাল কবীরের দিকে। তারপর জিজ্ঞেস করল, “তোমার ক্লান্ত লাগে না? এই যে বারবার আমার কাছে আসো? কেন আসো? যাও, চলে যাও।”
এ কী বলছে টাপুর? কবীরের ধাক্কা লাগল। টাপুরের কি মন খারাপ? কবীর বলল, “টাপুর, তুমি বোঝো না আমি কত ভালবাসি তোমায়? তোমায় ছাড়া আমি এক মুহূর্তও কিছু চিন্তা করতে পারি না। তোমার জন্য আমি সব কিছু করতে পারি। তুমি জানো কত কিছু ছেড়ে, কত বাধা টপকে আমাকে তোমার কাছে আসতে হয়? আমি এত কষ্ট পাই, তুমি বোঝো না? আমায় কী ভাবো তুমি?”
টাপুর বলল, “কাকু।”
“কাকু? মানে? আমি তোমার কাকু?” কবির হতবুদ্ধির মতো তাকিয়ে রইল। টাপুর ভুরু দিয়ে কবীরের পেছনে ইঙ্গিত করল, কবীর নিমেষে পেছনে ঘুরল। আর সঙ্গে সঙ্গে ওর হাত থেকে কার্ড, টফির প্যাকেট আর ফুল সব পড়ে গেল মাটিতে। কুয়াশা জড়ানো পাম্প হাউসের ভুতুড়ে হলুদ আলোয় কবীর দেখল নারুকাকার সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে বাবা।
