পাতাঝরার মরশুমে – ১

হাড়িকাঠটা দেখলেই গা ছমছম করে দিয়েগোর। লাল সিঁদুর মাখানো কালো কাঠের তৈরি জিনিসটা, ইংরেজি ইউ অক্ষরের মতো দেখতে। সারাদিন এরকম ধুলো বালির মধ্যে পড়ে থাকলেও বেশ চকচক করে জিনিসটা। শুনেছে সত্তর-আশি বছর আগেও নাকি এখানে লুকিয়ে চুরিয়ে নরবলি হত। কোনও এক তান্ত্রিক নাকি নর রক্ত পান করতেন।

এই গাছটার পিছনেই একটা বড় বাউন্ডারি ওয়াল। তার মধ্যে একটা বিশাল ম্যানশন ধরনের বাড়ি। আগে দিয়েগো দেখত যে বাড়িটা একদম অযত্নে পড়ে আছে। কেমন প্লাস্টার-খসা, গাছ-গজানো, ভাঙাচোরা চেহারা। কিন্তু গত কয়েক মাসে বাড়িটাকে সারানো হয়েছে, সাজানো হয়েছে। লোহার গেটের ফাঁক দিয়ে ও দেখেছে যে ভেতরের বাগানটাও প্রুন করে সুন্দর করা হয়েছে। হালকা কুসুম রং করা হয়েছে বাড়ির দেওয়ালে। কে বাড়িটায় আসছে কে জানে। তবে যে-ই আসুক সে যে খুবই বড়লোক সেটা দিয়েগো বুঝতে পেরেছে। এই শেষ বিকেলের অল্প আলোতেও নতুন বাড়িটা ঝিকোচ্ছে। দিয়েগো ভাবল এমন বাড়ি বাটানগরে আর নেই।

“কাকা, যাই বলো পরশুর ম্যাচটা কিন্তু জিততেই হবে। তা হলে তিন বছর পরপর কাপটা রাখার চান্স আছে আমাদের। তুই তো জানিস রিটার্ন ম্যাচে ওদের টিম বরাবর হারে। গুরু তোমায় বাঁচাতেই হবে, নিজের নামটা সার্থক করতেই হবে।” জ্যাকসনের কথায় দিয়েগো ওর দিকে মুখ ফেরাল। জ্যাকসনটা এরকমই, কাকা, জ্যাঠা যা খুশি ডাকে। সবাই জ্যাকসন জ্যাকসন বলে বটে, আসলে কিন্তু জ্যাকসন ওর নাম নয়। ওর আসল নাম হল মনোময় মুখোপাধ্যায়। ওকে জ্যাকসন নামে কেন ডাকা হয় তার পিছনে একটা ছোট্ট ইতিহাস আছে।

দিয়েগোরা তখন ক্লাস এইটে পড়ে। একদিন স্কুলে মনোময় এল অদ্ভুত দেখতে একটা বেল্ট পরে। লাল রঙের, লোহার চকড়াবকড়া নাট-বল্টুর মতো কী সব লাগানো সেটায়। আর বকলেশের জায়গায় লোহার একটা কচ্ছপ লাগানো। স্কুলের সাদা জামা কালো প্যান্টের সঙ্গে একদম মানাচ্ছিল না সেটা। প্রথমেই যাদব স্যারের ক্লাস ছিল। জ্যাকসনের কাণ্ড দেখে তিনি তো রেগে লাল, বললেন, “এসব কী পরেছিস? জোকারের মতো লাগছে। খোল এক্ষুনি, খুলে ফেল।”

মনোময় গম্ভীরভাবে উত্তর দিয়েছিল, “স্যার, বেল্ট খুললেই কেলো হবে, আজ আবার আন্ডার প্যান্ট পরিনি। আর এরকম বেল্ট তো মাইকেল জ্যাকসনও পরে। তখন তো কোনও দোষ হয় না।”

স্যার আর কিছু বলেননি, মানে বলার আর কিছু ছিল না আর কী।

সেই ঘটনাটা কীভাবে যেন সারা স্কুলে ছড়িয়ে পড়েছিল।

তার পর থেকেই মনোময় হয়ে উঠেছে জ্যাকসন। আর এই ক্লাস টুয়েলভ অবধি পৌঁছোতে পৌঁছোতে মনোময় নামটাই প্রত্নতাত্ত্বিকদের গবেষণার বিষয় হয়ে উঠেছে, আর জ্যাকসন নামটা চলে এসেছে সামনের সারিতে। এমনকী স্কুলের হেডস্যার পর্যন্ত মাঝে মাঝে মনোময়ের বদলে জ্যাকসন ডেকে ফেলেন।

তবে হ্যাঁ, একটা ব্যাপার ঠিক বলেছে জ্যাকসন, এই ফুটবল ম্যাচটা জিততেই হবে। তা হলেই পরপর তিনবার ‘টমাস চ্যালেঞ্জ কাপ’ উঠে আসবে ওদের নঙ্গী হাই স্কুলে। যদিও একটা রিটার্ন ম্যাচ আছে, সেটাও ওদের, মানে রবিন মেমোরিয়ালের নিজের মাঠে, কিন্তু গত দু’বারই রিটার্ন ম্যাচটা ওরা হেরেছে। আর সঠিকভাবে বলতে গেলে হেরেছে দিয়েগোর কাছেই। এবার, ক্লাস টুয়েলভের দিয়েগোর নঙ্গী হাই স্কুলের হয়ে শেষবার খেলা। কারণ এইচ এস পাশ করলেই তো এখানকার পাঠ শেষ।

দিয়েগো নামটাও ওর নিজের নয়। ওর আসল নাম দয়ারাম আংরে। ওরা মারাঠি। বহুকাল আগে ওদেরই কোনও পূর্বপুরুষ মহারাজা শিবাজির সেনাপতি ছিলেন। সেই বর্গির আমল থেকে ওরা এই বঙ্গদেশে, ওদের মধ্যে এখন আর মারাঠা দেশের নামগন্ধ নেই। দিয়েগোরা বাংলার জল-মাটির সঙ্গে মিশে সম্পূর্ণ বাঙালি হয়ে গেছে। এমনকী দিয়েগোর মা বাঙালি বাড়ির মেয়ে। বাবা এই ছোট শহরেরই ‘বাটা শু কোম্পানি’-তে ম্যানেজার।

তা বলে সেটাই কিন্তু দিয়েগোর একমাত্র পরিচয় নয়। দিয়েগোর আরেকটা পরিচয় আছে। সেটা হল ওর বাঁ পা। যেটা দিয়ে ও অনায়াসে ফুটবল পা থেকে মাথা আর মাথা থেকে পায়ে নাচায়। খুব সহজেই পাঁচ-ছ’জনকে কাটিয়ে ও পৌঁছে যায় বিপক্ষের গোলে। মাঝ মাঠ থেকে আচমকা ড্রপ শটে গোল করে গোলকিপারকে বোকা বানায় যখন তখন। ফুটবল-পাগল বাটানগরের লোকেরা হাঁ হয়ে ওর খেলা দেখে। তাদের মনে পড়ে যায় এরকমই বেঁটেখাটো, ঝাঁকড়া চুলের একজনকে। নিমেষে যিনি ছত্রাখান করে দিতে পারতেন পৃথিবীর যে-কোনও ডিফেন্স। বল পায়ে যিনি ক্রমশ মানুষ থেকে ঈশ্বর হয়ে উঠেছিলেন। দয়ারাম বল নিয়ে এগোয়, তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে বিপক্ষের ডিফেন্স। সমস্ত লোকেরা অবাক হয়ে দেখে, বেঁটে, ঝাঁকড়া চুলের ছেলেটার জাদু। তারা আনন্দে চিৎকার করে ওঠে “দিয়েগো, দিয়েগো।”

দিয়েগো জানে জ্যাকসন পরশুর ম্যাচের কথাটা কেন ওকে বলছে। কারণ ও জানে দিয়েগো ছাড়া গতি নেই। কিন্তু ফুটবল টিম গেম। এভাবে একা কেউ পারে? দিয়েগো বলল, “দুর, কী যে বলিস। আমি একা কী করব? টিম সাপোর্ট না-থাকলে হয়?”

“মাইরি আর কী। ’৮৬ সালে মারাদোনার টিমে কোনও সাপোর্ট ছিল? মারাদোনা পারলে তুইও পারবি।”

“মামদোবাজি, না? কোথায় মারাদোনা আর কোথায় আমি চারাপোনা! ভাগ।”

“গতবারের ম্যাচটায় তো তুই-ই একা ওদের পুঁতে দিলি। চার গোল! মাইরি, ওদের ক্যাপ্টেন রুদ্রকে দেখে মনে হচ্ছিল কোরামিন দিতে হবে। দ্যাখো বস্ তুমি খেলে দাও, বাকিটুকু আমি দেখে নেব।”

বাকিটুকু যে কী সেটা ঠিক বুঝল না দিয়েগো। কারণ খেলার পর আর থাকেটা কী? ভাবল জিজ্ঞেস করবে। পারল না। সামনেই গঙ্গার দিক থেকে জোরে হর্ন বাজল একটা। দিয়েগো মুখ ঘুরিয়ে সেদিকে তাকাল। ওরা বসে আছে গঙ্গার পাড়ে। এখন জোয়ার চলছে। ছোটমতো একটা জাহাজ যাচ্ছে, হর্নটা তারই। শেষ বিকেলের আলোয় ভারী সুন্দর দেখাচ্ছে গোটা দৃশ্যটা। নভেম্বরের প্রথম, অল্প অল্প ঠান্ডা পড়ছে। কুয়াশাও। গঙ্গার ও-পাড়ের ইটখোলার চিমনি থেকে বেরোনো ধোঁয়ায় একটু ঘোলাটে হয়ে আছে চারিদিক। কিন্তু তবু দারুণ দেখাচ্ছে। গঙ্গার পাড়ে এই বিরাট অশ্বত্থ গাছ, সিঁদুর-মাখা হাড়িকাঠ আর সামনের একফালি সবুজ পাড়। এটাই ওদের আড্ডার জায়গা। ওরা বলে গ্যাজনখানা। রোজ প্র্যাকটিস থেকে ওরা এখানে চলে আসে। ওরা মানে দিয়েগো, জ্যাকসন, ডুডু আর কবীর। মাঝে মাঝে অবশ্য আমনও আসে। আমন ওদের এক বছরের জুনিয়ার। ক্লাস ইলেভেনে পড়ে, সায়েন্স নিয়ে।

তবে আজ আর কেউ নেই। শুধু ওরা দু’জন। “কী রে চুপ মেরে গেলি যে? কিছু অভয়বাণী ছাড়, না হলে তো প্রেস্টিজে গ্যামাক্সিন থেকে চোনা সব ডিসকাউন্ট রেটে পড়তে থাকবে।”

জ্যাকসন আবার খোঁচাল।

“ধুর, আমি কী বলব?” দিয়েগো নিস্পৃহ গলায় বলল।

জ্যাকসন লাফিয়ে উঠল, “ন্যাকামি কোরো না, তুমি হচ্ছ বাটানগরের মারাদোনা। তুমি ইচ্ছে করলেই হবে।”

দিয়েগো নিরুপায় গলায় বলল, “চেষ্টা করব।”

“ব্যস, ব্যস ওতেই হবে। তবে পাঁচ গোলের বেশি দিস না। ওদের স্কুলের ছেলেগুলোর হেনস্থা দেখলে মেয়েগুলো খুব কাঁদে। আর তুই তো জানিস মেয়েদের কান্না আমি একদম সহ্য করতে পারি না।”

“কেন?”

“কারণ আমিও তো রামমোহন বিদ্যাসাগরদের উত্তরসূরি, মেয়েদের চোখের জল আমাকে আন্দোলিত করে। বিশেষ করে সুন্দরী মেয়েদের চোখের জল। তাই পাঁচ গোলের বেশি দিস না।”

দিয়েগো হাসল শুধু, জ্যাকসনটা ভুলভালই রয়ে গেল। এত বড় হয়েছে কে বলবে! কিন্তু আর না, সন্ধে হয়ে এসেছে। ও বলল, “চল, সন্ধে হয়ে এল। শুধু খেলা খেলা করলে হবে, সামনেই টেস্ট পরীক্ষা না?”

গঙ্গার পাড়টা এখন সত্যি বেশ অন্ধকার হয়ে এসেছে। ওরা সাইকেল নিয়ে বাঁধের ওপর দিয়ে হাঁটতে লাগল। একটু দূরে নড়বড়ে জেটিটা দেখা যাচ্ছে। আগে এখানে জাহাজ থামত। বাটা কোম্পানির মাল আসত সেই জাহাজে। কিন্তু এখন পরিত্যক্ত। সন্ধের পর এখানে যতসব বদ ছেলেদের আড্ডা। জেটির পরেই বাঁধ থেকে রাস্তা ঢালু হয়ে নেমে গেছে। সেই রাস্তার ডানদিকে শিবমন্দির। আগে মন্দিরটা সুন্দর সাজানো ছিল কিন্তু এখন কেমন যেন রংচটা ভাব সর্বত্র। দেখলেই মন খারাপ হয়ে যায় দিয়েগোর। কিন্তু শিবমন্দিরটা পেরোতে হল না ওদের। আবছা অন্ধকারে দেখল একজন হন্তদন্ত হয়ে ওদের দিকেই আসছে। লোকটার হাঁটা দেখে আর হাতের ঢাউস পাতলা জিনিসটা দেখে দিয়েগো চিনতে পারল। রাধাকাকু। হাতে এক বিশাল ঘুড়ি। বাটানগরের সবাই একে বোঁ ঘুড়ি হিসেবে চেনে। চিনে পট্টির থেকে স্পেশাল অর্ডার দিয়ে বানানো পাঁচ ফুট বাই চার ফুটের প্রজাপতি আকারের ঘুড়ি। যখন এটা ওড়ে, বোঁ শব্দ হয় একটা। আর অনেক দূর থেকে শোনা যায় সেই শব্দ।

রাধাকাকু ছোটখাটো ব্যাবসা করে একটা— জ্যাম, জেলি, আচার, পাঁপড়— এই সবের। কিন্তু সেসবে বিশেষ ওর মন নেই। আসলে লোকটা একদম ঘুড়ি পাগল। বিকেল চারটে বাজলেই নিজের ব্যাবসার দড়ি-দড়া ছিঁড়ে পুজোর মাঠে হাজির হয়। তারপরই ব্যস, বাটানগরের মাথায় বোঁ শব্দে একটা প্রজাপতি ওড়ে। রাধাকাকু জ্যাকসনদের পাশের বাড়িতে থাকে। জ্যাকসনকে নিজের ছেলের মতো ভালবাসে। দিয়েগো জানে তার ঠেলাতেই ও এই সন্ধেয় গঙ্গার ধারে এসেছে। জ্যাকসনটাও যেমন, হয়তো বাড়িতে বলে এসেছে বিকেলের মধ্যে ফিরবে। আর জ্যাকসনদের বাড়িতে থাকার মধ্যে আছে ওর মা। জ্যাকসনের বাবা জাহাজে চাকরি করে— রেডিয়ো অফিসার। বছরে দু’মাসের জন্য বাড়িতে আসে। ফলে মা সবসময় জ্যাকসনকে নিয়ে চিন্তিত।

ওদের সামনে এসেই রাধাকাকু হাউমাউ করে উঠল, “কী অলপ্পেয়ে ছেলে তুই, পাড়ার মোড়েও যাইনি, বউমা এসে বলল তুই বিকেলে ফিরবি বলে এখনও ফিরিসনি। চল, বাড়িতে চল। তোর দিদা দাদু এসে বসে আছেন। তোর সঙ্গে দেখা না-করে যেতে পারছেন না। দেখ তো তোর জন্য ঘুড়িটা পর্যন্ত রেখে আসার সময় পাইনি! বাঁদর।”

জ্যাকসন রাধাকাকুর শেষ কথাটার মর্যাদা রাখতেই বোধহয় বাঁদরের মতো মুখ করে হাসল। বলল, “ইস্‌, ভুলেই গিয়েছিলাম, চলো চলো।” তারপর দিয়েগোর দিকে ফিরে বলল, “তা হলে ওই কথাই রইল, পাঁচের বেশি নয়। মেয়েদের দুঃখটাও তো দেখতে হবে।”

রাধাকাকু দাঁড়িয়ে পড়ল, “ও! পরশু তোমাদের রবিন মেমোরিয়ালের সঙ্গে খেলা, না? দিয়ো তো ওই স্কুলটাকে হারিয়ে। ওই রবিন মেমোরিয়ালের ন্যাংলাপ্যাংলাগুলো সব এক-একটা ক্ষুদ্র শয়তান। আমাকে বলে কিনা ‘আধা কাকু আধা কাকিমা।’ দিয়ো তো বেশ করে হারিয়ে। আমাদের স্কুলের ইজ্জত তোমার হাতে। মানে ইয়ে, পায়ে।”

দিয়েগো জানে রাধাকাকু নঙ্গী হাই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র। দিয়েগো মনে মনে হাসল— কী ভাবে এরা? ও একা জেতাতে পারে নাকি? অবশ্য আগের ম্যাচগুলোর ফলাফল দেখলে সবার এটা মনে হবেই। কারণ বাস্তবিকই দিয়েগোর কাছেই রবিন মেমোরিয়াল হেরেছে, নঙ্গী হাই স্কুলের কাছে নয়।

রাধাকাকু আর জ্যাকসন চলে গেল। অঞ্চলটা একদম ফাঁকা হয়ে গেছে এখন। দূরে টিমটিম করছে বাটা অ্যাবজলমেন্ট কোয়ার্টারের আলো। দোতলা কোয়ার্টারগুলোকে কেমন ভুতুড়ে দেখাচ্ছে। তার সামনের বিশাল বড় বড় দুটো মাঠকে দেখে তেপান্তরের মাঠ বলে মনে হল দিয়েগোর। বিকেলে খেলা হলেও, এই মাঠগুলোতে একটু সন্ধের পর থেকেই জোড়ায় জোড়ায় ছেলেমেয়েরা এসে বসতে শুরু করে। মাঠের সামনের রাস্তায় আলো নেই। আসলে ওগুলো যতবারই লাগানো হয় ততবারই কারা যেন আলোগুলো ভেঙে দিয়ে যায়। আলোয় অসুবিধে হয় যে! একবার হাতঘড়িটা দেখল দিয়েগো, ওরে বাবা আর সময় নষ্ট করা যাবে না। ও সাইকেলে উঠে পড়ল। বাড়ি গিয়ে অ্যাকাউন্টেন্সি নিয়ে বসতে হবে। সায়েন্স কঠিন বলে মাধ্যমিকের পরে কমার্স নিয়েছিল ও। এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে যে এও খুব কঠিন ঠাঁই। বিশেষ করে অ্যাকাউন্টেন্সি। ওঃ কবে যে এইচ এস-এটা শেষ হবে। এ ছাড়াও মায়ের শরীরটাও খারাপ। বাড়ির বাইরে বেশিক্ষণ থাকতে মন চায় না ওর।

শিব মন্দিরের রাস্তার থেকে বাঁদিকে বাঁক নিল দিয়েগো। পরিষ্কার পিচ করা রাস্তা, ফঁকা। দু’দিকে ছাতিম, গুলমোহর আর রেনট্রির সারি। যদিও এখন পাতাঝরা, তবু খুব সুন্দর।

সামনেই কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্ক। দিয়েগো দেখল তার কাছে এক দঙ্গল ছেলে দাঁড়িয়ে। মার্কারি ভেপার ল্যাম্পের আলোয় দিয়েগো চিনতে পারল ওদের। রবিন মেমোরিয়ালের ছেলেরা। ওরা প্র্যাকটিস শেষ করে ফিরছে। সবারই কাঁধে কিট ব্যাগ, গায়ে জার্সি। পরশুর ম্যাচের জন্য ওরাও নিশ্চয়ই খুব খাটছে। দিয়েগো জানে সহজে ছেড়ে দেবে না ওরা। কারণ ওরাও জানে এইবার নঙ্গী হাই যদি জিতে যায়, কাপটা নঙ্গী হাই-এর হয়ে যাবে চিরদিনের মতো। আর ওরাও জানে নঙ্গী হাই-এর একমাত্র অ্যাডভান্টেজ হল দিয়েগো। তাই ওর ওপর ওদের একটা চাপা আক্রোশও আছে যেন। সুযোগ পেলেই ওরা দিয়েগোকে হেনস্থা করে। দিয়েগো জানে এখনও ওকে দেখলে ওরা ‘কী গো’, ‘হ্যাঁ গো’, ‘ও গো বলে আওয়াজ দেবে। দিয়েগো সাইকেলের স্পিড বাড়াল। ফালতু ঝামেলা ভাল লাগে না। কিন্তু ওদের পাশ কাটিয়ে বেরোতে পারল না। আওয়াজটা এল। তবে অন্যভাবে। ভিড় থেকে একটা চিৎকার উঠল, “দিয়েগো, অ্যাই দিয়েগো, দাঁড়া কথা আছে।” রুদ্র। গলা শুনেই দিয়েগো বুঝেছে। বাধ্য হয়ে সাইকেল থামাল ও। দেখা যাক কী ব্যাপার।

রুদ্র রবিন মেমোরিয়ালের ক্যাপ্টেন। লম্বা, ছিপছিপে চেহারা, আর দেখতেও খুব সুন্দর। সবসময়ই একটা ঘ্যাম নিয়ে চলে ও। ওর বাবা বিদেশি এক ব্যাঙ্কের ম্যানেজার, মা ইনকাম ট্যাক্সের উকিল। বাড়ির অবস্থা খুব ভাল। এর ওপর রুদ্র নিজেও পড়াশুনোতে খুব ভাল। বিশেষ করে অ্যাকাউন্টেন্সিতে দারুণ। টিউশনে এক ব্যাচেই পড়ে ওরা।

দিয়েগো সাইকেল থামাতেই রুদ্র ওদের দঙ্গলটার থেকে বেরিয়ে এল। তারপর দিয়েগোকে বলল, “চল কোথাও বসি, একটু কথা আছে।”

দিয়েগো সামান্য আপত্তি জানাল, “না রে আজ সময় নেই। বাড়িতে গিয়ে অ্যাকাউন্টেন্সি নিয়ে বসতে হবে। আর মাসখানেক বাকি আছে টেস্টের।”

“ধুর ছাড় তো। কোন চ্যাপ্টারটা সমস্যা হচ্ছে বলিস দেখিয়ে দেব।” রুদ্র কনফিডেন্টলি বলল। এভাবে বললে আর ও কী করবে? অগত্যা রাজি হল দিয়েগো।

কাছেই পিৎজার নতুন একটা দোকান খুলেছে। ‘নিউল্যান্ড ক্যাফে’। ঝাঁ চকচকে সাইন বোর্ড তার। ভেতরে উর্দি পরা ওয়েটার, হালকা সুরে মিউজিক বাজে। চারিদিকে আয়না লাগানো দেওয়াল। কেমন যেন পার্ক স্ট্রিটের কোনও দোকান মনে হয়। সত্যি বলতে কী এই দোকানটায় ঢুকতেই কেমন কমপ্লেক্সে ভোগে দিয়েগো। কলকাতা থেকে মাত্র দশ কিলোমিটার দূরে এই ছোট্ট বাটানগর। শহর তাই দ্রুত ছুঁয়ে ফেলেছে তাকে।

দুটো চিকেন পিৎজার অর্ডার দিল রুদ্র। দিয়েগো বুঝল না কী এমন দরকার পড়ল রুদ্রর যে এত কস্টলি দোকানে ঢুকিয়ে জামাই আদর করছে! রুদ্রই প্রথমে মুখ খুলল, “তোর সঙ্গে দেখা হয়ে ভালই হয়েছে, না হলে রাতে তোর বাড়িতে যেতাম।”

“আমার বাড়িতে? কেন?” দিয়েগো খুব অবাক হল। রুদ্রর সঙ্গে ওর তেমন বন্ধুত্ব নেই যে রুদ্র ওর বাড়িতে যাবে। তা ছাড়া দিয়েগো চায় না ওর বাড়িতে কেউ যাক। বিশেষ করে এখন। কারণ একটা গুরুতর সমস্যা শুরু হয়েছে ওর জীবনে, ও চায় না কেউ সেটা জানুক।

রুদ্র এক চুমুক জল খেয়ে বলল, “একটা ছোট্ট প্রস্তাব আছে আমার। বিজনেস ডিলও বলতে পারিস। গিভ অ্যান্ড টেক।”

“মানে, কী বলতে চাইছিস তুই?”

পিৎজা এসে গেছে। রুদ্র এক কামড় দিয়ে শুরু করল, “আগে বল রুপাইকে তোর কেমন লাগে?”

ধক করে উঠল দিয়েগোর বুক। রুদ্র জানল কী করে? কারও তো জানার কথা নয়। “কী রে চুপ করে গেলি কেন? বল, রুপাইকে কেমন লাগে তোর?”

“কেমন আবার ওই ঠিক আছে।” আমতা আমতা করে উত্তর দিল দিয়েগো।

“ঠিক আছে? শুধুই ঠিক আছে? হুঃ আমি কিছু বুঝি না, না? কোচিংয়ে হাঁ করে তো শুধু রুপাইকেই দেখিস। শোন, যদি সত্যি কথা বলিস তা হলে একটা উপায় বের করি।” বলে ইঙ্গিতপূর্ণভাবে চোখ টিপল রুদ্র।

দিয়েগো বিষম খেল। চিকেন পিৎজার মুরগি যেন পেটের মধ্যে জ্যান্ত হয়ে উঠেছে। কারণ কথাটা সত্যি। ওর অ্যাকাউন্টেন্সি অর্ধেক মাথায় ঢােকে না রুপাইয়ের জন্যই। ওরা একসঙ্গেই তাপস স্যারের কোচিংয়ে পড়ে। স্যার পড়ানও খুব ভাল। কিন্তু রুপাইকে দেখলেই সব গুলিয়ে যায় ওর। সেই ক্লাস ইলেভেনে যেদিন প্রথম দেখেছিল রুপাইকে সেদিনই বুঝেছিল দিয়েগো যে হায়ার সেকেন্ডারির রেজাল্টের বারোটা বাজল। এরকম মেয়ের সামনে বসে পড়া যায় নাকি? কোচিংয়ে সবার সঙ্গে কথা বলে দিয়েগো কিন্তু এই বছরখানেকের বেশি হয়ে গেলেও রুপাইয়ের সামনে বিশেষ কথা বলতে পারে না ও। কে যেন ওর মুখের মধ্যে ব্লটিং পেপার ঢুকিয়ে দেয়। একবার রুপাই ওকে জিজ্ঞেস করেছিল, “ক’টা বাজে?” ঘাবড়ে গিয়ে দিয়েগো বলে ফেলেছিল, “খুব বাজে, ভীষণ বাজে।” রুপাই এমন অবাক হয়ে গিয়েছিল যে আর প্রশ্ন করতে ভরসা পায়নি। দিয়েগো মাঝে মাঝে ভাবে ও কি কোনওদিন রুপাইকে বলতে পারবে না নিজের কথা? দিয়েগোর কথা নয়, দয়ারাম আংরের কথা?

“কী রে ভ্যাবলা মেরে গেলি যে? বল রুপাইকে তোর পছন্দ কিনা?” রুদ্র সামান্য হেসে আবার জিজ্ঞেস করল।

দিয়েগো মিয়ানো গলায় বলল, “হলেই বা কী হয়েছে? ও যদি বেল হয় তো আমি ঠোঁট ভাঙা কাক।”

“বা বা, দিয়েগো থেকে যে নেরুদা হয়ে উঠলি রে! হুম, মানে প্রেমে পড়েছিস! কী ঠিক না?” রুদ্রর কথায় দিয়েগো চুপ করে মাথা নাড়ল শুধু। রুদ্র আবার হাসল, বলল, “তোর সমস্যা হল তুই প্রপোজ করতে পারছিস না, রাইট?”

“হ্যা, ঠিক।”

“আমি একটা উপায় বের করতে পারি, তবে…”

“কী বল না, বল।” দিয়েগো উৎসাহিত হয়ে উঠল। অবশ্য ইচ্ছে করলে রুদ্র উপায় বের করতেই পারে। রুপাই রবিন মেমোরিয়ালে রুদ্রর সঙ্গেই পড়ে। তা ছাড়া কোচিং থেকে প্রায় রোজই একসঙ্গে বাড়ি ফেরে। এক পাড়াতেই বাড়ি যে।

“শোন দিয়েগো, আমি রুপাইয়ের সঙ্গে তোকে ফিট করে দিতে পারি, কিন্তু আমার একটা রিকোয়েস্ট আছে। সেটা তোকে রাখতে হবে।” রুদ্র হঠাৎ সিরিয়াস হয়ে গেল!

“কী রিকোয়েস্ট?” দিয়েগো অবাক।

“পরশুর ম্যাচটা তোকে ছাড়তে হবে।” শান্ত গলায় বলল রুদ্র।

“মানে?” থতমত খেয়ে গেল দিয়েগো। বলে কী ছেলেটা? ম্যাচ ছাড়তে হবে? এ যে ম্যাচ ফিক্সিং! বিশ্বাসঘাতকতা! এ সম্ভব নাকি? দিয়েগো বলল, “কী যা তা বলছিস? ইয়ারকি মারিস না।”

“না, ইয়ারকি মারছি না তো। শোন, পরশুর ম্যাচটা ছাড় আর ব্যস রুপাই তোর। আমি খুব বেশি কিছু চাইছি না। তুই শুধু গোলে বল না-মেরে বাইরে মারবি। কাউকে বিশেষ কাটাবি টাটাবি না। আর দেখিস যদি আমরা গোল করতে পারছি না, তুই টুক করে একটা সেম সাইড গোল করে দিবি! কেমন?”

দিয়েগোর মাথা বোঁ বোঁ করছে। বলে কী ছেলেটা? পাগল নাকি? রুদ্র আবার বলল, “দেখ, তুই তো জানিস এই ম্যাচটার গুরুত্ব কতটা। আমার ক্যাপটেন্সিতে এবার আমি কাপটা জিততে চাই।”

দিয়েগো চোয়াল শক্ত করে দাঁত চেপে বলল, “আর যদি আমি রাজি না হই?”

রুদ্র হাসল, “তা হলে আমি রুপাইকে গিয়ে বলব যে দিয়েগো একটা খারাপ ছেলে। তোর দিকে দিয়েগোর কুনজর আছে। যে-কোনওদিন বড় রকমের কোনও ক্ষতিও করে দিতে পারে। সিম্পল।”

দিয়েগো চুপ করে গেল। মুখ লাল। রুদ্র এখনও হাসছে, বলল, “থিঙ্ক ওভার ইট মারাদোনা। আমার প্রস্তাবে রাজি হলে রাজকন্যা তোর। মাত্র নব্বইটা তো মিনিট। খেলার পরে একটু গালাগালি খাবি, এই তো। তারপর সবাই ভুলে যাবে। আরে সবাই ভুলে যায়। কেউ সারাজীবন এসব মনে রাখে নাকি? বল এখন তোর কোর্টে। ভেবে দেখ কী করবি।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *