অনেক উঁচুতে ঘুড়িটা উড়েছে। লাল চিলের মতো একটা ঘুড়ি। একটা লাল পাখি আকাশের থেকে যেন নিষ্পলক তাকিয়ে আছে নীচে। আকাশের থেকে মাটি দেখতে কেমন লাগে জ্যাকসন জানে। একবার ব্যাঙ্গালোর থেকে জেট এয়ারওয়েজের প্লেনে করে কলকাতায় এসেছিল জ্যাকসন। সেটা ছিল ইভিনিং ফ্লাইট। হায়দ্রাবাদে প্লেনটা দাঁড়িয়েছিল কিছুক্ষণ। জানলার পাশে সিট নিয়েছিল জ্যাকসন। প্লেনটা যখন রানওয়েতে নামার জন্য অনেকটা নীচে নেমে এসেছিল, জ্যাকসন অবাক হয়ে দেখেছিল আলোর এক শহর। যেন দীপাবলির রাত। সেরকম দৃশ্য আর কোনওদিন দেখেনি ও। এখনও মাঝে মাঝে রাতের বেলায় ওদের বাড়ির ছাদে গিয়ে দাঁড়ালে ওর মাথার ওপর যেন সেই রাতটাই ফিরে আসে। অসংখ্য তারার আলো দেখে মনে হয় কে যেন সারা আকাশটায় একটা একটা করে প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছে।
আজ লাল ঘুড়িটা দেখে হঠাৎ সেই কথাগুলো মনে পড়ে গেল জ্যাকসনের। কিন্তু কেস কী? এরকম তো হয় না। এত ফিলজফির লক্ষণ তো ভাল নয়। এসব রোগ তো ডুডু, কবীরদের আছে। তবে কি সঙ্গদোষ? অবশ্য হবে নাই বা কেন! ফিলজফিক আঁতলামি শুনতে শুনতে তো কানের খোলের প্রোডাকশন রেট বেড়ে গেছে। আর হেডস্যারও পারেন বটে। কে যে ওঁকে ফুটবল ম্যাচটা দেখতে আসতে বলেছিল। আরে বাবা পড়াশুনোর মানুষ পড়াশুনোয় থাকুন না। শুধুমুধু খেলা দেখতে এসে ঝামেলা পাকানো কেন?
আসলে আজ খেলা ছিল। কাঠ গোলা বয়েস ভার্সেস নঙ্গী হাই স্কুল। পুরু এই খেলাটা আয়োজনের কথা বলেছিল। খেলাটা হওয়ার কথা ছিল ডিসেম্বরের শেষে কিন্তু খেলাটা হল আজ এগারোই জানুয়ারি। আজ ইদ বলে স্কুল বন্ধ আর ব্যস, হেডস্যার চলে এসেছেন মাঠে খেলা দেখতে। আর এমনই কেলো যে আজই ম্যাচটা এক গোলে হেরে গেছে জ্যাকসনরা। স্বভাবতই বেশ মন খারাপ হয়ে আছে ওদের। পুরু একটু বেশি বিষন্ন। কে জি বি ওদের সব প্লেয়ার নামায়নি, আর খেলায় বিশেষ গা-ও লাগায়নি। তবু বোঝা গেছে যে টিমটা ছন্দে নেই নঙ্গী হাই স্কুলের। কে জি বি অনেকগুলো ওপেন করেছিল। কিন্তু কবীর একা আটকেছে সব। দিয়েগো মাঠে এসেও এ-ম্যাচটায় খেলেনি। তবে দিয়েগো প্র্যাকটিসে যা ফর্ম দেখাচ্ছে, জ্যাকসন জানে দিয়েগো খেললেও স্কোর লাইন একই হত। নেহাত কবীর ছিল। জান প্রাণ দিয়ে অবিশ্বাস্য সব সেভ করেছে। কোনওটা পেছন দিকে উড়ে, কোনওটায় ফুল স্ট্রেচ করে, আবার কোনওটা বিপক্ষের প্লেয়ারের পায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে নিশ্চিত গোল বাঁচিয়ে দিয়েছে। তবে কতক্ষণ আর কুম্ভ একা রক্ষা করবে? ফলে এক গোল খেতেই হয়েছে।
জ্যাকসন নিজে কম ছড়ায়নি। পুরু পইপই করে জ্যাকসনকে বলেছিল শট গোলে মারতে যাওয়ার সময় এক চোখ বন্ধ রাখতে। কিন্তু প্রতিবারই শট মারার পর জ্যাকসনের মনে হয়, যাঃ চোখ বন্ধ করতে তো ভুলেই গেলাম। ডুডু হাফটাইমে জিজ্ঞেস করেছিল, “কী রে জ্যাকসন, স্যার তোকে এক চোখ বন্ধ করে শট মারতে বলেছেন না? ঠিক তাই করছিস তো?”
জ্যাকসন বলেছিল, “ওসব চোখ ফোক বন্ধ করতে পারব না। তারপর খেলার সময় অমন করব আর সাইড লাইন থেকে রবিন মেমোরিয়ালের মেয়েরা এসে জুতো পেটা করুক আর কী।”
“জুতো পেটা?” ডুডু অবাক।
“ওরা যদি ভাবে ওদের চোখ মারছি? পুরু স্যার ডেঞ্জারাস জিনিস। ওঁর কথা আমি শুনব না বাবা।”
ম্যাচের শেষে এখন ওরা মাঠে বসে আছে। সামনে পুরু আর হেডস্যার। খেলার শেষে পুরু সামান্য একটু বলেছে। প্রথমে কার কোথায় ভুল হয়েছে সংক্ষেপে বলে পুরু বলেছে, “তোমাদের খেলতে দেখে আজ আমার কষ্ট হয়েছে খুব। কারণ তোমরা সবাই ফুটবলটা জানো, কিন্তু কেউ ফুটবলটা খেলছ না। সবাই যে যার মতো একটা খেলা খেলছ। ফুটবল অর্কেস্ট্রার মতো। সবাই ঠিক বাজালে তবেই মিউজিক একটা জায়গায় পৌঁছোয়। আমি এই ক’দিন তোমাদের মধ্যে থেকে বুঝেছি যে তোমাদের সবার মধ্যেই নানা টেনশন আছে। ‘এক্স’-এর সঙ্গে ‘ওয়াই’-এর গন্ডগোল, ‘বি’-এর সঙ্গে ‘সি’-এর মুখ দেখাদেখি বন্ধ। কিন্তু ফুটবলের মাঠে নামলে সব ভুলে যেতে হয়। মারাদোনা গোলের সামনে বল সাজিয়ে দিত কিন্তু বুরুচাগা বা ভালদানোকে গোল দিতে হত। তোমরা শোনোনি সেই গল্পটা? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় একটা কনসেনট্রেশন কাম্পে নাতসিরা বন্দিদের সঙ্গে একটা ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করেছিল। নাতসিদের কয়েকজন অফিসার বন্দিদের বলেছিল যে বন্দিরা যদি ম্যাচটা ইচ্ছে করে হেরে যায় তবে বন্দিদের আর মেরে ফেলা হবে না। আর নাতসিদের সম্মানও বাঁচবে। বন্দিদের দিয়ে ম্যাচের আগেই তাদের কবর খুঁড়িয়ে রাখা হয়েছিল। কিন্তু বন্দিরা ভয় পায়নি, তারা এককাট্টা হয়ে নাতসিদের দুরমুশ করে জিতেছিল ম্যাচটা। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও খেলা ছেড়ে পালায়নি। যে পালায় না সেই শেষ পর্যন্ত জেতে। তোমরা কি ভেবেছ বন্দিদের নিজেদের মধ্যে মনোমালিন্য ছিল না? ছিল, খুব ছিল। কিন্তু যখন একসঙ্গে কোনও কিছু করতে হয় ব্যক্তির চেয়ে সমষ্টিটাই প্রধান তখন। সম্মান আর খেলার চেয়ে বড় কিছু হয় না। ইট ইজ নট জাস্ট গেম ইট ইজ স্পোর্টস। তোমরা আরও প্র্যাকটিসে মন দাও। প্রায় সপ্তাহ তিনেক সময় আছে এখনও। আয়াম শিয়োর উই ক্যান পুল ইট আপ টুগেদার। চিয়ার্স।”
গোটাটা শুনে জ্যাকসনের ভেতরে একটা চনমনে ভাব এসেছে। পুরু স্যার ব্যাপক বলে তো! এটাই কি সেই ‘ভোকাল টনিক’ বা ‘পেপ টক’? সে যত টক মিষ্টি ঝালই হোক না কেন জ্যাকসনের রক্ত গরম হয়ে উঠেছে। অবশ্য ঠান্ডা হতেও বিশেষ সময় লাগল না। এবার হেডস্যার উঠলেন বলতে, “তোমরা সব পড়াশুনো ঠিকঠাক করছ তো? মনে থাকে যেন সামনেই পরীক্ষা কিন্তু। আজ তোমাদের খেলা দেখে আমার বিশেষ ভাল লাগল না। আর তোমাদের পুরু স্যার ইনডাইরেক্টলি বলেছিলেন তোমাদের মধ্যে পারসোনাল ডিফারেন্সের কথা। এর মানে কি টিমের মধ্যে তোমরা ঝগড়া করছ? আমার কানে কিছু কথা এসেছে গত ম্যাচে আমাদের হার নিয়ে। শোনো, কোনওরকম অসভ্যতামো আমি বরদাস্ত করব না। পুরু তোমাদের চেয়ে বেশি বড় নয়, তোমরা তাকে তাই বলে অগ্রাহ্য করবে না। যদি আমি উলটোপালটা কিছু দেখি বা শুনি আমি কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে স্টেপ নেব। আর ফুটবল একটা খেলাই শুধু নয়, আমাদের নঙ্গী হাইস্কুলের ঐতিহ্য। এটা সবসময় মাথায় রাখবে, বুঝেছ?”
হেডস্যার যে ভীষণ রেগে আছেন সেটা বিলক্ষণ বুঝল জ্যাকসন, ওর পাশে বসে আমন ফিসফিস করে বলল, “একদম ‘গিভ আপ’ স্যার। স্কুলেও হাবিজাবি বকেন এখানেও হাবিজাবি বকছেন। ম্যাচ হেরেছি ঠিক আছে, তা বলে এভাবে ‘গিভ আপ’ স্পিচ দিতে হবে?”
জ্যাকসন বলল, “চেপে যা, না হলে তোকে ‘গিভ ডাউন’ করতে সময় লাগবে না।”
কিন্তু হেডস্যার ভালমানুষ। বেশিক্ষণ রাগ করে থাকতে পারেন না। কথাগুলো বলার পর গোঁজ হয়ে রইলেন মিনিট দুয়েক তারপর বললেন, “অনেক খেলাধুলো হয়েছে, তোমাদের খিদে পায়নি? চলো সার্ভিস মার্কেটে, লুচি আলুরদম খাবে।” খিদে পায়নি মানে? জ্যাকসনের পেটে হাউহাউ করছে খিদে। মনে হচ্ছে গোটা শরীরটাই পেট হয়ে গেছে। ঘণ্টা দেড়েক খাটুনির পর জ্যাকসনের মনে হচ্ছে মাঠের ঘাসগুলোই এখন খেতে শুরু করে। এত খিদে কোথায় লুকিয়ে থাকে কে জানে। আর হেডস্যারের প্রস্তাবটাও মোক্ষম। সার্ভিস মার্কেটে যাওয়া। বাটানগরে এখন অনেক পিৎজার দোকান হয়েছে, পেস্ট্রির দোকান হয়েছে, কিন্তু জ্যাকসনের কেন জানে না এসব খেতে ভাল লাগে না। ফ্যাশন করে অন্যদের সঙ্গে খেতে গিয়ে দেখেছে ওর তেমন ভাল লাগছে না। অন্যরা যদিও ‘খুব ভাল’, ‘খুব ভাল’ বলছিল তবু ওর জানি কেন মনে হচ্ছিল সবাই গণ ঢপ মারছে। আসলে কারওই ভাল লাগছে না। জাস্ট নিজেকে স্টাইলিস দেখাবার জন্য এই মরার হাতের চামড়ার মতো পিৎজা চিবোচ্ছে।
লুচি তরকারি জ্যাকসনের ফেভারিট। আর সার্ভিস মার্কেটে এটা বানায়ও দারুণ। জ্যাকসনের বাবাদের আমল থেকে সার্ভিস মার্কেট বাটানগরে বিখ্যাত। কাটলেট, লুচি তরকারি বা মোগলাই পরোটা সব কিছুই এখানে দারুণ বানায়। আর কী আশ্চর্য! খাবারের কোয়ালিটিও সেই পুরনো দিনের মতোই আছে। সাহেব কলোনিতে ঢোকার যে-গেট তার উলটোদিকে একটু দূরেই ‘বাটাবাজার’ নামে বাটার জুতোর দোকান আর কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্ক। এর পেছনেই বিখ্যাত সার্ভিস মার্কেট। ছেলেবেলা থেকে এখানে খেতে এসে ওপরের সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থাকত জ্যাকসন। কম সে কম তিনতলা অবধি উঁচু একতলার সিলিং। সেখান থেকে লম্বা রড দিয়ে ঝোলানো পুরনো ডি সি পাখা। অত উঁচু একতলা বাড়ি জ্যাকসন শুধু সার্ভিস মার্কেটে এলেই দেখতে পেত। সেই উঁচু সিলিং থেকে ঝোলা পাখা, খাবারের হালকা গন্ধ, স্টিলের কাঁটা চামচ! সত্যিই ছোটবেলা আর ফিরে আসে না।
ডুডু বলল, “কী কেস বল তো? হেডস্যার খাওয়াচ্ছেন কেন?”
জ্যাকসন বলল, “সবাই তোর ঠাকুরদার মতো কিপটে নাকি যে দেখা হলেই খাওয়ার কথা বাদ দিয়ে আহ্নিক করো, মঙ্গলবার লাল জামা পরো, শুক্রবার সিনেমা দেখো না, এসব বলবে।”
ডুডু বলল, “তোর সঙ্গে কথা বলাটাই ঠিক নয়। আমায় বাঁশ দিয়ে এখন আমার ঠাকুরদার নিন্দে করছিস?”
মাঠ থেকে বেরিয়ে একসঙ্গে দল বেঁধে হাঁটতে শুরু করল ওরা। যেন মিছিল চলেছে। জ্যাকসন দেখল পুরু হঠাৎ হেডস্যারের কাছে গেল। কী? না পুরু যেতে পারবে না। ওর খুব দরকারি একটা কাজ আছে। হেডস্যার কিন্তু কিন্তু করেও পুরুকে ছেড়ে দিলেন। জ্যাকসন মনে মনে হাসল। ও জানে পুরুর জরুরি কাজটা কী। জ্যাকসন দেখেছে।
সেই সন্ধেয়, যেদিন পুরু সেই ছিনতাইবাজ তিমিরকে ধরেছিল, সেদিনই পুরুর চোখ দেখে বুঝেছিল জ্যাকসন যে স্যার এবার গেছেন। ওই চুপ-করে-থাকা মেয়েটা স্যারকে একদম শুইয়ে দিয়েছে। তারপর বেশ কয়েকদিন দেখেছে জ্যাকসন। মেয়েটা বিকেলের দিকে একটা নির্দিষ্ট সময়ে বাটা সিনেমার সামনে দিয়ে যায়। জ্যাকসন যাতায়াতের পথে দেখেছে যে, সে-সময়টা পুরু সিনেমা হলের সামনে একটা চায়ের দোকানে বসে থাকে। প্রথমে ব্যাপারটাকে অতটা গুরুত্ব দেয়নি ও। কিন্তু তিন-চার দিন একই ঘটনা চোখে পড়ায় একদিন নিজের থেকে লুকিয়ে দেখতে গিয়েছিল জ্যাকসন। আর হ্যাঁ যা ভেবেছে তাই। মেয়েটা রাস্তা দিয়ে গেল আর পুরু ড্যাবড্যাব করে দেখল। আর মেয়েটা চলে যেতেই পুরু সাইকেল নিয়ে অন্যদিকে চলে গেল। জ্যাকসন অবাক হয়ে দেখেছিল পুরু কিন্তু মেয়েটাকে ফলো করল না।
এখনও যে সেই একই কেস, জ্যাকসন জানে। ও দেখল পুরু দ্রুত চলে গেল সিনেমা হলের রাস্তায়। ‘প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে’ আশ্চর্য জীবন। এই যে চারিদিকে সবাই ধপাধপ প্রেমে পড়ছে সেটা কি বাটানগরের এত সুন্দর পরিবেশের গুণ, না এরই আরও গ্রেটার কোনও কসমিক ডিজাইন আছে? আশপাশের লোকেরা বাটানগরকে বৃন্দাবন নগর বলেই ডাকে। এমনকী নঙ্গী স্টেশন থেকে সকাল ন’টা তেত্রিশ আর সকাল দশটা চব্বিশের আপ ট্রেনকে বলা হয় ‘প্রজাপতি এক্সপ্রেস’।
জ্যাকসনের জীবনে কোনও প্রেম নেই। কেন নেই অনেকবার চিন্তা করেছে ও। দু’-একবার তো প্রোপোজও করেছিল দু’-একজনকে। অবশ্য কেউ ওকে সিরিয়াসলি নেয়নি। নেবেই বা কেমন করে?
ক্লাস নাইনে পড়ার সময়ে একটা ভীষণ বড়লোকের মেয়েকে ও বলেছিল, “তোকে আমি খুব ভালবাসি। বিশেষ করে তোরা টয়োটা করোলা গাড়িটা কেনার পর তোকে আমার আরও ভাল লাগছে।” মেয়েটার উত্তর কী ছিল বলার জন্য কোনও পুরস্কার নেই। এর পরেরবার এতটা কাঁচা খেলেনি ও। একটা সহজ সরল মেয়ের সঙ্গে কয়েকদিন ঘুরেও ছিল। কিন্তু মেয়েটার বাবা জানতে পেরে মেয়েটাকে মারে। মেয়েটা, সেটা এসে জ্যাকসনকে বলায় জ্যাকসন ঘ্যাম দেখাতে ও ইমপ্রেস করতে গিয়ে কুত্তে, কামিনে বলে মেয়েটার বাবাকে খুব গাল দিয়েছিল। মেয়েটা পরের দিন থেকে আর কোনও যোগাযোগই রাখেনি। কিন্তু জ্যাকসনের কোনও কষ্ট হয়নি। এখন ও বোঝে সেসব প্রেম ছিল না একদম। চারিদিকে দু’-একজন প্রেম করছে দেখে ওরও ওরকম কিছু মাথায় ঢুকেছিল। এখন ভাবলে হাসি পায় ওর।
“কী রে আজ এত চুপচাপ?” দিয়েগো পাশে এসে জিজ্ঞেস করল।
“ও তুই? আজ খেললি না কেন?” জ্যাকসন প্রশ্ন করল।
“এমনি। মন বিশেষ ভাল নেই।”
“বাড়িতে কোনও টেনশন?”
“সে তো আছেই। ছাড় ওসব কথা। আজ এত কী ভাবছিস? তোকে এই রোগে কবে থেকে পেল?”
“না, এমনি। সার্ভিস মার্কেট শুনে ক’টা কথা মনে পড়ে গেল।” দিয়েগো ঠোঁট উলটে বলল, “বাবা, তোর এসব হয় নাকি?”
জ্যাকসন উত্তর না দিয়ে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। পাশেই একটা ক্যাসেট সিডির দোকান। সেখানে একটা গান বাজছে। হিন্দি। “কাজরা রে কাজরা রে তেরে কারে কারে নয়না।” “গুরু কী গান দিয়েছে।” হঠাৎ চিৎকার করে উঠল জ্যাকসন। ঐশ্বর্য রাইকে ওর একঘর লাগে। আর গানটাও ফাটাফাটি। স্থান কাল ভুলে ও হঠাৎ গানের সঙ্গে গলা মিলিয়ে চিৎকার করে গেয়ে উঠল। ওর আচমকা চিৎকারে সবাই থতমত খেয়ে গেল। একটা নেড়ি কুকুর ঘুমোচ্ছিল। সে ছিটকে উঠে রাস্তার অন্যদিকে চলে গেল। কিন্তু জ্যাকসনের সেসব হুঁশ নেই, ও নেচে যাচ্ছে। ওর হুঁশ হল হেডস্যার ওর কান ধরাতে। এক রাস্তা লোক, যার পঁচাত্তর শতাংশ ওকে চেনে, তাদের সামনে হেডস্যার ওর কান ধরলেন। তারপর কড়া গলায় বললেন, “রাস্তার মধ্যে এ কী অসভ্যতা? স্কুলের নাম সব দিক দিয়ে না-ডোবালেই হচ্ছে না? এই তোমার রুচি? রুচি উন্নত করো, বুঝেছ? রুচি উন্নত করো।”
প্রায় সার্ভিস মার্কেট এসে গেল। একদিকে সেখানকার লুচি আলুরদম, অন্যদিকে হেডস্যারের কানমলা। জ্যাকসন একবার ভাবল না-খেয়ে চলে যাবে। কিন্তু লুচিটা খুব টানছে ওকে। ও চুপচাপ দোকানে ঢুকে গেল। ও দেখল হেডস্যারকে দোকানে খুব খাতির করছে। কারণ এক, উনি নঙ্গী হাই-এর হেডমাস্টার; দুই, উনি এই দোকানের নিয়মিত খদ্দের আর তিন, সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হল দোকানটা স্যারের ভাই কিছুদিন হল কিনেছেন। স্যার ওদের বসিয়ে কাউন্টারে গিয়ে বললেন, “এই চোদ্দোজনকে চারটে করে লুচি আর আলুরদম দাও। স্পেশালভাবে তৈরি করবে, এরা সব আমার ছাত্র কিন্তু।”
জ্যাকসন মাথার ওপর তাকাল। সেই অনেক উঁচু সিলিং। লম্বা রড দিয়ে ঝোলানো ডি সি পাখা। শুধু শীতকাল বলে পাখাগুলো বন্ধ। এরই মধ্যে লুচি আলুরদম এসে গেছে। এদের সব কিছুই ফটাফট। কিন্তু লুচিতে কামড় দিয়ে নাক কুঁচকে গেল জ্যাকসনের। এ কী তৈরি করেছে আজ? তেলচিটে গন্ধ, তার ওপর রবারের মতো লুচি। ও বুঝল হুড়োহুড়ি করে ঠান্ডা লুচিই গরম করে ওদের দিয়েছে। সব স্টুডেন্টরা এ ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছে। জ্যাকসন অবাক হয়ে দেখল স্যার দিব্যি ওগুলো খেয়ে চলেছেন। একবার মুখ তুলে বললেনও, “কী চমৎকার হয়েছে না?” জ্যাকসন আর পারল না, দুম করে প্লেট সরিয়ে উঠে দাঁড়াল, বলল, “স্যার, এগুলো লুচি? ভাল লুচি? আপনার তো ভাইয়ের দোকান স্যার, বলুন লুচি উন্নত করতে।” জ্যাকসন আর দাঁড়াল না। দোকান থেকে বেরিয়ে গেল। নাও! আরও রাস্তার মধ্যে ওর কান ধরে ওর রুচি উন্নত করতে বলে ঠ্যালা সামলাও!
জ্যাকসন জানে ওর একটা কাজ করার আছে। আর সেটা ওকে করতে হবে একদম একা। কেউ সেটা জানুক ও চায় না। ওর ঘটানো গন্ডগোল ওকেই মেটাতে হবে। জ্যাকসন হাঁটতে লাগল সাহেব কলোনির গেটের দিকে। ওকে দেখে সাহেব কলোনির গেটের দারোয়ানটা বেরিয়ে এল গুমটির বাইরে। জ্যাকসনকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কোথায় যাবে?” লোকটার নেহাত বয়স হয়েছে তাই ‘তুমি’ বলাটা জ্যাকসন মনে মনে ক্ষমা করে দিল। জ্যাকসন চুপ করে আছে দেখে লোকটা আবার একই প্রশ্ন করল। জ্যাকসন এবার বলল, “সায়েকার বাড়ি যাব। ওকে বলুন মেঘাদি আমায় পাঠিয়েছে।”
“সায়েকা? মানে জানাবাবুর মেয়ে? দাঁড়াও ওদের ফোন করে একবার জিজ্ঞেস করে নিই।” লোকটা সায়েকাদের বাড়িতে সিকিউরিটি ফোন থেকে ডায়াল শুরু করল।
পাঁচ মিনিটের মধ্যে গেট দিয়ে বেরিয়ে এল সায়েকা। আজ সামনে থেকে ভাল করে দেখে বুঝল ডুডু কেন অত আপসেট হয়ে আছে। এ-মেয়েগুলোর জন্যই ট্রয়ের যুদ্ধ ফুদ্ধ হয়। জ্যাকসনের মনে হল ভগবানের উচিত এক্ষুনি এই টাইপের মেয়ে তৈরি করা বন্ধ করে দেওয়া। সায়েকা গম্ভীর আর বিস্ময় মেশানো গলায় বলল, “মেঘাদি তোমায় পাঠিয়েছে?” জ্যাকসন দেখল দারোয়ানটা আবার গুমটিতে ঢুকে গেছে। আশেপাশে কেউ নেই। ও বলল, “না, মেঘাদি পাঠায়নি, ওটা না-বললে তুমি আমার সঙ্গে দেখা করতে না।”
সায়েকা বিরক্ত গলায় বলল, “তবে কী চাও তুমি? দেখো আমি জানি তুমি ওই বাজে ছেলেটার বন্ধু। আমি তোমার সঙ্গে কোনও কথা বলতে চাই না। তা ছাড়া আমার প্যাকিং করার আছে।”
“প্যাকিং? কেন?” জ্যাকসন এবার অবাক হল।
“কাল আমরা দিল্লি যাচ্ছি। আমার দিদা খুব অসুস্থ। দু’-তিন সপ্তাহের আগে ফিরব না।”
জ্যাকসন ভাবল কথাগুলো সায়েকা ওকে বলছে কেন? যাতে ঠিক জায়গায় কথাগুলো পৌঁছে যায় তাই? জ্যাকসন বলল, “তবে আর কী, আমি আসলে বলতে এসেছিলাম যে ডুডু খুব কষ্টে আছে।
“খারাপ ছেলেরা কষ্টেই থাকে।” সায়েকার গলায় ঝাঁঝ।
“না মানে তোমাদের ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে একটা।”
‘ভুল বোঝাবুঝি? কেন কীসের ব্যাপারে? ও পরীর সঙ্গে যেখানে খুশি ঘুরতে পারে। আই কেয়ার আ ড্যাম।”
“নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই, কিন্তু তোমার জানা দরকার পরী ওর গার্লফ্রেন্ড নয়।”
সায়েকার ভুরু এবার বিরক্ত থেকে অবাকে মোড় নিল, “তবে সেদিন যে তুমি বললে এই বেলা পরী, ওই বেলা আর একজন। সেটা?”
“ওঃ ইয়ারকিও বোঝো না?” জ্যাকসন হালকা গলায় বলল।
“ইয়ারকি?” সায়েকার গলায় এবার দ্বিধা। জ্যাকসন বুঝল সায়েকার জ্যাকসনের কথা বিশ্বাস করতে খুব ইচ্ছে করছে কিন্তু করতে পারছে না। ও এবার সায়েকাকে আশ্বস্ত করার জন্য বলল, “হ্যা ইয়ারকিই তো। পরীর অন্য প্রেমিক আছে। ডুডু জাস্ট ফ্রেন্ড।”
“অন্য প্রেমিক? মানে? তুমি শিয়োর?” সায়েকা উদগ্রীব হয়ে উঠেছে।
“টু হান্ড্রেড পারসেন্ট।” জ্যাকসন স্মার্টলি বলল।
“কে সে? পরীর প্রেমিক কে?” কী সাংঘাতিক প্রশ্ন করে রে বাবা মেয়েটা। এর তো সি বি আই-এ চাকরি করা উচিত।
জ্যাকসন বুঝল ও ভালই ফেঁসে গেছে। সায়েকা জ্যাকসনকে চুপ করে থাকতে দেখে আবার প্রশ্ন করল, “কে বলো? যদি তুমি দুশো পারসেন্ট শিয়োর হও, তবে তো তুমি জানবেই।”
জ্যাকসন ঢোঁক গিলল। এই রে একটা নামও মনে আসছে না। কী বলবে ও? সায়েকার ভুরু আবার সন্দেহজনকভাবে বাঁকতে শুরু করেছে। জ্যাকসন দেখল কেস এবার বিগড়ে যাবে। তাই কেস যাতে না-বিগড়োয় ও তাড়াতাড়ি বলল, “আমি।”
