নগরবধূ আম্রপালী – ৯

 নয়

মেয়ে তাঁর কবে বড় হয়ে গেছে তা টের পাননি মহানমা। সেই কবে আমবাগানের ছায়ায় অবহেলায় পড়ে থেকে কাঁদছিল মেয়েটি। একরত্তি শিশুটিকে গৃহ নিয়ে এসেছিলেন তিনি। তুলে দিয়েছিলেন হরিবালার হাতে। তারপর বড় করে তোলা। কখনও তাঁরা ভাবেননি এ মেয়ে তাঁদের নয়। নিজেদের সন্তানের মতো করেই আগলে রেখেছিলেন অম্বাকে। কিন্তু আজ এই সভায় এ কোন অম্বাকে দেখছেন তাঁরা? গোটা বিধানসভায় উপস্থিত রাজপুরুষদের চুপ করিয়ে দিয়েছে ওইটুকু মেয়ে। কিন্তু এতো সাহস তো ভালো নয়। এই নীরবতাই হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যে ঝড় হয়ে নেমে আসবে তাঁর মেয়ের জীবনে। মুহূর্তের মধ্যে রাজাদের নির্দেশে গুমঘরে গুম করে রাখা হবে তাঁদের মেয়েকে। তারপর মৃত্যুদণ্ড। সর্বনাশ! ভাবতেই শিউরে উঠলেন মহানমা। মেয়েকে বাঁচাতে তিনি দ্রুত হাতজোড় করে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, “মহারাজ ও ছেলেমানুষ। কী বলতে কী বলেছে। ওর কথা ধরবেন না। আসলে ছোট থেকে ওকে আমরা আদরে মানুষ করেছি।” এই অবধি বলে মহানমা পাশে বসা স্ত্রী হরিবালার দিকে তাকালেন। আসলে তিনি সেই মুহূর্তে চাইছেন হরিবালা তাঁকে সমর্থন জানাক। হরিবালা এসব দেখে শুনে ভয়ঙ্কর বিচলিত হয়ে পড়েছেন। তিনি চেয়েছিলেন মেয়ের বিবাহ দেবেন ধুমধাম করে। কিন্তু কিশোরী কন্যাকে পাত্রস্থ করতে গিয়ে এ কোন নরকে ঠেলে দিচ্ছেন তাঁরা?

মহানমা দেখলেন হরিবালা ফ্যালফ্যাল একবার তাঁকে দেখছেন আর একবার অম্বাকে দেখছেন। পরিস্থিতি জটিল বুঝে মহানমা অনুরোধ করার ভঙ্গিতে বললেন, “মহারাজ, অপরাধ নেবেন না ‘নগরবধূ’ মানে তো একপ্রকার গণিকাই। ওইটুকু মেয়েকে এতো বড় শাস্তি না দিলেই কি নয়?”

লিচ্ছবিরাজ জয়ন্ত হাত তুলে মহানমাকে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলে উঠলেন, “মহাশয়, আপনি ভুল বুঝেছেন, আপনাদের মেয়েকে কোনো সাধারণ গণিকা হিসেবে নির্বাচন করা হয়নি। সে কোনো গণিকালয়ে থাকবে না। বৈশালীর সাধারণ নাগরিকরা তার সান্নিধ্য উপভোগ করতে পারবে না। সে হবে সমাজের অভিজাত সম্প্রদায়ের মনোরঞ্জনের মাধ্যম। তাকে রাষ্ট্র নিয়োগ করছে রাষ্ট্রের উচ্চবিত্ত মানুষদের বিনোদনের জন্য। তার কাজ হবে রাজপুরুষদের বিনোদন দেওয়া। রাষ্ট্র তাকে বছরে দু’ হাজার কার্ষাপণ বেতন দেবে। আলাদা প্রাসাদ থাকবে নগরবধূর। থাকবে পৃথক নিরাপত্তারক্ষী। তার দেখভালের জন্য থাকবে দাস-দাসী। আর যে রাজপুরুষ ও সমাজের অভিজাত ব্যক্তিরা নগরবধূর কাছে যাবেন তার জন্য প্রতিরাতের মূল্য সেই অতিথিকে আলাদা করে চোকাতে হবে।”

“মহারাজ, মাত্র তেরো বছর বয়সেই এই দায়িত্ব পালন করা কি সম্ভব হবে?” মহানমা ভাবলেন, অন্তত বয়সের দোহাই দিয়ে যদি মেয়েকে সমাজের উচ্চবিত্তের গণিকা হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করা যায়।

লিচ্ছবিরাজ হেসে ফেললেন। একবার তাকালেন অম্বার দিকে। ঋজু ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটি। যেন গোটা সভায় সে রাজত্ব করছে তার নির্বাক উপস্থিতি দিয়ে। জয়ন্ত মনে মনে ভাবলেন, এ মেয়েকে সঠিক তালিম দিলে অনেক দূর যাবে। শত্রুপক্ষের লোকজনকে ঘায়েল করতেও এই নারীকে ব্যবহার করা যাবে তুরুপের তাস হিসেবে। এই রূপের আগুনে পুড়বে না এমন পুরুষ নেই। অম্বার দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে রাজা জয়ন্ত মহানমার উদ্দেশে বললেন, “এখনই ওকে নগরবধূর দায়িত্ব পালন করতে হবে না। ওকে আগে তালিম নিতে হবে বিভিন্ন গুণী মানুষের কাছে। নাচ-গান, রান্না-বান্না থেকে আদব-কায়দা, সব শিখতে হবে। এসব শিখতে শিখতে আম্রপালী পূর্ণ নারী হয়ে উঠবে। তারপর সে রাষ্ট্রের কল্যাণে কাজ করবে। ভবিষ্যতে এই মেয়েটি হয়ে উঠবে বৈশালীর জনপদ কল্যাণকারী।”

“একজন নগরবধূর কি কোনো স্বাধীনতা নেই?” ফের সবাইকে চমকে দিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করে বসল আম্রপালী। তার মনের ভেতর এখন ঝড় বইছে। সেই ঝড় কেউ টের পাচ্ছে না। তার কাছে এর থেকে মৃত্যুদণ্ডও ঢের ভালো ছিল। অম্বার মনে প্রশ্ন জাগে, রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা কি নারীকে রক্ষা করার জন্য? নাকি তাকে রাজপুরুষদের ভোগ্য পণ্য হিসেবে যোগ্য করে তোলার জন্য?

অম্বার প্রশ্নের উত্তরে লিচ্ছবিরাজ জয়ন্ত একটু অবাক হলেন। সরু চোখে একবার দেখলেন মেয়েটিকে। বুঝলেন মেয়েটি শুধু রূপসী নয়, বেশ বুিদ্ধমতী। তিনি শান্ত কণ্ঠে বললেন, “নগরবধূকে কেউ জোর করতে পারবেন না। প্রতিদিন একজন মাত্র রাজপুরুষ তার কাছে যেতে পারবেন। তার প্রাসাদে কে অতিথি হবেন তা নগরবধূ নিজে নির্বাচন করবেন। কাউকে খারিজ করার অধিকার তার থাকবে। এমনকী এই বিধানসভা থেকে দূত গেলেও প্রাসাদের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার ক্ষেত্রে নগরবধূর অনুমতি লাগবে।”

লিচ্ছবিরাজের রথ তিনজনকেই বৈশালী থেকে ফিরিয়ে দিয়ে গেল শ্রাবস্তীতে। মহানমা জানেন বিধানসভায় গৃহীত সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করার ক্ষমতা তাঁর মতো সাধারণ কৃষকের নেই। বিরোধিতা করা মানে মৃত্যুদণ্ড। চোখের সামনে মেয়েকে রাজপুরুষগণের গণিকা হতে দেখার থেকে তাঁর মরে যাওয়া ভালো ছিল। মহানমা চেষ্টা করলেন মেয়ের মনের অবস্থা বোঝার। বৈশালী থেকে ফেরার পথে কোনো কথা বলেনি অম্বা। গুম মেরে বসে থেকেছে। হরিবালা কাঁদছেন। অভিসম্পাত করছেন সেই সব ক্ষমতাশালী পুরুষদের। যাঁদের জন্য তাঁর আদরের মেয়ের আজ এই অবস্থা। তিনি শুধু চেয়েছিলেন মেয়েকে সুপাত্রের হাতে সঁপতে। মেয়ে সুখে ঘর-সংসার করছে মা হিসেবে এইটুকুই তো দেখতে চেয়েছিলেন তিনি। কোন মা চায় তাঁর কন্যাকে নগরবধূ হিসেব দেখতে? রাজপুরুষদের অন্তর্কলহ মেটাতে তাঁর মেয়েকে তুলে ধরা হল রাষ্ট্রের সম্পত্তি হিসেবে। এক শ্রেণির পুরুষের লোভ ও লালসার শিকার তাঁদের কিশোরী কন্যা। অম্বার কোনোদিন সংসার হবে না। সে কারুর স্ত্রী হতে পারবে না। নিদান অনুযায়ী সে গোটা বৈশালী নগরীর বধূ। ছিঃ! ছিঃ! ঈশ্বর তাঁদের জীবনে এ কী অভিশাপ বয়ে আনলেন!

হরিবালা রাতে স্বামীকে বললেন, “চলো, এখান থেকে পালাই।”

মহানমা অবাক হয়ে স্ত্রীকে বললেন, “তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি? এখান থেকে কোথায় পালাবে তুমি? চারদিকে রাজার লোকজন পাহারায়। পালাতে দেখলেই মেরে ফেলবে। আমরা তো মরবই, অম্বাকে নিয়েও ছিনিমিনি খেলবে রক্ষীরা।”

“কেন আমরা যদি নদী পেরিয়ে মগধে চলে যাই। শুনেছি মগধরাজ বৈশালীর গোষ্ঠীপতিদের পছন্দ করেন না।” বড় আশা নিয়ে কথাগুলো বললেন হরিবালা।

মগধরাজের সঙ্গে বৈশালীর বনিবনা নেই। আর মগধরাজ বিম্বিসার এখন প্রভূত শক্তিশালী। তাঁর রাজ্যের বিস্তার ক্রমশ বাড়ছে। হরিবালা কথাটা মন্দ বলেননি। মহানমা গভীর ভাবে ভেবে দেখলেন কোনোক্রমে গঙ্গা পেরিয়ে মগধে ঢুকে পড়ে আশ্রয় নিতে পারলে এরা আর কিছু করতে পারবে না। কিন্তু কীভাবে তা সম্ভব?

.

ছোট্ট থেকে বন্ধুরা তাকে বলে এসেছে সে সুন্দর। তাকে দেখতে অন্য রকম। তার রূপের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছে সবাই। শ্রাবস্তীর তরুণরা তাকে প্রেমের প্রস্তাব পাঠিয়েছে ভুরি ভুরি। কিন্তু আম্রপালী জীবনেও ভাবেনি এই রূপই তার চরম শত্রু হয়ে দেখা দেবে একদিন। তাকে বিবাহ করতে ধুন্ধুমার কাণ্ড বেঁধে যাবে শ্রাবস্তীতে। কিন্তু আজ বৈশালী বিধানসভায় যা ঘটল তার থেকে খারাপ আর কিছু ঘটতে পারে না। নারীত্বের চরম অপমান ছাড়া একে আর কিছু বলা যায় না। আজীবন সে রাজপুরুষদের বিনোদনের খোরাক হয়ে থাকবে। তার সংসার, তার পরিবার বলে কিছু থাকবে না। কোথায় গেল তার রাজকুমার? যাকে ঘিরে একদিন সে স্বপ্ন দেখেছিল। সে তো এল না তাকে উদ্ধার করতে?

খোলা জানালা দিয়ে মৃদু হাওয়া ঘরে ঢুকছে। বাইরে অন্ধকার রাত। একটানা ঝিঁঝির ডাক শোনা যাচ্ছে। গোটা শ্রাবস্তী এখন ঘুমে অচৈতন্য। অথচ তার ঘুম আসছে না। অসহ্য লাগছে তার এই জীবন। রূপ, রূপ, রূপ! এই আগুনে রূপই হল তার কাল। চাই না এই রূপ তার। চাই না এই জীবন। চাই না নগরবধূর খ্যাতি, বৈভব। মাথা ঝিমঝিম করছে অম্বার। শরীর অবশ হয়ে আসছে। ডান হাতে ধরা ধারালো ছুরিটা ক্রমশ নেমে আসছে তার বাঁ হাতের কব্জির ওপর। ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। বিছানার ওপর থেকে পাথরের মেঝেতে গড়িয়ে পড়ছে টপ টপ করে। ঘরের ভেতর জ্বলা প্রদীপের শিখাটা তিরতির করে কাঁপছে। আস্তে আস্তে ঘোলাটে হয়ে আসছে আলোটা। কেউ যেন দরজার বাইরে থেকে তার নাম ধরে ডাকছে, ‘অম্বা… অম্বা…’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *