ছয়
বৈশালীর এক বর্ধিষ্ণু গ্রাম শ্রাবস্তী। সেই গ্রামের বাসিন্দা মহানমা। পেশায় কৃষক। সকালে বেরিয়েছেন চাষের কাজ দেখভাল করতে। আমবাগানের ভেতর দিয়ে তিনি হাঁটছিলেন অন্যমনস্ক ভাবে। সেই সময় হঠাৎ একটি শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলেন। সাতসকালে এই নির্জন আমবাগানে শিশুর কান্না শুনে ভারী অবাক হলেন তিনি। কৌতূহলবশত কাছে গিয়ে দেখেন একটি ফুটফুটে শিশু কন্যা আমগাছের নিচে পড়ে আছে। কাঁদতে কাঁদতে হাত-পা ছুঁড়ছে। বোধহয় খিদের চোটে কাঁদছে। মহানমা এদিকওদিক তাকালেন। ভাবলেন কেউ হয়ত শিশুটিকে গাছের তলায় শুইয়ে রেখে কাছাকাছি কোথাও গিয়েছেন। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেও শিশুটির পিতা-মাতার কোনো হদিশ পেলেন না মহানমা। এদিকে শিশুটি তারস্বরে চেঁচিয়ে চলেছে। একরত্তি শিশুটিকে এভাবে একলা ফেলে রেখে যেতে মন সায় দিল না মহানমার। তিনি শিশুটিকে নিয়ে চললেন নিজের গৃহে।
মহানমার কোলে ছোট্ট শিশুটিকে দেখে স্ত্রী হরিবালা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “সকালে চাষের কাজে বেরিয়ে কার শিশু তুমি নিয়ে এলে? ওইটুকু দুধের ছানা মাকে ছাড়া কাঁদবে না? যাও ওকে ওর মায়ের কাছে দিয়ে এসো।”
মহানমা স্ত্রীকে সব কথা খুলে বললেন। পুরোটা শোনার পর হরিবালা জানালেন, এই শিশুটিকে তাঁরাই নিজেদের সন্তানের মতো মানুষ করবেন। পরম মমতায় তিনি স্বামীর কোল থেকে শিশুটিকে নিজের কোলে টেনে নিলেন।
মহানমা ও হরিবালার কোনো সন্তান ছিল না। ফলে তাঁরা শিশুটিকে পেয়ে যারপরনাই আনন্দিত হয়ে উঠলেন। কিন্তু শিশুটির নামকরণ নিয়ে মহানমা ও হরিবালার মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ তর্কবিতর্ক চলল। শেষে মহানমা বললেন, “ওর নাম রাখা হোক আম্রপালী।”
“কেন আম্রপালী?” প্রশ্ন করলেন হরিবালা।
স্ত্রীর মত পেতে ব্যাকুল মহানমা যুক্তি দিলেন, যেহেতু তিনি শিশুটিকে আম্রকুঞ্জে কুড়িয়ে পেয়েছেন তাই তার নাম রাখা হোক ‘আম্রপালী’।
স্বামীর এই যুক্তি অবশ্য মনে ধরল হরিবালার। তিনি বললেন, “তাহলে আমরা ওকে ‘অম্বা’ নামে ডাকব।”
নিঃসন্তান হরিবালার অন্তরে একটা ভয়ও কাজ করছিল। যদি অম্বার প্রকৃত পিতা-মাতা এসে ওকে ফেরত নিয়ে যেতে চান। তিনি মহানমাকে তাঁর সেই আশঙ্কার কথা জানিয়েও ছিলেন। মহানমা স্ত্রীকে যথাসম্ভব বুঝিয়ে বলেছিলেন, “অম্বার প্রকৃত মাতা-পিতা এসে দাবি করলে তো তাকে ফিরিয়ে দিতেই হবে। অন্যের সন্তানকে এভাবে নিজেদের দখলে রাখাটা অন্যায়।”
হরিবালা অবুঝের মতো দাবি করে বলেছিলেন, অম্বা তাঁদের মেয়ে। তিনি অন্য কারুর হাতে তাকে তুলে দেবেন না।
মহানমা বুঝেছিলেন নিঃসন্তান হরিবালা শিশুটিকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাইছেন। তাঁর মাতৃত্বের স্নেহ ও ভালোবাসা দিয়ে অম্বাকে তিনি নিজের সন্তানের মতোই বড় করে তুলতে চাইছেন। মহানমা শিশুটিকে মানবিক কারণেই আমবাগান থেকে তুলে নিয়ে এসেছিলেন। ওই ভাবে খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকলে শিশুটি মারা যেত। তখন মহানমার মনে এই বিষয়টি আদৌ মাথায় আসেনি। তিনি সেই মুহূর্তে শুধু ভেবেছিলেন শিশুটিকে একটা নিরাপদ আশ্রয় দিতে হবে। তাই তিনি শিশুটিকে তুলে এনে হরিবালার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। এখন হরিবালা তাঁকে নিজের সন্তান ভাবতে শুরু করেছেন। সন্তানের মায়া বড় কঠিন বস্তু। তিনি নিজেও িক এই ক’ মাসে ওই ছোট্ট ফুটফুটে শিশুটির মায়ায় জড়াননি? কিন্তু মুশকিল হচ্ছে ওর প্রকৃত পিতা বা মাতা এসে যদি তাঁদের সন্তানের দাবি জানায় তাহলে কী হবে? হরিবালা অম্বাকে ফেরত দিতে অস্বীকার করলে জল গড়াবে অনেক দূর। এই নিয়ে লিচ্ছবিরাজের কাছে নালিশ ঠুকে দিতে পারেন অম্বার মাতা ও পিতা। তখন রাজপ্রাসাদের বিচারসভায় ডাক পড়বে তাঁদের দুজনের। অম্বাকে তো ফেরত দিতেই হবে সেই সঙ্গে শাস্তির মুখে পড়তে হবে তাঁদের দুজনকেও। সেই আশঙ্কায় মহানমা ভেতরে ভেতরে গুটিয়ে যেতে থাকলেন।
দিন যায়, বছর যায়। অম্বার প্রকৃত মাতা-পিতার হদিশ আর মেলে না। অনেকটা নিশ্চিন্ত হন মহানমা। ওদিকে হরিবালার আদরযত্নে বেড়ে উঠতে থাকল অম্বা। মহানমা আর হরিবালার সংসারে সেই তখন খোলা হাওয়া। একমুঠো রোদ। দিনভর সে গৃহের আনাচকানাচে প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়ায়। অম্বার প্রতিটি বিষয়ে খেয়াল রাখেন হরিবালা। প্রজাপতির মতোই উড়তে উড়তেই অম্বা বেড়ে উঠতে থাকল। যতই সে বেড়ে উঠতে লাগল ততই সুন্দর হয়ে উঠতে থাকল সে। কিশোরী বয়সেই তার রূপের আগুন ম্লান করে দিল পূর্ণিমার জ্যোৎস্নাকে। শ্রাবস্তীর রাস্তায় অম্বা বের হলেই যুবকদের ভিড় লেগে যায় তাকে দেখতে। নানা অছিলায় তারা অম্বার সঙ্গে সখ্য করতে চায়। সম্ভ্রান্ত পরিবারের যুবকেরা নানা উপহার নিয়ে চলে আসে গৃহে। তাদের একটাই ইচ্ছে, অম্বার সঙ্গে সময় কাটানো। অম্বার অবশ্য নিজের রূপ নিয়ে বিশেষ ভ্রুক্ষেপ নেই। সে জানে সে সুন্দর। আর সুন্দরের পিছনে যে সবাই ছুটবে এটা সে কিশোরী বেলাতেই বুঝে গিয়েছে। কিন্তু তাকে শ্রাবস্তীর কেউ আকর্ষণ করে না। তার স্বপ্ন এক রাজকুমার আসবে ঘোড়ায় চড়ে। এসে তাকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে ভিনরাজ্যে।
মেয়ে রজস্বলা হওয়ার পর মহানমা ও হরিবালা ঠিক করলেন অম্বার বিবাহ দেবেন। অম্বার তখন তেরো বছর মতো বয়স।
কিশোরী অম্বার রূপ যেমন তেমনই সে নৃত্যপটিয়সী। অম্বার খ্যাতি শ্রাবস্তীর সীমানা ছাড়িয়ে পৌঁছে গিয়েছিল বৈশালী নগরেও। অম্বা মোটামুটি সচ্ছল কৃষক পরিবারের মেয়ে। মহানমা ও হরিবালা অভিজাত বংশের পাত্রের খোঁজ চালাতে লাগলেন। একে একে সুপুরুষ ধনী পাত্রেরা এসে দেখে যেতে থাকল অম্বাকে। সবাই অম্বাকে এক কথায় বিবাহ করতে চায়। এই নিয়ে তাঁদের নিজেদের মধ্যে কোন্দল বেঁধে গেল। এ খবর মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল ত্রৌঞ্চ, শাক্য, মগধ সহ আরও বহু রাজ্যে। কে এই নারী? যাকে বিবাহ করার জন্য কোন্দল শুরু হয়ে যায় পাত্রদের মধ্যে। একে একে অম্বাকে দেখতে আসতে শুরু করলেন রাজপুত্র, মন্ত্রীপুত্র থেকে ধনী ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর দলপতিরা। তাঁরাও অম্বার রূপ ও নৃত্যকলা দেখে পাগল। সবাই তাকে বিবাহ করতে চান।
বিষয়টি ক্রমে জটিল আকার ধারণ করল। আম্রপালীকে কে বিবাহ করে নিয়ে যাবে তা নিয়ে রীতিমতো বৈশালীর মাটিতে হাঙ্গামা বেঁধে গেল। বিভিন্ন গোষ্ঠীর দলপতিরা শ্রাবস্তীতে এসে তাঁবু গাড়লেন। আশেপাশের রাজ্যের রাজারা পাঠালেন সৈন্য। হুকুম দেওয়া হল আম্রপালীকে জোর করে তুলে আনতে। এক কিশোরীকে পেতে সবাই নিজের নিজের ক্ষমতা জাহির করতে শুরু করলেন। এড়ানো গেল না রক্তপাত। আম্রপালীর নাগাল পেতে মরিয়া হয়ে উঠলেন সেই সময়ের ক্ষমতাবান পুরুষরা।
শ্রাবস্তীর মাটিতে এই হানাহানির খবর পৌঁছাল লিচ্ছবি গোষ্ঠীর নেতাদের কানে। তাঁরাও অবাক। এক কিশোরীকে বিবাহ করা নিয়ে এমন কাণ্ড তাঁরা কস্মিনকালেও শোনেননি। অশান্তি এমন আকার নিল যে তা নিয়ে আলোচনা করতে হল বৈশালীর বিধানসভায়। লিচ্ছবিরাজ জয়ন্ত নির্দেশ দিলেন সেনা পাঠিয়ে বাইরে থেকে আসা সবাইকে এ রাজ্যের সীমানার বাইরে করে দিতে। রাজার নির্দেশ মতো সেনারা গিয়ে যুদ্ধরত সব গোষ্ঠীর দলপতিদের বলল, “আপনারা বৈশালীর সীমানার বাইরে গিয়ে নিজেদের মধ্যে কলহ মেটান। লিচ্ছবিরাজ চান না তাঁর রাজ্যে কোনো নারীর জন্য রক্তপাত ঘটুক।’’
বৈশালীর লিচ্ছবি গোষ্ঠী সে সময় বেশ ক্ষমতাশালী ছিল। আগ বাড়িয়ে কেউ আর তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করতে চাইতো না। তাই রণে ভঙ্গ দিয়ে তাঁবু গুটিয়ে পানিপ্রার্থীরা ফিরে গেলেন। কিন্তু মুশকিল হল বৈশালীর রাজপুরুষদের নিয়ে। তাঁরাও আম্রপালীকে পেতে নিজেদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে পড়লেন। গৃহযুদ্ধ বাঁধার উপক্রম হল। আম্রপালী নামের এক কিশোরী বৈশালীর মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়াল। বৃজ্জিরাজ দেবমাল্য আগেই দেখে গিয়েছিলেন আম্রপালীকে। তিনি প্রথম দেখাতেই আম্রপালীর প্রেমে পড়ে যান। লোক মারফত আম্রপালীর জন্য পাঠিয়েছেন উপহার সামগ্রী। কিন্তু আম্রপালীকে বিবাহের ইচ্ছা প্রকাশ করে বৈশালীর অন্যান্য ক্ষমতাবান পুরুষরা শ্রাবস্তীতে ভিড় বাড়াতে শুরু করায় দেবমাল্য শ্রাবস্তীতে তাঁবু গাড়লেন সশ্রস্ত্র লোকবল নিয়ে। সেই দেখে বাকি গোষ্ঠীর নেতা ও রাজারাও তাঁদের লোকজন নিয়ে হাজির শ্রাবস্তীতে। আম্রপালীকে কেউ হারাতে নারাজ। প্রয়োজনে পেশিশক্তির প্রদর্শন করতেও তাঁরা রাজি। একে অপরকে যুদ্ধে আহ্বান করে বসলেন তাঁরা।
এই অবস্থায় রাজার ডাক এল মহানমার কাছে। এক সকালে রাজার পেয়াদা এসে দাঁড়াল মহানমার গৃহের দরজায়। মহানমা বুঝলেন, অম্বাকে বিবাহ করা নিয়ে যে হাঙ্গামা বেঁধেছিল তা লিচ্ছবিরাজ মোটেই ভালো চোখে নেননি। পেয়াদা জানাল, অতি সত্বর রাজা তাঁকে বিধানসভায় দেখা করার নির্দেশ পাঠিয়েছেন। আর সঙ্গে তাঁর কন্যাটিকেও নিয়ে যেতে বলেছেন। মহানমা আর হরিবালা পড়ে গেলেন ফ্যাসাদে। চিন্তায় পড়ে গেলেন তাঁরা। বুঝলেন এ তো মহা বিপদ, মেয়েকে সুপাত্রের হাতে সঁপতে গিয়ে খাল কেটে কুমির এনে ফেলেছেন তাঁরা। খোদ রাজার দরবার থেকে ডাক এসেছে। কপালে গভীর চিন্তার ভাঁজ ফুটে উঠল মহানমার। তিনি অনেক ভেবেও কূল পেলেন না যে, রাজা তাঁর সঙ্গে অম্বাকেও কেন ডেকে পাঠালেন? অম্বা বিধানসভায় গিয়ে কী করবে? এ আবার নতুন কোন বিপদের মেঘ ঘনিয়ে উঠল তাঁদের সুখের সংসারে?
