নগরবধূ আম্রপালী – ১৭

 সতেরো

 আম্রপালীর প্রমোদভবনের অলিন্দে পাথরের খিলান। সেই খিলানের গায়ে খোদাই করে বসানো নগ্ন নারী মূর্তি। পাথরে বাঁধানো পথ সেই ভবনের অন্দর থেকে পাক খেয়ে চলে গিয়েছে পিছনের দিকে। সেখানে রয়েছে বেশ বড়সড় সরোবর। তার টলটলে কালো জলে পদ্মফুল ফুটে আছে। সরোবরের জলে খেলে বেড়াচ্ছে রাজহাঁসের জোড়া। পদ্মের মধু খেতে ভিড় জমিয়েছে মৌমাছিরা। ইতিউতি উড়ছে জলফড়িং। তাদের ডানায় রোদ পড়ে ঝিলিক দিয়ে যাচ্ছে। সরোবরের চারদিকে আমগাছ। সেই আমগাছের ছায়াই সরোবরের জলকে আরও কালচে করে তুলেছে। সরোবরের একধারে শ্বেতপাথরের বাঁধানো ঘাট। সেই ঘাটের সিঁড়িতে বসে আছেন আম্রপালী। সবে তিনি সরোবরের জলে স্নান সেরে উঠেছেন। তপ্তকাঞ্চনবর্ণা। পানপাতার মতো মুখের গড়ন। বাঁকা ধনুকের মতো ভ্রু। ভরা দিঘির মতো চোখ। ভ্রু পল্লবে অকৃত্রিম চাউনি। তাঁর শরীর থেকে জলের ফোঁটা যেন মুক্তার মতো ঝরে পড়ছে। ভেজা কাপড়ের আড়ালে তাঁর সিক্ত শরীর। শরীরের প্রতিটি ভাঁজ নিঁখুত হয়ে ফুটে উঠেছে। স্নানের পর জল থেকে উঠে আসায় চিবুক থেকে জলের রেখা নেমে যাচ্ছে বুকের নির্জন উপত্যকার দিকে। উনচল্লিশ বছরের শরীর। তবু কোমল। লাবণ্যে ভরা। যেন বর্ষার অরণ্য। কিন্তু আম্রপালী জানেন এই শরীরে লিচ্ছবি গোষ্ঠীর রাজপুরুষগণের লালসা ও কামনার অদৃশ্য চিহ্ন আঁকা রয়েছে। রাতের অন্ধকারের সেই সব যন্ত্রণার চিহ্নগুলো ধুয়ে ফেলতেই যেন তিনি রোজ সকালে এই সরোবরের জলে একটু বেশি সময় কাটান। স্নানের সময়টুকু একান্ত নিজের জন্য রাখেন। তারপরেও যেন পুরুষের লালসার আঁশটে গন্ধ লেগে থাকে তাঁর শরীরে। তাঁর প্রমোদভবনের বিশাল স্নানাগারের ভেতর একটি সুদৃশ্য জলাধার কাঁচা দুধ ভরা থাকে। সেই দুধে মেশানো থাকে নিমপাতা ও কেশর। সেই জলাধারে বেশ কিছুক্ষণ গা ডুবিয়ে বসে থাকেন তিনি। দাসীরা এসে গা মুছিয়ে দেয় তাঁর। তারপর গোলাপের পাপড়ি দেওয়া জলে ফের স্নান সেরে নেন। সরোবরের জলে সাঁতার কেটে কিছুক্ষণ এই সরোবরের ধারে সময় কাটান আম্রপালী। তারপর চলে যান তাঁর অন্দরমহলের স্নানাগারে।

‘আম্রকুঞ্জ’-র এই দিকটায় সবার আসার অনুমতি নেই। জনা কয়েক বিশ্বস্ত দাসী এ দিকটায় আসতে পারে। রক্ষীদের এই সরোবরের দিকে আসা বারণ। প্রমোদভবনের পিছন দিকে এই সরোবরে স্নানের সময়টা ভীষণ ভাবেই আম্রপালীর একান্ত নিজের। যদিও তিনি জানেন আদতে এই বিশাল প্রমোদভবন বিলাসবহুল খাঁচা ছাড়া আর কিছু নয়। বিপুল ঐশ্বর্য, বৈভব থাকা সত্ত্বেও তিনি খাঁচাবন্দি। স্বাধীন আকাশে ইচ্ছেমতো ওড়ার ক্ষমতা তাঁর নেই।

অন্দরমহলের স্নানাগারে গিয়ে স্নান সম্পূর্ণ করলেন আম্রপালী। পোশাক বদলিয়ে ফের জলাশয়ের সামনেই বাঁধানো ঘাটে এসে বসলেন। খোলা চুল। কোমর ছাপিয়ে তা নিচে নেমে গিয়েছে। কিছুটা উদাস ভাবে দূরের দিকে চেয়ে আছেন তিনি। রাজহাঁসের জোড়া দুটো খেলে বেড়াচ্ছে সরোবরের মাঝখানে।

আম্রপালীর দুই খাস দাসী চন্দ্রাবতী ও ইরাবতী এগিয়ে এল আম্রপালীর চুলের পরিচর্যা করতে। কিন্তু আম্রপালী তাদের ফিরিয়ে দিলেন। দুজনেই বুঝল নগরবধূর আজ মন ভালো নেই। এই দুই যুবতীকে আম্রপালী কয়েক মাস আগে রাস্তা থেকে উদ্ধার করে নিয়ে এসেছিলেন। গ্রীষ্মের এক বিকেলে আম্রপালী বেরিয়েছিলেন নগর ভ্রমণে। হঠাৎই তাঁর রথের সামনে এসে পড়েছিল এই দুজন। সামান্য আহত হয়েছিল ওরা। আম্রপালী দুজনকেই তাঁর রথে তুলে নিয়েছিলেন। নিয়ে এসেছিলেন আম্রকুঞ্জে। দুজনকেই কিশোরী বয়সে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল গণিকালয়ে। তারপর তাঁরা হাত বদল হয়ে ঘুরতে ঘুরতে চলে আসে বৈশালীতে। দুজনেই তাঁকে শুনিয়েছিল তাঁদের জীবনের নির্মম এক অধ্যায়। আম্রপালীর কাছে তাঁরা বারবার অনুরোধ করেছিল একটা কাজের জন্য। দুই তরুণী জানিয়েছিল তারা একটা আশ্রয় পেলে আর ফিরে যেতে চায় না গণিকাবৃত্তির জীবনে। চন্দ্রাবতী ও ইরাবতীর জীবনের করুণ কাহিনি শুনে মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল আম্রপালীর। তিনি আশ্রয় দিয়েছিলেন ওদের। ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন কাজের। আম্রকুঞ্জেই থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল দুজনের।

হরিবালা জিজ্ঞেস করেছিলেন, “হ্যাঁ রে, এদের আবার কোথায় পেলি?”

আম্রপালী মাকে শুনিয়েছিলেন ওদের জীবনের গল্প। হরিবালা বলেছিলেন, “আহা রে, ভালো করেছিস বাপু। বাছারা থাকুক এখানে। হাতে হাতে এটা ওটা করে দেবে ’খন। প্রয়োজনে তোরও ফাইফরমাস খেটে দেবে।”

এরপর থেকে চন্দ্রাবতী আর ইরাবতী আম্রপালীর দাসী হিসেবে প্রমোদভবনেই থাকতে শুরু করে। কয়েক মাস আগে হঠাৎই রক্তবমি করে মারা যান অবন্তিকা। বৈদ্য এসে বলেন, খাবারে বিষক্রিয়ায় মৃত্যু হয়েছে তাঁর। অবন্তিকা ছিলেন আম্রপালীর ছায়াসঙ্গী। তাঁর খাস দাসী। আম্রপালীর সবকিছুর খেয়াল রাখতেন তিনি। তাই তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে শোকগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন আম্রপালী। তিনি আজও বুঝতে পারেননি অবন্তিকার খাবারে বিষ কী করে এল? প্রথমে একবার ভেবেছিলেন লিচ্ছবিদের কোনো চরের কাজ এটা। পরে ভেবে দেখেছিলেন, রাজা জয়ন্ত এ কাজ করাবেন না। মিশিরাম তার লোকজনদের দিয়ে খোঁজখবর করে জেনেছিল এ কাজ লিচ্ছবিদের নয়। কেউ কেউ আবার বলেছিল, অবন্তিকা আত্মহত্যা করেছে। আম্রপালীর মাথায় ঢোকেনি খামোকা অবন্তিকা আত্মহত্যা করতে যাবে কেন? আর তাকে হত্যা করেই বা কার কী লাভ? এ রহস্য অবশ্য আজও ভেদ হয়নি।

সময় সব ক্ষত সারিয়ে দেয়। ধীরে ধীরে আম্রপালী নির্ভর করতে শুরু করেন চন্দ্রাবতী ও ইরাবতীর ওপর। দুজনেই কাজের ক্ষেত্রে দক্ষ। এখন তো ওরাই আম্রপালীর সব কাজকর্ম করে। আম্রপালীর খাস দাসী হয়ে উঠেছে দুজনেই। দুজনকেই নিজের বোনের মতো স্নেহ করেন আম্রপালী। ওরাও তাঁকে দিদি বলে ডাকে। অবন্তিকার অভাব এখন আর সেভাবে টের পান না আম্রপালী। চন্দ্রা ও ইরা তাঁকে অবন্তিকার অভাব টের পেতে দেয় না।

প্রাসাদের বারান্দা থেকে সরোবরের ঘাটের দিকে তাকালেন হরিবালা। মেয়ে আজকাল বড় বেখেয়ালে থাকে। তথাগতর কাছে দীক্ষা নেওয়ার পর থেকেই অম্বাকে ভীষণ অন্যমনস্ক থাকতে দেখেন হরিবালা। তিনি মেয়ের মনের কষ্ট বোঝেন। কিন্তু তাঁর হাত-পা বাঁধা। কিছুই করার নেই। তিনিও একজন নারী। মা হয়ে মেয়েকে সংসার দিতে পারলেন না। এ দুঃখ তিনি কোথায় রাখবেন? অম্বাকে কষ্ট পেতে দেখলে তাঁরও প্রাণ কাঁদে। প্রাসাদের বারান্দা থেকে নিচে নেমে এলেন হরিবালা। গিয়ে দাঁড়ালেন আম্রপালীর কাছে। স্নেহমাখা কণ্ঠে মেয়েকে বললেন, “অম্বা, আয় তোর চুলে তেল মাখিয়ে ভালো করে চুল আঁচড়ে দিই।”

মায়ের গলা শুনে ফিরে তাকালেন আম্রপালী। সরোবরের বাঁধানো ঘাটে ছোট্ট কিশোরীর মতো বসলেন। দাসীরা এগিয়ে এল হরিবালাকে সাহায্য করতে। হরিবালা হাতের ইশারায় তাঁদের চলে যেতে বললেন। মেয়ের ঘন লম্বা কালো চুলে জবাকুসুম তেল মাখিয়ে দিতে থাকলেন আম্রপালীর পালিকা-মা হরিবালা।

সরোবরের টলটলে কালো জলের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন আম্রপালী। ভাবলেন, শরীর অপবিত্র হয় না। স্নান করলে শরীরের দাগ ধুয়ে যায়। কিন্তু মন? মনের দাগ কোথায় ধোবেন তিনি? আম্রপালীর বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এল। অচিরেই তা মিশে গেল জবাকুসুমের গন্ধে। আর ঠিক তখনই প্রাসাদের ছাদের প্রাচীরের ওপর দাঁড়িয়ে কোন্দন্য চিৎকার করে ডাকল, “মা… ও মা… !”

আম্রপালী ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন পুত্রকে। বিরক্ত হলেন ছেলের ওপর। বড্ড দুষ্টু হয়েছে ইদানীং। কিন্তু তিনি কিছু বলার আগেই হরিবালা ধমকে উঠলেন নাতিকে, “ওখানে উঠেছিস কেন? পড়ে যাবি তো, নিচে নেমে আয় বলছি!”

কোন্দন্য তাতে কান না দিয়ে হাত নেড়ে চিৎকার করে বলতে থাকল, “বুদ্ধ আসছে। মা, বুদ্ধ আসছে!”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *