উনিশ
প্রথম দিনটা আম্রপালীর প্রমোদভবনে ঝড়ের মতোই কেটে গিয়েছে তথাগতর। তিনি জানেন বৈশালীতে এসে রাজা জয়ন্তর প্রাসাদে না যাওয়ার বিষয়টি লিচ্ছবি গোষ্ঠী ভালো চোখে নেয়নি। তাঁকে কেউ সরাসরি কিছু না বললেও তিনি জানেন এরা ক্ষমতাশালী। এদের চটালে ফল ভালো হয় না। কিন্তু তাঁর কিছু করার নেই। তিনি আম্রপালীকে কথা দিয়েছিলেন। কথার খেলাপ করা তিনি পছন্দ করেন না। পরে তিনি না হয় রাজা জয়ন্তকে বুঝিয়ে বলবেন। গতকাল দুপুরে তিনি যখন আমবাগানের ছায়ায় শিষ্যদের নিয়ে বসে ছিলেন তখন এক ঝলক দেখে ছিলেন মন্ত্রী কোরককে প্রাসাদের অভ্যন্তরে যেতে। কী কারণে কোরক এখানে এসেছিলেন তা তিনি অনুমান করতে পেরেছিলেন। তথাগত চিন্তিত আম্রপালীকে নিয়ে। তাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়ে শেষে না রাজার কোপে পড়ে এই নারীটি। কিন্তু আম্রপালীকে তিনি এ ব্যাপারে কিছু বলেননি। বলাটা শোভা পায় না। তবে আম্রপালীর আতিথেয়তায় তিনি মুগ্ধ। মনে মনে এই নারীটিকে তিনি গভীর স্নেহ করতে শুরু করেছেন। তাঁর কোনো ক্ষতি হোক তা তিনি চান না।
পরের দিন সকাল থেকেই আম্রকুঞ্জে প্রচুর মানুষের ভিড়। সেখানে গৈরিক আসনের ওপর বসে আছেন তথাগত। ভক্ত ও শিষ্যদের ঢল নেমেছে। দুপুরের আহারের সময় হয়ে এলেও তথাগত ভক্তদের হাত থেকে ছাড়া পেলেন না। আমগাছের ছায়ায় তিনি ঠায় বসে আছেন। আবদার মেটাচ্ছেন ভক্তদের। গতকাল তিনি এসেছেন বৈশালীতে। এ খবর মুখে মুখে চাউর হতেই দূরদূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসছেন তাঁর কাছে। ‘আম্রকুঞ্জ’-এর অভ্যন্তরে জায়গার অভাব নেই। কিন্তু তথাগত প্রাসাদের সামনের আমবাগানেই বসবেন বলে জানিয়েছিলেন। আম্রপালীর নির্দেশে মূল ফটক সাধারণ জনতার জন্য খুলে দিয়েছিল রক্ষীরা। নগরবধূর কাছে ভগবান বুদ্ধ এসেছেন তাই ভিড়ও ক্রমশ বাড়তে থাকল। তথাগতর সঙ্গে রয়েছেন ভিক্ষু সারিপুত্ত, ভিক্ষু আনন্দ, ভিক্ষু উপালি এবং ভিক্ষু শুদ্ধসত্ত্ব।
বৈশালীর বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ শুভব্রত একজন রূপাজীবার প্রমোদভবনে আসবেন না বলে ঠিক করেছিলেন। কিন্তু ভেবে দেখলেন তথাগত তাঁর দীক্ষাগুরু। তিনি যেখানে যাবেন সেখানে তাঁরও যাওয়া উচিত। মন সায় না দিলেও তিনি এসে পড়েছেন আম্রপালীর প্রমোদভবনে। তবে গতকাল তিনি তথাগতকে প্রাসাদে পৌঁছে দিয়ে বৌদ্ধবিহারে চলে গিয়েছিলেন। আজ সকালে ফের এসেছেন। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছেন, বাধ্য হয়ে এসেছেন ঠিকই কিন্তু নগরবধূর প্রমোদভবনে তিনি জল স্পর্শ করবেন না।
তথাগতর কাছেই ছিলেন আম্রপালীর ব্যক্তিগত দেহরক্ষী মিশিরাম ও তাঁর লোকজন। মিশিরামের ওপর দায়িত্ব রয়েছে তথাগতর যাতে কোনো অসুবিধা না হয় তা খেয়াল রাখার। কারণ নানা ধরনের লোকজন আসছে তথাগতর কাছে। ভিড় সামলাতে দক্ষ মিশিরামের লোকজন। তারাই সবাইকে একে একে তথাগতর সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা করছে।
গতকাল তথাগত কিছুই প্রায় খাননি। শুধু সামান্য ফলাহার করেছিলেন। অনেকটা পথ এসেছেন। তাই ভক্তদের আবদার মিটিয়ে নির্দিষ্ট কক্ষে বিশ্রাম নিতে চলে গিয়েছিলেন। আজ সকাল থেকেই আম্রপালী রন্ধনশালায় ব্যস্ত। স্নান সেরে নতুন পোশাকে রন্ধনশালায় এসেছেন। সঙ্গে রয়েছেন মা হরিবালা। মূলত হরিবালাই নিজের হাতে সব পদ রান্না করেছেন। তাঁকে সাহায্য করেছে আম্রপালীর দুই খাস দাসী ইরাবতী ও চন্দ্রাবতী। অন্যদিকে আম্রপালীর নির্দেশে ভান্ডারা বসেছে প্রাসাদের সামনের আমবাগানে। সেখানে সাধারণ জনতার খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যারা দূরদূরান্ত থেকে তথাগতকে দর্শন করতে এসেছেন তাঁরা যাতে দুপুরের আহার সম্পূর্ণ করতে পারেন তার জন্যই এই ভান্ডারা। সেখানেও প্রচুর মানুষ। তা সামলাচ্ছেন আম্রপালীর অন্যান্য দাস-দাসীরা। আর প্রাসাদের অভ্যন্তরে বিশেষ পাকশালায় আয়োজন করা হয়েছে তথাগতের আহারাদির। আম্রপালীর পুষ্যি বেড়ালগুলো পর্যন্ত বুঝে গিয়েছে যে আজ বিশেষ রান্নাবান্না হচ্ছে। তাই তারাও পায়ে পায়ে ভিড় জমিয়েছে পাকশালার চৌকাঠে। মাঝে মাঝেই ‘ম্যাও’ ‘ম্যাও’ করে গলা সেধে চলেছে তারা। দুধমণি চালের ভাতের গন্ধে ম ম করছে গোটা রন্ধনশালা। মোটামুটি সব পদ রাঁধা শেষ। আমিষ কিছু নেই। সবই নিরামিষ। সঙ্গে রয়েছে মাটির সরায় পাতা টক দই। হরিবালা বললেন, “এবার ওঁকে ডাক। বেলা বয়ে যাচ্ছে যে।”
আম্রপালী তথাগতের জন্য পায়েস তৈরি করছিলেন। তথাগত পায়েস খেতে ভালোবাসেন বলে শুনেছেন তিনি। তাই তিনি নিজের হাতে পায়েস তৈরি করে খাওয়াতে চান তথাগতকে। কাঠের আগুনে তখন পায়েস ফুটছে। আর একটু জাল দিয়ে নামিয়ে নেবেন। এমন সময় মিশিরাম দৌড়ে এসে বলল, “মা, তথাগত আপনার খোঁজ করছিলেন।”
“যাই ওঁদের জন্য আসন পাতি গিয়ে। তুই নিজে গিয়ে ওঁকে নিয়ে আয়।” মেয়েকে এ কথা বলেই রন্ধনশালা থেকে বেরিয়ে গেলেন হরিবালা। তাড়াহুড়ো করে বেরনোর সময় আর একটু হলেই একটা বেড়াল তাঁর পায়ের তলায় চাপা পড়ছিল। বিরক্তি নিয়ে হরিবালা বলে উঠলেন, “আহ্, তোরা আবার এখানে এসে জুটেছিস কেন? আমিষ তো কিছুই নাই। যা পালা এখান থেকে।”
আম্রপালী যাওয়ার আগে ইরা আর চন্দ্রাকে বলে গেলেন, পায়েসটা আর একটু ঘন হয়ে এলে ওপরে কেশর ছড়িয়ে নামিয়ে রাখতে। মনে মনে ভাবলেন, নিশ্চয়ই তথাগতের খিদে পেয়ে গেছে। তাঁর উচিত ছিল আগেই ওঁকে প্রাসাদে ডেকে নিয়ে আসা। রান্না করতে করতে সে কথা আর খেয়াল ছিল না। বিব্রত বোধ করলেন আম্রপালী।
প্রাসাদের অলিন্দ দিয়ে হেঁটে আসছিলেন তথাগত। মুখোমুখি হতেই আম্রপালীকে বললেন, “তোমাকেই খুঁজছিলাম মা। আজ বিকেলে একবার আমাকে একটু রাজা জয়ন্তর প্রাসাদে যেতে হবে। বুঝতেই পারছো, বৈশালীতে এসে ওঁর সঙ্গে দেখা না করলে ওঁর আবার অভিমান হতে পারে।”
তথাগতের মুখ থেকে ‘মা’ ডাকটা শুনলে আম্রপালীর হৃদয় জুড়িয়ে যায়। মনে হয় এই প্রথম তাঁকে কেউ মানুষের মর্যাদা দিচ্ছে। পঞ্চাশের ওপর বয়স এখন তথাগতের। পরিব্রাজকের মতোন মাইলের পর মাইল পথ তিনি পাড়ি দেন পায়ে হেঁটে। শুধু মানুষের কল্যাণের কথা ভেবে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যান। তবু যেন তাঁর ক্লান্তি নেই। মুখে সব সময় স্মিত হাসি লেগে থাকে। এই ঋষিপুরুষের সামনে দাঁড়ালে আম্রপালী অন্তর থেকে শান্তি বোধ করেন। তাঁর সব সময় ইচ্ছে করে এই মানুষটির কর্মযজ্ঞে সামিল হতে। কিন্তু তাঁর মতো রূপাজীবাকে কি আর তিনি সেই সুযোগ দেবেন? তথাগত যে মনে করে তাঁর প্রমোদভবনে এসেছেন এটাই আম্রপালীর কাছে স্বপ্ন। যদিও তিনি খোঁজ নিয়ে জেনেছেন যে, তথাগত মহিলাদের নিয়ে একটি ভিক্ষুণী সংঘ খুলেছেন। মাতা গৌতমী সেই ভিক্ষুণী সংঘের অধ্যক্ষা। পাটলিপুত্রের কাছে আম্বারা গ্রামে ভিক্ষুণী সংঘের বৌদ্ধবিহার। সেখানে অনেক মহিলা তথাগতের শিষ্যত্ব নিয়ে মানুষের কল্যাণে কাজ করেন। গতকাল তথাগতের সঙ্গে ভিক্ষুণীরাও অনেকে এসেছেন বৈশালীতে। তাঁরা উঠেছেন বৈশালীর বৌদ্ধবিহারে। সেখানে ভিক্ষুণীদের জন্য আলাদা করে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা আছে।
আম্রপালীকে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে তথাগত জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি অন্য কিছু ভাবছ?”
আম্রপালী লজ্জিত বোধ করলেন। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
তথাগত ফের শান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি আমায় কিছু বলতে চাও?”
কী বলবে আম্রপালী? তাঁর যে অনেক কথা বলার আছে এই যুগপুরুষটিকে। কিন্তু কীভাবে বলবেন তা গুছিয়ে উঠতে পারছেন না। কোনো মতে তিনি শুধু বলে উঠলেন, “প্রভু আমি আমার পেশা ছাড়তে চাই। এই নগরবধূর জীবন আমি আর বইতে পারছি না। আমি প্রাচুর্য চাই না। অর্থ চাই না। বৈভব, ক্ষমতা কিচ্ছু চাই না। আমি শান্তি চাই।” কথাগুলো বলতে বলতে দু’ হাত জোড় করে আম্রপালী তথাগতের পায়ের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন।
তথাগত আম্রপালীর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “বেশ, আর কী চাও তুমি?”
তথাগতের স্পর্শ পেলেন আম্রপালী। অনাবিল শান্তির এক মুহূর্ত। কিছুক্ষণ চোখ বুজে সেই স্পর্শের ছোঁয়া নিলেন তিনি। তথাগত কিছুটা ঝুঁকে তাঁর বাহু স্পর্শ করলেন। বুকে এক সমুদ্র কান্না চেপে উঠে দাঁড়ালেন আম্রপালী। বললেন, “আমি আমার এই আম্রকুঞ্জ সহ প্রাসাদটি বৌদ্ধসংঘে দান করে দিতে চাই। এই প্রাসাদটি আমি অর্জন করেছি। আমি চাই এখানে একটি বৌদ্ধবিহার তৈরি করা হোক।”
তথাগত স্মিত হেসে বললেন, “বেশ তোমার এই ইচ্ছাও পূরণ হবে। আমি তোমার এই প্রাসাদ সহ আম্রকুঞ্জটি নিলাম। এখানে বৌদ্ধবিহার তৈরি করব। এবার কি তুমি তোমার মনের অস্থিরতা দূর করতে পেরেছো?”
আম্রপালী তাঁর গভীর দুটি চোখের পাতা মেলে তাকালেন তথাগতের মুখের দিকে। কী প্রশান্তি ওই মুখে। শরীর ও মনের সমস্ত পাপ যেন ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়। “আমি ভিক্ষুণী সংঘে যোগ দিয়ে বাকি জীবন কাটাতে চাই।”
তথাগত কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর শান্ত কণ্ঠে বললেন, “কিন্তু মা, সে তো সন্ন্যাসিনীর জীবন। বড় কঠিন সেই জীবন। অনুশাসন আর শৃঙ্খলার বেড়াজাল। তুমি কি সেই জীবনে মানিয়ে নিতে পারবে? তুমি কি অন্তর থেকে সাড়া পাচ্ছ? নাকি আবেগের বশে সিদ্ধান্ত নিচ্ছ?”
“আমার আর কিছুই হারানোর নেই। আর কিছু পাওয়ারও বাকি নেই। আমি এই জীবন থেকে শুধু মুক্তি চাই। আমার বাকি জীবন নিয়োজিত হোক মানুষের কল্যাণে। আমাকে সেই সুযোগটুকু দিন প্রভু।” খানিকটা উদাসভাবে কথাগুলো উচ্চারণ করলেন আম্রপালী।
প্রাসাদেরই অলিন্দে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন তথাগত। দূরে একটা থামের আড়াল থেকে তাঁকে লুকিয়ে দেখছিল একটি তেরো-চোদ্দ বছরের কিশোর। তাকে ইশারায় কাছে আসতে বললেন তিনি। কিশোরটি লাজুক মুখে তথাগতর কাছে এল। তথাগত দেখলেন একেবারে বিম্বিসারের মুখ কেটে যেন বসানো। কিশোরটির এক মাথা কোঁকড়ানো চুলে হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী নাম তোমার?”
কিশোরটি লাজুক ভাবেই জানাল, তার নাম কোন্দন্য।
আম্রপালী বললেন, “কোন্দন্য আমার পুত্র। ওকেও আপনি সংঘের সদস্য করে নিন।”
তথাগত হেসে ফেললেন। “কোন্দন্য এখন অনেক ছোট মা। ও আগে বড় হোক। যথা সময়ে আমি ওকে বৌদ্ধসংঘে যুক্ত করব। ও বড় না হওয়া পর্যন্ত বৌদ্ধবিহারে তোমার সঙ্গে থাকতে পারবে।”
