নগরবধূ আম্রপালী – ২১

 একুশ

রাজা জয়ন্ত তাঁর প্রাসাদে। রাজার মুখোমুখি হতে পারছেন না মন্ত্রী কোরক। নিজের ঘরে অস্থির ভাবে পায়চারি করছেন। এখনও ওদিক থেকে কোনো খবর এল না। কোনো পাকা খবর না নিয়ে তিনি কোন মুখে রাজার কাছে যাবেন? আজ কদিন ধরে আম্রপালীর প্রমোদভবনে কী যে হচ্ছে তার কোনো খবরই পাওয়া যাচ্ছে না। গুপ্তচরেরা কিছুই জানাতে পারছে না। সেই সুদূর গান্ধার দেশ থেকে চারজন গুপ্তঘাতককে অনেক ব্যয় করে আনা হয়েছে। ওরা গুপ্তঘাতক। অর্থের বিনিময়ে হত্যা করাই ওদের কাজ। বিশ্বস্ত লোকজনকে দিয়ে ওই চারজনকে আনিয়েছেন কোরক। নির্দেশ দেওয়া আছে কাজ সেরে বৈশালীতে আর এক মুহূর্ত না থেকে বিদায় নিতে। রক্ষীর পরিচয়ে গত রাতেই চারজনকে আম্রকুঞ্জের পরিধির মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কাজটা ঠিকঠাক হল কি না তার কোনো খবর মিলছে না। রাজা জয়ন্তর কড়া নির্দেশ এই কথা যেন পাঁচকান না হয়। তথাগত আম্রকুঞ্জে আছেন তিনি যেন কোনো রকম সন্দেহ প্রকাশ না করেন।

ঠিক করা আছে বৈশালী বিধানসভার তরফে এক বিবৃতিতে বলা হবে— “এক দল অজ্ঞাত পরিচয় আততায়ীর হাতে আচমকাই নিহত হয়েছেন আম্রপালী। বৈশালীর রক্ষীর পরিচয় দিয়ে আততায়ীরা আম্রকুঞ্জে প্রবেশ করেছিল। প্রতিবেশী কোনো রাজ্য ষড়যন্ত্র করেই হত্যা করেছে বৈশালীর রাজনর্তকীকে। জনপদকল্যাণকারী আম্রপালীর অকালমৃত্যুতে শোকস্তব্ধ গোটা বৈশালী। পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় আম্রপালীর দেহ সৎকার করা হবে।” বিবৃতিটা একবার মনে মনে ঝালিয়ে নিলেন কোরক। মোটামুটি এটুকু বললেই হবে। কিন্তু পাকা খবরটা আসবে কখন?

.

আম্রকুঞ্জের ভেতর তখন বেশ ভিড়। বৌদ্ধবিহার থেকে এসেছেন সংঘের ভিক্ষুণীরাও। তথাগত তাঁদের সকাল সকাল আসতে বলেছেন। বৈশালী ছেড়ে তাঁরা আজ চলে যাবেন। মূল ফটকের বাইরে সাধারণ জনতার ভিড়। তাঁরা এসেছেন যদি একবার আম্রপালীকে দেখতে পাওয়া যায় সেই আশায়। অনেকে এসেছেন ভগবান বুদ্ধের দর্শনে।

প্রিয় চার শিষ্যকে নিয়ে তথাগত বাইরে বেরিয়ে এলেন। তাঁর পিছু পিছু সংঘের ভিক্ষু ও ভিক্ষুণীরা। সবার মুণ্ডিতমস্তক। গায়ে রক্তিম উত্তরীয়। সারিবদ্ধ ভাবে তাঁরা বেরিয়ে আসছেন মিছিলের আকারে। আম্রপালীর প্রমোদভবন ‘আম্রকুঞ্জ’-এর মূল ফটকের বাইরে তখন প্রতীক্ষারত জনতা। ভগবান বুদ্ধকে দেখে তাঁদের মধ্যে চাঞ্চল্য দেখা দিল। জনতার মধ্যে থেকে ধ্বনি উঠল, “ভগবান বুদ্ধের জয় হোক।”

তথাগত থামলেন। এক পলক তাকালেন বৈশালীবাসীর দিকে। বললেন, “সবার মঙ্গল হোক।”

কিছুক্ষণের মধ্যে আম্রকুঞ্জ ফাঁকা হয়ে গেল। তথাগত চলে গেছেন। তাঁর সঙ্গে চলে গিয়েছেন বৌদ্ধ ভিক্ষু ও ভিক্ষুণীর দলও। কিন্তু একবারের জন্যও দেখা মেলেনি আম্রপালীর। হতাশ জনতা ধীরে ধীরে ফিরে যাচ্ছে।

আম্রকুঞ্জের দাস-দাসী থেকে রক্ষীরাও গতকালের পর আর আম্রপালীকে দেখতে পায়নি। কোথায় উধাও হয়ে গেলেন বৈশালীর নগরবধূ? প্রাসাদের অভ্যন্তরের দাস-দাসীরা শুধু দেখেছে সেই ভোরবেলা থেকে জনা চারেক কঠিন চেহারার যুবক ঘুরে বেড়াচ্ছে প্রাসাদের আনাচেকানাচে। পরনে তাদের রক্ষীর পোশাক। তাঁরাও খোঁজ করছে আম্রপালীর।

বৌদ্ধ ভিক্ষু ও ভিক্ষুণীদের মিলিয়ে বেশ বড়সড় দল। সারিবদ্ধ ভাবে সবাই হেঁটে চলেছেন একসঙ্গে। দেখলে মনে হবে বৌদ্ধ শ্রমণদের মিছিল। একেবারে সামনের সারিতে রয়েছেন তথাগত। তাঁর পাশে পাশে হাঁটছেন ভিক্ষু সারিপুত্ত, ভিক্ষু আনন্দ, ভিক্ষু উপালি এবং ভিক্ষু শুদ্ধসত্ত্ব। শুদ্ধসত্ত্বের হাত ধরে হাঁটছে কিশোর কোন্দন্য। তার মস্তক মুণ্ডিত। গায়ে রক্তিম উত্তরীয়। কোন্দন্যর আরেক পাশে হাঁটছে মিশিরাম। তিনিও সংঘের সদস্য হয়েছেন। তার পিছনের সারিতে ভিক্ষুণীরা। সেই দলে রয়েছে ইরা ও চন্দ্রা। তথাগতর শরণ নিয়েছে তারাও। তিনিই তাদের নতুন জীবন দিয়েছেন। তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন আম্রপালী। মগধে আর ফিরে যেতে রাজি হয়নি দুজন। তারা বেছে নিয়েছে ভিক্ষুণীর জীবন।

ভিক্ষুণীদের পিছনের সারিতে রয়েছেন কয়েকজন তরুণ শ্রমণ। তাঁরা এ কদিন বৌদ্ধবিহারে ছিলেন। তথাগতর ডাকে আজ সকালে এসেছিলেন আম্রকুঞ্জে। শুভব্রত আজ ভোরে এসেছিলেন সেখানে। তথাগতর সঙ্গে দেখা করে ফিরে গিয়েছেন বৌদ্ধবিহারে।

আশ্বিনের সোনালি রোদ মাখা পথ ধরে হাঁটছেন সবাই। পথের দু’ ধারে ফুটে রয়েছে কাশফুল। শরতের হাওয়ায় মাথা দোলাচ্ছে কাশফুলের দল। হাঁটতে হাঁটতে গোটা দলটি বৈশালীর সীমানা পেরিয়ে গেল। তাঁরা যাবেন পাটলিপুত্র হয়ে আম্বারা গ্রামে।

ভিক্ষুণীদের মধ্যে একজন একটু থামলেন। পিছন ফিরে তাকালেন বৈশালীর তোরণদ্বারের দিকে। মাথায় দেওয়া লাল কাপড়ের অবগুন্ঠন সামান্য সরালেন। তাঁর চোখের কোণটা চিকচিক করে উঠল।

তথাগত এসে পাশে দাঁড়ালেন। “তুমি কি গৃহের টান এড়াতে পারোনি মা?”

“না প্রভু। এ গৃহের টান নয়। এ মাটির টান। মাতৃভূমির টান।” সেই পানপাতার মতো মুখ। টানাটানা চোখ। নিঁখুত, নিভাঁজ মুখমণ্ডল। শুধু মাথার সেই একরাশ চুলের ঢাল আর নেই। তিনি এখন মুণ্ডিতমস্তক। তাঁর শরীরে কোনো অলঙ্কার নেই। নিরাভরণ শরীরে পরে আছেন সামান্য সুতির বস্ত্র। সন্ন্যাসিনীর পোশাক। কাঁধে ভিক্ষার ঝোলা। তাঁকে দেখে কারুর বোঝার উপায় নেই যে, এই নারী একদিন বৈশালীর নগরবধূ ছিলেন। রাজপুরুষরা তাঁর রূপের কাছে নতজানু হতেন। তাঁর ক্ষমতা ও বৈভব কোনো রাজার থেকে কিছু কম ছিল না। কিন্তু আজ তিনি কপর্দকশূন্য। সব বিলাসিতা ত্যাগ করে ভগবান বুদ্ধের পরামর্শে তিনি সন্ন্যাসিনীর বেশে বৈশালী ছাড়ছেন।

“তুমি সন্ন্যাসিনী। সন্ন্যাসিনীদের কোনো পিছুটান থাকতে নেই। জগতে সবকিছুই অনিত্য। অলীক। কল্পনাময়। কখনও কোনো কিছুর দ্বারা মোহগ্রস্ত হ’য়ো না। মনে রাখবে সবকিছুই ক্ষণিক, দুঃখময়, বিসদৃশ ও অলীক।” তথাগত উপদেশটুকু দিয়ে এগিয়ে গেলেন সামনে।

সংঘের সদস্য হয়েছেন বৃদ্ধা হরিবালাও। তিনিও চলেছেন এই দলে। মেয়েকে থমকে দাঁড়াতে দেখে পিছন থেকে ডাক দিলেন, “মা রে চল, আর মায়া বাড়াসনি।”

আম্রপালী আর বৈশালীর নগরবধূ নন। রাজপুরুষদের লালসা মেটানোর জীবন এখন অতীত। তার মন এখন নির্ভার। শান্ত। মাথা উঁচু করে তিনি আকাশের দিকে তাকালেন। নির্মল নীল আকাশ। ইতিউতি ভেসে বেড়াচ্ছে শরতের মেঘ। দূরে দুধসাদা কাশবন। হাওয়ায় ডানা ভাসিয়েছে গাঙচিলের দল। মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল একঝাঁক টিয়া। আর কোনো পিছুটান অনুভব করলেন না আম্রপালী। শুধু অনুভব করলেন তাঁর জন্মান্তর ঘটে গিয়েছে। মনে মনে একবার আওড়ে নিলেন তথাগতর সেই অমোঘ বাণী, “কামনার সমান আগুন নেই। তৃষ্ণার সমান কষ্ট নেই। দেহের মতো দুঃখময় কিছু নেই। শান্তির সমান সুখ নেই। শান্তিই পরম সুখ।” সেই শান্তির খোঁজেই ধুলোমাখা পথে পা বাড়ালেন আম্রপালী।

***

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *