চোদ্দ
এক যুগেরও বেশি সময় অতিবাহিত। সম্রাট বিম্বিসার এখন পঞ্চাশোর্ধ। মগধের সিংহাসনে বসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন যুবরাজ অজাতশত্রু। বিম্বিসার জানেন তাঁর সঙ্গে ছেলের মতের অমিল অনেক। তিনি যেভাবে রাজ্য চালিয়েছেন অজাতশত্রু সেভাবে চালাতে চান না। গত তেরো-চোদ্দ বছরে তিনি আর বৈশালী যাননি। দেখা হয়নি আম্রপালীর সঙ্গে। যদিও তিনি জানেন আম্রপালীর একটি পুত্রসন্তান আছে এবং সেই সন্তানের পিতা তিনি। শুনেছেন তার নাম কোন্দন্য। সে এখন সদ্য কিশোর। পিতা হিসেবে বিম্বিসার মন থেকে চান কোন্দন্যর সান্নিধ্য পেতে। কিন্তু আম্রপালী তাকে মগধে পাঠাতে নারাজ। বিম্বিসার চেয়েছিলেন কোন্দন্য মগধের সিংহাসনে বসুক। গোপনে দূত মারফত অনেকবার বিম্বিসার চেষ্টা করেছেন আম্রপালীকে বৈশালী থেকে মগধে নিয়ে আসতে। কিন্তু আম্রপালী বারবার তাঁর প্রস্তাব ফিরিয়েছেন। এমনকী ছেলেকেও কাছছাড়া করতে চাননি। বিম্বিসার আজও ভুলতে পারেননি আম্রপালীর সান্নিধ্যে কাটানো দিনগুলো। তিনি আজও বৈশালীর নগরবধূকেই ভালোবাসেন।
“তোমাকে অন্যমনস্ক লাগছে কেন মগধরাজ? তুমি কি কারুর কথা ভাবছ?” তথাগতর মাথায় ছাতা ধরে পাশে পাশে হাঁটছিলেন বিম্বিসার। তিনি যে অন্যমনস্ক তা ঠিক খেয়াল করেছেন তথাগত। তথাগত অর্ন্তযামী। মনের হদিশ ঠিক পেয়ে যান। তিনি সব জানেন। আম্রপালীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কথাও বিম্বিসার তাঁকে আগেই বলেছেন। বৈশালীর লিচ্ছবিরাও তথাগতের অনুগত। সেখানেও বৌদ্ধবিহার আছে। তথাগত মাঝেমধ্যে যান। কিন্তু বিম্বিসার মুখ ফুটে তাঁর কাছে আম্রপালীর খোঁজ নিতে পারেন না। তাঁর রুচিতে বাধে। তিনি তড়িঘড়ি বলে উঠলেন, “নাহ্, তেমন কিছু নয়।” তারপর দাবি করার ভঙ্গিতে বললেন, “আজকের দিনটা অন্তত আপনাকে আমার প্রাসাদে অতিথি হিসেব কাটাতে হবে। বৌদ্ধবিহারে না হয় কাল যাবেন।”
বিম্বিসার তাঁর অনুগত শিষ্য হলেও তথাগত তাঁকে একজন বন্ধু হিসেবেই দেখেন। তাই বিম্বিসারের ডাক তিনি ফেরাতে পারেন না। তথাগতের বয়স বাড়ছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে কাজের ধারা। তাঁর সংঘের সদস্য সংখ্যা বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। নানা জায়গায় তৈরি করেছেন বৌদ্ধবিহার। তাঁকে অনবরত ছুটে বেড়াতে হয়। ভিক্ষুদের পাশাপাশি তিনি তৈরি করেছেন ভিক্ষুণী সংঘও। ভিক্ষুণী সংঘে যোগ দিচ্ছেন মহিলারা। মাতা গৌতমীর নেতৃত্বে আম্বারা গ্রামে চলছে ভিক্ষুণী সংঘের কাজ। বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে তথাগত বোধিবৃক্ষমূলে বুদ্ধত্ব লাভ করেছিলেন। সে অনেককাল আগের কথা। কিন্তু বিম্বিসারকে সে কথা বোঝায় কার সাধ্য? মগধরাজ বৈশাখী পূর্ণিমায় রাজগির পাহাড়ের কোলে বিম্বিসারপুরীতে প্রতি বছর অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। সেই অনুষ্ঠান হয় তথাগতকে ঘিরেই। তাই তথাগতকে প্রতি বছর এই দিনটায় মগধে আমন্ত্রণ জানান বিম্বিসার। আর বিম্বিসারের আমন্ত্রণ তথাগত ফেরাতে পারেন না।
বৈশাখ মাস। রাজগিরে এখন বেশ গরম। কঠিন পাথরের পাহাড় চারদিকে। ফলে দিনের বেলায় রোদের তাপে সেই পাথর গরম হয়ে ওঠে। দিনভর তাপ ছড়ায়। ভরদুপুরে বয় গরম হাওয়া। এই গরমে অনেকটা পথ এসেছেন তথাগত। মুখমণ্ডলে সামান্য হলেও ক্লান্তির ছাপ। তাঁর মাথায় ছাতা ধরে আছেন বিম্বিসার। এ কাজটা যে কোনো রক্ষী বা দাস-দাসী করতেই পারে। কিন্তু বিম্বিসার নিজে গিয়ে তথাগতকে প্রাসাদের অভ্যন্তরে নিয়ে আসেন। তথাগত বারণ করলেও শোনেন না। এমনকী পাশে পাশে চলা মগধের মন্ত্রী পুরঞ্জয়কেও ছাতা ধরতে দেন না। তথাগতর অস্বস্তি হয়। কিন্তু সে কথা বিম্বিসারকে বোঝাবে কে?
বিম্বিসারপুরীতে তুমুল ব্যস্ততা। তথাগতকে আপ্যায়নের সব বন্দোবস্ত নিপুণ ভাবে করতে সকাল থেকে ছুটে বেড়াচ্ছেন মহারানি চেলনা। তাঁর অন্তঃপুরে দাস-দাসীর অভাব নেই। তবু তিনি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সব আয়োজন সম্পূর্ণ করতে চান। তথাগতর নামে লোকের মুখে কত গুণগান শোনেন তিনি। মগধের মানুষ বলেন, তিনি নাকি ভগবান। তাঁর কাছে সব পাওয়া যায়। তিনি মনের দুঃখ পর্যন্ত ভুলিয়ে দিতে পারেন। তাঁর নাকি অলৌকিক ক্ষমতা আছে। যদিও মহারানি চেলনা কোনোদিন তা প্রত্যক্ষ করেননি। তবু তিনি আশায় বুক বাঁধেন, যদি এই শাক্য সন্ন্যাসীর সংস্পর্শে এসে বদলে যান সম্রাট বিম্বিসার। যদি একবার চোখ ফেরান তাঁর দিকে। তিনি এই মগধ সাম্রাজ্যের মহারানি। ক্ষমতা, ঐশ্বর্য, বৈভব— কী নেই তাঁর! সেই তিনি কিনা হেরে বসে আছেন কোথাকার এক বৈশালীর নগরবধূ আম্রপালীর কাছে? এ লজ্জা, এ অপমান তিনি আর সইতে পারছেন না। এতো বছরেও বিম্বিসারের মন বসল না তাঁর কাছে। তিনি মহারানি হয়ে আছেন ঠিকই কিন্তু বিম্বিসারের মনের মানুষ হয়ে উঠতে পারেননি। কী আছে ওই রূপাজীবার মধ্যে যা তাঁর নেই? কেন বিম্বিসার আজও ছুটে যেতে চান ওই নারীর কাছে? মগধের সিংহাসনে বসাতে চান তাঁদের সন্তানকে। মা হিসেবে চেলনা কিছুতেই তা হতে দেবেন না। তিনি চান তাঁর পুত্র অজাতশত্রুর অভিষেক হোক মগধের রাজসিংহাসনে। সেই হবে মগধের সম্রাট। মগধের সিংহাসনে আর কাউকে তিনি বসতে দেবেন না।
“বৈশাখী পূর্ণিমার অনুষ্ঠান নিয়ে তুমি একটু বেশিই ব্যস্ততা দেখাচ্ছ মা।” মহারানি চেলনার ঘরে ঢুকলেন অজাতশত্রু। যুবরাজের চোখেমুখে অসন্তোষ স্পষ্ট। দুপুরের আহারাদি শেষ। তথাগত ও তাঁর সঙ্গে আসা বৌদ্ধ শ্রমণদের আপ্যায়নে কোনো ত্রুটি রাখেননি মহারানি। তথাগত তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে প্রাসাদের অভ্যন্তরে নির্দিষ্ট কক্ষে বিশ্রাম নিচ্ছেন। মহারানি চেলনা শুয়ে ছিলেন তাঁর শয়নকক্ষে। চোখের ওপর আড়াআড়ি ভাবে রাখা হাত। পুত্রের গলা শুনে হাত সরালেন চোখের ওপর থেকে। বললেন, “ওই শাক্য সন্ন্যাসীকে নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। যা করছি সব তোর পিতার জন্য। ওঁকে খুশি করতেই আমার এই সকাল থেকে ছুটে বেড়ানো।”
অজাতশত্রু মায়ের পায়ের কাছে বসলেন। “ওই সন্ন্যাসীকে নিয়ে পিতার এই উন্মাদনা আমার সহ্য হয় না মা। রাগ হয়। জাত-বর্ণহীন ধর্ম আবার কী? তাহলে তো রাজা আর প্রজার মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না। সমাজে কোনো শ্রেণি থাকবে না। বুদ্ধের দর্শন আমি মানি না। আমি মনুবাদী ব্রাহ্মণ্যধর্মে বিশ্বাসী।”
“বেশ তো। তার জন্য তোকে আগে মগধের সিংহাসনে বসতে হবে।”
“মগধের সিংহাসনে আমিই বসব মা। তুমি চিন্তা ক’রো না।”
উঠে বসলেন মহারানি। হাত রাখলেন পুুত্রের মাথায়। “সে তো আমারও স্বপ্ন। কিন্তু তোর িপতা যে তলে তলে চেষ্টা চালাচ্ছেন বৈশালীর নগরবধূর অবৈধ সন্তানকে এনে মগধের সিংহাসনে বসাতে।”
“সব ওই শাক্য সন্ন্যাসীর বুদ্ধি মা। পিতা ওর বুদ্ধিতেই চলেন। আমি ওকেও ছাড়ব না।” উত্তেজিত হয়ে উঠলেন মগধের যুবরাজ।
“বোকার মতো কথা বলিস না!” পুত্রকে মৃদু ধমক দিলেন চেলনা। তারপর পরামর্শ দেওয়ার সুরে বললেন, “তোর আসল শত্রু বৈশালীর ওই নগরবধূর ছেলে। আগে তাকে পথ থেকে সরানোর ব্যবস্থা কর। নাহলে কোনো একদিন দেখবি তোর সামনে দিয়ে হেঁটে মগধের সিংহাসনের দখল নিচ্ছে সে। শাক্য সন্ন্যাসীকে অতো গুরুত্ব দেওয়ার দরকার নেই। তবে এটা মাথায় রাখিস ওর কিন্তু অনুগামীর সংখ্যা প্রচুর। ফলে ওকে ওর মতো চলতে দে।”
মহারানি চেলনার পায়ের কাছ থেকে উঠে এলেন অজাতশত্রু। ঘরের মধ্যে বার কয়েক পায়চারি করলেন। “তুমি জানো মা, ওই তথাগত কিছু দিনের মধ্যেই বৈশালীতে যাবেন। শুনছি এবার নাকি ওই আম্রপালীর প্রাসাদে উঠবেন তিনি।”
“বলিস কী রে? শাক্য সন্ন্যাসী উঠবেন এক নগরবধূর প্রমোদভবনে? তুই কোথা থেকে এ খবর পেলি? এবার কি তবে আম্রপালী তথাগতকেও বশ করে ফেলল?” একনাগাড়ে কথাগুলো বলে উঠলেন মহারানি চেলনা।
“লোক আমার চারদিকে রাখা আছে মা। পাকা খবর। দলবল নিয়ে আম্রপালীর কাছেই যাচ্ছেন ওই শাক্য সন্ন্যাসী। তথাগতকে বাবা জিজ্ঞেস করছিলেন যে, উনি বৈশালীতে এর মধ্যে যাবেন কিনা? উত্তরে তথাগত বাবাকে বলেন, উনি মাস ছয়েকের মধ্যে বৈশালীতে যাবেন। এবার উনি আম্রপালীর বাসভবনে অতিথি হবেন।”
মহারানি চেলনা পালঙ্ক থেকে নেমে দাঁড়ালেন। পুত্রকে কাছে টেনে বললেন, “এর থেকে ভালো সুযোগ আর পাওয়া যাবে না। এক ঢিলে সব পাখি মারব। মরবে ওই গণিকার সন্তান। মরবে শাক্য সন্ন্যাসী। আর আম্রপালীকে আমি রাজপথে এনে দাঁড় করাব। বৈশালীর মানুষ ওকে দেখে পাথর ছুঁড়ে মারবে।” মগধের মহারানির চোখ থেকে ঝরে পড়ছে প্রতিশোধের আগুন।
“কী বলছ মা! আমি তো কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। কী তোমার পরিকল্পনা? আমাকে বলো।” শোনার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে উঠলেন অজাতশত্রু।
মগধরাজ তাঁর স্বামী। কিন্তু তাঁকেই ছিনিয়ে নিয়েছে আম্রপালী। তিনি মুখ বুেজ সব সহ্য করেছেন। মগধের রাজপথেও সেই নগরবধূর রূপ ও গুণের প্রশংসা শুনতে শুনতে তিনি ক্লান্ত। কিন্তু এবার চুপ করে থাকলে তো মগধের সিংহাসন হাতছাড়া হবে তাঁর সন্তানের। মা হিসেবে তা তিনি মেনে নিতে পারেন না। আম্রপালীকে হত্যা করে কোনো লাভ হবে না তাঁর। সেক্ষেত্রে আম্রপালী মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী জায়গা করে নেবে। তাহলে গোটা বৈশালী চিরকাল মাথায় করে রাখবে ওকে। তার চেয়ে বরং বৈশালীর মানুষের কাছে ওই নগরবধূকে খলনায়িকা হিসেবে প্রতিপন্ন করে ছাড়বেন তিনি। মনে মনে এই সংকল্প নিলেন মহারানি চেলনা।
