নগরবধূ আম্রপালী – ৫

 পাঁচ

বর্ষা বিদায় নিয়েছে। মাস তিনেকের বেশি সময় ধরে তথাগত ও তাঁর শিষ্যরা বৈশালীতে আছেন। এবার অন্যত্র চলে যাওয়ার কথা। তাই বৌদ্ধবিহারে সামান্য ব্যস্ততা। তথাগত বৈশালীতে এলে একবার লিচ্ছবিরাজের সঙ্গে দেখা করেন। তাঁর প্রাসাদে গিয়ে কিছু সময়ের জন্য আতিথ্য গ্রহণ করেন। যদিও রাজা জয়ন্ত তাঁকে বারবার বলেন যে, বৌদ্ধবিহারে না থেকে প্রাসাদেই থাকার জন্য। কিন্তু তথাগত প্রতিবারই তা অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে ফিরিয়ে দেন। একই অবস্থা হয় তাঁর মগধে গেলে। সেখানেও সম্রাট বিম্বিসার তাঁর ভক্ত। তিনি জোরাজুরি করেন প্রাসাদে থাকার জন্য। তথাগত তাঁকে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে নিরস্ত্র করেন। বিম্বিসার-পুত্র অজাতশত্রু যে তাঁকে মনে মনে অপছন্দ করেন সেটা তথাগত টের পান। কিন্তু মুখে কিছু বলেন না। মগধের মহারানি চেলনা তাঁকে খাতির করেন। তিনি গেলে আদরযত্নের ত্রুটি রাখেন না। সব কিছু সত্ত্বেও মহারানি চেলনার চোখে তিনি অবিশ্বাসের ছায়া লক্ষ্য করেছেন। বৈশালী ও মগধের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব যে কোনো দিন রক্তপাত ঘটাবে। এটা জানেন তথাগত। তিনি চেষ্টা করেন তা রুখতে। কিন্তু সব কি আর তাঁর হাতে আছে? অতীতেও বহুবার এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বৈশালীর নগরবধূ আম্রপালীকে নিয়ে বিম্বিসার ও লিচ্ছবিদের মধ্যে এর আগেও একবার যুদ্ধ লাগার উপক্রম হয়েছিল। তিনি শুনেছেন সম্রাট বিম্বিসার এক বণিকের ছদ্মবেশে বৈশালীতে প্রবেশ করেছিলেন। বণিকের বেশেই উঠেছিলেন আম্রপালী নামে ওই রাজনর্তকীর প্রমোদভবনে। সেবার ওই নগরবধূর আপত্তিতেই মগধরাজ যুদ্ধ না করে মগধে ফিরে যান।

বৌদ্ধবিহারের সামনে খানিকটা উদাস ভাবে দাঁড়িয়েছিলেন তথাগত। তাঁকে ওই ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এগিয়ে এলেন শুভব্রত। তিনি এই বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ। তাঁকে এই মঠের দেখভালের দায়িত্ব দিয়েছেন তথাগত। ফলে বাকি শিষ্যরা এবার অন্যত্র গেলেও তাঁকে এখানেই থেকে যেতে হবে। “কী ভাবছেন তথাগত?” কাছে গিয়ে নিচু স্বরে প্রশ্ন করলেন শুভব্রত।

তথাগত একটু থমকে বললেন, “তেমন কিছু নয় শুভব্রত। সবাই কি তৈরি? আমাদের যে বেরোতে হবে।”

“সবাই তৈরি তথাগত। কিন্তু আপনার একজন শিষ্য এখনও অনুপস্থিত।”

“কে সে?”

“আজ্ঞে, শুদ্ধসত্ত্ব। সেই তরুণ শ্রমণ, যাকে আপনি বৈশালীর নগরবধূর প্রমোদভবনে গিয়ে থাকার অনুমতি দিয়েছিলেন।”

“শুদ্ধসত্ত্ব কি এখনও ফেরেনি?”

“না তথাগত। ও আর ফিরবে বলে আমার মনে হয় না। আমি কিন্তু আগেই বলেছিলাম… ”

তথাগত হাত তুলে শুভব্রতকে থামিয়ে বললেন, “এখনও সময় আছে। এতো চিন্তিত হ’য়ো না। শুদ্ধসত্ত্ব ঠিক ফিরে আসবে। মঠের অনুশাসন ভাঙার ছেলে ও নয়।”

“শুদ্ধসত্ত্ব বয়সে নবীন। ওই রাজনর্তকী তাঁর রূপের জাদুতে বশ করে ওকে বিপথে চালিত করেছে তথাগত।” বেশ উত্তেজিত হয়েই কথাগুলো বলে ফেললেন শুভব্রত।

“যদি তাই ঘটে থাকে তাহলে ভালোই হয়েছে শুভব্রত। শুদ্ধসত্ত্বের বৌদ্ধ ভিক্ষু হওয়ার যোগ্যতা নেই। কারণ সে সংযমী নয়। কিন্তু আমার মন বলছে শুদ্ধসত্ত্ব অগ্নিপরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হবে।”

“তথাগত, আমি কিন্তু আপনাকে আগেই সাবধান করেছিলাম যে, ওই নারী ছলনাময়ী। ওর প্রমোদভবনে একজন ভিক্ষুর পা দেওয়া মানে তাঁর সন্ন্যাসজীবন অপবিত্র হওয়া।”

তথাগত খানিকটা বিরক্ত হলেন। বললেন, “আমি তো তোমাকে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ করতে শেখাইনি শুভব্রত। আম্রপালী একজন রূপাজীবা হতে পারে কিন্তু সেও একজন মানুষ। আমরা তো মানুষের কল্যাণের কথা চিন্তা করি। ভেবে দেখো, আম্রপালী একজন রূপাজীবা। কিন্তু সে কি এই জীবন স্বেচ্ছায় বেছে নিয়েছে? যে রাজপুরুষগণ তাঁর কাছে কার্ষাপণের বিনিময়ে আনন্দ ও বিনোদন কিনতে যান তাঁরা সবাই কি সাধুপুরুষ?”

তথাগতর থেকে এরকম সুনিপুণ যুক্তি আশা করেননি শুভব্রত। তাই চুপ করে গেলেন। কারণ এ নিয়ে কিছু বলতে গেলে লিচ্ছবি গোষ্ঠীর ক্ষমতাশালী পুরুষদের বিরুদ্ধেই আঙুল তুলতে হবে। সে সাহস শুভব্রতের নেই। তাই তিনি এই বিষয়ে আর বিশেষ কিছু না বলাকেই শ্রেয় মনে করলেন।

একে একে বৌদ্ধ শ্রমণরা জড়ো হলেন বৌদ্ধবিহারের প্রাঙ্গণে। সবাই তৈরি। এবার রওনা দিতে হবে। তথাগত দেখলেন একমাত্র শুদ্ধসত্ত্ব গরহাজির। তিনি কিছু একটা ভাবলেন। তারপর শুভব্রতকে বললেন, “এবার আমাদের রওনা হতে হবে। তুমি এই বৌদ্ধবিহারের দায়িত্বে, দেখো মানুষের সেবা থেকে এই মঠ যেন বিচ্যুত না হয়।”

শুভব্রত প্রণাম করলেন। তথাগত তাঁকে আশীর্বাদ করলেন। তারপর পা বাড়ালেন পথে। বাকি বৌদ্ধ ভিক্ষুরা তথাগতকে অনুসরণ করলেন। তথাগতর পাশে পাশে হাঁটছিলেন ভিক্ষু সারিপুত্ত, ভিক্ষু আনন্দ এবং ভিক্ষু উপালি। শুভব্রত বেশ কিছুটা এগিয়ে দিলেন। তথাগত তাঁকে বললেন ফিরে যেতে। শুভব্রত ফিরে গেলেন মঠে।

মেঠো পথ ধরে হেঁটে চলেছেন বৌদ্ধ ভিক্ষুর দল। সবার আগে চলেছেন তথাগত। বৈশালী নগরীর মানুষজন তথাগতকে দেখে এগিয়ে আসছেন। কথা বলছেন। সবার কথাই মন দিয়ে শুনছেন তিনি। একটা সময় তাঁরা পৌঁছালেন গঙ্গার তীরে। এবার নৌকোর ব্যবস্থা করতে হবে। ভিক্ষু সারিপুত্ত, ভিক্ষু আনন্দ এবং ভিক্ষু উপালি গেলেন নৌকোর ব্যবস্থা করতে। তথাগত দাঁড়িয়ে আছেন নদীর তীরে। বর্ষার শেষে গঙ্গা এখন গর্ভবতী নারীর মতো। বিস্তৃত সেই জলরাশির দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে ছিলেন তিনি। ঠিক সেই সময় শুনলেন চিৎকার করে তাঁকে ডাকতে ডাকতে ছুটে আসছেন শুদ্ধসত্ত্ব। তথাগত ঘাড় ঘুরিয়ে সেই দিকে দেখলেন। শুদ্ধসত্ত্বের পিছন পিছন উদভ্রান্তের মতো ছুটে আসছেন এক নারী। তাঁর পরনে আলুথালু পোশাক। হাওয়ায় উড়ছে খোলা চুল। তাতে তেল পড়েনি কয়েকদিন। লম্বা চুল খানিকটা রুক্ষ। তবে সেই নারী যে রীতিমতো সুন্দরী তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

শুদ্ধসত্ত্ব ছুটে এসে প্রণাম করলেন। হাঁফাতে হাঁফাতে বললেন, “বিলম্ব হওয়ার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী প্রভু। কিন্তু আমি নিরুপায় হয়েই দেরি করেছি।”

তথাগত বললেন, “আমি জানতাম তুমি ফিরে আসবে। এবার যাওয়া যাক। পথে যেতে যেতে বাকি কথা হবে।”

শুদ্ধসত্ত্ব ও তথাগতর কথোপকথনের মাঝেই সেই নারী এসে তথাগতর পা ছুঁয়ে প্রণাম করলেন। তথাগত বললেন, “তোমার কল্যাণ হোক মা। যদি না ভুল করি তুমি নিশ্চয়ই রাজনর্তকী আম্রপালী।”

আম্রপালী বিস্ফারিত চোখে তথাগতকে দেখছেন। কী প্রশান্তি ওই চেহারায়। যেন এক বরফমাখা পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে সামনে। এই সেই ভগবান বুদ্ধ। যিনি বোধিলাভ করেছেন। এঁর কথা কত শুনেছেন। কিন্তু কোনোদিন মুখোমুখি দাঁড়াননি। গোটা বৈশালীর মানুষ এই মানুষটিকে শ্রদ্ধা করে। তাঁকে মনের আসনে যত্ন করে বসিয়েছে। আজ এই মানুষটির সামনে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে কত দিনের চেনা।

শুদ্ধসত্ত্ব একটু সংকোচ করে বললেন, “উনি আপনার শরণে আসতে চান প্রভু। আমার অনেক আপত্তি সত্ত্বেও উনি প্রাসাদ ছেড়ে এখানে চলে এসেছেন। আমি কি ওঁকে এখানে এনে কোনো ভুল করেছি?”

তথাগত স্মিত হাসলেন। বললেন, “না তুমি কোনো ভুল করোনি। কিন্তু আমার তো ওঁকে দেওয়ার মতো কিছু নেই।”

এ কোন আম্রপালী? মুখে প্রসাধন নেই। শরীরে নেই দামি পোশাক। অঙ্গে নেই সোনার অলংকার। অতি সাধারণ এক পোশাকে তিনি ছুটে এসেছেন ভগবান বুদ্ধের কাছে। আম্রপালী হাতজোড় করে তথাগতের উদ্দেশে বললেন, “আমি পাপী প্রভু। নিজের রূপ, ঐশ্বর্যের অহংকারে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। আমি আপনার এই তরুণ শ্রমনকে বশ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বলতে দ্বিধা নেই আমিই নিজে বশ হয়ে গিয়েছি। এখন আমার মুক্তির পথ বলে দিন। আমাকে আপনার শরণে নিন।” কথা বলতে বলতে আম্রপালী কেঁদে ফেললেন।

তথাগত সস্নেহে আম্রপালীর মাথায় হাত রাখলেন। আম্রপালী অনুভব করলেন তাঁর শরীরে ভেতর এক অদ্ভুত প্রশান্তি খেলা করছে। ভগবান বুদ্ধ তাঁকে স্পর্শ করেছেন। তাঁর মতো একজন রূপাজীবার মাথায় হাত রেখেছেন। আবেগে আম্রপালীর দু’ চোখ বেয়ে জল ঝরতে শুরু করল। তাঁর তপ্ত কাঞ্চনবর্ণ মসৃণ গাল বেয়ে নেমে এল জলের ধারা।

“তুমি কী চাও?”

তথাগতের প্রশ্ন শুনে চোখ মেলে তাকালেন আম্রপালী। বললেন, “আমাকে আপনার শরণে নিন।”

তথাগত শান্ত কণ্ঠে বললেন, “বেশ নিলাম। আজ থেকে তুমিও আমার শিষ্যা। তোমার কাজ হবে মানুষের কল্যাণ করা।”

“কিন্তু আমি যে একজন রূপাজীবা প্রভু। আমার ক্ষমতা কতটুকু?”

“ক্ষমতা নিয়ে ভেবো না। যে কাজই করো চিত্ত পরিশুদ্ধ রেখো নিয়ত। জেনো এটাই বুদ্ধের অনুশাসন। বলো, বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি। অর্থাৎ আমি বুদ্ধের শরণ নিলাম। বলো, ধম্মং শরণং গচ্ছামি অর্থাৎ আমি ধর্মের শরণ নিলাম।”

বিপুল ঐশ্বর্যের অধিকারিণী আম্রপালী। তাঁর রূপ ও গুণের খ্যাতি গোটা দেশ জোড়া। বড় বড় রাজা মহারাজারা তাঁর দরজায় এসে দাঁড়ান। প্রশংসায় ভরিয়ে দেন। কিন্তু তাঁকে কোনোদিন একজন নারী হিসেবে সম্মান দেননি। তিনি থেকে গিয়েছেন সমাজের একজন রূপাজীবা হয়ে। কিন্তু আজ ভগবান বুদ্ধ যেন তাঁকে এক নতুন জীবন লাভ করালেন। বুদ্ধের শরণে এসে তাঁর হৃদয়ে যেন প্রশান্তি নেমে এসেছে। উঠে দাঁড়িয়ে তিনি কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে অনুরোধ করলেন, “আপনি িক একবার আমার গৃহে পায়ের ধুলো দেবেন প্রভু?”

তথাগত বললেন, “নিশ্চয়ই যাব। তবে এবার তো আর হবে না। এর পরের বার বৈশালীতে এলে তোমার আমন্ত্রণ গ্রহণ করব।”

আম্রপালী মনে মনে ভাবলেন, ভগবান বুদ্ধ তাঁর মন রাখার জন্য এ কথা বলছেন। উনি কেন যাবেন তাঁর গৃহে? সমাজে আম্রপালীর খ্যাতি ও প্রতিপত্তি থাকলেও আসলে তিনি তো আদতে নগরবধূ। বহুভোগ্যা। তিনি বিনোদনের উৎস হতে পারেন। কিন্তু কেউ তাঁকে প্রকাশ্যে গ্রহণ করবেন না। তবু এই যুগপুরুষ তাঁর আমন্ত্রণে যে সাড়া দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এই অনেক।

তথাগত তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে চলে যাচ্ছেন অন্যত্র। আম্রপালী তাকিয়ে আছেন সেই দিকে। তাঁর হৃদয়জুড়ে যে ঝড় বইছিল তা এখন প্রশমিত হয়েছে। ভগবান বুদ্ধ তাঁকে আশ্রয় দিয়েছেন। তিনি আজ থেকে ভগবান বুদ্ধের শিষ্যা। এবার তাঁকে প্রাসাদে ফিরতে হবে। তিনি যে পোশাকে রাস্তায় বেরিয়েছেন তা দেখলে বৈশালীবাসী জ্ঞান হারাবে। লিচ্ছবিদের কানে গেলে আবার এই নিয়ে জলঘোলা হবে। রাজনর্তকী এই পোশাকে এখানে কী করছেন? তাঁর রথ কোথায়? হাজারও প্রশ্নে তাঁকে জেরবার হতে হবে। তাই শাড়ির আঁচল দিয়ে তিনি মুখ ঢেকে নিলেন। অবগুন্ঠন টানা মুখে সাধারণ কৃষক পরিবারের গৃহবধূর মতো লাগছিল আম্রপালীকে। ‘গৃহবধূ’? শব্দটি মনে পড়তেই দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো আম্রপালীর বুক চিরে। যা কিনা নিঃশব্দে মিশে গেলে নদীর চরের শূন্যতায়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *