আঠারো
“মহারাজ একটা খবর দেওয়ার ছিল।” দূত এসে দাঁড়াল লিচ্ছবিরাজ জয়ন্তর প্রাসাদে।
জয়ন্ত জানেন তথাগত এসেছেন বৈশালীতে। এবার তিনি বেশ কয়েক বছর পর এলেন। তাই তিনি বিশেষ দূতকে পাঠিয়ে ছিলেন তথাগতকে প্রাসাদে নিয়ে আসতে। উদ্গ্রীব হয়ে তিনি অপেক্ষা করছিলেন তথাগতর আসার খবরের। তাই দূতকে দেখে বললেন, “হ্যাঁ বলো, কখন আসবেন উনি? উনি কি সরাসরি প্রাসাদে আসবেন নাকি বৌদ্ধবিহারে প্রথমে উঠবেন? যদি বৌদ্ধবিহারে প্রথমে ওঠেন তাহলে ওখানে রথ পাঠানোর ব্যবস্থা করো।”
দূত ইতস্তত বোধ করল খবরটা দিতে। সে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না যে, এই খবরের বিনিময়ে সে কিছু অর্থ পুরস্কার হিসেবে পাবে কী পাবে না।
দূতকে চুপ করে থাকতে দেখে মেজাজ হারালেন জয়ন্ত। “আঃ! চুপ করে সঙের মতো দাঁড়িয়ে আছো কেন? কী বললাম, কথা কানে যায়নি নাকি?”
রাজার ধমকে দূত থতমত খেয়ে জানাল, “মহারাজ, উনি এখানে আসবেন না।”
“মানে? কী হেঁয়ালি করছ তখন থেকে? এখানে আসবেন না তো যাবেন কোথায়? বৌদ্ধবিহারে?”
“না মহারাজ উনি সেখানেও যাবেন না বলে জানিয়েছেন।”
“বৈশালীতে আর কোথায় যাবেন উনি? সেটা কি কিছু জানিয়েছেন? তোমায় কী করতে পাঠালাম। তুমি আমন্ত্রণ জানাওনি?”
“মহারাজ উনি আম্রপালীর কাছে যাবেন বলে জানিয়েছেন।” মিনমিন করে কথাগুলো বলেই ঢোঁক গিলল দূত।
রাজা জয়ন্ত কি ঠিক শুনছেন? কী বলছে তাঁর এই দূত! তথাগত জানিয়েছেন, তিনি আম্রপালীর প্রমোদভবনে যাবেন। উত্তেজিত হয়ে উঠলেন জয়ন্ত, “তুমি জানো, তুমি কার সম্পর্কে কী বলছ? তথাগত যাবেন আম্রপালীর প্রমোদভবনে? তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? তোমার এই বক্তব্যের জন্য বিচারসভায় তোমার মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। সেটা কি তুমি জানো?”
মহা আতান্তরে পড়ল দূত। সে ভেবেছিল, তথাগতর আম্রপালীর বাসভবনে যাওয়ার খবরটা রাজার কানে দ্রুত তুলতে পারলে কিছু অর্থ পুরস্কার স্বরূপ মিলবে, তা না এ তো উলটে তার প্রাণ নিয়ে টানাটানি। সে হাতজোড় করে আকুতি জানিয়ে বলে উঠল, “মহারাজ আমি বারবার আপনার আমন্ত্রণের কথা ওঁকে বলেছি কিন্তু উনি সরাসরি তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। এমনকী উনি বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ ভিক্ষু শুভব্রতকেও বলেছেন যে, তিনি আম্রপালীর প্রাসাদে আতিথেয়তা গ্রহণ করতেই বৈশালীতে এসেছেন।”
তথাগত বৈশালীতে এসেছেন আম্রপালীর আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে? চোয়াল শক্ত করলেন রাজা জয়ন্ত। এ তো তাঁর চরম অপমান। বৈশালীর নগরবাসীরা কী ভাববেন? তাঁরা তো জানবেন যে ভগবান বুদ্ধ বৈশালীতে এসে উঠেছেন এক নগরবধূর প্রমোদভবনে। মানসম্মান থাকবে না আর। নাহ! যে করেই হোক তথাগতকে আম্রপালীর প্রমোদভবনে যাওয়া থেকে আটকাতেই হবে। তিনি দূতকে ঈশারায় চলে যেতে বললেন। দূত চলে যেতেই হাঁক পাড়লেন। দ্রুত ছুটে এল এক রক্ষী। জয়ন্ত তাঁকে নির্দেশ দিলেন, মন্ত্রী কোরককে ডেকে দিতে।
কোরক আসতেই ক্ষোভে ফেটে পড়লেন জয়ন্ত। “তোমরা করোটা কী? কেউ কি নিজের কাজটুকু ঠিক ভাবে করতে পারো না? এভাবে চললে তো বৈশালীতে অরাজকতার সৃষ্টি হবে।”
বহুদিন পর এমন রূপে জয়ন্তকে দেখলেন কোরক। বুঝলেন এই মুহূর্তে বেশি কথা বলা ঠিক হবে না। লিচ্ছবিরাজের মেজাজ সপ্তমে চড়ে রয়েছে। কিন্তু কারণটা কী তা অনুমান করতে সক্ষম হলেন না কোরক। মোলায়েম সুরে বললেন, “মহারাজ আমার ত্রুটি যদি একবার বলে দেন… ”
“তুমি কী জানো তথাগত বৈশালীতে এসেছেন?”
“জানি মহারাজ। উনি আর কিছুক্ষণের মধ্যেই এই প্রাসাদে এসে পৌঁছে যাবেন আপনার সঙ্গে দেখা করতে। ওঁর আপ্যায়নের সব ব্যবস্থা পাকা করে রাখতে বলেছি।”
জয়ন্ত শূন্যে মুষ্টিবদ্ধ হাত ছুঁড়ে বললেন, “তার কোনো প্রয়োজন হবে না কোরক। উনি এখানে আসবেন না।”
“তাহলে কি উনি বৌদ্ধবিহারে যাবেন?”
“না! উনি আম্রপালীর প্রমোদভবনে উঠবেন বলে জানিয়েছেন। আম্রপালী নাকি ওঁকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে আর উনি তা গ্রহণ করেছেন।”
মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতো চমকে উঠলেন কোরক। বুঝলেন লিচ্ছবিরাজ জয়ন্ত কেন এতো রেগে রয়েছেন। ভগবান বুদ্ধ শেষে নগরবধূর আম্রকুঞ্জে অতিথি হবেন? ছিঃ ছিঃ! এ তো গোটা বৈশালীর অপমান। চারদিকে ঢিঢি পড়ে যাবে। প্রশ্ন উঠে যাবে ক্ষত্রিয়গোষ্ঠীগুলির ক্ষমতা নিয়ে। এক নগরবধূর কাছে শেষে হার মানতে হবে বিপুল শক্তিধর বজ্জিয়ান প্রজাতন্ত্রকে। না না এ কিছুতেই হতে দেওয়া যায় না। কোরক ডান হাতের মধ্যমা দিয়ে কপালে বার কয়েক টোকা মারলেন। যদি কিছু উপায় বের করা যায়।
কোরককে চুপ করে থাকতে দেখে জয়ন্ত নির্দেশ দিলেন, “তুমি এক্ষুনি লোকজন নিয়ে নিজে যাও আম্রপালীর কাছে। ওকে বলো যতো অর্থ লাগে রাজকোষ থেকে ওকে দেওয়া হবে। ও শুধু তথাগতকে আপ্যায়ন করা থেকে বিরত থাকুক। কোনোভাবেই তথাগত যেন ওর প্রমোদভবনে রাত না কাটায়।”
“মহারাজ আমি এক্ষুনি বিষয়টি নিষ্পত্তি করে আসছি। আপনি উতলা হবেন না।” কোরক যেতে গিয়েও থমকে দাঁড়ালেন। ফের জয়ন্তর দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলেন, “মহারাজ অর্থের প্রলোভনে আম্রপালীকে বশীভূত করা না গেলে কি চরম পথ নেব? আপনার আগাম অনুমতির প্রয়োজন।”
কোরককে সামনে পেয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়ে কিছুটা শান্ত হয়েছেন জয়ন্ত। তিনি বললেন, “একজন গণিকাকে অর্থ আর অলঙ্কার দিয়েই বশ করতে হয় কোরক। এছাড়া আর কী দিয়ে তাকে কিনবে তুমি? ওকে বলো যা খুশি চেয়ে নিতে বিনিময়ে তথাগতকে ছেড়ে দিতে হবে।”
কোরক দ্রুত প্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। তাঁর গন্তব্য আম্রকুঞ্জ।
রথে চড়ে যখন তিনি আম্রকুঞ্জে পৌঁছোলেন তখন সেখানে বহু মানুষের ভিড়। মূল ফটক আজ খুলে দেওয়া হয়েছে। প্রাসাদের সামনের আম্রকুঞ্জে বসে আছেন তথাগত। সেখানে বৌদ্ধ ভিক্ষু ছাড়াও সাধারণ জনতার ভিড়। তথাগতকে ঘিরে রয়েছেন অসংখ্য মানুষ। মূল ফটকের নিরাপত্তা আজ ঢিলেঢালা। কোরক আম্রকুঞ্জের দিকে গেলেন না। এক নিরাপত্তা রক্ষীকে নির্দেশ দিলেন আম্রপালীর কাছে তাঁর আসার খবর দ্রুত পাঠাতে। কোরক লিচ্ছবিরাজের ঘনিষ্ঠ অনুচর। রাজ্যের মন্ত্রীও বটে। রক্ষী দ্রুত ছুটল অন্দরমহলের দিকে। আরেক রক্ষী এগিয়ে এসে কোরককে প্রাসাদের অতিথি নিবাসে নিয়ে গিয়ে বসাল। কোরক বসে রইলেন। তাঁর সঙ্গে আসা কয়েকজনকে তিনি বাইরে অপেক্ষা করতে বলে এসেছেন। তাদের বলে এসেছেন প্রয়োজন হলে ডেকে নেবেন।
কিছুক্ষণ পর এলেন এক বৃদ্ধা। কোরক চেনেন এঁকে। হরিবালা। আম্রপালীর পালিকা-মা। হরিবালা নমস্কার জানিয়ে বিনীতভাবে বললেন, “ভগবান বুদ্ধ আজ আমাদের অতিথি। আম্রপালী তাঁকে আপ্যায়ন করতে ব্যস্ত। আপনি যদি কিছু মনে না করেন তাহলে আরেক দিন আসুন। আজ আম্রপালী আপনাকে সময় দিতে পারবে না।”
একজন নগরবধূ তাঁকে ফেরাচ্ছেন। বৈশালীর মন্ত্রীকে ফিরিয়ে দিচ্ছেন। সাহস দেখলে অবাক হতে হয়। কিন্তু কোরক জানেন রাগলে তাঁর চলবে না। তাঁকে কাজ হাসিল করে যেতে হবে। নাহলে লিচ্ছবিরাজ তাঁকে ছেড়ে দেবেন না। শেষে এক গণিকার জন্য মন্ত্রীত্বও না খোয়াতে হয়। “জানি মা। আপনারা আজ খুবই ব্যস্ত। কিন্তু রাজার বার্তা। আমাকে তো আম্রপালীর কাছে পৌঁছে দিতেই হবে। বুঝতেই পারছেন। আমি শুধু কয়েক মুহূর্ত সময় নেব।”
হরিবালা “দেখছি” বলে প্রাসাদের ভেতরে চলে গেলেন। কোরক বসে রইলেন। একটু পরে দুজন যুবতী এল। কোরককে প্রণাম জানাল। বলল তাদের একজনের নাম ইরাবতী ও অন্য জনের নাম চন্দ্রাবতী। দুজনে জানাল, তাকে আম্রপালী প্রাসাদের ভেতরে ডেকে পাঠিয়েছেন। দুজনেই অবশ্য কায়দা করে জানতে চাইল লিচ্ছবিরাজ কী বার্তা পাঠিয়েছেন আম্রপালীর জন্য। কোরকের মেয়ে দুটোকে সুবিধের লাগল না। কেমন যেন একটু বেশি ঘনিষ্ঠ হতে চাওয়ার বাড়তি উদ্যোগ চোখে পড়ল তাঁর। মনে মনে ভাবলেন, গণিকার প্রমোদভবনে এর থেকে বেশি কীই বা তিনি আশা করতে পারেন? মুখে অবশ্য বললেন, “যার জন্য বার্তা তাঁকেই জানাব। এটাই মহারাজের হুকুম।”
“খোদ মন্ত্রীমশাই আমার প্রমোদভবনে। কী ব্যাপার?” কোরক অন্দরমহলে প্রবেশ করতেই প্রশ্ন করলেন আম্রপালী।
“বিশেষ প্রয়োজনে আসতে হল। কিন্তু ব্যস্ত বলে আপনি তো দেখাই করতে চাইছিলেন না।” একটু তির্যক ভাবে কথাগুলো বললেন কোরক।
“ভগবান বুদ্ধ আমার কুটিরে অতিথি আজ। ব্যস্ততা তো থাকবেই। আমি নিজে খেয়াল রাখছি যাতে ওঁর কোনো অসুবিধা না হয়। আর তাছাড়া আপনি ভুলে গিয়েছেন শর্ত অনুযায়ী রাজার দূতকেও আমার সঙ্গে দেখা করতে হলে এক সপ্তাহ আগে আর্জি জানাতে হয়। বিধানসভায় এই প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছিল আমাকে নগরবধূ হিসেবে নিয়োগের সময়ই।”
কোরকের শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল। ক্ষমতা আর বৈভব তো এই নারীর মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছে। যথাসম্ভব নিজেকে শান্ত রেখে তিনি বললেন, “লিচ্ছবিরাজ জয়ন্ত আপনাকে একটা প্রস্তাব পাঠিয়েছেন।”
“কী প্রস্তাব?” শান্ত গলায় প্রশ্ন করলেন আম্রপালী।
কোরক ঘরের চারদিকে তাকালেন। দেখলেন সেই দুই যুবতী দরজার কাছে দাঁড়িয়ে। তিনি ওদের দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইলেন।
আম্রপালী তাকালেন চন্দ্রা ও ইরার দিকে। কোরককে আশ্বস্ত করে বললেন, “ওরা আমার খুব কাছের লোক। ওদের সামনে আপনি যা বলার বলতে পারেন।”
কোরক চুপ করে রইলেন। আম্রপালী ইশারায় ইরা ও চন্দ্রাকে ঘরের বাইরে চলে যেতে বললেন।
ইরা ও চন্দ্রা চলে যেতেই কোরক আম্রপালীকে বললেন, “মহারাজ জয়ন্ত চান না তথাগত আপনার প্রমোদভবনে অতিথি হয়ে থাকুন। আপনি তথাগতকে ফিরিয়ে দিন। তার বিনিময়ে যত অর্থ চান তা পেয়ে যাবেন। এমনকী যা চান তাই পাবেন।”
কোরকের প্রস্তাবে হেসে ফেললেন আম্রপালী। বললেন, “মহারাজকে গিয়ে বলুন অর্থ আমারও কিছু কম নেই। ফলে অর্থ কেন, কোনো কিছুর বিনিময়েই আমি তথাগতকে আমার প্রাসাদ থেকে চলে যেতে বলব না। উনি আমার অতিথি। আমিই ওঁকে আমার সাধ্যমতো আপ্যায়ন করব।”
কোরকের কাছ থেকে পুরোটা শুনলেন লিচ্ছবিরাজ জয়ন্ত। এক নগরবধূর কাছে এই পরাজয় তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না। বৈশালীর মাটিতে দাঁড়িয়ে তাঁর প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার মূল্য চোকাতেই হবে আম্রপালীকে।
জয়ন্তকে গুম মেরে বসে থাকতে দেখে কোরক খুব নিচু স্বরে বললেন, “মহারাজ এবার ওকে থামিয়ে দিন। ও তো নিজেকে আপনার থেকেও ক্ষমতাবান বলে মনে করতে শুরু করেছে। কোনোদিন বৈশালীর রানি হিসেবে নিজেকে দাবি করে বসবে।”
“উপায় বাতলাও কোরক, উপায়। এই অপমানের বদলা আমায় নিতেই হবে।” ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন জয়ন্ত।
কোরক শান্ত ভাবে বললেন, “মহারাজ, গাছে পোকা লেগে গেলে গাছ কেটে ফেলতে হয়। তা সে চন্দন গাছ হলেও তাকে রাখা যায় না।”
জয়ন্ত এবার সোজা হয়ে উঠে বসলেন। মাথার চুলে একবার হাত বুলিয়ে নিলেন। কোরকের দিকে তাকালেন সরু চোখে। বললেন, “গাছ কেটে ফেলো। তবে দুটো জিনিস মাথায় রেখো। এক, গুপ্তঘাতকেরা কেউ যেন বৈশালীর না হয়। ভিন রাজ্য থেকে বরাত দিয়ে নিয়ে এসো। আর দুই, এই বিষয়ে তথাগত যেন ঘুণাক্ষরেও কিছু টের না পান।”
