নগরবধূ আম্রপালী – ১৫

 পনেরো

আশ্বিন মাস। নীল বর্ণের আকাশ। রোদের ঝিলিক চারদিকে। বৈশালীর প্রাকৃতিক পরিবেশ অত্যন্ত মনোরম। নগরজুড়ে সবুজের বাহার। এখানে ওখানে উদ্যান, তার মাঝে সরোবর। ফুটে রয়েছে পদ্মফুল। বৈশালী নগরে এর আগেও এসেছেন তথাগত। বোধিলাভের পর এখানে বেশ কয়েক বার কাটিয়ে গিয়েছেন তিনি। একবার তো গোটা বর্ষাকালটা এই নগরেই কাটিয়েছিলেন। প্রায় বছর ছয়েক পর ফের এলেন এখানে। এর আগের বার তিনি একজনকে কথা দিয়েছিলেন বৈশালীতে এলে তাঁর আমন্ত্রণ রক্ষা করবেন। তাই তিনি ঘুরতে ঘুরতে চলে এসেছেন এখানে।

বৈশালী নগরীর চারদিক প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। সামনেই তোরণদ্বার। সেই দিকেই ধ্যানস্থ ভঙ্গিতে হাঁটছেন তথাগত। মুণ্ডিতমস্তক। চোখ অর্ধমুদিত। পরনে রক্তবর্ণের পোশাক। পায়ের নিচে মেঠো পথ। পথটি সংকীর্ণ। দু’ পাশে ফসলের মাঠ। সেখানে দুধমণি ধানের চারা মাথা দোলাচ্ছে। তথাগতের সঙ্গে রয়েছেন তাঁর চার প্রিয় শিষ্য। ভিক্ষু সারিপুত্ত, ভিক্ষু আনন্দ, ভিক্ষু উপালি এবং ভিক্ষু শুদ্ধসত্ত্ব। তাঁদের অনুসরণ করছেন বৌদ্ধ ভিক্ষুর দল। সে দলে রয়েছেন ভিক্ষুণী সংঘের সদস্যারাও। তাঁরা থাকবেন বৈশালীর বৌদ্ধবিহারে।

বৈশালীর তোরণদ্বারের কাছে দাঁড়িয়ে আছেন ভিক্ষু শুভব্রত। বয়স এখন তাঁর মধ্য চল্লিশ। তাঁর পোশাকও রক্তবর্ণের। শুভব্রত বৈশালীর বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ। এক সময় তিনি ব্যবসায়ী ছিলেন। পাটলিপুত্র নগরে তঁার ব্যবসা ছিল। বছর দশেক আগে তিনি বুদ্ধের শরণে আসেন। দীক্ষা নেন বুদ্ধের কাছে।

তথাগত আসছেন বৈশালী নগরে। বৈশালীর রাজাও চান তাঁর প্রাসাদেই আতিথেয়তা গ্রহণ করুন তথাগত। ভিক্ষু শুভব্রতের পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছে লিচ্ছবিরাজ জয়ন্তর দূত। দূর থেকে তথাগতকে দেখে দ্রুত তাঁর দিকে এগিয়ে গেলেন শুভব্রত। কাছে গিয়ে তথাগতকে প্রণাম করে বললেন, “আপনাকে আতিথ্য দিতে বৈশালীর বৌদ্ধবিহার প্রস্তুত।”

শুভব্রতের কথা শেষ হতেই রাজা জয়ন্তর দূত তথাগতকে প্রণাম করে বলল, “লিচ্ছবিরাজ একবার আপনাকে রাজপ্রাসাদে যেতে অনুরোধ করেছেন। আপনি বললে বৌদ্ধবিহার থেকে রথে করে আপনাকে প্রাসাদে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। মহারাজ চান আপনি প্রাসাদে বিশ্রাম নিন।”

তথাগত স্মিত হেসে দূতকে বললেন, “আমি ভিক্ষু মানুষ। এ শহর থেকে সে শহরে ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে ঘুরি। রথে চড়ে আমার প্রাসাদে যাওয়ার প্রয়োজন পড়বে না। তুমি বরং মহারাজকে ব’লো, সময় হলে তথাগত ঠিক নিজেই চলে যাবে।”

শুভব্রত এবার উৎসাহ দেখিয়ে বলল, “তাহলে চলুন, আগে আমরা বৌদ্ধবিহারের দিকে যাই।”

তথাগত মৃদু হাসলেন। কিছু বললেন না। তাঁকে চুপ করে থাকতে দেখে তাঁর এক শিষ্য ভিক্ষু আনন্দ শুভব্রতের উদ্দেশে বললেন, “তথাগতর পক্ষে এক্ষুনি রাজার নিমন্ত্রণ গ্রহণ করা সম্ভব নয়। উনি এখন বৌদ্ধবিহারেও উঠবেন না।”

রাজার দূত অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। সে বুঝে উঠতে পারল না তার এখন কী করা উচিত।

শুভব্রত অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন, “সে কী! কেন?”

ভিক্ষু সারিপুত্ত বললেন, “আম্রপালী আগেই তথাগতকে নিমন্ত্রণ করেছেন। আমরা এখন আম্রপালীর বাসভবনের দিকেই যাচ্ছি।”

“আম্রপালী!” িবস্মিত হলেন ভিক্ষু শুভব্রত। মনে মনে শঙ্কা প্রকাশ করে বিড়বিড় করে বলে উঠলেন, “তথাগত যাবেন একজন সামান্য নগরবধূর গৃহে? ছিঃ!”

শুভব্রতর কথা শুনতে পেলেন না তথাগত। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি আমায় কিছু বললে শুভব্রত?”

শুভব্রত দ্বিধান্বিত। ভাবছেন, এ কথা কী করে তিনি তথাগতর মুখের ওপর বলবেন? বেশ কয়েক বছর আগেও তরুণ ভিক্ষু শুদ্ধসত্ত্বকে আম্রপালীর প্রমোদভবনে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন তথাগত। তখনও নানা ভাবে নিজের আপত্তির কথা জানিয়েছিলেন তিনি। এবার তো খোদ তথাগতই ওই রূপাজীবার আতিথ্য গ্রহণ করতে যাচ্ছেন। কিন্তু তিনি তাঁর দীক্ষাগুরু। গুরুকে বিপথে তিনি যেতে দেন কী করে? শুভব্রত পড়লেন মহা সংকটে। তিনি কিছুতেই ভেবে উঠতে পারছেন না যে তথাগত একজন রাজনর্তকীর গৃহে কী করে আতিথেয়তা গ্রহণ করবেন? তথাগতের সামনে তিনি নীরবে দাঁড়িয়ে রইলেন। রাজপুরুষগণের লালসাকে নিবৃত্ত করে যে নারী তার কাছে একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু কী করে যাবে? তথাগত কি না জেনে কথাগুলো বলছেন?

শুভব্রতর মনের অবস্থা বুঝতে পারলেন তথাগত। শান্ত কণ্ঠে বললেন, “মনের কথা প্রকাশ না করলে মনের ওপর চাপ বাড়ে। সুতরাং মনকে হালকা করতে তুমি তোমার মনের কথা খুলে বলতে পারো।”

ভিক্ষু শুভব্রত এবার কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে বলে উঠলেন, “তথাগত আপনি বৌদ্ধবিহারে না উঠে কেন একজন সামান্য নগরনটীর গৃহে থাকতে যাবেন? সে অপবিত্রা নারী। বহুভোগ্যা। সমাজে তার কোনো স্থান নেই। তার গৃহে আপনি গেলে আপনার গরিমা ক্ষুণ্ণ হবে।”

তথাগত বললেন, “কিন্তু সেই নারী তো বিপুল ক্ষমতার অধিকারী। তার ধনসম্পদের কাছে অনেক ধনবান পুরুষও তো হার মানে। শুধু তাই নয়, এই আর্যাবর্তের এমন কোনো বিত্তবান পুরুষ নেই যে ওই নারীকে কামনা করেননি। তাহলে সমাজে তাঁর স্থান নিচে কী করে হল শুভব্রত? এমনকী বৈশালীর রাজাও তাঁর গুণমুগ্ধ।”

শুভব্রত বিস্ফারিত চোখে তথাগতর দিকে চেয়ে থেকে বলে উঠলেন, “আপনি ওর সব খোঁজখবর রাখেন?”

নির্লিপ্ত ভাবে তথাগত বলে উঠলেন, “আমি তোমারও সব খবর রাখি শুভব্রত। এই বৈশালী নগরেরও খবর রাখি। বৌদ্ধবিহারেরও খবর রাখি।”

শুভব্রত আড়ষ্ট ভাবে বলে উঠল, “কিন্তু তথাগত, ওই নারী যে অপবিত্র। ওর সংস্পর্শে আসাও পাপ। ওর ছায়াও মাড়ানো উচিত নয়। আর আপনি বলছেন ওর কাছে গিয়ে উঠবেন। ওর আতিথ্য গ্রহণ করবেন? ”

তথাগত নীরব রইলেন। তাঁর অন্তর চিরে দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এল। ভিক্ষু শুভব্রত শিক্ষিত। তিনি বৈশালীর বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ। দীক্ষাও নিয়েছেন তাঁর কাছে। দিবারাত্রি অহিংস মন্ত্র জপ করেন। কিন্তু মনের অন্ধকার এখনও দূর করতে পারেননি। মানবিক হয়ে উঠতে পারেননি। মনে মনে আহত বোধ করেন তথাগত। তাহলে কি তাঁর দীক্ষায় কোনো ত্রুটি ছিল? তিনিও কি ব্যর্থ নন? শুভব্রত তো তাঁরই শিষ্য। তাঁরই দেখানো পথে চলে। তাঁরই দর্শনে উদ্বুব্ধ হয়। অথচ একজন রূপাজীবাকে মানুষ ভাবতে পারছে না কেন? আম্রপালীও তাঁরই মতো মানুষ। তাঁর শরীর যেমন আছে, আত্মা এবং মনও আছে। শুভব্রতের আচরণে হতাশ বোধ করলেন তথাগত।

তথাগতকে নীরব থাকতে দেখে অস্বস্তি বোধ করলেন শুভব্রত। তিনি বুঝলেন যে তথাগত বৌদ্ধবিহারে উঠবেন না। তিনি আম্রপালীর গৃহেই যাবেন। মনে মনে শুভব্রত ঠিক করলেন, তিনি কিছুতেই ওই রূপাজীবার গৃহে পা দেবেন না। তাহলে তাঁর ভিক্ষু জীবন অপবিত্র হবে।

তথাগত তাঁর শিষ্যটির উদ্দেশে বললেন, “আমরা আম্রপালীর গৃহের উদ্দেশ্যেই যাচ্ছি। তুমিও যেতে পারো। অবশ্য এ বিষয়ে আমি তোমার ওপর কোনো জোর খাটাব না। পুরোটাই তোমার ইচ্ছে।”

কথা শেষ করেই তথাগত তার সঙ্গী চার শিষ্য ভিক্ষু সারিপুত্ত, ভিক্ষু আনন্দ, ভিক্ষু উপালি এবং ভিক্ষু শুদ্ধসত্ত্বকে নিয়ে এগিয়ে গেলেন।

মহা বিপাকে পড়লেন শুভব্রত। তথাগতকে মাঝপথে ছেড়ে মঠে ফিরে গেলে নানা কথা বা প্রশ্ন উঠবে। এ দিকে ওই নগরনটীর গৃহে পা দিলে তাঁর সন্ন্যাসজীবনের পবিত্রতা নষ্ট হবে। কিন্তু তিনি নিরুপায়— দীক্ষাগুরুকে অনুসরণ না করে উপায় নেই।তিনি নিশ্চিত আজ তাঁর সন্ন্যাসজীবনের পবিত্রতা নষ্ট হতে চলেছে।

শুভব্রতকে অনুসরণ করতে দেখে তথাগত বললেন, “দীক্ষাগুরুর কাছে সব শিষ্যই সমান। তুমিও যেমন আমার শিষ্য ঠিক তেমনি আম্রপালীও আমার শিষ্যা। সেও দীক্ষা নিয়েছে। তুমি কি তা ভুলে গিয়েছো? সে হয়ত ভিক্ষুণীর জীবন বেছে নেয়নি। কিন্তু আমার কাছে শিষ্যত্ব তো গ্রহণ করেছে।”

শুভব্রত ভুলে গিয়েছিলেন যে আম্রপালীও তাঁরই মতো তথাগতর শিষ্য। বছর ছয়েক আগে তথাগত এখানে এসেছিলেন বর্ষার সময়। গোটা বর্ষাকালটাই কাটিয়েছিলেন বৈশালীর বৌদ্ধবিহারে। সেবার তাঁর প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও ভিক্ষু শুদ্ধসত্ত্বকে তিনি অনুমতি দিয়েছিলেন আম্রপালীর প্রমোদভবনে দিন কাটাতে। সেবারই তথাগত ফেরার দিন নাটকীয় ভাবে আম্রপালী এসে হাজির হয়েছিল নদীর তীরে। শুদ্ধসত্ত্বের সহযোগিতায় ছলাকলা করে তথাগতের মন গলিয়ে তাঁর শিষ্যত্ব নিয়েছিল ওই গণিকা। শুভব্রত মনে মনে ভাবলেন, ভাগ্যিস ওই রূপাজীবাকে সংঘের সদস্য করে বৌদ্ধবিহারে আসার অনুমতি দিয়ে বসেননি তথাগত। তাহলে গণিকারাও অবাধে বৌদ্ধবিহারে প্রবেশ করত। নষ্ট হত শুচিতা। অপবিত্র হত তাঁর মতো সন্ন্যাসীদের জীবন।

মেঠো পথ ধরে এগিয়ে চলেছেন তথাগত। তাঁর সঙ্গে সঙ্গে হাঁটছেন তার প্রিয় চার শিষ্য ভিক্ষু সারিপুত্ত, ভিক্ষু আনন্দ, ভিক্ষু উপালি এবং ভিক্ষু শুদ্ধসত্ত্ব। কেউ কোনো কথা বলছেন না।

তথাগত দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে উঠলেন, ‘‘মোহ থেকে আসে দুঃখ। দুঃখমোচনের একমাত্র উপায় মোহ থেকে মুক্ত হওয়া। মোহ থেকে মুক্ত হবার উপায় হলো বাস্তবকে সহজ ভাবে গ্রহণ করা।”

তথাগত বা তাঁর শিষ্যরা খেয়াল করলেন না যে লিচ্ছবিরাজের দূতটি এতক্ষণ চুপচাপ তাঁদের কথা শুনছিল। এবার সে রাজপ্রাসাদের দিকে পা বাড়িয়েছে। তথাগত নগরবধূর প্রাসাদে উঠছেন। এই খবর রাজার কানে দিতে পারলে পুরস্কার স্বরূপ নগদ অর্থ অর্থাৎ ‘কার্ষাপণ’ পাওয়া যাবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *