নগরবধূ আম্রপালী – ১

।।এক।।

ভরা শ্রাবণ মাস। আকাশ মেঘের শাসনে ঢাকা। অাগন্তুক জলভরা মেঘ বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ছে যখন তখন। এই ভরা বর্ষায় জল পেয়ে গাছগুলো একটু বেশি সবুজ ও সতেজ হয়ে উঠেছে। বাতাসে একটা ভেজা ভেজা ভাব। সোঁদা গন্ধ। প্রাসাদের অলিন্দে পায়চারি করছিলেন আম্রপালী। এমন মেঘলা সকাল দেখলে মনকেমন করে তাঁর। প্রাসাদের সামনে বিশাল উদ্যান। তাতে সবুজ মখমলি ঘাস। সেই উদ্যানের বুক চিরে চলে গিয়েছে মোরাম বিছানো পথ। পথের দু’ ধারে রঙ-বেরঙের ফুলের গাছ। তাতে রংবেরঙের ফুল ফুটে আছে। গাছেদের শরীরে জল মুক্তোর মতো টলটল করছে। দু-এক ফোঁটা টুপটাপ ঝরে পড়ছে মাটিতে। মোরাম বিছানো পথ গিয়ে শেষ হয়েছে প্রাসাদের মূল ফটকে। সেখানে পাহারায় থাকে দ্বাররক্ষীরা। বিনা অনুমতিতে এ প্রাসাদে প্রবেশের অধিকার কারুর নেই। আম্রপালী অলিন্দ থেকে সামনের দিকে ঝুঁকে এলেন। টিপটিপ করে হালকা ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। হাত বাড়িয়ে বৃষ্টিকে ছোঁয়ার চেষ্টা করলেন তিনি। বৃষ্টি ভেজা উদ্যানের অনেকটা জায়গা জুড়ে রয়েছে আমবাগান। সেখানে পেখম তুলে ঘুরে বেড়াচ্ছে কয়েকটা ময়ূর। হঠাৎ একটা বার কয়েক ডেকে উঠল। ময়ূর তাঁর পছন্দের। কিন্তু ময়ূরের ডাক বড় কর্কশ। কানে লাগে।

আম্রপালী অন্যমনস্ক ভাবে তাকিয়েছিলেন মূল ফটকের দিকে। ঠিক তখনই তাঁর চোখে পড়ল এক তরুণ শ্রমণকে। “কে ওই তরুণ শ্রমণ?” মনে মনে নিজেকেই প্রশ্ন করলেন তিনি। তরুণ শ্রমণের সৌম্য চেহারা, ধীর গতিতে তাঁর হেঁটে আসার ভঙ্গি— মুগ্ধ করল তাঁকে। বহুদিন পর এক পুরুষকে ভালো লাগল তাঁর। আম্রপালী জানেন তাঁর যা ভালো লাগে তিনি তা পেতে অভ্যস্ত। তাবড় তাবড় রাজপুরুষকে তিনি বশ করেন মুহূর্তে। এই আগন্তুক তো তরুণ শ্রমণ। একে বশ করা কী আর এমন ব্যাপার?

বর্ষার সময়টা বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা বৈশালীতে এসে মাস তিনেক থাকেন। বছরের বাকি সময় বিভিন্ন জায়গায় এরা ধর্মচর্চা করে বেড়ান। বর্ষায় এই বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা বিশ্রাম নেন। বৌদ্ধবিহার থেকে বেরিয়ে দিনভর তাঁরা বৈশালীর গৃহ গৃহ ঘুরে ভিক্ষা করেন। আম্রপালী শুনেছেন এদের দীক্ষাগুরু একজন শুদ্ধ মানুষ। তাঁর নাম নাকি তথাগত। তাঁকে সবাই বলেন ভগবান বুদ্ধ। একসময় তিনিও ছিলেন রাজপুত্র। কিন্তু সব বৈভব ও সংসারের মায়া ত্যাগ করে তিনি বেরিয়ে পড়েছিলেন সন্ন্যাসী হয়ে। বৈশালীর লিচ্ছবিরাজগণও তথাগতকে মান্যিগণ্যি করে চলেন। তাঁর অনুগামীর সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে। তাঁর কথা নাকি বৈশালীর রাজাও ফেলতে পারেন না। তথাগতকে এখনও দেখেননি আম্রপালী। কিন্তু তাঁর সম্বন্ধে অনেক কথা শুনেছেন। লোকমুখে শুনেছেন তথাগত কখনও কখনও বৈশালীর বৌদ্ধবিহারে এসে বিশ্রাম নেন।

বৌদ্ধ শ্রমণ বেরিয়েছেন দোরে দোরে ঘুরে ভিক্ষা করতে। তাই দ্বাররক্ষীরা তাঁকে আর আটকায়নি। মূল ফটক পেরিয়ে মোরাম বিছানো পথে তিনি এগিয়ে আসছেন প্রাসাদের দিকে। আম্রপালী এবার স্পষ্ট দেখলেন সেই তরুণ সন্ন্যাসীকে। দীর্ঘদেহী। সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। মুণ্ডিতমস্তক। এক সময় গায়ের রং গৌরবর্ণ ছিল। এখন তা রোদে পুড়ে তামাটে হয়ে গিয়েছে। পোশাক বলতে শরীরে রক্তিম উত্তরীয় জড়ানো। কাঁধে ঝোলা। ওপরের অলিন্দ থেকে আম্রপালী সেই শ্রমণকে ভালো করে লক্ষ করতে থাকলেন। ওই বৌদ্ধ সন্ন্যাসী কি জানেন তাঁকে দূর থেকে লক্ষ করছেন পৃথিবীর সবথেকে সুন্দর নারীটি? যাঁর পায়ের কাছে রাজপুরুষরা পর্যন্ত এসে গড়াগড়ি খায়। তাঁর বৈভব ও ঐশ্বর্য যে কোনো রাজাকে হার মানাবে। এই জগতের সব সুখ তিনি এক লহমায় কিনে নিতে পারেন। অভাব তাঁর নেই। তাঁর রূপ ও গুণের কাছে নিমেষে বশ মানেন রাজা, উজির, ব্যবসায়ী।

বৃষ্টির তেজ বাড়ছিল। আম্রপালীর প্রমোদভবনে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা আসেন ভিক্ষা নিতে। কোনো বৌদ্ধ সন্ন্যাসীকেই আম্রপালী নিজের হাতে ভিক্ষা দেননি। প্রাসাদে তাঁর দাস-দাসীর অভাব নেই। তারাই এসব দেখভাল করে। কিন্তু এই তরুণ শ্রমণ কেন এতো টানছে তাঁকে? আম্রপালী দেখতে পাচ্ছেন বৃষ্টির ফোঁটা ওই ভিক্ষুর পেশিবহুল শরীরে পড়ে পিছলে যাচ্ছে। বৃষ্টি তাঁকে ভিজিয়ে দিলেও ওই শ্রমণের কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। তিনি ধীর পায়ে হেঁটে আসছেন প্রাসাদের দিকে।

অলিন্দ থেকে শয়নকক্ষে ফিরে এলেন আম্রপালী। ভাবলেন, এই তরুণ সন্ন্যাসীকে তিনি নিজের হাতে ভিক্ষা দেবেন। আর ভিক্ষা দেওয়ার অছিলায় তাঁকে বশ করবেন। দেখা যাক, দীক্ষাগুরু তথাগত ওই তরুণ সন্ন্যাসীকে তাঁর জাদুজাল থেকে রক্ষা করতে পারেন কি না? কার শক্তি বেশি? ভগবান বুদ্ধের দীক্ষামন্ত্রের? নাকি তাঁর এই যৌবন ভরা শরীরী আবেদনের?

তিনি অবন্তিকাকে ডাকলেন। অবন্তিকা দাসী হলেও আম্রপালীর খাস লোক। দীর্ঘদিন আম্রপালীর সঙ্গে আছেন। লোকে বলে ছায়াসঙ্গী। আম্রপালীর সবকিছুর হদিশ জানেন এই দাসী। অবন্তিকা বয়সে খানিকটা বড় হলেও আম্রপালী তাঁকে নাম ধরেই ডাকেন। আর অবন্তিকা আম্রপালীকে ‘অম্বা’ বলেই সম্বোধন করে থাকেন। এ প্রাসাদে হরিবালা ছাড়া অবন্তিকাই একমাত্র মানুষ যিনি আম্রপালীকে ‘অম্বা’ বলে ডাকতে পারেন। অবন্তিকা ছাড়া আম্রপালী এক কথায় অচল। তাই কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে সবার আগে ডাক পড়ে তাঁর। অবন্তিকার তিনকুলে কেউ নেই। আম্রপালীর কাছেই থাকেন। আম্রপালীর কাজকর্ম করা ছাড়াও বালক কোন্দন্যর দেখভালের দায়িত্বও তাঁর ওপর। ছোট্ট কোন্দন্য জানে অবন্তিকা তার মাসি।

ডাক শুনে অবন্তিকা শয়নকক্ষে আসতেই আম্রপালী তাঁকে বললেন, “ওই বৌদ্ধ ভিক্ষুকে বসতে বল। ওঁকে আমি নিজের হাতে ভিক্ষা দেব।”

আম্রপালীর এ হেন আচরণে বেশ খানিকটা অবাক হলেন অবন্তিকা। এর আগে কখনও তিনি অম্বাকে এ রকম আজব ইচ্ছা প্রকাশ করতে দেখেননি। তিনি আম্রপালীর মুখের দিকে তাকালেন। “পুণ্যি করার সাধ জেগেছে বুঝি?” মৃদু কটাক্ষ হেনে অবন্তিকা দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

আম্রপালী পাশের কক্ষে গেলেন। দেখলেন কোন্দন্য তখনও ঘুমিয়ে আছে। এতো বেলায় কোন্দন্যকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখে চিন্তিত হলেন তিনি। ভাবলেন শরীর টরীর খারাপ হল নাকি? বিছানায় গিয়ে কোন্দন্যর পাশে বসলেন। ঘুমন্ত ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন কিছুক্ষণ। এরই মধ্যে অবন্তিকা ফিরে এসে বললেন, “শিগগির নিচে যা। উনি ফিরে যেতে চাইছেন। আমি ওঁকে কোনো মতে বসিয়ে রেখে এসেছি।”

আম্রপালী মনে মনে ভাবলেন, এতো তাড়া কীসের ওই বৌদ্ধ ভিক্ষুর? আম্রপালীর প্রমোদভবন থেকে চলে যেতে চাইছেন? এখানে এলে তো কেউ আর ফিরে যেতে চায় না। ওই বৌদ্ধ শ্রমণের প্রতি কৌতূহল বেড়ে গেল আম্রপালীর। অবন্তিকাকে বললেন, “চল যাচ্ছি।”

দৃপ্ত ভঙ্গীতে নিচে নেমে এলেন আম্রপালী। কিন্তু দেখতে পেলেন না বৌদ্ধ শ্রমণকে। দেখলেন নিচের ঘরে কেউ নেই। তিনি এক দাসীকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, “কোথায় উনি?”

দাসী পালটা জিজ্ঞেস করল, “কার কথা বলছেন?”

“আহ! ওই বৌদ্ধ ভিক্ষু কোথায় গেলেন?” দাসীর ওপর বিরক্ত হয়ে উঠলেন আম্রপালী।

“উনি তো দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ঘরে বসতে চাইছেন না।” ভয়ে ভয়ে উত্তর দিল দাসী।

“সে কী তোরা ওঁকে বলিসনি ঘরে বসতে? এই প্রাসাদে কি বসার জায়গার অভাব?” খানিকটা ধমকের সুরেই কথাগুলো বলে উঠলেন আম্রপালী।

মুখ নিচের দিকে নামিয়ে নিয়ে দাসী বলল, “বলেছিলাম ভেতরে এসে বসতে। কিন্তু উনি বললেন সংঘের বারণ আছে। বাইরে থেকেই ভিক্ষা নিয়ে চলে যাবেন।”

‘সংঘের বারণ’! তার মানে তাঁর প্রাসাদে এসে বসলে বৌদ্ধ শ্রমণের জাত ও মান যাবে? নষ্ট হবে তাঁর সন্ন্যাসজীবন? তিনি নগরনটী বলে অচ্ছুত। তাঁদের দীক্ষাগুরু তথাগত শিষ্যদের এই শিক্ষা দিয়েছেন? তিনি একজন নারী নন? তিনি কি তথাগতর কাছেও শুধুমাত্র একজন নগরবধূ? মনের গভীরে কষ্ট অনুভব করলেন আম্রপালী। পুরনো ক্ষতটায় কেউ যেন ফের হাত রেখে দিয়েছে বলে মনে হল তাঁর।

প্রাসাদে প্রবেশের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন সেই বৌদ্ধ শ্রমণ। তাঁর অঙ্গের লাল ভূষণ ভিজে। বৃষ্টির জল তাঁর সবল পেশি রেখায় চুঁইয়ে পড়ছে। শান্ত চাউনি।

আম্রপালী গিয়ে সামনে দাঁড়ালেন। নমস্কার জানালেন দু’ হাত তুলে। “এই বৃষ্টিতে আপনি বাইরে দাঁড়িয়ে কেন? অনুগ্রহ করে ভেতরে এসে বসুন। আমার আতিথেয়তা গ্রহণ করুণ। এখানে আপনার কোনো অসুবিধা হবে না।”

তরুণ শ্রমণ মৃদু হেসে বললেন, “তার প্রয়োজন নেই। অামাকে আরও অনেকের গৃহে ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে যেতে হবে।”

আম্রপালী জানেন তাঁর এই আহ্বান ওই বৌদ্ধ ভিক্ষুর পক্ষে ফেরানো সম্ভব হবে না। কত শত ক্ষমতাবান পুরুষ তাঁর আহ্বানের জন্য মুখিয়ে থাকেন। শত শত কার্ষাপণ দিতেও কার্পণ্য করেন না তাঁরা। আর ইনি তো তরুণ বৌদ্ধ ভিক্ষু। সংঘের অনুশাসন ভেঙে পড়ল বলে। আম্রপালীর চোখে লাস্যময়ী দৃষ্টি। সামান্য হাসলেন। আবেগঘন কণ্ঠে বলে উঠলেন, “এই বর্ষায় ক’টা দিন এখানে না হয় কাটিয়ে গেলেন। অসুবিধা কী? নাকি আমাকে ভয় পাচ্ছেন?”

“আপনি একজন নারী। নারীরা মাতৃরূপী। ভয়ের জিনিস নন। আর ভয় পেলে দুর্বল হয়ে যেতে হয়। ভীত হলে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। কিছু মনে করবেন না আমি আপনার আমন্ত্রণ রক্ষা করতে পারছি না।” শান্ত ভাবে কেটে কেটে কথাগুলো উচ্চারণ করলেন ওই তরুণ শ্রমণ।

কথাগুলো চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল আম্রপালীর মুখে। কোন ধাতুতে তৈরি এই পুরুষ? আম্রপালীর আহ্বান ফেরাচ্ছে? এ কি মানসিকভাবে সুস্থ আছে? নাকি মানসিক ভারসাম্যহীন এক পুরুষ? এক কথায় ভীষণ অপমানিত বোধ করছিলেন আম্রপালী। তিনি সরু চোখে তাকালেন তরুণ শ্রমণের দিকে। দু’ চোখের গভীরে কী শান্ত দৃষ্টি। কোথাও কাম নেই। জীবনে প্রথমবার এমন এক পুরুষকে দেখছেন আম্রপালী যে তাঁর দিকে কামাতুর দৃষ্টিতে চেয়ে নেই। তাঁর জেদ চেপে গেল, মনে মনে সংকল্প করলেন এই তরুণকে বশ করতেই হবে। বললেন, “আমি আমার গৃহে আপনাকে বিশ্রামের আমন্ত্রণ জানািচ্ছ। আমার ইচ্ছে আপনি এই বৈশালীতে যতদিন আছেন ততদিন এখানে অতিথি হিসেবে থাকুন।”

আম্রপালীর কথা শুনে এক অমলিন হাসি ছড়িয়ে পড়ল ওই তরুণ শ্রমণের চোখেমুখে। তিনি হাত জোড় করে নমস্কার করার ভঙ্গিতে বললেন, “তথাগতর অনুমতি ছাড়া আমি আপনার গৃহে আতিথ্য গ্রহণ করতে পারব না।”

আম্রপালী স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। এই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনে হয়নি। তিনি ফিরিয়েছেন। তাঁকে কেউ ফেরায়নি। সেই সাহস কেউ দেখায়নি। তরুণ শ্রমণ ধীর পায়ে চলে যাচ্ছেন মোরাম বিছানো পথ দিয়ে। ঝিরঝিরে বৃষ্টি তাঁকে কিছুক্ষণের মধ্যে ঝাপসা করে দিল।

প্রাসাদের অভ্যন্তরে যেতে যেতে আম্রপালী ভাবলেন তিনি হেরে গেলেন না তাঁর রূপ হেরে গেল? উত্তর খুঁজতে খুঁজতে মার্বেলের সিঁড়ি বেয়ে ওপরের তলায় উঠছিলেন তিনি। ঠিক তখনই বালক কোন্দন্য এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *