নগরবধূ আম্রপালী – ১০

 দশ

নতুন রাজ্য জয় করে মগধে ফিরেছেন মগধরাজ বিম্বিসার। গোটা রাজ্য জুড়েই উৎসবের আমেজ। রাজগির পাহাড়ের মাথায় সুরক্ষিত এক দুর্গের নাম বিম্বিসারপুরী। তিনদিক পাহাড় দিয়ে ঘেরা। মাঝে সমতল অঞ্চলে মগধরাজ গড়ে তুলেছেন তাঁর রাজধানী এই বিম্বিসারপুরী। মূল ফটকের কাছে পরিখা কাটা। একপাশ দিয়ে নেমে এসেছে উচ্ছ্বল ঝরনা। সেই ঝরনার জল বয়ে গিয়েছে পরিখা দিয়ে। এক কথায় দুর্ভেদ্য নগরী এই বিম্বিসারপুরী। দুর্গের ভেতর রাজপ্রাসাদ। সেই রাজপ্রাসাদে বসেছে মজলিস। নানা রাজ্য থেকে নর্তকীরা এসেছেন তাঁদের নৃত্যকলা পরিবেশন করতে। আজ আনন্দের দিন। মগধরাজের মন খুশিতে ভরপুর। বিম্বিসার সঙ্গীত অন্তঃপ্রাণ। তিনি নিজেও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম নিয়েছেন। এখনও নিয়মিত রেওয়াজ করেন। দেশ-বিদেশের নানা সঙ্গীতজ্ঞ তাঁর আতিথেয়তা গ্রহণ করেছেন। বহু নামী শিল্পীকে তিনি পুনর্বাসন দিয়েছেন তাঁর রাজ্যে।

বিম্বিসারপুরীর অন্তঃপুরের জলসাঘরে শুরু হয়েছে নৃত্যানুষ্ঠান। একের পর এক নর্তকীরা তাঁদের নৃত্য পরিবেশন করছেন সঙ্গীতের সঙ্গে। সভাসদদের নিয়ে বসে আছেন বিম্বিসার। তাঁর হাতে সুরাপাত্র। তিনি বসে আছেন জলসাঘরের এক কোণে। পাশে তাঁর আস্থাভাজন বন্ধু পুরঞ্জয়। পুরঞ্জয় মগধের মন্ত্রীও। লোকে বলে বিম্বিসারের এই পরাক্রমের পিছনে পুরঞ্জয়েরও অবদান আছে। সুরা, সঙ্গীত ও নর্তকীদের নাচ মায়াবী করে তুলেছে এই রাতকে।

প্রত্যেককে আজ নিজের হাতে কার্ষাপণ দিচ্ছেন মগধরাজ। সুরা, সুর ও নাচের মৌতাতে ডুবে আছেন তিনি। এমন সময় কৌশাম্বীর এক নর্তকীর নাচ ও গানে মুগ্ধ হয়ে বিম্বিসার বলে উঠলেন, “আহা অপূর্ব! এই দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ নর্তকী আজ মগধের মাটিতে নেমে এসেছে।”

মগধরাজের প্রশংসা শুনে ওই নর্তকী তাঁকে প্রণাম জানালেন। বিম্বিসার তাঁকে বললেন, “আপনার নৃত্যকলায় আমি মুগ্ধ। আপনি কী উপহার চান বলুন?”

নর্তকী সামান্য ঝুঁকে বললেন, “মহারাজ, আপনি খুশি হয়েছেন এটাই আমার পুরস্কার।”

বিম্বিসার পাশে বসা পুরঞ্জয়কে বললেন, ওই নর্তকীকে তাঁর সমান ওজনের স্বর্ণালঙ্কার উপহার হিসেবে দিতে। তারপর নর্তকীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনি চাইলে মগধেও থাকতে পারেন। এখানে আপনার শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে কোনো অসুবিধা হবে না।”

মজলিস শেষ হলে একে একে সবাই চলে গেলেন। পুরঞ্জয় আর বিম্বিসার তখন একান্তে বসে। পুরঞ্জয় বিম্বিসারের বন্ধুসম। আসলে পুরঞ্জয় বৈশালীর রাজপুত্র। তিনিও লিচ্ছবি গোষ্ঠীর নেতা ছিলেন এক সময়। লিচ্ছবিদের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা কিছু কম ছিল না। কিন্তু বেশ কয়েক বছর আগে লিচ্ছবিদের রাজা নির্বাচনের সময় তাঁকে ভোটে দাঁড়াতে দেওয়া হয়নি। রাজা জয়ন্ত গোষ্ঠীপতিদের সঙ্গে যোগসাজস করে তাঁকে কোণঠাসা করে ছাড়েন। পুরঞ্জয় জানেন, এর পিছনে মূল বুদ্ধি ছিল জয়ন্তর খাস অনুচর কোরকের। কোরকের সঙ্গে তাঁর কোনোকালেই বনিবনা ছিল না। তাই সুযোগ বুঝে কোরক তাঁর চাল চেলেছিলেন। ভোটে দাঁড়ালে হার নিশ্চিত জেনে পুরঞ্জয় ভোটে লড়বেন না বলে ঠিক করেছিলেন। তাতে ভরা বিধানসভায় তাঁকে নিয়ে কম ঠাট্টাতামাশা হয়নি। সে সব আজও ভোলেননি তিনি। শেষে তাঁর নামে মিথ্যে বদনাম রটানো হল। বলা হল, পুরঞ্জয় মগধের চর হিসেবে কাজ করছেন। বৈশালী বিধানসভায় নেওয়া সিদ্ধান্ত নাকি তিনি পাচার করে দিচ্ছেন মগধরাজের কাছে। পুরঞ্জয় বুঝতে পেরেছিলেন কোরক ও জয়ন্ত মিলে তাঁকে ঘিরে এমন ভাবে জাল বিস্তার করছেন যে, শেষে তাঁকে বিধানসভায় রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে তুলে ধরা হবে। আর বৈশালীতে রাষ্ট্রদ্রোহিতার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। পুরঞ্জয় ঠিক করে ফেলেন বৈশালীতে আর থাকবেন না। তাঁকে বৈশালী ছেড়ে পালাতে হবে। পরিস্থিতিই তাঁকে বাধ্য করেছিল বৈশালী ছেড়ে মগধে আশ্রয় নিতে। মগধরাজের সঙ্গে দেখা করে তিনি সব খুলে বলেছিলেন। বিম্বিসার এমনিতে খোলামনের মানুষ। পুরঞ্জয়কে তিনি শুধু আশ্রয়ই দেননি, তাঁকে বন্ধুর আসনে বসিয়েছেন। ধীরে ধীরে পুরঞ্জয় বিম্বিসারের পরামর্শদাতা হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেন। বিম্বিসার তাঁকে মগধের মন্ত্রী করে দেন।

নির্জন জলসাঘরে সুর ও সুরার মৌতাত ছড়িয়ে রয়েছে। পুরঞ্জয়কে চুপ করে থাকতে দেখে বিম্বিসার বললেন, “কি বন্ধু, তোমার কি এই মজলিস পছন্দ হয়নি? আহা কী নৃত্য পরিবেশন করলেন ওই নর্তকী। মন ভরে গেল।”

পুরঞ্জয় মগধে থাকলেও বৈশালীর সমস্ত ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ খবর রাখেন। তিনি জানেন বৈশালীতে আম্রপালী নামে এক রাজনর্তকী ইদানীং প্রচুর খ্যাতি কুড়িয়েছেন। তাঁর কাছে যাওয়ার জন্য রীতিমতো হা-পিত্যেশ করে পড়ে থাকেন দেশ-বিদেশের রাজা, মন্ত্রী ও বিত্তশালীরা। একবার তাঁকে দেখার জন্য তাঁর প্রাসাদের বাইরে তাঁবু খাটিয়ে বসে থাকেন অনেকে। তাঁর রূপ নাকি এমনই যে আকাশের চাঁদও তাঁকে দেখে লজ্জা পেয়ে মেঘের আড়ালে চলে যায়। শুধু তাঁর রূপ নয় তিনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে যেমন পারদর্শী তেমনই নৃত্যকলায়। তাঁর রূপ ও গুণের জাদুতে আচ্ছন্ন অসংখ্য মানুষ। বন্ধু বিম্বিসারের কানে কি পৌঁছায়নি আম্রপালীর খ্যাতির বার্তা? পুরঞ্জয় বিম্বিসারের প্রশ্নের উত্তরে বললেন, “বন্ধু তুমি এই নর্তকীর নৃত্যকলাতেই মুগ্ধ হলে? তাহলে আম্রপালীর নৃত্যকলা দেখলে কী বলবে? আম্রপালীর নখেরও যোগ্য নয় ওই নর্তকী।”

আম্রপালীর নামটা শুনেছেন বিম্বিসার। তিনি জানেন উত্তরের রাজ্য বৈশালীতে এক নগরবধূর প্রবল খ্যাতি। তাঁর সম্বন্ধে অনেকেই তাঁকে বলেছেন। কিন্তু মগধের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ভালো নয়। আম্রপালীর নৃত্যগীত দেখতে তিনি মগধে গেলে লিচ্ছবিরা তাঁকে ছেড়ে দেবেন না। পুরঞ্জয়কে তিনি বললেন, “আম্রপালীর বিষয়ে আমিও অনেক কথা শুনেছি। কিন্তু ওঁর নৃত্যকলা দেখার সৌভাগ্য হয়নি।” এরপর একটু থেমে কিছু চিন্তা করলেন বিম্বিসার। তারপর বললেন, “আচ্ছা সামনেই তো মগধে রাজ্যোৎসব। সেখানে ওঁকে আমন্ত্রণ জানালে হয় না?”

পুরঞ্জয় হেসে ফেললেন। বললেন, “তা সম্ভব নয়। লিচ্ছবিরা আম্রপালীকে বৈশালীর বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেয় না। তাঁকে একজন ‘নগরবধূ’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় নজরবন্দি করে রাখা হয়। বাইরে থেকে দেখলে কিছুই বোঝা যায় না। তাঁকে ব্যবহার করা হয় বৈশালীর রাজপুরুষদের মনোরঞ্জনে। আম্রপালী আদতে একজন গণিকা। যাকে ভোগ করার অধিকার একমাত্র সমাজের উচ্চবিত্তদের। তাঁকে সেভাবেই তালিম দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে।”

আম্রপালীকে নিয়ে কৌতূহলী হয়ে উঠলেন বিম্বিসার। তিনি পুরঞ্জয়কে বললেন, “তুমি আর কী কী জানো আম্রপালীর সম্বন্ধে?”

পুরঞ্জয় মোটামুটি সংক্ষেপে আম্রপালীর গোটা জীবনটাই তুলে ধরলেন বিম্বিসারের সামনে।

পুরোটা মন দিয়ে শুনলেন বিম্বিসার। তাঁকে খানিকটা অন্যমনস্ক দেখাল। পুরঞ্জয়কে বললেন, “এই নারীকে না দেখলে তো জীবন বৃথা। তুমি বৈশালী যাওয়ার ব্যবস্থা করো।”

“ক্ষেপে গেলে নাকি বন্ধু! তুমি ভালো করে জানো, বৈশালী গেলে তোমাকে লিচ্ছবিরা বন্দি করবে।” বেশ জোরের সঙ্গেই কথাগুলো বললেন পুরঞ্জয়।

‘‘তাহলে তুমি সেনাপতিদের নির্দেশ দাও সেনাবাহিনীকে তৈরি রাখতে। আমি বৈশালী আক্রমণ করব। যুদ্ধ করে ছিনিয়ে আনব আম্রপালীকে। তাঁকে সসম্মানে এই রাজ্যে এনে রাখব।”

পুরঞ্জয় বললেন, “বন্ধু, নারীকে ছিনিয়ে আনা যায় কিন্তু তাঁর মনকে ছিনিয়ে আনা যায় না।”

“কী হেঁয়ালি করছ পুরঞ্জয়?” বিরক্তি প্রকাশ করলেন বিম্বিসার।

“হেঁয়ালি নয়, ওভাবে তুমি আম্রপালীকে পাবে না।”

“তাহলে উপায়?” অধৈর্য হয়ে প্রশ্ন করলেন বিম্বিসার।

‘‘উপায় একটা বার করা যাবে ’খন। কিন্তু ভেবে দেখো বন্ধু, তুমি মগধের রাজা। তোমায় কি একজন গণিকার কাছে গিয়ে দাঁড়ানো মানায়?”

বিম্বিসার ধীর কণ্ঠে বললেন, “তুমি যা বললে তা থেকে বুঝেছি আম্রপালী স্বেচ্ছায় গণিকাবৃত্তি বেছে নেননি। তাঁকে জোর করে এই পথে নামতে বাধ্য করা হয়েছে। এতে তাঁর কোনো দোষ নেই। তাছাড়া আমি একজন গণিকার কাছে যাচ্ছি না। যাচ্ছি একজন শিল্পীর কাছে।”

বৈশালী থেকে একদিন পালিয়ে আসতে হয়েছিল পুরঞ্জয়কে। প্রতিশোধস্পৃহা আজও তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়। মগধরাজ এখন প্রভূত শক্তির অধিকারী। তিনি চাইলে এই মুহূর্তে বৈশালী আক্রমণ করতেই পারেন। পুরঞ্জয় ইচ্ছা করলে লিচ্ছবিরাজ জয়ন্ত ও কোরকের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতেই পারেন। এটাই সুবর্ণ সুযোগ। কিন্তু তিনি তো আদতে বৈশালীর পুত্র। বৈশালীর ক্ষতি হোক তা তিনি চান না। যুদ্ধ বাঁধলে সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বৈশালীর প্রজারা। তাই তিনি বিম্বিসারকে পরামর্শ দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, “যুদ্ধের খেয়ালটা এখনই মাথায় এনো না। ওটা বাদ দাও। যুদ্ধ বাঁধালে মগধেরও ক্ষয়ক্ষতি কিছু কম হবে না।”

“তাহলে কি আম্রপালীর সঙ্গে আমার দেখা হবে না?” খানিকটা বিমর্ষ শোনাল বিম্বিসারের গলা।

বন্ধুকে ভেঙে পড়তে দেখে তাঁকে আশ্বস্ত করে পুরঞ্জয় বলে উঠলেন, “হবে, বন্ধু, হবে। আমি আছি কী করতে? দাঁড়াও একটা উপায় বার করতে দাও তো দেখি।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *