।। তিন।।
বর্ষার সময়টা সূর্যের মুখ প্রায় দেখা যায় না বললেই চলে। মেঘে মেঘে বেলা বয়ে যায়। পালঙ্কে শুয়েছিলেন আম্রপালী। অন্যদিন এতক্ষণে উঠে যান। কিন্তু আজ যেন তাঁকে আলসেমিতে পেয়েছে। মনমেজাজও ঠিক নেই। গতকাল রাতে এক বণিক এসেছিলেন তাঁর কাছে রাত কাটাতে। লিচ্ছবি নেতাদের ঘনিষ্ঠ ওই বণিক। কে তাঁর কাছে আসবে তা নির্বাচন করার স্বাধীনতা আম্রপালীর আছে। এই রাজা-উজির-মন্ত্রী ও ব্যবসায়ীরা সমাজের অভিজাত শ্রেণির মানুষ। প্রচুর অর্থ ও ক্ষমতা এদের। এরা সকলেই তাঁর কাছে আসে আনন্দ খুঁজতে। বিপুল অর্থের বিনিময়ে এরা আম্রপালীকে কাছে পায়। কিন্তু আম্রপালী দেখেছেন বিপুল বৈভব ও ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও এরা সবাই এক এক জন অসুখী মানুষ। প্রত্যেকেই একে অন্যের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করেন। সবাই আম্রপালীকে বোঝাতে চায় সেই শ্রেষ্ঠ। সেই ঈশ্বরের ন্যায় ক্ষমতাসীন। সুরাপানের পর এই অভিজাত মানুষগুলোর আচরণ পালটে যায়। তখন এদের দেখে মাঝে মাঝে করুণা হয় আম্রপালীর।
গতকাল রাতের ব্যবসায়ীটিও বড় গোলমেলে ছিলেন। রাতের খাবার পছন্দ হয়নি বলে তুলকালাম কাণ্ড বাঁধিয়ে ছিলেন। চোদ্দ রকম ব্যঞ্জন সাজিয়ে তাঁকে খাবার পরিবেশন করা হলেও তাঁর মুখে রোচেনি সেই খাবার। চিৎকার করে গাল পাড়ছিলেন দাস-দাসীদের। হরিবালা চিৎকার শুনে ছুটে গিয়েছিলেন সেখানে। তাঁকেও রেয়াত করেননি সেই মদ্যপ ব্যবসায়ী। আসলে অতিরিক্ত সুরা পান করার পর তাঁর আর তালজ্ঞান ছিল না। চেঁচামেচি শুনে আম্রপালী বিরক্তি নিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন। মা হরিবালাকে বলেছিলেন, “তুমি তোমার ঘরে যাও মা। আমি একে সামলে নিচ্ছি।” এই ধরনের বহু মানুষ এর আগে তিনি দেখেছেন। আম্রপালী ওই ব্যবসায়ীর কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই ব্যবসায়ী নেশাতুর চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিলেন স্থির দৃষ্টিতে। ঘোলাটে চোখে কামের আগুন। তাঁকে স্পর্শ করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা মানুষটির চোখে মুখে। আম্রপালী ওই ব্যবসায়ীর উদ্দেশে বলেছিলেন, “আপনার খাওয়া হয়ে গেলে আমরা জলসাঘরে যেতে পারি?”
আম্রপালীর রাগ হলেও নিজেকে সামলে নিয়েছিলেন। কারণ তিনি একজন নগরবধূ। তাঁর কাছে অভিজাত সম্প্রদায়ের মানুষরা আসেন অর্থের বিনিময়ে আনন্দ কিনতে। পালটা রাগ দেখানো তাঁকে মানায় না। এক অর্থে এরাই তাঁর ভগবান। এরাই তাঁকে এই উচ্চতায় নিয়ে গেছে। দুই খাস রক্ষীকে ডেকে আম্রপালী নির্দেশ দিয়েছিলেন বণিকটিকে জলসাঘরে নিয়ে যেতে।
নাচ দেখার মতো অবস্থায় আর উনি ছিলেন না। আম্রপালী নাচ শুরু করতেই উনি টলমল পায়ে উঠে দাঁড়ালেন। এগিয়ে গেলেন নর্তকীর বেশে থাকা আম্রপালীর দিকে। কোমরে গোঁজা বটুয়ার ভেতর থেকে ‘কার্ষাপণ’ বের করে শূন্যে ছুঁড়তে গিয়েই টলে গেল তাঁর পা। মুখ থুবড়ে পড়ে গেলেন নরম ফরাসের ওপর। আম্রপালী নাচ থামিয়ে তাঁর লোকজনদের বললেন, ওঁকে অতিথিশালায় নিয়ে গিয়ে যত্ন করে শুইয়ে দিতে। সকালে ওঁর ঘুম ভাঙলে যেন ঈষদুষ্ণ জলে মধু ও লেবুর রস মিশিয়ে খাইয়ে দেওয়া হয়।
ওই ব্যবসায়ীর আর খোঁজ নেওয়া হয়নি আম্রপালীর। তাঁর দাস-দাসীরা অবশ্য সব সামলে নেবে। কিন্তু গতকাল রাতের ওই ঘটনার পর থেকে মুখটা যেন তেতো হয়ে আছে তাঁর। তাই মেঘে মেঘে বেলা হয়ে গেলেও শয্যা ছাড়তে ইচ্ছা করছে না।
“কী রে এতো বেলা হয়ে গেল বিছানা ছাড়লি না?” ধূপের গন্ধ ছড়াতে ছড়াতে ঘরে ঢুকলেন মা হরিবালা।
হরিবালার পিছন পিছন ঘরে ঢুকলেন অবন্তিকা। হাতে একটা ছোট্ট রুপোর রেকাবি। তার ওপর একটা রুপোর কারুকাজ করা পাত্র। “এই নে, এটা খেয়ে নে দেখি।”
সকালে ঘুম থেকে উঠে খালি পেটে ঈষদুষ্ণ জলে একটু মধু ও আমলকীর রস মিশিয়ে খান আম্রপালী। মধু ও আমলকীর অনেক গুণ। ত্বক ও চুলের জন্য খুব উপকারী। হরিবালা মেয়েকে ছোট থেকে এ কথা বলে এসেছেন।
জানালার পর্দা সরাতে সরাতে অবন্তিকা বললেন, “তোর সঙ্গে একজন দেখা করতে এসেছেন।”
এই সকালবেলা কে আবার তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসবেন? তাছাড়া তিনি অনুমতি না দিলে তো কারুর এই ভবনে প্রবেশ করারই কথা নয়। হ্যাঁ রাজার কোনো দূত এসে থাকলে আলাদা কথা। পাত্রের পানীয়টি শেষ করে নামিয়ে রাখলেন আম্রপালী। দেখলেন হরিবালা ধূপ ঘোরাতে ঘোরাতে ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন।।
আম্রপালী অবন্তিকাকে জিজ্ঞেস করলেন, “কে আবার আমার সঙ্গে দেখা করতে এলো?”
“গতকালকে যিনি এসেছিলেন তিনি ফের এসেছেন।” অন্দরসজ্জার কাজ করতে করতে বলে উঠলেন অবন্তিকা।
ভুরু কুঁচকে বিরক্তি প্রকাশ করলেন আম্রপালী। “গতকাল আমার কাছে আবার কাছে কে এসেছিল? ওহ! ওই মদ্যপ ব্যবসায়ীটার কথা বলছিস? সে কি এখনো বিদেয় হয়নি? সে আবার আমার কাছে কী চায়? এক রাতের পাখি আমি। রাত চলে গিয়েছে পাখিও উড়ে গিয়েছে। যা গিয়ে বলে দে আমি এখন বিশ্রাম করছি।”
“আরে বাবা সে নয়। ওই যে গতকালকে যে সন্ন্যাসীটা এসেছিল। তোর পুণ্যি ঠাকুর। নিচে এসে দাঁড়িয়ে আছে। জিজ্ঞেস করলুম, কিছু লাগলে বলুন আমরা দিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু না, সে তোর সঙ্গেই দেখা করতে চায়।”
আম্রপালী বেশ অবাক হলেন। “বলিস কী? সেই বৌদ্ধ শ্রমণ? যা, যা, শিগগির গিয়ে ওঁকে অন্দরে নিয়ে আয়।”
“সন্ন্যাসী মানুষ, তাঁরে নিয়ে তোর যে কী আদিখ্যেতা তা বুঝিনে বাপু।” ঝাঁঝিয়ে উঠলেন অবন্তিকা।
“তোকে বুঝতে হবে না। যা গিয়ে ওঁকে ভিতরে নিয়ে আয়। আমি এক্ষুনি যাচ্ছি।” অবন্তিকাকে ঠেলে নিচে পাঠালেন আম্রপালী।
আম্রপালী পালঙ্ক থেকে নিচে নেমে দাঁড়ালেন। তারপর দরজা বন্ধ করলেন। প্রশস্ত শয়নকক্ষ তাঁর। পালঙ্কের ঠিক উলটো দিকে প্রমাণ আকারের আয়না। আয়নার সামনে সাজানো নানা প্রসাধনী। সেখানে বসে প্রসাধন সারেন তিনি। ঘুম থেকে উঠে আয়নার সামনে কোনোদিন দাঁড়ান না আম্রপালী। কিন্তু আজ গিয়ে দাঁড়ালেন। ঘুম থেকে ওঠার ফলে রাতপোশাক এলোমেলো। আয়নায় তিনি নিজেকে দেখছেন অনেকদিন পর। দুধে-আলতা মেশানো গায়ের রং তাঁর। পানপাতার মতো মুখ। বাঁকানো ধনুকের মতো ভ্রু। গভীর দিঘির মতো চোখ। তাতে গত রাতের কাজল লেগে রয়েছে। টিকালো নাক। পদ্মফুলের পাপড়ি-রঙা পাতলা ঠোঁট। টানটান মুখের ত্বক। কালো মেঘের মতো ঘন চুল। সামান্য ঝুঁকে নিজের মুখমণ্ডলের ওপর বার কয়েক আলতো করে হাত বোলালেন আম্রপালী। তারপর সোজা হয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একটানে শরীর থেকে রাত-পোশাক খুলে ফেললেন। নিরাবরণ শরীর। বহু যত্নে তাঁকে সৃষ্টি করেছেন ঈশ্বর। পাকা বেলের মতো সুডৌল স্তনযুগল। আম্রপালী তা স্পর্শ করলেন। সমুদ্র দেশের মতো গভীর নাভি। তারও নিচে নাভিমূল। বিস্তৃত জঙ্ঘা। আম্রপালী নিজের শরীরে হাত বোলাতে বোলাতে ভাবেন আয়না পুরুষ হলে এতক্ষণে তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত। নিজের খেয়ালেই দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট আলতো করে কামড়ালেন। হেসে উঠলেন লাস্যময়ীর মতো। এই বত্রিশ বছর বয়সেও তাঁর শরীরে চমৎকার বাঁধন। মনে মনে ভাবলেন, তাঁর আহ্বান ফেরানোর মতো ক্ষমতা রাজপুরুষদের নেই। হে তরুণ শ্রমণ, তুমি তো কোন ছার! ফিরে তোমাকে সেই আসতেই হল। আমার শরীরের গভীরেই তোমার মুক্তি।
দ্রুত তৈরি হয়ে নিচে নেমে এলেন আম্রপালী। তরুণ শ্রমণকে তিনি বেশিক্ষণ অপেক্ষা করাতে রাজি নন। আম্রপালী এসে দাঁড়াতেই তিনি উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার জানালেন। আম্রপালীও প্রতি নমস্কার জানালেন। “আপনি যে আমার আমন্ত্রণ রক্ষা করতে এসেছেন তাঁর জন্য আমি সত্যি খুশি হয়েছি। আপনার নাম কি আমি জানতে পারি?”
“অবশ্যই, আমার নাম শুদ্ধসত্ত্ব। আমি একজন সাধারণ বৌদ্ধ ভিক্ষু।”
আম্রপালী হেসে বললেন, “আমি তো আপনাকে গতকালই আমার এই ভবনে থাকার আমন্ত্রণ জানিয়ে ছিলাম। কিন্তু আপনি হয়তো ভেবেছিলেন একজন নগরবধূর আতিথ্য গ্রহণ করলে আপনার সন্ন্যাসজীবন অপবিত্র হবে।”
আপত্তি জানিয়ে শুদ্ধসত্ত্ব বললেন, “আপনি ভুল ভাবছেন, আমার মনে এরকম কোনো সংশয় ছিল না। কিন্তু আমি আপনাকে আগেই বলেছিলাম যে, তথাগতর অনুমতি ছাড়া আপনার আমন্ত্রণ গ্রহণ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।”
“বেশ তো, তা তথাগত কি আপনাকে অনুমতি দিলেন?”
“নিশ্চয়ই। উনিই আমাকে বললেন যে আপনার আতিথ্য গ্রহণ করা উচিত। তথাগত মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ পছন্দ করেন না। উনি চান পৃথিবীর সমস্ত প্রাণী আনন্দে থাক।”
তথাগতর কথা এর আগেও শুনেছেন আম্রপালী কিন্তু কখনও এই মানুষটির সাক্ষাৎ পাননি। এই বৈশালীর গণিকাপল্লির গণিকারাও নাকি সকালে উঠে তথাগতের নাম নিয়ে দিন শুরু করেন। তরুণ শুদ্ধসত্ত্বের কথা শুনে আম্রপালীর শ্রদ্ধা বেড়ে গেল মানুষটার প্রতি। বললেন, “আপনি তো এখানে থাকবেন বলেই এসেছেন, তা আপনার মালপত্র কই?”
শুদ্ধসত্ত্ব মৃদু হাসলেন। বললেন, “আমি বৌদ্ধ ভিক্ষু আমার কোনো মালপত্র নেই। এই ঝোলাই আমার পথ চলার সম্বল। এতেই আমার প্রয়োজন মিটে যায়।”
আম্রপালী ভাবলেন, তাঁর বিশাল প্রমোদভবন। সেখানে বৈভবের ছড়াছড়ি। তাঁর পোশাক, প্রসাধনী, নিত্য ব্যবহারের জিনিসপত্রের পরিমাণ কত তা তিনি নিজেই জানেন না। তাঁর দাস-দাসীদেরও নির্দিষ্ট থাকার জায়গা রয়েছে। আর এই তরুণ সন্ন্যাসী বলছেন এই ঝোলাতেই তাঁর সব জিনিস এঁটে যায়। জীবনে কী ওর কোনো চাহিদা নেই? কী করে একজন মানুষ এতো অল্পে জীবনধারণ করতে পারে?
আম্রপালীর মনের অবস্থা বুঝতে পেরেই শুদ্ধসত্ত্ব বললেন, “আকাঙ্ক্ষা দুঃখের কারণ। আর চাহিদার কোনো শেষ নেই। তাই আকাঙ্ক্ষা ও চাহিদাকে ত্যাগ করাই বাঞ্ছনীয়। ভগবান বুদ্ধের কাছে দীক্ষা নিয়ে জেনেছি, সমস্তই ক্ষণিক, সমস্তই দুঃখময়, সমস্তই স্বলক্ষণ এবং সমস্তই শূন্য।”
