আট
এক সকালে বৈশালীর রাজপ্রাসাদ থেকে রথ এসে দাঁড়াল শ্রাবস্তীতে। সে খবর আগেই পাঠানো হয়েছিল মহানমার কাছে। রাজার ডাক বলে কথা। ফেরানোর সাহস নেই। সকাল থেকেই মহানমা ও হরিবালা তৈরি হয়েছিলেন। মেয়ে অম্বাকে সকাল সকাল স্নান সেরে তৈরি থাকতে বলেছিলেন। হরিবালা মেয়েকে নিজের হাতে সাজিয়েছেন। চুলে মাখিয়ে দিয়েছেন জবাকুসুম তেল। তারপর খোঁপা করে দিয়েছেন। খোঁপায় গুঁজে দিয়েছেন জুঁইফুলের মালা। কপালে ছোট্ট কুমকুমের টিপ। চোখে কাজল। মুখে প্রসাধন বলতে চন্দন ও শাঁখের গুঁড়োর মিশ্রণ। অম্বাকে পরানো হয়েছে আকাশি রং-এর শাড়ি। তেরো বছর বয়সেই অম্বা যেন পরিপূর্ণ নারী। তার রূপ ফেটে পড়ছে। অম্বা বুঝতে পারছে না হঠাৎ তাদের কেন ডাক পড়ল রাজদরবারে। সে কখনও বৈশালী নগরীতে যায়নি। তবে বৈশালী নগর নিয়ে অনেক কথা শুনেছে। সকাল থেকে অনেকবার সে মা ও বাবাকে জিজ্ঞেস করেছে, কেন তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে রাজদরবারে?
মহানমা ও হরিবালা মেয়েকে জানিয়েছেন তাঁরা কিছুই জানেন না। রাজার পেয়াদারা এসে হুকুম দিয়ে গিয়েছে ওখানে যাওয়ার জন্য। তাই তাঁরা তাকে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন। না গেলে রাজাজ্ঞার বিরুদ্ধাচরণ করার অপরাধে শাস্তি পেতে হবে। অম্বাও জানে না বাবা-মায়ের সঙ্গে কেন তাকেও তলব করা হয়েছে। তবে সে এটুকু জানে যে তাকে বিবাহ করার জন্য শ্রাবস্তীতে প্রচুর হাঙ্গামা হয়েছে। সে শুনেছে বৈশালীতেও যুদ্ধ লাগার উপক্রম হয়েছে। অম্বা চায় না বৈশালীতে তার জন্য রক্তপাত ঘটুক। কারণ সেও তো বৈশালীরই বাসিন্দা। বৈশালী তার মাতৃভূমি। শ্রাবস্তী তো বৈশালীরই অঙ্গ।
মহানমা ও হরিবালা মেয়েকে নিয়ে ভয়ে ভয়ে রথে চড়লেন। রথ চলতে শুরু করল মসৃণ গতিতে। বৈশালী নগরীর রাজপথে রথ এসে পৌঁছোতেই অম্বা বড় বড় চোখ করে এদিকওদিক দেখতে থাকল। রাজপথের দু’ ধারে বড় বড় অট্টালিকা। পরিচ্ছন্ন রাস্তাঘাট। পথের পাশে মাঝেমধ্যেই ফুলের উদ্যান। তার মাঝখানে টলটলে জলের সরোবর। সেখানে ফুটে আছে অসংখ্য পদ্মফুল। দূরে দেখা যাচ্ছে আম্রকুঞ্জ। বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে নগরের রূপ দেখছিল অম্বা। আর সেই মুহূর্তে এক অজানা আশঙ্কায় গুম মেরে বসে ছিলেন মহানমা ও হরিবালা।
রাজপ্রাসাদ সংলগ্ন জমিতেই বৈশালীর বিধানসভা। সামনে বিশাল লোহার ফটক। তাতে পাহারায় রক্ষীরা। রথ সেই ফটকের সামনে এসে দাঁড়াতেই রক্ষীরা ফটক খুলে দিল। রথ মোরাম বিছানো পথ দিয়ে ঢুকে গেল ভেতরে। বেলে পাথরের বিশাল ভবন। তার ভেতরে বসে সভা। রথ থেকে নেমে তিনজন চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন। বৈশালীর বিধানভবনে এর আগে কোনোদিন মহানমা বা হরিবালা আসেননি। কিন্তু তাঁরা জানেন এখানে রাজ্যের সমস্ত ক্ষমতাবান পুরুষরা বসেন। তাঁদের হাতেই বৈশালীর বাসিন্দাদের ভাগ্য লেখা হয়। বিধানভবনের ফটকে দাঁড়িয়ে মহানমা ভাবছিলেন কার সঙ্গে দেখা করতে হবে? কোথায় বসেন লিচ্ছবিরাজ?
এমন সময়ই এক রক্ষী এসে তাঁদের ভিতরে যেতে বললেন। বিধানসভার ভিতরে গিয়ে তাঁরা দেখলেন সভাগৃহ পরিপূর্ণ। নির্দিষ্ট আসনে বসে আছেন রাজপুরুষগণ। এতো ক্ষমতাবান মানুষের মাঝে দাঁড়িয়ে অস্বস্তি বোধ করতে থাকলেন হরিবালা। তিনি অম্বাকে শক্ত করে ধরে থাকলেন।
অম্বার মনে হল সে যেন কোনো অন্য গ্রহে চলে এসেছে। বিস্ফারিত চোখে সে চারদিক দেখতে থাকল। সভার ভেতর বড় বড় খিলান। সভাগৃহের ছাদ গম্বুজাকৃতি। ওপর থেকে ঝুলছে বেলোয়ারি ঝাড়লণ্ঠন। পাথরের দেওয়ালে খোদাই করা শিল্পকৃতি। অম্বা জানে না, সে যখন বিধানসভার জৌলুস দেখতে ব্যস্ত, তখন তাকে ঘিরে শুরু হয়েছে গুঞ্জন। কয়েকশো চোখ তাকে দেখছে।
অর্ধচন্দ্রাকৃতি ভাবে ছড়ানো বিধানসভার আসন। সেখানে বসে আছেন নির্বাচিত গোষ্ঠীপতি ও রাজারা। সামনে অনেকটা খোলা জায়গা। সেখানে শ্বেতপাথরের মেঝেতে একটি বিশাল আকারের পদ্মফুল আঁকা। মহানমা ও হরিবালাকে একটি জায়গা দেখিয়ে বসতে বলা হল। আর অম্বাকে বলা হল মাঝখানে এসে দাঁড়াতে। অম্বা এসে দাঁড়াল ঠিক পদ্মফুলের মাঝখানের অংশে।
রাজা জয়ন্ত তাঁর নির্দিষ্ট আসনে বসে থেকে দেখছিলেন আম্রপালী নামক এক কিশোরীকে। স্থির তাঁর দৃষ্টি। পাশ থেকে মন্ত্রী কোরক নিচু স্বরে বললেন, “মহারাজ এ তো স্বর্গের অপ্সরাদেরও হার মানায়। এই কন্যার জন্ম কী করে হল এই কৃষক-দম্পতির ঘরে?”
জয়ন্ত উত্তর দিলেন না। মনে মনে ভাবলেন, এ মেয়ে তো বৈশালীর ঐশ্বর্য। ঈশ্বর যেন পরম যত্নে তৈরি করেছেন এই নারীকে। নিঁখুত তার শারীরিক গঠন। গায়ের রং যেন সোনার জলে রাঙানো। মনে হচ্ছে যেন কোনো পরি স্বর্গ থেকে নেমে এসেছে এই সভাগৃহে। এই নারী কোনো একজন পুরুষের স্ত্রী হতে পারে না। তাহলে এই রূপ, এই শরীরের অপচয় হবে। দেবমাল্য ঠিকই বলেছিল তাহলে।
“মহারাজ এবার সময় এসেছে সিদ্ধান্ত নেওয়ার।”
কোরকের কথায় ঘোর ভাঙল জয়ন্তর। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে সভায় উপস্থিত সদস্যদের উদ্দেশ্যে বললেন, “এই নারীকে নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই রাজপুরুষদের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি হয়েছে। বহু পুরুষ একে বিবাহ করার জন্য পাগল এবং একে অপরের বিরুদ্ধে শক্তি প্রদর্শনেও পিছপা হচ্ছেন না। ইতিমধ্যেই শ্রাবস্তীতে ভিন রাজ্য থেকে অনেকেই এই নারীটিকে বিবাহ করার প্রস্তাব নিয়ে এসে গোলমাল পাকিয়েছেন। রক্ষীদের দিয়ে সে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেছে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে গৃহযুদ্ধ লাগার জোগাড়। ফলে এর একটা বিহিত হওয়া দরকার।”
“এই সমস্যার সমাধান তো আমি এক মুহূর্তেই করে দিতে পারি লিচ্ছবিরাজ। আমি এই নারীকে বিবাহ করতে চাই। বৈশালীর কন্যা বৈশালীরই রাজগৃহে রানি হিসেবে স্থান পাবে।” জয়ন্তর কথার মাঝেই উঠে দাঁড়িয়ে কথাগুলো দৃপ্ত ভঙ্গিতে বলে উঠলেন বৃজ্জিরাজ দেবমাল্য।
দেবমাল্য এ কথা বলতেই সভায় ফের কোলাহল শুরু হল। অনেকেই তাঁদের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে দাবি জানাতে থাকলেন তাঁরাও আম্রপালীর পানিপ্রার্থী।
প্রবীণ গণপূরক সভার গোলমাল থামাতে উদ্যোগী হলেন। সবাইকে শান্ত হওয়ার আবেদন জানালেন। তারপর দেবমাল্যকে বাধা দিয়ে বললেন, “বৃজ্জিরাজ, প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নিয়ম অনুযায়ী আপনি সভার কাজে বাধা দিতে পারেন না। জয়ন্তকে বলতে দিন। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সেই সিদ্ধান্তে সবার কল্যাণ হবে।”
জয়ন্ত এবার কোরকের দিকে এক পলক তাকালেন। ভাবলেন মন্ত্রী কোরকের মগজটা বেশ উর্বর। সে এই বুদ্ধিটা না দিলে ঝামেলার অন্ত ছিল না। দেবমাল্যকে তো কিছুতেই বাগে আনা যাচ্ছে না। তাঁর এক জেদ, আম্রপালীকে তাঁর চাই। অবশ্য এখন মেয়েটিকে চোখের সামনে দেখে তাঁরও চিত্ত চঞ্চল হয়ে উঠেছে। মেয়েটির রূপ তাঁকেও আকৃষ্ট করছে। এ নারীকে কারুর স্ত্রী হিসেবে গৃহবন্দি করে রাখা অপরাধ। এই নারী বহুভোগ্যার জন্য আদর্শ। এ রাষ্ট্রের সম্পত্তি।
প্রবীণ গণপূরকের হস্তক্ষেপে সভার গোলমাল একটু থামলে তিনি জয়ন্তকে বললেন প্রস্তাব পেশ করতে।
জয়ন্ত খানিকটা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বললেন, “এ যে স্ত্রীরত্ন! ঈশ্বরের অপরূপ সৃষ্টি। একে কিছুতেই অন্য রাজ্যে যেতে দেওয়া হবে না। ঈশ্বরের সৃষ্টি করা এই জগতে ঐশ্বরিক সৌন্দর্য উপভোগের অধিকার সবার। চাঁদ বা জ্যোৎস্না কারও একার হতে পারে না। তাই আম্রপালীকে কোনো একজন পুরুষের সঙ্গে বিবাহের অধিকার দেওয়া ধর্মসম্মত হবে না। তাহলে এই সৌন্দর্যের অপচয় হবে। তার মতো দেহপল্লবীর অধিকারী রাষ্ট্রের কোনো এক বিশেষ পুরুষের স্ত্রী হলে অন্য পুরুষদের মধ্যে তার জন্য রীতিমতো যুদ্ধ বেঁধে যাবে। যা রাষ্ট্রের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকারক। তাই সব দিক বিবেচনা করে আমি প্রস্তাব রাখছি, আম্রপালীকে প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক পুরুষের স্ত্রী হিসেবে মনোনীত করে ‘নগরবধূ’ করে রাখা হোক।
লিচ্ছবিরাজ জয়ন্তর এই প্রস্তাবে সভায় প্রচুর সমর্থন এল। করতালিতে ভরে উঠল বিধানসভা। দেবমাল্য বুঝলেন জয়ন্তর এই চালের কাছে তিনি মাত হয়েছেন। তাঁর আর কিছু করার নেই। নগরবধূ মানে আম্রপালী সবার। সবাই তাকে ভোগ করতে পারবে। এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করা মানে তিনি একঘরে হয়ে পড়বেন। সেক্ষেত্রে পুনরায় নির্বাচন জেতা তাঁর পক্ষে মুশকিল হয়ে পড়বে। অচিরেই বৃজ্জি গোষ্ঠী তাঁকে আর রাজা হিসেবে নির্বাচন করবে না। সুতরাং জয়ন্তর এই প্রস্তাবে তাঁরও সায় দেওয়া ছাড়া উপায় নেই।
সভাগৃহে জোর গুঞ্জন, “আম্রপালী নগরবধূ।” নগরবধূ মানে সবার স্ত্রী। এবার সবাই তার সঙ্গে রাত কাটানোর ইচ্ছা প্রকাশ করতে থাকলেন। সভার শৃঙ্খলা ফেরাতে গণপূরক কাঠের হাতুড়ি দিয়ে তাঁর সামনের মেজের ওপর জোরে জোরে আঘাত করতে থাকলেন। ধীরে ধীরে সভায় নীরবতা ফিরে এল। তিনি প্রশ্ন করলেন, “তাহলে এই প্রস্তাব সর্বসম্মত ভাবে গৃহীত হল বলা যায়?”
সভায় নির্বাচিত প্রতিনিধিরা চিৎকার করে জানালেন, “হ্যাঁ, হ্যাঁ। এটাই সঠিক সিদ্ধান্ত। আম্রপালী সবার। গোটা বৈশালীর। গোটা রাষ্ট্রের।”
জয়ন্ত স্মিত হাসলেন। মনে মনে ভাবলেন, যাক, ফাঁড়া কাটল। এক নারীর জন্য বৈশালীতে আগুন লাগার জোগাড় হয়েছিল। এক চালে অন্তত সবাইকে খুশি করা গিয়েছে।
কোরক এই সময়টার অপেক্ষায় ছিলেন। জয়ন্তর মুখে মৃদু হাসির রেখা দেখা দিতেই তিনি ফিসফিস করে বললেন, “মহারাজ আমার পুরস্কারটা মনে আছে তো?”
জয়ন্ত ঘাড় ঘুরিয়ে বললেন, “নিশ্চয়ই, তোমার সহস্র কার্ষাপণ আজই পেয়ে যাবে।”
“আর মহারাজ ওই যে আমার পুত্রের ব্যাপারটা। মানে জমি… জায়গিরদার।’’
“ওহ্, ঠিক আছে গঙ্গাপারের ওই গণ্ডক গ্রামের জায়গিরদার করে দেব তোমার ছেলেকে… কী যেন নাম তোমার ছেলের?
কোরক বিগলিত হয়ে বললেন, “আজ্ঞে লুব্ধক মহারাজ।”
আটটি ক্ষমতাসীন ক্ষত্রিয়গোষ্ঠীর সম্মিলিত প্রজাতন্ত্র। বৈশালী নগরীতে যাদের মূল রাজধানী। সেই নগরীর বিধানসভায় হাজির গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত রাজা থেকে গোষ্ঠীপতিরা। পরিভাষায় যাঁদের রাজপুরুষ বলা হয়। তাঁরা এক কিশোরীর জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে। গোটা প্রক্রিয়াটা ওই কিশোরীর সামনেই হল। সে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল সভাগৃহের মাঝখানে। তাকে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। পুরোটা সে দেখল, শুনল। তাকে পাওয়ার আশায় রাজপুরুষদের উল্লাসও দেখল এতক্ষণ ধরে। এবার সে মাথা উঁচু করে বলল, “আমার কিছু বলার ছিল।”
গোটা সভা এবার দেখল এক উদ্ধত কিশোরীকে। গণপূরক বললেন, “বলো, তোমার কী বলার আছে?”
দু’ হাত বুকের কাছে জড়ো করে অম্বা বলল, “আপনারা আমার জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন কিন্তু একবারও তো আমায় কিছু জিজ্ঞেস করলেন না!”
এর উত্তরে জয়ন্ত বললেন, “তুমি ঈশ্বরের অপরূপ সৃষ্টি। তুমি কোনো সাধারণ নারী নও। তাই তুমি রাষ্ট্রের সম্পত্তি। এক্ষেত্রে রাষ্ট্র সম্মিলিত ভাবে যে সিদ্ধান্ত নেবে তাই চূড়ান্ত। তোমাকেও তাই মেনে নিতে হবে। তাই এক্ষেত্রে তোমার আর আলাদা করে কোনো ইচ্ছা-অনিচ্ছা থাকতে পারে না।”
আম্রপালী কিশোরী হলেও জানে যে এর থেকে মৃত্যুদণ্ড অনেকগুণ ভালো। তাই দৃঢ় কণ্ঠেই সে বলে উঠল, “রাষ্ট্র কি নারীর কোনো ইচ্ছে-অনিচ্ছের তোয়াক্কা করে না?”
কখনও কখনও এক নিরীহ কিশোরীর সাদামাটা প্রশ্নও যে এমন জটিল ধাঁধার মতো লাগে তা জানা ছিল না বৈশালীর রাজপুরুষদের।
