নগরবধূ আম্রপালী – ৪

।। চার।।

আম্রপালীর প্রমোদভবনে ঘরের অভাব নেই। বিশাল অট্টালিকার ওপরের তলায় সার দিয়ে ঘর। আম্রপালীর ঘর একেবারে দক্ষিণ দিকে। তার পাশের ঘরেই থাকে কোন্দন্য। আম্রপালীর পুত্র। এই দিকটায় বাইরের কারুর আসার অনুমতি নেই। এমনকী তাঁর কাছে যাঁরা রাত কাটাতে আসেন তাঁরাও এদিকে আসতে পারেন না। অতিথিদের জন্য নির্দিষ্ট বিলাসবহুল ঘর আছে। তাঁদের দেখভাল ও যত্নআত্তির জন্য লোকও রাখা আছে। জলসাঘর নিচে। সেখানে আম্রপালী নৃত্য পরিবেশন করেন। তা দেখার জন্য ছুটে আসেন সমাজের উপরতলার মানুষ। আম্রপালী এখন রাজনর্তকী। রাজপুরুষরাই তাঁর কাছে আসেন। সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে তিনি। এই বৌদ্ধ শ্রমণকে অবশ্য তিনি মনে মনে পছন্দ করতে শুরু করেছেন। তাঁর চোখের চাউনি, কথা বলার ভঙ্গি ঠিক অন্য পুরুষদের মতো নয়। কিন্তু পুরুষ তো। ফলে আম্রপালীর আহ্বান ফেরাতে পারেননি। তাই তো তিনি একদিনের মধ্যেই ছুটে এসেছেন তাঁর কাছে। আম্রপালী জানতেন তরুণ শ্রমণকে তিনি বশ করবেনই। তথাগত তাঁকে আটকাতে পারেননি। যদিও এই তরুণ সন্ন্যাসী তাঁকে জানিয়েছেন যে, তথাগতই নাকি তাঁকে এখানে পাঠিয়েছেন। আম্রপালী অবশ্য এ ব্যাপারে সন্দিহান। তাঁর স্থির বিশ্বাস, তাঁর রূপের আগুনে এই তরুণ ভিক্ষুকে পুড়তেই হবে। তাঁর রূপ ও যৌবনের টানেই তিনি ফিরে এসেছেন।

পুবমুখী একটি ঘরে শুদ্ধসত্ত্বের থাকার ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিলেন আম্রপালী। ঘরটি তাঁর শয়নকক্ষের কাছাকাছি। ইচ্ছে করেই এই বন্দোবস্ত করলেন তিনি। তরুণ শ্রমণকে তাঁর শয়নকক্ষের কাছাকাছি একটি ঘরে এনে রাখার নির্দেশে যারপরনাই অবাক হয়েছেন অবন্তিকা। তিনি কাউকে আম্রপালীর শয়নকক্ষের কাছাকাছি কোনো ঘরে রাত কাটাতে দেখেননি। শুদ্ধসত্ত্বের থাকার যাতে কোনো অসুবিধা না হয় তা দেখার দায় বর্তেছে অবন্তিকার ওপর। দ্রুত ঘরটিকে সুন্দর করে সাজিয়ে তুললেন তিনি।

শুদ্ধসত্ত্ব ধীর পায়ে ঘরে ঢুকলেন। প্রশস্ত ঘর। মাঝখানে প্রমাণ আকারের পালঙ্ক। ঘরের দেওয়ালে বাহারি আসবাব। মেহগনি কাঠের দেরাজ। কেদারা ও মেজ। ঘরের একদিকে খোলা বারান্দা। সেখানে দাঁড়ালে সামনের উদ্যানের সবুজ চোখে পড়ে। বাকি দু’ দিকে বড় বড় জানালা। শুদ্ধসত্ত্ব জানালার কাছে গেলেন। বাইরে তাকালেন। এদিক দিয়ে সম্ভবত প্রাসাদের পিছন দিকটা দেখা যায়। একটা বিশাল জলাশয়। তাতে টলটল করছে কালো জল। জলে মেঘের ছায়া পড়েছে। জলাশয়ের চারদিকে আমগাছ। একটা পাথর বাঁধানো পথ গিয়েছে জলাশয়ের দিকে। এখান থেকে দেখা যাচ্ছে স্নানের ঘাট। তা শ্বেতপাথর দিয়ে বাঁধানো। দিঘির জলে খেলে বেড়াচ্ছে রাজহাঁসের দল। শুদ্ধসত্ত্ব জানলার ধার থেকে সরে এলেন। কাঁধের ঝোলাটা রাখলেন পালঙ্কের ওপর।

“ঘর কি আপনার পছন্দ হয়েছে? নাহলে অনুগ্রহ করে জানাবেন অন্য ঘরের ব্যবস্থা করে দিতে বলব।” দরজায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলেন আম্রপালী।

শুদ্ধসত্ত্ব বললেন, “এতো বৈভবে থাকার অভ্যাস আমার নেই। আমার জন্য খুব সাধারণ মানের ব্যবস্থা করলেই আমি খুশি হব।”

“আপনি আমার অতিথি। আপনার জন্য সেরা বন্দোবস্ত করাটাই আমার কর্তব্য।”

শুদ্ধসত্ত্ব মাথা নিচু করে কয়েক মুহূর্ত কিছু একটা ভাবলেন। তারপর আম্রপালীর দিকে সরাসরি তাকিয়ে বললেন, “আপনি আপনার কর্তব্য অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন। কিন্তু আমি তো আমার অভ্যাসকে ত্যাগ করতে পারি না। একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু হিসেবে তা করাটা অধর্মের।”

“এ কথা কেন বলছেন আপনি? আমি কী আপনাকে আদরযত্ন করতে পারি না? আমি তো চাইবই আমার অতিথিকে আতিথেয়তার উষ্ণতায় ভরিয়ে দিতে। যাতে আপনি আমার নাম সারাজীবন মনে রাখেন।”

সামান্য হাসলেন শুদ্ধসত্ত্ব। “আপনি খ্যাতির মধ্যগগনে বিরাজ করছেন। সবার মনের অন্দরে রানির মতো রয়েছেন। আমার মতো সাধারণ বৌদ্ধ ভিক্ষুর মনে রাখা না রাখায় আপনার সত্যিই কী কিছু এসে যায়?”

“যায়। অনেকখানি এসে যায়।” আম্রপালীর কণ্ঠস্বর আবেগঘন শোনাল।

শেষে শুদ্ধসত্ত্বের জেদের কাছে হার মানলেন আম্রপালী। পালঙ্ক সরিয়ে রাখা হল ঘরের একপাশে। অনেক খুঁজে প্রাসাদের মালখানা থেকে নিয়ে আসা হল তক্তপোষ। তাতে একটি পরিচ্ছন্ন চাদর পেতে নিলেন শুদ্ধসত্ত্ব। আম্রপালীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনি অকারণ চিন্তা করবেন না। এতেই আমার হবে।”

বিস্ফারিত চোখে আম্রপালী জিজ্ঞেস করলেন, “এভাবে আপনি শুতে পারবেন?”

ঝোলা থেকে টুকিটাকি জিনিসপত্র বের করতে করতে শুদ্ধসত্ত্ব বললেন, “আমরা এভাবেই শুয়ে অভ্যস্ত।”

আম্রপালীকে চুপ করে থাকতে দেখে শুদ্ধসত্ত্ব তাঁর দিকে এগিয়ে গেলেন। বললেন, “একজন ভিক্ষুর জীবনধারণে প্রয়োজন, শরীর ঢাকার জন্য তিন টুকরো কাপড়, মাটির তৈরি একটি ভিক্ষপাত্র, একটি সুচ, জল পান করার একটি পাত্র, একটি চিরুনি আর একটি কোমরবন্ধনী। নিজস্ব সম্পত্তি বলতে একজন ভিক্ষুর এইটুকুই। আর বাকি সব সম্পদই সংঘের। তথাগত আমাদের এই শিক্ষাই দিয়েছেন।” জীবনে প্রথমবার এমন এক আশ্চর্য মানুষকে দেখলেন আম্রপালী। আর যতই দেখছেন ততই যেন অবাক হচ্ছেন। কী সংযমী জীবন। এই পৃথিবীতে আছেন অথচ এ পৃথিবীর কোনো কিছু যেন তাঁকে ছুঁতে পারছে না। খাওয়ার সময়ও আম্রপালী দূর থেকে অবাক হয়ে দেখেছেন শুদ্ধসত্ত্বকে। হরিবালার তত্ত্বাবধানে সব রকম উপাদেয় রান্নার পদ সাজিয়ে তাঁকে পরিবেশন করা হয়েছিল। সঙ্গে ছিল ধোঁয়া ওঠা দুধমণি চালের ভাত। কিন্তু শুদ্ধসত্ত্ব প্রায় কিছুই খেলেন না। অল্প একটু ভাত, ডাল আর সবজি খেলেন। পরে নিলেন টক দই।

হরিবালা জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আপনার কি খেতে কোনো রকম অসুবিধে হচ্ছে?”

হরিবালাকে আশ্বস্ত করে শুদ্ধসত্ত্ব দ্রুত বলে উঠেছিলেন, “না মা, এ কী বলছেন আপনি? এতো আয়োজন করেছেন। কিন্তু আমি তো এতো খেতে পারি না। আমার অল্পতেই পেট ভরে যায়। যতটুকু শরীরের প্রয়োজন ঠিক ততটুকুই আমি খাই।”

.

আম্রপালীর প্রাসাদে দিন কাটছে শুদ্ধসত্ত্বের। আরাম, সুখ ও বৈভব সবই আছে এখানে। কোনো কিছুর অভাব নেই। বৌদ্ধবিহার থেকে এখানে চলে আসায় তাঁকে এখন আর ভিক্ষাবৃত্তি করতে হচ্ছে না। কিন্তু শুদ্ধসত্ত্বের এভাবে থাকতে ভালো লাগে না। তিনি দেখেছেন প্রাসাদে একটি বালক ঘুরে বেড়ায়। খোঁজ নিয়ে জেনেছেন বালকটি আম্রপালীর সন্তান। কানাঘুষোয় শুনেছেন বালকটির পিতা নাকি মগধরাজ বিম্বিসার। তিনি ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না, একজন নগরবধূ কী করে মায়ের ভূমিকা পালন করেন? এ নিয়ে অবশ্য কোনো কৌতূহল প্রকাশ করেননি তিনি। অচিরেই কোন্দন্যর সঙ্গে শুদ্ধসত্ত্বের একটা সখ্য তৈরি হল। কোন্দন্যর দাবি মেনে শুদ্ধসত্ত্বকে তার খেলার সাথীও হতে হল। ধীরে ধীরে শুদ্ধসত্ত্ব এই প্রমোদভবনের বাসিন্দা হয়ে গেলেন। কিন্তু প্রমোদে ভেসে গেলেন না। আম্রপালীর এই বিশাল প্রাসাদে তিনি রয়ে গেলেন তাঁর সন্ন্যাসজীবনের প্রাত্যহিক কাজকর্মকে সঙ্গী করেই।

আম্রপালী ক্রমশ এই তরুণ অতিথির প্রতি আকর্ষণ বোধ করতে থাকলেন। ইতিমধ্যে রাজপুরুষগণ তাঁর সান্নিধ্যে রাত কাটানোর অনুরোধ নিয়ে হাজির হচ্ছিলেন। কিন্তু আম্রপালী প্রত্যেককে ফিরিয়ে দিচ্ছিলেন। শরীর খারাপের অজুহাত খাড়া করে তিনি প্রাসাদে অন্তঃপুরবাসিনী হয়ে রইলেন। রথে চড়ে বাইরেও বের হচ্ছিলেন না। তাঁর প্রমোদভবনে যে এক তরুণ সন্ন্যাসী এসে মাসের পর মাস রয়েছেন সেই খবর লিচ্ছবিরাজের কানেও উঠেছে। তিনিও দূত পাঠিয়ে বিষয়টি নিয়ে জানতে চেয়েছেন। আম্রপালী জানিয়েছেন, ওই সন্ন্যাসী তাঁর অতিথি। উনি তথাগতের শিষ্য এবং তথাগতই তাঁকে এখানে পাঠিয়েছেন। ফলে তিনি এখন আর অন্য কাউকে তাঁর প্রমোদভবনে অতিথি হিসেবে জায়গা দিতে পারছেন না। ওই তরুণ সন্ন্যাসী বৌদ্ধবিহারে ফিরে গেলে তিনি ফের রাজনর্তকীর ভূমিকা পালন করতে দ্বিধা করবেন না। আম্রপালী জানেন লিচ্ছবিরাজের বিরুদ্ধে তিনি সরাসরি যেতে পারবেন না। তা সে রাজনর্তকী হিসেবে তাঁর যতই প্রতিপত্তি থাক না কেন। লিচ্ছবি গোষ্ঠী বৈশালীতে প্রবল শক্তিশালী। আর এরা ক্ষত্রিয়। তাই তিনি ইচ্ছে করেই তথাগতকে এর মধ্যে টেনে আনলেন। কারণ তিনি জানেন তথাগতর অপরিসীম প্রভাব রয়েছে লিচ্ছবিদের মধ্যে। তাঁকে বৈশালীতে সবাই মান্য করেন। তাই তথাগত ওই তরুণ শ্রমণকে তাঁর প্রমোদভবনে পাঠিয়েছেন শুনলে এটা নিয়ে আর কেউ জলঘোলা করবে না।

.

সেদিন সন্ধ্যা থেকেই মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছিল। আকাশে ঘনঘন বিদ্যুতের ঝলকানি। কোন্দন্য ভয় পেয়ে চলে এসেছিল মায়ের কাছে। আম্রপালী ওকে রাতে তাঁর কাছেই শুতে বললেন। কোন্দন্যকে ঘুম পাড়িয়ে শয়নকক্ষ থেকে বেরিয়ে এলেন আম্রপালী। বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে অলিন্দে পায়চারী করতে তাঁর ভালো লাগে। সেই সময়ই তিনি পুব দিকে শুদ্ধসত্ত্বের ঘর থেকে আলোর রেখা দেখতে পেলেন। ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন সেই দিকে। শুদ্ধসত্ত্বের ঘরের দরজা ভেজানো। দরজা সামান্য ফাঁক হয়ে থাকায় আলোর রেখা এসে পড়েছে লম্বা অলিন্দের বাঁধানো পাথরে। আম্রপালী দরজা সামান্য ঠেললেন। দেখলেন শুদ্ধসত্ত্ব তক্তপোষের ওপর বসে ঝুঁকে পুঁথি পড়ছেন। পিছন ফিরে থাকায় তিনি আম্রপালীকে লক্ষ করেননি। ঘরের কুলুঙ্গিতে রাখা প্রদীপগুলো জ্বলছে। মাঝে মাঝে কেঁপে কেঁপে উঠছে তার শিখা। ঘরময় লালচে আভা ছড়ানো। শুদ্ধসত্ত্বের ঊর্ধ্বাঙ্গ উন্মুক্ত। প্রদীপের আলো তাঁর পিঠের পেশিতে পড়ে পিছলে যাচ্ছে।

নিঃশব্দে ঘরে ঢুকলেন আম্রপালী। পড়ায় নিমগ্ন শুদ্ধসত্ত্ব। আম্রপালী এবার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। আম্রপালীর ছায়া পড়ল শুদ্ধসত্ত্বের শরীরে। শুদ্ধসত্ত্ব পুঁথি থেকে চোখ তুললেন। পিলসুজে রাখা প্রদীপের আলোয় দেখলেন এক মায়াবী নারী তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। বাইরে বিদ্যুৎ চমকাল। বিদ্যুতের নীলচে রেখায় দু-এক মুহূর্তের জন্য স্পষ্ট দেখলেন আম্রপালীর মুখ। চোখের ভাষা পড়তে অসুবিধা হল না তাঁর। তিনি নির্লিপ্ত ভাবে তাকিয়ে রইলেন।

আম্রপালী ঝুঁকে এলেন শুদ্ধসত্ত্বের মুখের কাছে। তাঁর নিঃশ্বাস ঘন হয়ে আসছে। তিনি তাঁর পাতলা ঠোঁট দিয়ে শুদ্ধসত্ত্বের ঠোঁট স্পর্শ করতে মরিয়া হয়ে উঠলেন। শুদ্ধসত্ত্ব তাঁকে থামিয়ে দিলেন। আম্রপালী বিস্মিত। এই শ্রমণ কী পুরুষ? আম্রপালীর চুম্বন ফিরিয়ে দেয়! এ কেমন পুরুষ? “আপনি আমায় ফিরিয়ে দিচ্ছেন শুদ্ধসত্ত্ব?”

শুদ্ধসত্ত্ব কঠিন গলায় বললেন, “না, আপনাকে ফেরাচ্ছি না। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করছি। তথাগত বলেন, ‘নিজেকে নিয়ন্ত্রণ কর। তারপর অন্যকে অনুশাসন কর। নিজে নিয়ন্ত্রিত হলে অন্যকেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করাই কঠিন।’’’

আম্রপালীর শরীরে কেউ যেন সুচ ফোটাচ্ছে। আজ পর্যন্ত পৃথিবীর সমস্ত পুরুষ তাঁকে পেতে চেয়েছে। তাঁর শরীর তাঁর রূপের প্রশংসা করেছে। আর এই তরুণ শ্রমণ তাঁকে এভাবে একলা পেয়ে ফিরিয়ে দিচ্ছে? মাথার ভেতর আগুন জ্বলে উঠল আম্রপালীর। জেদ চেপে গেল তাঁর। নারীর ছলনায় ভুলেছে মুনি-ঋষিরা আর এই তরুণ শ্রমণকে তিনি বশ করতে পারবেন না? এক লহমায় তিনি পরনের কাঁচুলি টান মেরে খুলে ফেলে ঊর্ধ্বাঙ্গ উন্মুক্ত করে দিলেন। পিলসুজে জ্বলা প্রদীপের আলোয় থরথর করে কাঁপছে রহস্যময়ী এক নারীর শরীর। শুদ্ধসত্ত্ব স্থির বসে আছেন তক্তপোষের ওপর। তাঁর ঠিক চোখের সামনে উন্মুক্ত নারীর শরীর। সুডৌল স্তনযুগল। তার ওপর তেরছা ভাবে এসে পড়েছে প্রদীপের হলুদ আলো। জানালা দিয়ে মাঝে মাঝে এসে পড়ছে বিদ্যুতের নীলচে রেখা।

শুদ্ধসত্ত্ব ফিসফিস করে নিজেকে বলে উঠলেন, “দেহ নশ্বর, কামে আনন্দের অনুসরণ করিও না।”

আম্রপালী খোলা চুল দু’ কাঁধ বেয়ে নেমে এসেছে বুকের ওপর। তিনি তা হাত দিয়ে পিছন দিকে সরিয়ে দিলেন। তারপর তিনি অকস্মাৎ শুদ্ধসত্ত্বের হাত ধরে টেনে তাঁর স্তনের ওপর রাখলেন। শুদ্ধসত্ত্ব আপত্তি করলেন না। আবার নিজে থেকে স্পর্শও করলেন না। আম্রপালী আর নিজেকে ধরে রাখতে পারছেন না। বুকের ভেতর অপমানের আগুন জ্বলছে তাঁর। পরাজয়, পরাজয়— এ তাঁর নির্মম পরাজয়। একজন রূপাজীবার করুণ পরাজয় এক তরুণ শ্রমণের কাছে। আম্রপালী তালজ্ঞান হারিয়ে ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলে উঠলেন, “আপনি কি পুরুষ? আমার এই সুডৌল নরম স্তনের স্পর্শেও আপনার শরীর জাগছে না? বিন্দুমাত্র কাম অনুভব করছেন না?”

রাগে-অপমানে আম্রপালীর হাত শিথিল হতেই শুদ্ধসত্ত্ব হাত সরিয়ে নিলেন আম্রপালীর স্তনের ওপর থেকে। তারপর আম্রপালীর উদ্দেশে শান্ত কণ্ঠে বললেন, “আপনি মনে করছেন স্তনযুগল নরম ও সুডৌল। আসলে আপনি এই মুহূর্তকে অনুভব করছেন। আর আমি দেখছি উন্নত স্তনযুগল জরাগ্রস্ত হয়ে বারিশূন্য চামড়ার থলের আকার ধারণ করেছে। যা কিনা দুঃখের আলয়।”

আম্রপালী কান্নায় ভেঙে পড়লেন। শুদ্ধসত্ত্বের পায়ের কাছেই হাঁটু মুড়ে বসে কাঁদতে থাকলেন। এ কী বললেন ওই তরুণ শ্রমণ? সত্যিই তো। রূপ-যৌবন তো চিরস্থায়ী নয়। কালের নিয়মে জরা আসবে। আজ যে উন্নত সুডৌল স্তনযুগল নিয়ে তিনি কামনার আগুন জ্বালতে গিয়েছিলেন, তা একদিন বারিশূন্য চামড়ার থলের আকার নেবে।

আম্রপালীকে ওভাবে কাঁদতে দেখে শুদ্ধসত্ত্ব আম্রপালীর মাথায় হাত রাখলেন। শান্ত কণ্ঠে বললেন, “হেরে যাওয়ার দুঃখ আর জিতে যাওয়ার লোভ জীবনকে পীড়া দেয়।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *