এগারো
মগধের পূর্বে অঙ্গ রাজ্য। মাঝখান দিয়ে বয়ে গিয়েছে চম্পা নদী। এই চম্পা নদীই মগধ ও অঙ্গ রাজ্যের সীমানা। মগধের পশ্চিমে শোন নদী। আর উত্তরে গঙ্গা। গঙ্গা পার হলেই বৈশালী। বৈশালীর তিন দিক প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। সেখানে নজরমিনারে পাহারায় থাকে বৈশালীর সেনা। গঙ্গা পার হয়ে কিছুটা গেলেই তোরণদ্বার। সেখানেও সর্বক্ষণ মোতায়েন থাকে সেনারা। তবে জলপথেই অন্য রাজ্যগুলির সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য চলে বৈশালীর। বণিকরা যাতায়াত করেন বজরা ও নৌকো করে। পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রেও গঙ্গাকেই গুরুত্ব দেওয়া হয় বেশি। সেই গঙ্গার ঘাটেই এক শীতের রাতে ভিড়ল ছোট্ট একটা নৌকো। নৌকো থেকে নামলেন দুই আরোহী। সঙ্গে বেশ কিছু মালপত্র। তাঁবু খাটানোর সরঞ্জাম। তাঁদের সারা শরীর কম্বলে ঢাকা। দুই ছায়ামূর্তি হেঁটে গেলেন বৈশালী শহরে প্রবেশের উদ্দেশ্যে। তোরণদ্বারে মোতায়েন রক্ষীরা তাঁদের আটকাল।
দুই আগন্তুকই সুঠাম স্বাস্থ্যের অধিকারী। দ্বাররক্ষীরা তাঁদের কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই দুজনেই একসঙ্গে বলে উঠলেন, “জয় লিচ্ছবিরাজের জয়।”
“আপনারা এতো রাতে কোথায় যাবেন?” মশাল হাতে রক্ষীরা প্রশ্ন করল।
“আমরা বণিক মানুষ। ঘুরে ঘুরে ব্যবসা করি। বৈশালীর অনেক নাম শুনেছি। তাই ভাবলাম এখানে এসে ক’টা দিন কাটিয়ে যাই। যদি কিছু ব্যবসা-বাণিজ্য হয়।”
“কিসের ব্যবসা?”
“আজ্ঞে, এই পোশাকের। ওই যে ওগুলোতে সব পোশাক আছে।” সঙ্গে আনা মালপত্রের দিকে আঙুল দেখিয়ে কথাগুলো বললেন এক আগন্তুক।
এক রক্ষী জিজ্ঞেস করল, “এতো রাতে কোত্থেকে আসছেন?”
“আর বলবেন না, আসছি সেই কাশী থেকে। পথে নানা জায়গায় থামতে থামতে অনেকটা দেরি হয়ে গেল।”
“কিন্তু এতো রাতে তো নগরের অভ্যন্তরে প্রবেশের অনুমতি নেই।” কঠিন স্বরে বলল এক রক্ষী।
আগন্তুক অনুনয়ের সুরে বললেন, “বৈশালী নগরীর কত সুনাম। রাজার কত ক্ষমতা। আর আমাদের একটু আশ্রয় হবে না!”
“রাজা জানতে পারলে আমাদের প্রাণ যাবে।” এবার আরেক রক্ষী এগিয়ে এল।
“রাজা তো প্রাসাদে। আপনারাই তো সব। বৈশালীর নিরাপত্তার দায়িত্ব তো আপনাদেরই হাতে। এই দেখুন না, এই শীতের রাতে আপনারাই তো জেগে থেকে বৈশালীকে রক্ষা করছেন।”
এবার একটু বরফ গলল। এক রক্ষী বলল, “ঠিক আছে যান। তবে কাউকে বলবেন না যে আমরা এতো রাতে আপনাদের নগরে প্রবেশ করতে দিয়েছি।”
এতক্ষণ আরেক আগন্তুক চুপ করে ছিলেন। এবার তিনি তাঁর কোমরে বাঁধা বটুয়া থেকে কিছু কার্ষাপণ বের করে রক্ষীদের হাতে দিয়ে বললেন, “এগুলো রাখুন। উৎকোচ নয়। আমাদের উপকার করার জন্য খুশি হয়ে দিলাম।”
চকচকে মুদ্রার কাছে সবাই কুপোকাত। লোভ এমনই জিনিস, মানুষকে নুইয়ে দেয়। কিন্তু ইচ্ছে থাকলেও রক্ষীরা কেউ হাত বাড়িয়ে মুদ্রাগুলি নেওয়ার সাহস দেখাচ্ছিল না। সেটা দেখে আগন্তুক বললেন, “আমরা যে এই পথ দিয়ে প্রবেশ করেছি একথা যেমন কেউ জানবে না, ঠিক তেমনই এই উপহারের কথাও কেউ জানতে পারবে না।”
দুই আগন্তুকই দেখলেন মশালের আলোয় রক্ষীদের চোখ চকচক করে উঠল। এই শীতের রাতে পড়ে পাওয়া এতগুলো মুদ্রা কে আর ছাড়তে চায়? এ ওকে ঠেলছে সে তাকে ঠেলছে। রক্ষীরা ইতস্তত বোধ করছে দেখে আগন্তুক বললেন, “আমাদের বন্ধু ভাবুন। আমরা আপনাদের কোনো ক্ষতি করব না।”
রক্ষীদের সংযমের বাঁধ ভাঙল। তারা মুদ্রাগুলি নিলো। দুই আগন্তুক হাসিমুখে বিদায় নিতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তাঁদেরই মধ্যে একজন আচমকা জিজ্ঞেস করে বসলেন, “আচ্ছা বৈশালীতে আম্রপালীর প্রাসাদটা কোন দিকে?”
আম্রপালীর খ্যাতি ছড়িয়েছে দিগ্বিদিকে। ফলে তাঁর প্রাসাদের হদিশ জানতে চায় অনেকেই। রক্ষীরা ভাবলো এরাও আম্রপালীর অনুরাগী। এক রক্ষী বললো, ‘‘সোজা দক্ষিণ মুখ করে হাঁটতে থাকুন। যে কোনো লোককে জিজ্ঞেস করলেই দেখিয়ে দেবে। দেখবেন একটা েশ্বতপাথরের প্রাসাদ। তার চারিদিকে প্রচুর আমগাছ। প্রাসাদের বাইরে অনেকেই দেখবেন তাঁবু খাটিয়ে বসে আছেন।”
“কেন তাঁবু খাটিয়ে বসে আছেন কেন?”
‘‘আম্রপালী সবার সঙ্গে দেখা করেন না। উনি রাজনর্তকী। কিন্তু ওঁকে দেখতে আসেন অনেক মানুষ। তাঁরাই একবার ওঁকে দেখার জন্য তাঁবু খাটিয়ে অপেক্ষা করেন প্রাসাদের বাইরে।” এই পর্যন্ত বলে সেই রক্ষী একটু থামল। এক পলক আপাদমস্তক মেপে নিল দুই আগন্তুককে। তারপর নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল, “কেন আপনারাও কি তাঁর সাক্ষাৎপ্রার্থী?”
“আমাদের সঙ্গে কি আর উনি দেখা করবেন? উনি কত বড় মাপের নর্তকী। কত খ্যাতি ওঁর। রাজা, মন্ত্রী, বড় বড় ব্যবসায়ীরা ওঁর সাক্ষাৎ পাওয়ার জন্য হত্যে দিয়ে পড়ে থাকেন। আমরা তো সাধারণ ব্যবসায়ী মাত্র।” খানিকটা নিরাশ হয়েই কথাগুলো বলে উঠলেন আগন্তুক।
“তা আপনি ঠিকই বলেছেন। তবে অর্থ থাকলে সবই সম্ভব।”
“সেটা কী রকম?”
“মানে ওঁর দেখা পেতে গেলে আর্জি পেশ করতে হয়। সেই আর্জি জানাতে হয় ওঁর প্রাসাদের দরজায় যারা পাহারা দেয় তাঁদের কাছে। তারা সেই আর্জি পৌঁছে দেন আম্রপালীর খাস দাসীদের কাছে। তারপর তা পৌঁছায় আম্রপালীর কানে। এবার তিনি যদি মনে করেন দেখা করবেন তাহলে প্রাসাদে যাওয়ার অনুমতি মিলবে। দিনে উনি একজনের বেশি অতিথির সঙ্গে দেখা করেন না। আম্রপালীর প্রাসাদে রাত কাটাতে গেলে দিতে হয় একশত কার্ষাপণ।” একটানা কথাগুলো বলে থামলেন সেই রক্ষী।
রক্ষীদের ছাড়পত্র পেয়ে সেই রাতেই বৈশালীর দক্ষিণে তাঁবু গাড়লেন দুই আগন্তুক। শীতের রাতে ঘন কুয়াশায় মোড়া আম্রপালীর প্রাসাদ। উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা চারদিক। সামনে বিশাল এক লোহার ফটক। তার দু’ পাশে স্তম্ভ। তাতে জ্বলছে মশাল। পাহারায় রয়েছেন রক্ষীরা। আশেপাশে বেশ কয়েকটি তাঁবু দেখতে পেলেন দুই আগন্তুক। বুঝলেন এরাও আম্রপালীকে দেখার আশায় এসেছেন।
তাঁবুর ভেতর ঢুকে ধড়াচুড়ো ছাড়লেন দুই আগন্তুক। দুজনেই ছদ্মবেশে আছেন অনেকক্ষণ। মগধরাজ বিম্বিসার পুরঞ্জয়কে বললেন, “যাক আপাতত নিশ্চিন্ত। কী বলো?”
পুরঞ্জয় উদ্বিগ্ন মুখে জানালেন, “বন্ধু, আমি বলব তুমি বেশি ঝুঁকি নিয়ে ফেলেছো। আমাদের কাছে কোনো অস্ত্র নেই। ধরা পড়লে ন্যূনতম প্রতিরোধটুকু গড়ে তুলতে পারব না।”
“আহ্! অত চিন্তা ক’রো না তো। তুমি তো বলে এসেছো ছদ্মবেশে কিছু সেনা এখানে পাঠাতে।”
পুরঞ্জয় অনেক মাথা খাটিয়ে এই পরিকল্পনা সাজিয়েছেন। তাঁরা দুজন রাতের অন্ধকারে বণিকের ছদ্মবেশে বৈশালীতে ঢুকবেন। তার ঠিক পরের দিন থেকে কিছু দক্ষ সেনা বৈশালীতে ঢুকবে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে। তাঁরা বানজারার মতো ঘুরে বেড়াবে কাছাকাছি। কোনো বিপদ ঘটলে এই ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে থাকা দক্ষ সেনারা একজোট হয়ে রক্ষা করবে মগধরাজকে। তারপর প্রয়োজনে আরও সেনা আনানো হবে। যুদ্ধ লাগার পরিস্থিতি তৈরি হলে বৈশালীকে চারদিক থেকে ঘিরে আক্রমণ করা হবে। বৈশালীর রাজারা সেই দিক সামাল দিতে ব্যস্ত থাকবেন। সেই সুযোগে বিম্বিসারকে নিরাপদে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে মগধে। পুরঞ্জয় বিম্বিসারকে দীর্ঘদিন চেনেন। তিনি জানেন, বিম্বিসার একবার যখন এতো ঝুঁকি নিয়ে ওই নর্তকীর কাছে এসেছেন তখন তাঁকে বৈশালী থেকে বিম্বিসারপুরীতে নিয়ে যাবেনই। সে ভালোবাসা দিয়েই হোক অথবা রক্ত ঝরিয়েই হোক।
মহারানি চেলনাকে বিম্বিসার বলেই এসেছেন যে, তিনি কিছুদিনের জন্য ছদ্মবেশে বৈশালীতে যাচ্ছেন আম্রপালীর নৃত্যকলা দেখবেন বলে। ততদিন মগধের ভার সামলাবেন বড় ছেলে অজাতশত্রু। অজাতশত্রু বয়সে তরুণ। এখন থেকেই রাজত্ব সামলানোর পাঠ নেওয়া ভালো। মহারানি চেলনা বিষয়টিকে মোটেই ভালো চোখে নেননি। তিনি আম্রপালীর নাম শুনেছেন। মগধরাজ বৈশালীর গণিকার কাছে যাচ্ছেন এটা তাঁর মোটেই পছন্দ হয়নি। তিনি আপত্তিও তুলেছিলেন। কিন্তু বিম্বিসার তা এক কথায় খারিজ করে দিয়ে বলেছিলেন, “আম্রপালী একজন নৃত্যশিল্পী। রাজনর্তকীও বটে। তাঁকে মগধে নিয়ে আসতে পারলে আমার রাজসভা আরও সমৃদ্ধ হবে।”
রাজগিরে তিন পাহাড়ের কোলে মনোরম পরিবেশে চোখ ধাঁধানো বিম্বিসারপুরী। দুর্ভেদ্য দুর্গের ভেতর রাজপ্রাসাদ। সেই প্রাসাদের বাসিন্দা আজ তাঁবুতে দিন কাটাচ্ছেন। তাও পরিচয় গোপন করে। ছদ্মবেশে। পুরঞ্জয় ভাবলেন, কী অমোঘ আকর্ষণ ওই নারীর। তার জন্য কত মানুষ আজ ঘরছাড়া। খোদ মগধরাজ পর্যন্ত তাঁর প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে চলে এসেছেন শত্রুপুরীতে। পুরঞ্জয় জানেন, অর্থ খরচ করলে ঠিক পৌঁছে যাওয়া যাবে আম্রপালীর কাছে। কারণ তিনি অর্থের বিনিময়েই অতিথিদের সঙ্গ দেন। তাঁদের সামনে নৃত্য পরিবেশন করেন। ফলে ঠিকঠাক জায়গায় পর্যাপ্ত অর্থের সঙ্গে আর্জি পেশ করতে হবে। এতো ঝুঁকি নিয়ে তাঁরা যখন এখানে এসেছেন তখন খালি হাতে ফিরবেন না।
