নগরবধূ আম্রপালী – ১২

 বারো

চিকের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে নমস্কার জানালেন বছর পঁচিশের এক নারী। মোলায়েম কণ্ঠে বললেন, “ভেতরে আসুন।”

বিম্বিসার জীবনে নারী কম দেখেননি। মহারানি চেলনা ছাড়াও তাঁর অন্দরমহলে পাঁচশ জন রানি। প্রত্যেককেই তিনি বিবাহ করে মগধে নিয়ে এসেছেন। তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তারের ক্ষেত্রে নারীদের ভূমিকাও কম নয়। বিভিন্ন রাজ্যের রাজকুমারীকে তিনি বিবাহ করেছেন। ফলে যৌতুক হিসেবে পেয়েছেন অসংখ্য বর্ধিষ্ণু গ্রাম ও জনপদ। সেই সমস্ত এলাকার রাজস্ব জমা পড়ে মগধের কোষাগারে। অনেক রাজ্যের রাজাই বিম্বিসারের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী। অনেকেই তাঁদের কন্যার বিবাহ দিয়েছেন মগধরাজের সঙ্গে। ফলে নারীসঙ্গ থেকে বঞ্চিত নন বিম্বিসার। কিন্তু এ কোন নারীকে তিনি দেখছেন চোখের সামনে? এ তো নারী নয়, অপ্সরা। স্বয়ং ঈশ্বর যেন পরম যত্নে গড়ে তুলেছেন এই নারীকে। এই নারীর সান্নিধ্য পাওয়া তো ভাগ্যের ব্যাপার। জীবনে এমন রূপসী নারী দেখেননি তিনি। মনে মনে ধন্যবাদ জানলেন পুরঞ্জয়কে। দিন তিনেক চেষ্টার পর পুরঞ্জয় অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে আম্রপালীর সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেছেন। বন্ধুর কাছে এই মুহূর্তটির জন্য মনে মনে ঋণ স্বীকার করে নিলেন বিম্বিসার। পুরঞ্জয় অবশ্য বলে দিয়েছিলেন নিজের পরিচয় প্রকাশ না করতে। তাই বিম্বিসার নিজেকে একজন বণিক হিসেবেই পরিচয় দিলেন। তিনি রাজপোশাক পরেও আসেননি। এসেছেন একজন বণিকের পোশাকে। চট করে কেউ তাঁকে চিনতে পারবে না। বিম্বিসার একাই আম্রপালীর প্রাসাদে এসেছেন। তাঁবুতে রয়ে গিয়েছেন পুরঞ্জয়। পরিস্থিতি ঘোরালো হলে যাতে তিনি দ্রুত মগধের সেনাপতির সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন তাই এই ব্যবস্থা।

আম্রপালীর প্রাসাদে প্রবেশ করে বিম্বিসার বুঝলেন বৈভবে এই প্রাসাদ তাঁর বিম্বিসারপুরীকেও টেক্কা দিতে পারে। শ্বেতপাথর বাঁধানো পথ সোজা চলে গিয়েছে অন্দরমহলে। দু’ পাশের দেওয়ালে ঝুলছে কাঠের কাঠামোয় বাঁধানো বিভিন্ন ব্যক্তির তৈলচিত্র। তাঁরা প্রত্যেকেই বিখ্যাত মানুষ। কেউ সম্রাট, কেউ কবি, কেউ গায়ক, কেউ শিল্পী। বিম্বিসার বুঝলেন দেশ-বিদেশের নানা ব্যক্তিত্বের পায়ের ধুলো পড়েছে এই প্রাসাদে। তার মানে আম্রপালী চিত্রকলার ভক্ত। বিম্বিসার পরপর ছবিগুলি দেখতে দেখতে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ একটি ছবি দেখে একটু থমকে গেলেন। দেওয়ালে টাঙানো একটি প্রতিকৃতি তাঁর খুব চেনা মনে হলো। কাছে গেলেন বিম্বিসার। আরে এ তো তাঁরই মুখচ্ছবি। তবে তরুণ বয়সের। বছর চল্লিশের এই বিম্বিসারের সঙ্গে ওই ছবিটির কিছুটা মিল আছে। তবে তা শুধু তাঁর চোখেই ধরা দেবে।

বিম্বিসারকে দাঁড়িয়ে পড়তে দেখে থমকে দাঁড়ালেন আম্রপালী। একটু অবাক হয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী হল থামলেন কেন?”

বিম্বিসার ছবির থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা আপনি কি চিত্রকলার ভক্ত?”

রঞ্জিত দুই ঠোঁটের ফাঁকে দেখা দিল এক চিলতে হাসি। “ভক্ত কিনা জানি না। তবে অনুরাগী বলতে পারেন।”

“এই ছবিগুলি কি আপনি আঁকিয়েছেন?”

“আজ্ঞে। নামী শিল্পীদের দিয়ে আঁকিয়ে নিয়েছি। তবে উপযুক্ত পারিশ্রমিক দিয়ে।”

প্রশ্নটা করা এই মুহূর্তে ঠিক হবে কিনা ঠিক বুঝে উঠতে পারলেন না বিম্বিসার। কিন্তু কৌতূহল আর চেপে রাখতে পারছেন না তিনি। তাই মনে দ্বিধা নিয়েও জিজ্ঞেস করে ফেললেন, “আচ্ছা এই ছবিটা কার? কোনো রাজার?”

আম্রপালী কিছুটা এগিয়ে এলেন বিম্বিসারের দিকে। বললেন, “সে কী! ওঁকে চেনেন না? উনি মগধরাজ বিম্বিসার।”

বিম্বিসার মনে মনে আনন্দিত হলেন এই ভেবে যে তাঁর ছবিও আম্রপালী আঁকিয়ে সাজিয়ে রেখেছেন এই প্রাসাদে। মুখে অবশ্য বললেন, “আপনি মগধরাজকে চেনেন? মানে, কখনও সাক্ষাৎ হয়েছে ওঁর সঙ্গে।”

“না ওঁকে চিনি না। দেখা হয়নি ওঁর সঙ্গে। তবে অনেকের মুখে ওঁর নানা কীর্তির কথা শুনেছি। উনি মগধের রাজা। শক্তিশালী। বীর। ওঁর বীরত্বের কথা অনেক শুনেছি। এখানে বহু গুণী মানুষের ছবি আছে ওঁর ছবি না রাখলে অন্যায় হতো। তাই এক শিল্পীকে দিয়ে এটা আঁকিয়ে নিয়েছিলাম। তবে এটা সম্ভবত মগধরাজের তরুণ বয়সের ছবি।” খুব ধীর লয়ে কথাগুলো বললেন আম্রপালী।

বিম্বিসার একটা ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হলেন যে, এই বণিকের ছদ্মবেশের আড়ালে তাঁকে আর চেনা যাচ্ছে না। তার ওপর এই কদিন ঠান্ডায় প্রাসাদের আরাম ছেড়ে তাঁবুতে রাত কাটানোয় শরীরের জৌলুস অনেকটাই ফিকে হয়েছে। সব মিলিয়েই সম্রাট বিম্বিসার এখন শ্রীহীন।

যে ঘরটিতে বিম্বিসারের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে সেটি বেশ রাজকীয়। আম্রপালীর নির্দেশ মেনে তাঁর দাস-দাসীরা তাঁকে আপ্যায়ন করে নিয়ে এসেছে এই ঘরে। বিম্বিসার এবার স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন। কদিন ওভাবে তাঁবুতে কাটানোয় ভালো করে স্নান, খাওয়া, ঘুম কিছুই হয়নি। তাই আগে পরিচ্ছন্ন হয়ে নিলেন। তবে বণিকের ছদ্মবেশ ছাড়লেন না। দুপুরের আহার সারলেন পরিপাটি করে। তারপর নরম বিছানায় শুয়ে টানা ঘুম দিলেন। মনে মনে অবশ্য পুরঞ্জয়ের জন্য উদ্বিগ্ন হলেন। ভাবলেন তিনি তবু এই প্রাসাদে আছেন কিন্তু পুরঞ্জয়কে তো কাটাতে হচ্ছে সেই তাঁবুতেই। সেই সকালের পর অবশ্য আর আম্রপালীর দেখা পাননি বিম্বিসার। সন্ধ্যায় এই প্রাসাদের জলসাঘরে বসবে নৃত্যকলার আসর। বিম্বিসারই অনুরোধ করেছিলেন আম্রপালীকে। বলেছিলেন, “আপনার নৃত্যকলার খ্যাতি ছড়িয়েছে দেশ-বিদেশে। আমি একজন সামান্য বস্ত্র-ব্যবসায়ী হলেও শিল্পরসিক। সঙ্গীত ভালোবাসি। নৃত্যকলাও। আমি কি আপনার নৃত্যকলার সাক্ষী থাকতে পারি?”

খানিকটা অবাক চোখে তাঁর দিকে তাকিয়েছিলেন আম্রপালী। যেন এমন আবদার এর আগে কখনও শোনেননি। তারপর বলেছিলেন, “নিশ্চয়ই পারেন। আজ সন্ধ্যায় আপনাকে সে সুযোগ দেব।”

“সেখানে নিশ্চয়ই আরও গুণীজনেরা উপস্থিত থাকবেন?” প্রশ্নটা করেই ফেলেছিলেন বিম্বিসার।

“না, আপনিই আজ আমার অতিথি। আপনার জন্যই থাকবে সব ব্যবস্থা। আপনার সামনেই আমি পরিবেশন করব আমার নৃত্যকলা। আপনাকে খুশি করাই আমার ধর্ম।”

আম্রপালীর কথা শেষ হতেই বিম্বিসার বলে উঠেছিলেন, “শুধুমাত্র আমার কথা ভেবে এই ব্যবস্থা করার জন্য আমি আপ্লুত। কিন্তু একজন শিল্পীর ধর্ম হওয়া উচিত শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধ থাকা। কোনো মানুষকে খুশি করা কোনো শিল্পীর ধর্ম হতে পারে না।”

আম্রপালী এর উত্তরে কিছু বলেননি ঠিকই কিন্তু বিম্বিসারের দিকে স্থির চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়েছিলেন। বিম্বিসার দেখেছিলেন কী গভীর সেই দৃষ্টি। সেই চোখের দৃষ্টিতে কী ছিল? সন্দেহ? নাকি প্রশ্রয়? বিম্বিসার তার উত্তর পাওয়ার আগেই দেখেছিলেন আম্রপালী প্রাসাদের অভ্যন্তরে মিলিয়ে যাচ্ছেন। অপস্রিয়মাণ সেই নারীর দিকে তাকিয়ে বিম্বিসার ভাবছিলেন, পুরঞ্জয় যা বলেছিলেন তার থেকেও শতগুণ বেশি সুন্দরী এই নারী।

বিশাল জলসাঘরে ঝাড়বাতির নরম আলোয় আম্রপালী ফুটিয়ে তুলছেন তাঁর অপরূপ নৃত্যকলা। গোটা জলসাঘর যেন ইন্দ্রের কানন। যন্ত্রশিল্পীরা বাজিয়ে চলেছেন সুর, তাল, লয়ের ছন্দে। আর এক অপ্সরা তখন মগ্ন তাঁর শিল্পকলা প্রদর্শনে। তাঁর প্রতিটি নাচের মুদ্রা, শরীরী বিভঙ্গ নদীর ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ছে। আম্রপালীর নৃত্যকলায় মুগ্ধ বিম্বিসার। তিনি দিশেহারা এই নারীর সামনে। ভুলে গেলেন যে তিনি এখানে এক বণিকের ছদ্মবেশে গোপনে এসেছেন। এটা বিম্বিসারপুরী নয়, এটা আম্রপালীর প্রমোদভবন। এই নারী তাঁকে চুম্বকের মতো টানছে। একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে তিনি তাকিয়ে রইলেন আম্রপালীর দিকে। ডুবে গেলেন বাজনার লয়ে, নাচের ছন্দে। আজকের এই অমলিন সন্ধ্যা শুধু সঙ্গীতের। বেখেয়ালেই বিম্বিসার এক যন্ত্রশিল্পীর কাছে থেকে চেয়ে নিলেন সেতার। কিছুক্ষণের আলাপ পর্ব পেরিয়ে সেতারের তারে ঝড় তুলল তাঁর আঙুল। তবলিয়া দিতে শুরু করলেন সঙ্গত। মেলবন্ধনে সৃষ্টি হল বন্দিশ। নিবিষ্ট মনে বিম্বিসার বাজিয়ে চললেন চঞ্চল প্রকৃতির সান্ধ্যকালীন রাগ ‘চারুকেশী’।

.

“আপনি কে? কী আপনার পরিচয়?” ঘরের দরজা খুলে আচমকাই প্রবেশ করলেন আম্রপালী। পিছন পিছন এল তাঁরই দেহরক্ষী মিশিরাম। কালো মিশমিশে তাঁর শরীর। একমাথা ঝাঁকড়া চুল। পেটানো চেহারা। হাতে বল্লম। সেটা বিম্বিসারের দিকে তাক করা। মিশিরাম আম্রপালীর খাস অনুচর। তাঁর জন্য প্রাণ দিয়ে দিতে পারে।

শীতের রাত। নিজের ঘরে পালঙ্কে আধশোয়া অবস্থায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন বিম্বিসার। কম্বলটা আলগোছে দিয়ে রেখেছিলেন গায়ের ওপর। ঘরের কোণে জ্বলছে কাঠের আগুন। কুলুঙ্গিতে ঘিয়ের প্রদীপ। আজকের সন্ধ্যা তাঁকে বড় তৃপ্তি দিয়েছে। তিনি ভাবছিলেন আম্রপালীরই কথা। ভাবছিলেন এই নারীকে যদি নিয়ে যাওয়া যেত মগধে। আম্রপালী রাজি হলে তিনি তাঁকে রাজরানি করে রাখতেও রাজি। এমন সময় হঠাৎই আম্রপালীর প্রবেশ। কম্বলটা সরিয়ে দ্রুত বিছানায় উঠে বসলেন বিম্বিসার। বুঝলেন তিনি ধরা পড়ে গিয়েছেন আর লুকোচুরি খেলে কাজ নেই। নিজের পরিচয় জানিয়ে দেওয়াই ভালো। একবার আড়চেখে মিশিরামকে দেখলেন। তারপর ধীর কণ্ঠে বললেন, “মৃত্যুকে আমি ভয় পাই না। তবে এভাবে মরতে চাই না। আমি একজন নিরস্ত্র মানুষ। আর একজন নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করা আপনার মতো শিল্গীর সাজে না। যদি সুযোগ দেন তাহলে নিজের পরিচয় দিতে পারি। তবে এটুকু বলতে পারি আপনার কোনো ক্ষতি করার উদ্দেশ্য নিয়ে আমি এখানে আসিনি।”

এক মুহূর্ত কিছু একটা ভাবলেন আম্রপালী। ঘাড় ঘুরিয়ে মিশিরামকে চোখের ইশারায় চলে যেতে বললেন। মিশিরাম নীরবে ঘর ছেড়ে চলে গেল। ঘরের মধ্যে শুধু আম্রপালী আর বিম্বিসার। আম্রপালী কয়েক কদম এগিয়ে গেলেন পালঙ্কের দিকে। চোখেমুখে খানিকটা বিস্ময় তাঁর। কে এই পুরুষ? সকাল থেকেই তাঁকে পদে পদে অবাক করে চলেছেন। ইনি কোনো সাধারণ ব্যবসায়ী হতে পারেন না। রাজা, মন্ত্রী, ধনী ব্যবসায়ী জীবনে কম দেখেননি তিনি। কেউ তাঁকে শিল্পীর মর্যাদা দেননি। সবাই তাঁর নৃত্যকলার তারিফ করেছেন তাঁর শরীরের সান্নিধ্য পেতে। কিন্তু এ কোন পুরুষ যিনি একবারের জন্যও তাকে কামনার চোখে দেখলেন না। চাইলেন না তাঁর সঙ্গে শরীরী খেলায় মেতে উঠতে। এখানে যাঁরা আসেন তাঁরা প্রত্যেকেই সমাজের শীর্ষস্তরের মানুষ। তাঁরা বিপুল অর্থ ব্যয় করে তাঁর কাছে আসার সুযোগ পান এবং তাঁরা তা আম্রপালীর কাছে থেকে উসুল করে নিতে চান। কিন্তু এই বণিকরূপী মানুষটি সম্পূর্ণ অন্য রকম। তার ওপর আজ সন্ধ্যায় যেভাবে ইনি সেতার বাজালেন তাতে করে আম্রপালী হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। সন্দেহ তিনি আগেই করেছিলেন। সন্ধ্যার ওই ঘটনার পর নিশ্চিত হয়ে যান এই অতিথি কোনো সাধারণ ব্যবসায়ী নন। আসল পরিচয় জানতেই তাঁর এখানে আসা। বলা তো যায় না কার মনে কী আছে? “এবার বলুন তো আপনি কে? কোন উদ্দেশ্যে পরিচয় গোপন করে এখানে এসেছেন?”

বিম্বিসার একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলেন আম্রপালীর দিকে। আম্রপালীর গালে আগুনের লালচে আভা পিছলে পড়ছে। চোখের তারায় আগুনের শিখা কাঁপছে। সম্মোহিত ভঙ্গিতে বিম্বিসার এগিয়ে গেলেন আম্রপালীর দিকে। “যদি বলি ভালোবাসার টানে এসেছি।”

“এটা আমার উত্তর হল না। আমি আপনার পরিচয় জানতে চেয়েছি।”

“পরিচয় জানালে কি ভালোবাসার স্বীকৃতি দেবেন?”

“ভালোবাসার কথা এখানে এসে সবাই বলেন। এটা নতুন কিছু নয়। আপনি কে সেটা আগে জানান। না হলে রক্ষীদের ডাকতে আমি বাধ্য হব।” ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠতে থাকলেন আম্রপালী।

আরও এগিয়ে গেলেন বিম্বিসার। আম্রপালীর চোখে চোখ রাখলেন। মৃদু ঝুঁকে ফিসফিস করে বললেন, “আমি বিম্বিসার।”

“মগধরাজ বিম্বিসার!” আম্রপালী বিস্মিত।

বণিকের ছদ্মবেশ খুলে রাখলেন বিম্বিসার। ফের কাছে গেলেন আম্রপালীর। তিনি জানতেন তাঁর পরিচয় জানালে আম্রপালী অবাক হবেন। তাই তিনি আম্রপালীকে ধাতস্থ হওয়ার কিছুটা সময় দিলেন। “আপনি ঠিকই শুনেছেন, আমি মগধরাজ বিম্বিসার। আপনার নৃত্যকলা দেখার টানে আমি বৈশালীতে ছুটে এসেছি।”

এই ঠান্ডাতেও আম্রপালীর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। মগধরাজ বিম্বিসার তাঁর কাছে এসেছেন। এ যে স্বপ্ন। যাঁর বীরগাথা লোকের মুখে মুখে ঘোরে তিনি এসেছেন তাঁর দরজায়। এও কি সম্ভব? অগাধ বৈভব যাঁর, যাঁর নির্দেশে মগধ সাম্রাজ্য ওঠে বসে সেই মানুষটি বণিকের ছদ্মবেশে এসেছেন তাঁর নাচ দেখতে। নিজ মুখে বলছেন তাঁকে ভালোবাসেন। আম্রপালীর সব কেমন যেন গুলিয়ে গেল। তিনি কোনোক্রমে শুধু বললেন, “রা-জ-ন আ-প-নি আমার কাছে… আমি যে একজন রাজনর্তকীর বেশে গণিকা মাত্র… ”

আম্রপালীর রক্তিম ঠোঁটে বিম্বিসার তাঁর করতল আলতো করে চেপে ধরলেন। বললেন, “আমার কাছে আপনি একজন শিল্পী। আমি একজন শিল্পীর কাছে এসেছি, গণিকার কাছে নয়।”

উত্তরের হিমেল হাওয়ায় বাঁশ-পাতারা যেমন তিরতির করে কাঁপে আম্রপালীর শরীরও তেমন করেই কাঁপছে। জীবনে এই প্রথম কোনো পুরুষ তাঁকে শিল্পীর মর্যাদা দিলেন। তাঁর মনের নরম জায়গাটায় হাত রাখলেন। জীবনে প্রথম কোনো পুরুষ তাঁকে স্পর্শ করলেন প্রেমিকের মতো। সমস্ত বিষাদ আজ উড়ে যাচ্ছে উন্মুক্ত আকাশে। এই প্রথম তাঁর মনে হচ্ছে শরীরে ও মনে কোনো গ্নানি নেই। হালকা লাগছে নিজেকে। তিনি ঝুঁকে বিম্বিসারকে প্রণাম করতে গেলেন। বিম্বিসার তাঁকে বাঁধা দিলেন। দু’ হাতে তাঁর বাহু ধরে আবেগতাড়িত কণ্ঠে বললেন, “তোমার জায়গা ওখানে নয় আম্রপালী।”

বিম্বিসার তাঁর দুই বাহু প্রসারিত করে আম্রপালীকে আহ্বান জানালেন। সেই আহ্বানে সাড়া দিলেন আম্রপালী। আবদ্ধ হলেন মগধরাজের বলিষ্ঠ আলিঙ্গনে। এই স্পর্শে লালসা নেই। এই স্পর্শ কোনো পুরুষের নয়। এই স্পর্শ প্রেমিকের। পঁচিশ বছরের জীবনে এই প্রথম আম্রপালী এক অচেনা শিহরণের মুখোমুখি হলেন। একটু একটু করে সেই শিহরণকে উপভোগ করতে থাকলেন। তিনি জানতেন না শরীরও আসলে গাছেদের মতো। গ্রীষ্মের পর বর্ষা এলে গাছের পাতারা যেমন ভিজতে উন্মুখ হয়ে থাকে তেমনি শরীর ভেজে শরীরের উষ্ণতা মাখা স্পর্শে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *