ষোলো
বৈশালীর দক্ষিণ প্রান্তে এক বিশাল ভবন। নাম “আম্রকুঞ্জ”। শ্বেতপাথরের তৈরি প্রমোদভবনটি রাজপ্রাসাদের থেকে কোনো অংশে কম নয়। ভবনটির চারদিকে আম্রকুঞ্জ। আমগাছের ছায়ায় মাখামাখি ভবন চত্বর। সামনে প্রশস্ত খোলা প্রাঙ্গণ। প্রাঙ্গণ জুড়ে সবুজ মখমলী ঘাসজমি। সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে হরিণ ও ময়ূূরের দল। ভবনের সামনে খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি রথ। গোটা বৈশালী জানে এই ভবনটিতে বাস করেন নগরনটী আম্রপালী। আর প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে থাকা রথটি তাঁর বড় প্রিয়। সেই রথে চড়ে তিনি যখন বৈশালী নগরীর রাজপথে বের হন তখন প্রতিটি পুরুষের হৃদয়ে ঝড় ওঠে। লোকে বলে রাজপথে চাঁদ বেরিয়েছে। পুরুষের চোখে কামনার আগুন জ্বলতে দেখতে অভ্যস্ত আম্রপালী। সবাই তাঁকে আড়ালে ও নিভৃতে পেতে চায়। কিন্তু তিনি এখন রাজনর্তকী। সাধারণ পুরুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাঁর রূপের ছটার কাছে নতজানু বৈশালী নগরী। দূরদূরান্তের রাজ্যের ক্ষমতাবান পুরুষরা তাঁর সান্নিধ্য কামনা করেন। তাঁর প্রাসাদের সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকেন কখন তিনি একটু দেখা দেবেন। প্রাসাদের ভেতর বাইরের লোকের প্রবেশ নিষিদ্ধ। দ্বাররক্ষীরা কড়া পাহারায় থাকে। প্রাসাদের চারদিকে কড়া নিরাপত্তার ঘেরাটোপ। একটা সময় লিচ্ছবিরাজ যে সমস্ত পেয়াদাদের পাঠিয়েছিলেন আম্রপালীর নিরাপত্তার দেখভাল করার জন্য তাঁরা এখন আম্রপালীরই বশবর্তী। রাজার পেয়াদা হলেও তাঁরা এখন নিজেদের অজান্তেই নগরবধূর অনুগত রক্ষী। তিনি একবার মৃদু হাসলেই রক্ষীরা বিগলিত হয়ে ওঠে। আম্রপালীর খাস দেহরক্ষী মিশিরামের নেতৃত্বে তৈরি থাকে বিশেষ লেঠেল বাহিনী।
পুরুষরা তাঁকে কামনা করতেই পারেন। কিন্তু কোন পুরুষকে তিনি সঙ্গ দেবেন তা নির্বাচন করেন তিনি। সে অধিকার বা স্বাধীনতা তাঁর আছে। তিনি ইচ্ছে করলে হেলায় ফিরিয়ে দিতে পারেন বিপুল ক্ষমতাবান পুরুষকেও। তাঁর সঙ্গে রাত কাটাতে চান না এমন পুরুষ এ ভুবনে আর কজন আছেন?
তার শরীরের অমোঘ আকর্ষণ এড়িয়ে যেতে কেউ পারেননি। মগধরাজকেও ছুটে আসতে হয়েছিল তাঁর কাছে। লিচ্ছবি গোষ্ঠীর নেতারা পর্যন্ত এসে ভিখিরির মতোন দাঁড়ান তাঁর প্রাসাদের দরজায়। একটি রাতের সঙ্গ কামনা করেন। কিন্তু সব পুরুষকে কি তিনি তাঁর শরীরী বিভঙ্গে বশ করতে পেরেছেন? আম্রপালীর মনে পড়ে সেই তরুণ শ্রমণের কথা। সেই বর্ষণমুখরিত সকাল। দুটি শান্ত চোখ। গৌরবর্ণ শরীরে রক্তিম পোশাক। তাঁকে এই প্রাসাদে তুলে এনেও তো তিনি কিছুই করে উঠতে পারেননি। অনেক প্রলোভনেও জাগিয়ে তুলতে পারেননি সেই বৌদ্ধ ভিক্ষুর শরীরকে। জীবনে সেই প্রথম পরাজয় অনুভব করেছিলেন আম্রপালী। আর তারপরই তিনি ছুটে গিয়েছিলেন তথাগতর কাছে। কী অমলিন সুখ তাঁর সান্নিধ্যে। অদ্ভুত এক শান্তি ওই চোখের দৃষ্টিতে। বৈভব, ক্ষমতা, রূপ, যৌবন কোনো কিছুই যেন স্পর্শ করতে পারে না ওই মানুষটিকে। আম্রপালী নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিলেন তথাগতর কাছে। অথচ এ দেওয়ায় শরীরের কোনো ভূমিকা ছিল না। তিনি অনুভব করেছিলেন মানসিক তৃপ্তি কাকে বলে। বুদ্ধের শরণে নিজেকে সেদিন উৎসর্গ করেছিলেন। তথাগত তাঁকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, সময় হলে তিনি তাঁকে ঠিক ডেকে নেবেন। নিয়োগ করবেন সংঘের কাজে।
বুদ্ধের শরণে আসার পর থেকে আম্রপালীর এই বৈভব আর ভালো লাগে না। ভালো লাগে না অর্থের বিনিময়ে রাজপুরুষদের সঙ্গ দিতে। শরীরী বিভঙ্গে মেতে উঠতে। আম্রপালী জানেন যত বড় প্রাসাদেই তিনি থাকুন না কেন, যত বৈভবের অধিকারিণীই তিনি হন না কেন সমাজ তাঁকে একজন নগরবধূ হিসেবেই দেখে। তিনি কামনার বস্তু হতে পারেন, ভালোবাসার মানুষ নন। তাঁর এই বিত্ত ও প্রভাব নিয়ে আড়ালে-আবডালে অনেকেই গালমন্দ পাড়েন। আম্রপালীর শরীর আছে, রূপ আছে কিন্তু মনের হদিশ নেই। তিনি আদতে পণ্য। পণ্য বিক্রি হয়। পণ্যকে কেউ মনের অলিন্দে যত্ন করে সাজিয়ে রাখে না। পুরুষ তার কাছে শরীরের আনন্দ খুঁজতে আসে। ভালোবাসা নয়। আম্রপালীও ভালোবাসার মানে খোঁজা বন্ধ করে দিয়েছেন অনেকদিন আগেই। তবু বিম্বিসারকে তিনি ভালোবেসেছিলেন। তাঁর পুত্রের জননী হয়েছিলেন। সেই মগধরাজ পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে ছদ্মবেশে দেখা করতে এসেছিলেন। বণিকের ছদ্মবেশে। তাও কি নিজের পরিচয় গোপন রাখতে পেরেছিলেন সম্রাট বিম্বিসার? পারেননি। আম্রপালী জানেন সংসার তাঁর কপালে লেখেননি ঈশ্বর। ভালোবাসা মানে এক রাতের খেলা। বিম্বিসার তো চেয়েছিলেন তাঁকে মগধে নিয়ে যেতে। রাজরানি করে রাখতে। কিন্তু মানুষের চাওয়াগুলো এক রকম। আর ভাগ্যে লেখা থাকে আরেক। সংসার-সন্তান নিয়ে ঘর করতে গেলে এই বৈশালীর মাটি রক্তে ভিজবে। এক নারীর দখল নিয়ে ফের যুদ্ধ বাঁধবে। বৈশালীর মানুষের ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করতে পারেন না আম্রপালী। সে তাঁর অন্তরে যতোই বিচ্ছেদের রক্তক্ষরণ হোক না কেন? তাই তো সেদিন মা হরিবালার পরিকল্পনা অনুযায়ী মগধরাজ ও তাঁর বন্ধু পুরঞ্জয়কে মুণ্ডিতমস্তকে বৌদ্ধ ভিক্ষুর ছদ্মবেশে তাঁর প্রাসাদ থেকে মগধের উদ্দেশ্যে রওনা করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। লিচ্ছবিরাজের সেনারা বিন্দুমাত্র টের পাননি যে তাঁদের চোখের সামনে দিয়েই বৈশালী সীমান্ত পেরিয়ে চলে যাচ্ছেন মগধরাজ বিম্বিসার ও তাঁর বন্ধু পুরঞ্জয়। সেই শেষবার বিম্বিসারের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছিল। এই তেরো-চোদ্দ বছরে আর কখনও মগধরাজের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়নি। গোপনে তাঁর দূত মারফত মগধরাজ একাধিক বার আম্রপালীকে আহ্বান জানিয়েছেন কোন্দন্যকে নিয়ে মগধে চলে যেতে। কিন্তু আম্রপালী তাতে সাড়া দেননি।
একদিন ভরা সভায় তাঁকে নগ্ন হতে হয়েছিল রাষ্ট্রের স্বার্থের কাছে। একদল পুরুষ তাঁর জীবনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন। তাঁদের লালসা মেটাতে রাষ্ট্রের স্বার্থে তাঁকে নগরবধূ হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল ধীরে ধীরে। সেই কিশোরী বয়সের অপমানের দাগ আজও ভুলতে পারেননি আম্রপালী। তাঁর ইচ্ছের কোনো গুরুত্ব দেননি কেউ। ভরা বিধানসভায় সেদিন কার্যত ধর্ষিতা হয়েছিলেন রাজপুরুষদের চোখের দৃষ্টির সামনে। নৃত্যকলা সহ চৌষট্টি কলায় তালিম দিয়ে তাঁকে গড়ে তোলা হয়েছিল সমাজের উচ্চবিত্তের গণিকা হিসেবে। সেদিন বৈশালী বিধানসভা থেকে শ্রাবস্তীর গৃহে ফিরে হাপুস নয়নে কেঁদেছিলেন তিনি। রাগে, দুঃখে, অপমানে সেদিন রাতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আত্মহত্যা করার। কিশোরী বয়সের আবেগ বাধা মানেনি। হাতের শিরা কেটে চেষ্টা করেছিলেন আত্মহত্যা করতে। কিন্তু ঠিক সেই সময়ে মহানমা ও হরিবালা এসে পড়েছিলেন তাঁর ঘরে। তাঁরা চেয়েছিলেন মেয়েকে নিয়ে বৈশালী ছেড়ে মগধে পালাতে। কিন্তু কোনোটাই হয়নি। না তাঁকে নিয়ে পালাতে পেরেছিলেন তাঁর বাবা-মা, না তাঁর আত্মহত্যা করা হয়েছিল। শেষে লিচ্ছবিদের নির্দেশে তাঁদের শ্রাবস্তী ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল বৈশালীর নির্দিষ্ট প্রাসাদে। সেখানে শুরু হয়েছিল তাঁর তালিম। চোখের সামনে এসব দেখতে দেখতে একদিন বাবা মারা গেলেন। এখন তাঁর নিজের বলতে মা আর কোন্দন্য। আম্রপালী চান না কোন্দন্যর ওপর কোনো বিপদ ঘনিয়ে আসুক। তাই তিনি বরাবর গোপন করে এসেছেন সন্তানের পিতৃপরিচয়। সম্রাট বিম্বিসার বারবার খবর পাঠানো সত্ত্বেও কোন্দন্যকে তিনি মগধে পাঠাতে রাজি হননি। মগধরাজ চেয়েছিলেন বড় হয়ে মগধের সিংহাসনে বসুক কোন্দন্য। কিন্তু আম্রপালী চাননি সন্তানকে হারাতে। তিনি জানতেন কোন্দন্য মগধে গেলেই তাকে হত্যা করা হবে। বিম্বিসার ও মহারানি চেলনার পুত্র অজাতশত্রু মগধের সিংহাসনের প্রবল দাবিদার। প্রয়োজনে তিনি তাঁর পিতাকে খুন করতেও পিছপা হবেন না। বিম্বিসারের পুত্র হলেও অজাতশত্রু আদৌ পিতার মতো হননি। সেই তরুণ বয়স থেকেই তিনি ক্ষমতালিপ্সু। বাবার মতো শিল্পকলা নিয়ে তাঁর বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই।
কোন্দন্য তাঁর পুত্র। আম্রপালী জানেন কোন্দন্যকে নিয়ে বৈশালীর মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। নানা মানুষের নানা প্রশ্ন। কে এই সন্তানের পিতা? এই প্রশ্নের উত্তরে আম্রপালীর কঠিন জবাব, “কোন্দন্য আমার পুত্র, এটাই ওর পরিচয়।”
আম্রপালীর খাস পরিচারিকা অবন্তিকাই কোন্দন্যকে মানুষ করেছেন ছোট থেকে। তিনি অবন্তিকার ওপর ভরসা করতেন। মাস কয়েক আগে হঠাৎ করে অবন্তিকার মৃত্যু আম্রপালীকে আরও একা করে দিয়েছে। কোন্দন্যকে এখন তিনিই আগলে রাখেন। অবন্তিকার রহস্যজনক মৃত্যু ভয় পাইয়ে দিয়েছে আম্রপালীকে। দীর্ঘদিনের সাথীকে হারিয়ে তিনি এখন নিঃসঙ্গ। তবে কি তাঁর সাধের ‘আম্রকুঞ্জ’-এর ভেতর নীরবে বোনা হচ্ছে ষড়যন্ত্রের জাল?
