নগরবধূ আম্রপালী – ২০

 কুড়ি

এতো আয়োজন কিন্তু তথাগত প্রায় কিছুই খেলেন না। হরিবালা মাটিতেই আসন পেতে খাবার পরিবেশনের ব্যবস্থা করেছিলেন। ভিক্ষু শুদ্ধসত্ত্ব হরিবালাকে আগেই বলে রেখেছিলেন এই ব্যবস্থা করতে। শুদ্ধসত্ত্ব এই প্রাসাদে এর আগে গোটা বর্ষাকাল কাটিয়ে গিয়েছেন। তাঁর কাছে এই প্রাসাদ ও প্রাসাদের বাসিন্দারা নতুন নয়। শুধু ইরাবতী ও চন্দ্রাবতী নামের ওই দুই তরুণী দাসীকে এর আগের বার দেখেননি তিনি। আম্রপালীর সঙ্গে শুদ্ধসত্ত্বের সম্পর্ক এখন বেশ সাবলীল। তথাগতর প্রিয় শিষ্যদের মধ্যে একমাত্র শুদ্ধসত্ত্বই আম্রপালীর পূর্ব পরিচিত। শুদ্ধসত্ত্ব জেনে গিয়েছেন যে, আম্রপালী তাঁর সমস্ত সম্পত্তি সংঘে দান করেছেন। সব ছেড়ে ভিক্ষুণীর জীবন কাটাতে চান তিনি। শুদ্ধসত্ত্ব মনে মনে এই নারীটিকে এখন শ্রদ্ধা করেন।

তথাগত সহ তাঁর প্রিয় চার শিষ্য এক পংক্তিতেই খেতে বসেছিলেন। ভিক্ষু সারিপুত্ত, ভিক্ষু আনন্দ, ভিক্ষু উপালি এবং ভিক্ষু শুদ্ধসত্ত্ব তৃপ্তি করেই খেয়েছেন। সে কথা তাঁরা খোলখুলি জানাতে দ্বিধা করেননি। শুধু এক জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে থেকেছেন ভিক্ষু শুভব্রত। আম্রপালী তাঁকে অনুরোধ করে বলেছিলেন, “এই ভরদুপুরে কিছু একটু অন্তত মুখে দিন। নাহলে যে আমার অকল্যাণ হবে।”

ঠান্ডা গলায় শুভব্রত জানিয়েছিলেন, তিনি বৌদ্ধবিহার থেকে সকালবেলায় খেয়ে এসেছেন। এখন আর তাঁর খিদে নেই।

আম্রপালী ও হরিবালা বারবার তাঁকে কিছু মুখে দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছিলেন দেখে তথাগত বলে উঠেছিলেন, “ওকে ছেড়ে দাও মা। ওর নিশ্চয়ই খিদে নেই। খিদে পেলে ও নিজেই চেয়ে খাবে।”

আম্রপালী আবদারের সুরে তথাগতকে বললেন, “আমি শুনেছি আপনি পায়েস পছন্দ করেন। আমি নিজের হাতে আপনাকে একটু পায়েস খাওয়াতে চাই।”

“আচ্ছা বেশ। অল্প একটু দিও।”

তথাগতর কথা শেষ হতেই কাঠের রেকাবি নিয়ে ঘরে ঢুকল ইরা ও চন্দ্রা। রেকাবিতে সাজানো কয়েকটি মাটির পাত্র। তাতে রয়েছে পায়েস। আম্রপালী হাত বাড়ালেন একটি পাত্রের দিকে।

“আমিও পায়েস খাব।” বলতে বলতে ঘরের ভেতর দৌড়ে এল কোন্দন্য।

তথাগত আম্রপালীকে বললেন, “ওকে আগে খাইয়ে দাও মা। তারপর আমি খাব।”

এমন সময় মিশিরাম দরজায় এসে দাঁড়াল। আম্রপালী অবাক হয়ে তাকালেন। মিশিরাম হাত জোড় করে বললেন, “অপরাধ নেবেন না মা। ওই পায়েস আগে ওদের খেতে বলুন।”

আম্রপালী মিশিরামকে ধমক দিয়ে বললেন, “কী যা তা বলছ! এ পায়েস আমি সাধ করে তৈরি করেছি ভগবান বুদ্ধকে নিজের হাতে খাওয়াব বলে। ইরা ও চন্দ্রা আগে খাবে মানে?”

মিশিরাম কঠিন গলায় বলে উঠলেন, “ওই পায়েসে বিষ মেশানো আছে। ওদেরই আগে খেতে বলুন।”

“কী বলছ কী তুমি?” আঁতকে উঠলেন আম্রপালী। তাঁর হাতে ধরা মাটির পাত্র কেঁপে উঠল। তার থেকে কিছুটা পায়েস ছলকে পড়ল মার্বেল পাথরে বাঁধানো মেঝেতে।

“কে মিশিয়েছে বিষ? কে মিশিয়েছে বলো?” উত্তেজনায় আম্রপালীর থরথর করে কাঁপছেন। খেয়াল করলেন না মেঝেতে পড়ে থাকা পায়েস চেটে খেতে ঘরে ঢুকে পড়েছে তাঁর এক পুষ্যি বেড়াল।

স্তম্ভিত মুখে বসে আছেন তথাগত। তাঁর প্রিয় শিষ্যরা একে অন্যের মুখের দিকে তাকাচ্ছেন। কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না তাঁরা।

কাঠের রেকাবি হাতে স্থির মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে আম্রপালীর দুই খাস দাসী ইরা ও চন্দ্রা। মিশিরাম ঘরে ঢুকে এগিয়ে গেল তাদের দিকে। “মা আপনার নিজের ঘরেই শত্রুর প্রবেশ ঘটেছিল। আপনি টের পাননি। উলটে আপনি তাদের স্নেহ-ভালোবাসা দিয়ে আপন করে নিয়েছিলেন। আপনার এই দুই খাস দাসী আজ পায়েসে বিষ মিশিয়ে নিয়ে এনেছে।”

মিশিরামকে থামাতে গর্জে উঠল ইরা ও চন্দ্রা। “ডাহা মিথ্যে বলছে দিদি। আমরা বিষ মেশাতে যাব কেন?”

মিশিরাম চিতার মতো ক্ষিপ্র ভঙ্গিতে কোমরে গোঁজা ধারাল ছুরিটা নিমেষে বের করে ইরার গলায় চেপে ধরল। ইরার হাত থেকে ছিটকে পড়ল কাঠের রেকাবি। মাটিতে পড়ে ভেঙে গেল পায়েস ভর্তি মাটির পাত্রগুলো। ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে রইল বিষাক্ত পায়েস। সবাই সেদিকে তাকাতেই দেখলেন আম্রপালীর পুষ্যি বিড়ালটি ইতিমধ্যেই সেই পায়েস মুখে দিয়ে মারা গিয়েছে।

মিশিরামের হাতে ধরা ছুরির ধার ক্রমশ চেপে বসছে ইরার গলায়। সে ছটফট করছে মিশিরামের হাত থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য। মিশিরাম বলল, “অনেকদিন ধরেই এই দুজনকে আমি দেখেছি প্রাসাদের অভ্যন্তরে সন্দেহজনক ভাবে ঘোরাঘুরি করতে। কোন্দন্যর ওপর নজরদারি চালাতে দেখেছি। সন্দেহ আমার ছিলই। কিন্তু আপনাকে বললে আপনি আমায় বিশ্বাস করতেন না। রাতের অন্ধকারে ওদের দুজনকে আমি প্রাসাদের পিছন দিক দিয়ে বাইরে যেতেও দেখেছি। আর আজ যখন আপনাকে পাকশালায় আমি ডাকতে এলাম তখন দেখি ওরা সেখানে। আপনি তথাগতর কাছে গেলেন। আমি আপনার পিছু নিলাম না। দাঁড়িয়ে রইলাম আড়ালে। নজর রাখছিলাম এই দুজনের ওপর। দেখছিলাম, ফিসফিস করে নিজেদের মধ্যে কিছু কথা বলছিল ওরা। তারপর কাঁচুলির ভেতর থেকে একটা মোড়ক বের করল একজন। অন্যজন তা মিশিয়ে দিল পায়েসের হাঁড়িতে। তখন আমি ধরলে বিষয়টা হাতে-নাতে ধরা হত না। তাই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করছিলাম।”

আম্রপালী দু’ হাতে মুখ ঢেকে মেঝেতে বসে পড়লেন। তাঁর সামনেই নিথর পুষ্যির দেহ। বার কয়েক প্রিয় পুষ্যির নিথর শরীরে হাত বোলালেন। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বললেন, “তোরা আমার এতো বড় সর্বনাশ করতে চাইছিলিস কিসের জন্য? তোদের রাস্তা থেকে তুলে এনে আশ্রয় দিয়েছিলাম। কোনো কিছুর অভাব রাখিনি। তাও তোরা আমার এতো বড় ক্ষতি করতে চেয়েছিলি!”

মাকে কাঁদতে দেখে ঘাবড়ে গেল কোন্দন্য। সে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরল। আম্রপালী পুত্রকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।

“আমি আপনাকে আগেই সাবধান করেছিলাম তথাগত। বারণ করেছিলাম এখানে আসতে। আপনি আমার কথা শুনলেন না।” এ সব দেখেশুনে মুখ খুললেন শুভব্রত।

তথাগত উঠে দাঁড়ালেন। হাতের ঈশারায় শুভব্রতকে থামতে বললেন। এগিয়ে গেলেন ইরা ও চন্দ্রার দিকে। ইরার গলায় ধরা মিশিরামের ধারাল ছুরি। সামান্য চাপ দিলেই রক্তপাত অবশ্যম্ভাবী। পাশেই রেকাবি হাতে দাঁড়িয়ে চন্দ্রা। তথাগত মিশিরামকে বললেন ইরাকে ছেড়ে দিতে।

মিশিরাম তথাগতর নির্দেশ মেনে ইরাকে ছেড়ে দিলেন। চন্দ্রার রেকাবি থেকে এক পাত্র পায়েস নিজের হাতে তুলে নিয়ে তথাগত বললেন, “এই বিষাক্ত পায়েস আমি খেলে তোমরা কি শান্তি পাবে? তোমাদের জীবনের সব সমস্যা যদি মিটে যায় তাহলে আমি এই পায়েস খেতে রাজি আছি।”

“প্রভু, এ কী করছেন?” একসঙ্গে চিৎকার করে উঠলেন ভিক্ষু সারিপুত্ত, ভিক্ষু আনন্দ, ভিক্ষু উপালি এবং ভিক্ষু শুদ্ধসত্ত্ব।

তথাগত যেন শুনতেই পেলেন না শিষ্যদের চিৎকার। তিনি শান্ত কণ্ঠে বললেন, “বলো মা, তোমরা কে? কী তোমাদের পরিচয়? কেনই বা তোমরা এ কাজ করলে?”

এবার ভেঙে পড়ল ইরা। সে তথাগতের পায়ের কাছে বসে বলল, “আমাদের ক্ষমা করে দিন প্রভু। অর্থের লোভে এ কাজ করতে রাজি হয়েছিলাম। এখন ফিরে গেলে আমাদের মৃত্যু নিশ্চিত। আপনি রক্ষা করুন আমাদের।”

তথাগত ইরার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “বেশ তো। আমি তোমার হাতে এই পায়েস খাচ্ছি। তাহলেই তো তোমাদের কার্যসিদ্ধি হবে।”

কাঠের রেকাবি নিচে নামিয়ে রেখে চন্দ্রাও হাঁটু গেড়ে বসল তথাগতর সামনে। ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে বলল, “আমাদের মেরে ফেলুন প্রভু। আমরা ফিরে গেলেও আমাদের মৃত্যুদণ্ডই হবে। আমাদের বাঁচার সব পথ বন্ধ।”

তথাগত বললেন, “কে পাঠিয়েছে তোমাদের? কী তোমাদের উদ্দেশ্য?”

চন্দ্রা কাঁপা গলায় জানাল, “মগধের রাজপুত্র অজাতশত্রু। আমরা আদৌ গণিকা নই। মগধের মহারানি চেলনার দাসী ছিলাম প্রভু। একদিন দুজনে আমাদের ডাকলেন। নির্দেশ দেওয়া হল দাসী সেজে প্রবেশ করতে হবে আম্রপালীর বাসভবনে। ধীরে ধীরে তাঁর মন জয় করে হয়ে উঠতে হবে তাঁর খাস দাসী। এই প্রমোদভবনের সব খবর মগধে পাচার করা ছিল আমাদের কাজ। আম্রপালীর কাছের লোক হয়ে উঠতে অবন্তিকাকে আমরাই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিয়েছিলাম। আমাদের বলা হয়েছিল আপনি এই প্রাসাদে অতিথি হয়ে আসবেন। তখন যেভাবেই হোক খাবারে বিষ মিশিয়ে আপনাদের সবাইকে হত্যা করতে হবে।”

“কিন্তু আমাদের সবাইকে হত্যা করে কী লাভ তোমাদের যুবরাজের?” প্রশ্ন করলেন তথাগত।

এবার ইরা বলে উঠল, “আপনাদের নয়। মূল উদ্দেশ্য ছিল কোন্দন্যকে পৃথিবী থেকে সরানো। আর আম্রপালীকে বৈশালীর মানুষের কাছে খলনায়িকা হিসেবে তুলে ধরা। তাই এই ভাবেই পরিকল্পনা সাজানো হয়েছিল। কোন্দন্যকে আমরাই এ ঘরে পাঠাই। বলি মা’র কাছে গিয়ে পায়েস খেয়ে আসতে। উদ্দেশ্য ছিল আম্রপালী নিজের হাতে ছেলেকে বিষাক্ত পায়েস খাওয়াবেন। একই সঙ্গে সবাই জানবে তথাগতকে নিজের প্রমোদভবনে ডেকে এনে বিষ খাইয়ে হত্যা করেছেন বৈশালীর নগরবধূ।”

বিম্বিসারকে তথাগত চেনেন। তিনি জানেন এই ষড়যন্ত্র বিম্বিসারের অজান্তেই রচিত হয়েছে। পিতাকে আড়ালে রেখে অজাতশত্রু মগধে ইদানীং নিজের ক্ষমতা বিস্তার করছেন। আর তাঁকে মদত দিচ্ছেন মহারানি চেলনা। এবারের গ্রীষ্মে মগধে অতিথি হয়ে গিয়ে বিম্বিসারের অসহায়তার কথা টের পেয়েছিলেন তথাগত। তিনি জানেন অচিরেই বিম্বিসারকে বন্দি করে তাঁর পুত্র অজাতশত্রুই মগধের সিংহাসনে বসবেন। তথাগত কোন্দন্যর দিকে তাকালেন। কোন্দন্য মা’র বুকে মুখ গুঁজে আছে। আম্রপালী অসহায় ভাবে চোখের জল ফেলছেন। তথাগত ভাবলেন ভাগ্যের ফেরে মা ও পুত্র এক কঠিন ফাঁদে আটকে পড়েছেন। এদের রক্ষা করতে গেলে এখানে রাখলে চলবে না।

তথাগতকে চুপ করে থাকতে দেখে শুদ্ধসত্ত্ব বললেন, “এরা এখানে এল কী করে? আমি আগের বার যখন এসেছিলাম তখন তো এদের এখানে দেখিনি।”

মিশিরাম জানাল, “মা-ই এদের এনে তুলেছিলেন এখানে। কাজ দিয়েছিলেন। আশ্রয় দিয়েছিলেন।”

ইরা ফের জানাল, “ওটাও পরিকল্পনা করেই করা। আমরা ইচ্ছে করেই ওর রথের সামনে এসে পড়েছিলাম। আমাদের ওপর নির্দেশ ছিল বৈশালীতে ঢুকে যেমন করে হোক আম্রকুঞ্জে আস্তানা গাড়তে হবে। ধীরে ধীরে হয়ে উঠতে হবে আম্রপালীর খাস দাসী। তারপর অপেক্ষা করতে হবে সঠিক দিনের। আমরা অর্থের লোভে কাজটা করতে রাজি হয়েছিলাম ঠিকই কিন্তু পরে আর ফেরার উপায় ছিল না। কাজ না করে মগধে ফিরলে মৃত্যু নিশ্চিত। আমরা পাপী। আমাদের বাঁচান প্রভু।”

“মৃত্যু এখানেও নিশ্চিত তোমাদের।” হিসহিস করে বলে উঠল মিশিরাম। তারপর আম্রপালীর দিকে তাকিয়ে অনুমতি চাওয়ার ভঙ্গিতে বলল, “এদের নিয়ে যাই মা। এদের শাস্তি দেবে লিচ্ছবিরাজ। রাজার সেনার হাতে এদের তুলে দিলেই হবে।”

.

তখন অনেক রাত। আম্রকুঞ্জে সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। জেগে আছে শুধু দ্বাররক্ষীরা। সেই সময় মূল ফটকের সামনে ঘোড়ায় চড়ে এসে দাঁড়াল চার সশস্ত্র যুবক। বলিষ্ঠ চেহারা। পরনে রক্ষীর পোশাক। তারা প্রবেশ করতে চাইল ‘আম্রকুঞ্জ’-এর ভেতর। বাধা দিল দ্বাররক্ষীরা। জানতে চাইল, কী তাদের পরিচয়? আগন্তুকরা জানাল, তারা বৈশালীর রাজদরবার থেকে এসেছে। আম্রকুঞ্জে অতিথি হিসেবে আছেন তথাগত। তাঁর নিরাপত্তার স্বার্থেই এই বিশেষ ব্যবস্থা। বৈশালীরাজ পাঠিয়েছেন জেনে দ্বাররক্ষীরা ওই আগন্তুকদের আর আটকাল না। রাতের অন্ধকারে আম্রকুঞ্জের ভেতর বিনা বাধায় প্রবেশ করল চার যুবক। তারা জানে, দ্রুত তাদের কাজ সেরে চলে যেতে হবে বৈশালী ছেড়ে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *