তেরো
মগধরাজ বিম্বিসারের এই স্পর্ধা কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না লিচ্ছবিরাজ জয়ন্ত। আজ মাস তিনেক বিম্বিসার বৈশালীতে ঘাপটি মেরে রয়েছেন অথচ তাঁরা কেউ কিছু জানতে পারেননি। এ তো বজ্জিয়ান প্রজাতন্ত্রের ব্যর্থতা। নগররক্ষী, দ্বাররক্ষী, সেনা, গুপ্তচরেরা কেউ কিছু জানতে পারেনি। আশ্চর্য! বিম্বিসার যে বীর ও ধূর্ত সেটা তিনি জানেন। কিন্তু সবার চোখে ফাঁকি দিয়ে বৈশালীতে ঢুকে আম্রপালীর প্রমোদভবনে এতোদিন কাটাচ্ছেন এ কী ছেলেখেলা নাকি? এই নিয়ে আজ বিধানসভায় বিস্তর চেঁচামেচি হয়েছে। সমালোচনা হয়েছে সেনাধ্যক্ষেরও। খোঁজ নেওয়া হচ্ছে কাকে কাকে উৎকোচ দিয়ে বিম্বিসার আম্রপালী পর্যন্ত পৌঁছেছে? আম্রপালীর ভূমিকা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। আম্রপালী এখন রাজনর্তকী। তিনি শুধু নগরবধূ নন। তাঁকে এই বিধানসভা বৈশালীর জনপদকল্যাণকারী হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তিনি কেন বৈশালীর শত্রু বিম্বিসারকে তাঁর প্রমোদভবনে অতিথি হিসেবে থাকতে দিয়েছেন? তবে গুপ্তচরসূত্রে জয়ন্ত জানতে পেরেছেন বিম্বিসার নাকি তাঁর পরিচয় গোপন করে বণিকের ছদ্মবেশে আম্রপালীর কাছে গিয়েছিলেন। আম্রপালীর বিম্বিসারকে চেনার কথা নয়। জানা গিয়েছে বিম্বিসারকে সাহায্য করেছে পুরঞ্জয়। দেশদ্রোহী পুরঞ্জয় বৈশালীকে হাতের তালুর মতো চেনে। নিজের প্রাসাদের অলিন্দে প্রচণ্ড উত্তেজিত ভাবে পায়চারি করছিলেন জয়ন্ত। মনে মনে ভাবছিলেন বিম্বিসার যখন একবার বৈশালীতে ঢুকে পড়েছেন তখন তাঁকে আর জাল কেটে বেরোতে দেওয়া যাবে না। আজই তিনি বিধানসভায় আলোচনা করে আম্রপালীর ওই প্রমোদভবনে সেনা পাঠানোর প্রস্তাব অনুমোদন করিয়েছেন। সেনাপ্রধানকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে আম্রপালীর প্রমোদভবন সেনা দিয়ে ঘিরে ফেলতে। যেভাবেই হোক বিম্বিসার আর পুরঞ্জয়কে গ্রেফতার করে এনে বিধানসভায় পেশ করতে হবে। প্রয়োজনে তাঁদের হত্যা করতেও দ্বিধা না করতে। বিম্বিসারকে এই সুযোগে জব্দ করতে পারলে গোটা মগধের অধিকারও তাঁদের হাতে চলে আসবে। তাঁর অনুপস্থিতিতে মগধের সেনারা দিশেহারা হয়ে পড়বে। বিম্বিসারের তরুণ পুত্র অজাতশত্রু কতদিন আর বৈশালীর সেনাদের ঠেকিয়ে রাখতে সক্ষম হবে? জয়ন্ত ভাবলেন একদিকে আম্রপালী তাঁদের উপকারই করেছেন। বিম্বিসারকে এভাবে অরক্ষিত পাওয়া তাঁদের কাছে ভাগ্যের ব্যাপার। সুতরাং এই সুযোগ কাজে লাগাতেই হবে।
আম্রপালী আশঙ্কা করেছিলেন এরকমই একটা কিছু ঘটবে। মগধরাজকে তিনি বারংবার অনুরোধ করেছিলেন রাতের অন্ধকারে ফিরে যেতে। কিন্তু তাঁর এক দাবি, “তোমাকে ছাড়া মগধে ফিরব না। তুমিও চলো আমার সঙ্গে। আমি তোমাকে বিবাহ করতে চাই। দিতে চাই রানির মর্যাদা।”
আম্রপালী বিম্বিসারকে ভালোবেসেছেন। জীবনে প্রথমবার কাউকে ভালোবেসেছেন তিনি। তাঁর সন্তানের জননী হতে চলেছেন। এ কথা শোনার পর থেকেই বিম্বিসার আরও জেদ ধরেছেন তাঁকে নিয়ে মগধে চলে যাওয়ার। কিন্তু আম্রপালী জানেন, তাঁর মুক্তি নেই। সংসার তাঁর কপালে লেখেননি ঈশ্বর। তবু তিনি মা হওয়ার অনুভূতিটুকু পেতে চান। তাই বিম্বিসারকে ভালোবেসে তিনি তাঁর সন্তান গর্ভে ধারণ করেছেন। এর জন্য অনেক ঝড়ঝাপটা তাঁকে সামলাতে হবে। তাও তিনি জানেন। কিন্তু বৈশালী ছেড়ে তিনি পালাতে পারবেন না। তিনি নরম হলেই বিম্বিসার বৈশালী আক্রমণ করবেন। মগধরাজের বন্ধু পুরঞ্জয় সেভাবেই পুরো ছক সাজিয়ে রেখেছেন। বিম্বিসারের কাছ থেকে তিনি শুনেছিলেন কীভাবে তাঁরা দুজনে মগধ থেকে বৈশালীতে ছদ্মবেশে প্রবেশ করেছিলেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শুধু তাঁর জন্য মগধরাজ বৈশালী এসেছেন। এ মানুষকে ভালো না বেসে পারা যায়? আম্রপালী লোক পাঠিয়ে পুরঞ্জয়কে নিয়ে এসেছিলেন তাঁর প্রাসাদে। বিম্বিসারের মতো সমান মর্যাদায় তাঁর থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত করেছেন। কিন্তু এভাবে কদিন? তাঁর প্রমোদভবনে লিচ্ছবিদের চর নজর রাখে। প্রাসাদের রক্ষীদের মধ্যেও মিশে আছে লিচ্ছবিদের বেতনভুক কর্মী। প্রাসাদের অভ্যন্তরে কী হচ্ছে না হচ্ছে তার খবরাখবর রাখাই তাদের কাজ। ফলে যতই তিনি বিম্বিসার ও পুরঞ্জয়কে তাঁর খাসমহলে লুকিয়ে রাখুন না কেন লিচ্ছবিদের কানে এ খবর পৌঁছতোই। এখন আম্রপালীর দুশ্চিন্তা হচ্ছে কী করে তিনি বিম্বিসার ও পুরঞ্জয়কে বৈশালীর সীমানা পার করিয়ে মগধে পৌঁছে দেবেন। বিম্বিসার ও পুরঞ্জয় তাঁর অতিথি। তাঁদের অক্ষত অবস্থায় মগধে পৌঁছে দেওয়াটা তাঁর কর্তব্য। নাছোড়বান্দা বিম্বিসার বেপরোয়া। তাঁর এক কথা, “তুমি শুধু হ্যাঁ বলো। আমি বৈশালী জয় করে তোমাকে মগধে নিয়ে যাব। আমার সেনারা সীমান্তে অপেক্ষা করছে।”
সেই কিশোরী অবস্থায় তাঁকে কে দখল করবে তা নিয়ে শ্রাবস্তীতে রক্ত ঝরতে দেখেছিলেন আম্রপালী। তাঁর জন্য বৈশালীতে ক্ষত্রিয়গোষ্ঠীগুলির মধ্যে গৃহযুদ্ধ বাধার উপক্রম হয়েছিল। আবার তাঁর জন্য যুদ্ধ বাঁধুক তা চান না আম্রপালী। বৈশালী তাঁর জন্মভূমি। নিজের সুখের জন্য বৈশালীর মাটিতে রক্ত ঝরতে দেবেন না তিনি। একটা সংসার গড়তে গিয়ে শত শত সংসারে তিনি কান্নার রোল ওঠাতে পারবেন না।
প্রাসাদের অলিন্দ থেকে বাইরে তাকালেন আম্রপালী। তিনি যা সন্দেহ করেছিলেন ঠিক তাই। তাঁর প্রাসাদের সীমানার ধার ঘেঁষে সশস্ত্র রক্ষীরা জমায়েত হচ্ছেন। আম্রপালী বুঝলেন প্রথমে প্রাসাদের চারপাশ নিঃশব্দে ঘিরে ফেলছে লিচ্ছবি সেনা। তারপর সেনারা প্রাসাদের অভ্যন্তরে প্রবেশের অনুমতি চাইবে তাঁর কাছে। অনুমতি তাঁকে দিতেই হবে। না দিলে সেটা হবে দেশদ্রোহিতার সামিল। বড় জোর বিশেষ ক্ষমতাবলে কিছুটা সময় তিনি আটকে রাখতে পারেন। আম্রপালী বুঝলেন সময় আগত।
হরিবালা মেয়ের মন বোঝেন। তিনি জানেন মেয়ে বিম্বিসারকে ভালোবেসে ফেলেছে। তাঁর সন্তানের মা হতে চলেছে। এই সময় দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ শরীরের পক্ষে ভালো নয়। তিনি নিজে মা হতে পারেননি তো কী হয়েছে মেয়ের পাশে থেকে সাহস জুগিয়ে গিয়েছেন। গর্ভে তিনি আম্রপালীকে ধারণ করেননি ঠিকই কিন্তু সে তো তাঁরই সন্তান। তাই মেয়েকে ওভাবে অলিন্দে উদ্বিগ্ন মুখে ঘোরা ফেরা করতে দেখে মেয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। তাঁকে দু’ হাতে জড়িয়ে বুকে টেনে নিলেন।
“চিন্তা করিস না মা। তোর সন্তানের কথা ভেবে তোর সুস্থ থাকাটা জরুরি।” মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরেই কথাগুলো বলে উঠলেন হরিবালা।
আম্রপালী মাকে আঁকড়ে ধরলেন। “মগধরাজকে অক্ষত অবস্থায় মগধে ফেরানোর ব্যবস্থা করতেই হবে মা। নাহলে আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না।”
মেয়ের মাথায় স্নেহের হাত বোলাতে বোলাতে হরিবালা বললেন, “তুই ওঁদের খবর পাঠা। বল তৈরি থাকতে। আজকের মধ্যে যে কোনো সময় ওঁদের বৈশালীর সীমানা পার হতে হবে।”
আম্রপালী মা’র বাহুডোর থেকে নিজেকে মুক্ত করে কান্নাভেজা গলায় বললেন, “কী করে তা সম্ভব মা? চারদিকে লিচ্ছবি সেনা ঘিরে রেখেছে। যে কোনো সময় ওরা এই প্রাসাদের অভ্যন্তরে ঢোকার অনুমতি চাইবে। এ দিকে মগধরাজ ও তাঁর বন্ধু সম্পূর্ণ নিরস্ত্র।”
হরিবালা দোতলার অলিন্দ থেকে বাইরের দিকে তাকালেন। এখান থেকে প্রাসাদের বাইরেটা অনেকটা দেখা যায়। শীতের বেলা ছোট। দুপুরের রোদ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। মেঠো পথ দিয়ে কয়েকজন বৌদ্ধ ভিক্ষু রক্তিম পোশাকে হেঁটে যাচ্ছেন। কাঁধে তাঁদের ঝোলা। হরিবালা শুনেছেন এক শাক্য রাজপুত্র স্বেচ্ছায় তাঁর রাজ্যপাট ছেড়ে দিয়ে সন্ন্যাসজীবন বেছে নিয়েছেন। বেশ কয়েক বছর হল তিনি বোধিলাভ করেছেন। তিনি এখন ভগবান বুদ্ধ। সেই যুগপুরুষের নাকি অনেক মহিমা। তাঁকে সবাই তথাগত বলে ডাকে। বৈশালীর লিচ্ছবিরা পর্যন্ত তাঁর অনুগামী। তাঁর শিষ্যরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে ভিক্ষাবৃত্তি করেন। বৈশালীতে তাঁরা একটা বৌদ্ধবিহার তৈরি করেছেন। সেখানে তথাগতর শিষ্যরা ধর্মচর্চা করেন। তথাগতও মাঝে মাঝে সেখানে আসেন। যদিও হরিবালা কোনোদিন তথাগতকে দেখেননি।
বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মন্থরভাবে হেঁটে যাওয়ার দৃশ্য দেখতে দেখতে মেয়েকে আশ্বস্ত করে হরিবালা বললেন, “ওঁদের তৈরি থাকতে বল আর বাকিটা আমার ওপর ছেড়ে দে।”
অলিন্দ থেকে মেয়েকে ঘরে নিয়ে এলেন হরিবালা। এক দাসীকে ডাকলেন। বললেন, অবিলম্বে একজন ক্ষৌরকারকে প্রাসাদের অভ্যন্তরে পাঠাতে।
নিজের ঘরে অস্থির ভাবে পায়চারি করছিলেন পুরঞ্জয়। ভাবছিলেন কী করে নিরাপদে বৈশালী ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া যায়। প্রাসাদের চারদিক ঘিরে ফেলেছে লিচ্ছবি সেনা। যে কোনো মুহূর্তে ওরা প্রাসাদের ভেতর চলে আসতে পারে তাঁদের খোঁজে। এ দিকে বিম্বিসার তাঁকে কিছুতেই বৈশালী আক্রমণের অনুমতি দিচ্ছেন না। এই বিপদেও শান্ত তিনি। বলছেন, “আমি তথাগতর শরণ নিয়েছি পুরঞ্জয়। আমার কোনো ক্ষতি হবে না। আমি বৈশালী দখল করতে আসিনি। আমি আম্রপালীর ভালোবাসা পেতে এসেছি। ও আমার সন্তানের জননী হতে চলেছে। ওকে মগধে নিয়ে যাওয়ার সব রকম চেষ্টা করছি।”
পুরঞ্জয় জানেন সম্রাট বিম্বিসার ভগবান বুদ্ধের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছেন। বছর পাঁচেক আগে তথাগত বোধিলাভ করেছেন। মগধে তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয়। তথাগত মগধে এলে বিম্বিসার নিজে গিয়ে তাঁকে প্রাসাদে নিয়ে আসেন। বছর চল্লিশের সৌম্যকান্তি তথাগতকে পুরঞ্জয় শ্রদ্ধা করেন। শুধুমাত্র ভালোবাসা দিয়ে মানুষটি এই বয়সেই হাজার হাজার মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। অন্য দিকে বিম্বিসারের হৃদয়ে আম্রপালীর জন্য ভালোবাসা জেগে উঠতেই তিনি তাঁর আগ্রাসী মনোভাব ছেড়ে বেরিয়ে এসেছেন। পুরঞ্জয়ের মনে আছে এই বিম্বিসারই তাঁর প্রাসাদে বসে তাঁকে বলেছিলেন, আম্রপালীকে মগধে নিয়ে আসার জন্য বৈশালীর সঙ্গে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে। আর আজ তিনি আম্রপালীকে পেতে ব্যাকুল হলেও বৈশালীর সঙ্গে যুদ্ধে যেতে নারাজ।
এই পরিস্থিতি যে হতে পারে তা আগেই আন্দাজ করেছিলেন পুরঞ্জয়। তিনি ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে মগধের সেনাদের তৈরি থাকতে বলেছিলেন। কিন্তু বিম্বিসার তাঁদের বৈশালীতে অনুপ্রবেশের অনুমতি দিচ্ছেন না। এ ব্যাপারে বিম্বিসারের বক্তব্য, আম্রপালী চান না বৈশালীতে মগধের সেনারা প্রবেশ করুক। তাহলে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী। যুদ্ধ এড়াতে চান পুরঞ্জয়ও। কিন্তু এখানে যেভাবে তাঁরা আটকে পড়েছেন তাতে মগধের সেনাদের সাহায্য ছাড়া বেঁচে ফেরা খুব কঠিন। লিচ্ছবিরা সুযোগ পেলে বিম্বিসারকে বন্দি করবে। আর তাঁকে তো হত্যা করবেই। একদিন কোনো মতে প্রাণ হাতে করে এই বৈশালী থেকে পালিয়ে গিয়ে মগধে আশ্রয় নিয়েছিলেন তিনি। বৈশালী তাঁর জন্মভূমি হওয়া সত্ত্বেও এখানে তাঁর থাকার অধিকার নেই। তাঁকে দেশদ্রোহী বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। এই কলঙ্ক আজও তাঁকে বয়ে নিয়ে বেড়াতে হয়। মধুর প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ থাকলেও পুরঞ্জয় সে পথে হাঁটতে চান না। কারণ তাতে ক্ষতি হবে বৈশালীর মানুষের। এই একই কথা তিনি শুনেছেন আম্রপালীর মুখেও। অদ্ভুত এই নারী। খোদ মগধরাজের ভালোবাসা তিনি ফিরিয়ে দিয়েছেন অবলীলায়। এই লিচ্ছবিরাই তাঁকে বাধ্য করেছিলেন গণিকা হতে। সুযোগ পেয়েও তিনি মগধের রাজরানি হয়ে থাকার আহ্বানে সাড়া দিলেন না। অথচ তিনিও বিম্বিসারকে ভালোবাসেন। আম্রপালীর দিকে তাকালে সে কথা সহজেই টের পাওয়া যায়। এক গণিকাও নিজের মাতৃভূমিকে রক্তে রাঙাতে চান না। চান না তাঁর নিজের সুখের জন্য বৈশালী ও মগধের ঘরে ঘরে কান্নার রোল উঠুক। এই তিন মাসে আম্রপালীকে অনেকখানি কাছ থেকে দেখেছেন পুরঞ্জয়। তাঁর কখনও মনে হয়নি তিনি একজন গণিকার প্রমোদভবনে আছেন। আম্রপালীকে কোনো বিশেষ একটি শব্দে ব্যাখা করা যায় না। আম্রপালী এক আশ্চর্য নারী। যাকে ঈশ্বর যত্নে তৈরি করেছেন। কিন্তু তাঁর ললাটে লিখেছেন রাশি রাশি বঞ্চনা। ক্ষমতা, বৈভব, রূপ, যৌবন— সব কিছুর প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও আম্রপালী নারী হিসেবে একজন একা মানুষ। যার মনের খবর কেউ রাখে না।
ঠিক সন্ধ্যার মুখে দুই বৌদ্ধ ভিক্ষু আম্রপালীর প্রাসাদের পিছন দিক দিয়ে বাইরে বের হলেন। দুজনেরই সুঠাম চেহারা। মুণ্ডিতমস্তক। পরনে লাল রং-এর পোশাক। কাঁধে ঝোলা। তাঁরা প্রাসাদের পিছন দিকের আমবাগান পেরিয়ে মেঠো পথ ধরলেন। সেখানে লিচ্ছবিদের রক্ষীরা মোতায়েন ছিলেন। তাঁরা দেখলেন দুই বৌদ্ধ ভিক্ষু তাঁদের কাছে এসে বললেন, “বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি।”
রক্ষীরা জানেন খোদ লিচ্ছবিরাজ তথাগতর ভক্ত। বৌদ্ধবিহার করার জন্য লিচ্ছবিরা তথাগতকে জমি পর্যন্ত দিয়েছেন। তাঁরা জানেন বৈশালীতে বুদ্ধের প্রভাব দিনদিন বাড়ছে। এই ভিক্ষুর দল ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ভিক্ষা করেন। দিনের শেষে ফিরে যান বৌদ্ধবিহারে। রক্ষীরা আর বাধা দিলেন না দুই ভিক্ষুকে। তাঁরাও ভগবান বুদ্ধের নাম নিতে নিতে মেঠো পথ ধরে দূরে মিলিয়ে গেলেন।
