নগরবধূ আম্রপালী – ২

।। দুই।।

বৈশালী নগরীর এক প্রান্তে বৌদ্ধবিহার। ধর্মচর্চার জন্য এই উপাসনা গৃহটি তৈরি করেছিলেন তথাগত। লিচ্ছবিরাজগণের অনুদানে তা এখন কিঞ্চিৎ বড় হয়েছে। এখানে বেশ কিছু বৌদ্ধ ভিক্ষু থাকেন। বিশেষ করে বর্ষার সময়টা এখানে অনেকে আশ্রয় নেন। তথাগতও এখানে আসেন মাঝেমধ্যে। এবারে বৈশালীতেই তিনি বর্ষাকালটা কাটাবেন বলে মনস্থির করেছেন। যদিও তিনি বৈশালীতে পা দিলেই লিচ্ছবিরাজ তাঁকে প্রাসাদে নিয়ে যাওয়ার জন্য লোক পাঠান। প্রাসাদের আড়ম্বর জীবন তাঁর পছন্দ নয়। তিনি প্রাসাদে যান রাজার সঙ্গে দেখা করতে। কিন্তু থাকেন হয় কোনো শ্রেষ্ঠীর গৃহে না হয় এই বৌদ্ধবিহারে। বৈশালীর এই বৌদ্ধবিহারটির দায়িত্বে রয়েছেন ভিক্ষু শুভব্রত। শুভব্রত তাঁর একনিষ্ঠ শিষ্য। প্রশাসনিক কাজেও দক্ষ। নিয়মনিষ্ঠার সঙ্গেই এই বৌদ্ধবিহারটি পরিচালনা করেন তিনি। তথাগত তাঁর ওপর ভরসা করেন। লিচ্ছবি গোষ্ঠীর নেতাদের সঙ্গেও সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলেন শুভব্রত।

ভিক্ষাবৃত্তি সেরে একে একে বৌদ্ধ শ্রমণরা বৌদ্ধবিহারে এসে তাঁদের দ্বি-প্রাহরিক ভোজন সেরে নিয়েছেন। দুপুরের আহারাদি সেরে নিয়েছেন তথাগতও। তিনি স্বল্পাহারি। অল্পতেই তাঁর ক্ষুধা নিবৃত্তি হয়। কুটিরে সামান্য বিশ্রাম নিয়ে তিনি চলে এসেছেন উপাসনা গৃহে। বৌদ্ধবিহারের মাঝখানে খড়ের ছাউনি দেওয়া উপাসনা গৃহ। চারদিকে মাটির দেওয়াল। আশেপাশে ছড়ানোছিটানো কুটির। সেখানে থাকেন বৌদ্ধ ভিক্ষুরা। এরই মধ্যে একটি কুটির বরাদ্দ তথাগতর জন্য। উপাসনা গৃহের মাটির দেওয়ালে ভেষজ রং দিয়ে লেখা নানা উপদেশ। সঙ্গে ছবি। দেওয়ালের কুলুঙ্গিতে পিলসুজ রাখা। তার ওপর মাটির প্রদীপ। মাটিতে পাতা কাপড়ের আসন। তারই একটিতে ধ্যানস্থ ভঙ্গিতে বসে রয়েছেন তথাগত। তথাগতকে ওই ভাবে বসে থাকতে দেখে তাঁর শিষ্যরা একে একে এসে উপস্থিত হলেন সেখানে। তথাগত চোখ মেলে তাকালেন। তরুণ শ্রমণরা তাঁকে প্রণাম জানালেন। শ্রমণদের মধ্যে থেকে একজন তথাগতকে প্রশ্ন করলেন, “প্রভু, ঈশ্বর কী?”

স্মিত হাসলেন তথাগত। উত্তরে জানালেন, “আমি তো তাঁকে দেখিনি, ফলে আমি তাঁর কথা কী করে বলব? আমি জানি কেবল আমার মতো দেহধারী মানুষকে। ফলে আমি মানুষেরই ভালো-মন্দ, সুখ-দুঃখ এসব নিয়ে চিন্তা করি, এসব নিয়েই ভাবি এবং সবার কী করে ভালো হবে সেই চিন্তাই আমাকে তাড়িত করে। সব প্রাণী সুখী হোক এটাই আমার একমাত্র কামনা।” এই অবধি বলে তথাগত সেই তরুণ শ্রমণের দিকে একদৃষ্টে তাকালেন। তারপর ফের বলে উঠলেন, “পরম স্রষ্টা তোমাকে তৈরি করেছেন এবং এই সুন্দর পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকো। তাঁর প্রতি আস্থাশীল থাকো। পরম স্রষ্টাই ঈশ্বর। যিনি ছড়িয়ে আছেন প্রতিটি জীবের মধ্যে।”

“তাহলে কি ঈশ্বরের অস্তিত্ব নেই?”

তথাগত একটু সময় নিলেন। তারপর প্রশ্নকর্তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “যখন একটি শিশু মাতৃগর্ভে একটু একটু করে বেড়ে ওঠে তখন সে তার মাকে দেখতে পায় না। আবার মা-ও তার গর্ভস্থ সন্তানকে দেখতে পান না। কিন্তু দুজনেই দুজনকে অনুভব করে। অথচ মা ও গর্ভস্থ সন্তান দুজনেরই তো অস্তিত্ব আছে। কিন্তু কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছে না। আমরাও প্রত্যেকেই সেই অসীম সত্যের গর্ভে রয়েছি।”

“তথাগত, চিত্তশুদ্ধি কী করে সম্ভব?” কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করলেন আরেক শিষ্য।

তথাগত শান্ত কণ্ঠে বললেন, “প্রত্যেক মানুষের মধ্যে রয়েছে নিজেকে শুদ্ধ করে তোলার অনন্ত সম্ভাবনা। এই শুদ্ধ মন নিয়ে মানুষের কল্যাণ করে যেতে হবে। আর এর জন্য প্রয়োজন চারটি গুণ। মৈত্রী, করুণা, মুদিতা ও উপেক্ষা। মৈত্রী, অর্থাৎ জগতের সবকিছুর ভেতর দিয়ে বয়ে চলা জীবনকে ভালোবাসা। করুণা— জগতের সব জীবের প্রতি দয়া। মুদিতা— জগতের সব জীবনের প্রতি সহানুভূতি। উপেক্ষা— জগতের সব অস্থিরতার ওপরে উঠে মনকে শান্ত ও অবিচল রাখা।”

উপাসনা গৃহে নিস্তব্ধতা। উপস্থিত সন্ন্যাসীরা চুপ করে তথাগতের বাণী শুনছেন। পিছনের সারিতে বসে আছেন বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ ভিক্ষু শুভব্রত। তিনি মনে মনে ভাবছিলেন, তথাগত বলেন ভারী চমৎকার। সময় যেন থমকে থাকে। প্রতিটি শব্দ ও বাক্যের ভেতর এক আশ্চর্য গভীরতা লুকিয়ে থাকে। কঠিন দর্শনের গূঢ় দিকগুলো কত সহজে তিনি ব্যাখ্যা করেন।

কিছুক্ষণ থেমে তথাগত ফের বলতে শুরু করেন, “মহাবিশ্বের শৃঙ্খলা চলে সুনির্দিষ্ট প্রাকৃতিক নিয়মে। আর জগতের সকল বস্তুই এই প্রকৃতির অধীন। মানুষের দুঃখ-দুর্দশা, জরা, দুশ্চিন্তা, অভাব, হতাশা — কোনো অতিপ্রাকৃত নির্ভর বিষয় নয়। এর জন্য দায়ী মানুষের চরিত্র। মানুষের মনের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হলো কামনা। আর কামনা অপূর্ণ থাকলে তৈরি হয় অপ্রাপ্তি। অপ্রাপ্তি থেকেই সৃষ্টি হয় দুঃখ। কোনো বেদনাদায়ক ঘটনায় মানুষের মন যেমন যন্ত্রণা থেকে মুক্তি চায়, তেমনি আনন্দের সময় মানুষ চায় সুখ দীর্ঘস্থায়ী হোক। তাই মানুষের মন কখনো স্থিরতা পায় না। সবচেয়ে ক্ষমতাশীল রাজাও এর জন্য দুশ্চিন্তার হাত থেকে মুক্তি পান না। সুখের পিছনে ছুটে আর দুঃখ থেকে পালিয়ে বাঁচতে মানুষ গোটা জীবন পার করে ফেলে। দুঃখ এবং সুখকে কামনা ছাড়া গ্রহণ করলেই মানুষের এই দুর্দশা আর থাকে না।”

তথাগতকে থামতে দেখে এক শিষ্য দ্রুত প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু মানুষের মন এই কামনা ত্যাগ করবে কেমন করে?’’

তথাগত বললেন, “এটা কঠিন, তবে অসম্ভব নয়। এর জন্য আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দরকার। ‘কী হতে পারতো’? না ভেবে যদি আমরা ‘কী হচ্ছে’ ভাবি তাহলেই বিষয়টা অনেক সহজ হয়ে যায়।”

“দুঃখকে কী করে জয় করা যায় তথাগত?” প্রশ্ন করলেন এক শিষ্য।

“আকাঙ্ক্ষা থেকেই দুঃখের সৃষ্টি। মোহ থেকে দুঃখ আসে, দুঃখমোচনের একমাত্র উপায় মোহ থেকে মুক্ত হওয়া। মোহ থেকে মুক্ত হবার উপায় হল বাস্তবকে সহজে গ্রহণ করা।”

“আর মুক্তি? মুক্তিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন আপনি?”

“নির্বাণ লাভের মাধ্যমেই মুক্তি সম্ভব। ‘নির্বাণ’ মানে আগুন নিভে যাওয়া। এর ফলে মানুষ নিজেকে সব রকম কল্পনা ও মোহ থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারে। গ্রহণ করতে পারে রূঢ় বাস্তবকে। এতে তাঁরা দুঃখ-ব্যথা অনুভব করেন না তা নয়, কিন্তু তখন এগুলো তাঁকে আর পীড়িত করে না। কামনা-বাসনাকে এড়াতে প্রয়োজন সাধনার। কঠিন সাধনার মধ্যে দিয়ে ইন্দ্রিয়কে জয় করতে পারাটাই মানবজীবনে মুক্তি।”

তথাগতর শিষ্যদের মধ্যে এক তরুণ শিষ্য অনেকক্ষণ ধরে উশখুশ করছিলেন। তথাগত বুঝলেন ওই শিষ্য তঁাকে কিছু বলতে চান। তথাগত তাঁর দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, “শুদ্ধসত্ত্ব, তুমি কী কিছু বলতে চাও?”

শুদ্ধসত্ত্ব মাথা নেড়ে বললেন, “হ্যাঁ, আমি একটি বিষয় আপনাকে জানাতে চাই।”

“নিঃসংকোচে বলো।”

শুদ্ধসত্ত্ব নিজেকে একটু গুছিয়ে নেওয়ার সময় নিলেন। তারপর বললেন, “আমি আজ ভিক্ষাবৃত্তি করতে করতে নগরপ্রান্তে আম্রপালীর প্রমোদভবনে গিয়েছিলাম।”

“বেশ তো। তাতে কী হয়েছে?”

“না, মানে উনি আমাকে ওঁর প্রমোদভবনে অতিথি হিসেবে থেকে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে ছিলেন।”

“এতে সংকোচ বোধ করার কী আছে শুদ্ধসত্ত্ব?”

“আমি সে আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে ফিরে এসেছি।”

“বেশ তো কাল গিয়ে ওঁর আমন্ত্রণ গ্রহণ করো। ওখানে এই বর্ষাকালটা না হয় কাটিয়ে এসো।”

এতক্ষণ পিছন থেকে সব কথাবার্তা শুনছিলেন বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ শুভব্রত। এবার তিনি আপত্তি জানিয়ে বলে উঠলেন, “তথাগত এ আপনি কী বলছেন? শুদ্ধসত্ত্ব বয়সে নবীন। সে একজন সন্ন্যাসী। আপনার কাছে দীক্ষিত। সে কী করে ওই নগরনটীর প্রমোদভবনে আতিথেয়তা গ্রহণ করবে? এতে তো তাঁর সন্ন্যাসজীবন কলুষিত হবে।”

“নারী অপবিত্র ও অচ্ছুত তো আমি বলিনি শুভব্রত। আমি সংসারের মোহে না পড়ার পরামর্শ দিয়েছিলাম। তাহলে সন্ন্যাসজীবনে বাধা আসে। পিছুটান জন্মায়।”

“কিন্তু তথাগত এ নারী তো কোনো সাধারণ নারী নয়। সে একজন রূপাজীবা। সমাজের অভিজাত পুরুষরা তার কাছে যায় যৌন তাড়নায়। এই ধরনের নারীরা উন্মুক্ত মলভাণ্ডারের মতো দুর্গন্ধ যুক্ত। বিষমিশ্রিত মদিরার মতো অনিষ্টকারী। কুটিলা সাপের মতো দুই জিহ্বা বিশিষ্ট। পাতালের মতো অতল গভীর। রাক্ষসীর মতো মায়াবিনী। অগ্নির মতো সর্বগ্রাসিনী। নদীর মতো সর্ববাহিনী। বায়ুর মতো যথেচ্ছগামিনী। বিষবৃক্ষের মতো বিষফল প্রসবিনী। একজন জ্ঞানী ভিক্ষু এই উন্মুক্ত মলভাণ্ডরূপ নারীদের দুর্গন্ধ উপলব্ধি করে তাদের সবসময় পরিত্যাগ করেন।” এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে একটু হাঁফাতে থাকলেন শুভব্রত। উত্তেজনায় তাঁর ফর্সা মুখ লালচে হয়ে উঠেছে।

শুভব্রত উত্তেজিত হয়ে উঠলেও শান্ত তথাগত। শুদ্ধসত্ত্ব মাথা নিচু করে বসে আছেন। তিনি ভাবছেন আম্রপালীর প্রমোদভবনে আমন্ত্রণের বিষয়টি না বললেই বোধহয় ভালো হতো। তথাগত কী ভাবলেন! ভিক্ষু শুভব্রত সম্ভবত তাঁকে ভুল বুঝলেন। তিনি হয়তো ভাবলেন যে, সে আম্রপালীর প্রমোদভবনে থাকার ব্যাপারে লালায়িত।

তথাগত শান্ত কণ্ঠে শুভব্রতের উদ্দেশে বললেন, “তুমি দেখছি আম্রপালীর ওপর অত্যন্ত বিদ্বেষ পোষণ করো। সে একজন রাজনর্তকী। লিচ্ছবী গোষ্ঠীর রাজপুরুষরা তাঁকে এই বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে তাঁর কাছে অভিজাত রাজপুরুষরা জৈবিক চাহিদা পূরণে যান। কিন্তু তার জন্য তাঁকে বাছাই করা বিশেষণে ভূষিত করা বোধহয় তোমার উচিত নয়। মনে রেখো নারীর গর্ভ থেকেই প্রাণের সঞ্চার হয়। আম্রপালীও একজন নারী এবং সন্তানের জননী।”

“ক্ষমা করবেন তথাগত। আম্রপালীর সঙ্গে আর পাঁচজন নারীর তুলনা হয় না। সে মায়াবিনী। পুরুষকে বশ করাই তার পেশা।” কেটে কেটেই কথাগুলো বললেন শুভব্রত।

“তর্ক করে এ বিষয়টি দীর্ঘায়িত করার কোনো মানে হয় না শুভব্রত। সব সময় মনে রাখবে যিনি অস্থির চিত্ত, যিনি সত্য সম্বন্ধে অবগত নন, যাঁর মানসিক প্রসন্নতা নেই, তিনি কখনও প্রাজ্ঞ হতে পারেন না।”

শুভব্রত ঠিক বুঝে উঠতে পারলেন না। মনে মনে ভাবলেন, তথাগত কী তাঁকে উদ্দেশ্য করেই উপদেশটি দিলেন?

শুদ্ধসত্ত্বকে ডেকে তথাগত বললেন, “তুমি কাল আম্রপালীর প্রমোদভবনে গিয়ে তার আমন্ত্রণ গ্রহণ করবে। এখান থেকে আমরা অন্যত্র যাবার আগে তুমি ফিরে এসো বৌদ্ধবিহারে।”

শুদ্ধসত্ত্ব প্রণাম সেরে উঠে পড়লেন। একে একে অন্য শিষ্যরাও ফিরে গেল তাঁদের কুটিরে। তথাগতকে একা পেয়ে শুভব্রত বললেন, “আপনি ওই তরুণকে আগুনে ঝাঁপ দিতে বললেন তথাগত। ওকে আর ফিরে পাবেন না। ও পথভ্রষ্ট হবে। কলুষিত হবে ওর সন্ন্যাসজীবন। কেন ওকে ওখানে যাওয়ার অনুমতি দিলেন? ”

তথাগত মৃদু হাসলেন। তারপর শুভব্রতর পিঠে হাত রেখে বললেন, “চিন্তা ক’রো না। শুদ্ধসত্ত্ব ঠিক সময়েই বৌদ্ধবিহারে ফিরে আসবে।” তারপর একটু থেমে ফের তিনি বললেন, ‘‘আমি ওর চোখে কাম দেখিনি শুভব্রত!”

তথাগতকে তাঁর কুটির পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসতে গেলেন শুভব্রত। দুজনেই পাশাপাশি হাঁটছিলেন। হঠাৎ তথাগত থামলেন। শুভব্রতকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন, “মনে রাখবে, ধর্মেরও আগে হল মন। মনই শ্রেষ্ঠ। সবকিছু মনোময়। মন পবিত্র থাকলে শত প্রলোভনেও তুমি কলুষিত হবে না।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *