শামানিজম

শামান-তন্ত্র

আবার অন্যদিকে মূলত অপার্থিব, অলৌকিক শক্তির ওপর যে-অগাধ বিশ্বাস নিয়ে, যে-আদিম ধৰ্ম অতি প্রাচীনকালে গড়ে উঠেছিল তার মধ্যে একটি হচ্ছে শামানতন্ত্র বা শামানিজ্‌ম্। বর্তমানে পৃথিবীর ০.২ ভাগ মানুষ শামানিষ্ট এবং এঁরা ছড়িয়ে আছেন পৃথিবীর প্রায় ১০টি দেশে। তবে সত্যিকথা বলতে কি পৃথিবীর নানা দেশের আদিম মনুষ্যগোষ্ঠীর মধ্যে এবং তথাকথিত উন্নত সাম্প্রতিক ধর্মগুলির মধ্যেও এই শামান মানসিকতা বিচ্ছিন্নভাবে ও প্রচ্ছন্নভাবে রয়েছে।

শামান (Shaman) কথাটির দ্বারা এমন একজনকে বোঝায় যে বিশেষ এক মানসিক অবস্থায় বিশেষ ধরনের আত্মার সঙ্গে অর্থাৎ অপার্থিব, অতিপ্রাকৃতিক শক্তির যোগাযোগ করতে পারে বলে বিশ্বাস করা হয়। এবং সে নাকি এই যোগাযোগের ফলে নানাবিধ কাজ করে দিতে পারে, যেমন রোগ সারানো, বিপদমুক্তি, ফসল ফলানো, ইত্যাদি ইত্যাদি। আবার এই যোগাযোগের ফলে নানা ‘ঐশ্বরিক নির্দেশ’, ‘অপার্থিব সংবাদ’ ইত্যাদিও সংগ্রহ করতে পারে। গ্রীনল্যাণ্ড থেকে আফ্রিকা, রাশিয়া কিংবা আন্দামান, কোরিয়া বা মেক্সিকো—পৃথিবীর নানা দেশেই এই শামানরা ছড়িয়ে আছে। আমাদের এখানে বা অন্যত্রও ঠাকুরের বা ভূতের ভর হওয়া বা বিশেষ দেবদেবীর দ্বারা আবিষ্ট হওয়ার ব্যাপারটি আসলে এই আদিম শামান পন্থারই একটি রূপ।

মানুষের চিন্তাভাবনা বিকাশের একেবারে শুরুর দিকে, সে যে প্রকৃতির সবকিছুর মূলে একটি রহস্যময় শক্তির অস্তিত্ব কল্পনা করেছিল, তা আগেই বলা হয়েছে। মানুষের কল্পনার এই বিশেষ দিকটিকে বলা হয় ( Animatism); কল্পনার এই প্রক্রিয়ায় মানুষের জীবন, জীবজন্তুর জীবন, প্রাকৃতিক সব ঘটনা,— এসবের মূলে কায়াহীন, অবয়বহীন এক শক্তি বা আত্মার কথা ভাবা হয়। আদিম মানুষ এই শক্তির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে। এই চেষ্টার যে প্রক্রিয়া পৃথকভাবে বিশেষ আচরণ-পদ্ধতি, বিশ্বাস, ইত্যাদি নিয়ে স্বাতন্ত্রের দাবি করে, তাকে আলাদা একটি ধর্ম তথা শামান-পন্থা (Shamanism) হিসেবে বলা হয়।

পরবর্তীকালে মানুষ এই শক্তি বা ‘আত্মা’-কে বিশেষ আকারে কল্পনা করেছে—সৃষ্টি হয়েছে দেবদেবীর চেহারা। কিন্তু পৃথিবীর বহু আদিবাসী গোষ্ঠী ঐ কায়াহীন অলৌকিক আত্মায় গভীরভাবে বিশ্বাস করে এবং তার সঙ্গে যোগাযোগের জন্য নিজের গোষ্ঠীর বিশেষ বিশেষ এক একজনের উপর দায়িত্ব দেয়। এই দায়িত্বপ্রাপ্ত যোগাযোগকারী ব্যক্তিই শামান যাকে অলৌকিক ক্ষমতাধর, অপার্থিব শক্তির প্রতিভূ ইত্যাদি হিসাবে ভাবা হয়।

আসলে এই শামানরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানসিক অর্থাৎ মস্তিষ্কের রোগে ভোগা ব্যক্তি। এখন জানা গেছে হিস্টেরিয়া, মৃগী, স্কিজোফ্রেনিয়া, হরমোনজাত কিছু রোগ, মস্তিষ্কের অপুষ্টি ইত্যাদি নানা ধরনের রোগ রয়েছে, যে-সব রোগের রোগীরা অস্বাভাবিক ও মিথ্যা কিছু অনুভূতির শিকার হয়। অসুস্থতা ছাড়া, কৃত্রিমভাবেও এই বিভ্রমের অভিজ্ঞতা লাভ করা যায়। গাঁজা, ভাঙ, চরস, ধুতুরা (হয়ত বা সোমরসও) বা আধুনিককালের এল এল ডি ইত্যাদি শরীর গ্রহণ করলে, মস্তিষ্কে তাদের রাসায়নিক প্রভাবে নানা বিভ্রম ও তথাকথিত অতীন্দ্রিয় অনুভূতি (Extra Sensory Perception বা ESP) লাভ করা যায়, অর্থাৎ শামান বা ঈশ্বরের দূত হওয়া যায়। (আবার কোরিয়ায় জন্মান্ধ ব্যক্তি সবচেয়ে শক্তিশালী শামান হতে পারে বলে বিশ্বাস করা হয়।)

ঘোরের মধ্যে আচ্ছন্ন, আবিষ্ট, অবস্থায় অর্থাৎ খিঁচুনি বা ফিটের সময় ও পরে, তারা অদ্ভুত সব অভিজ্ঞতার কথা বলে-অপার্থিব শক্তির ওপর বিশ্বাসের কারণে ঐ সব শক্তি তথা আত্মার ব্যাপারেও নানাবিধ কথাবার্তা বলে,—যা আসলে মিথ্যা কিছু অনুভূতি মাত্র। একইভাবে নানা ধরনের বিভ্রমও (hallucination ও illusion) তার ঘটে। এই সব মিথ্যা অভিজ্ঞতাগুলিকে সে বিশ্বাসযোগ্যভাবে বলে। অপার্থিব শক্তি, আত্মা ইত্যাদির ওপর বিশ্বাস যাদের গভীর ঐ গরিষ্ঠ সংখ্যক সরলবিশ্বাসী ‘সুস্থ’ ব্যক্তি ঐ অসুস্থ ব্যক্তির রহস্যময় কথাকে শ্বাস করে এবং নিজের কল্পনাকে আরো জোরদার করে তোলে। হাজার হাজার বছর আগে এভাবেই শামান-ঐতিহ্যের শুরু। আর সম্প্রতিকালে, বিগত দু-আড়াই হাজার বছরের মধ্যে মানুষের লিখিত সাহিত্য, সামাজিক ও অন্যান্য জ্ঞান উন্নত হয়েছে : এসবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রাচীন ঐসব শামানদেরই উত্তরসূরীরা নানাবিধ শিক্ষামূলক কথাবার্তা ব’লে ও সমাজ সংস্কারকের ভূমিকা নিয়ে ধর্ম, ও আধ্যাত্মিকতার প্রচার করে এবং এইভাবে জীবস্তু অবতার, ধর্মগুরু, বাবাজি বা স্বামীজি, ঈশ্বরের প্রতিভূ ইত্যাদি নাম নিয়েছে। তথাকথিত ধ্যানস্থ অবস্থায় ঈশ্বরের দর্শন পাওয়া ও তার নির্দেশ শোনা ( hallucination) বা তুরীয় অবস্থায় বিষ্ঠাকে মিষ্টান্নভাবা বা বাচ্চা ছেলেকে কৃষ্ণভাবা (illusion)-এর মতো ব্যাপার ঘটে। প্রকৃতঅর্থে এসবই পূর্বোক্ত নানাবিধ রোগের লক্ষণ মাত্র। তথাকথিত যে-সব ধর্মপ্রচারক দাবি করেছেন, তাঁরা ঈশ্বরের দেখা পেয়েছেন ও নির্দেশ শুনেছেন, স্পষ্টত তাঁরা সবাই-ই এই গোষ্ঠীভুক্ত—যদিও তাঁদের সামাজিক ভিন্নতর ভূমিকাও রয়েছে।

শামান এই সব অবতার এবং ব্রাহ্মণ, পুরোহিত; ওঝা-গুণিন ইত্যাদিদেরও পূর্বসূরী বা সমগোত্রীয়। এস্কিমো, আফ্রিকার আদিবাসী, আন্দামান নিকোবরের আদিবাসী, কোরিয়া বা অন্যান্য নানা দেশেই এখনো টিকে থাকা আদিবাসীদের মধ্যে, এই শামানতন্ত্র আদিমরূপে বর্তমান।

এস্কিমোরা যেমন মনে করে, নাতির শরীরে তার ঠাকুর্দার বা তার আগেকার কোনো পূর্বপুরুষের আত্মা আসে। শামান ‘ঠিক করে দেয়’ কার কার আত্মা ঐ শিশুর মধ্যে এসেছে। বড় হলে নিজের ‘আত্মা’ সৃষ্টি হয়ে যায়। তার আগে অব্দি এস্কিমোরা তাদের শিশুকে শত অপরাধ করলেও শাস্তি দেয় না, কারণ শিশুকে শাস্তি দেওয়া তো আসলে শ্রদ্ধেয় কোনো পূর্বপুরুষকে শাস্তি দেওয়া।

মধ্য-অস্ট্রেলিয়ার খরাপ্রবণ এলাকায় শামানদের কাজ হচ্ছে বৃষ্টি আনা, কিন্তু আফ্রিকার জঙ্গলে বা শ্রীলঙ্কার ভেদ্দা গোষ্ঠীর মধ্যে তার কাজ শিকারকে সফল করে তোলা। ক্যালিফোর্নিয়ার রেড ইণ্ডিয়ানদের শামানরা মূলত চিকিৎসার কাজ করে। জড়ি-বুটি গাছ-গাছড়ার ব্যবহারের সঙ্গে ঐ অপার্থিব শক্তি বা আত্মাকেও কাজে লাগানোর চেষ্টা করে তারা।

পরবর্তীকালে সৃষ্টি হওয়া অন্যান্য নানা ধর্মমতে এই শামানতন্ত্রের ছাপ পড়েছে। যেমন মুসলিমদের দরবেশরা ঈশ্বরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে বলে দাবি করে এবং প্রকৃত অর্থে নিছক শামানদেরই অনুকরণ করে। চীনের তাওপন্থীরাও শামানপন্থার অনুসরণ করে, আবিষ্ট অবস্থায় উন্মত্তের মতো নাচতে নাচতে চীৎকার করে ও অলৌকিক শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ হয়ে গেছে বলে ভাবে,— আমাদের দেশে কীর্তন করতে করতে বা নামগান, জপ ইত্যাদি তথাকথিত নানা ধর্মীয় প্রক্রিয়ার সময় সম্মোহিত অবস্থায় অনেকে যেমন অদ্ভুত সব অস্বাভাবিক কাজ-কর্ম করে বলে শোনা যায়। তথাকথিত হিন্দুদের নানা প্রাচীন ধর্ম-সাহিত্যেও শামানদেরই মতো ধ্যান করে বা নানা ক্রিয়াকাণ্ড করে দেবদেবীর দেখা পাওয়ার বা কথাবার্তা শোনার কিংবা অতিপ্রাকৃতিক শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করার কথা বলা হয়েছে। হাল আমলেও এমন হিন্দু শামান তথা অসুস্থ ব্যক্তির দেখা পাওয়া গেছে, যারা অবতার ছাপ পেয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতিও পেয়েছে।

তাই আসলে শামানতন্ত্র বর্তমানে পৃথিবীর মাত্র ০.২ ভাগ মানুষ (এদের প্রায় সবাই নানা আদিবাসী গোষ্ঠী) অনুসরণ করে বলে বলা হলেও, অন্যান্য আধুনিক ধর্ম ও বিপুল সংখ্যক অ-আদিবাদী শিক্ষিত ব্যক্তির মধ্যেই পরোক্ষে এর ছাপ পড়েছে।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *